সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬

গ্রন্থ আলোচনা * অমিতাভ সেন




'পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে'

অমিতাভ সেন 


মাখনরঙা প্রেক্ষিতে স্থানু পাখিশরীর ধারণ করে প্রাণপানে ধাবিত অজস্র পাখি। প্রশান্ত সরকারের প্রচ্ছদ ও অলংকরণের অশেষ উপাদানে উজ্জ্বল শাশ্বত বোস প্রণীত বাইশটি ছোট গল্পের সংকলন 'পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে'। 'লেখক পরিচিতি' পাঠকের সঙ্গে লেখকের অতি সহজেই সম্পর্কনির্মাণে সাহায্য করে। উৎসর্গপত্রে শাশ্বতর উচ্চারণ নাভিমূল নির্গত অতিসরল আশ্বাসবাণী। সারাংশে গ্রথিত লেখকের স্বগতোক্তি। সূচিপত্রের ক্রমিকধারা অনুসরণ করে সংকলনের আলোচনার যথাসাধ্য প্রয়াসে নিরত থেকে জানাই শাশ্বতগদ্য বাংলা সাহিত্যের গড়পড়তা নিটোল গপ্পোনিয়মের বাইরে স্থাপন করতে সুসক্ষম এক স্বতন্ত্র ও সবল কথাকাহিনী ধারা।

                                                           তিন পৃষ্ঠা বরাবর ('"বিপ্লব " একটি পাখির নাম') লেখক সর্বজ্ঞভূমিকাপালনে অবিরাম অবিচল থাকা সত্ত্বেও নামহীন 'ছেলেটার' স্থায়ী স্নায়ুলেখনির্মাণে অতিসমর্থ। 'জামবনি থেকে কলকাতায়' অনায়াসে যাত্রারত চেতননির্মাণের সংবেদী যান। আবহ সৃষ্টি হয়েছে অতিজরুরি ডিটেলে ("...সহস্রাধিক এঁটো বাসন আর মেগা সিরিয়ালের শব্দব্যঞ্জনা।") । বটগাছটার অজস্র চোখের 'অল্প আঁচে' ছেলেটার বুকে বাজে 'গোত্রহীন যান্ত্রিকতার উপনিষদ '। চরিত্র আকার পেল সংকেতধর্মী বিবরণে। 'কমরেড লাখাই' ছেলেটার আদর্শ হয়ে ওঠে। নৈর্ব্যক্তিকতা বজায় রাখার অসামান্য ক্ষমতা শাশ্বতগদ্যে প্রোজ্জ্বল। 'শত বৈবস্বত কাল' জুড়ে ঘটে যাওয়া সাম্যহীনতায় জীর্ণ আকাশের কাছে প্রশ্ন রাখে আখ্যানটি।

                                                                                                                                                                                                        মন্থর তালে হরেনবাবুর গপ্পো ('চলতি ভ্যালেন্টাইনের গপ্পো') শুরু হলেও পর্যবেক্ষকের সজাগ দৃষ্টি ও বোধ তাড়া করে পারিপার্শ্বিক স্থিতি ও অস্থিরতা। প্রজন্মগত বৈষম্য অতিস্পষ্ট সুচারু কৌতুকের অবলম্বনে। গপ্পোর মাত্রা বৈপ্লবিক স্তরে উন্নীত হয় স্ট্যালিন মুসোলিনির 'স্থিতি বিভ্রাটে'। নির্মম উদাসীন বাস্তবতা 'সন্ধ্যের নিমতলা ঘাটের অন্ধকার পিছন সিঁড়িটার মতো'। জীবনমধ্যাহ্নের যৌনতার স্বর মনস্তত্বের জটাজাল এড়িয়ে স্বচ্ছন্দ প্রকাশ পায় '... মানে ভ্যালেন স্টালিন' - এ।

                                                        অস্তিনাস্তির অগম পারে নিয়ে ফেলে 'আমিময়' চরিত্রটির 'সুন্দরবনের গহীন মানচিত্রে' ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা ('হিমজ্যোৎস্নায় বনবিবি')। ক্ষেত্র সমীক্ষার আদলে ঘটনার বিন্যাস সাবলীল অথচ গভীর। "মুঈন মণ্ডল" -- এর শ্রেণীপরিচয় ও ব্যবহারজাত বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ জগতের বেড়াজাল পার করে এগিয়ে নিয়ে যায় গ্রামীণ সংস্কৃতি ও সংস্কারের ভরকেন্দ্রে।

 "ভুলাকন্যা" প্রাগৈতিহাসিক সত্যবলিষ্ঠতার সামনে দাঁড় করায় সমকালকে ('নষ্টভূমি ও ঈশ্বরী বনজ্যোৎস্না')। জীবনের ছবির 'গন্ধটায় নেশা ধরে যায়' যেমন তেমনই রূপ পায় '... নৈসর্গিক অন্ধকারের প্রতি অমনোযোগী, সূর্যশোক'। ডগরের শরীর কখন যে ধরিত্রীর অংশ হয়ে ওঠে ঘন কথার বুননে টের পাওয়া কঠিন।

লক্ষ্মী রানী মাহাতর কাহিনিবয়নে ('বন্য রাতের ঘুমহীন চুপকথারা') ভৌগোলিক সংকীর্ণতা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে অনুভূতির গর্ভে তীব্র মোচড় সৃষ্টি করে। 'ময়ূরের পালক' নিয়ে চলে সম্ভবত প্রাকপুরাণের নিবিড় আয়োজনে। 'একই জঙ্গলের দুই প্রাক্তন প্রেমিকার মত বাঘিনী ও লক্ষ্মী চুপচাপ সরে যায়, ...' চিহ্নিত হয় কোনো নতুন দৃশ্য উন্মোচনের সম্ভাবনা।

                                                   'একটা ভীষণ টাটকা বডি' চেয়েছিল সমীরণ গোটা জীবন ধরে। মনের ভিতরে চলাফেরা করে চলে 'ধীর এক্সপ্রেশন' অথচ ছবি থেকে যায় অসম্পূর্ণ ('শূন্য দৃশ্যের ছবিওয়ালা')। সমীরণের শরীরে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সত্তার স্থিতাবস্থা সৃষ্টি করে গভীর জটিলতা। ক্ষত চিন্তার অক্ষত রূপ ধরা পড়ে অক্ষরে অক্ষরে।

 স্বগতোক্তির ধারায় বিস্তার লাভ করে না-কাহিনির যাত্রা পুরাণ হয়ে এসে থিতু হয় 'অমলের গায়ে'। নারীশরীরে আশ্রয়প্রার্থী স্বরটি বরাবরই মেনে চলে প্রাণের তাগিদে বেঁচে থাকার সংগ্রাম ('মনু পক্ষের এক "কৌরব"')। 'স্ববিবাদী দ্বিধা দ্বন্দ্বের সমীকরণ নিপুণ তুলিতে আঁকা হতে থাকে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে'।

'একা ঘুমহীন রাত জাগে শোভনা' -- খণ্ডিত বাক্যটির ওপর ভর করেছে অখণ্ড শূন্যতার ইতিবৃত্ত ('অদাহ')। বেওয়ারিশ লাশ পোড়ানোর ডোম, শোভনা একদা ছিল 'মাথায় আঁচল জড়ানো মলিন গৃহবধূ'। রাজনীতির শিকার শোভনা বাঁচে 'মৃত্যুর গন্ধটাকে বুকে করে'। শেষরক্ষা হয় নি তবু যতই 'ক্ষিপ্র, ভয়ংকর, চণ্ডালিনী' সে হয়ে উঠুক না কেন পরিস্থিতি অনুযায়ী। শাশ্বতগদ্যের সংবেদী দিক কেবল বর্ণনায় সীমিত নয়। প্রতিটি শব্দ অন্তর্ভেদী ব্যঞ্জনানির্মাণে ক্রিয়াশীল।

স্মৃতিবর্তিকায় আলোকিত মনের গোপন কন্দরে রচিত 'যৌথজীবনের গল্প '। ('ছাই রঙের মাটি') প্রতীকী প্রবাল ফের প্রশ্ন হানে 'বুলু নামটার সাথে কি ওই সুন্দর মুখটার আদৌ কোন সম্পর্ক আছে?' 'ইঁটভাটার ছবি' আছড়ে পড়ে 'চুর্ণী নদীর বাঁকে'।

'দেল সন্ন্যাসীর ব্রত পালন' পর্যবেক্ষণ গদ্যশরীরে যুক্ত করেছে বিশ্বাসজনিত আচারের অলংকার। হিন্দু-মুসলিম মিশেলে বাংলার সাংস্কৃতিক চালচিত্র কথাকাহিনির প্রধান উপজীব্য। ('খেজুর সন্ন্যাসী') 'গাজী পীর এই নয়ন পোঁতার দেবতা' -- বাক্যটি কাহিনির যাত্রাপথ নির্ধারণে সহায়তা করে।

মায়াময় আরম্ভের পর অপেক্ষা করে 'আত্মশ্লাঘার গুমনামী শর্বরী'। উত্তমপুরুষে গ্রন্থনা অগ্রসর হয়, স্মৃতিধারাপ্রসার লাভ করে ('অনন্ত বিকেলের রূপকথার') 'কিশোরী বেলার অভ্যাস' সমক্ষে আসে অনায়াসে। "ইন্দ্রাণী ঘোষ" বিশ্বাস করেন তাঁকে 'ছিঁড়ে উপড়ে ফেলা যাবে না'।

গল্পের ভিতরে গল্প যেন বিনি সুতোয় গ্রথিত। 'উদয়হাটি'র উজ্জ্বল উপস্থিতির পাশে কিছুমাত্র ম্লান নয় 'বিশ্ব মানচিত্রের এক আজব নকশা'। ভ্রমের অজস্র অনুষঙ্গ কাহিনির যাত্রাপথে বহুস্তরীয় মাত্রা সংযোজন করেছে। ('ডরাইয়া মরে') প্রতিটি ক্ষণস্থায়ী দৃশ্য ও ঘটনা চেনা পরিসর অতিক্রম করেছে সুনিপুণ গদ্যগুণে।

ব্যক্তি প্রীতম সহজেই এসে মেশে ফুড ব্লগার প্রীতমে। "আপনি কি কাউকে খুঁজছেন"? বিরামহীন লয়ে পৌঁছে দেয় প্রীতম-কুসুমের হৃদবাসরে। ('বই পাড়ার মাটন কারি') 'মাটন কারি' নিমিত্ত মাত্র ভূমিকায় সক্রিয় গোটা আখ্যান জুড়ে। সামাজিক পরিমণ্ডল এড়াতে চাইলেও উপেক্ষা করা যাবে না এমন গতিময় বিন্যাসের কৌশলে।

ভাবনা ও ভাষার নিবিড় দাম্পত্য অবস্থান সৃষ্টি করে অমোঘ উচ্চারণ। সুলগ্না-কৌশিক-নমিতা বিচরণ করে অবাধে নিজ নিজ আধার অবলম্বন করে। ('জতুর্থ কলম ও রুইতন রেজোন্যান্স') 'সেই রাতের পর থেকে ওপারের যতিহীন নিস্তব্ধতা ঢেকে ফেলেছিল কৌশিকের সব ঋতুর উৎসবময় জীবন'।

'কলিম শেখ' চরিত্রটির সামনে আসার প্রস্তাবনা নির্মাণে তন্নিষ্ঠ পাঠের প্রয়োজন রয়েছে। ('আফুটানির গপ্পো এবং সেই লোকটা') কাহিনির নির্দিষ্ট পথরেখা না ধরে দৃষ্টিপাত দাবি করে 'পাণ্ডুয়া ব্লকের পশ্চিমের গ্রামগুলো'। সংবাদদাতার নিয়মে প্রকাশ পায় 'কলিম শেখ' -- এর অস্তিত্বের মূলমন্ত্র। হয়তো মনে হতেই পারে 'সবটাই আফুটানির গপ্পো'।

'শেষবারের দেখা ট্রামটা' তাড়িয়ে নিয়ে ফেরে আখ্যানশরীরে। ভঙ্গুর নাগরিকতায় রিক্ত মৃদুলা আঁকড়ে ধরে ট্রামযাপন। যুগসঞ্চিত অবক্ষয় ধরা পড়ে নিত্যনৈমিত্তিক জীবনচর্যার ভাঁজ ভাঁজে। ('মিছিলের ঠিক পরের ট্রামটা') 'সটান উঠে বসে আধখোলা জামাটা গায়ে দিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা লাগায় সন্দীপ। মৃদুলা ওর দিকে চেয়ে থাকে শুধু'।


গ্রন্থনাম -- 'পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে'

লেখক -- শাশ্বত বোস

প্রকাশক -- রাজর্ষি ঘোষ, অনিমিখ পাবলিকেশনস্

প্রচ্ছদ ও অলংকরণ -- প্রশান্ত সরকার

মূল্য -- ৪০০ টাকা

যোগাযোগ: ৮৫৮৫০৬১২৬২ / ৯০০৭১৮২১০৬



########################################



                               অমিতাভ সেন


জন্ম: ৯ অক্টোবর ১৯৬৮।'রেখায় লেখায় : ইতি অমিতাভ সেন' (২০১৯), 'ছড়া জোড়া মন' (২০২০), 'চতুর্দশপদী অন্তরিন' (২০২১), 'চতুর্দশপদী ক্রমবর্ধমান' (২০২২), 'আজানে-আহ্নিকে' (২০২৩), 'ঝরে জল' (২০২৩), 'ফারাক' (২০২৪), 'বেইমান' (২০২৫) -- আটটি পদ্যগ্রন্থে অমিতাভ সেন নিয়ত ভ্রাম্যমাণ। 'বান্ধবনগর', 'কবিতা বুলেটিন', 'আবহমান বাংলা ওয়েব পত্র', 'চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম', 'কক্ষপথ', 'বল্মীক', 'এবং অধ্যায়', 'পুরোগামী সাহিত্য', 'এই সময়', 'রোববার.ইন' ইত্যাদিতে এযাবৎ অমিতাভর পদ্য আলোচিত ও প্রকাশিত। 'The Antonym - Global Literary Magazine' - এ প্রকাশিত ওঁর অনূদিত দুটি ছোটগল্প 'Raghunandan's Death Report' এবং 'The Hyena'। 'Chime of Time : Yearbook of Bengali Poetry in Translation', পঞ্চাশটি কবিতার সংকলনে সতেরোটি কবিতা বাংলা থেকে ইংরেজিতে অমিতাভর অনূদিত।


ধারাবাহিক রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনি * প্রভাত ভট্টাচার্য





প্রভাত ভট্টাচার্য 

পর্ব * 

রাজ্যাভিষেক 


পরদিন সকালে সাজো সাজো ভাব। সামনের খোলা জায়গাটায় একটা লাল ভেলভেটে মোড়া সিংহাসন এনে রাখল শার্দুল ,আর একজনের সাথে। সবাইকে ডাকা হল সেখানে । 

    সবারই মনে প্রশ্ন, কি ব্যাপার?কিসের এত আয়োজন  ? 

     সেইসময় বিতান এসে বলল, সবাই চুপ করুন এখন। রাজামশাই আসছেন। একটু পরেই অভিষেক হবে। 

     রাজামশাই  ! বলে উঠলো অর্জুন। 

   বিতান কড়া চোখে তাকালো তার দিকে। 

    এবারে দেখা গেল শার্দুল একটা ড্রাম বাজাতে বাজাতে আসছে। আর তার পরেই দেখা গেল অজয় আসছে রাজার বেশে, গায়ে ঝলমলে পোষাক, মাথায় মুকুট, কোমরে তরবারি। 

    সে গটগট করে এসে সেই সিংহাসনে বসল। মুখে স্মিত হাসি। 

    বিতান তার কপালে পরিয়ে দিল রাজটীকা। তারপরে সবাইকে বলল, বলো, রাজামশাইয়ের জয়। 

  সবাই তাই বলল। 

   হয়ে গেল রাজামশাইয়ের রাজ্যাভিষেক। 

    তোমাদের মত প্রজা পেয়ে আমি খুব খুশি। এবারে সবাই মিলে নতুন উদ্যমে আমাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আজ এই শুভদিনে তোমাদের জন্য বিশেষ খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই বলে অজয় প্রস্থান করল। শার্দুল চলল তার সঙ্গে। 

    চলো সবাই খেতে চলো। আর আজ থেকে সবাই ওনাকে রাজামশাই বলে ডাকবে। বলল বিতান। ভুল যেন না হয়। 

    আর তুমি বুঝি মন্ত্রীমশাই  ? বলে উঠলো অতীশ। 

    ধরে নাও তাই। 

     ভালোই হল খাওয়াদাওয়া । এবারে সবাই যে যার ঘরে চলে গেল। এই অভিনব ব্যাপারটা সকলের মনেই রেখাপাত করেছে। 

    এদিকে অজয় বসে বসে ভাবছে  এই তো শুরু। এইবার আস্তে আস্তে সে চারিদিকে তার রাজত্ব কায়েম করবে। আর একবার তার পরিকল্পনাগুলোকে ঝালিয়ে নিতে লাগল সে। 

    অতীশ সুমিতের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, কেমন দেখলে যাত্রাপালা? 

    আরে পাগল, চুপ করো! কে কোথা থেকে শুনে ফেলবে। বলে সুমিত ঘরে ঢুকে গেল। 

   অতীশের মুখে হাসি লেগেই রয়েছে। সত্যিই পাগলই বটে। এবারে সে এগোল ল্যাবরেটরির দিকে। রবিনসনের সঙ্গে একটু দেখা করা যাক। 

    বাবলু ভাবছে, এক আজব জায়গায় এসে পড়েছি। এখানে না এলেই ভালো হত। 

    ওদিকে কৃষ্ণ তার মনের অস্থিরতা দূর করার জন্য নতুন ছবি আঁকতে শুরু করল। সামনে একটা এক্সিবিশন আছে,  সেখানে দেওয়া যায় ছবিটা। 

    আর সবার অলক্ষ্যে চলেছে ষড়যন্ত্রের জাল বোনা।


অতীশ ল্যাবরেটরির দরজার সামনে গিয়ে বেল বাজল। পিপ হোল দিয়ে দেখে রবিনসন দরজা খুলে দিতেই সে ঢুকে পড়ল। 

     কি চাই  ? বলল রবিনসন। 

     কি আবার। কাজ করবো। 

     এখন নয়, পরে। 

     তাই বুঝি। ঠিক আছে, রাজামশাইয়কে গিয়ে বলছি যে তুমি এই কথা বলেছো। 

     না না, কিছু বলতে হবে না ।আপনি আপনার মত কাজ করুন। 

     পথে এসো বাবা। বলে অতীশ লেগে গেল তার কাজে। রবিনসন একটু তফাতে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। 

     একটু পরেই অজয় চলে এল সেখানে । রবিনসনের দিকে তাকাল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে। 

     উনি কি সব কাজ করছেন। 

      গলার আওয়াজ পেয়ে অতীশ মাথা তুলে তাকাল আর বলল, আরে, রাজামশাই এসে গেছেন যে। 

     অজয় একটু লজ্জা পেয়ে গিয়ে বলল, আপনাকে আর রাজামশাই বলতে হবে না। এই একটু  দেখতে এসেছিলাম সবকিছু । তা নতুন কিছু কাজ শুরু করলেন। 

     বলছি। তুমি আগে ঐ রবিনসনকে সরিয়ে দাও এখান থেকে । 

     অজয় রবিনসনকে বলল ওখান থেকে চলে যেতে। অতীশ তুমি করে বললেও সে কিছু বলল না। 

      এবারে শোনো। আমি আমি একটা নতুন রশ্মি, মানে রে, আবিস্কার করেছি, যেটা খুবই কাজের। 

      গ্রেট।  তা সেটা কিভাবে কাজে আসবে  ?

     রামায়ণ পড়েছো নিশ্চয়ই  ?

     হ্যাঁ, অবশ্যই। 

     সেখানে আছে যে ইন্দ্রজিৎ রাম লক্ষণকে নাগপাশ দিয়ে বেঁধে অচেতন করে দিয়েছিল। আমার এই রে দিয়েও তাই করা যাবে । এর প্রভাবে সবাই অচেতন হয়ে পড়ে থাকবে। কি, কাজের জিনিস তো  ?

     দারুণ কাজের জিনিস। আপনি একজন জিনিয়াস। 

    থ্যাঙ্ক ইউ। তবে এটা পুরোটা করতে আমার একটু সময় লাগবে। আর একজন ভালো কম্পিউটার জানা লোক আমার দরকার। 

       সে পেয়ে যাবেন। বলে অজয় সুমিতকে ডেকে পাঠালো। 

      সুমিত আসতে অজয় তাকে বলল অতীশকে সাহায্য করতে। 

     আচ্ছা রাজামশাই। বলল সুমিত। 

     আর ওই রবিনসন লোকটাকে খুব একটা সুবিধের বলে মনে হচ্ছে না। বলল অতীশ। 

    ঠিক আছে, ওকে আমি চোখে চোখে রাখছি। আমি এখন আসি। কিছু দরকার হলে বলবেন। 

     অজয় চলে যেতে অতীশ হাসিমুখে তাকিয়ে রইলো সুমিতের দিকে। 

     আপনি শুনলাম সায়েনন্টিস্ট । 

     হ্যাঁ, ওই আর কি। একটু কফি আনতে বলো তো। 

    বলছি। 

     একটু পরে শার্দুল কফি নিয়ে এলো। অতীশ তাকে বলল, তা তোমার কি পোস্ট জুটলো,  বিদুষকের?

      কিছু না বলে চলে গেল শার্দুল। 

     এসো, এবারে একটু কাজকর্ম করা যাক।


( আগামী সংখ্যায়)




************************************"**************************************************************



প্রভাত ভট্টাচার্য  

তিনি সব্যসাচী--- এক হাতে সামলান চিকিৎসকের গুরুভার দায়িত্ব আর এক হাতে ফোটান সাহিত্য সৃষ্টির ফুল। দ্য হার্ট, মিশন পসিবল, মাই ডটার, রাজবাড়িতে রক্তপাত , ডিটেক্টিভ সূর্য এবং কবিতা সংকলন - কাগজের মানুষ এবং ফিনিক্স পাখি তাঁর উজ্জ্বল সাহিত্যসৃষ্টি । সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর  তিনটি ভিন্ন ধরনের উপন্যাস - দশভুজা, কাগজের মানুষ ও মায়াবী গ্রাম। এছাড়াও তাঁর আর একটি মনভোলানো সৃষ্টি 'গুহা মানবের ডায়েরি'  





উপন্যাস * দীপংকর রায়





কথা দিয়েছিলাম হেমন্তের নিয়রে 

পর্ব * ২২

দীপংকর রায়


জীবনের নানা ঘটনার আলোটুকুকেও মনে হয় তেমনই যেন… সেই কলার ভেওয়ায় ভেসে চলা দূরের আলোটুকুরই মতো,… যাতে কত নান্টু.. মন্টু.. মিষ্টি.. জ্যোছনা.. মায়া.. মিনু …. ইতিরা যে কত আলো জুগিয়েছিল পরস্পর এক একটি অধ্যায়ে এসে, তার সকল মুগ্ধতা অমুগ্ধতার কথা কি ভুলে যেতে পারবো কোনোদিনও এই জীবনে?সেই কথাটাই ভাবি মাঝে মাঝে।

   গোপরিচর্যায় এতটাই মন দিয়েছি, যে, যেকোনো উপায়েই হক কালো গোরুটিকে গাভিন না করে ছাড়া যাবে না কিছুতেই। তার জন্যে যেমন এ খাটালে ও খাটালে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তেমন যাঁরা একটু গুছিয়েগাছিয়ে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে এই ধরণের খামারী হয়েছে, তাঁদের ওখানেও জিঞ্জির ডাক্তারের দৌলতে একেকদিন যেয়ে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে আসছি, তাঁরা এই সব বিষয়গুলি নিয়ে কীভাবে ভাবনাচিন্তা করছে। ইদানীং একরকম প্রতিদিনই সন্ধ্যাবেলা হলে জিঞ্জির ডাক্তারের ওখানেই কেটে যাচ্ছে। নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে সময়গুলি কাটিয়ে দিচ্ছি। সেখানে নানাধরণের আলোচনাই হয়। যদিও একেক সময় সেগুলিতে আর শুধুই গোরুবাছুরের বিষয়ই থাকছে না শুধু, সেখানে শিল্প-সাহিত্য রাজনীতি সমাজনীতি দেশ ভাগ উদ্বাস্তু সমস্যা একাত্তরের দিনগুলি রাতগুলি ও কাব্য ধর্মের নানা প্রসঙ্গ ও আলোচিত হয়, জিঞ্জির দাই আমাকে উৎসাহিত করে একখানি কবিতার গ্রন্থ তৈরি ছাপতে দেবার জন্যে। আমি অবশ্য ইতিমধ্যেই কিছুটা অন্তত জানতে পেরেছি, সে কাজ কতটা কঠিন। প্রেস, ছাপাছাপি, এসবের কোনো ধারণাই আমার যে সে অর্থে নেই, সে কথা তো তাঁকে বলি না খুব পরিস্কার করে। তবে তাঁর দেওয়া উপদেশটি মাথায় রাখি, এবং নিজের মনে নিজেই যেন এই কথা বলতে বলতে পথ হাঁটি, তাঁর বাড়ির থেকে ফেরার পথে, কীইবা লিখেছি এমন, যাতে এখনই বই ছাপতে পারা যায়? নিজের লেখালিখি নিয়ে এই ভয়ই-তো এখনো কাটেনি!

   কিন্তু একথাও তো সত্যি, জিঞ্জির দার প্রচেষ্টাতেই তো শেষপর্যন্ত কালো গোরুটিকে গাভিন করা সম্ভব হয়েছিলো! যাইহোক এযাত্রায় কশাইএর হাত থেকে রেহাই পেলো সে। যদিও সেই চেষ্টাতে বিষনিভাইও বিশেষ সহকারী হয়েছিলো। আর একজন ডাক্তার সরকার দার তত্বাবধানে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ষাঁড় ধরিয়ে আনতে যেয়ে কী মুগ্ধই না হয়েছিলাম, ওখানকার খামার পরিচর্যার ধরণ ধারণ দেখে! মনে মনে ভাবতে থাকলাম, এমন  ভাবে যদি খানিকটা সবুজ ঘাস পাতা খাইয়ে, খোলা জায়গায় ওদের বিচরণ করিয়ে খামার তৈরি করতে পারতাম বড়সড় একটি জায়গায়, তাহলে কি ভালোই না হতো! কিন্তু সেটা কীভাবেই বা সম্ভব ? অতটা পরিসর কোথায়ই-বা পাবো, যাতে অন্তত ওইরকম ঘাস জন্মানো যেতে পারে ! সেই পরিমান অর্থ কেই বা জোগাবে আমাকে? 

   যদিও সে সময় এই অঞ্চলে জমির দাম খুব একটা বেশি নয়। তবুও হাজার পাঁচ ছয় তো হবেই কাঠা। সে যাই হোক, কোথা থেকে আসবে তা? 

সংসারে একটা অনটন তো লেগেই থাকে, তাতে এতগুলি দিন একটি গোরুর উপরে আর কতোই বা চালানো যায় ? 

   তাই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। শুধু এইটুকুই এগোয়, ইদানীং বিষনি ভাইকে ছেড়ে দিই রানিয়ার মাঠের থেকে খানিকটা ঘাস কেটে আনতে। কিন্তু তাকে ওদিকে পাঠানোও-তো বিপদ, সে আবার টানে টানে বাগদি পাড়ার দিকে চলে না যায় যদি! 

যদিও যায় অবশ্য মাঝে মাঝে সে কথাও ঠিক। এবং যথারীতি একেকদিন গরম চোলাই মদ খানিকটা ঢেলে দিয়েও আসে 

গলায় । এসে প্রথমটায় চুপচাপ থাকে, তারপরেই শুরু হয় তার উল্টোপাল্টা বকবক। এরকম দেখলে তাকে সামনের মাঠের মধ্যে নিয়ে যেয়ে বন্ধুবান্ধবরা মিলে তার মাথায় কয়েক বালতি জল ঢেলে দেওয়া হয় । সে তখন, জয় সিয়ারাম, জয় সিয়ারাম বলে নিজের মনে নিজেই কানতে থাকে। 

  তখন তাকে দেখে আবার কষ্ট ও হয় খানিকটা। মনে মনে‌ বলি, কেন যে এই সব ছাইপাঁশ খাও বিষনি ভাই? একথা বলেও তাকে তার গাহাতপা মুছিয়ে তাকে তার শোবার জায়গায় পাঠিয়ে দি। 

   সে বলে, আর না পিয়েঙ্গে, ইবারের মতো মাফ করে দেও গো বড় বাবু। 

  বড় কষ্ট হয় তখন তাকে দেখে। হাতজোড় করে বারবার সে তার অপরাধের জন্যে ক্ষমা চেতে থাকে। 


   ইদানীং আমাদের বড় ভাগ্নেটি আমাদের এখানেই থাকছে কদিন হলো । দিদি তাকে রেখে যায়। বাড়িতে একটি বাচ্চা থাকলে ভালোই লাগে । ও এখানে থাকলে মাও অফিস কামাই করে। ওকে আমরা সকলে মুনাই বলে ডাকি। ভালো নাম কী রেখেছে, সেটা অবশ্য তখনো পর্যন্ত আমিও জানতাম না কিছুই। জানতে পারলাম ও যখন স্কুলে ভর্তি হলো। দিদির একমাত্র নেশা হলো ভারতবর্ষের এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো। অশোকদারও এক-ই বাতিক। সময় সুযোগ পেলে, কারখানার ভার কদিনের জন্যে ছোটো ভাইএর উপর দিয়ে বেড়িয়ে পরে তাঁরা। কখনো ছেলে তাঁদের সঙ্গে যায়, কখনো ও এ-বাড়িতেই থাকে। ওকে নিয়ে বিশেষ অসুবিধা নেই, হাতের মধ্যে একটুকরো কাপড় ধরিয়ে দিয়ে ঘুম পাড়ালেই ও ঘুমিয়ে যায়। সেই কাপড়ের টুকরোটিকে নিয়ে ও মুখের কাছে নাড়াচাড়া করতে করতে হয়ত সুরসুরি অনুভব করে ও,তারপরেই ঘুমিয়ে যায় আপন মনে নিজেই ।

   সময়গুলিকে নিয়ে আজকাল প্রায়শই ভাবতে বসি, কীভাবে কাটাচ্ছি এই যে এই সব সময়গুলো! 

  এইটা বেশ কিছুদিন যেন ভেতরে ভেতরে একটা তাড়না তৈরি করছে দেখতে পারছি। আগেও ছিলো না এই তাড়না, তা না, ছিলো, তবে ভেবেছি এই কথাই— ও হয়ে যাবে, চলুক না যেভাবে চলছে সেভাবে।

   রসিক দাদুর বলে দেওয়া সেই কথাটা বারবার মনে হয়: রোজ কী করলে, সে তুমি যাই করো না কেন, তার একটি পর্যবেক্ষণ তুলে রাখবে খাতায় কলমে অন্তত। না পারলে নিজেকে নিজে একবারের জন্যে হলেও প্রশ্ন করবে এই বিষয়ে। 

   এর পরে বিষয়টিকে মনে হলো, তাহলে তো হিসাব রাখা বলে তাকে? এত হিসেব করে কি চলা যায় ? না জীবন চলে কখনো? কোনোদিনও কি সেটা মনে করেই চলা যায় কি সব সময়? 

   দ্বন্দে পড়ি। কোনটাকে কী বলে! কেবলই মনে হয় সত্যিই তো, কিছু কি করেছি আদেও ইতিমধ্যে? কোনটা আমার সঠিক কাজই বা! 

    এই যে সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠলাম, তারপরে নিত্য কর্মের মধ্যে যা যা পড়ে, সেগুলি করা হলো, সঙ্গে সঙ্গে গোপরিচর্যাও হলো। তাদের জন্যে প্রাথমিক কাজকর্মও সারা হলো। এর পর বাজার । বিষনিভাইএর সঙ্গে সঙ্গে গোরুগুলির স্নান-ধান পর্ব সারা হলে তাদের বাড়ির পাশের মাঠে বেঁধে দেওয়া। এরপর নিজের স্নান-ধান পর্ব সারা। ইদানীং স্কুলের কলে, না হলে মাখন সাহার পুকুরে ডুবিয়ে স্নান করতে ইচ্ছে হলে নেমে যাই সেখানে। জল সংকট এখনো কাটেনি এদিকে। সাপ্লাইয়ের জলও ইদানীং রাস্তার মোড়ে মোড়ে। বাড়িতে বাড়িতে জলের লাইন এলেও সাপ্লাই ভালো হয়নি এখনো। বলছে সমগ্র কাজটি সড়গড় হতে হতে সময় লাগবে এখনো। আরো দুবছর নাকি এইভাবেই কাটবে। সবজায়গায় পাম্পিং স্টেশন এখনো করে উঠতে পারা যায়নি কেন সেটা জানা যায় না যদিও এখনো। তাই মানুষজনের জলের ভরসা বলতে সেই রাস্তার টিউকল, ছশো ফুটের যেগুলি বসানো আছে সেগুলিই খানিকটা। আর যাদের বাড়িতে কুয়ো আছে তাদের স্বস্তি। তাই, জল নিয়ে টানাপড়েন এখনো এই অঞ্চলে আছেই লেগে । 

  তারপর স্নানধান শেষ হলে রোদের দিকে কিছুক্ষন চেয়ে থাকা। বিশেষ করে ফাল্গুন চৈত্রের রোদ-ছায়ার  এই এগারোটা বারোটার দিকের খেলাটা বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকি…। এটা যেন খানিকটা ব্যাধির মতোন হয়ে গেছে । আসলে ঐ সময়টার আলোর দিকে চেয়ে থাকাটায় বেশ একটা অন্যরকম বোধ তৈরি হয়ে ওঠে ভেতরে ভেতরে। বিশেষ করে এই সময়ের ঋতুকালীন আলোছায়ার ভেতর কোথাও যেন এক নতুন জন্মের সম্ভবনা তৈরি হয়ে ওঠে । যদিও এটা হয়ত নিজের সঙ্গে নিজেরও একটা বোঝাপড়ার বিষয় হয়ত। আর সেখানেই যেন কোথাও একটা ধরা পড়ে যাওয়া থাকে হয়ত। যে আরাধ্য অবাধ্য অনিয়মের পথে জীবনের সেই মোক্ষকে খুঁজে বেড়াবার সংকল্পে তথাকথিত পথে চলতে চাইলাম না, অথচ তারই অধ্যায়নের চেতনায় অন্য এক নিয়মের মধ্যে দিয়ে যে অনিয়মের ডাক শুনতে চাওয়া, তাঁর সেই অসহায়োতাতেই কখনো কখনো ভেঙে পড়ি যেন ভীষণভাবে। তবে তা বেশিক্ষণ আমার মনখারাপ তৈরি করতে পারে না। আবার একসময় উঠে দাঁড়াই, নিজের মধ্যে নিজেই যেন এক বিশ্বাস তৈরি করে নিই এই বলে, কেন আমি ভেঙে পড়বো সেই সব কে দেখে…?

  শংকর কাল্টু উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পরে চলে গেল শহরের ব্যাস্ত এক দিকে পড়াশোনা করতে। শুনেছি সেই কলেজ নাকি খুব নামকরা । 

   দিদিমার চিঠি পাই, তাতেও জানতে পাই সঞ্চয় চুয়াডাঙ্গায় কলেজে ভর্তি হয়েছে। জ্যোস্না মাসির ওখানে থেকে পড়াশোনা করছে। সে চলে গেছে বলে দিদিমার চিঠিপত্র লেখার লোকের অভাব হয়েছে বড়োই। কাইলে মামাও খুব ব্যাস্ত। তার ও সময় হয় না । একমাত্র‌ বড়ো দাদুই ভরসা এখন যেটুকু। যদিও তাঁরও হাটঘাট আছে তো। সবদিন তাঁকেও পাওয়া সম্ভব নয় । যেদিন হাটঘাট থাকে না সেদিনটাই বুঝে তাঁর অবসর থাকলে তবেই লিখে দেয় সে। 

    দিদিমা এই বিষয়ে মায়ের কাছে অনুসচনা করে লেখে, এই সময়টাতে আমিও যদি ওদেশে থেকে পড়াশোনার মধ্যে থাকতাম, তাহলে  আমারও-তো এইসময় গ্রামের বাইরে থেকে পড়াশোনা করারই কথা ছিলো তো !  

    তারপরেই লেখে এই বলে, যদিও সে সব বিষয় নিয়ে দুঃখ করেই বা কী আর হবে!

   এইরকম সব কথাই  দিদিমার চিঠির মধ্যে থেকে উঠে আসে… তার অর্থ হলো তার ভেতরে ভেতরে একটা চাপা বেদনার বহিঃপ্রকাশই তো এই সব কথা ! 

    এমনই সব ইঙ্গিত থাকে সব সময় সেই সব চিঠির মধ্যে বেশিরভাগটা জুড়েই….. ও বুঝলো না, ও এখন কী করছে? তোমার সংসারের দেখভাল করবার জন্যেই তো ওকে নিয়ে গেলে তুমি? তাহলে আর বিলম্ব কেন, সংসার করে দেও এবারে। গ্যানেনদির ও নানা সময় একথাই বলে, বলে, ও দিদি, আমি তোমাগের একটা কথা না পালি, কিছুই তো ভাবতি পারি নে বলো? তাই কোই কি শোনো, তারেই বা আর কতকাল কথা দিয়ে ভুলোয়ে রাখতি পারি, তাই কও তো? 

   মনে মনে ভাবি, পড়াশোনা করে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় এসব না করতে পারলে কি তার বিধান হলো, একটা বিয়ে করা? যেকোনো কাউকে গ্রহণ করে সংসারি হয়ে যাওয়াটাই কি তাঁর এখনকার বিধান! 

   মানুষের জীবনের এই সহজ সরল ধারাবাহিকতার বাইরে আর কোনো জীবনের ধর্ম নেই ?

   একটি মন যেন প্রতিবাদ করে উঠে বলতে চায়, কে বলেছে নেই? আছে তো, তাহলে সেই কথা মানুষ বুঝতে চায় না কেন? আমি কোন পথ ধরে এগিয়ে চলেছি তাহলে এখন? 

    কোনোটা ধরেই তো ভেবেচিন্তে চলতে পারিনি আমি! তাই যদি না হবে তাহলে শঙ্কর কাল্টু ওরা নতুন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আমার পরিচয় করাতে যেয়ে অত দ্বিধায় পরে কেন? কত থতমত খাবারইবা কী আছে! কই সহজ সরল ভাবে বলতে পারে না কেন, আমি কবিতা লিখিই শুধু? 

   কবিতা লিখে পাড়ার জলসায় তা পাঠ করলে বাহবা পাওয়া যায়। অথচ সামাজিক পরিচয় দিতে গেলে

কোনো স্বীকৃতি নেই কেন? শিল্প সাহিত্যের কোনো শ্রেণী নেই, ইস্কুল কলেজ নেই, ডিগ্রি নেই, যা আছে তা ওই বিশেষ একটা দিক নিয়ে উচ্চ স্থানে যাবার জন্যে গবেষনা করা বলে যাকে, তাঁদের জন্যেই কিছু একটা উপাধিটুপাধী হয়, এই আর কি। অর্থাৎ নিম্ন মানে তাঁর যদি কোনো পরিচয় নাই থাকে, তাহলে সমাজে সে ওই নিম্নমানেরই শুধু ? নিজের পরিচয় দিতে যেয়ে অন্য কোনো ভাবে বোঝাতে মন চায় না। আর কেনোই বা ঘাড় ঝুঁকিয়ে এমন একটা যেন অপরাধবোধে মুখটিকে ম্লান করে দাঁড়িয়েই বা থাকতে হবে কেন অমন ভাবে ?

   যদিও এ সবের কোনো আলোড়ন সামনে আসতে দিই না। সেই সব জায়গায় পরিচিত করতে এত দ্বিধায় পড়ে যায় যখন, তখন আমি খুব সহজেই তাঁদের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে নিজের পরিচয়টা খুব পরিস্কার করে দিয়ে বলি, আমি বলছি, ওঁরা একটু দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছে তো? বিষয়টা এরকম, আমি কোনো ধারাবাহিক পড়াশোনার মধ্যে এখন নেই। নিজের মতো লেখাপড়া করি কিছু অবশ্য। যাতে কোনো পরিক্ষার ঘর নেই। খাতা নেই। নম্বর নেই। সার্টিফিকেট নেই। নেই সমাজে বড় ছোটো কোনো বিশেষ স্বীকৃতির তকমা। যা বলতে যেয়ে মুখটা খুব উঁচু করে বা বুক টান করে বিশেষ ভাবে কিছু একটা বলা যায় না, তবুও এই সমাজে তেমন কোনো পরিচয় নেই সেই ক্ষেত্রে এ কথাটা তো বলা যায় খুব সহজ ভাবে! যদিও যেটা আছে সেটা সংসারের কোনো বিশেষ কাজেই লাগে না।

   এতে কারো কাছে বিশেষ বাহবা পাই, আবার কারো কাছে নেহাত সৌজন্যতাবসত তাদের বলতে শুনি, না না তাতে কি, যে যেভাবে চায় সেটাই তো শিক্ষা;  তবে আপনাকে দেখে কিন্তু সে কথা কখনোই মনে হয় না, আপনি কিছুই করেন না যে। 

   এসব শুনে আত্মতৃপ্তি পাওয়া গেলেও, তা যে প্রকৃত আত্মতৃপ্তি না তাকি জানি না আমি ! বেশ ভালো করেই জানি। তাতে কি আমার ভেতরের সংকোচ বোধ সবটা চলে যায়? না, ইদানীং মনে হয় কেবলই সত্যিই তো, এখানে আমার কোনো যোগ্যতাই তো নেই,  পরিচয় দেবার মতো তেমন কিছু আছে কি ? 

   এইসব কিছুর সামনে সব সময়ই পড়তে হয়। সে একেবারে পরিচিত অপরিচিত আত্মীয় স্বজন পরিজন সকলের সামনেই।

   সকলের ভেতরে থেকেও সকলের থেকে একেক সময় আলাদা হয়ে যাই‌। নিতান্ত এক ছদ্মভদ্রতাবসতোই  মনে হয় নিজেকে। আর এটা ভালো করেই মনে হয়, এই জিনিস সমস্ত জীবনই বহন করতে হবে, যত দিন বেঁচে থাকবো এই শরীরে।


                           ( আগামী সংখ্যায় )




অণুগল্প * প্রদীপ কুমার দে





অসম্ভব সত্যি

প্রদীপ কুমার দে



--  আমার জীবনটা একেবারে বিফলে...

--  এটা কেমন কথা?

--  প্রথম প্রথম তাই মনে হত, প্রশ্ন করতাম নিজেই নিজের কাছে, উত্তর আসত, আরও লড়ে যাওয়ার আশায় বুক বাঁধতাম।

--  তারপর?

--  পরে আর কিছুই নেই। আজীবন বিছানায়...

--  একবার যদি সবটা বল ....?

--  তখন যুবক। সার্কাস দলে ভিড়ে গেলাম। উত্তম স্বাস্থ্য, আর খুব সাহসী ছিলাম তাই। চাকরিও পাওয়া গেল। সার্কাস শুধু ভেলকিবাজী নয়, সাহসের খেলা! অনেক লড়াই অনেক সাহস তোমাকে প্রফেশনাল ট্রাপিজের এক নায়ক বানিয়ে দেবে,তাহলেই। ভালই কাজ করছিলাম কোহিনূর সার্কাসে। অত্যধিক ভালমানুষি আর সাহস দেখিয়ে সমস্যায় পড়লাম। খানিকটা নিজের ইচ্ছেও ছিল। গভীর কুঁয়োর মধ্যে বাইক নিয়ে একেবারে নিচু থেকে উপরে ওঠা আবার নামা সঙ্গে হাড়হিম করা সব ঝুঁকি নিয়ে খেলা। সবার হয় না কিন্তু আমার হল, এল বিপদ, দুর্ঘটনা, পরিণতি স্বরূপ এই বিছানা উপহার পেলাম।

--  ভয় পেয়ো না তমাল, আমি আছি, তোমায় ভাল করে তুলবই ...

--  ঋতু, অবাক হচ্ছি, এই সময়ে এসে কোন নারী স্বেচ্ছায় পাশে দাঁড়ায়? আবার ভাল লাগছে তোমার ভালবাসা পেয়ে, তোমার কথা শুনে ...

--  এই বিশাল পৃথিবীর তুমি কতটুকু খবর রাখ তমাল? এখনও আমার মত অনেক ঋতু আছে তমালের জন্য ...

এরপর যন্ত্রনা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম অনেক রাত, পাশে ছিল ঋতু। ঘুম ভেঙে গেছিল না স্বপ্নের দেশে ছিলাম জানি না, দেখলাম আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু অসম্ভবভাবে আমি হাঁটছি ঋতুকে জড়িয়ে ধরে ...

অসম্ভব, কিন্তু সত্যি!



গল্প * মনোজিৎকুমার দাস

 



উতল  মন


মনোজিৎকুমার দাস


সে আমাকে প্রথম ভালবাসতে শিখিয়েছিল।  কতই বা তখন আমার বয়স । আমি সবেমাত্র সাত ক্লাস পাশ করে আট ক্লাসে উঠেছি, ও আমার থেকে দু’ক্লাস উপরে পড়তো। একই পাড়াতেই আমরা থাকি। ক্লাস সেভেন থেকে আমি প্রথম হয়ে এইটে উঠলাম। আর ও ক্লাস নাইন থেকে প্রথম হয়ে টেনে প্রমোশন পেল। একই স্কুল বাসে আমরা রোজ স্কুলে যেতাম , ও কিন্তু আমার সঙ্গে যেতে আলাপ করতে আসেনি একদিনও ।  উপর ক্লাসের ছাত্রদের সাথে কথা বলার সাহস আমার সে বয়সে ছিল না। 
মিরপুরে ১০ নম্বর গোলচত্ত্বর থেকে আমরা স্কুলে যাওয়ার  জন্যে স্কুল বাসে উঠতাম ,আর স্কুল শেষে আবার ওখানটাতে বাস থেকে নামতাম। আমাদের মধ্যে সুশোভন ও থাকতো। স্কুলবাসের প্রায়  সবাই আমাকে চিনে , আমি মনে মনে ভাবতাম।  প্রতি ক্লাসে সুশোভন  প্রথম হওয়ায় সবাই সুশোভনকে যেমন চিনতো, আমিও তেমন ভাবেই চিনতাম।  সুশোভন আমাকে চিনতো তবে তেমনভাবে চিনতো কিনা জানি না।
স্বাস্থ্যচেহারায় আমি আর পাঁচজনের চাইতে ভাল এটা আমি নিজেও বুঝতাম । সত্যি কথা বলতে নজর কারার মতো চেহারা আমার ,তা আমাদের ক্লাসের ছেলেমেয়েদের বুঝতে কষ্ট হয়নি।  একই পাড়ায় বাস করে, একই স্কুলবাসে যাতায়াত করেও আমার চোখ কিন্তু সুশোভনের  দিকে পড়েনি ।
আমাদের স্কুলের অডিটোরিয়ামে বার্ষিক পরীক্ষাফল ঘোষণা করেছিলেন হেডস্যার। অন্যান্য স্যার ছিলেন,ছিলেন  অভিভাবকেরাসহ অনেক গুণীজন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে হেডস্যার ক্লাস নাইন থেকে ফল ঘোষণা করতে শুরু করলেন। সুশোভনের নামটা তার মুখ থেকে প্রথমে উচ্চারিত হলো। সুশোভন ডেক্স চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানালো।
আমি তার মুখটা দেখেই চিনে ফেললাম। ওতো আমাদের পাড়ার , আমরা একই স্কুল বাসে যাতায়াত করি,আমি মনে মনে বললাম। আমাদের স্কুলটা ঢাকার নাম করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এক এক ক্লাসে চার পাঁচটা করে সেকশন । একই ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের চেনার উপায় নেই। এক সময় আমাদের ক্লাসের রেজাল্ট ঘোষণার পালা এলো। ক্লাসের প্রথম হিসাবে আমার নাম হেডস্যার ঘোষণা করলেন। আমার আশা ছিল আমি প্রথম না হলেও সেকেন্ড হবো।আমার রেজাল্ট আমি উল্লাসিত। রেজাল্ট ঘোষণার অনুষ্ঠান শেষে ফটো তোলার হিড়িক পড়ে গেল। সুশোভনই প্রথম এগিয়ে এসে আমাকে বললো “কনগ্রাচুলেশন অন ইওর এক্সসেলেন্ট রেজাল্ট, সুরঞ্জনা।”  আমার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলো “সেম টু ইউ । উইথ গুড উইসেস।” ওটাই ছিল আমাদের প্রথম কথা বলা। তারপর থেকে আমাদের দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা পড়ে উঠলো।
তারপর সুশোভন এক বছরের কয়েক মাস বেশি স্কুলে থাকলো। ক্লাস টেনের টেস্টের পরও এস.এস.সি. পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা একসাথেই স্কুলে যেতাম ।ওদের পরীক্ষার রেজাল্ট বের হওয়ার পরও ওর সাথে আমার যোগাযোগ ছিল। পরীক্ষা দেবার পর প্রায় প্রায়ই ও আমাদের বাড়ি আসতো। আমার বাবামা আর ভাইবোনেরা তাকে ভালচোখেই দেখতো।আমার মা আর েেছাট বোনটির সাথে আমিও দু’তিন বার ওদের বাসায়ও গিয়েছি।
ওর বাবা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউভিট পদে প্রমোশন পেয়ে মিরপুর থেকে  সিলেটে শহরে বদলী হওয়ায় বাবা মা ভাইবোনের সঙ্গে সুশোভনকেও  সিলেট শহরে চলে  যেতে হলো। সেই থেকে  সুশোভনের সঙ্গে আমার সর্ম্পকের ছেদ পড়লো।
ও আমাকে ভালবাসতে শিখিয়েছিল। সত্যি এক সময় আমরা পরষ্পর পরষ্পরকে ভালবেসে ফেলি ।  বয়:সন্ধিক্ষণের দু’জন তরুণতরুণীর মধ্যে নিষ্কাম প্রেমের একটা সম্পর্ক আমাদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল।
তারপর কয়েক বছর কেটে গেছে । ওর  দেখা পাইনি। সে সময়  মোবাইল ফোন থাকলে এমনটা হয়তো হতো না।  মনের অজান্তে একদিন ওকে ভুলে গেলাম।
এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি ইংরেজিতে। অনার্সে ভাল রেজাল্ট করেছি। মাস্টার্স শেষ করে বের হয়ে যাব অল্পদিনের মধ্যে ।
বয়ঃসন্ধিক্ষণ পেরিয়ে আসার বছর দু’তিন পর  ডিপার্টমেন্টের একটা ছেলের সঙ্গে আমার প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠায় আমাদের দিন ভালই কাটছিল । এখন আমাকে পূর্ণ যৌবনা তরুণীই বলতে হয় । এখন আমার ভালোমন্দ বুঝবার ক্ষমতা আমার আছে বলে মনে হয় ।
হঠাৎ করে একদিন সুশোভন আগমন ঘটলো। “এতদিন কোথায় ছিলে সুশোভন ?” এতদিন পরে তার সাথে প্রথম সাক্ষাতে আমার প্রশ্ন । ও আমতা আমতা করে কি যেন বলতে চাইলো ।
ওকে এড়িয়ে যেতে চাইলাম, এখনো এড়িয়েই যেতে চাচ্ছি। কিন্তু ওকে এড়িয়ে যেতে পারছি না,আসলে কিন্তু ওইতো প্রথম আমাকে ভালবাসা কাকে বলে শিখিয়েছিল। আমাকে ছাড়া ও এক সময় যেন নিঃশ্বাস নিতে পারতো না।
ওর সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে প্রতিদিনই এখনো । ওকে কাছে পেলে এখনো আমার খুব ভাল লাগে । এদিকে, ডিপার্টমেন্টের ছেলেটিকে  আমি কী বলবো ; ভেবে পাচ্ছি না। এখন আমি কী  করবো!




গল্প * দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়






সব আনন্দে

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়



পেশা কখন যেন নেশায় বদলে গেছে অভীকের। অফিসের সকলে ওকে ' কাজ - পাগলা ' বলে!

অভীক জানে এসব।ওর কিছু করাও নেই।মা ছাড়া আর কোন পিছুটান নেই।এই মধ্য - চল্লিশেও তথাকথিত আইবুড়ো। অফিসের

 সকলেরই খুব প্রিয়পাত্র অভীক।অফিস কর্তৃপক্ষ এটা ভালোই জানে।আর জানে, অভীকের মেধার ওপর নিশ্চিত ভরসা করে কোম্পানির টার্ন ওভার আকাশচুম্বি করা যায়। তাই সিনিয়র ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদে প্রোমোশন ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। অফিসের সকলেই খুব খুশি।এই অল্প বয়সে এতো উঁচুতে ! অতএব কাছের মানুষের মতো আবদার, বড়ো একটা পার্টি চাই।

প্রতি বছর অফিসের কর্মীদের নিয়ে একটা সেমিনার হয় বাইরে কোথাও। বেড়ানোও হয় সহকর্মীদের।রথ দেখা কলা বেচা ! কর্তৃপক্ষও চায় এটা।তাই অভীক এবারে প্রত্যেক কর্মী পরিবারকেও জুড়ে দিল অফিস সেমিনারে।পরিবার নিয়ে একটা পিকনিকের দাবি ছিল কর্মীদের অনেকদিন ধরেই । অভীকের কর্তৃপক্ষকে রাজী করাতে বেশি বেগ পেতে হলো না। কর্তৃপক্ষের পূর্ণ বিশ্বাস ,অভীক পরে নিশ্চয়ই এটাকে কাজে লাগিয়ে কোম্পানিরই সুবিধা করবে!

অতএব এক শণিবার চলো ডায়মন্ডহারবার, ডায়মন্ডহারবার চলো ! শণিবার ধর্মতলা থেকে অফিসের দুটো ভলবো বাস ছাড়বে। নামী ও দামি এক রিসর্টে থাকা এক রাত। পরদিন বিকেলে ফেরা। সকলের উদ্বাহু উচ্ছাস বুঝিয়ে দিল কতোখানি আশার ছিল এ সেমিনার কাম ট্যুর।

এক সপ্তাহ দৌড়াদৌড়ি করে অভীক সব ব্যবস্থা করে ফেলল। পূর্ণ সহযোগিতায় অয়ন।অয়নও ব্যাচেলার !ওর মা মারা গেছে এক বছর আগে। বাড়িতে বাবা আর ও। কিছুদিন আগেই বাবার ডান হাঁটুর অপারেশন করিয়েছে।তাই অয়ন যেতে পারবে না জানালো। কিন্তু অভীক নাছোড়। অফিসে সবচেয়ে কাছের এইটা অয়ন।ও না গেলে হয় !অভীক ওর গাড়িতে অয়নের বাবার যাবার ব্যবস্থা করলো।অয়ন একসময় অভীকের মরিয়া চেষ্টার কাছে হার মানলো। সহকর্মীরা খুশি।এই সুযোগে যদি অয়ন দেবলীনা একটু কাছাকাছি আসতে পারে।

দেবলীনা অয়নের বিভাগেই কাজ করে। কম্পিউটার অপারেটর।অয়নের প্রতি দেবলীনার দূর্বলতা অফিসবিদিত।সকলে মজা করে এটা নিয়ে।অয়নকে দেখে মনে হয় ওর একটা ভালোলাগা তৈরি হয়েছে দেবলীনার প্রতি। কিন্তু অয়ন বাবার বিষয়টায় বড়ো কাতর। বিয়ের পর চাকুরীরতা দেবলীনা কি ঠিকমতো মেনে নেবে অয়নের বাবাকে ?অয়নের চিন্তা ও আপত্তির কারণ এখানেই। অভীকের ইচ্ছা,এই বেড়ানোর সুযোগে যদি দেবলীনা ও অয়নের পরিবারকে এক জায়গায় করে দেওয়া যায়। পাশাপাশি রুমের ব্যবস্থাও করেছে অভীক এই কারণেই।হোটেলের ঘর থেকে নদীর সৌন্দর্য যদি মন দূর্বল করে একটু।নরম মন ভালোবাসা ভেজা হতে আর কতক্ষন !

হইহই করে সকলে ভলবো বাসে চললো ডায়মন্ডহারবার। পৌঁছেই স্বাগত সকলে  ফলের জুস দিয়ে। বিশাল রিসর্টে থাকা খাওয়া দেখে সব অবাক।হোটেলের ফাঁকা মাঠটায় বাচ্চা গুলো দৌড়াচ্ছে। মহিলারা কখনো দোলনা , কখনো নদীর ধারে সেলফিতে মগ্ন। বেশি লোকের ভিড় সুইমিং পুলের পাশে।নীল জলের মায়ায় মোহময় চোখ সকলের। কয়েকজন নেমে পড়লো জলে প্রাতঃরাশ সেরে।অভীক ব্যালকনি থেকে দাঁড়িয়ে দেখছে সব। ভালো লাগছে খুব ওর। সকলের মুখের ত্রিকোণমিতিতে আনন্দ ভৈরবী! মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে ওর। মাকে মাসির কাছে রেখে এসেছে । অস্টিওআর্থ্রাইটিসে পঙ্গু মাকে আজকাল আর কোথাও নিয়ে যাওয়া যায় না। মাকে এই ব্যালকনিতে বসিয়ে দিলে নদীর শোভা দেখতে দেখতে খুব মজা পেতো মা,  নিশ্চিত।

দুপুরে রাজকীয় খাওয়া দাওয়ার পর ঘরে একটু বিশ্রাম। সেমিনার  চারটে থেকে ছটা। তারপর নদীর বুকে রিসর্টের নিজস্ব স্ক্রুজে সন্ধ্যায় নদীর বুকে ভেসে বেড়ানো। আলোর মালায় সজ্জিত স্ক্রুজে সত্যিই যেন এক মায়াময় পরিবেশ! আমুদী মাছ ভাজা, চিকেন প্যাটিস, শিক কাবাব, চিপস্,কফি ও কোল্ড ড্রিংকসের আয়োজন যেন আমোদ ঠাসা। অন্ধকারে নদীর জলে স্ক্রুজের আলোয় এক মায়াবী পরিবেশ। বাচ্চারা, মহিলারা আনন্দে উচ্ছল।শব্দের প্রাবল্যে তারা যেন মেলে ধরছে নিজেদের।সকলেই যেন ঐ মূহুর্তটাকে সঞ্চয় করে রাখতে চায় মনের মণিকোঠায়।

স্ক্রুজের ছেলেগুলো মিউজিক চালিয়ে দিল ।সুরের আবেশে সকলের কোমর একটু একটু করে দুলছে,বুঝল অভীক। নীচের ডেকে নেমে এলো।অয়নের বাবার পাশে ফাঁকা চেয়ারটায় বসলো।ওর বাবার মুখে মুচকি হাসি বুঝিয়ে দিল উনিও এখন আনন্দযজ্ঞে আপন নিমন্ত্রণে। বাচ্চাগুলো নামছে। মহিলারা অল্প অল্প কোমর দোলাতে শুরু করেছে।

হঠাৎ অভীকের প্রিয় কিশোরকুমারের গানটা বেজে উঠল রিমিক্সে।তুমি ভি চলো,হাম ভি চলে/ চলতে রহে জিন্দেগী।গানটা কতোবার মাউথঅর্গানে ও বাজিয়েছে তার হিসাব নেই।এক সময় কোনো অনুষ্ঠানে বাজাতে গেলেই এই গানটা শ্রোতাদের অনুরোধে বাজাতেই হোতো।একটু আবেগ বিহ্বল হয়ে পড়েছিল ও। হঠাৎ দেখে অয়নের বাবা লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বাচ্চাগুলোর সাথে কোমর দোলাতে শুরু করেছে। মহিলারা মূহুর্তের মধ্যে এক বলয় তৈরি করে ফেললো। ভদ্রলোক সকলকে নাচতে উৎসাহিত করছেন। জোরে জোরে বলে চলেছেন :"আনন্দ ! আনন্দ !"সকল মহিলারা প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে স্বমহিমায়।  সহকর্মীরাও বউদের সাথে যোগ দিয়েছে ইতিমধ্যে।এক ইতিহাস সৃষ্টি হচ্ছে যেন স্ক্রুজের ডেকে। অভাবনীয় এক সন্ধ্যা আলো হয়ে যেন সকলের বুকে বাসা বেঁধেছে।সদ্য হাঁটু বদলানো এক বৃদ্ধ জীবনকে উপভোগ করছেন আপন মনের আবেশে।এ আয়োজন সার্থক!অয়ন বাবাকে নিষেধ করতে গেলে অভীক ওকে হাত ধরে টেনে নিলো কাছে। দেবলীনা দূর থেকে অয়নের দিকে তাকিয়ে একদৃষ্টে। অভীক অয়নের কানে কানে বলে উঠলো :" এই তো সময় অয়ন।এই তো সময় ! " অয়ন প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে একছুটে দেবলীনার হাত ধরে দোলা শুরু করলো। দেবলীনার সারা চোখে মুখে হাজার ঝাড়বাতির আলো। দেবলীনার বাবা মার মুখেও  সম্মতির হাসি। ভারমুক্ত লাগছে অভীকের। মায়ের কথা মনে পড়লো ওর।মা থাকলে এক্ষুণি রবীন্দ্রনাথের কোন গান গুনগুনিয়ে উঠতেন। ডেকের চেয়ারে বসে একদৃষ্টে অভীক সাক্ষী হতে থাকলো আর এক একমুখ-দাড়ি বৃদ্ধের আনন্দ উৎযাপনে  !




##########################################


প্রবন্ধ * তপন পাত্র

 




ছড়া : উৎপত্তি ও বিকাশ

তপন পাত্র 



                "ছড়া ছড়া ছড়া

              নাড়লো  কবে কড়া,

              নানা মুনির  নানা মত

                আজব ও মনগড়া।"

       বাংলা সাহিত্যে প্রথম কবে ছড়া রচিত হয়েছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচকের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। সেই সমস্ত মতামত যুক্তিগ্রাহ্য মনে না করে এক আধুনিক ছড়াকার ছড়া লিখেছেন, যা এই রচনার প্রথমেই উদ্ধৃত। এ কথাটি অবশ্যই ধ্রুব সত্য যে কে, কবে, কখন ছড়া রচনা শুরু করেছেন তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব।

     সকল ভাষার প্রথম সাহিত্য অবশ্যই লোকসাহিত্য আবার লোকসাহিত্যের আদি সৃষ্টি ছড়া বলেই সকলে বিবেচনা করেন।সকল ভাষার মতো বাংলা ভাষার ছড়াগুলিও লোক সাহিত্যেরই অংশবিশেষ। স্বাভাবিকভাবেই লোকছড়াগুলি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন বলে বিবেচিত হয়ে এসেছে বিগত শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন বলে সাহিত্যের ঐতিহাসিকেরা উল্লেখ করেছিলেন খনার বচন এবং ডাক পুরুষের কথাকে। সেগুলি প্রবাদপ্রতিম। কিন্তু ১৯০৭ সালে মহা মহোপাধ্যায় পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় নেপালের রাজ দরবারের পুঁথিশালা থেকে চর্যাপদ আবিষ্কার এবং সম্পাদনা করে ১৯১৬ সালে কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশের পর বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতামত বদলে গেল। চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন বলে বিবেচিত হলো।

             ছড়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে কোন কোন সাহিত্যের সমালোচক মন্তব্য করলেন চর্যাপদের প্রথম পদটি সহ আরো বেশ কয়েকটি পদ ছড়ার আঙ্গিকে স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত। কিন্তু এ কথা সর্বৈব অসত্য। এই পদের গঠন পদ্ধতিতে কোনভাবেই স্বরবৃত্ত ছন্দ অনুসৃত হয়নি, যা হয়েছে তা প্রাচীন মাত্রাবৃত্ত, সর্বোচ্চ ছন্দ হিসেবে মনে হলেও অন্তত এর বিষয়বস্তু ছড়ার বিষয়বস্তু নয়, একথা পাঠক মাত্রই বিবেচনা করবেন। আবার কোন কোন সমালোচক বলেছেন, অন্নদামঙ্গলের কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়ের কাব্যে প্রথম স্বরবৃত্ত ছন্দ অর্থাৎ ছড়ার ছন্দ ব্যবহৃত হয়েছে। একথাও যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কারণ তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এই কাব্য রচনা করেছেন। কাব্যে গঙ্গার তরঙ্গের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি যে চরণগুলি ব্যবহার করেছেন, সেখানে স্বরবৃত্ত ছন্দ অনুসৃত হয়েছে, কিন্তু বাংলা সাহিত্যে সেটি প্রথম স্বরবৃত্ত রীতির ব্যবহার নয়। আবার বৈষ্ণব পদাবলী এবং শাক্ত পদাবলীর কোথাও কোথাও অল্পস্বল্প স্বরবৃত্ত রীতি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু সেই অংশগুলোকে সঠিক অর্থে প্রকৃত ছড়া বলা যায় না।

            তাহলে নানা মুনির নানা মতের ঘন অরণ্যে প্রবেশ না করে আমরা খুব সহজেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, প্রচলিত লোক ছড়া, খনার বচন, ডাক পুরুষের কথা ---এগুলোই ছড়ার আদি সৃষ্টি, আদি রূপ। যেহেতু মুখে মুখে ফিরেছে বাংলা ভাষার সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকেই, কিন্তু পাথর প্রমাণ অকাট্য যুক্তি নেই ঠিক কোন দিন, কে বা কারা এগুলো রচনা করলেন, হয়তো তাই বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন রূপে পরবর্তীকালে এগুলো বিবেচিত হলো না। পন্ডিতেরা চর্যাপদ কে প্রাচীনতম নিদর্শন বলে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে যত বেশি উঠে পড়ে লাগলেন লোক ছড়াগুলোকে ঠিক ততখানি গুরুত্ব দিলেন না। এর ফলে ছড়া প্রেমিক, ছড়া রচয়িতাদের অভিমান হতেই পারে। তাঁরা ছড়ার সৃষ্টিকাল নিয়ে, উদ্ভবকাল নিয়ে মন্তব্য দাতাদের  বিরুদ্ধে ছড়া রচনা করতেই পারেন। তাঁদের মতামত কে "আজব" ও "মনগড়া" বলতেই পারেন।

                 একটু সুস্থ ভাবধারার মানুষ, নিরপেক্ষ বিচার প্রেমিক মানুষ মাত্রই স্বীকার করবেন যে, বিভিন্ন ধরনের লোক ছাড়া যেমন --- ছেলে ভুলানো ছড়া, ঘুম পাড়ানি ছড়া, মেয়েলি ছড়া, খেলাধুলার ছড়া, রা'তকথা বা ভাঙানির মতো ছড়ার আঙ্গিকে লেখা দু চার লাইনের রচনাগুলি আধুনিক ছড়ার পূর্ববর্তী প্রচলিত রূপ। এবং এ প্রসঙ্গে অবশ্যই খনার বচন ও ডাক পুরুষের কথা চলে আসে।

     যতদূর জানা যায় খনা পালযুগ অর্থাৎ অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে কোন এক সময় জীবিত ছিলেন। প্রচলিত একটি কিংবদন্তি অনুসারে তিনি পশ্চিমবাংলায় অধুনা উত্তর  ২৪ পরগনার বারাসতের কাছে দেউলিয়া গ্রামে বসবাস করতেন। অপর একটি কিংবদন্তি অনুসারে তিনি সিংহল রাজের কন্যা ছিলেন।

এই মহিলা বাঙালি জ্যোতিষী ছড়ার আকারে অনেক অনেক উপদেশমূলক বাক্যগুলি রচনা করেছিলেন যেগুলি কৃষিতত্ত্ব, আবহাওয়া, কৃষিকাজ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং শস্যের যত্নের নানান দিক সূচিত করে।ডাক পুরুষের কথা প্রসঙ্গে কেউ বলেছেন প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের কথা বা ছড়া, সকল কথায় আবহাওয়ার কৃষি জীবন প্রকৃতি ও সামাজিক নিয়ম-কানুন বিষয়ক উপদেশ রয়েছে। আবার অনেকেরই বক্তব্য 'ডাক' নামক একজন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের হীনযান শাখার তন্ত্র সাধক ছিলেন। তিনিও খনার সমসাময়িক। কিংবদন্তি আছে ডাক মানুষের দুঃখ দূর্দশা দূর করতে এবং ভবিষ্যতের জন্য উপদেশ দিতে পারতেন। আবার এমন কথারও প্রচলন আছে যে, ডাক পৃথিবীর মানুষের সংবাদ নিয়ে নাকি স্বর্গধামে পৌঁছে দিতেন। এই খবরাখবর প্রদানের কাজ করতেন বলেই তিনি ডাক পুরুষ নামে সুপরিচিত। কারো কারো মতে আবার ডাক পুরুষ হলেন পূর্ববঙ্গের একজন মানুষ এবং বৌদ্ধ সাধক। লোকছড়া, খনার বচন এবং ডাক পুরুষের কথা --এগুলিই ছড়ার প্রথম পর্ব এ বিষয়ে খুব একটা সন্দেহের অবকাশ নেই। সম্ভবত প্রসিদ্ধ ছড়াকার যোগীন্দ্রনাথ সরকার কলকাতার সিটি বুক সোসাইটি থেকে ১৮৯৯ সালে লৌকিক ছড়াগুলিকে প্রথম গ্রন্থভূক্ত করেন, নাম দিয়েছিলেন "খুকুমণির ছড়া"।

           

                 অনেকেই যেমন চর্যাপদের প্রথম পদটি সহ অন্যান্য কিছু পদকে স্বরবৃত্ত রীতিতে রচিত ছড়া বলেছেন , তেমনি কিছু কিছু বিদগ্ধ পণ্ডিত বলেছেন,  স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত আধুনিক ছড়ার উদ্ভব মধ্যযুগীয় কাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এর ধামালি ছন্দ থেকে , কেননা  শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ব্যবহৃত ধামালি ছন্দে স্বরবৃত্তের পূর্ববর্তী রূপটি পরিলক্ষিত হয়। এ কাব্যের শব্দে যেহেতু হসন্ত(্) উচ্চারণ নেই এবং অকারান্ত শব্দ অকারান্ত রূপেই উচ্চারিত হয়, সেহেতু পর্বের আদিতে শ্বাসাঘাত স্পষ্ট না হলেও তার ইঙ্গিত রয়েছে। ধামালী হলো প্রাচীন বাংলা কাব্যের একটি লৌকিক ছন্দ রীতি,যাতে আদিরসাত্মক কোনো বিষয় বাদ্য-বাজনা সহযোগে গ্রামের প্রান্তে এক বিশেষ শ্রেণীর শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে গীত হতো। এই ছন্দ লৌকিক ছড়ার ছন্দ বা স্বরবৃত্তরীতির ছন্দের উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রসঙ্গত 'লাচাড়ি'র কথা আসে। বাংলার প্রাচীন সুরুচিসম্পন্ন লোকগানের লৌকিক রীতির ছন্দকে বলে লাচাড়ি। লাচাড়ি স্বরবৃত্ত বা শ্বাসাঘাত প্রধান ছন্দরীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। লাচাড়ির সঙ্গে ধামালীর পার্থক্য কেবলমাত্র বিষয় নির্বাচনে। ভদ্র, সংস্কৃত, সর্বদা সকলের উপস্থিতিতেই শ্রবণযোগ্য ও রুচিকর বিষয় হলে তাকে বলে লাচাড়ি, তা-ই যদি গ্রাম্য, অশ্লীল বা আদি রসাত্মক হয়, তাহলে তা হলো ধামালী। পঞ্চদশ শতাব্দীর কবি বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে প্রথম ধামালী শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সেখানে শ্রীরাধার প্রতি শ্রীকৃষ্ণের অশ্লীল ব্যবহারের ছবি ফুটে উঠেছে বারংবার এই ছন্দের মধ্য দিয়ে। ছান্দসিক আচার্য প্রবোধচন্দ্র সেন "ধামালী" শব্দটির অর্থ করেছেন --"ধাবমান" বা "দ্রুতগতি যুক্ত"। যেটাকে আমরা আধুনিক ছড়ার পূর্বসূরী বলে ব্যাখ্যা করতেই পারি। অন্তত ছন্দের দ্রুত গতির বিষয়টি লক্ষ্য রেখে।


            শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের পর আসে বৈষ্ণব পদাবলীর কথা। বৈষ্ণব পদাবলির কবি লোচনদাসের পদাবলিতে স্বরবৃত্ত ছন্দের পর্বগত শ্বাসাঘাত  সুস্পষ্ট, যাকে অতি সহজেই ছড়ার ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্যরূপে চিহ্নিত করা যায়। লোচন দাসের একটি পদে পাচ্ছি:

     "কুল খোয়াবি বাউরি হবি লাগবে রসের ঢেউ।

     লোচন বলে রসিক হলে বুঝতে নারে কেউ।।"

এরকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে বৈষ্ণব পদাবলীতে আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে,যেগুলোকে আধুনিক ছড়ার পূর্ববর্তী পদক্ষেপ বলা যায়।

              বৈষ্ণব পদাবলীর সমসাময়িক ও পরবর্তী সময়ে শাক্ত পদাবলীতেও ছড়ার ছন্দ লক্ষ্য করা গেছে একটু বেশি বেশি পরিমাণেই। লোকপ্রিয় এই ছন্দকে রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত প্রমুখ শাক্ত কবিগণ খুব সুন্দর করে ব্যবহার করেছেন। যেমন --

      (১) সারাদিন করেছি মাগো সঙ্গী লয়ে ধুলাখেলা,

        ধুলা ঝেড়ে কোলে নে মা এসেছি গো সন্ধ্যাবেলা।


       (২) শিহরি মা মনে হলে কাল সকালে নিয়ে যাবে,

     মরি ত্রাসে কৈলাসে গো কেমনে মা দিন কাটাবে।

   

      (৩) আর অভিমান করিস নে মা ক্ষমা দে মা ও শঙ্করী।

     দু' নয়নে বহে ধারা মা হয়ে কি সইতে পারি।।


                এক কথায় লৌকিক ছড়ার ছন্দ বা স্বরবৃত্ত ছন্দ, চর্যাপদ ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তন পেরিয়ে বৈষ্ণবপদাবলীর পথ অতিক্রম করে কাব্য সাহিত্যের ধারাবাহিকতায় অষ্টাদশ শতকে শ্যামা সংগীত,আধুনিক মঙ্গলকাব্য, গোপীচন্দ্রের গান, , বাউল গান, পাঁচালি ও মৈমনসিংহ-গীতিকার, এছাড়া প্রচলিত টুসু গান, ভাদু গানের বিবর্তনের মধ্য দিয়েও পরিপুষ্টি লাভ করে আধুনিক যুগে ছড়ার ছন্দরূপে পরিপূর্ণ ও স্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, জন্ম হয়েছে প্রকৃত আধুনিক সাহিত্যিক ছড়ার। উদাহরণ হিসেবে পুরুলিয়ার টুসু গানের মাত্র দুটি চরণ উদ্ধার করছি, যেখান থেকে ছড়ার ছন্দটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।

"পুরুলিয়ার পৎনি পকা উড়ে গেলে ধ'রব না।

  যার সঙে যার ভালোবাসা, পরান গেলে ছা'ড়ব না।।"


      এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে আজকের পার্থ চট্টোপাধ্যায় --যাঁরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করলেন, তাঁরা কিন্তু কেউ পৃথকভাবে ছড়াকে কোন স্থান দেননি। পদাবলী, কাব্য, নাটক, উপন্যাস,ছোটগল্প, প্রবন্ধ সহ বিভিন্ন শ্রেণী সাহিত্যের ইতিহাসে যুক্ত হলেও ছড়া হলো না। কেন হলো না জানি না। তার সদুত্তর খুঁজে পাই না। দুয়েক লাইনে কবিদের কবিতা প্রসঙ্গে তাঁদের ছড়ার কথা এসেছে নমো নমো করে। এ কথা সত্য যে, আমরা যদি লোক ছড়ার কথা বাদ দিই তাহলে তারপর থেকে খনার বচন , ডাক পুরুষের কথা থেকে শুরু করে বাংলা কাব্য সাহিত্যের ধারায় প্রায় সর্বত্রই স্বরবৃত্ত ছন্দ বা দলবৃত্ত বা শ্বাসাঘাতপ্রধান বা বলবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার থাকলেও সেগুলো সঠিক অর্থে ছড়া নয়, ছড়ার ছন্দে লেখা গান অথবা কবিতা; ধাঁধা অথবা ভাঙানি। প্রকৃত আধুনিক ছড়ার সৃষ্টি তারও অনেক পরে। কারণ প্রকৃত ছড়া সার্বিকভাবে শিশুর সঙ্গে, শিশু মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মূলত এর শ্রোতাও শিশু আর এর গঠন প্রকৃতির মধ্যেও যেন কোথায় রয়ে গেছে একটা শিশুসুলভ চপলতা, ছড়া শুনতে শুনতে বুড়ো জেঠুও হয়ে ওঠেন সবুজ কচি শিশু। শিশুই তো এই মায়াময়, মোহময় বসুন্ধরার বুকে চির নতুন ও চির পুরাতন প্রাণসম্পদ। তাই তাদের নিয়ে, তাদের জন্য, তাদের মতো করে যে সাহিত্য,যে ছন্দোবদ্ধ বাণী ঝংকার, সেই বেদমন্ত্রগুলি ব্যাকরণগত দিক থেকে অসঙ্গত হতেই পারে, অংশত অর্থহীন হতেও পারে, 'যা ইচ্ছে তাই' হতে পারে, আবোল তাবল হতে পারে,আর পারে বলেই তো সেগুলি ছড়া। এককথায় পর্বের আদি অক্ষরে শাসাঘাত যুক্ত, দ্রুত লয় আশ্রিত, চার মাত্রার পূর্ণ পর্বে গঠিত, যে সুপ্রাচীন লৌকিক ছন্দে শিশুদের উপযোগী, শিশুদের আনন্দ-বিনোদনমূলক ছোট ছোট আকারের ছান্দিক কবিতা, তারই নাম ছড়া। এতে(১) চরণের সঙ্গে চরণের কোন অর্থযুক্ত পারস্পর্য নাও থাকতে পারে,(২) অর্থের চাইতে ধ্বনি এবং লয়ের গুরুত্ব অধিকতর,(৩) এই সাহিত্য কণা কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নিগড়ে বাঁধা নয়, (৪) এর পাঠ ছন্দযতি অনুসারে, অর্থযতির ধার ধারে না, (৫) এতে কিছু কিছু অর্থহীন বর্ণগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়, যেগুলি ব্যাকরণসম্মতভাবে শব্দ নয় কিন্তু অনুভবে শব্দের মর্যাদা পেয়ে যায়। অনেক সময় এক ভাষার ছড়াকে অন্য ভাষায় কিছুতেই অনুবাদ করা যায় না, ছড়ার এ এক মস্ত যাদু!

        বাংলা ছড়া সাহিত্যে যে নামগুলি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে, যাঁদের ছড়া শিশুদের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মতো মুখভার বয়স্ক মানুষেদেরও মন ভাল করে দেয় তাঁরা হলেন -উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, যোগীন্দ্রনাথ সরকার,সুকুমার রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, সত্যজিৎ রায়, লীলা মজুমদার, অন্নদাশঙ্কর রায়, জসীমউদ্দীন, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শিবরাম চক্রবর্তী, সুনির্মল বসু, নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, হেমচন্দ্র বাগচী, দীনেশ দাস, গোলাম মোস্তফা, বন্দে আলী মিয়া, ভবানীপ্রসাদ মজুমদার প্রমুখ আরো অনেক অনেক ছড়াকার। সময়ের সাথে সাথে ছড়ার রূপ বদল ঘটেছে। দ্রুতলের ছন্দ আরো দ্রুতগতি লাভ করেছে। ছড়ার প্রতিটি চরণে চার মাত্রার পর্ব থাকে চারটি। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। কখনো কখনো চার পর্বের চরণের জায়গায় দু পর্বের চরণ লক্ষ্য করা যায়। চার মাত্রার পরিবর্তে পাঁচ মাত্রার ও তিন মাত্রার ব্যতিক্রম পর্ব লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু মাত্রা গননায় হেরফের লক্ষ্য করা গেলেও উচ্চারণ প্রকৃতিতে ছড়াটি পাঠ করতে বা আবৃত্তি করতে কোন অসুবিধা হয় না। সম্প্রতি তো চার মাত্রার পরিবর্তে সম্পূর্ণ তিন মাত্রার পর্বেও ছড়া রচিত হচ্ছে। আধুনিক ছড়ার গতিপ্রকৃতি এবং বিষয়বস্তুর ক্রমপরিবর্তনগুলি ধরা একটি সুদীর্ঘ আলোচনার বিষয়। খুব সংক্ষেপে বলা সম্ভব নয় যে,

     "লটে গাছটি মুড়োলো,

     গল্প আমার ফুরোলো।"

তাই আপাতত তিন মাত্রার পর্ব বিশিষ্ট পাঁচটি পর্বের চরণে রচিত মাত্রা গণনার বিচারে সর্বাধুনিক একটি ছড়ার দুটি চরণ উল্লেখ করে এই আলোচনার ইতি টানছি ---

"সুমন ধন ফুল নেয় গো চুমু দেয় গো চুম নেয় গো সব জনায়,

তুল তুল তুল ফুল ফুল ফুল  তার গাল ওই সব গাল ওই দেয় রাঙায়।"

                   



#########################################


অনুবাদ কবিতা * জয়িতা ভট্টাচার্য





নাজিম হিকমতের কবিতা

ভাষান্তরঃ জয়িতা ভট্টাচার্য 


নাজিম হিকমত শুধু তুরস্ক নয় বিশ্বের  অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার। জন্ম ১৫ জানুয়ারি ১৯০২ ও মৃত্যু মস্কোয় ৩ জুন ১৯৬৩। বামপন্থী আন্দোলন ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তাঁকে কুড়ি বছর কারাগারে কাটাতে হয়। সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য ৫৬ বছরের জন্য সাজা ঘোষণা করা হয় এই তুর্কি কবির বিরুদ্ধে। তাঁর কবিতা গীতিময়তায় ঋদ্ধ। নাজিম হিকমতকে "রোমান্টিক কম্যুনিস্ট ",কখনও জেলখানার কবি বলা হয়। ১৯৫০ সালে তাঁকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। গত সংখ্যার পর, এখানে আমরা নাজিম হিকমতের আরো কয়েকটি কবিতা পড়ছি, কবি জয়িতা ভট্টাচার্যের অনুবাদে---


জীবনের গান


কপালের ওপর নেমে আসা চুল চকিতে 

সরে গেল আর

কেঁপে উঠল মাটি

অন্ধকারে ফিসফিস করছে বৃক্ষসমূহ

তোমার অনাবৃত বাহু হয়ে হিমশীতল

এখন

আমাদের দৃষ্টির অগোচরে নিশ্চয়ই কোথাও 

জেগে উঠেছে চাঁদ 

সীমানা ছাড়িয়ে 

পাতার পিছল বেয়ে  নেমে আলোকিত কাঁধ

কিন্তু জানি

চাঁদ উঠলে সঙ্গী হবে বন্ধু বাতাস।

গাছগুলো ফিসফিস করে 

অনাবৃত তোমার হিম হাত 

ওপরের ডাল থেকে অন্ধকারে কী যেন 

খসে পড়ল তোমার পায়ের পাতায়

তুমি আরও সরে এলে আমার কাছে

গাছ আর পাখি কীট-পতঙ্গ সাক্ষী

আমার হাতের ভেতর ফলের খোসার মতো

তোমার নগ্ন চামড়া, আঁশটে এবং ঝাপসা

হৃদয়ের গান স্তব্ধ হয়েছে

সাধারণ বোধটুকুও কাজ করছে না,

আমার সঙ্গিনীর শরীরে হাত রেখে ভাবছি

আজ রাতে আমি আর কিছু লিখতে বা পড়তে পারছি না।

না প্রেম না অপ্রেম

যেন উল্লম্ফ নেকড়ের জিভ 

আঙুরের পাতায় 

শ্বাপদের থাবা.

নড়তে,শ্বাস নিতে খেতে বা পান করতে...

পারছি না কিছুই করতে

মাটির নিচে একটা বীজের মতোই ফেটে যাচ্ছে আমার হাত।

হৃদয়ের বোধ নয় এমনকি কমন সেন্স নয়

না প্রেম না অপ্রেম  

আমার হাত খুঁজছে তাহার শরীর

আমার হাত এখন আদি পুরুষের হাত ।

যেভাবে মাটির গভীরে শিকড় খোঁজে জল

সেই ভাবে সে বলল

শুধু খেতে পরতে,শীতে গ্রীষ্মে সংগ্রামে বা বর্ণের গন্ধে নয়__

মরণের জন্য এই জীবন নয়

জীবনের জন্য হোক এই মরণ..."

আর তখন

আমার ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছে মেয়েলি

লালচে চুল

কিছু একটা স্পন্দিত করছে মাটি

আঁধারে ফিসফিস করছে উদ্ভিদ 

দৃষ্টির অগোচর হয়ে গেলো চাঁদ 

দূরে, এখন অনেক দূরে....

আর আমার হাত স্পর্শ করে আছে আমারই 

নারীর শরীর 

সমস্ত গাছ আর পাখি আর কীট-পতঙ্গের 

সামনে,

এখন আমি বেঁচে থাকার অধিকার চাই 

যে জীবন নেকড়ের লাফের মত

যে জীবন বীজধান স্ফুটনের 

আমি অধিকার চাই আদি মানবের।

       ___________




আলোর মানুষ 


যখন ছোটো ছিল কখনও একটা মশাও মারেনি 

বেড়ালের ল্যাজে বেঁধে দ্যায়নি ক্যানেস্তারা 

কিম্বা দেশলাই বাক্সে বন্দী করেনি কোনও গুবরে পোকা,

এমনকি একটা পিঁপড়ের ঢিবিতেও সে কখনও লাথি মারতে 

পারেনি।

তবু বড়ো হয়ে  যাবার পরে

বিছানার চারদিকে যখন ছড়িয়ে ছিল মৃত্যু

সে তখনও এমনকি বলেছিল 

"আমাকে একটা কবিতা শোনাও

সমুদ্রের আর সূর্যের কবিতা

পরমানুর জ্বলন্ত ভাঁড়ার নিয়ে কবিতা শোনাও 

উপগ্রহ নিয়ে কবিতা শোনাও 


মানবজাতির গৌরবের কবিতা শোনাও" 

         


Optimistic man

 Nazim Hikmet

=============

as a child he never plucked the wings off flies

he didn't tie tin cans to cats' tails

or lock beetles in matchboxes

or stomp anthills

he grew up

and all those things were done to him

I was at his bedside when he died

he said read me a poem

about the sun and the sea

about nuclear reactors and satellites

about the greatness of humanity


দিশা


বাড়িয়ে দেয়া আলোয় দাঁড়িয়ে আছি।

একটি ক্ষুধার্ত হাত

আর অপূর্ব একটা পৃথিবী।

চোখে আঁটে না এতো বনস্পতির ভিড়  __

এত আশা,এত সবুজের সমারোহ।

মালবেরির বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে

রোদেলা পথ,

 বন্দী আমি হাসপাতালের জানলা দিয়ে দেখছি।

যুঁই ফুলের তীব্র সুবাসে ঢেকে গেছে ওষুধের গন্ধ 

কাছাকাছি ফুটে আছে কোথাও। 

কয়েদি হতে পারি কিন্তু

বিষয়টা হলো নতি স্বীকার নয়।



It's this way

Nazim Hikmet

===========

I stand in the advancing light,

my hands hungry, the world beautiful.


My eyes can't get enough of the trees--

they're so hopeful, so green.


A sunny road runs through the mulberries,

I'm at the window of the prison infirmary.


I can't smell the medicines--

carnations must be blooming nearby.


It's this way:

being captured is beside the point,

the point is not to surrender.