স্বরবর্ণ
সৃজনের মৌলিক স্বর
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
প্রসঙ্গঃ স্বরবর্ণ
ধারাবাহিক রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনি * প্রভাত ভট্টাচার্য
প্রভাত ভট্টাচার্য
পর্ব * ৯
প্রস্তুতি
তারপর তার মনে এক পরিবর্তন আসে। সে ভাবে যে তাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এমন কিছু করবে যাতে সবার ওপরে আধিপত্য বিস্তার করা যায়। কিন্ত তার ক্ষমতাই বা কতটুকু।
কিন্ত হঠাৎ করেই অবস্থার পরিবর্তন হল। তার এক নিঃসন্তান কাকা, যিনি ছিলেন একজন বৈজ্ঞানিক, মারা যাবার আগে তার সমস্ত সম্পত্তি অজয়ের নামে লিখে দিয়ে যান। কলকাতার বাড়ি ছাড়াও নির্জন জায়গায় এই বাড়ি ,ল্যাবরেটরি এবং কিছু টাকা পেয়ে গেল সে। এর ফলে অবস্থা ফিরে গেল তার। সে সেই টাকা দিয়ে ব্যাবসা শুরু করল। আর দারুণ সফল হল সেই ব্যাবসা । হাতে প্রচুর টাকা চলে এল তার।
কিন্ত তার লক্ষ্য তো অন্য। তার মনের বাসনা সকলের ওপরে আধিপত্য বিস্তার করা। কাকার কাজ ছিল রোবট নিয়ে, আর বেশ কয়েকটা রোবটও ছিল তার ল্যাবরেটরিতে। একদিন ঘটনাচক্রে যোগাযোগ হয়ে যায় রবিনসনের সঙ্গে, যার রোবট এবং বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে ভালোই দখল আছে। তাকে এখানে নিযুক্ত করে সে। শার্দুলের সঙ্গেও একইভাবে পরিচয় হয় আর সে তার বিশ্বস্ত অনুচর হয়ে দাঁড়ায়। তারপর তার ব্যাবসা গুটিয়ে সবকিছু নিয়ে সে এখানে চলে আসে আর পরিকল্পনা করতে থাকে ভবিষ্যতের জন্য। তার উদ্দেশ্য সফল করার জন্য প্রয়োজন কিছু লোকজন নিয়ে এক বাহিনী তৈরি করবার। সে হবে সকলের রাজা। বাকিরা তার প্রজা । সে হুকুম চালাবে সকলের ওপরে।
সেই উদ্দেশ্যে সে বিজ্ঞাপন দিল এবং লোকজন চলেও এল অনেকে। আর কদিন পরেই শুরু হবে অ্যাকশন। তারপর তার রাজত্ব ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকবে । ঠিক পথেই এগোচ্ছে সে। আর আজ তো রাজ্যাভিষেক হয়েই গেল। তবে জঙ্গলের এই অদ্ভুত জীবটা একটু ভাবনার বিষয়। যাকগে, ও কোন ব্যাপার নয়। আর এই পাগল বিজ্ঞানীর অভিনব অস্ত্র তো দারুন।
অজয়ের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
এদিকে অতীশ পুরোদমে কাজ করে চলেছে ল্যাবরেটরিতে। সুমিতকে থাকতে হচ্ছে তার সঙ্গে। সে খানিকটা অধৈর্য্য হয়ে পড়েছে।
আমার কাজটা কি এখানে? বলে উঠল সে।
অত ছটফট করো কেন। সময় হলেই সব জানতে পারবে। হাসিমুখে বলল অতীশ।
সুমিত চুপ করে গেল। এখন সে খানিকটা খাতির করছে অতীশকে, কারণ সে দেখেছে যে অজয় বেশ পাত্তা দিচ্ছে অতীশকে। মনে হচ্ছে পাগল হলেও এ বেশ ট্যালেন্টেড ।
সেদিন অজয় ল্যাবে এসে অতীশকে বলল, কাজ কতদূর এগোলো?
প্রায় শেষ। আর দুদিনেই সবকিছু তৈরি হয়ে যাবে।
সত্যিই আপনি জিনিয়াস। এবারে আমরা পূর্ণ উদ্যমে কাজ শুরু করবো ।
এদিকে বাবলু, আবদুল আর রমেশ আলোচনা করছে নিজেদের মধ্যে ।
দু একদিনের মধ্যেই কিছু একটা হতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। আবদুল বলল।
কিন্ত আমরা এই কজন মিলে কিই বা করতে পারি। পুরোটাই মনে হচ্ছে পাগলামি । আর এদের পাল্লায় পড়ে আমরা ফেঁসে গেলাম। বলল রমেশ।
একটু অ্যাকশন হলে তো ভালোই লাগে। বাবলু বলে উঠল।
দেখা যাক। এখন ঘরে যাই। সেই শার্দুলটা আবার কখন চলে এসে ধমক দেবে।
ওরা যে যার ঘরে চলে গেল।
অজয়ের তো পুরো পরিকল্পনা করাই আছে।প্রথমে আশপাশের অঞ্চল, পরে অন্যান্য জায়গা দখল করা হবে। যারা বশ্যতা স্বীকার করবে না, তাদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা করতে হবে। আস্তে আস্তে বাড়বে তার রাজত্বের বিস্তৃতি, বাড়বে লোকলস্কর ,আর সে হয়ে উঠবে অপ্রতিরোধ্য সম্রাট। রোবটেরা তো আছেই, আর রয়েছে পাগল বিজ্ঞানীর অভিনব অস্ত্র। রয়েছে অনুগত লোকজনও ।
এইসব ভেবে তার মনে বেশ একটা খুশি খুশি ভাব এল।
আগামী পর্বে
************************************"**************************************************************
উপন্যাস * দীপংকর রায়
কথা দিয়েছিলাম হেমন্তের নিয়রে
পর্ব * ২২
দীপংকর রায়

একেক সময় একেক জনের কাছ থেকে একেকটি গ্রন্থের নাম শুনি আর সেই নামের তালিকা মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলি, ব্রজদাকে দিয়ে দিও তো মা….
মা তার অফিসের সেই মানুষটির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ও ব্রজদা, দ্যাখেন তো ছেলে আবার কোন
কোন তালিকা পাঠিয়েছে?
সেইসব তালিকা হাতে পেয়ে ব্রজদা বলে, দিদি, আপনার ছেলে তো কিছুই বাদ রাখছে না দেখছি, ও আসলে কী করতে চায় তাই বলুন তো?
মা বলে, তা তো জানি না ব্রজদা! তার কাজই হচ্ছে এসব নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকা;
তাতে সেও বলে, না না, সে ভালো, তবে এমন সব বই এই বয়েসে পড়তে চাইছে কেন সেটাই ভাবছি, এছাড়া একেকবার ভাবছি, আসলে এর উদ্দেশ্যটা কী? সেটা কি নিতান্তই ভালোবাসা, না অন্য কোনো ভাবনাচিন্তা থেকে? তাই ভাবছি, একদিন ওর সঙ্গে কথা বলবো, ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে দিদি, বলবেন তো একদিন আসতে; আসুক না, আসাতে তো কোনো সমস্যা নেই! ওর সঙ্গে একটু কথা বলবো;
মা সবটাই বাড়িতে এসে বলে। তবে ব্রজদার সংশয় নিয়ে একটি কথারও কোনো সমাধানের ভেতর মা প্রবেশ করতে চায় না কখনোই। এই সমস্ততে তার সন্মতির কোনো অভাব কোনোদিনও খুঁজে পেয়েছি বলে মনে করি না। এসবে নির্দিধায় তাঁর প্রশ্রয় পেয়েছি বরাবরই নিঃশব্দে। অনুভব করেছি, মা হয়তো আমার এই চলার পথকে সমর্থনই করে। আর তা যদি না করতো তাহলে এত অর্থাভাবের ভেতর, এই সামান্য কটি টাকা উপার্জন থেকে ব্রজদাকে এতগুলি টাকা সে মাসে মাসে নির্দিধায় দিতে পারতো না কখনোই।
একেবারে ধারাবাহিক ভাবে ব্রজদার পাঠানো শরৎ রচনাবলীর একেক খন্ড হাতে পেলে সে দিনটা বেশ অন্যরকমের মনে হতো। সঙ্গে সঙ্গে অনুভবের ভেতর সকাল বেলার সব আলোরা যেন আহ্লাদে আটখানা হয়ে উল্লাস করে উঠতো একান্ত মনে, সে কথা আর কেউ টের না পেলেও নিজে অনুভব করতাম খুব ভালো করেই।
ইতিমধ্যে রচনাবলীগুলি শেষ হয়ে আসলো। সেটা চলতে চলতেই ব্রজদাকে দিয়ে আরো কত অন্য
বইও তো আনিয়ে নিয়েছি, সেও নির্দিধায় সংগ্রহ করে এনে দিয়েছে উপনিষদ থেকে আরম্ভ করে পুরানের কয়েকটি খন্ডও। সে যেমন আছে, তার মধ্যে বিবেকানন্দের যোগগুলিও রয়েছে। আবার সেগুলি দিতে না দিতেই হয়তো আবার বললাম, কোরান শরীফের কথাটিও। আবার হয়তো লিখে পাঠালাম, এ.টি দেবের ডিকশনারি, ইংরাজী বাংলা, বাংলা ইংরাজী অভিধানের কথাটিও। সমস্যা হচ্ছে বলে আঞ্চলিক ভাষার অভিধানের কথাটাও বলে দিলাম একদিন। বললাম, ব্রজদাকে বলে দেখো তো এইগুলি পাওয়া যায় নাকি?
আবার কিছুদিন যেতে না যেতে তাঁকে লিখে পাঠালাম, বাংলা অনুবাদে রাশিয়ান গ্রন্থগুলির কথা। ভস্তকের কী অসম্ভব প্রোডাকশন সে সব! তাতে মূল্য ও তো বেশি না! হাতে পেলে বড় ভালো লাগতো। তাই নিয়েই একেকটি দিন কেটে যায়…। সে কীই না এনে দেয়নি ব্রজদা; পুশকিন থেকে তলস্তয়, ম্যাক্সিম গোর্কি থেকে লেলিন কার্ল মার্ক্স, কী নেই! আবার সেগুলি হয়তো সব পড়াও হয় নি, তার মধ্যেই বললাম, জীবনানন্দের কাব্যগ্রন্থ গুলির কথা। বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে বোদলেয়ারের কথা। জঁ আর্তুর রেবোর কথা। ফরাসি লেখক শিল্পীদের কথা জানতে বেশ কিছুদিন পেয়ে বসেছে, সে একেবারে রিলকে থেকে রঁদা। এ ছাড়াও আরো অনেকেই ছিলেন তার বাইরে, এছাড়া তাঁর পছন্দ করে আনা দু’একজনের ভালো ভালো বইপত্রও পেয়েছি দু’একখানি। হয়তো লিখে পাঠালাম বাঙালি কবিদের এই সময়ের নির্বাচিত কবিতাগুলির সব নামধাম একসঙ্গে। হয়তো লিখে দিলাম, আধুনিক কাব্য পরিচয় নিয়ে কয়েকটি লেখকের নামও। এমনও হয়তো দেখা গেল, এই কেউ বললো, এই বইটা পড়েছো? ছন্দ নিয়ে কী সুন্দর লেখা! একবার পড়ে দেখো ছন্দ সম্মন্ধে একটা পরিস্কার ধারণা তেরি হয়ে যাবে। এরপর মাইকেল মধুসূদন থেকে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গুলি তো আছেই। তাছাড়াও হঠাৎ মনে হলো বা কারোর কাছে শুনতে পেলাম হয়তো, সুর বা রাগ রাগিনী গুলি নিয়ে একবার একটু পড়াশোনা করে দেখো। অমনি ছুটলাম, কোথায় পাওয়া যাবে সে সব?
প্রতিমাসে ব্রজদাকে এইভাবে একেকটি লিস্ট পাঠিয়ে দি, আর ব্রজদাও এক পরিশোধ না হতে হতেই আর এক সংগ্রহ করে এনে দিয়ে চলেছেন ধারাবাহিক ভাবে… একেক অধ্যায়ে, নির্দিধায়। কত টাকা পাওনা থাকলো তাঁর খাতায়, তার জন্যে তাঁর বই পৌঁছানোতে কোনো খামতি নেই। শুধু মাসটি পড়লে তিনি তাঁর কাঁধে ঝোলানো ঝোলা ব্যাগটির ভেতর থেকে একখানি বাঁধানো খাতা বের করে হিসাব লিখতে থাকেন কত কার কাছে পাওনা থাকলো। টাকা জমা করেন একেকজনের নামের তালিকা বের করে ।
তাঁর মতো এই ধরণের মানুষ না থাকলে কে এমনভাবে যা অর্ডার করা হয় অমনি সেটাই পৌঁছে দিত কয়েকদিনের মধ্যেই! সে না থাকলে কে আমার মতো মানুষের চাহিদা পূরণ করতো এইভাবে? একসঙ্গে নগদ টাকা দিয়ে কিনবার ক্ষমতা কি আমার মায়ের ছিলো?
ইদানীং বই-পত্রের খোঁজ পেয়ে যাই দেশ পত্রিকার সাপ্তাহিক সংখার ভেতর বিজ্ঞাপনের পাতা থেকে। সেখান থেকেই জানতে পাই অনেক প্রকাশকের নাম ধাম ঠিকানা বা বই-পত্রের খোঁজ-খবর অনেককিছুই। এক টাকা দিয়ে সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকা নিতেও যেন কত টানাটানির মধ্যে পড়তে হয়! তার সঙ্গে আবার যদি একেকদিন যুগান্তর আনন্দ বাজার বা বর্তমানের আরো দৈনিকগুলি নিতে যাই, তাহলেই আরো গ্যাঁড়াকল দেখা দিলো। ইদানীং আবার শুনছি কলেজস্ট্রিট নামেরই আর একটি পাক্ষিক না মাসিক পত্রিকা বের হবে নাকি!
কিন্তু তা তো হলো, নির্বিবাদে একের পরে এক বইপত্র তো নিয়ে যাচ্ছি, আমার জন্যে মাসে মাসে এতগুলি টাকা গুনতেও হয় মাকে; তাতে তো সংসার খরচাতেও একটু টান পড়ে? কোনো মাসে গোরুর দুধের উপার্যনের থেকে হয়তো কিছু মায়ের হাতে তুলে দিতে পারি, আবার কোনো মাসে কিছুই হয়তো পারি না। তখন মা হয়তো বোঝে কোথা থেকেই বা দেবে; কিন্তু ভাই ছাড়ে না, সে বলে, দাদার জন্যে তো মাসে মাসে এতগুলি টাকা ব্রজদাকে দিতে পারো, আর আমার বেলায় তো অষ্টরম্বা! যাকগে তা-না-হয় ছেড়েই দিলাম, তার বিনিময়ে আমার জন্যে তো কিছু আনতে পারো?
মা বলে, তুই দাদার মতো পড়াশোনা কর, তোর জন্যেও আনবো। স্কুলের পড়াতেই তো মন নেই, তার আবার দাদাকে নিয়ে বিচার করতে বসিস! তোর মাস্টার, স্কুল, বই-খাতা-পত্র এই সব নিয়ে— তারপর এটা চাই, ওটা চাই তো আছেই, কই, তা নিয়ে তো দাদা কিছু বলে না! তাহলে তোর মনে এত হিংসা কেন? কাজের বেলায় তো কিছুই না!
সেও ছাড়ে না, বলে, আমি তো ইস্কুলের পড়া পড়ি, ও ওসব কীসের পড়া পড়ে এতো? গাদা গুচ্ছেক বই মাসে মাসে তোমাকে দিয়ে নিয়ে আসে! কী হবে, ওই সব দিয়ে?
দেখতে পাই, মা তাতে একটুও আশ্চর্য হয় না। সে তার উত্তরে বলে, ও যাই করুক, তুই-ও ওর মতো দিনরাত পড়াশোনা নিয়ে থাক; তাহলে তুইও যা চাইবি তোকেও তাই এনে দেবো।
দিন যত যাচ্ছে ততোই দেখছি এরকম সব নানা রকম নতুন নতুন আগ্রাসী চিন্তাভাবনার থেকে সে ভীষণ ভাবে দিনদিন প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে উঠছে। স্কুল থেকে কোনোরকমে ঘরে ঢুকেই বইপত্রের ব্যাগটাকে বিছানার উপরে ফেলে দিয়েই ছুট লাগায় পাড়ায়। সে বাড়িতে আসতে না আসতেই দেখি একেকজন রাস্তার ওপর থেকে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে। এদের অনেককেই চিনে উঠতে পারি না। কোথায় তাদের বাড়িঘর তাও জানি না। বুঝি, এরা কেউই কাছেপিঠে থাকে না। ওরা যে এই পাড়ার ছেলেপেলে না সেটাও বুঝি। কারণ ওর এই পাড়ার বন্ধুবান্ধবদের আমি ইতিমধ্যেই চিনে ফেলেছি। তারা লেখাপড়া নিয়ে লেগে থাকে। আর এরা যারা, তাদের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় তারা কেউই লেখাপড়া করে না। এদের দেখলেই বোঝা যায়, এদের চেহারায় শৃংখলার ছাপ নেই কোনো। কেন জানি না, এদেরকে দেখে এবং খানিকটা বুঝেও এদের সম্পর্কে কোনো কথা বলি না কখনো।
দিন যত যাচ্ছে ততোই দেখতে পাচ্ছি ঘরে ফিরতে তার সন্ধ্যা উতরে যাচ্ছে। তারপর হয়তো হাতে-পায়ে এক হাঁটু কাদার দাগ নিয়েই বিছানায় গড়িয়ে পড়লো। আর উঠলো না। মা বাড়ি ফিরে ডাকাডাকি করার পর, তখন হয়তো উঠলো। সন্ধ্যাবেলায় একেকজন মাস্টাররা এসে তারা হয়তো আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ফিরে চলে গেল। সে নিতাইদা এলেও একই অবস্থা, আমি বাড়িতে না থাকলে কাজের দিদির হাতে চা-টা খেয়ে ফিরে চলে যায় সেও। আবার ডেকেডুকে উঠোতে পারলে তখন হয়তো কিছুক্ষণ পড়তে বসলো তার সঙ্গে। কিন্তু বৃদ্ধ হরির বাবা মেসোমশাই, তিনি আর সেটা পেরে ওঠেন না । সে নানাভাবে দুঃখ প্রকাশ করতে করতেই হয়তো চলে যায়। বলতে থাকেন, শুধুশুধু মাস গেলে পারিশ্রমিক নিতে ভালো লাগে নাকি কারোর! তুমিই বলো না মাসি? অর্থাৎ কাজের দিদিকে উদ্দেশ্য করে এই কথা বলেন তিনি।
এই জিনিস যতো দিন যাচ্ছে ততোই ঘটে চলেছে।
তাকে নিয়ে সবসময়ই চিন্তিত থাকতে হয়; ওর এই যে স্বাভাবিক জীবনযাপনের প্রতি একধরণের অবহেলা সেটা দেখেই। সবসময়ই একটা উৎকন্ঠা তৈরি হতে থাকে ভেতরে ভেতরে; এই বুঝি বাড়ি ফিরে কাজের দিদির ওপরে-না হম্বিতম্বি করে, এই দেও ওই দেও, এটা করে রাখলে না কেন? এরপর তো আছেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়া। পরের দিন স্কুলের পড়া তৈরি না করা। তার মানে, পরের দিন ইস্কুল কামাই করা। এবং তার পরের দিন খুব ভালো মানুষের মতো অনুরোধ করা সেই আমাকে, এই দাদা, আমাকে একটা দরখাস্ত লিখে দে না বানিয়ে-বুনিয়ে। এই পেটে ব্যথা বা জ্বর-মাথাব্যথা কিছু একটা বলে লিখে দিলেই হবে সেটা। না হলে ক্লাসে বসতে দেবে না-তো স্যারেরা। তাই মাকে দিয়ে সাদা কাগজে সই করিয়ে রেখে দেয় আগেভাগেই, তারপর আমার কাছে বায়না, কিছু একটা বলে-কয়ে-বানিয়ে লিখে দিতেই হবে সেই অনুপস্থিতি সংক্রান্ত দরখাস্তটি।
অনেক রকম ভাবে বোঝাতে চেষ্টা করি তখন। এটা তুই ঠিক করছিস না কিন্তু। প্রায়শই এই যে একটা মিথ্যা তোকে বলতে হচ্ছে, এটা কি ঠিক? আর এটা তো প্রতি সপ্তাহেই তুই লিখে নিয়ে জমা দিচ্ছিস স্কুলে; এটা কি ঠিক হচ্ছে, তুইই বল না? মাস্টার মশাইরা কি নির্বোধ? সবই বোঝেন তাঁরা, এটা জানবি কিন্তু! পরীক্ষার খাতায় কিন্তু এর প্রভাবটা বুঝতে পারবি। এর আগে তুই তো এমন ছিলি না? আর এইসব ছেলেপেলেরা কারা? কাদের সঙ্গে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াস তাই বল তো? আচ্ছা, তুই কি আলমারির কৌটো থেকে টাকাপয়সা নিয়ে নিস? সত্যি কথা বলবি কিন্তু?
এসব শুনে সে একেবারেই অস্বীকার করে বলে, আলমারির চাবি তো তোর হাতেই মা দিয়ে যায়; আমার হাতে তো দেয় না! তাহলে আমি কীভাবে ওখান থেকে টাকাপয়সা বের করে নেবো? কৌটোর কোনো খোঁজখবরই-তো আমি রাখি না! ভালো করে খোঁজখবর করে দেখ, কাউকে বিশ্বাস করবি না কিন্তু।
এইসব নিয়ে দিদির বাড়িতে মার সামনে যতোই আলোচনা করতে যাই, মা সে কথায় কোনো গুরুত্ব দিতে চায় না। যতোই বলি কদিন তুমি একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে লক্ষ্য করে দেখো ও কাদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে। কাদের এত টানাটানি ওকে নিয়ে? সেটা খেয়াল করে দেখো অন্তত; পরে হাতের বাইরে চলে না যায় সমস্তটা।
মা সেসব খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে কিছুতেই ভাবতে চায় না। চেঁচামেচি হইহল্লা করে একটুখানি, তারপর হয়তো বোঝাতে চেষ্টা করে দুই একবার একটু খানি, কিন্তু তার বেশি কিছুই না। তাতে সেও হয়তো দুই একদিন ঠিক সময় মতো বাড়িতে ফিরেও আসে সকাল সকাল, তারপর আবার সেই যে কে সেই অবস্থা। একইরকম ছন্দে ফিরে যায়। দশটা এগারোটা বাজিয়ে না হলে বাড়িতে ঢোকা আর হয় না। কোনো কোনোদিন এগারোটারও ওপারে চলে যায় ঘড়ির কাঁটা। আর সেইসব সময়গুলিতে কাজের দিদিও চিন্তায় পড়ে; কেবলই বলতে থাকে, ও দাদা, রাস্তায় একটু এগিয়ে যেয়ে একবার দেখো-না-কেন, মার আসতে এত দেরি হচ্ছে কেনো?
হাঁটতে হাঁটতে রাইফেল ক্লাব ছাড়িয়ে রাস্তায় যেয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, তার ফেরার পথের দিকে চেয়ে। বেশ কিছু সময় পরে হয়তো দেখতে পাই হনহন করে হেঁটে আসছে ঐ তো…
এরকম কত রাত্তির-যে কি রকম দুশ্চিন্তাতে কাটে আমাদের, তার ঠিক নেই। কাজের দিদিও ক্রমাগত তখন তাড়া দেওয়ার তালেই থাকে। নিরুপায় হয়ে হয়তো ঠান্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো যেয়ে, রাস্তায়। অন্যান্য ঋতুগুলিতেও-তো নানা প্রতিবন্ধকতা থাকে! কাজের দিদির নানা উৎকন্ঠা জনিত চিন্তাভাবনায় আমাকেও ব্যতিব্যস্ত হতেই হয়, এক সময় না এক সময়। মা যেমন তার এই ধারাবাহিকতা থেকে বেরোতে পারে না, তেমনই ভাইও দিনদিন একই নিয়মে সন্ধ্যা উতরিয়ে ঘরে ফিরে বিছানায় এসে এলিয়ে পড়ে। এরপর মা বাড়ি ফিরলে শুরু হয় তাকে ঘুম থেকে তোলার জন্যে ডাকাডাকি…
দিন যত যাচ্ছে ততই দেকছি এইসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা বাড়ছে। এই তো, এই কিছুদিন আগেও আমি আমার ভাবনাচিন্তার ভেতরেই মগ্ন থাকতে পারতাম বেশ! আর এখন, কিছুই আর করে উঠতে পারি না। কেবলই তাকে নিয়ে ভেতরে ভেতরে একটা উৎকন্ঠা! মানসিকভাবে ভীষণ পাছড়ে ফেলছে যেন। কেবল একটি কথাই ভাবছি, ও তো মূল ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো! ওর এই লাগামছাড়া ভাব, হিংসা আশ্রিত মনোভাব, কথায় কথায় টাকাপয়সার প্রয়োজন হয়ে পড়া। সে সেই কুড়ি পয়সার আবদার থেকে এখন একটাকা দুই টাকায় পৌঁছেছে। প্রায় দিনই মার অফিস যাবার সময় এইসব নিয়ে মার আঁচল ধরে টানাটানি করে। টাকা না পেলে চিৎকার চেঁচামেচি। এইসব নিয়ে প্রায় দিনই তার অফিস কামাই হয়ে যায়। তারপর হয়তো খানিকক্ষণ তাই নিয়ে হাহুতাশ চললো! এরপরে দেখা যায় মা হয়তো অফিস না যেয়ে দিদির বাড়ির দিকে রওনা দিলো। সারাদিন সেখানেই কাটালো। পরে আমার একটি কথাই মনে হয়েছে, এইসব ক্ষেত্রে মা অধৈর্য্য না হয়ে যদি তারপরও ওকে বোঝানোর জন্যে সেই দিনটি অন্তত ওকে দিতে চেষ্টা করতো, তাহলে হয়তো বা ফলাফল কিছুটা ভালো হলেও হতে পারত। সেও যেন তখনকার মতো ছেলের সঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচি বা হাহুতাশ করেই হাল ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো মেয়ের বাড়িতে। এই বিষয়টি নিয়ে মাও হয়তো ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না আগামী দিনগুলির কথাটা কিছুতেই। কিম্বা হয়তো পারছে, কিন্তু বিরক্তি তাকেও হতাশ করে তুলছে। এই জন্যেই এখানে ওখানে সময় কাটিয়ে এসব ভুলে থাকতে চাইছে সেও। আর এমনও হতে পারে, নিজের সঙ্গে নিজে অনেকটা লড়াই করে করে এখন অনেকটাই ক্লান্ত সে। তাই হয়তো ভবিতব্যের কাছে এইভাবে সবকিছু সমর্পণ করে সেও নির্লিপ্ত হয়ে থাকতে চাইছে এভাবেই।
এসব দেখে দেখে হতাশ হয়ে পড়ছি আমিও। মাকে একদিন সবটা বুঝিয়ে বলবার চেষ্টাও করি। সে তাতে বলে, আমি অনেক লড়াই করেছি রে বাবা, এবার তুই দেখ— আমি হেরে গেছি, এই সংসার সংসার করে নিজের কথা কখনো ভাবিনি। রাস্তার কলের জল খেয়ে দিনের পর দিন কেটেছে আমার। পেটে একটি দানাও দিতে পারিনি। এই কথাটা কে বুঝলো বল তো? অনেক করেছি, আর পারছি না। ক্লান্ত হয়ে গেছি। তাই যেখানে একটুখানি শান্তি পাই সেখানেই যেয়ে বসে থাকি। কী করবো আর বল? কেউ বুঝলো না। তোদের ঠাকুমা এক কাপড়ে বের করে দিলো ভাড়াবাড়িতে। তোর বাবার মৃত্যুর পরেই। ভাগ্যিস মায়ের কেনা এই জায়গাটুকু ছিলো, তাই মাথা গোঁজার একটুখানি আশ্রয় তৈরি করতে পেরেছি। তা না হলে খাসমহালে রুদ্র বাড়ির সেই দড়মার ঘরেই হয়তো ঝড় জলে আর বানের জলে ভাসতে হতো। কে বুঝতে চেষ্টা করলো বল সেইসব কষ্টের দিনগুলির কথা?
মার মুখে এইসব শুনে হয়তো অনেক কিছুই বলার ছিল, বলতেও পারতাম, কিন্তু না, বলিনি। সত্যিই তো, তার জীবনের সেইসব সত্যের কাছে মাথা নত হয়ে আসে সবসময়ই। কিন্তু সবটার জন্যই কি ঠাকুমা ও দাদু একা দায়ী? নাকি তারও প্রচন্ড স্বাধীনচেতা মনোভাব এক্ষেত্রে খানিকটা দায়ী? সে যাই হোক, ছাব্বিশ বছরে বিধবা হয়েছে সে। চাকরির জন্যে দুয়ারে দুয়ারে পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছে। দিনে জলছবির কারখানায় কাজ, রাতে নার্সিং। এই করে সমস্ত দিন পথে পথেই কাটিয়ে দিয়েছে। তাই আজ সে ক্লান্ত হবে না তো কী হবে? আজ যদি দাদু ঠাকুমা আমাদেরকে কাছছাড়া না করতো তাহলে অন্তত আমাদের জীবনও এমনভাবে অন্য খাতে বইতে পারতো নাকি? তাই মায়ের এইসব কথায় হাঁ করে তাকিয়ে শোনা ছাড়া সত্যিই কি কোনো উত্তর আছে আমার কাছেও? নিজেও কি সেই জায়গায় অপরাধি নই একটুও? সংসারের মূল ধারায় আমিও কি নিজেকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছি একটিবারও?
যে পথে অনিশ্চয়তা, সে পথেই তো আমিও ভেসে চলেছি। আমারও তো তার পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল। কই, আমিও কি পারছি সেভাবে? নাকি সেইভাবে পারার কোনো সম্ভাবনা দেখাতে পেরেছি কখনও? যেটুকু নিয়ে সে অন্তত একটুখানি নিশ্চিন্ত হতে পারে?
ইতিমধ্যে আরও দুটি পোষ্যকে এনে হাজির করেছে ভাই। তাদের মধ্যে একটি হলো সাদা ইঁদুর, আর একটি হলো মিশ্র জাতের কুকুর। তাদের অবস্থান হয়েছে ইলেকট্রিক মিটার ঘরের মধ্যে। এবার তাদের দেখভাল করো তোমরা। তবে সাদা ইঁদুরগুলি কদিন যেতে না যেতে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল সেটা বোঝা গেলো না কিছুই। কুকুরটি থাকলো। সাদা ইঁদুরগুলি যেতে না যেতে সেখানে এসে হাজির হলো আর একটি খরগোশ ছানা। তাকে সম্ভবত আনা হয়েছিলো গড়িয়ার হাট থেকে। তার জন্যে বাজার থেকে কফির পাতা সংগ্রহ করে আনা হতো। এবার সে আমার সামনের ফুলের বাগানের ভেতর চরে বেড়াতে লাগলো। কখনো কখনো সন্ধ্যাবেলা হলে কোথায় যে গাছগাছালির ফাঁকে লুকিয়ে পড়ে! আবার কখন নিজের ইচ্ছাতেই বেরিয়ে আসে, তার কিছুই বোঝা যায় না। সে এক অদ্ভুত খেলা তার। এই পর্বও চললো বেশ কিছুদিন। আমরা বাড়ির সকলেই বেশ একটা মায়ায় জড়িয়ে পড়লাম। তাকে দেখলে মনে হতো আরেক ঘটনা— সেটাও সেই ওই দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর যখন আমরা ওদেশে ফিরে গেছিলাম, তার কিছুদিন পরেই হয়তো হবে, ওদেশেই পাশের বাড়ির পুরোনো দালানের চোরাকুটুরির মধ্যে যে বেজির বাসা ছিলো দেখতে পেতাম, তার ভেতর থেকেই কিভাবে যেন একদিন টিপটিপে বৃষ্টির ভেতর একটি বেজির বাচ্চা কিভাবে যেন দলছুট হয়ে উঠোনের উপর একাকি ঘোরাঘুরি করছিলো দেখতে পেলাম। তাই দেখে আমিও কিছু না ভেবে, তাকে খপ করে চেপে ধরে বেশ কিছুদিনের ভেতরেই তাকে বেশ পোষ মানিয়ে নিয়ে তার সঙ্গে অদ্ভুত এক খেলায় মেতে উঠেছিলাম যেন খানিকটা নিভৃতে। কখনো কখনো তীর ধনুক বানিয়ে তাই নিয়েই তার সঙ্গে অদ্ভুত কতো খেলায় মেতে উঠতাম যে, তার আর কি বলবো! সে যেন এক তীরধনুকের জগতের ভেতর ফিরে যাওয়া! তারই এক ধরণের খেলা চলতো যেন তার সঙ্গে আমার। একেক সময় তাকেই তাক করে পাটকাঠির তীর ছুঁড়ে দিতাম তার দিকে! সে যেয়ে দিদিমার ব্যবসার জন্যে যে লাল চিনির বস্তা থাকতো সারি সারি, তার পাশে দুই একখানা মিল্ক পাওডারের বস্তাও দাঁড় করানো থাকতো, সেই বস্তার পেছনে যেয়েই লুকিয়ে পড়তো। কখনো কখনো মিল্ক পাউডার মেখে একেবারে হয়তো ভূত হয়ে বেরিয়ে আসতো সামনে। তাকে দেখে তখন কী মজাই না হতো! সে সবের গল্প আর কীই বা বলি?
সেই বেজির বাচ্চাটি যখন আরও একটু বড় হলো, তখনো তার এই লুকোচুরি করার অভ্যাসটা গেল না। দিদিমার ঘরে খাটের উপর যে ডাই করা পাটের গাঁটগুলি পাহাড়প্রমাণ উঁচু হয়ে পড়ে থাকতো, সে সেখানেও সেই পাটের গাঁটের উপর চড়ে বসতো। কিম্বা হয়তো আবারও খানিক গুঁড়ো দুধ মেখে সামনে এসে দাঁড়িয়ে যেত চুপচাপ বাবুটি হয়ে। বকাবকি করলে বুঝতে পারতো। তখন ক্ষেপেও যেত। ক্ষেপে গিয়ে ক্যাঁচর ম্যাচর করতো। ডাকতো কখনো ক্রে.. ক্রে.. ক্রে… ক্রে… করে। একেবারে অতিষ্ট করে তুলতো ডেকে ডেকে । ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিতাম তখন। এবং চুপ করে যেত তখনই। কীভাবে যেন বুঝতো সেই ধমক। অভিমান দেখাতো নানা ধরণের হাবভাব দেখিয়ে। বোঝাতো যেন, তোমার রাগই আমি দেখবো শুধু? আমার রাগ দেখবে না কেন একটুও? আমাকেই শুনতে হবে শুধু তোমার রাগ? বলতো যেন, আমি বেজির বাচ্চা না হয়ে মানুষের বাচ্চা যদি হতাম? তাহলে তো কেঁদে কেঁদেই একসার করতাম! তখন কী করতে বাছাধন?
এরকম কতো যে কথোপকথন চলতো তার সঙ্গে! তারপর একদিন কোথায় যে বেপাত্তা হয়ে গেলো সে! কোথাও খুঁজে পেলাম না আর! ভীষণ মনমরা হয়ে থাকলাম বেশ কিছুদিন। কদিন খাওয়াদাওয়াও বন্ধ হবার দশা হলো। সব সময় মনে পড়তো তার কথাই শুধু। বহু খোঁজাখুঁজি করে একসময় খোঁজাখুঁজি বন্ধ করে দিলাম। মনে মনে ভাবলাম হয়তো ও ওর জাত ভাইদের সঙ্গেই কোথাও চলে গেছে। যদিও সেটাও তো হবার নয়! ওরা একবার দলছুট হয়ে মানুষের সঙ্গে থাকলে আর গ্রহণ করে না তাকে তাদের মধ্যে কোনোভাবেই। তারপরও এ বাগান ও বাগান কত চেয়ে চেয়ে দেখা! সেই যে সে— কখনো কখনো বাগানে চলে যেতো। আবার একসময় ফিরে আসতো নিজে নিজেই। তাই ওর সেই বাগানের থেকে ফিরে আসবার নির্দিষ্ট পথের দিকগুলির দিকে চেয়ে থাকতাম, যদি কখনো হুস করে বেরিয়ে আসে! কিন্তু না। আর কোথাও তার কোনো খোঁজ পাওয়া গেলো না। শেষে বেশ কিছুদিন পরে পাটের ব্যাপারিরা পাট কিনতে এলে, তারা যখন এক এক করে পাটের গাঁট বাইরে বের করে আনছে উঠানের ওপর হন্দরের মাপ দিতে, পাল্লায় তুলছে একে একে, তখন তারাই পাটের গাঁটের ভেতর থেকে তার শুটকে যাওয়া শরীরটা বের করে আনলো পাটের গাঁটের খাঁজের ভেতর থেকে। একেবারে শুটকে চেপ্টা হয়ে পড়েছিলো সেখানে। তারাই তাকে বের করে আনলো বাইরে। মনে মনে ভাবলাম, ঘরের ভেতরে এভাবে মরে পড়ে থাকলো অথচ তার দেহে পচন ধরলো না একটুও কেন! আমরা কেউ কখনো কোনো গন্ধ পেলাম না তো এতদিনেও? সেটা কী করে সম্ভব!
শেষপর্যন্ত তার সৎকার কার্য ঘাটের বাগানের একটি কোণেই সবকিছু একেবারে মানবিক নিয়ম মেনেই সারা হলো। এবং সেই থেকে একেবারে নিজের কাছে নিজে শপথ নিলাম এই বলে, আর কোনোদিন কোনো জীবজন্তুকে পোষ মানাবার চেষ্টা করতে যাবো না।
এতদিন পরে আবারও কি সেই মোহজালে পড়ে ছটফট করতে যাবো নাকি? এই খরগোশ ও কুকুরটির সঙ্গে কেন জানি আবারও জড়িয়ে যাচ্ছিলাম যেন। এবং সেই জন্যেই হয়তো মনে পড়লো, কোন্ সে দূর অতীতের কথা— সে যেন আজও বলে চলেছে, এত দুর্বল মনের মানুষ তুমি? এতো প্রেম তোমার জীবনের জন্যে? খবরদার আর কখনো মুগ্ধ হতে যেয়ো না কিছুতেই।
এইভাবে এখন এখানেও এই এক পর্ব শুরু হয়েছে। আর কোনো দিকে এখন বিশেষ মন নেই। মাঝে একটি চন্দনা পাখির বাচ্চাও এনে হাজির করেছিল সে। কিন্তু সে যাত্রায় তাকে অন্য কাউকে দিয়ে দেবার একটা ব্যবস্থা করতে তাকে বাধ্য করা হলো অনেক চিৎকার চেঁচামেচি করে। কাজের দিদি কিম্বা বিষনি ভাই দুজনের সকলেরই ইদানীং এইসব বাড়তি ঝামেলাতে সায় নেই। তাই তারাও সোরগোল তুললো। বিশেষ করে কাজের দিদি তো ঘোর বিরোধীতা করলো। কারণ ভাইয়ের সঙ্গে তার বনিবনা নেই একটুও। কাজের দিদির নাকি আমার প্রতি বেশি পক্ষপাতিত্ব দোষ আছে। সে তাকে সহোযোগিতা করে না একটুও। এবং এই জন্যেই নাকি সে তার নানা দোষ খুঁজে বের করে সবসময়।
বিষয়টা নিয়ে একটুখানি লক্ষ করলেই বোঝা যায় যদিও, কাজের দিদি একজন পরের ঘরের মানুষ, সে হয়তো পেটের দায়ে কিম্বা আশ্রয়হীনতার কারণে, যে জন্যেই হোক, মানুষের বাড়িতে কাজের জন্যে এসেছে, আজ বেশ কয়েক বছর তো সে এই সংসারেই রয়েছে। এই সংসারের প্রতি তার একটা একাত্মতাও তৈরি হয়েছে। এই সংসারের মানুষজনের সবকিছুর প্রতিই। এবং সেটাই স্বাভাবিক। সেই জন্যেই হয়তো তার নিজের অবস্থানের কথাটা ভুলে যায় সে কখনো কখনো। কিন্তু তাকে যদি কথায় কথায় সেই কথাটাই স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, এই বাড়িতে তার জায়গাটা ঠিক কোনখানে, তাহলে তো তার কষ্ট হবেই। সে তো সবটা বুঝতে পেরেই এইসব নানা অহেতুক কাজকর্মে বাধা দেয়। সে বুঝতে পারছে, কীভাবে একটি ছেলে নানারকম ভাবে ভেসে যাচ্ছে। টাকা পয়সা সরিয়ে ফেলছে, তার দায়ও খানিকটা তো তার ওপরেও পড়তে পারতো! এরপর আরও নানা অনিয়ম তো আছেই। অসময়ে বাড়িতে ফিরেই খাওয়াদাওয়া রান্নাবান্না নিয়েও হুজ্জতি করা, স্নানের জল তুলে রাখার পরেও তাতে নানা রকমের ত্রুটির কথা বলে তার ওপরে নানা চিৎকার চেঁচামেচি, গালিগালাজ করা তো প্রতিদিনের ঘটনা। সেসব ভুলে সবটা করে দিয়েও নানা দোষে দোষী হয় সে। কিন্তু তারও তো একটা বয়স হয়েছে। তারও তো একটা অভিজ্ঞতা আছে। সেও তো বুঝতে পারছে দিনের পর দিন তার এই অধঃপতনের কারণগুলো। তাই হয়তো চুপ করে থাকতে পারে না কখনো। সেই কারণে শত্রু হয়ে যায় সে। ভালোমানুষ থাকতে পারে না। পক্ষপাতিত্ব দোষে দোষী হয়ে যায়!
এই যে নানা জীবজন্তু যোগাড় করে আনছে অথচ তাদের দেখাশোনার বেলায় অন্যদেরকেই সেটা করতে হচ্ছে। কুকুরের জন্যে মাংসের ছাঁট জ্বাল দিতে হচ্ছে, কয়লার উনুনে কাটকুটো জ্বেলে শেষ আঁচে সেটাকে বসিয়ে দিতে হচ্ছে সেই কাজের দিদিকেই, তা না হলে আমাকে। এর পর থাকে কুকুরটিকে স্নান করানো, পায়খানা পেচ্ছাপ করাতে বাইরে নিয়ে যাওয়া, সময় মতো না নিয়ে গেলে সে হয়তো বারান্দার ওপরেই করে ফেলবে; তখন তার সেই মলমূত্র ধোয়াধুয়ি করা সেও তো তাকেই করতে হয়। কে করবে আর? এই নিয়ে সময়ে অসময়ে কাজের দিদির ধৈর্যচূতি হলে তখন হয়তো তার মুখ দিয়ে বেফাঁস কিছু কথা বের হয়ে গেল, তখন ভাই-এর মনে ভৃত্য মালিকের অবস্থান নিয়ে বাকবিতন্ডা শুরু হয়ে যায়। দিশাহীন হয়ে পড়ি সে সময় আমি। চেষ্টা করি সেইসব নিজের হাতে পরিষ্কার করতে। আপাতভাবে অন্তত সেই পরিস্থিতিটা যাতে সামলে যায়।
সে তো গেল। ইতিমধ্যে আর একটি আশ্চর্য ধরণের এক ফাঁদ তৈরি করে ফেলেছে সে। তাই দিয়ে সামনের বাড়ির মাসিমাদের ছাদের ওপরে যে ছায়া পড়ে বাড়ির পাশের ঝাউজঙ্গলের, সেইখানে সে ফাঁদ পাতে টিয়া পাখি ধরবার জন্যে। ঝাউগাছের ওপরে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া পাখির ওড়াউড়ি। কীভাবে যেন তাদের ভেতর থেকে কেউ কেউ তার ঐ পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেই আটকে যায়। দড়ি দিয়ে বানানো সেই ফাঁদ পেতে দিয়ে সে মাসিমাদের ছাদের সিঁড়ি ঘরে চুপ করে বসে থেকে লক্ষ্য রাখে কখন টিয়াপাখিগুলি তার পাতা ফাঁদে পা দেয়। ধরা পড়লে এবার তাদের সে খাঁচায় পোরে। পাড়াতেও চাউর হয়ে গেছে তার এই বিশেষ কীর্তির কথা। এবার সে সেই টিয়াপাখিগুলি একে একে কুড়ি, পঁচিশ, পঞ্চাশ, একশো যা পায় তাতেই বেঁচে দেয়।
বিষয়টি প্রথম দিন দেখেই তাকে এই কাজ থেকে বিরত হতে বললেও সে কোনো গুরুত্বই দিতে চায় না। এবং বলে, থাম তো তোর যত যুধিষ্ঠিরপণা। মানুষজন তো ওদের খাইয়ে পরিয়ে আগলে রাখবে বলে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি? না হলে ওরা গাছে গাছে ঘুরে কীই বা এমন কিছু পায় তাই বল তো? তার চাইতে আমি তো ওদের একটা নতুন জীবন দিচ্ছি! খাবে আর কথা বলা শিখবে। এই তো কাজ? তা তোর ভালো লাগছে না কেন তাতে? যা তো, এইসব ধর্মজ্ঞান দিস না আমায়। আমি অনেক পুণ্যের কাজ করছি জেনে রাখিস।
বললাম, বুড়ো পাখি কি আর কথা বলবে! ছোটো বাচ্চা হলে হয়তো মানুষজনের কাছে থাকতে থাকতে মানুষের কিছু বুলি আউড়ালেও আউড়াতে পারে।
সে তাতে বলে, না না, বলবে। যাক গে, ওইসব নিয়ে তোর ভাবার দরকার নেই এতো!
তারপরও তাকে দু’ এক কথা বলে বোঝাতে চাইলাম, যদি বোঝে। বললাম, দেখিস একদিন ওরা আর তোর এই ফাঁদে ধরা দেবে না; যখন ওরা বুঝে যাবে বিষয়টা। মানুষজনও তেমনই— যখন দেখবে, পাখি আর কথা বলছে না, তখন তারাও আর নেবে না।
তবুও বেশ কিছুদিন চললো। যতদিন পাখিগুলির বুঝতে সময় লাগলো। একদিন সত্যি সত্যিই আর একটি পাখিও সেই ফাঁদে পা দিতে নেমে এলো না সেই ফাঁকা ছাদের ওপর। তখন সে ক্লান্ত হয়ে নেমে এলো মাসিমাদের ছাদের ওপর থেকে একদিন দেখতে পেলাম। আমার দিকে চেয়ে ঠোঁট উল্টিয়ে বললো, না রে, তোর কথাই ঠিক হলো, ব্যাটারা টের পেয়ে গেছে, বুঝলি! বহুত চালাক হয়ে গেছে! আর হবে না রে। বাদ দিতেই হলো শেষ পর্যন্ত।
কী আর বলবো! কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর চোখটা নামিয়ে নিয়ে বই-এর পাতার দিকে মন দিতে চেষ্টা করলাম।
বেশ কিছুদিন তার এইসব ক্রিয়া কর্মের দিকে আর নজর দিই না সেভাবে। যদিও তার এইসব কাজে প্রশ্রয় দেবার মত মানুষজনেরও অভাব নেই। পাড়ার অনেকেই আছে সেই দলে। এই পক্ষপাতিত্ব একটি ছেলের জীবনটা যে কত দূর নিয়ে যেতে পারে তাই নিয়ে তাদের তো আর ভাবনার কিছু নেই!
নানাভাবে আমিও যেন কীভাবে কীভাবে সংসার থেকে নিজেকে এবারে একটুখানি আলাদা করে ফেলছি দিনদিন। সংসারের আর পাঁচ রকমের সমস্যা থেকে কেমনভাবে যেন নিজের কর্তব্য কর্মটুকু ছাড়া অন্য সব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি। বুঝিয়ে দিতে চাইছি যেন এইটুকু আমার, এর বাইরে যা কিছু সব তোমাদের। আমার ভাবনা বাড়াবার নেই আর এতকিছু নিয়ে।
প্রতিদিন তাকে নিয়ে এইসব দেখতে থাকা, এটা যত দিন যাচ্ছে ততই বেড়ে চলেছে। প্রাইভেট মাস্টাররা এসে প্রতিদিন একজন না একজন ঘুরে চলে যান। তাঁরা ফিরে যাবার সময় নানাভাবে দুঃখ প্রকাশ করতে করতে চলে যান। মা যেন এসব জেনেশুনেও তাকে কঠিন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে যেটুকু শক্ত হওয়া প্রয়োজন, সেটা হতে পারছে না। সে মনে করছে আজ যা হলো তা হলো, আগামীকাল হয়তো আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু তা তো হয়ই না, বরং দিন যত যায় আরো জটিল থেকে জটিলতর হয় বিষয়টি। একদিকে কাজের দিদির বিরক্তি, মা বাড়ি ফিরলে প্রতিদিন একটা না একটা নালিশ, এই হয়েছে, ওই হয়েছে, এইসব।
সেসব শুনে মাকেও তার কোনো প্রতিকারের উপায় বের করতে দেখি না। দেখি না সেরকম কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে। সেখানে তার অপত্য স্নেহের কাছে সবটাই বিবশ হয়ে পড়ে।
সমস্ত পরিস্থিতিটা নিয়ে দিদির বাড়িতে আলোচনা হয় সকলে মিলে। কিন্তু সমাধানের পথ আবিষ্কার করা যায় না। বরং তাকে কিছু হাত খরচের বরাদ্দ করিয়ে দেওয়া হয়। সেই আবদার নিয়েই ক’দিন অশান্তি চলছিলো যখন। এছাড়া স্কুলের নাম করে টাকা পয়সা তো একরকম প্রায়শই নেয় সে। কিন্তু তাতেও হচ্ছে না ইদানিং। মূলত তার একটিই দাবি, আমাকে মাসে মাসে কিছু হাত খরচা দিতে হবে। কিন্তু কেন, কেন এই প্রয়োজন এত তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে উঠলো তার! সে কথা কিন্তু কেউ জিজ্ঞাসা করছে না তাকে। যদিও তার উত্তরও হয়তো তৈরিই থাকতো তার কাছে। কারণ দিন যত যাচ্ছে ততোই এই জিনিসটি অন্তত পরিষ্কার হয়ে উঠছে আমার কাছে, কারণ ও যা কিছু আবদার করছে, এবং সেটা না মানলে তাই নিয়ে যেরকম চিৎকার চেঁচামেচি করছে, সেগুলি করার কৌশল বা পদ্ধতির ভাষা বা বলার ধরণ ধারণ দেখে মনে হয় না সেগুলি সবটা ওর নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত।
পরিস্থিতির অভিমুখ যেভাবে প্রতিদিন বিভ্রান্ত করে তুলছে, তাতে ভীষণ ভাবে মনে পড়ছে, যেবারে সেই ওদেশ থেকে এ দেশে চলে আসার জন্যে কমলেশ চক্রবর্তীর সঙ্গে চেষ্টা করে আবার ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম, সেই সময় দিদিমার আমাকে নিয়ে বিশেষ একটি উপলব্ধির কথাগুলি। সেগুলি ছিল এরকমই— ওকে বোঝাও ঠাকুরদা, ও ওই দেশে ফিরে যেয়ে আর পারবে না। ও আর ওখানের মতো কিছুই নেই! ও যে এই দেশের জল হাওয়ায় গড়ে উঠেছে… সে কথা ও ভুলে যায় কেন যে, সেটাই ভাবি! আমার এই কথাটা মিলিয়ে নিও একদিন, ওরও মনে পড়বে আমার এই কথাগুলি। একদিন ওকেও বুঝতি বাধ্য হতিই হবে, ওর এই সিদ্ধান্ত কতটা ভুল ছিল। সেদিন কিন্তু সে সব বুঝতি পেরেও কোনো লাভ হবে নানে জেনো। কারণ সেদিন আর ফিরে আসতি পারার কোনো পথ থাকবেনানে ওর কাছে। তার চেয়ে এখনো ভালো চায় তো ওরে বুঝতি কও, আমার কথাডা। ওরে আমি ও দেশে যাতি দিতি চাচ্ছি নে, তা না। কিন্তু ওর এই একেবারের জন্যে ফিরে যাওয়াটা মাইনে নিতি পারতিছি নে আমি কিছুতিই। ঠিক আছে ও যাক না, পাসপোর্ট ভিসা করে। বেড়ায়ে আসুক গে, কিডা মানা করতিসে তারে? কিন্তু ওখানে থাকে যাবার চিন্তা যেন না করতি কও তাকে। তারপরেও যদি ও যাতি চায়, তাহলি কবো, একদিন এই অধমের কথাটা মনে পড়বে। সমস্ত জীবন ধরে মনে পড়বে— আমি নিষেধ করিছিলাম যে ওদেশে একেবারে চলে যাতি তারে ।
সত্যি সত্যিই সে কথাগুলি আজ বড় মনে পড়ছে। তখন গুমরে থাকছি। কোনোভাবেই কোনো একটি দিককে খুঁজে পাই না। বারবার ভাবছি, কীভাবে, এই অবস্থা থেকে সবকিছুকে রক্ষা করা যায়? পরমুহূর্তেই ভাবি, এত ভার আমি নিচ্ছিই বা কেন! একে তো নিজের জীবনের এই দুর্গমতা। সেই নিয়েই দিশাহীন হয়ে থাকি মাঝে মাঝেই। যদিও কিছুক্ষণ পরেই ওসব ভুলে যাই সবকিছুই। ভুল হয়তো সঙ্গ দেয় বলেই তালবেতাল হই না! তা না হলে কি যে হতো, সেও কি জানি! ভেতরে ভেতরে এত তড়িৎ গতি চলে যে; সেকি সামলাতে পারতাম? সে তো সামলায় ওই ভুলই!
*************************************************************************
অণুগল্প * প্রদীপ কুমার দে
গল্প * দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
জীবন জারণ
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
এই পাথরটার ওপর বসলে কেমন যেন পূর্ণ পূর্ণ মনে হয় নিজেকে অনুভবের। ফাঁকা হৃদয় যেন আপন ছন্দে ভরে ওঠে। চারিদিক হাতড়ে বুকের ঝোলায় ভরে নিতে চায় সবকিছু।পাথরটার ওপর বসলেই কেমন এক চেনা আপনপন। মনে হয় যেন মায়ের কোলের ওপর বসলাম। মায়ের শরীরের চেনা গন্ধটা ফিরে আসে ওর বৃত্তে।এই সময়টায় এদিকে কেউ আসেনা সচরাচর।উৎসাহী দু একজন পর্যটক অথবা একটু প্রয়োজনের আড়াল খুঁজতে থাকা প্রেমিক যুগল। তখন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে অনুভব। ওরা লজ্জা পায় প্রথমে।তারপর নিজেরাই একান্ত বলয় বানিয়ে আনন্দ অভিসারে নামে।অনুভব ভাবে তখন,এই মুহূর্তগুলোতেই হয়তো বাঁচতে হবে একসময় ওদের জীবন অনুভবে।কারণ বারবার একই ভোগ পরের দিকে সেই সন্তুষ্টি আর দেয় না।এটা অর্থনীতির পরিভাষায় ' ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি' । দাম্পত্যের ক্ষেত্রেও অনেক সময় তাই ঘটে।প্রথম দিকের সুখ উধাও হলেও অনেক সময় টেনেহিঁচড়ে শেষ দাঁড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া।এ এক ট্রাজেডি তখন ! মানুষ বলেই হয়তো টেনে যায় ইচ্ছের বিরুদ্ধে !*************************************************************************************
ছোটগল্প * কল্যাণ ভট্টাচার্য
প্রাগৈতিহাসিক মানুষ
কল্যাণ ভট্টাচার্য
যত দিন যাচ্ছে মনটা ভেঙে যাচ্ছে সজনীকান্তের। এবারও আশানুরূপ রেজাল্ট করতে পারল না ছেলেটা। বড়ো সংগ্রাম করে জীবনের পথে এগিয়ে যেতে হয়েছে সজনীকান্তকে। নিজে সারা জীবন ধরে চেষ্টা করেও একটা চাকরি পাননি কিন্তু নিজেকে বা তাঁর পরিবারকে কখনোই বিপদের মুখে ফেলতে দেননি। আসলে বুঝতেই দেননি সংসার নামক যাঁতাকলটি তিনি কিভাবে ঠেলছেন। জীবন সংগ্রামে অনেক কষ্ট করেছেন কিন্তু পরিবারের স্ত্রী পুত্র কাউকে কোনো কষ্ট টেরও পেতে দেননি। নানা ফাইফরমাশ খেটে অর্থ উপার্জন করেছেন কিন্তু সুযোগ পেয়েও অসৎ পথে হাঁটেননি। কাল কিভাবে চলবে এমন পরিস্থিতি এলেও বাড়িতে এসে লাফিং বুদ্ধার মতো হাসিটা ঝুলিয়ে রেখেছেন বহুবার । কিন্তু তাঁর কষ্ট যন্ত্রণা কাউকে বুঝতেও দেননি। তাঁর কেবল একটাই লক্ষ্য ছেলেটা যেন একজন ভালো মানুষ হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়। সজনীকান্তের বড়ো ইচ্ছে ছেলেটা নিজের মেধায় যেন একজন বড়ো মাপের ডাক্তার হয়। সেজন্য তিনি সব সব করতে পারেন। ছেলের সব সখ আহ্লাদ বলার আগেই পূরণ করেন।
সজনীকান্ত দেখেছেন ছেলে সুজন যথেষ্ট বুদ্ধিমান। সেই প্রি-নার্সারি থেকে পড়াশোনায় অদ্ভুত অদ্ভুত বুদ্ধি বের করে তাক লাগিয়ে দিত সে। একবার হয়েছে কি ৮ ঘরের টেবিল মুখস্থ করানোর কিছুক্ষণ পরে ২০ ঘরের টেবিল একবার দেখেই সে না দেখে হুবহু খাতায় লিখে দেয়। সজনীকান্ত বিস্মিত হয়ে যান কি করে এটা সে পারল! জিজ্ঞেস করতেই সুজন সেই শিশু বয়সেই সজনীকান্তকে সব কৌশল বুঝিয়ে দেয়। এমন আরো কিছু কিছু বিষয়ে তার কৌশলী বুদ্ধির পরিচয়ে সজনীকান্ত চমকে যেতেন । ফলে তাঁর মনের মধ্যে বসে যায় যে এমন বুদ্ধিমান ছেলেকে তিনি তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে ডাক্তারী পড়াবেন। যতদিন গেছে বুদ্ধি সুজনের ক্ষুরধার হয়েছে কিন্তু অদ্ভুতভাবে উঁচু ক্লাসে গিয়ে রেজাল্ট ওর আশানুরূপ হয়নি। এই ভালো রেজাল্ট না হওয়ার পেছনের প্রেক্ষাপট কিছুটা হলেও জানেন সজনীকান্ত। ছেলে সুজনকে টানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাস। পাঠ্য বইয়ের বাইরের অনন্ত জ্ঞান ওকে দূরে নিক্ষেপ করে। ছেলেকে পড়াতে গিয়ে অনেকবারই দেখেছেন সজনীকান্ত সে পাঠ্য বইয়ের নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তরে সন্তুষ্ট না হয়ে লাইব্রেরী থেকে ওই বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ বই নিয়ে আরো গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। আবার কখনো কখনো ইন্টারনেটের সাহায্য নিয়ে ওই বিষয়ে ডিটেইলস জেনে নিচ্ছে। এমনকি স্কুলেও ক্লাস টিচারদেরকে কেন হলো, কিভাবে হলো ইত্যকার নানা প্রশ্নে জর্জরিত করায় তাঁরাও বিরক্ত প্রকাশ করে। তাঁরা সুজনের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারায় বাধ্য হয়ে গার্জেন কলও করেছেন। শিক্ষকরা সজনীকান্তকে এও জানিয়েছেন, সে কি ওই বিষয়ে গবেষণা করবে যে এমন প্রশ্নের উত্তর তার জানা চাইই! সজনীকান্তও বলে উঠেছিলেন সেসময়, নাহয় আপনারা একটু বিষয়ের গ্রাসরুটটা বুঝিয়েই দিলেন, তাতে তো কোনো ক্ষতি নেই! প্রত্যুত্তরে সেই শিক্ষক তাঁকে জানালেন, এতো সময় আমাদের নেই। শুধু আপনার ছেলেকে আমাদের পড়াতে হয়না, চল্লিশ জনের গোটা ক্লাসকে দেখতে হয়। তবে আপনার ছেলে যেভাবে চলছে তাতে সে ভালো রেজাল্ট কিছুতেই করতে পারবে না। আর বাস্তবিক হলোও তাই। সজনীকান্তের ছেলের এই গভীর অন্বেষার বিষয়টা ভালো লাগলেও ভালো রেজাল্টের ক্ষতির আশংকা থেকে সাবধানও করেছেন মাঝেমধ্যে। কিন্তু সুজন একইরকম তার অন্বেষার কাজ চালিয়ে গেছে। আর একইরকমভাবে ভালো রেজাল্টের বিষয়ে উদাসীন থেকে গেছে। সুজনের এই রেজাল্টের বিষয়ে উদাসীনতা সজনীকান্তকে চিন্তায় ফেলেছে। সজনীকান্ত ভালো রেজাল্টের কথা বললে সে বলে, খুব ভালো রেজাল্ট দিয়ে ভালো ছেলে বা ভালো মেয়ে হয় না বাবি। রেজাল্ট দিয়ে ভালো মন্দ বিচার করা যায় না। ভালো নম্বর একটা সংখ্যা মাত্র। আর যারা যেন তেন প্রকারেণ ফার্স্ট হওয়াটা প্র্যাক্টিস করে ফেলে তারা স্বার্থপর মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। তারা ভবিষ্যতে নিজেদের মেলে ধরতে খুব ভালো কেরিয়ার গড়বে কিন্তু মা বাবা বা কাউকে ভবিষ্যতে দেখবে না। সমাজের কথা তো ছেড়েই দাও।
ওর এসব যুক্তি শুনে থমকে গেছেন সজনীকান্ত। ভাবতেই পারছেন না এ ছেলে এমন ভাবনা পোষণ করলে কিভাবে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাবে। মনে মনে ভাবেন, আজো এই প্রথাগত শিক্ষা দিয়েই তো ছেলেমেয়েদের কেরিয়ার তৈরি হয়। তাই কেরিয়ারটা তো আগে গড়ে তুলতে হবে বাপু। কিন্তু এক অনিবার্য কারণে ছেলেকে কিছু বলে উঠতে পারেন না।
[২]
মাধ্যমিকে সুজন সাধারণভাবে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছে। কিন্তু ওর জ্ঞান বুদ্ধি অনুযায়ী একেবারেই সাধারণ। খুব আশা ছিল সজনীকান্তের ছেলেকে নিয়ে। কিন্তু জীবনের প্রথম বড়ো পরীক্ষাতেই হোঁচট খেল সুজন। এখনকার দিনে মাধ্যমিক পরীক্ষায় সাধারণভাবে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করাটা কোনো বড়ো বিষয় নয়। এই নম্বর নিয়ে সুজন কিভাবে ডাক্তারী পড়ার দিকে এগিয়ে যাবে! এই ভাবনা সজনীকান্তকে কুড়েকুড়ে খায়। নাহ,ছেলেটার সাথে একটু আলাদা করে বসতে হবে। কিন্তু কী বলবেন সজনীকান্ত? বলবেন, তুমি এবার থেকে শুধু পড়ার বইয়ের দিকে ফোকাস রাখো, জ্ঞানের গভীরে যাওয়ার জন্য পড়ার বইয়ের বাইরে কিছু পড়া বা জানার দরকার নেই? বলতে পারবেন একথা? বলাটা উচিত হবে? সজনীকান্ত দ্বন্দ্বে পড়ে যান, কী বলা উচিত হবে ছেলেকে?
এদিকে তাঁদের সীমান্তপল্লীর প্রায় সব ছেলে মেয়েরাই দারুণ দারুণ সব রেজাল্ট করেছে। সীমান্তপল্লীর ছেলে অপূর্বকে নিয়ে জৌলুস বেরিয়েছে। ও পুরো পশ্চিম বর্ধমান জেলা জুড়ে প্রথম হয়েছে। সেরা দশজনের মধ্যে আছে।
খবরটা সুজনই প্রথম দেয় ওর বাবা মাকে। বলে, আমার বন্ধু অপূর্ব জেলার ফার্স্ট বয় হয়েছে মা। চল ওকে একটু কনগ্র্যাচুলেশন করে আসি।
ওর মা বলে ওঠে, তুই কী রে! তোর নিজের রেজাল্ট কি হলো সে খবর নেই, চললি বন্ধুকে কনগ্র্যাচুলেশন জানাতে!
সজনীকান্ত স্ত্রী জয়াকে থামায়। বলে, ছেলের রেজাল্ট তো আমরা জেনে গেছি। পরের পরীক্ষায় ও দেখবে আরো ভালো রেজাল্ট করবে। ঠিক আছে তুমি এক প্যাকেট মিষ্টি কিনে ওর সাথে যাও।
সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে সুজন, বাবি, শুধু মিষ্টি? একটা ভালো গিফট দেবো না ?
এ ছেলেকে কি বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারেন না সজনীকান্ত। একটা প্রচ্ছন্ন হাসি লেগে থাকে সজনীকান্তের ঠোঁটে। বলেন, ঠিক আছে তোমার যা গিফট দেবার কিনে দিয়ে দিও।
সুজনের চোখে মুখে আনন্দ ঠেকরে বেরিয়ে আসে, চলো, চলো মা, তাড়াতাড়ি গিয়ে গিফটটা দিয়ে আসি। অপূর্ব খুব খুশি হবে।
সুজন আর তার মা জয়া এগুতেই দেখে এ বাড়ি ও বাড়ির মায়েরা ছেলেমেয়েদের গর্বে পাড়ার রাস্তার মুখেই জটলা পাকিয়েছে। ওই জটলা পেরিয়ে এগিয়ে যেতেই সুজনের এক বন্ধু গৌরবের মায়ের মুখোমুখি। প্রি-নার্সারি থেকে একই সাথে পড়ত ওরা। দুই মা দুই বাচ্চাকে নিয়েই একসময় ওদের স্কুলে যেত।
কি গো সুজনের মা, চললে কোথায় ? মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোলো কিন্তু তোমার ছেলের রেজাল্ট জানলাম না তো?
জয়া হাসে, তা তোমার ছেলেরও তো রেজাল্ট জানতে পারিনি গো!
গৌরবের মা বলে, আমার গৌরবের রেজাল্ট দেশসুদ্দু লোক জানে গো। এ লোকাবার জিনিস নয়। নাইন্টি ফাইভ পার্সেন্ট নম্বর পেয়েছে। আরেকটু হলে আমাদের পাড়ার অপূর্বকে ধরে নিতো। কপাল মন্দ! এবার তোমার ছেলের খবর বলো, সুজনও তো খুব বুদ্ধিমান ছেলে ছিল। ছোটবেলায় স্কুলে কত কম্পিটিশন হতো দুজনের মধ্যে।
সুজন বলে ওঠে, না না, আমাদের মধ্যে কোনো কম্পিটিশন হতো না গো কাকিমণি। গৌরব বরাবরই পড়াশোনায় ভালো ছিল।
তা বেশ বাপু। এবার তোমার রেজাল্টটা বলো দেখি।
জয়া দ্রুত বলে ওঠে, আমার ছেলেও খুব ভালোভাবে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছে।
তা কত পার্সেন্ট পেয়েছে বললে না তো?
ওই তোমার ছেলের মতোই। প্রায় নাইন্টি…
সুজন ওর মাকে থামিয়ে দ্রুত বলে ওঠে, না কাকিমণি, আমি সিক্সটি ফাইভ পার্সেন্ট নম্বর পেয়েছি।
আরো সব মহিলাদের মুখও এখন এদিকে। নিমেষে জয়ার চোখমুখ বিবর্ণ হয়ে যায়।
অপূর্বর মা বলে ওঠে, ছোটবেলায় তুই কত ভালো ছেলে ছিলিস! এতো কম নম্বর কি করে হলো রে?
আমি তো এখনো আগের মতোই আছি কাকিমণি!
না, এই কম্পিটিশনের বাজারে এতো কম নম্বরে কোথায় ভর্তি হবি, কি করে এগুবি! তোর বাবা বলছিলেন একদিন তোকে নাকি ডাক্তারি পড়াবেন। এখন কিভাবে…
এসব কথাবার্তায় জয়া একেবারে কুঁকড়ে যায়। বলে, আসি গো গৌরবের মা। পরে আবার দেখা হবে। বলেই এগোনোর জন্য পা বাড়াতে যায়। হাত ধরে থামায় ওকে গৌরবের মা। বলে, দুঃখ করোনা গো সুজনের মা। আরো বড়ো পরীক্ষা তো বাকি আছে। তখন দেখো… তবে এই মেনিমুখো টিচারগুলোও হয়েছে তেমনি। আমার গৌরবকে তো ওরাই একটু কম নম্বর দিয়ে অপূর্বর থেকে নিচে করে দিল। নাহলে আমার গৌরব ঠিক এক থেকে দশের মধ্যে থাকত। তোমার ছেলেকেও দ্যাখো ওরা…
এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল সুজন। এখন বলে উঠল, না কাকিমণি, টিচাররা আমাদের ঠিক নম্বরই দিয়েছেন।
সুজনের কথায় যেন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল গৌরবের মা। বলে, তোর কথা আমি বলতে পারবো না রে। তবে আমার গৌরবকে যে ওরা কম নম্বর দিয়ে অপূর্বর পেছনে ঠেলে দিয়েছে এটা আমি বলতে পারি। বলেই অন্যান্য মহিলাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় গৌরবের মা।
এবার ছেলে সুজনের হাত ধরে নিজের পথ ধরে জয়া। যেতে যেতেই বলে, কি দরকার তোর ওর সাথে মুখ লাগানো। দেখলি তো ছেলেকে নিয়ে ওর কত গর্ব! আর সব সত্যি কথা ওদের সামনে বলতেই হবে! তুই তো খুব ভালো নম্বর তুলে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করিসনি। বললামই যদি তোর জন্য একটু মিথ্যে কথা। তাতে কি মহামারি হয় শুনি!
না মা, যা সত্যি তাই তো বলা উচিত! মিথ্যে বললে তো আমি আমি থাকবো না! মিথ্যে আমি হয়ে যাবো। আমি যা তাই থাকতে চাই মা।
[৩]
ক্রমশ সজনীকান্ত ছেলে সুজনের সাধারণের পথে যাওয়ার দিকে চেয়ে থাকেন । সুজনের অসাধারণ বুদ্ধি জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও নিজেকে এভাবে সাধারণ থেকে অতিসাধারণ দিকে নিয়ে যাওয়াটা ওঁকে বিস্মিত করে তোলে। যেন অন্য এক বোধিজ্ঞানে লিপ্ত সে। মহান নয়, মহানুভবতাই যেন ওর লক্ষ্য। সজনীকান্ত ক্রমশ যেন তাঁর ছেলেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। হ্যাঁ, আরো সাধারণের দিকে সে এগিয়ে চলেছে। মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক থেকে একাউনটেন্সিতে অনার্স — সবেতেই ভালভাবে উত্তীর্ণ হলেও সে অসাধারণ কিছু করতে পারেনি। বাবা সজনীকান্ত চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক, সাইন্স নিয়ে পড়ুক। কিন্তু সুজন নিজেকে সাধারণ একজন ছাত্র হিসেবে কমার্স নিয়ে পড়েছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা এম.বি.এ. নয়, সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে সাধারণ চাকরি চেয়েছে। বাবা সজনীকান্ত তাকে টিচার্স ট্রেনিং করিয়েছেন এই অবধি। কোনো সরকারি চাকরি নয়, সাধারণ চাকরিতেই সে সন্তুষ্ট থেকেছে। ভালো সরকারি চাকরিতেও সে নিস্পৃহ থেকেছে। যদিও না চাইলেও সে কোম্পানিতে ট্রেনি অফিসার হিসেবে জয়েন করেছে। কোম্পানিই তাকে এই পোস্ট দিয়েছে। এতেই সে সন্তুষ্ট। ওর বাবা সজনীকান্তকে বলেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করছে বাবি। আমিও তাদের মধ্যে একজন। আমার এতেই আনন্দ। তারা যদি ভালো থাকে, তাহলে আমিও ভালো থাকবো। চাকরির জায়গায় বেশ মানিয়ে নিয়েছে সুজন । সহকর্মীরা যেন ওকে চোখে হারায়। কোনো সহকর্মী বিপদে পড়লে তার জন্য সে অনেক সময় ষোলো ঘন্টা, এমনকি একটানা কুড়ি ঘন্টাও ডিউটি করেছে। কিন্তু কোনো বিরক্ত প্রকাশ করেনি। একদিন বাড়ি এসে ওর মাকে জানায় সুজন, আগে কেউ কিছু কিনলে পাঁচ পয়সারও হিসেব হতো মা । আমি ওদের বলেছি, বন্ধুদের মধ্যে এমন চুলচেরা হিসেব করতে নেই । যে যেমন পারে খরচ করবে। তাতে কারো কিছু কম আর কারো একটু বেশি। এতে ভালবাসা অটুট থাকে। এখন আমাদের মধ্যে ভালবাসার টান আরো বেড়ে গেছে । এটাই আমার আনন্দ মা।
ওর বন্ধুরা কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, আবার কেউ ভালো সরকারি অফিসার হয়েছে। সুজন তার স্বভাব অনুযায়ী তাদের সাফল্যে উৎফুল্ল হয়ে তাদেরকে খাইয়েছে, গিফট দিয়েছে। অন্যের সাফল্যে ওর এতো আনন্দ কিভাবে হয় ভেবে বন্ধুরা পর্যন্ত অবাক হয়ে যায়।
আজ সুজন চাকরি করছে। হ্যাঁ, একটা সাধারণ কোম্পানিতে। মাইনেও খুব বেশি নয়। তবে চলে যায়। মাইনের সম্পূর্ণ টাকাটা সে তার বাবার কাছে পাঠিয়ে দেয়। হ্যাঁ, আগের মতোই ওর বাবার কাছে খাওয়া আর ট্রেন-বাস ভাড়ার টাকা নেয়। বন্ধুদের গর্ব করে বলে, আমার বাবা আমাকে হাত খরচ দেয়। বন্ধুরা কেউ কেউ বলে, তুমি তো এখন চাকরি করছো। এখনো বাবার কাছে…। তুমি কি এখনো সেই ছোটটি আছো!
সুজন মৃদু হেসে বলে, বাবা-মায়ের কাছে তো ছেলেমেয়েরা ছোটই থাকে। বাবা-মায়ের কাছে ছোট হয়ে দেখো তোমরাও খুব আনন্দ পাবে। জয়া নিজেকে প্রশ্ন করে, আচ্ছা, আমাদের ছেলেটা কি কোনো দিনই বড়ো হয়ে উঠবে না?
[৪]
এই গল্পের উপসংহারে সাধারণ দৃষ্টিতে সুজনের আরো অবনমন ঘটে। যত দিন যাচ্ছে পৃথিবীটা আরো জটিল হচ্ছে। আর সুজন তত সরলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কথায় কথায় ওর বন্ধুবান্ধবদের বলে, পৃথিবীটা বড়ো সুন্দর। সবাই কি ভালো মানুষ, না? যেন নিজেই প্রশ্ন করে নিজেই তার সঠিক উত্তরে সিলমোহর দেয়। তখন সহকর্মীরা এর ওর মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তাদের মধ্যে প্রশ্নটা যেন অনুরণিত হয়, সত্যি পৃথিবীটা সুন্দর! সুন্দর! সুন্দর! সহকর্মীদের কেউ কেউ যেন ওর চরিত্রটা পড়ে নেয়। ওরা বোঝে, ছেলেটা সহজ সরল আর সেই সাথে বোকা। সুজন সহকর্মীদের ভালবাসে, বিশ্বাস করে। বাবা সজনীকান্ত ছেলের ভেতরটা চেনেন। তাই বারবার সতর্ক করেন, চোখ-কান খোলা রেখো ব্যাটা। সুজন বলে, হ্যাঁ বাবি, এখানে সবাই খুব ভালো। আমাকে খুব ভালবাসে।
সবাই একই জায়গায় চাকরি করে, অনেকেই পুরনো কর্মী হিসেবে সুজনের থেকে বেশি বেতন পায়। কিন্তু অনেকেই ওর কাছ থেকে ধার নেয়, কিন্তু শোধ দেওয়ার কথা ভাবে না। সুজনও সে টাকা চাইবার প্রয়োজন মনে করে না। কোথাও একসাথে খাওয়া দাওয়া হচ্ছে, তার বিল মেটাবে কে, না সুজন। না, এ বিষয়ে সুজনের কোনো হেলদোল নেই। আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের জন্মদিন বা কোনো উপলক্ষে কোথাও গিফট দিতে হবে সে একটা নয়, দুটো গিফট দেবে। এতেই ওর আনন্দ। ওর মা হয়ত ব'লে উঠল, দুটো গিফট কেউ দ্যায়! একটা গিফট দিলেই তো হয়! সজনীকান্ত চুপিচুপি জয়াকে বলে ওঠেন, ছেড়ে দাও, ওর দুটো গিফট দিতে ইচ্ছে হচ্ছে, দিতে দাও। ওর রাজা মনটাকে মেরো না। সহকর্মী বন্ধুবান্ধবরা বুঝে গেছে আসলে সুজন হচ্ছে সহজ সরলের সাথে সাথে বোকা মানুষ। তবে কোথায় কি করছে শিশুটির মতো সে এসে ওর বাবা মাকে সব বলছে। বলা শেষে একগাল হেসে বলে, কী করবো বলো, এতে ওরা খুশি হয়। যেন পৃথিবীর সব মানুষকে সব আনন্দ খুশি দেওয়ার ভার ওকেই দেওয়া হয়েছে। বাবা সজনীকান্ত ছেলের এসব কাজকর্ম দেখে মস্করা করে বলেন, ছেলে আমার লস প্রজেক্ট। নিজের জন্য নয়, সে অপরের জন্য বাঁচে।
সুজন বলে, না বাবি, জীবনে চলাফেরাটা রাজার মতো হওয়া উচিত। অধমর্ণ নয়, উত্তমর্ণ হয়ে মানুষকে বাঁচতে হবে। তবেই জীবন থেকে আনন্দ পাওয়া যাবে ।
অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সুজন নানাভাবে ঠকছে বুঝতে পারেন সজনীকান্ত। সহজ সরল এই ছেলেকে সাবধান করতে একদিন সজনীকান্ত বললেন, সহজ সরল থাকা ভালো ব্যাটা, কিন্তু কেউ যেন তোমাকে বোকা না মনে করে।
সুজনের মুখে যেন উত্তরটা লেগেছিল। বলল, আচ্ছা বাবি, দেশের মানুষের কথা ভেবে মাত্র ষোলো বছর বয়সে ক্ষুদিরাম যে ফাঁসি নিয়েছিল, সে কি বোকা ছিল?
এর উত্তর কি দেবেন জানা নেই সজনীকান্তের।
ছেলে সুজনই যেন বাবাকে সেখান থেকে উদ্ধার করতে বলে উঠল, তুমি আমাকে মাও সে তুংয়ের লেখা একটা গল্প শুনিয়েছিলে বাবি, মনে আছে? সেই যে একটা বোকা বুড়ো লোক যে একদিন পাহাড় সরিয়ে ছিল। তুমি বলেছিলে… একদিন চিনের একজন অতি সাধারণ বুড়ো লোক পাহাড়ের চুড়োয় উঠে পাহাড় কাটতে লাগে। তার উদ্দেশ্য ছিল তার পরিবারের মানুষজন যেন সহজে পাহাড়ের ওপারে চলে গিয়ে নিজেদের কাজকর্ম সহজে করতে পারে। পরিবারের মানুষজনকে ভালবেসেই তো সে ওই অসম্ভব কাজটা করতে শুরু করেছিল বাবি। তারপর বুড়োকে যে দেখে সেই জিজ্ঞেস করে, এই অসম্ভব কাজটা কিভাবে সে সম্ভব করবে। সে তখন উত্তর দিয়েছিল, সে হয়তো নিজের জীবনে এর শেষ দেখে যেতে পারবে না। কিন্তু এই কাজটা তখন তার ছেলে করবে। তার ছেলের পর তার নাতি করবে। তারপর তার নাতির ছেলে করবে। এভাবে কাজ চলতেই থাকবে। তাহলেই একদিন সম্পূর্ণ পাহাড় সরে যাবে। সেই কথা শুনে উদ্দীপনা পেয়ে ওখানকার লোকজন নিজেরাই পাহাড় সরাবার কাজে লেগেছিল। আর একদিন সেই পাহাড় সরেও গিয়েছিল। সাধারণ মানুষের চোখে বোকারাই তো অনেক বড়ো বড়ো কাজ করেছে বাবি। আর একটি কথাও আর বলেনি সেদিন।
এমন কথা সে কেন বলল খোঁজার চেষ্টা করলেন তিনি। ছেলে সুজন কি তাহলে পুরনো পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাইছে যেখানে একদিন পাপ ছিল না, পূণ্য ছিল না। কেবল এক অনাবিল আনন্দ ছিল। তবে কি সে ক্রমশ প্রাগৈতিহাসিক মানুষ হয়ে যাচ্ছে ?
**************************************************************************************************
গুচ্ছ কবিতা * রতন পালিত
(এক)
সু-উচ্চ বনস্পতি
তুমি
ছায়া দাও উদয়াস্ত
আমি
ছোট্ট একটি বিন্দু
কোন দিকেই
ছায়া পড়ে না আমার
(দুই)
গিরি-শিখরে তুমি
সাবলীল
বিশ্ব দেখ ক্লান্তিহীন চোখে
অবরোহে
আমি
কবরের নীচে
জীবনের আলো পাই
(তিন)
হারিয়ে যাচ্ছি
মহাশূন্য
কাঁদবার কেউ নেই
এসো, এক-থালা চাঁদের আলো
চেয়ে
চিৎকার করি...
(চার)
এ মহাবিশ্ব
নীরব পাঠশালা
আমি
জীবনের সহজপাঠে
আগামীর অক্ষর বুনি
(পাঁচ)
একা চলতে চলতে যখন
তে'মাথার মোড়ে এসে পড়ি
বুঝতে পারি
উত্তাপ
সব ঘামের বাপ্ নয়
ছয়
গাছটা দৃঢ়, ঋজু
তাকে জড়িয়ে আকাশে মাথা তুলছে
একটি লতা
একটু পরেই
কলম ধরবে
ঈশপের গল্পকার
কবিতা মননে, চিন্তনে। স্কুল জীবন থেকে। প্রথম প্রকাশিত কবিতা ১৯৮৩ সাল, স্কুল ম্যাগাজিনে। তারপর বিভিন্ন জনের আবদারে অনেক লেখা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এবং স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশ। কবিতার পাশাপাশি গল্প, অনুগল্প। মাঝে কয়েক বছরের ছেদ। বর্তমানে নিয়মিত চর্চায়।
গুচ্ছ কবিতা * পার্থসারথি মহাপাত্র
কবিতাগুচ্ছ * পার্থসারথি মহাপাত্র
বার্ধক্যের আকাশে শৈশব
তখন আকাশটাই ছিল আমার ক্যানভাস
মনের রঙে প্রতিদিন আঁকতাম স্বপ্ন।
ছেলে-মেয়ে ভেদ ছিল না কোথাও,
সবাই ছিলাম আকাশের সমান তারা।
একটা মাঠজোড়া সবুজ দৌড়,
কৃষ্ণচূড়া-ফোটা লাল উত্তাপে
ঝলমল করত কৈশোরের দিন।
আজ বার্ধক্যে বিছানার সাদা চাদরে
নীরব হয়ে শুয়ে থাকে শরীর।
ইচ্ছে হয় চোখে চোখে থাকুক আপনজন,
কিছুক্ষণ ভুলে যাক পৃথিবী তার বয়স,
আর আমরা বার্ধক্যের আকাশে
শৈশব হয়ে মাঠের ঘাসে ঘাসে
দু’দণ্ড ইকড়ি–মিকড়ি খেলি।
বার্ধক্যে একা
আড্ডাবাজ, প্রাণচঞ্চল জীবনটা
আর আড্ডার ভিড় জমায় না!
হৃদরোগের মত অনিহাও
এখন আমার পরম আত্মীয়
হতাশার গাঙে নিমজ্জিত হয়ে
একাকীত্বে ভোগার সময়টাই বার্ধক্য!
দেওয়ালে গোটাকয় ছবি এঁকেছি
হাসি, কান্না, আনন্দ, দুঃখ, ভাবুক আরও.....
আমার যা কথা বলার বলি ওদেরকেই,
দেওয়ালেরও কান আছে কিন্তু
বাড়ির অন্যদের মতো ওরা বকে না
দেওয়ালের মুখ নেই।
বার্ধক্যবেলা
সারাজীবনের অর্জিত ধারণা ভ্রান্ত
প্রমাণিত করার চেষ্টা চলছে আজ
ছেঁড়া কাপড়ের শেষ পরিনতি ন্যাতা
নোংরা সাফ করলেও
নোংরা হয়েই পড়ে থাকে ঘরের কোণে
জীবন সায়াহ্নেও একইভাবে
পড়ে থাকে অপাংক্তেয় বার্ধক্যবেলা।
জীবনটা আজ বোঝা হয়ে উঠলো
এ ভার আর বইতে চায় না কেউ।
অমোঘ গোধূলি থমকে দাঁড়িয়ে
ঐ বুঝি দু'চোখের ঝাপ নামাতে আসছে ঢেউ।
মোহনার দিকে
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে রক্ত মাংসের গভীরে,
রোদে পোড়া দিনের মতো নিঃশব্দে।
যে পা ছিল স্রোতস্বিনী,
সে এখন ব্রততী, পর ভরসায় রোহিণী।
চোখের ভেতর জমে আছে
ঋতু বৈচিত্রের পিচুটি,
ভাঙা সাঁকোর ওপারে
ফেলে আসা দিনের ডাক।
ধমনী নয় শিরায় শিরায় বয়ে চলে সময়
যেন শুকনো নদীর বুকে
মাটি ফুঁড়ে ওঠা পুরোনো স্রোতের স্মৃতি।
কথা কমে আসে,
কিছু নীরবতা লিখে যায় ইতিহাস।
যারা একদিন নাম ধরে ডাকত,
তারা অনেকেই দূরের কুয়াশা।
এই নিঃশব্দ পথচলা জীবনের আরেক রূপ
যেখানে নিরবতা ভীড় করে,
আর গভীরতা বাড়ে।
বার্ধক্য তুমি ক্লান্তি নও,
এক দীর্ঘ পথের শেষে সমুদ্র মোহনা
যেখানে জল ধীরে ধীরে বয়
অবশেষে সাগরে মিলিয়ে যায়
আর আকাশটা উদার দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।
""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
************************************************************
পার্থসারথি মহাপাত্র
৯ এর দশক থেকে লেখালেখির সাথে যুক্ত পুরুলিয়া জেলার বলরামপুরের পার্থসারথি মহাপাত্র। বাংলার বিভিন্ন ছোট পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা বিচ্ছিন্ন ভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে। কবিতা ছাড়াও ছোট গল্প ও অণুগল্প নিয়মিত লিখে চলেছেন । তাঁর লেখা দুটি কবিতার বই 'বড়মুকরুর ছা'( মানভূমী ভাষায়),পোয়াতি মেঘ এবং 'ক্ষুধার স্পর্শে বর্ণমালা কেঁপে যায়' সমাদৃত। এখনো কোনো গল্পের বই প্রকাশিত হয়নি। পরবর্তী ক্ষেত্রে প্রকাশ করার সম্ভাবনা আছে।





















