মঙ্গলবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৫

গুচ্ছ কবিতা * বাবলু সরকার

 




কবিতাগুচ্ছ * বাবলু সরকার 


“২৯” তারিখ 


১.

আজ বুঝি সকাল থেকেই তুমি 

একটি শবদেহে পরিণত হয়ে আছো

ঠান্ডা শীতল রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে শিরায় 

আমি তো সামান্য এক চড়ুই সমতুল ধুকপুকে

হৃৎপিণ্ড আর কতটুকু উষ্ণতা নিতে পারবো 

সূর্যের থেকে ঠোঁটে করে আর কতবারই বা

তোমার শবদেহে সেই রোদ্দুর কে দিতে পারবো 



২.


বললাম ম্লান হেসে 

তুমি কি ধানক্ষেত ভালোবাসো

পথের ধারের সবুজ ধানক্ষেত 

আমি কিন্তু ভালোবাসি অথচ 

তুমি নীরব রইলে বললে না কিছু 

বদলে হেঁচে কেশে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরলে 

যেন নিজের দেহ তত্ত্ব বীজ কে দুই দাঁতের নীচে 

নিয়ে কামড়ে কামড়ে সবুজকেই গিলে নিলে 



৩.


আমার মৃত্যুর দিকে একটুও হেঁটে আসলে না তুমি 

আমি কিন্তু এবারে বকবো খুব সারারাত 

বকুনিঝকুনি করবো সাদা আলো নিভিয়ে 

নিরীহ রেললাইন কখন যে হিংস্র হয়ে ওঠে 

দু'পাশে ঘন অরণ্য নিবিড় কখনো বালি ইঁদুর 

অন্ধকারে শরীর থেকে খুবলে নেয় নক্ষত্র রাত

মহাকাশ আগুন দমবন্ধ যৌবন আমার 

সমাপিকা ক্রিয়ার যুবক বেলা 

এবার আমি এইসব মৃত্যু কে আশ্চর্য হয়ে 

দেখতেই থাকবো তবু  তোমার যৌবন নিয়ে 

আমার মৃত্যুর দিকে হেঁটে আসবো না



৪.


একবার তো জানলায় আসতে পারো 

দেখতে পারো পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসার

পথগুলোকে।নদীদের ইশারায় কেঁপে উঠতে 

পারো বছর শেষের এই দিনগুলোতে 

মেঘের ফাঁক গলে গলে মেঘের ঠোঁট

ফাঁকা করে একবার ছুঁড়তে পারো 

পোড়া তেলে ভাজার মতো চুমু

নীরব মৌমাছির মতো নিশি শুধুই ফিরে

আসে মৌচাকে অথচ তোমার নাভির উপর 

পড়ে আছে কত ভাঙা ভাঙা মৌচাক 



৫.


ওই পথ দিয়ে অফুরন্ত কোকিল উড়ে যাচ্ছে 

সামনে এক ভাসমান সমুদ্র আর ওই সমুদ্রের 

নীচে আমার বাঁশি আর তৃষ্ণা আর এদিকে 

তোমার বুকে মানে তুমি বুকে নিয়ে নিশ্চিন্তে 

ঘুমিয়ে আছো কতগুলো মৃত বাঁশি নিয়ে আমার 













********************************************************************



বাবলু সরকার 

 বাবলু সরকার বাদকুল্লা সুরভিস্থান নদীয়া থেকে লিখছেন। পেশায়  প্রাইভেট টিউটর ও এল আই সি কর্মী।  নয়ের দশক থেকে লেখা শুরু হলেও দুই হাজার থেকে পাকাপাকি ভাবে লেখা শুরু। সম্পাদিত পত্রিকা "সম্ভব "। মূলত লিটল ম্যাগাজিনের প্রতিই আগ্রহ। কাব্যগ্রন্থ নেই। লেখা পাঠানোয় ভীষণ অনীহা। এই অনীহার কারণেই হয়তো কাব্যগ্রন্থ হয়নি।


গুচ্ছ কবিতা * অর্ণব সামন্ত

 




         
কবিতাগুচ্ছ  * অর্ণব সামন্ত 



আপেল ও তীরন্দাজ 

            
গভীর জলের রক্তিম শোলপোনা খেয়ে গ্যাছে ডিম 
একজন তীরন্দাজই সফল হয় চাঁদমারি ফুঁড়ে যেতে 
আপেলের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র বোঝার আগেই 
কেউ আবেশে আশ্লেষে ঢলে পড়ে দ্রাঘিমার দুর্বলতায় 
রামধনু কাপড়ে ঢাকা আগাপাছতলা 
তবু উন্মুখ নাভি মাধ্যাকর্ষণে টানে হাজার হাজার ফুলকি 
কেউ তার জারিত হয়ে স্নিগ্ধতার পথে হাঁটে রূপান্তরে
ঘূর্ণিপাকে নতুন নক্ষত্রের জন্ম হয় মরে গিয়ে নক্ষত্রের কামনা বাসনা 
কেউ তর্জনী নির্দেশ করে কেউ করতল পাতে গ্রহণ আগ্রহে 
ছায়াশরীরের প্রতি ছায়াশরীরের যুদ্ধ বাড়ে প্রেম 
ঝঙ্কারে ঝঙ্কারে দেয় জায়মান কাব্যের শরীর 
আগুনকে সাক্ষী রেখে আগুনই রচনা করে আগুনে সন্তান 
আপেলই মাধ্যাকর্ষণ হয়ে গিলে খায় সমস্ত পৃথিবী 
উড়ে যায় মুক্তি উড়ালে হাজার মরণ পরে দারুন বাঁচায় 
গভীর জলের জল যেতে চায় আরও গভীরে ব্ল্যাকহোলের কঠিন প্রসবে 
নবজাতক আবহমান দ্রাঘিমার বুকের সুধাপানে মগ্ন 
নতুন তীরন্দাজ নতুন নতুন মৃগয়ার জন্য নিজেকে তৈরী করে।



উপঢৌকন 

         

দুর্দম আহ্বান ছিল আখরে , শব্দে 
ভাবে ভঙ্গিতে তখন সিঁড়িতে ওঠার উজান 
উজিয়ে আসছে সুর , স্বরলিপি , সৌরভ 
বিকেল ঝাঁটিয়ে যাচ্ছে যাবতীয় জঞ্জাল 
সকাল আনতে তার কি উন্মাদনা 
মিল্কিওয়ে নেমে আসছে বারান্দায় 
উপহার উপঢৌকন উজিয়ে যাচ্ছে উপভোগে 
সম্পৃক্ত , সমৃদ্ধ হতে হতে তোর ওষ্ঠে স্ফুরিত আমার গান 
আমি প্রমিথিউস হয়ে স্বর্গ থেকে চুরি করা আগুন 
তোকে দিচ্ছি দহনে , উজ্জীবনে , সুসভ্যতায় 
প্রত্ন আকরিক থেকে বেরিয়ে আসছে খাঁটি সোনা 
ঝঙ্কারে , বিদ্যুচ্চমকে এককের গান তখন আকাশ ফুঁড়ে অন্য আকাশে 
শিকার তীরন্দাজ হয়ে তীরবিদ্ধ করছে শিকারীকে 
অমল জ্যোৎস্নায় ভাসাচ্ছে স্বর্গ ও স্বর্গসুখের চরাচর !




স্বাতী নক্ষত্রের ঘূর্ণিজল 

          

নির্যাসটুকুও নিঙড়ে রাখি চন্দনচর্চায় 
স্বাতী নক্ষত্রের জল জলের আরও গহনে যেতে চায় 
কী দহন কী স্নিগ্ধতা কী তেজে মহিমায় ভরপুর 
ওগো প্রনম্য অগ্নি তুমি জেগে থাকো ভস্ম নিঃস্ব করে দিতে 
কী দারুন মরে গিয়ে উড়ান দিতে ফিনিক্স ডানায় 
ঢেউগুলি উজ্জীবনের জীবনকে দেয় জীবনের চেয়েও বেশি ছোঁয়া 
গরলে গরলে যে জীবন হয়ে যায় অমৃতের চেয়েও বেশি সুস্বাদু 
নির্যাসের ছায়া রাখে ব্ল্যাকহোল কাব্যে ,
আলোর ভাস্কর্য প্রসব করে কারুকামনার কারুকার্যে
পোশাকের মতো খুলে ফ্যালে মনের ভিতর মন 
মাংস-মেদ-মজ্জা-স্নায়ুর অঙ্কুরোদ্গমে এসো আলো
তরতাজা কবিতা হয়ে দাঁড়ায় নির্যাস মুখোমুখি 
কথনে জ্যোৎস্না হাসিতে রোদ্দুর দ্রাঘিমাকে সোনালী করে 
হৃৎকমল করে না আফশোষ জীবন ছোট্ট বলে 
বরঞ্চ এ ভুবনে ঢেলে দেয় সৌরভের ঢেউ , সুরের আগুন 
চানঘরে গান হয়ে নৃত্য করে এ জীবন এ যাপন 
স্বাতী নক্ষত্র জলধি হয়ে পেতে চায় গভীরে জলের ঘূর্ণি স্বাদ !




জ্যোৎস্না 


জ্যোৎস্না লালন করে , জ্যোৎস্না পালন করে 
সেই জ্যোৎস্না করে পান , সেই জ্যোৎস্নায় চান 
গানঘরে চান করে উঠে আসে নির্জন দুপুর 
তিলক কামোদ বেজে ওঠে দখিনা সুবাতাসে 
অরণ্য শেখাও তাকে , মোহনা শেখাও 
উপত্যকা দিয়ে গড়িয়ে পড়ে আশ্লেষ বর্ণমালা 
গহীন গাঙের অথইয়ে জলের গভীরে যেতে চায় জল 
সংস্কার উচ্ছন্নে পাঠানো নির্ভীক আদি প্রাণ 
দ্বৈততার বীজ বোনা জমিনকে এককের দৌরাত্ম্যে ডাকে 
বুদ্বুদ জীবন ভুলে ডুবে যায় দৃঢ় প্রত্যয় গরিমায় 
ঝঙ্কারে ঝঙ্কারে জাগে জায়মান সময়ের অপত্য সুখ 
দ্রাঘিমাংশ রেখে দেয় বুকের গভীরে বুকের গভীরে 
জ্যোৎস্না কথনে কাছে দাঁড়ায় সাতজন্মের আত্মীয়তা নিয়ে 
জ্যোৎস্না ভাগ বাটোয়ারা করে দুটি চাঁদ 
আবার এককের জ্যোৎস্নায় হারায় দারুন !




 দেরাজে সাতজন্ম 


দেরাজে তুলে রাখি গত জন্মের দরাজ হৃদয় ও দুপুর 
সন্ধ্যের ভিজে কন্ঠ , রাতের অঙ্কুরোদ্গম 
সকাল সকাল কুসুম কুসুম মন আছে তোর শরীর নেই 
বিকেলে শঙ্খকে বাজাল হলুদের গভীরে গিয়ে 
বিদ্যুচ্চমকে বিদ্যুচ্চমকে কখন বৃষ্টি এল , কখন যে জ্যোৎস্না 
ভিজে পুড়ে ভিজে পুড়ে দহন স্নিগ্ধ বেলার কামনা 
সুর সৌরভ ছড়িয়ে ছড়িয়ে করতলে এনে দিল সমস্ত ভুবন 
সাতজন্ম বেঁধে গাঁটছড়ায় মুক্তিকে দেওয়া হল ছাড়পত্র 
দেরাজে দ্রাঘিমাংশ অনন্ত দ্রাঘিমায় ভাসে মগ্নমুগ্ধতায় !

                                                                          

  **************************************************************************************    


 অর্ণব সামন্ত 

ইংরাজী ভাষার ছাত্র। ইংরাজীতে এম. এ ; বি . এড ।উনিশশো তিয়াত্তর সালে দক্ষিণ ২৪ পরগণার বাসন্তীতে জন্মালেও স্কুল জীবনের পর থেকে শহরতলীতে আবাস । শিক্ষকতা পেশা , নেশা কবিতা লেখা । এ পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ , ৪টি - গোলাপ এবং , ঝরা সময়ের উপকথা , পারমিতা , বামাক্ষী । পেশাগত সময় বাদে গান শোনা , বইপড়া , ফোটোগ্রাফি , কবিতা লেখাকেই জীবন যাপনের একমাত্র উপায় বলে মনে করেন।   


গুচ্ছ কবিতা * রতন পালিত




কবিতাগুচ্ছ * রতন পালিত


ফাঁদ  

      

মায়াবী পথের জটিলতা

জানা অজানার আমি আর

আমার চৈতন্য

শেষ বিন্দু ভেবে নিজেকে

বাঁধতে পারিনি


সংকেত এসেছিল

বিশাল বিশাল ফেরিওয়ালা

আমাকে কৈফিয়ত দিতে হয়েছে


কারণ; সস্তা হলেও

সেই দুর্লভ প্রলোভন কেনার সামর্থ

আমার ছিল না



ঘুম 


রাস্তাগুলো উঠছে আর নামছে

আমিও

আমার সাথে যারা ছিল

তারা ঘুমিয়ে পড়েছিল শীতল সুখে


ঘুম,  সে'ও এক বিচক্ষণ অভিব্যক্তি

জেনেছি --

তারও পছন্দ অপছন্দের  মনিব আছে



মাদল 

        

ছোট গাছগুলো জ্বলছে

বড় গাছগুলোর মাথা টলমল


তীব্র বেগ

আছড়ে পড়ছে ঢেউ; সাথে


একটা স্নিগ্ধ নদীর বেতাল চলন


নৈসর্গিক বাগিচায়

রঙিন কিছু গাছ


কানে আসছে

কোথাও

মাদল বাজছে বেহুঁশ



সবার মা 

       

শান্তি পীঠ


শব নেই, কোন ডোম নেই

আধপোড়া বাঁশ, আধপোড়া কাঠ

ইতিউতি


একটি খোলা মন্দির

ভিতরে বিভৎস মূর্তি

টানা টানা চোখ, টকটকে লাল মুখ


জনশ্রুতি

তিনিই সবার মা













******************************************************************



রতন পালিত 

কবিতা মননে, চিন্তনে । স্কুল জীবন থেকে। প্রথম প্রকাশিত কবিতা স্কুল ম্যাগাজিনে, একাদশ শ্রেণী। তারপর বিভিন্ন জনের আবদারে অনেক লেখা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এবং স্থানীয় শারদীয় পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশ। মাঝে বেশ কয়েক বছর ছেদ। বর্তমানে নিয়মিত চর্চায়।

প্রবন্ধ * শাশ্বত বোস

 



বিবর্তনবাদ ও প্রাণের উৎপত্তিতে পুরাণের গ্রহণযোগ্যতা আদৌ কতটা?


ভারতবর্ষ এক বৃহত্তর ধর্মযাপনের দেশ। কথাটা লিখলাম শুধু এটা বোঝাতে নয় যে এই দেশ এক সুবৃহৎ জনসংখ্যার ধারক হিসেবে বহু প্রাচীন কাল ধরে নানা ভাষা-জাতি-সভ্যতার মানুষের ভরসাযোগ্য যাপনচিত্র এঁকে চলেছে অগণিত নদীশাখার বহমান ধারায়, সেই সাথে আমি এই ধর্মাচরণ বা ধর্মযাপনের ব্যবহারিক ভিত্তির উপরও জোর দিতে চাইছি। ধর্মকে ঘিরে বহু জাগতিক বিশ্বাস-অবিশ্বাস গঠনতন্ত্র ও নির্দেশিকার প্রবহমান আত্মিকতার সুপ্ত একটি ধারা একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে ধ্বনিত হয়ে চলেছে গোটা দেশটার সুষুম্না তন্ত্রের ভেতর, সেই সভ্যতার প্রারম্ভিক সময়কাল থেকে। হিন্দুধর্মকে সনাতন ধর্মের আখ্যা দেওয়া হয়, এর প্রাচীনতার হিসেবেই শুধু নয় একই সাথে এর বিশালতা ও বিচিত্র ভাষাভাষীর মানুষের মধ্যে সময়বিশেষে এই ধর্মের যাপনের ভিন্নতাও এক্ষেত্রে সমানভাবে বিচার্য্য হয়ে থাকে। মহাকাব্য, বিজ্ঞান কিংবা অনুমান এই সব কিছুই এই ধর্মের সাথে মিলে মিশে গেছে প্রলম্বিত এক গুরুমন্ত্রের মত। মনে করা হয় মহাভারতের রচয়িতা ব্যসদেবই ভারতীয় পুরাণের সংকলক। তবে ইতিহাস অনুসারে পুরাণের সব থেকে প্রাচীন পাঠগুলো গুপ্ত সাম্রাজ্যের কালেই সংকলিত হয়েছিল। এর অধিকাংশ উপাদানই ঐতিহাসিকদের মতে এই সময়কালের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ। পুরাণ গ্রন্থগুলি ভারতের নানাস্থানে রচনা করা হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৫০ অব্দে রচিত ছান্দোগ্য উপনিষদে পুরাণের একটি প্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায়। বৃহদারণ্যক উপনিষদ পুরাণকে পঞ্চম বেদ বলে অভিহিত করে (ইতিহাসপুরানম্ পঞ্চম বেদম্)। অথর্ব বেদ এই ধারণাকে পুষ্টি দেয়। 

ভারতীয় পুরাণ মোট পাঁচটি বিভাগে বিভক্ত। যেমন সর্গ বা ব্রম্ভান্ড সৃষ্টির কাহিনী, প্রতিসর্গ: এর পরবর্তী যুগের বা প্রলয় পরবর্তী যুগের কথা বলে, বংশ: এতে দেবতা ও ঋষিদের বংশবৃত্তান্ত নিয়ে বলা আছে, মন্বন্তর: মনুর শাসনকাল যা তিরিশ কোটি চুরাশি লক্ষ আটচল্লিশ হাজার বছরের সমান এবং সেই সময়ের মনুষ্যজাতির সৃষ্টির বর্ণনা দেয় এবং বংশানুচরিতম: যেখানে রাজবংশের ইতিহাস বর্ণিত আছে। আরিয়ান রচিত ইন্ডিকায়, মেগাস্থিনিস থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে ভারতীয়রা শিব (ডায়োনিসাস) থেকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (সান্ড্রাকোটাস) পর্যন্ত "ছয় হাজার তেতাল্লিশ বছরে একশো তিপান্ন জন রাজা র কথা স্বীকার করে। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে রচিত বৃহদারণ্যক উপনিষদে গুরু-পরম্পরায় ৫৭টি যোগসূত্রের কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ গুরু-পরম্পরা তারও ১৪০০ বছর আগে থেকে প্রচলিত ছিল। যদিও এই তালিকার যথার্থতা নিয়ে মতদ্বৈত রয়েছে। কহ্লন রচিত রাজতরঙ্গিনী গ্রন্থে বর্ণিত রাজাবলিতে খ্রিস্টপূর্ব ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত রাজাদের তালিকা পাওয়া যায়। 

এখন আসা যাক সৃষ্টির আদিকল্পের কথায়। আধুনিক বিজ্ঞানচর্চ্চা শুরু হবার আগেও মানুষের মনে নিজের উৎপত্তি সম্পর্কে কৌতূহল ছিল। এই অজানাকে দেখা, অচেনাকে চেনার স্পৃহাই কিন্তু একদিন জন্ম দিয়েছিল দর্শনবাদের, যা মানুষকে ধর্মীয় মাদকতার পাশাপাশি এক স্বাধীন যুক্তিসম্মত মনন গড়ে তোলার ভিত্তি যোগায়। সেই চিন্তনশীলতাকে আধুনিক ও প্রমাণসাপেক্ষ করে তোলে বিজ্ঞান। তবু আজ এই উত্তর আধুনিক যুগেও, পুরাণ, দর্শন ও বিজ্ঞানের সংঘাত থামেনি। যদি আমরা তুল্যমূল্য বিচারে আসি তাহলে কিন্তু দেখবো, খুব গভীর স্তরের যুক্তিগ্রাহ্য প্রামাণ্য নথি না দিতে পারলেও, সৃষ্টির আদিকালে এই ব্রম্ভান্ডের রূপ ঠিক কেমন ছিল সেই নিয়ে একটি আভাস কিন্তু আমরা আমাদের পুরাণের থেকে পাই। এই যেমন বিজ্ঞান বলছে, এই মহাবিশ্ব প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছর পুরোনো। এ প্রসঙ্গে বলা যায় “বিগ ব্যাঙ” তত্ত্বই প্রাথমিক ভাবে আমাদের সৃষ্টির আদিকাল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাটা দিয়েছিল। সে এক ভয়ানক বিস্ফোরণ, যা সাধারণ মানুষের কল্পনাশক্তিরও বাইরে, তাকে অনায়াসে পুরাণে বর্ণিত সৃষ্টির শুরুতে স্থিত মহাপ্রলয়ের সাথে তুলনা করা চলে। সেই সময় থেকে মহাবিশ্ব প্রসারিত হয়েছে ক্রমে, ব্রম্ভান্ডের তাপমাত্রাও কমেছে। এর কিছু পরে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস গঠিত হয়েছে। ক্রমশঃ মহাকর্ষের অধীনে গ্যাসগুলো ঘনীভূত হয়ে বর্তমান মহাবিশ্বের ছায়াপথ তৈরী হয়। সেই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সৌরজগতে ৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী তৈরী হয়। আদিমতম পৃথিবীতে কোন বায়ুমণ্ডল ছিল না। গলিত ভর থেকে নির্গত মিথেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, অ্যামোনিয়া ভূপৃষ্ঠকে ঢেকে দেয়। সূর্য্যের অতিবেগুনী রশ্মি জলকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে বিভক্ত করে। অক্সিজেন এবং মিথেনের সাথে মিলিত হয়ে জল CO2 ও অন্যান্য যৌগ গঠন করে। ওজোন স্তর এই সময়েই তৈরী হয়েছিল। পৃথিবী শীতল হওয়ার সাথে সাথে জলীয় বাষ্প অঝোর ধারায় ঝরে পড়ে ও সাগর তৈরী করে। পৃথিবী সৃষ্টির ৫০০ বিলিয়ন বছর পর প্রাণের আবির্ভাব হয়েছিল। সূচনার স্তরে জীবনের প্রথম নন সেলুলার ফর্মগুলি ৩ বিলিয়ন বছর আগে উদ্ভুত হয়েছিল। এরাই হল দৈত্যাকার অণু (আর.এন.এ, প্রোটিন, পলিস্যাকারাইড) ইত্যাদি। এরাই তাদের অণুগুলিকে পুনরুৎপাদন করেছিল। জীবনের প্রথম সেলুলার ফর্মেশন সম্ভবত কোষ গঠনের মাধ্যমেই হয়েছিল। সমস্ত প্রাণের রূপই ছিল শুধুমাত্র জলের পরিবেশে।

এই সূত্রে আমরা বিষ্ণুর দশ অবতারের প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে পারি। মানুষ ও জীবজগতের উৎপত্তি ও বিবর্তনের প্রথম যুক্তিগ্রাহ্য ও বিজ্ঞানসম্মত ধারাটি আমরা ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত, চার্লস ডারউইনের দ্বারা লিখিত গ্রন্থ, ‘অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস বাই মিন্স অফ ন্যাচারাল সিলেকশন’ এর মাধ্যমে জানতে পারি। গ্রন্থটি প্রকাশের পর যা ডারউইনের মতালম্বীদের ভিতরে “ডারউইনবাদ” রূপে আখ্যায়িত হয়। যদিও আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে এই মতবাদটির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মনে করা হয় বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও গবেষণার দৃষ্টান্তের বদলে এটি একটি আদর্শ মাত্র। ডারউইন মূলতঃ প্রাকৃতিক নির্বাচন ও অসংগঠিত বিন্যাসের উপর জোর দিয়েছিলেন তাঁর বক্তব্যে। এই তত্ত্ব মূলতঃ মিউটেশন ও নির্বাচনের মাধ্যমে প্রজাতির বিবর্তনীয় বৈচিত্র সম্পর্কে জৈবিক তত্ত্বের ধারণা দিতে গিয়ে, “সমষ্টির মধ্যে কিছু জীবের প্রাকৃতিক নির্বাচন”, এই মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ঠ হয়। জন্ম নেয় একই প্রজাতির অনেক জীব, সৃষ্টির খেয়ালে শুধুমাত্র কিছু কিছু জীবের মধ্যেই সেই বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে যা তাদের অস্তিত্ত্বের সংগ্রামে সাহায্য করে। সেই বিশেষ কিছু জীবই পুনরুৎপাদনে সক্ষম হয়। এখন প্রশ্ন হল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবার সময় ডারউইন সাহেব কোন কোন প্রকরণ নিরীক্ষণ করেছিলেন। শোনা যায় যাত্রাকালে চার্লস ডারউইন, গ্যালাপোগাস দ্বীপপুঞ্জে যান। সেখানে তিনি জীবের এক আশ্চর্য্য বৈচিত্র লক্ষ্য করেন। সেখানে তিনি “ফিঞ্চস” নাম পরিচিত এক বিশেষ ধরণের ছোট কালো পাখি দেখেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে একই দ্বীপে অনেক জাতের ফিঞ্চ রয়েছে এবং প্রায় সব কটি জাত ওই দ্বীপেই বিবর্তিত হয়েছে। যাদের মূলতঃ বীজ খাওয়ার বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে পরিবর্তিত ঠোঁট সহ আরো অনেক রূপের উদ্ভব হয়েছিল। 

এখন আবার আসা যাক পুরাণ প্রসঙ্গে। এই ডারউইনবাদকে অনেক দার্শনিক ও পুরাতত্ত্ববিদ বিষ্ণুর দশ অবতারের প্রাচীন ধারণার সাথে সমানুপাতিকভাবে চিহ্নিত করেন। অগ্নি, পদ্মা, গরুড়, লিঙ্গ, নারদ, স্কন্ধ ও বরাহ পুরাণে এই দশাবতার রূপের বর্ণনা আছে। বিষ্ণু বা নারায়ণ সৃষ্টির আদিকালে ছিলেন যোগনিদ্রায় মগ্ন। প্রলয়ের পরের অবস্থা হল, বিলুপ্তি ও পুরুষ প্রকৃতির মধ্যে বিভাজনের সময়কাল। বিভিন্ন পুরাণ বিশেষতঃ বিষ্ণু পুরাণে বর্ণিত আছে প্রলয়ের পরবর্তীকালে ব্যাপক বর্ষণের পর তৈরী হয়েছিল নিখিল সুরার সাগর। সেই সাগর থেকে উঠে আসেন বিষ্ণু স্বয়ং যোগনিদ্রায় মগ্ন হয়ে। সে নিদ্রা স্বপ্নহীন। তাঁর নাভিপদ্ম থেকে উঠে আসেন সৃষ্টি বিধাতা ব্রম্ভা। বিষ্ণুর এই নিদ্রার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন, তাঁর নয়নাশ্রিত অতুল তামসী শক্তি, বিশ্বেশরী, জগদ্ধাত্রী, স্থিতি সংহার কারিণী, ভগবতী যোগনিদ্রা দেবী। স্বয়ং শ্রী শ্রী সপ্তশতী চন্ডি বর্ণিত ব্রম্ভার স্তবে উল্লিখিত আছে, 

“অর্ধমাত্রা স্থিতা নিত্যা যানুচ্চার্যা বিশেষতঃ ।

ত্বমেব সা ত্বং সাবিত্রী ত্বং দেবজননী পরা ।।

ত্বয়ৈব ধার্যতে সর্বং ত্বয়ৈতৎ সৃজ্যতে জগৎ ।

ত্বয়ৈতৎ পাল্যতে দেবি ত্বমৎস্যন্তে চ সর্বদা ।।”


অর্থাৎ তিনি অমৃতরূপা এবং অ-উ-ম ত্রিবিধ মাত্রারূপে অবস্থিত প্রণবরূপা। বিশেষরূপে যা অনুচার্যা, নির্গুণা বা তুরীয়া। তিনিই এই জগৎ ধারণ করেছেন। তিনি জগৎ সৃষ্টি করেন, পালন করেন আবার প্রলয়কালে তিনিই তা সংহার করেন। 

বিষ্ণুর দশাবতার হলেন, যথাক্রমে মৎস, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, বলরাম, বুদ্ধ এবং কল্কি। এ প্রসঙ্গে গৌড়ের রাজা লক্ষণসেনের রাজসভার পঞ্চরতের অন্যতম এক অসামান্য প্রতিভাধধর কবি জয়দেবের নাম স্মরণ করতেই হয়। বর্তমান বীরভূম স্থিত কেন্দুলী যা সেই সময়ে কেন্দুবিল্ব নামে পরিচিত ছিল, সেই গ্রামেই এই ক্ষণজন্মা পুরুষের জন্ম হয়। ১২ শতকে তাঁর রচিত কাব্য “গীতগোবিন্দ” তে দশাবতার স্তোত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই কাব্যের দশাবতার-স্তোত্রেই প্রথম গৌতম বুদ্ধকে 'যজ্ঞনিন্দাকারী' বিষ্ণুর অবতাররূপে উল্লেখ করা হয়েছে এবং কাব্যের শেষে ভগবানরূপী কৃষ্ণ ভক্ত রাধার শ্রীচরণ নিজের মাথায় রাখার যাচ্ঞা জানিয়েছেন, "দেহি পদপল্লবমুদারম্"। ভগবান বিষ্ণু যুগে যুগে ধরিত্রীর চিরাচরিত প্রাকৃতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় রাখতে জগতের মঙ্গলের জন্য অবতাররূপে ধরাধামে নেমে আসেন। এই স্তোত্রে জয়দেব অবতাররূপী কেশবের দশরূপের বর্ণনা দিয়ে বন্দনাগানে লিপ্ত হয়েছেন। এই কাব্যে বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণের গোপিনীদের সঙ্গে রাসলীলা, রাধার বিষাদ বর্ণনা, কৃষ্ণের জন্য ব্যাকুলতা, উপালম্ভ বচন, কৃষ্ণের রাধার জন্য উৎকণ্ঠা, রাধার সখীদের দ্বারা রাধার বিরহ-সন্তাপের বর্ণনা গ্রন্থিত হয়েছে। 

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করাই যায় দশাবতারের প্রাচীন ধারণার ক্রমটিকেও বহু ক্ষেত্রে আধুনিক ডারউইনীয় বিবর্তনের প্রতিফলন হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আর এই ধারণাটিকে সঠিক ভাবে উপলব্ধি করার জন্য এখন যদি আবার আমরা বিজ্ঞানের আঙিনায় ফিরে যাই তাহলে দেখবো এই পৃথিবীতে প্রথম জীবিত রূপ হল প্রায় ৩.২২ বিলিয়ন বছর আগে জন্ম নেওয়া নীল সবুজ শৈবাল, “সায়ানোব্যাক্টিরিয়া”। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ৩৫০০ মিলিয়ন বছর পুরোনো পাথরে পাওয়া জীবাশ্ম দ্বারা এই ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ত্ব প্রমাণিত হয়। এই সায়ানোব্যাকটিরিয়া কিন্তু সাধারণ শৈবাল নয়, এগুলি হল প্রোক্যারিওটিক জীবন রূপ এবং সেই কারণে কোষগুলিতে অর্গানেল ও স্বতন্ত্র নিউক্লিয়াস থাকে না। 

দশাবতারের প্রথম শ্লোকে কবি জয়দেব বলছেন,

“প্রলয়পয়োধিজলে ধৃতবানসি বেদং।

বিহিতরহিত্রচরিত্রমখেদম্।।

কেশব ধৃতমীনশরীর জয় জগদীশ হরে।।”


অর্থাৎ সৃষ্টির আদিতে অনন্ত জলরাশির তলায় জগৎ সংসার যখন নিমজ্জিত প্রায়, তখন সৃষ্টি রক্ষার্থে জীবের জন্মবীজ স্বরূপ জ্ঞানকেই তিনি নিমজ্জমনের হাত থেকে রক্ষা করেছেন মৎসরূপী নৌকার ন্যায়। জ্ঞানের স্বরূপার্থে, সৃষ্টির প্রতিরূপার্থে বেদ বা জ্ঞানালোকের প্রতিবম্বই এখানে জীবন বা প্রাণের স্বরূপ। অর্থাৎ কিনা বিজ্ঞানের কত শত বছর আগে পুরাণ আমাদের ধারণা দেয় প্রাণের সৃষ্টি হয়েছিল জলে।

দ্বিতীয় শ্লোকে তিনি বলেছেন,

“ক্ষিতিরতিবিপুলতরে তিষ্ঠতি তব পৃষ্ঠে

ধরণিধরণকিণচক্রগরিষ্ঠে।

কেশব ধৃতকূর্ম্মশরীর জয় জগদীশ হরে।।”


পুরাণ বলে বিষ্ণুর দ্বিতীয় অবতার হলেন কূর্ম বা কচ্ছপ। সমুদ্রমন্থনকালে মন্থনদণ্ডরূপী মন্দার পর্বতকে পৃথিবীর কেন্দ্রে স্থির রাখার জন্য ভগবান পরিগ্রহ করেছিলেন ভীমকায় কচ্ছপের রূপ, নিজ পৃষ্ঠে ধারণ করেছিলেন মন্দার পর্বতকে। সমুদ্র মন্থনের তাড়নায় পৃথিবীর ভারসাম্য যাতে হারিয়ে না যায় তাই পৃথিবীর ভরকেন্দ্রকেই নিজ পৃষ্ঠে ধারণ করেছিলেন তিনি। তার সেই গুণবলে পৃথিবী আজও নিজ অক্ষে স্থির আছে। জয়দেব তার কবির অন্তর্দৃষ্টিতে দেখলেন, পৃথিবীর ভার ধারণের ফলে ভগবানের কূর্মপৃষ্ঠে কিণাঙ্ক রেখা, আবার সেই রেখা তার ক্ষমতার প্রতীকও বটে। পৃথিবীপৃষ্ঠের সাথে ঘর্ষণের ফলে তাঁর পিঠে যে কিণাঙ্ক বা কড়া পড়েছে তা এক অর্থে তাঁর অঙ্গের শোভাও বটে। এবার যদি বিজ্ঞান অনুসন্ধিৎসু চোখে এর ভেতর বিবর্তনবাদের ধারাটি খুঁজে দেখতে হয়, তাহলে দেখবো কচ্ছপ উভচর প্রাণী অর্থাৎ জল থেকে স্থলে প্রাণের আগমন হল সবে। কোথাও গিয়ে এই ধারণা বৈজ্ঞানিক বিবর্তনবাদের সাথে মিলে মিশে গেল না কি?


দশাবতার স্তোত্রের এর পরের শ্লোকে কবি বলেছেন,


“বসতি দশনশিখরে ধরণী তব লগ্না

শশিনি কলঙ্ককলেব নিমগ্না।

কেশব ধৃতশূকররূপ জয় জগদীশ হরে।।”


পুরাণ মতে সৃষ্টির অতিপ্রসবহেতু ধরণী যখন রসাতলে তলিয়ে গিয়েছিল, তখন শ্রী হরি একশৃঙ্গী বরাহরূপ ধারণ করে, আপন একদন্ড শীর্ষে পৃথিবীকে সমুদ্র তলদেশ থেকে উদ্ধার করে আনেন। আসলে বসুন্ধরা হরিপ্রিয়া। বরাহ অবতারে তাঁর যেমন রক্ষকের ভূমিকাটি স্পষ্ট তেমনি ব্যঞ্জিত তাঁর প্রেমিক রূপও। উদ্ধারকালে পরম পুরুষ তিনি, ধরণীকে একশৃঙ্গে কর্ষণ করে নবসৃষ্টির সূচনা করেছিলেন। কবি বলেছেন, হে কেশব, চন্দ্রের অবিচ্ছেদ্য রূপ কলংকের ন্যায় বরাহরূপধারী তোমার শুভ্র দশনশিখরে শ্যামলিমা ধরণী মগ্ন হয়ে আছেন। কবি এখানে শৃঙ্গাররসে বিষ্ণুর বরাহরূপকে উজ্জ্বল করে তোলেন। আবার এই বরাহ অবতাররূপেই যেমন পুরোপুরি স্থলভাগে প্রাণের সঞ্চারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি জনন ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাণের পুনরোদ্গম ও বংশবৃদ্ধি ভাবনারও একটি স্বচ্ছ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 


তিনবার মনুষ্যেতর রূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হবার পর, চতুর্থবার কেশব ধারণ করলেন অর্ধ মানব-অর্ধ পশু, নৃসিংহ রূপ দুর্দমনীয় দানব হিরণ্যকশিপুর নৃশংস অত্যাচারের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার নিমিত্তে। এই হিরণ্যকশিপু স্বয়ং ব্রম্ভার কাছ থেকে বর পেয়েছিলেন যে দেবতা মানব দানব তাঁকে হত্যা করতে পারবেন না, এমনকি তিনি দিন বা রাতে হত হবেন না, এমনকি তাঁর মৃত্যু হবে না কোন অস্ত্রের আঘাতেও। বিবর্তনবাদ, বিজ্ঞান বলে “এপ” নামক এক বিশেষ বন মানুষের জিন মিউটেট ই জন্ম হয়েছে আধুনিক মানুষের। তারা লোমশ ছিল এবং গরিলা এবং শিম্পাঞ্জীর মত হাঁটত। ইথিওপিয়া ও তানজানিয়ায় মানুষের মত হাড়ের কিছু জীবাশ্ম পাওয়া গেছিল, যেগুলি প্রমাণ করে মানুষের পূর্বপুরুষের একটি প্রজাতি পূর্ব আফ্রিকায় ছিল। আবিষ্কৃত হাড়ের মধ্যে কিছু হাড় ভিন্ন প্রকৃতির ছিল, এই হাড়গুলিই ছিল প্রথম কোন মানব সদৃশ প্রাণীর, যাদের বলা হত “হোমো হ্যাবিলিস”। তাদের মস্তিষ্কের ক্ষমতা ছিল ৬৫০ থেকে ৮০০ সিসি এর ভেতর এবং তারা সম্ভবত শাকাহারী ছিল। ১৮৯১ সালে জাভাতে আবিষ্কৃত জীবাশ্ম থেকে “হোমো ইরেক্টাস” নামক একটি মানব প্রজাতির কথা জানা যায়, যাদের ৯০০ সিসির মত মাথা ছিল এবং সম্ভবত এরা মাংসাশী ছিল। আজকের উন্ন্ত মানুষের সব থেকে কাছের প্রকরণ “হোমো সেপিয়েন্স” আফ্রিকায় উত্থিত হয়েছিল এবং মহাদেশ জুড়ে তারা স্থানান্তরিত হয়েছিল। জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ৭৫ থেকে ১০ হাজার বছর আগে আধুনিক হোমো সেপিয়েন্সের আবির্ভাব হয়েছিল। অর্থাৎ মানুষের শরীরে আজও রয়ে গেছে বন্যতার জিন। সুযোগ পেলেই তাই আজও মানুষ ধরে পশুর রূপ। জীবজগৎ ধরাধাম কেঁপে ওঠে তার নৃশংসতায়। তবু মানবসৃষ্টির আদি পাঠ কিন্তু আমরা পাই, সেই আদি পুরাণেই। ডারউইনের বিবর্তনবাদের অনেক আগেই যার প্রচলন হয়েছিল।

তথ্যসূত্র: অন্তর্জাল












*************************************************************************************




শাশ্বত বোস


লেখকের জন্ম ১৯৮৯ সালের জানুয়ারী মাসে পশ্চিমবঙ্গের  হুগলী জেলার শ্রীরামপুর শহরে । হুগলী জেলারই রিষড়া শহরে শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম বিদ্যালয় থেকে স্টার মার্কস নিয়ে যথাক্রমে ২০০৫ ও ২০০৭ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন । ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখির সাথে যুক্ত। বিভিন্ন নামী পত্রিকা যেমন সন্দেশ, জোয়ার, কোরক, পথ ও পাঁচালি ইত্যাদি পরিবারের তিনি নিয়মিত সদস্য ছিলেন । বহু স্বনামধন্য লেখক-লেখিকাদের সাথে তিনি বিভিন্ন পত্রিকার শারদসংখ্যায় লেখালিখি করতেন । 

পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষা ও কেরিয়ারের জন্য সাময়িকভাবে সাহিত্যচর্চার জগৎ থেকে বিরতি নিয়েছিলেন । ২০১১  সালে ইলেকট্রনিক্স এন্ড কমিউনিকেশন  ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হবার পর একজন সফল আউটডোর ব্রডকাস্টিং ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে একটি খ্যাতনামা বাংলা স্যাটেলাইট চ্যানেলে যোগ দেন ও পরবর্তীতে তিনি ইন্ডিয়ান নেভি ডেপুটেশনেও কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি একটি নামি বহুজাতিক সংস্থায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কর্মরত । বর্তমানে তিনি পুনরায় সাহিত্যর্চচার জগতে প্রবেশ করেছেন। তার বিভিন্ন লেখালিখির মধ্যে উল্লেখযোগ্য রচনা “অনন্ত বিকেলের রূপকথারা” , “বৈশালী_পাড়ার_প্রতিমা রা”,  “অতঃপর অশুচি বনেদিয়ানা, পুজোর বনসাই এবং .....” ,  "কান্না রাগের 'হোমা পাখি'"  , “ডরাইয়া মরে”, “রূপান্তরের পথে”, “প্রবাসের বিভীষিকা”, “বইমেলা ও একটি গোলাপ”, “পুরোনো মর্গটার কাছে”, এবং “পিশাচসিদ্ধ”, যা একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত এবং ইতিমধ্যেই ইউ টিউবে অডিও স্টোরি হিসেবে সাড়া ফেলে দিয়েছে। এছাড়া ভ্রমণকাহিনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য  “পরবাসী টুসুর দেশে”||
তার লিখিত কবিতাগুলির মধ্যে “একটি ব্যর্থ প্রেমের ক্ষুব্ধ আখ্যান”, “উদ্বর্তিনী”,   “প্রাণের পুজো”, “কালো মেয়ের উপাখ্যান”,  “বাংলা ভাষার দেশ”, “অন্য বসন্ত”, “ ভালোবাসা ও একটি বসন্ত”, “ মন- শরীরী”,  “হে নজরুল”  ,  “সমর শেষের অসিয়ৎনামা”  উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয়||
এই স্বল্প কালেই বহু সংস্থা থেকে তিনি সেরার সেরা সম্মানে ভূষিত | এর মধ্যে “অচেনা পর্বত” সম্মান, রাজার কবিতা studio কর্তৃক প্রদত্ত “অয়ন সৃজন সম্মান” প্রণিধানযোগ্য|

প্রবন্ধ * সিদ্ধার্থ সিংহ

 




কৃষ্ণকীর্তনে নতুন সংযোজন-- রাধাদাস


সিদ্ধার্থ সিংহ

'রাউলে পেপারস' প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ল কবি রাউলের খ্যাতি। কিন্তু রাউলে কে?
প্রশ্ন শুনে মুখ খুলল এক ছোট্ট বালক। সে বলল, 'রাউলে ছিলেন মধ্যযুগের এক ধর্মযাজক। তিনি প্রচুর কবিতা, গল্প, গদ্য লিখেছিলেন। কিন্তু কখনওই তা লোকচক্ষুর সামনে আনেননি। পুরোনো গির্জার একটা সিন্দুকে সেগুলো তিনি রেখে দিয়েছিলেন। সেগুলোই উদ্ধার করেছে সে। আরও প্রচুর লেখা আছে।'
এই সব কথা যে বলেছিল, নিদারুণ দারিদ্র্যতার সঙ্গে যুজে উঠতে না পেরে মাত্র আঠারো বছর বয়সেই সে আত্মহত্যা করে।
আবিষ্কারক মারা যেতে পারে, কিন্তু আবিষ্কার? সেগুলো তো আর উবে যেতে পারে না! সে তো বলেছিল, আরও লেখা আছে। তা হলে সেগুলো কোথায়?
সন্ধান করতে গিয়ে চমকে উঠলেন সবাই। ফাঁস হয়ে গেল প্রকৃত রহস্য। আসলে রাউলে নামে কেউ কোনও দিন কখনও কোথাও ছিল না। ওই বালক পুরোনো কয়েকটা পুঁথির খোঁজ পেয়েছিল ঠিকই, তবে সেগুলো এগুলো নয়। কিন্তু সেগুলো পড়েই সে এতটা মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে, সে পৌঁছে যায় সেই পুরোনো পৃথিবীতে। যে সময়ে লেখা হয়েছিল ওই কবিতাগুলো। অবসর সময়ে সে ওগুলো পড়ত। দেখে দেখে টুকত। নকল করতে করতে শুধু প্রাচীন ভাষা বা ছন্দই নয়, নিখুঁত ভাবে আয়ত্ব করে ফেলেছিল পুঁথির সেই অবিকল হস্তাক্ষরও। এক সময় তার প্রভাবে সে নিজেই লিখতে শুরু করে এক-একটা কবিতা। কিন্তু তার মতো এক হতভাগা দরিদ্র বালক কবিতা লিখছে শুনলে কেউ কি সেই কবিতা পড়বে? তাই সে তুলে ধরেছিল মন গড়া এক রাউলের অস্তিত্ব।
পাঠকের কাছে পৌঁছল নতুন তথ্য। বিস্মিত হলেন পণ্ডিত মহল। তাই পরবর্তিকালে আর রাউলে নয়, 'রাউলে পেপারস' গ্রন্থটির জন্য কবি হিসেবে স্বীকৃতি পায় স্বল্পায়ুর সেই বালক--- টমাস চ্যাটারটন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কিডস তাঁকে উৎসর্গ করেন তাঁর 'এনডিমিয়ন' কাব্যগ্রন্থ। শেলি উৎসর্গ করেন তাঁর বিখ্যাত বই--- অ্যাডোনেইস।

না, এ রকম কোনও ঘটনা নয়। পুরুলিয়ার যুধিষ্টির মাজীর বড় ছেলে শিবপ্রসাদ গত ১৯৯৮ সালের ২১ জুন মারা যাওয়ার অনেক আগেই সত্যি সত্যিই উদ্ধার করেছিলেন একটি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি।
ষোড়শ শতাব্দীতে লেখা এক অজানা কবির অজানা কাব্য। কবির নাম--- রাধাদাস। না, রাধা দাস নয়, কারণ তখনও নামের শেষাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পদবির সৃষ্টি হয়নি। তাঁর গীতিকাব্যের নাম--- কৃষ্ণলীলামৃত গীত। যে বইটির কথা বৈষ্ণব সাহিত্য রসিকদের কাছে এত দিন অজানাই ছিল।
না, ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর 'বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত' বইটিতে যে রাধানাথ দাসের কথা উল্লেখ করেছেন, ইনি তিনি নন। উনি ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি এবং অতি দুর্বল পদকর্তা। তাঁর সঙ্গে এঁর কোনও সম্পর্ক নেই।
এই পাণ্ডুলিপি পাওয়ার পরে বোঝা যায় যে, এই রাধাদাসই বাংলা সাহিত্যে চতুর্দশপদী কবিতার জনক। যদিও তাঁর কাব্যে দশ/বারো লাইনের কিছু কিছু কবিতা আছে। জানি না, কপি করতে গিয়ে লিপিকারের অসচেতনতায় কলমের ফাঁক দিয়ে এ সব কবিতার দু'চারটে শব্দ বাদ পড়ে গেছে কি না! কারণ, যে পাণ্ডুলিপি থেকে কবি রাধাদাসের কাব্যটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটা কিন্তু কবির নিজের হস্তাক্ষরে লেখা মূল পাণ্ডুলিপি নয়। শ্রী টীকারাম সরাক নামে এক লিপিকার মূল পাণ্ডুলিপি থেকে বা অন্য কারও হস্তাক্ষরে লেখা কোনও প্রতিলিপি থেকে টুকে নিয়েছিলেন। পাণ্ডুলিপির নীচে তারিখ লেখা আছে--- ১৯ আষাঢ়, ১১৯৬ সন।
তাঁর লেখাতে বানানোর প্রচুর গন্ডগোল দেখা গেছে।  'র'-এ দীর্ঘ 'উ' ছাড়া আর অন্য কোনও অক্ষরে দীর্ঘ উ চোখে পড়েনি। 'স'-এর ব্যবহার খুব বেশি। 'শ' স্থান পেয়েছে যেখানে সেখানে। আবার 'ষ'-র চেহারা কোথাও নেই। 'শিশু' শব্দটি কোথাও 'সিসু', কোথাও 'শিশূ', তো কোথাও আবার 'শিসু'। 'ছাওয়াল' শব্দটি 'ছায়াল', 'ছায়বাল', 'ছাআল', 'ছাঅবাল' লেখা হয়েছে। দির্ঘ 'ঈ'-র ব্যবহার খুবই সামান্য। 'গোপি' এবং 'গোপী' দু'ভাবেই বানানটি লেখা হয়েছে। কবি নিশ্চয়ই এই ভুল করেননি।
এ তো গেল বানানের গন্ডগোল। এ ছাড়াও গীতি কবিতার ক্রমিক সংখ্যাতেও ভুল রয়েছে। কিছু কবিতার লাইন অন্য কবিতার মধ্যে ঢুকে গেছে। কয়েকটি কবিতার কিছু কিছু লাইন বাদ পড়ে গেছে। ফলে লিপিকার টিকারাম সরাক এই পাণ্ডুলিপিটি কপি করার সময় কতটা মনোযোগী বা যত্নবান ছিলেন তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় আছে।
সে যাই হোক, ড. ক্ষুদিরাম দাস এই পাণ্ডুলিপিটিকে অতি মূল্যবান বলে জানালেও পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি কিন্তু এই কাব্যটিকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার ন্যূনতম আগ্রহও দেখায়নি। ফলে যুধিষ্টির মাজী নিজেই উদ্যোগ নিয়ে বইটা ঠিকঠাক মতো সাজিয়ে, সম্পাদনা করে শেষ পর্যন্ত অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে, অধ্যাপক ড. দিলীপকুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় যে 'রাধাদাস প্রণীত কৃষ্ণলীলামৃত গীত' প্রকাশ করেছেন, তার জন্য তাঁর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।
এতে ১৩০টি গীতি কবিতার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম থেকে মথুরা যাওয়ার সময় পর্যন্ত কৃষ্ণলীলাকে তুলে ধরা হয়েছে। মূলত জয়দেবের গীতগোবিন্দম্ ও‌ ভগবতের কাহিনি নিয়েই এই কাব্য গড়ে উঠেছে। কবি এগুলোকে বলেছেন, সদা গেয়ং। অর্থাৎ এই কবিতাগুলো গানের জন্যই লেখা হয়েছে এবং কোন কবিতা কোন রাগে গাইতে হবে, প্রতিটি কবিতার শুরুতেই তা উল্লেখ করে দিয়েছেন। তার মধ্যে যেমন আছে শ্রী, কামোদ, করুণাশ্রী, মঙ্গল আসোআরি, মঙ্গল ধানসি, মল্লার, ইমন কল্যাণ। তেমনই আছে বেলেআরি, ভাটিআলি, ভাটালি, গাড়া, পাঠমঞ্জরি, বড়ারি, বিহাগাড়া জাতীয় ভারতীয় রাগ-রাগিণীর উল্লেখ। এর পাশাপাশি আছে 'তা তা থোই থোই বলয়ে মাত্র নাচিতে টুলিআ পড়ে'-র মতো নাচের নিখুঁত বর্ণনা। যা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত ও নৃত্যের সঙ্গে তাঁর গভীর পরিচয় ছিল। যার জন্য যে রাগের যে শৈলী, তার সঙ্গে মানানসই শব্দ জোগান দিতে গিয়ে তিনি যেমন বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার আঞ্চলিক বহু শব্দ ব্যবহার করেছেন, তেমনই করেছেন প্রাচীন বাংলা শব্দ, সংস্কৃত শব্দ এবং ব্রজবুলি শব্দও। যা মধ্যযুগের কোনও বৈষ্ণব সাহিত্যে সচরাচর পাওয়া যায় না। যেমন তুড়ি রাগে গাওয়ার জন্য তিনি লিখেছেন---
তারি অতি চঞ্চল জমুনা পাথার।
রভস পাতিঞা রঙ্গ দেখত কাণ্ডার।।
বিনতি তুমারে স্যাম নিবেদি চরণে।
ধরম দেখিঞা পার কর গোপি গণে।
অবলা গোপের নারী তুমি সে সুজন।
এ কালা জমুনার জলে হারাবে পরাণ।।
তিরি বধ পাতক ঘুচাহ কর পার।
জনমে জনমে জস ঘুসিব সংসার।।
কাতর গোপীর বোল সুনি কাহ্নু হাসে।
উপাএ করিল পার কহে রাধাদাসে।।

আবার সুহই সিন্ধুড়া রাগে গাওয়ার জন্য লিখেছেন---
ধনি হরিনি শ্যাম সোহাগিনি
পুলকি হঞাছে তনু।
দুখিনি দেখিঞা সদয় হইঞা
কহ কোথা গেল কাহ্নু।।
মন হরিল নাগর কালা।
অন্তর বাহির নাহিখ বিচার বিহরে কাহ্নর লিলা (ধ্রু)
হইঞা পুতনা বধে‌ এক জনা
সকট ভাঙ্গএ পায়।
এক তৃনাবর্ত্ত এক নন্দসূত
গলা চাপি মারে তায়।।
কেহো‌ সিসু হঞা হামাগুড়ি দিঞা
ভাণ্ড ভাঙ্গে নুনি খায়।
জামল য়র্জ্জুনে ভাঙ্গিএ বন্ধনে
ঠেকি উদুখল পায়।।
পসু পাখি সনে বিহরে বিপিনে,
কহো না কানুর বেশে।
কহে রাধাদাসে বিবিধ বিলাসে
খুজি বুলে বনদেশে।।

যদিও কাব্যের কোথাও তিনি তাঁর রচনাকাল লিখে যাননি। তবু তিনি যে ষোড়শ শতাব্দীরই কবি, তাঁর লেখাগুলো বিশ্লেষণ করলেই সহজে বোঝা যায়। যেমন, (১) বড়াই চরিত্রের সার্থক রূপায়ন। (২) ললিতা, বিশাখা-সহ রাধার অষ্টসখী, আয়ান ঘোষ ও রাধার শাশুড়ি-ননদের অনুপস্থিতি। (৩) রাধা চরিত্রের মধ্যে পূর্বরাগ ও ভাব সম্মিলনের অভাব। (৪) রাধা চরিত্রের মধ্যে তার বংশ পরিচয় ও তার স্বকীয়তার অভাব। এমনকী, রাধা নামের বদলে তাকে বারবার গোপী, গোপিনী, গোপনারী, গোপবালা, ব্রজবধূ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এতগুলো কবিতার মধ্যে কেবল ৬/৭টিতে রাধা আর শুধুমাত্র দু'জায়গায় রাই শব্দের উল্লেখ আছে। (৫) রাধার প্রেমকে পুরোপুরি পরকিয়া প্রেমে রূপান্তরিত করা ও তাকে সবলা নায়িকা রূপে তুলে ধরা। (৬) সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে যেটাকে আমরা দুর্গাপুজো বলা শুরু করি, পঞ্চদশ ও ষোড়শ‌ শতাব্দীতে কিন্তু সেটাকেই অম্বিকা পুজো বলা হতো। এই কবির বিভিন্ন লেখায় ধর্মীয় লোক উৎসব হিসেবে আমরা কিন্তু বারবার অম্বিকা পুজোর বিবরণই পাই। (৭) বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের ছন্দ, রীতি এবং নাটকীয় সংলাপের প্রভাব এবং তার অবৈষ্ণব সুলভ মানবতাবাদী জীবন দর্শনের প্রভাব। (৮) লেখা শুরু করার আগে চৈতন্য ও নিত্যানন্দের যুগ্ম বন্দনা ষোড়শ‌ শতাব্দীর রীতি। সেই রীতি এই কবির কাব্যেও আছে। (৯) তখনকার রীতি অনুযায়ী চৈতন্যচরিতামৃত বা কৃষ্ণকেলিচরিতামৃত-র মতো এই কবির কাব্যগ্রন্থের নামও--- কৃষ্ণলীলামৃত। (১০) বৈষ্ণব ভাবধারা ও দার্শনিক চিন্তার প্রভাব। (১১) ষোড়শ শতাব্দীর জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল (১৫৬০) কিংবা লোচন দাসের চৈতন্যমঙ্গল কাব্যে যেমন রাগ-রাগিণীর প্রবল প্রভাব দেখা যায়, তেমনই এই কবির কবিতাতেও নানান ঘরানার মার্গ সঙ্গীতের আনাগোনা লক্ষ করা যায়।
এই সব বিচার বিশ্লেষণ করলে অনুমান করা যায়, রাধাদাসের কাব্যগ্রন্থটি ষোড়শ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে রচিত। প্রশ্ন উঠতে পারে, দ্বিতীয় ভাগে লেখা হলে তার প্রায় একশো বছর আগের, পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের কবি বড়ু চণ্ডীদাসের এত প্রভাব তাঁর উপরে পড়ল কী ভাবে? সম্ভবত, সে সময়েও বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনই মানুষের মন জুড়ে ছিল। হয়তো স্বয়ং শ্রীচৈতন্যদেবও ওই কাব্যই পড়তেন। তাই এই কবি তার প্রভাব এড়াতে পারেননি। ফলে এত মিল।
বড়ু চণ্ডীদাসের রাধা প্রথম দর্শনেই কৃষ্ণের সঙ্গে ঝগড়া করেছে। পরে কৃষ্ণ ছলে বলে রাধার শরীর ভোগ করেছে। রাধাদাসের কাব্যেও তাই। যদিও রাধাদাসের প্রেম বাস্তব সম্মত। এতে দার্শনিক ভাবনার কোনও অবকাশ নেই। তাঁর মতে, দেহ ছাড়া প্রেম হয় না। কারণ, দৈহিক সৌন্দর্যই নরনারীকে মুগ্ধ করে। প্রেমের পথে নিয়ে যায়। তাই প্রথম দর্শনেই কৃষ্ণের নারীলোভী চরিত্রটা দেখে রাধা বিরক্ত হয়েছিল। পরে আরও বিরক্ত হয়েছিল যখন সে দেখেছিল, কৃষ্ণ গাছের আড়াল থেকে ব্রজবধূদের নগ্ন হয়ে স্নান করা দেখছে। রাধা তার উপরে প্রচণ্ড ক্ষেপে আছে বুঝতে পেরেও, আজকালকার রাস্তার বখাটে ছেলেদের মতো কৃষ্ণ কিন্তু ব্রজবধূদের পিছু ছাড়েনি। নানা অছিলায় তাদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছে। পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। আঁচল ধরে টানাটানি করেছে। যাকে বলা যায় রীতিমত ইভটিজিং। এখনকার দিনে হলে পাড়ার ছেলেরাই পেঁদিয়ে তাকে এলাকা ছাড়া করত কিংবা বহু আগেই লক-আপে ঢুকিয়ে দিত।
বহু বয়স্ক মানুষ আছেন, যাঁরা বৃষ্টির দিনে ছাতা নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন, কখন কোন মহিলা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য তাঁর ছাতার তলায় এসে আশ্রয় নেবে। সে রকম কৃষ্ণও যমুনার তীরে নৌকো নিয়ে বসে থাকত। যাতে কখন নৌকো আসবে তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে ব্রজবধূরা অধৈর্য হয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর নৌকায় উঠতে বাধ্য হয়। উঠতও কখনও-সখনও। আর এ ভাবেই মাঝে মাঝে সেই নৌকোয় ওঠার ফলে ধীরে ধীরে কৃষ্ণের সঙ্গে রাধার প্রেম হয়ে যায়। শুধু রাধাই নয়, পরকিয়া প্রেমে ডুবে যায় সমস্ত ব্রজবধূই।
মেয়েরা যখন প্রেমে পড়ে, তখন সব উজাড় করে বিলিয়ে দিতে থাকে। এত দিন রাধার পিছনে ঘুরঘুর করত কৃষ্ণ, এ বার রাধাই কৃষ্ণ কৃষ্ণ করতে লাগল। ঘরে তার মন টেকে না। কোনও কাজে মন বসে না। কৃষ্ণের বাঁশি বাজলেই রাধা তার স্বামীকে ঘুম পাড়িয়ে অভিসারে বের হয়। গুরু গরবিত লাজ, কুল, মান, মর্যাদা সব কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে সে কৃষ্ণের সঙ্গে মিলিত হয়। প্রতি অঙ্গের সঙ্গে প্রতি অঙ্গের মিলন।
বড়ু চণ্ডীদাসের মতো অতটা খোলাখুলি রগরগে বর্ণনা না দিলেও রাধাদাসও কিন্তু কোনও অংশে কম যাননি। যৌন বিজ্ঞান মেনেই বাস্তব দেহ মিলনেরই বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। রাধাকে জড়িয়ে ধরে কৃষ্ণ তার গলায় চুমু খাচ্ছে। বুকের কাপড় সরিয়ে স্তন যুগল উন্মুক্ত করছে। কাম ভাবাবেগে তার স্তনবৃন্ত শক্ত। পরনের কাপড়, মাথার চুল সব এলোমেলো‌। শরীরের সঙ্গে শরীরের ঘষায় দু'জনেই তৃপ্ত। রাধাদাস এখানে বর্ণনা করেছেন---
চারু রম্ভন গণ্ড চুম্বন,
উরজ খণ্ডন ভাতিআ।
বন্ধ বেণীর মুক্ত অঞ্চল,
মনেত ডর ছাড়িঞা।।
তুষি রতিপতি সঙ্গে রসবতী
বৃন্ত নীরস বঞ্ছিঞা।
বেশর ভূষণ কেশ বিগলিত
অঙ্গ অঙ্গ বিভাতিআ।

এ সব কবিতা একটু নাড়াচাড়া করলেই পরিষ্কার হয়ে যায় প্রেম, মিলন ও বিরহের ক্ষেত্রে কবি রাধাদাস কোনও অবাস্তব দার্শনিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত হননি। কৃষ্ণকে তিনি অবতার বলে স্বীকার করেছেন। তাঁকে দিয়ে অলৌকিক কাজকর্ম করিয়েছেন। কিন্তু রাধা তাঁর কলমে শুধুই এক মানবী। আমার মনে হয়, কবির নাম যেহেতু রাধা এবং তিনি নিজেও যেহেতু কৃষ্ণভক্ত, তাই ওই রাধার সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেখার একটা সূক্ষ্ম ইচ্ছে হয়তো কবির মধ্যে খুব সুপ্ত হলেও, অবচেতন মনে ছিল। তাই রাধাকে দিয়ে তিনি কোনও অসম্ভব কাজ বা দেবীসুলভ আচরণ করাননি। রাধা যেন গোকুলের একজন অতি সাধারণ ব্রজবধূ, যে প্রতিদিন মথুরার হাটে যায়। দই বিক্রি করে সংসার চালায়।
মধ্যযুগের কাব্যে নিখুঁত ট্র্যাজেডির কোনও স্থান ছিল না। অধিকাংশ বৈষ্ণব কাব্যেই রাধার ভাব কাব্যের ট্র্যাজিক ধর্মকে নষ্ট করেছে। অনেক কাব্যের কাহিনিকে আবার কংস বধ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার ফলে ট্র্যাজিকের রস জমতে পারেনি। রাধাদাসের কাব্যটি মধ্যযুগের বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রথম এবং শেষ বিয়োগান্ত কাব্য।
আগে যে কোনও কাব্যই লেখা হতো কাহিনি নির্ভর করে। বেশির ভাগই দেবদেবীকে ঘিরে। তাদের গুণকীর্তি বর্ণনা করাই ছিল কাব্যের মূল ধর্ম। আর সেই কীর্তি-কাহিনি যখন সুরের মধ্যে দিয়ে গাওয়া হতো, তাকে বলা হতো গুণকীর্তন। ধীরে ধীরে 'গুণ' বাদ দিয়ে যা পরে হয়ে যায় শুধুই--- কীর্তন।
কীর্তন দু'রকমের--- (১) নামকীর্তন। যা নগর সংকীর্তনেই মূলত শোনা যায়। আর (২) পালা কীর্তন। বৈষ্ণব মহাজনদের লেখা নানা পদে সুরারোপিত সংগীত। এটারও আবার দুটো ভাগ আছে। একটা চৈতন্য পূর্ব। অন্যটা চৈতন্য উত্তর। আগে বিষ্ণু ও লক্ষ্মীকে নিয়ে পদ রচনা হতো। পরে সেই জায়গায় আসে রাধা ও কৃষ্ণ। কিন্তু চৈতন্য আসার পরে বলা হয়, চৈতন্য হল যুগল অবতার মূর্তি। তিনি খানিকটা মেয়ে মেয়ে দেখতে ছিলেন বলে বৈষ্ণবেরা বলতেন, তিনি বহিরঙ্গে রাধা আর অন্তরঙ্গে কৃষ্ণ।
পরে, এই বৈষ্ণবেরাই খোল-করতাল নিয়ে নেমে পড়ে কীর্তনের পুরো বাজারটি দখল করে নেন। যদিও তখনও তাঁরা জানতেন না, শুধু সুগার রোগী নয়, যে কোনও মানুষের পক্ষেই সকালে হাঁটা শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ভাল এবং গানে মত্ত হয়ে দু'হাত তুলে ধেই ধেই করে নাচাটাও সাঁতার কাটা বা সাইকেলিং করার চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর। শরীর চর্চার এমন আদর্শ ব্যায়াম পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।
প্রায় পাঁচশো বছর ধরে বৈষ্ণব সাহিত্য নানা ভাবে, নানা রূপে, নানা রসে প্রবাহিত হয়ে সাহিত্য-শিল্প-সংগীত রসিকদের তৃপ্ত করেছে। কে নেই সেই তালিকায়? কবি জয়দেব, কবি বিদ্যাপতি, গৌরচন্দ্রিকা, বৃন্দাবন থেকে শুরু করে বড়ু চণ্ডীদাস, চণ্ডীদাস, কে নেই?
কিন্তু যাঁর নাম এত দিন জানা যায়নি, শোনা যায়নি, সেই কৃষ্ণলীলামৃত গীত-এর পাণ্ডুলিপি উদ্ধারের পরে এ বার নিশ্চয়ই ওই নামগুলোর পাশে আরও একটি নাম অত্যন্ত সম্ভ্রমের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। আর সেই নামটি হল--- রাধা দাস। না না থুড়ি, রাধাদাস।


*****************************************************************************************************************

সিদ্ধার্থ সিংহ 


সিদ্ধার্থ সিংহ আশির দশকের সব্যসাচী লেখক। জন্ম কলকাতায়। ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ই তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয় 'দেশ' পত্রিকায়। বড়দের এবং ছোটদের জন্য লেখেন কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, মুক্তগদ্য, সম্পাদকীয় এবং প্রচ্ছদ কাহিনি। তাঁর লেখা পাঠ্য হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদে। আইসিএসসি এবং সিবিএসসি বোর্ডের প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। বানিয়েছেন দু'টি তথ্যচিত্র। লিখেছেন বেশ কয়েকটি ছায়াছবির চিত্রনাট্য। তাঁর গল্প নিয়েও সিনেমা হয়েছে। এক সময় আনন্দবাজার সংস্থায় সাংবাদিকতা ছাড়াও নিয়মিত মডেলিংয়ের কাজও করেছেন। ছড়া, কবিতা, অণুগল্প, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, শিশুতোষ, প্রচ্ছদকাহিনি, সম্পাদকীয়, অ্যাঙ্কার স্টোরি এবং বিষয়ভিত্তিক মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে তিনশো সাতান্নটি বই। বিভিন্ন ভাষা থেকে অনুবাদও করেছেন। প্রবর্তন করেছেন 'রতিছন্দ', 'রিয়্যালিটি উপন্যাস' এবং 'ঝলক-গল্প'র। এই কথাসাহিত্যিক একক ছাড়াও, যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেছেন লীলা মজুমদার, রমাপদ চৌধুরী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, মহাশ্বেতা দেবী, শংকর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, নবনীতা দেবসেন, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ কুমার চক্রবর্তী, শুভঙ্কর সিংহের সঙ্গে এক হাজার সাতটি সংকলন। ২০১২ সালে 'বঙ্গ শিরোমণি' এবং ২০২০ সালে 'সাহিত্য সম্রাট' সম্মানে ভূষিত হন। পেয়েছেন অজস্র পুরস্কার।



সম্পাদকীয়




স্বরবর্ণ

সৃজনের মৌলিক স্বর

স্বরবর্ণ / ২৩ * পঞ্চম বর্ষ * প্রথম সংখ্যা

১৫ এপ্রিল, ২০২৫ * ১ বৈশাখ ১৪৩২


****************************************

পাঁচ বৎসর আগে যে-সম্পাদকীয় লেখাটি দিয়ে স্বরবর্ণের যাত্রা শুরু হয়েছিল, বর্তমান সংখ্যায়, (পাঁচ বৎসরের সূচনালগ্নে) সেটিই রেখে দেওয়া হল। সম্পাদকীয় বক্তব্য পাঁচ বছর পরেও মনে হয় সমান প্রাসঙ্গিক।

****************************************


সম্পাদকীয়

‘বিস্ময়ই দর্শনের জনক’ প্লেটো বলেছিলেন। আজ নয় । যিশু খ্রিষ্টের জন্মেরও চারশো  বছর আগে । তারপর পৃথিবী কত পথ পেরিয়ে এল। " হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে " । বিরামহীন । বিশ্রামহীন । কিন্তু , কথাটা  আজও সমান সত্যি । যে কোনো সৃষ্টির পিছনে কাজ করে এই বিস্ময়বোধ । বিস্ময়বোধ থেকে আসে আবেগ, অনুভূতি । আবেগ ধরতে চায় ব্যাখ্যাতীতকে শিল্পীর তুলিতে, কবির কলমে । কবিতা কী সংজ্ঞা দিতে গিয়ে পরবর্তীকালে ওয়ার্ডসওয়ার্থও  বলবেন, "Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings : it takes its origin from emotion recollected in tranquility." কিন্তু সেই tranquility  বা মনের প্রশান্তির স্থিতাবস্থা আসবে কেমন করে, বিস্ময়বোধই যদি কাজ না করে ।


       এই যে চিরপরিচিত পৃথিবী, যেখানে আমি রয়েছি, হাসছি, খেলছি , মুহূর্তকাল পরেই হয়ত আর আমার এখানে থাকা চলবে না " কখন যে গাঙচিল ছিড়ে ফেলে শালিকের প্রাণ "। প্রশ্ন এই, তাহলে কোথায় ছিলাম আমি, এই জন্মের আগে ? থাকব কোথায় এই জন্মের পরে ? থাকব না যে , সে তো ধ্রুব সত্য । কিন্তু সত্য এ-ও, আমি না থাকি, আমার সৃষ্টিরা থাকবে এই ধুলায়, মৃত্তিকায়, " যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে " । এমন স্থির বিশ্বাসে, বিস্ময়বোধকে অন্য মাত্রায়  উস্কে দিয়ে সুধীন্দ্রনাথও  বলেন " রূপ যে অশেষ ! হেথাকার ফুল এমনি ফুটিয়া রবে  / আমাদের মত কত বিহঙ্গ কত বিচিত্র ক্ষণ পতঙ্গ / লভি তার সেই রূপের সঙ্গ / বসন্ত উৎসবে লইবে বিদায় / ধরণীর ফুল এমনি ফুটিয়া রবে । "


       সৃষ্টির এমনই অমলিন ফুল তুলতে চায় স্বরবর্ণ। চর্বিতচর্বণ নয় । এঁটোকাটা নয় । সৃষ্টির অবিনশ্বর ফুল তোলার সেই অভিপ্রায়ে তার যাত্রা । কয়েকটি নির্দিষ্ট পথে । গল্প-কবিতা- প্রবন্ধের চেনা পথ তো রয়েইছে । সেই সঙ্গে রয়েছে অন্তত দু'টি নতুন বিভাগ । চেনা ছকের বাইরে । একটি "কবিতা উপন্যাস " যেখানে কবিতা ও উপন্যাসের মূল স্বর মিলেমিশে পৌঁছতে চাইছে অন্য এক উচ্চতায়, ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন আঙ্গিকে। আরেকটি বিভাগ " তোমায় খুঁজে ফিরি " যেখানে আমরা খুঁজবো জীবন-মৃত্যুর অমীমাংসিত জিজ্ঞাসা । যদিও দুইয়েরই লক্ষ্য শিল্পের মধ্য দিয়ে স্বরবর্ণে পৌঁছনো।


      এবার একটু চোখ ফেরাই চলমান সময় স্রোতে। সময়ের মতো উচিত শিক্ষক আর নেই, বলাইবাহুল্য । কখনো পার্থিব কোনো ঘটনার অভিঘাতে, সে আমাদের দুটো চোখের বদলে হাজারটা চোখ খুলে দেয়। কখনো হাজারটা দূরে থাক, ঈশ্বরদত্ত দুটো  চোখকেই একেবারে দৃষ্টিহীন করে রাখে । যেমন রাখছে নির্বাচনের মুহূর্তে । দল বদল, ভোল বদলের সময় । অবশ্য শুধু নির্বাচনই  বা কেন, ব্যক্তিজীবনে কি সমাজজীবনে, অনেক সময়েই  আমরা দৃষ্টিহীন হয়ে যাই, অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র সাজি, চোখের সামনে ন্যায়-নীতি -মূল্যবোধ বিসর্জিত হতে দেখলেও। আবার হাজারটা চোখ খুলে দেয় কোনো কোনো ঘটনা । যেমন দিল বিভীষিকাময় মহামারী কোভিড নাইনটিন । এই অভূতপূর্ব প্যান্ডেমিক  ভিতরে-বাইরে সহস্র চোখ খুলে দিল আমাদের। কী দেখলাম আমরা ? দেখলাম মৃত্যু মিছিল সমস্ত পৃথিবী জুড়ে । দেখলাম  লকডাউন সোশ্যাল ডিসটেন্স মাস্ক স্যানিটাইজ অর্ধাহার অনাহার পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু ইত্যাকার  অসহনীয় ঘটনাবলী । সাক্ষী হয়ে রইলাম এক ভয়াবহ দুঃসময়ের, যেরকম দুঃসময় এর আগে,  জ্ঞানত আমরা কোনদিন দেখিনি ।


        তবু আমরা বিশ্বাস রাখি, এই দুঃসময় কেটে যাবে, পৃথিবী আবার শান্ত হবে । সেই আশা নিয়ে আমরা দাঁড়াব মানুষের পাশে। মিথ্যা বুলিতে নয় । শিল্প-সাহিত্যের অমোঘ শুশ্রূষা নিয়ে । কেননা আমরা বিশ্বাস করি " Pen is mighter than the sword  " যা আমরা দেখেছি ফরাসি বিপ্লবে, রুশ বিপ্লবে  কি আমাদের দেশে রামমোহন- বিদ্যাসাগর - মধুসূদনে । কবির সুরে সুর মিলিয়ে আমরা বলব, " এ কোন অন্ত্যেষ্টি যার লক্ষ বছর পরেও / আমাদের কোন ইতিহাস থাকবে না ! / আর বিবাহ একটা রাষ্ট্রের অরণ্যে স্বপ্ন দেখবে / নদী বেঁচে উঠছে ... তীরে তীরে ঢেউ লাগছে / শব্দ হচ্ছে...অবিরল শব্দে শব্দে লুন্ঠনের শস্য ভাসে... /  কতটা জরুরি তবে একটা হাত থেকে আর একটা হাতের দিকে যাওয়া " ( সব্যসাচী মজুমদার )। হীন রাজনীতি দলাদলির উর্দ্ধে, এই কঠিন সময়ে একটা হাত আর একটা হাতের দিকে এগিয়ে যাবে মমতায়, ভালোবাসায় এটাই কাম্য ।


       পরিশেষে কৃতজ্ঞতা জানাই সেই সব কবি-লেখকদের, যাঁরা তাঁদের মূল্যবান রচনা দিয়ে  সমৃদ্ধ করলেন বর্তমান সংখ্যাটিকে । আগামীতে যেমন তাঁদের প্রশ্রয় পাব, তেমনই , প্রিয় পাঠক, আমাদের পথ চলায় আপনাকেও সঙ্গে পাব, আশা ।




  ************************************************************************************************************                                                                       

স্বরবর্ণ * ২৩ / যাঁরা লিখলেন

 




স্বরবর্ণ * ২৩ / পঞ্চমবর্ষ * প্রথম সংখ্যা 

১৬ এপ্রিল ২০২৫ * ১ বৈশাখ ১৪৩২ 


প্রবন্ধ * সিদ্ধার্থ সিংহ * শাশ্বত বোস 

গুচ্ছ কবিতা * রতন পালিত * অর্ণব সামন্ত *  গৌতম রায় * বাবলু সরকার * গৌতম কুমার গুপ্ত * 

অনুবাদ কবিতা * জয়িতা ভট্টাচার্য

অণুগল্প * শতদল মিত্র 

কবিতা * 

পঙ্কজ মান্না * অমিত চক্রবর্তী * কৌশিক সেন * তুষার ভট্টাচার্য  * দেবার্ঘ সেন * জবা ভট্টাচার্য * বিশ্বজিৎ বাউনা * শম্পা সামন্ত * দেবাশিস * প্রবীর কোনার * নিমাই জানা * বনশ্রী রায় দাস * পার্থ প্রতিম গোস্বামী* সাধন চৌধুরী * বিকাশ চন্দ * হামিদুল ইসলাম  মুক্তারা রাফিয়া * আজিজ উন নেসা  নীলাঞ্জনা ভট্টাচার্য্য * চন্দ্রাণী গোস্বামী * আবদুস সালাম * তাপস কুমার দে * মধুপর্ণা বসু * শ্রীদাম কুমার * তীর্থঙ্কর সুমিত * গোবিন্দ মোদক * জীবন সরখেল * সন্দীপ ঘোষ 

উপন্যাস (ধারাবাহিক) * কথা দিয়েছিলাম হেমন্তের নিয়রে * দীপংকর রায় 

উপন্যাস (ধারাবাহিক) * বামনের  চন্দ্রাভিযান * বিশ্বনাথ পাল 

উপন্যাস (ধারাবাহিক) * জীবন হাটের কড়চা * সুদীপ ঘোষাল

ধারাবাহিক রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনি  * প্রভাত ভট্টাচার্য

প্রসঙ্গঃ স্বরবর্ণ  

অলংকরণে ব্যবহৃত চিত্রাবলী * আন্তর্জাল 

এছাড়া নিয়মিত বিভাগ 


সম্পাদকমণ্ডলী      

ড . শুভঙ্কর দে          সৌম্যজিৎ দত্ত                     

ড . অলোক কোৱা     দেবাশিস সাহা


মঙ্গলবার, ২৫ মার্চ, ২০২৫

স্বরবর্ণ * ২৩ / পঞ্চমবর্ষ * যাঁরা লিখছেন




প্রবন্ধ * সিদ্ধার্থ সিংহ * শাশ্বত বোস 

গুচ্ছ কবিতা * রতন পালিত * অর্ণব সামন্ত *  গৌতম রায় * বাবলু সরকার * গৌতম কুমার গুপ্ত * 

অনুবাদ কবিতা * জয়িতা ভট্টাচার্য

অণুগল্প * শতদল মিত্র 

কবিতা * 

পঙ্কজ মান্না * অমিত চক্রবর্তী * কৌশিক সেন * তুষার ভট্টাচার্য  * দেবার্ঘ সেন * জবা ভট্টাচার্য * বিশ্বজিৎ বাউনা * শম্পা সামন্ত * দেবাশিস * প্রবীর কোনার * নিমাই জানা * বনশ্রী রায় দাস * পার্থ প্রতিম গোস্বামী* সাধন চৌধুরী * বিকাশ চন্দ * হামিদুল ইসলাম  মুক্তারা রাফিয়া * আজিজ উন নেসা  নীলাঞ্জনা ভট্টাচার্য্য * চন্দ্রাণী গোস্বামী * আবদুস সালাম * তাপস কুমার দে * মধুপর্ণা বসু * শ্রীদাম কুমার * তীর্থঙ্কর সুমিত * গোবিন্দ মোদক * জীবন সরখেল * সন্দীপ ঘোষ 

উপন্যাস (ধারাবাহিক) * কথা দিয়েছিলাম হেমন্তের নিয়রে * দীপংকর রায় 

উপন্যাস (ধারাবাহিক) * বামনের  চন্দ্রাভিযান * বিশ্বনাথ পাল 

উপন্যাস (ধারাবাহিক) * জীবন হাটের কড়চা * সুদীপ ঘোষাল

ধারাবাহিক রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনি  * প্রভাত ভট্টাচার্য

প্রসঙ্গঃ স্বরবর্ণ