সৃজনের মৌলিক স্বর
পঞ্চচুল্লির পায়ের কাছে
কৌশিকী দেব
আমার কাছে ভ্রমণ মানে শুধুই ঘুরে বেড়ানো নয়, শুধুই দল বেঁধে হইহই করা নয়। আমার কাছে ভ্রমণ মানে একটা জায়গাকে তীব্রভাবে ভালোবাসা, সেই জায়গাকে নিয়ে পাগলের মতো স্বপ্ন দেখা। আমার কাছে ভ্রমণ মানে অপেক্ষা, সঠিক সময়ের অপেক্ষা, সঠিক সুযোগের অপেক্ষা, অপেক্ষা করতে করতে করতে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠা ভালোবাসাকে কাছে পাওয়ার অপেক্ষা।
দেখার আগেই একটি জায়গার মায়ায় পড়া হলো ভ্রমণের প্রথম ধাপ। তারপর আসে স্বপ্ন দেখা ও সেই স্বপ্ন সত্যি করার জন্য একরাশ অপেক্ষা নিয়ে নিজেকে বিভিন্ন দিক থেকে প্রস্তুত করা। আর আমি তো পঞ্চচুল্লিকে একবার দেখে ফেলেছিলাম। সেই টান যে আরও তীব্র টান।
2016, ঘুরে দেখেছিলাম কুমায়ুন হিমালয়ের বেশ অনেকটা অংশ, হলদোয়ানি থেকে শুরু করে নৈনিতাল, সাততাল, ভীমতাল, মুক্তেশ্বর, বিনসর, আলমোড়া, চৌকোরি, মুন্সিয়ারি, বাগেশ্বর, বৈজনাথ, কৌশানী, রানীক্ষেত হয়ে কাঠগোদাম, সঙ্গে লখনউ, বারাণসীও ছিল। এতো কিছুর মধ্যে আঁটকে পড়েছিলাম কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে সারারাত জেগে মুন্সিয়ারি থেকে দেখা পঞ্চচুল্লির রূপে। মনে মনে ইচ্ছা রেখেছিলাম আবার একবার পঞ্চচুল্লির ভুবন-ভোলানো রূপ দেখবো কোন এক পূর্ণিমার রাতে।
মাঝে পেরিয়েছে ১০ বছর, ঘুরেছি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে। কিন্তু আর যাওয়া হয়নি পঞ্চচুল্লির আঙিনায়। এই বছর সেই ইচ্ছে আরও জোরদার হলো। সময়, সুযোগ সবাই বললো এবার অপেক্ষার অবসান হোক।
যথাসময়ে টিকিট কেটে, পছন্দের আস্তানায় মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে, যানবাহনের ব্যবস্থা করে শুরু হলো দিন গোনা। প্রধান গন্তব্য আদি কৈলাস ও পঞ্চচুল্লি বেসক্যাম্প।
আমি আজ বলবো দরমা ভ্যালি ও চৌদ্দ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত পঞ্চচুল্লি বেস ক্যাম্পের কথা। আমার দুর্বল শরীর নিয়ে ওই উচ্চতায় যাতে মানিয়ে নিতে অসুবিধা না হয় তাই কয়েক মাস ধরে অনেক চেষ্টা করেছি; হাঁটাহাঁটি, সঠিক খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে। অবশ্য আমি একা নই, আমরা তিনজনেই (আমি, আমার তেরো বছরের পুত্র ও তার বাবা) চেষ্টা করেছি শরীরকে ভালো অবস্থায় রাখার।
নির্ধারিত দিনে ট্রেনে উঠে স্বপ্নে বিভোর হয়ে নামলাম বরেলী জংশনে। ওভারহেড তার ছিঁড়ে ট্রেন ছয় ঘণ্টা লেট ছিল। আগে থেকে বুক করে রাখা গাড়িতে জিনিসপত্র তুলে দুপুর বারোটায় যাত্রা শুরু করলাম। টনকপুর পেরিয়ে পাহাড়ে চড়া শুরু হলো। চম্পাবতে চা বাগান ও বালেশ্বর মন্দির দেখে আমরা সেই রাত কাটালাম লোহাঘাটে। পরদিন কোলি ঢেক লেক, মিডো, স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিধন্য মায়াবতী আশ্রম, অ্যাবট মাউন্ট দেখে এগিয়ে গেলাম পিথোরাগড়ের দিকে। সেখানে আমরা দেখলাম অপূর্ব অবস্থানে থাকা মনের শান্তিদায়ক কামাখ্যা মন্দির, উল্কা মন্দির, ফ্ল্যাগ পয়েন্ট, ফোর্ট। এরপর আমরা এগিয়ে গেলাম ধারচুলার পথে, সঙ্গী হলো কালী নদী। নদীটি দীর্ঘ পথ ভারত ও নেপালের মধ্যে সীমানা টেনেছে। কালী নদীর ধার ধরে একসময় পৌঁছে গেলাম ধারচুলা। নদীর এপারে ভারতবর্ষের ধারচুলা, নদীর ওপারে নেপালের দারচুলা। ধারচুলায় নদীর ধারে ছিল সেদিনের রাত্রিবাস।
পরদিন কালী নদীর উপর ঝুলন্ত ব্রিজ পেরিয়ে নেপালের বাজারে কিছু কেনাকাটা করে ফিরে এসে রওনা দিলাম আদি কৈলাস ও ওম পর্বত দর্শনের উদ্দেশ্যে, রাত্রিবাস ছিল নাবি গ্রামে। দুই দিন সেখানে কাটিয়ে তুষারপাতের মধ্যে আদি কৈলাস ও ওম পর্বত দর্শন করে রওনা দিলাম শেষ গন্তব্য পঞ্চচুল্লি বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। নাবি গ্রাম থেকে কালী নদীকে সাথে নিয়ে যাওয়ার পথ ধরেই ফিরে এলাম তাওয়াঘাট ব্রিজে। সেখানে কালী নদীর সঙ্গ ছেড়ে শুরু হলো ধৌলি গঙ্গার সাথে পথ চলা।
পথ বেশ দুর্গম। একপাশে খাড়া পাহাড়, অন্যপাশে গভীর খাদ। এইরকম পথে চলার অভিজ্ঞতা আগেই হয়েছে, তাই ভয় তেমন লাগেনি। যারা প্রথম এমন দুর্গম পথে চলবেন তাদের বেশ ভয় লাগবে। ছোট বড় ধ্বস নামা এপথে খুব সাধারণ ঘটনা। এপথে এখনো পিচ ঢালা পথ তৈরি হয়নি, কাজ চলছে। আশা করা যায় দুই এক বছরের মধ্যে বেশ চওড়া ভালো রাস্তা তৈরি হয়ে যাবে।
আমরা এগিয়ে চলেছি পঞ্চচুল্লির টানে। সাথে চলেছে ধৌলিগঙ্গা নদী, কখনো পাশে পাশে, কখনো অনেক নিচে গভীর খাতের মধ্যে।
পথে মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে নিলাম। তাছাড়াও সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে দাঁড়াতে হলো বেশ কয়েকবার। নদীটির উপর বেশ কিছু ঝুলন্ত সেতু দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। পথে পড়লো ছিরকিলায় ধৌলি গঙ্গার উপর নির্মিত ড্যাম, একটি সুন্দর জলপ্রপাত যার নাম কাঞ্চবতী প্রপাত। বেশ কিছু ছোট বড় জলধারা পাহাড় থেকে নেমে রাস্তা পেরিয়ে ছুটে গেছে খাদের দিকে। রাস্তায় প্রবাহিত সেই জলধারা পার হতে বেশ শিহরণ জাগে। এক সময় দেখা দিল তুষার শৃঙ্গ।
হঠাৎ আকাশে মেঘের ঘনঘটা। মেঘ কুয়াশা মেখে এগিয়ে যেতে যেতেই হালকা বৃষ্টি নামলো। পথের পাশের জায়গা গোলাপী হয়ে আছে কোন এক ফুলের জন্য। নেমে ছবি তুললাম।
গন্তব্যের কাছাকাছি এসে প্রথমেই পেলাম দুগতু গ্রাম। বেশ কিছু হোমস্টে রয়েছে এখানে। এই গ্রাম থেকে পঞ্চচুল্লি দৃশ্যমান নয়। কিন্তু বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু হয় এই গ্রাম থেকেই। গ্রাম ছাড়িয়ে এগোতেই চোখে পড়লো নেওলা ইয়াংতি নদীর ওপারে নদীর ধারে আমার পছন্দ করা কটেজ। নাম তার নীল হলেও রং তার লাল। কটেজ ছাড়িয়ে আর একটু এগিয়ে গেলে নদীপথ থেকে কিছুটা পাহাড়ের উঁচুতে দান্তু গ্রাম, এখানেও বেশ কিছু হোমস্টে আছে। এই গ্রাম থেকে পঞ্চচুল্লি দৃশ্যমান। ব্রিজে নদী পেরিয়ে কটেজের সামনে নেমে বৃষ্টির মধ্যেই দৌড়ে গেলাম রিসেপশনে। তারা পৌঁছে দিলেন আমার পছন্দ করে রাখা শেষ কটেজটিতে। অপূর্ব পরিবেশ, কটেজ চত্বর বিভিন্ন ফুলে সাজানো।
কটেজের কাচের জানলা দিয়ে সবটুকু দৃশ্যমান। কিন্তু পঞ্চচুল্লি তখন মেঘের আড়ালে। টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যেই মন্ডল বাবু প্রথমে জল দিয়ে, তারপর চশমা পরিষ্কারের জন্য আনা লেন্স ক্লিনার দিয়ে জানলার কাচ পরিষ্কার করলো। ঘর থেকেই ওঠা-বসায়, ঘুমে-জাগরণে শুধু পঞ্চচুল্লি। আমরা জিনিসপত্র গুছিয়ে একটু ফ্রেশ হতেই বৃষ্টি থামলো। আমরা হাঁটতে শুরু করলাম এদিক ওদিক। ব্রিজের দিকে এগোতেই দেখি মাটির কাছাকাছি রামধনু উঠেছে। সে এক অপরূপ দৃশ্য। রামধনুর সাতটি রং এত স্পষ্ট ভাবে আমি আগে কখনও দেখিনি।
ন্যাওলা ইয়াংতি নদীর পাশেই ছিল এক ছোট্ট মন্দির। ব্রীজ পেরিয়ে সেখানে গেলাম, অসীম শান্তি বিরাজ করছে সেখানে। নদীর ধারে কিছুক্ষণ বসলাম, গায়ে মেখে নিলাম নদীর স্পর্শ, আর মনে মেখে নিলাম তার কলতান।
মেঘ সরে ক্রমশ দৃশ্যমান হলো পঞ্চচুল্লির চারটি শৃঙ্গ, এত কাছে যেন মনে হয় হাত বাড়িয়ে ছোঁবো। এখান থেকে চারটি শৃঙ্গই দেখা যায়, একটি আড়ালে থাকে। দেখতে পেলাম পঞ্চচুল্লির পায়ের কাছে বরফ গলে জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে। তবে পঞ্চচুল্লি ছাড়াও জায়গাটি চারদিক থেকেই বরফাবৃত পাহাড় দিয়ে ঘেরা। সেগুলির রূপও বর্ণনাতীত। সবুজ উপত্যকায় ঘুরে ঘুরে দেখলাম পঞ্চচুল্লি ও আশপাশের সৌন্দর্য।
কটেজে দুটি খরগোশ ছিল। আমার পুত্র কিছুক্ষণ সুন্দর সময় কাটালো তাদের সাথে।
বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলো। পকোড়া ও চা সহযোগে আমাদের সান্ধ্য আড্ডা জমে উঠলো পঞ্চচুল্লিকে সাক্ষী রেখে। একটু পর আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠলো। আর সেই জ্যোৎস্নায় স্নান করে ঝলমল করতে লাগলো মোহময়ী পঞ্চচুল্লি। চোখের পলক ফেলতে পারছিলাম না।
তাপমাত্রা তখন শূন্যের কাছাকাছি, ভীষন ঠান্ডা, রিসর্টের লোকেরা বুখারী জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন। সেই উত্তাপে মাটির ঘর আরও কিছুটা গরম হলো। রাতের সুস্বাদু খাওয়া সেরে ক্লান্তিহীন তাকিয়ে থাকলাম জোৎস্না ভেজা পঞ্চচুল্লির দিকে। সেই রাত চন্দ্রাহত হওয়ার রাত, সেই রাতে ঘুম আসে না কিছুতেই। তবু বিশ্রাম প্রয়োজন, মনকে বোঝালাম শুয়ে শুয়ে পর্দা সরালেই তাকে দেখতে পাবো।
তাই রাত গাঢ় হলে মনকে বুঝিয়ে নদীর কলতান শুনতে শুনতে ঘুমের দেশে পাড়ি দিলাম। মাঝরাত্রে ঘুম ভাঙলো বৃষ্টির শব্দে। বিশ্বাস হচ্ছিল না কিছুতেই, এই তো ঝলমলে চাঁদ দেখে শুতে গেলাম! উঠে বাইরে আসতে বাধ্য হলাম বিশ্বাস করতে। চারদিক মেঘে ঢাকা, বৃষ্টি পড়ে চলেছে, কোথাও পঞ্চচুল্লির চিহ্ন মাত্র নেই। খুব মন খারাপ হলো। পথে ধ্বস নামার আশঙ্কাও এলো মনে।
ভোরবেলা উঠে সূর্যোদয় দেখার বদলে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে হতাশ দৃষ্টি নিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। আজ হাঁটবো বেস ক্যাম্পের পথে, কিন্তু এই বৃষ্টিতে কীভাবে সম্ভব? মন ভারী হয়ে উঠলো।
সাতটা নাগাদ বৃষ্টি থামলো সাময়িক, কিন্তু চারপাশ মেঘাচ্ছন্ন। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে সকালের খাওয়া সেরে একজন গাইডকে নিয়ে রওনা হলাম দুগতু গ্রামের দিকে। সেখানে ট্রেকিংয়ের জন্য নাম নথিভুক্ত করে, টিকিট নিয়ে, ভাড়ায় লাঠি নিয়ে গাইড দাদার সঙ্গে শুরু করলাম পথ চলা। প্রথম দিকে চড়াই অংশ, পথে পাথর ফেলা আছে। ধীরে ধীরে সময় নিয়ে উঠতে থাকলাম।
চারপাশে অসংখ্য ছোট ছোট ফুলের বাহার চোখ টানতে থাকলো।
কিছুটা ওঠার পর পাখির চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম দান্তু গ্রাম, দুগতু গ্রাম, আমাদের কটেজ ও নেওলা ইয়াংতি নদীটিকে। উপর থেকেই দেখলাম নদীর উপর আমাদের কটেজের কাছের ব্রিজটি ছাড়াও আরও একটি ব্রিজ আছে। ঠিক করলাম সেদিন বিকেলে ওই দ্বিতীয় ব্রিজটির দিকে হাঁটতে যাবো।
চড়াই পেরিয়ে এলো ঘন পাইন ফারের জঙ্গল। এই অংশে চড়াই তেমন ছিল না।
এই জঙ্গলে একটি বিশেষ গাছ গাইড দাদা দেখালেন। বার্চ গাছ বা ভোজপত্র বা ভূর্জপত্র গাছ, যে গাছের ছালে শিক্ষার ইতিহাসে প্রথম লেখার কাজ হতো। ওই পাহাড়ে এই গাছ অনেক রয়েছে।
ফার (স্থানীয় ভাষায় দেওদার) গাছের ফল থেকে হতো কালি। সেই ফলও দেখলাম, নীল রঙের।
জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতেই আবার বৃষ্টি এলো। আমরা আমাদের সঙ্গে থাকা আদি কৈলাসে কেনা রেনকোটগুলি পরে নিলাম। জঙ্গল পেরোনোর পর এলো অফুরান সৌন্দর্যে মোড়া বুগিয়াল। বিভিন্ন গাছ, বিভিন্ন ফুলের বিস্তার চোখ ধাঁধিয়ে দিল।
একসময় পৌঁছে গেলাম পঞ্চচুল্লি বেস ক্যাম্পে। এখানে আগে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। পরে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভবনায় ডোম আকারের থাকার জায়গাগুলি পরিত্যক্ত হয়। এখন সেগুলো ভেঙে পড়ে আছে। আমরা ওই ভাঙা ঘরগুলিতে কিছুক্ষণ বিরতি নিলাম বৃষ্টির জন্য।
বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ নেই। আমরা আবার এগিয়ে চললাম। যদিও পঞ্চচুল্লি মেঘের আড়ালে তবু চারপাশে উঁচু উঁচু তুষারশৃঙ্গ, তার মাঝে উঁচু নিচু পথ ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি ফুলের বাহারের মাঝখান দিয়ে। কখনও কখনও পার হচ্ছি ছোট ছোট জলধারা।
একসময় বুগিয়াল জুড়ে সাদা, গোলাপী রডোডেনড্রনের শোভা মন্ত্রমুগ্ধ করে দিল। হইহই করে ছবি তুলতে থাকলাম বৃষ্টির মধ্যেই।
বৃষ্টি থামলো, আরও এগিয়ে দেখতে পেলাম মেঘের মাঝে পঞ্চচুল্লির আভাস, নেওলা ইয়াংতি নদীটি সৃষ্টির আভাস। চারপাশের সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।
ফিরতে ফিরতে আবার বৃষ্টি নামলো। সাবধানে নামতে থাকলাম। একসময় পৌঁছে গেলাম দুগতু গ্রামে। কিন্তু আমাদের গাড়ি সেখানে পেলাম না। ফোনের নেটওয়ার্কের সমস্যায় ড্রাইভার ভাই-এর সাথে কোন যোগাযোগও করতে পারলাম না। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে, তার মধ্যেই আবার হাঁটতে শুরু করলাম কটেজের দিকে। গাইড দাদা পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন। সংক্ষিপ্ত পথ হবে বলে সেই উপর থেকে দেখা ছোট ব্রিজটি দিয়ে নদী পার হলাম যেখানে বিকেলে আমাদের যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এই পথের সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। কটেজে পৌঁছতে পৌঁছতে কিছুটা ভিজে গেলাম।
ভিজে জামাকাপড় বদলে ছাতা নিয়ে আমরা খেতে গেলাম কটেজের ডাইনিং - এ। ডাইনিং থেকেও চারপাশের অফুরান সৌন্দর্য দৃশ্যমান। খেতে খেতে মনের মাঝে আগের রাতের ভয়টা ফিরে এলো।ভাবছিলাম এত বৃষ্টিতে ধ্বস নেমে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে না তো? বেশ ভয় পাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম খেয়ে কটেজ ছেড়ে নিচে নামার জন্য রওনা দেবো কি না। কিন্তু তখন দুপুর প্রায় তিনটে। অত দেরিতে ওই দুর্যোগের মধ্যে ধ্বসপ্রবণ পথে নামা ঠিক হবে না। তাই যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিলাম তিনজনে। বিকেল হতেই কটেজের কর্মীদের অনুরোধ করলাম আজ সময়ের আগেই বুখারী জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য। তারা দিলেন। ভেজা জামাকাপড়, ভেজা মানুষগুলো সেই উত্তাপে বেশ তাজা হয়ে উঠলো।
ইতিমধ্যে বৃষ্টি কমেছে, তবে কখনও থামছে কখনো পড়ছে। সন্ধ্যাটা গান গল্পে সুন্দর কাটালাম তিনজনে। জামাকাপড়, ব্যাগ সব ঠিকঠাক করে গুছিয়ে রাখলাম। রাত্রে যখন খাওয়ার জন্য ডাইনিং গেলাম তখন বৃষ্টি থেমেছে, তবে মেঘের ঘনঘটায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। খেয়ে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম সকলে।
রাত বারোটায় হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। জানলার পর্দা সরাতেই চমকে গেলাম। তাড়াতাড়ি বাইরে এসে দেখি জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ, চন্দ্রালোকে রূপোর সাজ পরে জ্বলজ্বল করছে মাউন্ট পঞ্চচুল্লি। সেদিন আবার আমি চন্দ্রাহত হলাম। সেই রাতে আর ঘুম আসেনি ঠিকমতো। হালকা তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেও বার বার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল, আমি জানলা দিয়ে বাইরে দেখছিলাম।
ভোর পাঁচটায় উঠে বাইরে এলাম। হালকা মেঘ এদিক ওদিক রয়েছে। পঞ্চচুল্লির চূড়ার উপরের অংশ কিছুটা মেঘের আড়ালে রয়েছে। চেয়ার নিয়ে বসে থাকলাম আমার কটেজের সামনে। ক্রমশ আকাশ আরো পরিষ্কার হলো। এক সময় সূর্যোদয় হলো। দিনের নতুন আলোয় ঝলমল করে উঠলো চারপাশ। শুধু পঞ্চচুল্লি নয় চারপাশের সবগুলি তুষারাবৃত পাহাড় যেন হেসে উঠলো। চা খেলাম ওখানে বসেই। তারপর তৈরি হয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম। এবার যেতে হবে।
মন চাইছে না, তবু যেতে হবে। নীল আকাশ আর ঝলমলে সূর্যালোকে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ালাম চারপাশে। মাউন্ট পঞ্চচুল্লি ফিসফিস করে বললো , " আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ ছিল ঠিকই, কিন্তু তোমার তো কিছুই অপূর্ণ রাখলাম না কন্যা।" না, অপূর্ণ কিছু ছিল না। তীব্র ভালোবাসা অনুচ্চারিত প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয়। আমার সেই ভালোবাসাতেই পঞ্চচুল্লি তার না বলা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলো। আমি ধন্য হলাম।
সেই খরগোশ দুটির সঙ্গেও দেখা করলাম। তারপর পিছনে তাকাতে তাকাতে গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি ব্রীজ পেরিয়ে নদীর ওপারে যাওয়ার পর দূর থেকে দেখতে পেলাম আমাদের রিসর্টের একটু আগে ছেড়ে আসা আমার কটেজটি, দরজা খোলা। এক তীব্র পিছুটান অনুভব করলাম। তবুও এগিয়ে যেতেই হবে।
সেই একই পথ ধরে ফিরে চললাম। পথে বৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও ছোটখাটো পাথর পড়েছে, তবে বড় কোন ধ্বস কোথাও ছিল না। তবে যেহেতু রাস্তা পিচের নয় তাই কিছু জায়গায় বেশ কাদা হয়ে গিয়ে কিছু গাড়ির সমস্যা হচ্ছিল। এইরকমই একটি গাড়ি ঠিকমতো উঠতে পারছিল না বলে আমাদেরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। রাস্তায় বেশ কিছু জায়গায় কাজও চলছিল।
সব পেরিয়ে নিরাপদে আমরা নেমে আসি তাওয়াঘাট, সেখান থেকে ধারচুলা হয়ে চম্পাবত। পরের দিন বরেলি জংশন থেকে ফেরার ট্রেন বিকালে।
মনের মাঝে ঘোরের মতো আসতে থাকে ফেলে আসা কয়েকটি দিন, ফেলে আসা কিছু মুহূর্ত, সেই চন্দ্রাহত হওয়ার রাত। বিদায় পঞ্চচুল্লি, জীবন সময় দিলে আবার আসবো।
কীভাবে যাবেন - ট্রেনে কাঠগোদাম, লালকুঁয়া বা বরেলি পৌঁছে সড়ক পথে ধারচুলা যেতে হবে। দূরত্ব যথাক্রমে 271 কিলোমিটার, 296 কিলোমিটার ও 374 কিলোমিটার। ধারচুলা থেকে সড়ক পথে দরমা উপত্যকা কম বেশি 80 কিলোমিটার। কিন্তু রাস্তা খারাপ হওয়ার জন্য সময় লাগবে 4 থেকে 5 ঘণ্টা।
কোথায় থাকবেন - দুগতু বা দান্তু গ্রামে অনেক হোমস্টে আছে থাকার জন্য। এছাড়া গ্রাম দুটির মাঝে নদীর ধারে দু একটি কটেজ রয়েছে।
***************************************************************************************
প্রভাত ভট্টাচাৰ্য
পর্ব * 10
ঘটনার ঘনঘটা
সবার মনেই চিন্তা, কি হবে। কিছু একটা তো ঘটতে যাচ্ছেই দু একদিনের মধ্যে ।
সেদিন অজয় সবাইকে তলব করল সামনের চত্বরে এসে জড়ো হওয়ার জন্য। সবাই এসে হাজির হল।
কাল থেকে আমাদের অ্যাকশন শুরু হবে। অজয় বলে উঠলো।
একটা গুঞ্জন উঠলো সকলের মধ্যে ।
কি করতে হবে আমাদের? বলে উঠলো রমেশ।
কাছেই যে গ্রামটা রয়েছে ,সেখানে আমরা আক্রমণ চালাবো, আর ওই গ্রাম আমাদের অধীনে আনবো। তারপরে আরও অন্যান্য এলাকা। এইভাবেই ছুটে চলবে আমাদের বিজয়রথ। ঠিক আছে ?
হ্যাঁ রাজামশাই। বলে উঠলো সকলে । কিন্ত তাদের মনের মাঝে জমে উঠেছে শঙ্কার কালো মেঘ।
খালি অতীশের মুখে হাসি।
এ তো পাগল । মনে মনে ভাবল আবদুল।
আজ থেকেই তাহলে অ্যাকশন শুরু হল। অজয় বলে উঠল।
গ্রেট! কে বলে উঠলো উচ্চস্বরে । সঙ্গে হা হা রবে অট্টহাসি।
বিস্ময়ের দমক কাটলে অজয় দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে একজন, হাতে উদ্যত পিস্তল। তার সাথে আরও কয়েকজন বন্দুকধারী, আর এক অতিকায় চেহারার অর্ধমানব।
আমি হলাম অশোক, আজ থেকে সম্রাট অশোক, আর তোমরা সবাই আজ থেকে আমার গোলাম। আর তুমি রাজামশাই ! তুমিও গোলাম আজ থেকে । আমাদের হাতে অস্ত্র তো আছেই, আর ঐ যে দেখছো, ও হচ্ছে সুপাররোবট, ওকে সিগন্যাল দিলেই তোমাদের আক্রমণ করবে। এই, তোমরা ওদের থেকে সব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নাও তো ।
তার অনুচররা তাই করলো ।
অজয় ভাবছে, কি থেকে কি হয়ে গেল। হঠাৎ করে এই অশোক কোথা থেকে চলে এলো।
তার দিকে চেয়ে অশোক হাসিমুখে বলল, ভাবছ এসব কি হল। সব পরিষ্কার করে দিচ্ছি। আমি কিছুদিন ধরেই জঙ্গলে ঘাঁটি গেড়ে ছিলাম আর তোমাদের গতিবিধি লক্ষ করছিলাম। জানলে খুশি হবে, আমি একজন সায়েনন্টিস্ট । তোমার কাকার অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলাম আমি। কিন্ত তুমি হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসলে। যাই হোক, আমি কোনভাবে অনেক টাকাপয়সা পেয়ে যাই আর নিজের ল্যাবরেটরি বানাই। এই সুপাররোবট আমারই তৈরি ।এ একাই পাঁচশো লোকের মহড়া নিতে পারে। এর শরীর থেকে বুলেট, বর্ষা সব বেরোতে পারে প্রয়োজনে। তোমার খোঁজখবর আমি সবই পাচ্ছিলাম শার্দুলের মারফত।
শার্দুল ! বিশ্বাসঘাতক ! বলে উঠল অজয়।
শার্দুলের মুখে এক অদ্ভুত হাসি।
কি আর করা যাবে। বলল অশোক। আর আমার এই সুপাররোবটও অনেক কিছু রেকর্ড করে নেয়। আজ থেকে তাহলে সবকিছুই আমার দখলে। আর আমিই সব রাজ্য জয় করবো। এই যে অতীশবাবু, আপনার অস্ত্র আমিই কাজে লাগাবো। আজ আর হবে না, কাল থেকে কাজ শুরু হবে।
ঠিক আছে, আপনি যেরকম বলবেন। সুমিত বলল।
এখন যাও, সবাই যে যার ঘরে চলে যাও। সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে সে আদেশ পালন করল। সুমিত অতীশের সঙ্গে তার ঘরেই ঢুকলো। তার মুখের দিকে হাসিমুখে চেয়ে রইল অতীশ।
সেই সময় শার্দুল ঘরে ঢুকে এসে বলল, চলো তোমরা। সম্রাট তলব করেছেন।
তুমি তো কামাল করে দিয়েছো । অজয়কে বোকা বানিয়ে একেবারে অন্য নৌকোয়।
তাড়াতাড়ি চলো, আর বাজে বকতে হবে না। নয়তো ঘাড় ধরে নিয়ে যাবো।
দুজনে চললো শার্দুলের সাথে। শার্দুল তাদের ল্যাবে নিয়ে এলো। সেখানে অশোক বসেছিল।
এই যে ,এসে গেছো। এখন আমাকে তোমার নতুন আবিষ্কারের ব্যাপারটা বুঝিয়ে দাও তো। বলল সে।
বলছি। এসব গোপনীয় ব্যাপার। আর কেউ নেই তো।
আর কেউ নেই। তোমার সাবধানতায় খুশি হলাম। তোমাকে আমার মন্ত্রী করে নেবো। এখন বলো।
হঠাৎ করেই সুমিত অশোকের গায়ে পড়ে গেল।
ইডিয়ট! বলে উঠল অশোক।
কিন্ত তারপরই তার গালে নেমে এল সজোরে থাপ্পড় আর পাঁজরায় মারাত্মক ঘুষি। আর তার পিস্তল
সুমিতের হাতে।
এদিকে অতীশ পা বাড়িয়ে ভূপতিত করেছে শার্দুলকে। তারপর মারের পর মার।
দুজনেই কাবু।
কিরে, ঘাড় ধরে নিয়ে যাবি না ! গুলি খাবি না কি! শার্দুলের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে বলল সুমিত।
বাইরে আমার লোক আছে। তোমাদের ব্যবস্থা করবে। অশোক বলল।
তাদের ব্যবস্থাই হয়ে গেছে এতক্ষণে । অতীশ বলল।
মানে ?
সিগন্যাল দিয়ে দিয়েছিলাম। পুলিশের লোক এসে গেছে নিশ্চয়ই।
কে তোমরা ?
আমি হলাম ডিটেকটিভ সূর্য।
আর আমি হলাম অনুজ, ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসার।
অশোক ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।
শার্দুল উঠে অতীশকে আক্রমণ করতে যাচ্ছিল, সুমিত ওরফে সুরজ তার পায়ে গুলি করল। সে আর্তনাদ করে মাটিতে পড়ে গেল।
দেখলে তো ? চুপচাপ শুয়ে থাকো। এবারে কিন্ত এদিক ওদিক হলে একেবারে বুকে গুলি করবো। বলে উঠল সুরজ।
আমি বাইরে গিয়ে দেখে আসি। সূর্য বলল।
পুলিশ এসে ইতিমধ্যেই পুরো জায়গার দখল নিয়ে নিয়েছে।
সূর্যকে দেখেই একজন অফিসার বলে উঠলেন, স্যার, আমি আমজাদ , আপনার সিগন্যাল পেতেই টীম নিয়ে চলে এসেছি । সবাইকে আটকে রাখা হয়েছে ,আর সব আর্মস আমাদের হেফাজতে।
গ্রেট জব। আরো দুজন আছে ভেতরে। ওদেরও হেফাজতে নিতে হবে ।
ও কে স্যার।
কিন্ত আপনি আমাকে চিনলেন কিভাবে?
আপনার অরিজিনাল আর এই ছবি আমাকে দেওয়া হয়েছিল।
অশোক আর শার্দুলকেও অ্যারেস্ট করা হল।
সম্রাট অশোক দেখছি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়েছেন। বলল সূর্য।
অজয়ের সঙ্গেও দেখা করে সূর্য বলল, কেমন আছেন রাজামশাই?
তুমি আসলে কে?
ডিটেকটিভ সূর্য নামেই সবাই জানে আমাকে।
সবাই দেখছি বিশ্বাসঘাতক।
কি আর করা যাবে। তোমরা যা সর্বনাশা কাজ করতে যাচ্ছিলে, তাতে তোমাদের রোখার জন্য এসব করতেই হয়েছে । যাক, এবারে যাও কারাগার প্রাসাদে।
আজ ফেরা কলকাতায়। একফাঁকে একটু দিল্লিটা ঘুরে নিলে হত, কিন্ত একা একা আর ভালো লাগছে না। কৃষ্ণকে ছাড়া অভিযান তো বড় একটা হয় না।
আজ ভীষণ অলস লাগছে সূর্যের। বিছানা ছেড়ে আর উঠতেই ইচ্ছে করছে না। ঘরেই ব্রেকফাস্ট দিতে বলে দিল সে।
একটু পরেই বেল বাজল।
অনুজ এসেছে।
গুড মর্নিং।
গুড মর্নিং। এই একটু দেখা করতে এলাম।
দুজনে খানিকক্ষণ কথাবার্তা হল।
কলকাতায় এলে আমার বাড়িতে আসবেন।
অবশ্যই। ফোন করে নেবো। আমি আগে গিয়েছি কলকাতায় ।
আপনার বাড়ি কোথায়?
বিহারের গয়াতে। ।
বিখ্যাত জায়গা।
গেলে আমাকে বলবেন।
ঠিক আছে।
আর আপনার এই বিরাট কাজের জন্য আপনি পুরস্কার পাচ্ছেন, আমি জানতে পারলাম।
একটু পরে সে বিদায় নিল।
এর মধ্যে কৃষ্ণ, উজ্জ্বয়িনী ,দুজনেরই ফোন করা হয়ে গেছে।
প্লেনে বসে একটু ঘুম পেয়ে গিয়েছিল।
কলকাতায় এয়ারপোর্টে কৃষ্ণ আর উজ্জ্বয়িনী এসেছিল তাকে নিয়ে যেতে।
গাড়ি চালাতে চালাতে কৃষ্ণ বলল, আজ আমি নিজে রান্না করেছি।
বাঃ, তাই নাকি! বলে উঠল সূর্য। আজ তাহলে জমিয়ে আড্ডা হবে।
আগামী পর্বে
************************************"**************************************************************
কথা দিয়েছিলাম হেমন্তের নিয়রে
পর্ব ২৩
দীপংকর রায়

পথের এই ধারাবাহিকতা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্য কিছু ভেবে চলতে চেয়েছি বলেই হয়ত এত অন্তরায়। প্রকৃত প্রাকৃতিক ভাবে শিক্ষাকে শিক্ষার মতো মূল্য দিয়ে ভাবতে গেছি বলেই তো, এতো প্রতিবন্ধকতা। সেই ভাবে কোনো পরিচয় তৈরি হবার পথ তো সেখানে দেওয়া নেই! যে কারণে সকলের মাঝখানে যেয়ে নানা সংকট তৈরি হয় সেই জন্যেই! পরিচিতি কি কোনোকিছু সেইভাবে দেবার মতো আছে? সেটাও তো বুঝে পাই না।
এইটা হলে, ওইটা হতে পারত; এই ধরণের ভাবনাচিন্তাগুলি
আমরা করি ঠিকই, কিন্তু সেই মহা প্রবাহের গতি যে যে তোড়ের মধ্যে দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে
চলে, তার গতিমুখ কি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? সেই মহা প্রবাহতেই ভাসিয়ে নিয়ে চলে তার
আপন ছন্দে সবকিছু। সেখানে মানুষের নিয়ন্ত্রণ শক্তি কতটুকুই বা? নিতান্ত অসহায়তাকে
গেলা ছাড়া— আর তো কোনো উপায় দেওয়া নেই!
এইরকম সব ভাবনাচিন্তা করে যখন কোনো তালই
খুঁজে পাই না, তখন যেন ঘাড় ভেঙে বসে থাকি বারান্দার একটি কোণে একাকী। চেয়ে থাকি সামনের
অন্ধকারের মধ্যে সেই অনেকটা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাউগাছ গুলির মাথার দিকে। এই
দেখার বিহ্বলতা অধকার রাত্রিবেলাগুলিতেও যেমন, আবার জোছনার আলোর মধ্যেও তেমন। তখনো
তেমনি চুপচাপ চেয়ে থাকতেই বলে যেন কেউ। আবার কখনো কিছুটা বাতাস পেয়ে,
মাথা
দুলিয়ে যেন সাড়া দেয় এই বলে, কী এতো ভাবছো বসে বসে? আমার মত মাথা দোলাও দেখি, আবার থেমে যাও, আবার মাথা দুলিয়ে এই আলো অন্ধকারে
মাখামাখি করো তো দেখি কেমন পারো! সেই একটুখানি প্রাণের অস্তিত্বে ধরা দিয়েছো যখন,
তখন তোমার এইসব আকাশ পাতাল ভাবনায় কোনো কূলই এসে ধরা দেবে না জেনো তোমার কাছে। সেখানে
কেবলই ভেসে থাকা। ভাসমান এক গতির সঙ্গে তোমার ছুটে চলা শুধুই। এই নিয়ে অস্থির হয়ে
যেও না। তুমি শুধু সেই চলাকেই অভ্যাস করো কেবল। তার আগুপিছু নিয়ে এত ভেবে ভেবে সময়
নষ্ট করো না। তাই বলি কি, ভাবনাচিন্তা বাদ দিয়ে যা করছো, যা করলে তোমার মন শান্ত হয়,
আনন্দ পায়, তাই করে যাও। একদিন যে কথা রসিক দাদু তোমাকে বলেছিলেন— যা তোর মনে হয়,
যা তুই প্রতিদিন মনে করতে চাস, বা করে চলতে বাধ্য হোস, সেগুলিই লিখে রাখবার চেষ্টা
করবি যতোটা পারিস। আবার মাঝে মাঝে সেই লেখা গুলি একবার দেখবার চেষ্টা করবি কিন্তু!
তাহলেই তুই তোর ভালো মন্দ সব কিছুকেই খুঁজে পেয়ে যাবি সেখানেই। দেখতে পাবি সেখানে তুই কতোটা পেরেছিস আর কতোটা তুই পারিসনি।
আমার মনে হয় কি জানিস, এটা সকল মানুষেরই করা দরকার। সেটা না হলে, সে তার ভালো মন্দ
কোনোকিছুই বুঝতে পারবে না কোনোদিন।
সেদিন তাঁর কথা মেনে নিয়ে যেভাবে শুরু করেছিলাম,
তা আবার নানা কারণে বহুকাল থেমে আছে।
নিজের
মনে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করি— তাহলে কি আবার শুরু করবো? যদি লিখিও, তাহলে কীই বা বেশি
কিছু হবে? বড়জোর জানতে পারবো কতকগুলি দিন পরে সেই দিনগুলি কেমন ছিলো! যদিও সেই হিসাবের
খাতায় তো যা তাই-ই, শূন্য তো, সবই শূন্য— কিছুই হয়নি!
হওয়া
কাকে বলে?
যেমন ধরা যাক, আজ মূল্যবান এই কাজগুলি করছি।
কাল এইগুলি করবার কথাটা ভেবেছিলাম, অথচ এই এই জন্যে হয়ে ওঠেনি। ওই জন্যে হয়ে ওঠেনি।
এই তো মোদ্দা কথা!
না না, সেটা না। শুধু সেটাই না। আরো অনেক
কিছু। গতকালের ভাবনা, আর গত পরশুর ভাবনাচিন্তার সঙ্গে দেখা যাবে কত পাল্টে গেছে সব
কিছুই!
ক্রম পর্যায়ের এই অদ্ভুত এক স্রোত, যাকে
ওইভাবে দেখা না গেলেও, তাকে ইচ্ছা করলেই উপলব্ধি করতে পারবে তুমি। আর কাজ? কাজ তো কাজের
মতোই চলবে… আজকের কাজ আর কালকের কাজের মধ্যেও যে নিরন্তর এক পার্থক্য, দেখবে সে তোমাকে
অত্যন্ত ধীর গতিতে পাল্টে নিয়ে চলেছে… তা তুমি খুব গভীর ভাবে লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবে,
বা টের পেয়ে যেতে থাকবে। তখন তুমি আরো ভালো করে বুঝতে পারবে আজকের ভূমিকা তোমার কী
ছিলো? কালকের ভূমিকাই বা কেমন ছিলো? পরশুই বা তুমি কেমন ছিলে? সবটাই তোমার কাছে স্পষ্ট
হয়ে উঠেছে দেখতে পাবে।
এখানেও একটুখানি কথা থাকে যদিও, সেই কথাটাও
কি ঠিক! তোমার লক্ষ্য কতো দূরে? কতোটা অন্তর্ভেদি? তাকে তুমি কতোটা মগ্ন হয়ে ধরে রাখতে
পারছো? সব দেখবে ধরা পড়ে যাবে। ধরা পড়ে যাবে তোমার নিজের কাছেই।
এই রকম রাত-অন্ধকারে কতোদিন যে একা একা কাটতে
লাগলো বারান্দায় বসে বসে, সেই একটিমাত্র মোড়াটিকে সম্বল করে, আর সামনের সেই ঝাউগাছগুলির
সারিই হয়তো সেসব কিছুটা জানে। সেই মাসিমাদের বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে যারা সারি
সারি! আর জানে বাড়ির সামনের পথটা।
ইদানীং যখন পথে কাঠের ইলেকট্রিক পোলের মাথায়
একটি করে ডুমলাইট লাগিয়ে দিয়ে গেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। তার আলো এসে পড়েছে আমাদের বাড়ির
সামনের দিককার রংচিতে বেড়ার উপর। যদি কেউ ওই রাস্তার উপর থেকে আমাদের বাড়িটিকে এই
রাতের বেলায় লক্ষ্য করে, তাহলে দেখতে পাবে, পাশাপাশি দুইখানি টালির চাল দেওয়া ঘর।
তার এক বারান্দায় সামান্য একটি আলো জ্বেলে বসে আছে এই রাতের বেলায় একটি ছেলে। তার
বাঁ পাশটিতে লম্বা করে গোরুগুলির থাকবার যে জায়গা রয়েছে। সেখানে হয়তো সেই গোরুগুলির
মধ্যে কেউ ঠ্যাং মেলে শুয়ে আছে। কেউ শুয়ে থেকে এই হয়ত উঠলো। তারপর খানিকটা থপ থপ
করে নেদে দিয়ে পেচ্ছাপ করার শব্দও শোনা গেল ঝরঝর করে। কিম্বা কেউ হয়তো এই সময় একমনে
জাবর কেটে চলেছে….।
এ সময় জেগে নেই মানুষজন। হয়তো কুকুরগুলি
মাঝে মাঝে এদিক ওদিক দৌড়ে যাচ্ছে আসছে। না হলে একই জায়গায় আড়াইপাক ঘুরে শুয়ে পড়লো
হয়তো কারোর বাড়ির সামনের দরজার গোড়ায় ।
কিন্তু সে যে যেভাবেই থাকুক না কেন, কেউ
কারো সঙ্গেই কোনো ভাবনা আদানপ্রদান করছে না অন্তত। এই সময়ে, ওই গোরুগুলি, তারা তাদের
মধ্যে যেমন, এই বাড়িটিও সে তার মতোই। ওই পেছনের ঝাউগাছ গুলি, এই পথ, এই পথের কুকুরগুলি,
তাদের কখনো খুব ত্রস্ত পায়ে চলা, কখনো এপাশ ওপাশ শুঁকতে শুঁকতে চলে যাওয়া, এসবের
সঙ্গে কোনো ভাষা, ভাব কোনোকিছুই কি বিনিময় করছে না কেউ এখন, এই রাত্তিরে?
কেউ কারোর দিকেই তাকাচ্ছে না যেন। সবাই
তার যার যার স্বভাবের ছন্দে, এইখানে, এমন রাতের বেলায় এসে মাঝে মাঝে শুধু মাত্র চুপটি
মেরে বসে থাকে। তখন আমাদের সব ছন্দ কি আমরা জানি সবটা? ওই গোরুগুলির মতন তো আমিও! ওই
কুকুরগুলির মতোই তো আমিও হয়ে যাই যেন, যেন এদিক ওদিক কিছু খুঁজতে খুঁজতে শুঁকে চলি
শুধুই…; কিম্বা দৌড়ে ছুটে যাই ওই পথের মাথায়। তারপর আবার ফিরে আসি। এই রাতের বেলায়
আমিও যেন ওদেরই মতন একজন হয়ে যাই, তাছাড়া আর কীই বা!?
শংকর কখনো কখনো কলেজ ফেরত বিকালের দিকে
আসে। বলে, চল, যাবি নাকি?
কোনোদিন হয়তো যাই, একটু হাঁটাহাঁটি করে
ফেরার পথে বাঁশদ্রোণী বাজার হয়েও আসি একেকদিন। খড়বিচালির জন্যে টাকাপয়সা জমা দিয়ে
ফিরে আসি ঘরে।
এই ঘোরাঘুরির মধ্যে দিয়ে অনেকটা সময় ফুরিয়ে
যাচ্ছে যে সেটা বুঝি যখন, তখন ভীষণ অস্বস্তি হয় এক ধরণের। সেটা ঠিক কীরকম সে কথা
নিজেও জানি না। কীই বা এত ভাবি?
এই পথ হাটাহাটিতে খানিকটা হালকা ঠাট্টা-ইয়ার্কি,
পথের মানুষজন দেখা। কিম্বা এ ওর আগামীদিনের জীবনটা কেমন হলে কেমন কি হতে পারে, এই সব
হাল্কা হাসি-ঠাট্টা, এই সব। আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও তর্কাতর্কি থাকে না
যে তাও না। থাকে। থাকে বর্তমান রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা নিয়ে কিছুক্ষণ কারোর কারোর। হয়তো
দেশ জাতি পক্ষপাতিত্বের কথাও। সে সবে খুব একটা গা দিই না। অর্থাৎ ভালো লাগে না বলেই
হয়তো দিই না গা। খেলাধুলা নিয়েও অতিরিক্ত আলাপ আলোচনায় মাতামাতিরও কোনো কারণ আছে
তা মানি না ।
এই ঘোরাঘুরি, যত দিন যাচ্ছে ততোই এক ধরণের
অহেতুক এক উপলব্ধিতে পরিণত হচ্ছে। অন্তত আমার কাছে। মাঝেমাঝে বাড়ি ফিরে এসে মনে হয়,
আর না। এই খালিখালি ঘোরাঘুরি করে সময় নষ্ট না করে তার চাইতে ঘরেতেই বসে থাকি, সে বরঞ্চ
কাজের কাজ হবে। ওরা এলে বলে দিই, আজ ভালো লাগছে নারে ভাই, তোরা যা, ঘুরে আয় গে।
এতে যদিও ওরা বলে, কিইবা করবি এখন ঘরে বসে
বসে? এখন কি পড়াশোনা করবি, না লেখালেখি? তাও
তো না, তাহলে? ওসব মাঝরাতে করবি। দেখবি, তখন সবকিছু কেমন আপন গতিতে এগিয়ে চলছে।
উত্তরে বলি, মাঝরাতে করবো কী রে, আমাদের
তো একখানিই ঘর। আমি যদি মাঝরাতে আলো জ্বেলে বসে থাকি, বাকি মানুষজন তাহলে ঘুমোবে কীভাবে?
ওসব ছাড়, ওই সুবিধা তোদের মতো আমার কি আছে নাকি? যাক গে, আজ ভাল্লাগছে না, তোরা যা।
আমি যাবো না এখন।
ওরা চলে গেলে বাড়িতেই চুপ করে বসে বসে সময়
কাটিয়ে দিই। আবার কোনো কোনোদিন একাই বেরিয়ে যাই। খানিকটা একা একাই হাঁটাহাঁটি করে
শেষে রমনিদার দোকানে কিছুক্ষণ গল্প করে ফিরে আসি। না হলে ঠাকুমার বাড়িতে চলে যাই।
না হলে দিদির ওখানে যেয়ে খানিকক্ষণ টেলিভিশন দেখে সময় কাটিয়ে আসি।
একেকদিন আবার চলে যাই শৈলেন মামার বাড়িতে।
ওখানে মামির হাতের এক কাপ চা পান
করে
ছেলেপেলেদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসি। বাড়ি ফেরার সময় নান্টু আমাকে ওদের পাড়ার
একটি মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যায়, কুকুর আতঙ্ক থেকে স্বস্তি পাবার জন্যে। এই এগিয়ে
দেবার মধ্যে যেটুকু পথ পেরোনো ওর হাত ধরে, তার মধ্যেই চালান করে দেয় ও যেন খানিকটা
অন্য এক তরঙ্গ।
হাঁটতে হাঁটতে কিছুদূর এগোনোর পরে হয়তো
জিজ্ঞাসা করে, কীরে, এবার যেতে পারবি তো? কুকুরে তোর এতো ভয়? কাল আসিস কিন্তু সন্ধ্যাবেলায়।
তোর সঙ্গে একটু ঘুরে আসবো ওপারের দিকে। জানিস তো, তোর সঙ্গে গেলে কিন্তু মা কিছুই বলে
না। কিরে, আসবি তো কালকে?
—‘দেখি তো...’ এই রকমের কিছুটা অনিশ্চিত সম্ভাবনার
মধ্যে রেখে শেষ করি কথা। ফিরে আসি। আবার হয়তো দীর্ঘ বিরতির পরে কোনোদিন যাওয়া হয়
ওদের ওখানে। তখন আর হয়তো হয় না। কখনো হয়তো যেতে মন চাইলেও কোনো ধরণের একঘেয়েমির
কাছে নিজেকে এগিয়ে দিতে কেন জানি কেমন এক রকম মনে হয়। তাই কোনোদিন হয়তো বেশ দোটানায়
পড়ে শেষপর্যন্ত রাইফেল ক্লাবের মোড় ঘুরে আর ওদের ওদিকটায় ঘুরি না।
আবার বেশ কিছুদিন পরে হয়তো ওর মায়ের হাতে
অতি যত্নের এক কাপ চায়ের টানে পৌঁছতে মনটা টানে। সেই এক কাপ চা হাতে তুলে দেবার মধ্যে
কী যে আন্তরিক স্পন্দনের ছোঁয়া পাই— শুধু মাত্র সেই টানেই ঘুরেফিরে ওদের বাড়িতে
পৌঁছে যেতে যেন বাধ্য হই। সেই সঙ্গে কি ওর সংসর্গটুকু মোটেও টানে না! না, সে কথা একটুখানি
স্বীকার না করলেও তো মিথ্যা বলা হয়! হ্যাঁ, সে সংস্পর্শের টান থাকলেও, পেছনে লেগে
থাকতো আর এক ধরণের ভীতি। তাই ভালোলাগা মন্দ লাগা সব কিছুই নিছক ক্ষণিকের। তাতে চিরকালীন
কোনো স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা প্রবেশ পথ পেতো না সহজ ভাবে।
মুস্কিলটি হচ্ছে এই— দুদিকের টান। শংকররা
এলে ওদের সঙ্গ না দিয়ে এই যে আমি আমার মত করে একেকদিন একেক জায়গায় কাটাচ্ছি, এবং
ঘরে ফিরে এসে এমনই এক বিষাদগ্রস্ত পরিস্থিতির মধ্যে নিজের ভেতরে নিজেই গুমরে থাকছি।
তখন কেবলই যেন মনে হয়, না, এইভাবে কেন আমি সময়গুলি নষ্ট করছি? তার চাইতে ঘরে বসে
থাকি। একান্ত ভাবে বসে থাকি। তখন কে যেন বলে, এর মধ্যেই ভুলে গেলে সব? এইভাবে ঘোরাঘুরি
করেই সময়গুলি বইয়ে দিচ্ছো? যে কাজের ব্রত নিয়েছিলে একদিন, সেটার কথা মনে নেই তোমার?
যে জন্যে ফিরে এলে আবার। সেইসব ভাবনাচিন্তার কথা তো একেবারেই বিস্মৃত হয়ে বসে আছো!
একেবারেই তো সেসব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ঘাপটি মেরে ঘুরে বেড়াচ্ছো এদিক ওদিক!
নিরন্তর যেন দুপাশের চাপ। ঘরে বসলে বাইরে
যাবার জন্যে মনটা ব্যাকুল হয়, আবার বাইরে বেরোলে ঘরের আসনখানি আঙুল উঁচিয়ে ধমকায়।
কার কথা শুনি! একসময় নিজের ভেতরে নিজেই ক্লান্ত হয়ে চিত হই শুয়ে পড়ি কেন যে সে
কথা কাকে বলি!
খানিকটা চেঁচামেচি বকাবকি করে ইদানীং দেখছি
ভাই সময় মতো নিতাইদা এলে বইপত্র নিয়ে বসে যাচ্ছে। হরির বাবা মেসোমশাই এলেও তাড়াতাড়ি
ব্যাগপত্র গুছিয়ে গাছিয়ে নিয়ে বসে যাচ্ছে পড়তে। দেখেশুনে বেশ ভালোই লাগছে ইদানীং
তাকে। কিন্তু কাজের দিদির সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না কিছুতেই যেন তার। তার করে দেওয়া কোনো
কাজই মনঃপুত
হয়
না তার । এই গন্ডগোল, ওমা! আবার দেখি সব ঠিকঠাক হয়ে গেলো যেন। বুঝে পাই না এই পরিবর্তন
কতোটা চিরস্থায়ী হবে। যাক এখন তো যা দেখা যাচ্ছে সেটা ভেবেই কিছুটা নিশ্চিন্ত হই।
পরে যা হয় তা হোক। এখন যেটুকু হয়েছে সেটুকুকেই মঙ্গলের বলে ভাবি না হয়।
দেখতে দেখতে তিন-চারটি বছর কোথা দিয়ে যে
চলে গেল বুঝতে পারলাম না।
এখন এখানে বাম রাজত্ব চলছে। এসেছিলাম কংগ্রেস
আমলে। এখন মানুষের মধ্যে সমাজতন্ত্রের পালাবদলের দিন। সর্বত্র কাস্তে হাতুড়ি আঁকা
হয় দেওয়ালে দেওয়ালে। নির্বাচনের সময় সেবারে একেবারে হই হই করে মানুষজন সমর্থন করে
নিলো সমাজতন্ত্রের সাংবিধানিক রূপ। যেন ঘরে ঘরে লালের ছড়াছড়ি। তাহলে কি সত্যি সত্যিই
সমাজ বিপ্লব একেবারে রাতারাতি ঘটে গেল, সর্বত্র? ঘরে বাইরে এত বিপ্লবের ছড়াছড়ি! স্লোগান।
যেন ভাতের হাঁড়িতেও লাল দাগ লাগিয়ে নিলো মানুষজন। সে যে কী হই হই ব্যপার! তা আর কী
বলি!
মায়েরও সেবার ভোটের ফলাফল গণনার ডিউটি পড়েছিলো।
সমস্ত রাত জেগে রবীন্দ্র সদনে গননা চললো । শেষ রাতে অফিসের গাড়িতে বাড়ির সামনে নামিয়ে
দিয়ে গেল দেখলাম। এর মধ্যে মায়ের অফিসের বাড়ি সংস্কারের কাজও চলছিল। সেই কারণেই
মনে হয় সূর্য নগরের কাছে কিছুদিন বাড়ির থেকে পায়ে হেঁটে অফিস করে আসতে পারত মা,
দেখতে পেতাম।
‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’... এই ছিল তখন পথে পথের
স্লোগান। কিন্তু বিপ্লব কোথায় যে ঘটলো তা বোঝা গ্যালো না। একজনও আর অন্য কোনো রাজনীতি
করে না যেন আর! সকলেই রাতারাতি সমাজতন্রের নামাবলী গায়ে দিয়েছে যেন এখন। অথচ ভালো
করে লক্ষ করলে দেখা যায় একই মানুষেরা জামাপ্যান্ট পাল্টে নিয়ে রাতারাতি লাল হয়ে
গ্যাছে পোশাকপরিচ্ছদেও। কেউ যেন কোনো কালে অন্য কোনো রংই চিনতো না এর আগে। দলে দলে
মানুষজন সি পি এমের সদস্যপদ পেয়ে গেল।
আমবাগানে মেশামেশির দৌলতে অমরদা বলে একজন
মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সেই অমরদা একজন সমাজতান্ত্রিকের নাম বলতো প্রায়শই।
কীভাবে তিনি সেই আমলে রাশিয়ায় চলে যান যেন সমাজতন্ত্র জানার জন্যে। সেই সময় কমিউনিস্ট
পার্টির সদস্য পদ পেতে কত কঠোর পরীক্ষার পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল তাকে। কত অপেক্ষার
পরে তখন সদস্য পদ পাওয়া যেত। তারই একটা বর্ণনা করতো প্রায়শই অমরদা। অমরদা কথায় কথায়
সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা বলে গর্ববোধ করতো। তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আছে নাকি তার
এখনোও। আমাকে বলতো, যাবি নাকি? দেখে আসবি প্রকৃত কমিউনিস্ট কাকে বলে! বয়েস হয়েছে
যদিও, তবুও চল দেখিয়ে আনি তোকে, কবে থাকে না থাকে!
বলেছিলাম যাবো। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। রবীন্দ্রনাথের
বংশধর। সম্পর্কে সম্ভবত নাতিই হবেন মনে হয়। ভাই-এর ঘরের ছেলের ছেলে বা মেয়ের ছেলে।
এরকম কিছু হবে সম্পর্কটি কিছু একটা।
একদিন বাসে করে কোথাও যেতে যেতে রাণিকুঠির
ওখানে বাসটা দাঁড়িয়ে গেল বিজয় মিছিলের জন্যে।
মিছিলের সামনে একখানি ট্রাকের মাথার উপর প্রশান্ত সুর পা ঝুলিয়ে গলায় গেঁদাফুলের
মালা পরে বসে দুই হাত নাড়তে নাড়তে জনতার উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন তাদের বিজয়ের
আনন্দে। বাসের জানলা দিয়ে সে দৃশ্য দেখলাম। মানুষের ঢল নেমেছে যেন রাস্তায়। বেশ কিছুক্ষণ
বাসের মধ্যে বসে বসে ঘামতে থাকলাম।
ক্লাব-জীবনের একটি বছরের মধ্যে সেই সময়টি—
নিতাইদার জন্যেই ক্লাবের সদস্য হয়ে যাওয়া, এবং তার জন্যেই অত মানুষের মধ্যে নিজের
লেখা পড়েছিলাম।
বেশ কিছুদিন সেই যে সংকল্প ক্লাবের হয়ে,
সেই যে নমনি রায়ের বাড়ির ছাদের মাথায় একাঙ্ক নাটকের মহড়ায় যোগ দেওয়া অভিনয় করার
জন্যে, যা বেশ কিছুদিন চললো, যদিও শেষ পর্যন্ত সে নাটক মঞ্চস্থ হয়নি আর। নিতাইদার
জন্যেই কালীবাড়িতে ঝন্টুদার চায়ের দোকানের আড্ডায় সন্ধ্যেবেলা হলে দোকানের সামনের
বেঞ্চিতে বসে বসে রাত দশটা পর্যন্ত আড্ডা দিতাম। তখন নিজেকে কেন যেন বেশ একজন কেউকেটা
গোছের মনে হতো— কেন যে মনে হতো সেটা কিন্তু
জানতে পারতাম না। তবে যাদের মধ্যে বসে বসে নানা সমাজ বিপ্লবের জয়গান শুনতাম, কখনও
কখনও সন্মতি জানাতেও বাধ্য হতাম তাদের কথার, যদিও তারা সকলেই আমার থেকে বয়েসে বড়,
তবে নিতাইদা ব্যতীত তাদের মধ্যে আর কাউকেই আমি দাদা বলতাম না, তাদের সকলের সঙ্গেই শুরুর
অভ্যাসবসত নাম ধরে ডাকাডাকির সম্বোধনেরই ছিল। এই ক্ষেত্রে প্রথম সম্বোধনের অভ্যাসটিকে
কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারিনা আজও। কারণ দুই চার বছরের ব্যবধানকে দাদা সম্বোধনে বাঁধলে,
বন্ধুত্বের সূত্রটি যেন কেমন কেটে যায়। যদিও এই স্বভাব দোষে পরবর্তী জীবনেও অনেক সূচিবায়গ্রস্থের
পাল্লায় পড়ে নিজেকেও হাঁটু ভেঙে দ হয়ে যেতে হয়েছে কত জায়াগাতেই যে, সে আর কী বলবো!
ইদানীং ঝন্টুদার দোকানের সামনেটা সন্ধ্যাবেলার
সময়টা নিয়ে নিচ্ছে প্রায়শই। বাড়ির কাজকর্ম সেরে সন্ধ্যা লাগতে না লাগতেই ঝন্টুদার
চায়ের দোকানে যেয়ে সেই যে কথাটি দিয়ে শুরু হতো, ‘দেখি, একটাকে দুটো করে দাও ঝন্টুদা’....
সেই অভ্যাসটির ঘোরে পেয়ে বসেছিলো যেন বেশ কিছুকাল। এই নিয়ে শঙ্করদের কাছেও কত অনুযোগ
শুনতে হয়েছে যে তার আর কীইবা বলি! ওরা বলতো, কী রে তোকে তো এখন চায়ের দোকানের আড্ডায়
পেয়ে বসেছে দেখছি ভালো মতোই! তুই শেষে কিনা চায়ের দোকানে ভিড়ে গেলি! একেবারে সাব
স্ট্যান্ডার ব্যপারস্যাপার সব! তুই কি জানিস, ঐ দোকানে কী কী হয়? তোর এইরকম অধঃপতন
হলো শেষপর্যন্ত? যাক, যা ভালো বুঝবি তাই করবি, আমি আর বলে কী করবো বল! তোর তো আবার
মানুষজন নিয়ে কারবারের প্রয়োজন হয়েছে শুনেছি আজকাল! কিন্তু দেখিস, এই সব গাঁজাখোর
মাগিবাজদের দলে ভিড়ে নিজে আবার ফেঁসে যেন না যাস! মানুষ খুঁজতে যেয়ে শেষে তুই না
আবার সেইসব মানুষের ফাঁদে আটকে পড়িস।
এই সব একদিন বলে গেলো শংকর ওদের দলবল সঙ্গে
করে নিয়ে এসে।
যদিও ওদের ধারণা সবটা ঠিক না হলেও অনেকটাই
যে ঠিক সেটা কিছু দিন যেতে না যেতেই বুঝতে পারলাম। শংকরের এই ক্ষেত্রে জানাজানির বহরটি
যে অনেকটাই সঠিক সেটা জেনে যাবার পরে আমার ক্ষেত্রে বেশ ভালোই হলো। নানা ধরণের মানুষজনের
আনাগোনা যে ছিল ঝন্টুদার দোকানে তার বড় একটা কারণ ঝন্টুদা ইংরাজী বাংলা মিলে বেশ কিছু
ধরণের মদ গেলাসে ঢেলে গোপনে বিক্রি করতো। অনেকেই চায়ের বদলে বেঞ্চির আবডালে রেখে সেই
গেলাসে চুমুক দিতো একটু একটু করে। সেটা কদিন যেতে না যেতেই বুঝে গেলাম। যদিও এই ক্ষেত্রে
ঝন্টুদার দোষ হচ্ছে সরকারি ট্যাক্স না দিয়ে বিনা লাইসেন্সে সে মদ বিক্রি করছে! হয়তো
ভেঙে ভেঙে বিক্রি করছে বলে দামটাও একটু বেশিই নিচ্ছে সে। তাতে আর এমন কি বিশেষ দোষের
কাজই বা করছে সে?
বিষয়টা নিয়ে বাইরে বেঞ্চিতে বসে সকলের সঙ্গে একদিন ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসাও করলাম
অন্যদেরকে, এটা কী করছে রে ভাই ঝন্টুদা?
তারা
তাতে বললো, ঠিকই তো আছে, লাগবে নাকি তোর?
একটু রাত হলেই কতজন যে ঝন্টুদার খরিদ্দার
হয়ে যেতো আমাদের মধ্যে থেকেও কেউ কেউ। এবং তারা তার অনেকদিনের একপেগের বাঁধাধরা খরিদ্দারও
বলা যায় । এতদিন যে বিষয়টি চোখে পড়েনি আজ সেটা একবারে অনেকটাই খোলামেলা হয়ে গেল
যেন। যে কথা এতদিন আমার অজানা ছিল, সেই কথাটা শংকরের জন্যে একেবারে হাট আগলা হয়ে গেল
আজ।
তা তো জানা হলো। তবে বিভিন্ন ধরণের মানুষজনের
আনাগোনা সেটা দেখাও তো কম না। তাদের নানা ধরণের আলাপ আলোচনা শোনা সেটাই বা কম কী! ঘুগনির
ঝোলের দাগ লেগে থাকা খবরের কাগজ ওল্টাতে ওল্টাতে কিছু একটা ঘোরের মধ্যে বেশ কিছুদিন
সময় কাটানো। একদিন সত্যি সত্যি দেখতে পেলাম ঝন্টুদার কাছ থেকে গাঁজার পুড়িয়া কিনে
নিয়ে ভিসা ভিসার বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে রাইফেল
ক্লাবের
খাড়া পাঁচিলের অন্ধকারে একটুখানি আড়াল খুঁজে নিয়ে হাতের তালুর উপরে গাঁজার পাতাগুলি
ভালো করে দুইহাতের তালুর মধ্যে ডলে নিয়ে তার থেকে গাঁজার বিচিগুলি বেছে বেছে ফেলে
সিগারেটের ভেতরের তামাক খানিকটি ফেলে দিয়ে বাকি কিছুটা গাঁজার পাতার সঙ্গে মিশিয়ে
নিয়ে এবারে সেই মিশ্রিত তামাকটি আবার খালি সিগারেটের খোলের ভেতর একটু একটু করে পুরে
নিয়ে এবার সেই সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে নিয়ে সে যে কি মনের সুখের টান টানতে লাগলো,
সেই দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী তো আমিও সেদিন হয়েছিলাম। কিছুক্ষণ বাদে কী ভালো ভালো কথাবার্তা
বলাবলি সে আর কি বলি। এতে নাকি তাদের বিরাট মস্তি। মস্তি কথাটির অর্থ সেদিনই প্রথম
ভালো করে বোঝাও হলো।
এরপরেও তাদের সেই দলের কিছুদিন সঙ্গি হয়েছিলাম
কখনো কখনো। ভিসার ডাকে রাইফেল ক্লাবের পাঁচিলের সেই অন্ধকার ছাওয়ায় ঘুরে এসে আবার
চুপটি করে চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে থাকা। ওদের সঙ্গে যাওয়ার মজাটা ওরা যখন গাঁজা
পান করে ফিরে আসতো তখন কতো যে ভালো ভালো দার্শনিক কথাবার্তা আওড়াতো সেটা শোনার জন্যেই
ছিল আমার বিশেষ অপেক্ষার মজা। কিন্তু এই বিষয়ের মজা পাওয়ার আনন্দ ঘোর ভাঙলো যেদিন
সামান্য একটুখানির জন্যে নান্টুর ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে মাঠের ভেতরে দেখা হয়ে যাওয়াতে
বেশ খানিকটা অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। ভাবলাম ও কি ভাবলো! ও কি গন্ধ পাইনি গাঁজার? তাহলে
ও কি ভেবে নিলো আমিও গাঁজা পান করতেই এখানে এসেছি? এই কথা যদি মামিমাকে বাড়ি যেয়ে
বলে দেয়!
সেই আমার যেন জ্ঞান ফিরলো! সামাজিক ভাবে
সেই জিনিসটা যে স্বীকৃত নয় সেই কথাটা ভেবে। যদিও এতদিন পর্যন্ত এই যে ওদের সঙ্গ করেছি
কখনো ওরা আমাকে সাধেনি গাঁজা পান করতে।
হ্যাঁ,
একদিন যদিও বলেছিলাম, দে তো দেখি, কী এমন মস্তি আছে পরখ করে দেখি। কী আছে ওতে?
সেই দিনই শেষ দিন ছিল যদিও ওদের সঙ্গে গাঁজার
আসরে রাইফেল ক্লাবের পাঁচিলের ছাওয়ায় দাঁড়ানো। কারণ তার পরের দিনই নান্টুর ভাই-এর
সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায়— কি ভেবে যে আর কখনোই তাদের সঙ্গ করিনি কেন যে সেইদিনের পর
থেকে, তা নিজেও কখনো ভেবে দেখিনি আর।
রমনীদার দোকানের থেকে ঝন্টুদার চায়ের দোকান
খুব একটা দূরে নয়, শুধু রাস্তাটির বাঁক আলাদা, ঝন্টুদার চায়ের দোকানের সামনের পথটি
সরাসরি রাইফেল ক্লাবের দিকের, আর রমনীদার দোকানটি কালীবাড়ি থেকে কুদঘাট মুখো পথের
উপর পড়ে। দূরত্বের ব্যবধান খুব বেশি না। শুধু পথের দিকটি দুটো দুদিকে এই যা। তাই বেশ
কিছুকাল, অন্তত একটি বছর তো হবেই, সেই চায়ের দোকানের আড্ডায় নিয়মিত উপস্থিতি ছিল
আমার। সেই সুবাদে নানা ধরণের মানুষজনের সঙ্গে মেলামেশা করবার সুযোগ হয়েছিল। যদিও সেই
মেলামেশায় কোথাও কোনো শিল্পের যোগ ছিল কি ছিল না কিছুই তা জানি না, তবে যৌবনের প্রথম
পর্বের সেই দিনগুলিতে যে যে মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, তাদের দেখেছিলাম খুব কাছ
থেকে তাতে বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছিলো কি হয়েছিলো না, তাও জানি না, তবে মনে হয়েছিল
এরাও যে খুব একটা খারাপ মানুষজন, তাও তো না! এইসব সমাজ থেকে যারা দূরে দূরে থেকে যে
সব শিক্ষিত মার্জিত ছেলেপেলেরা নিজেদেরকে খুব একটা আলাদা করে রেখে সংস্কৃতিবান বা কালচারালাল
শ্রেণী বলে নিজেদেরকে দাবি করে, তাদের থেকে এই সব মানুষজনদের সঙ্গে মেলামেশা করে যতটুকু
বুঝতে পারলাম তারা আর যাই হোক মেলামেশায় অনেক বেশি একাত্ম। একে অন্যের আপদে বিপদে
তারা ছুটে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাহায্য করতে একবারের জন্যেও পিছুপা হয় না। প্রয়োজনে হসপিটাল
বাড়ি সকলটাই সকলের জন্যে নিজের মতো করে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাত জেগে বা সারাদিন এক করে
ছুটোছুটি করে একসঙ্গে দল বেঁধে একে অন্যের জন্যে সমান ভাবে ভাবে।
এরা আবার নাটক জলসাও করে। আবার গাঁজা মদ্যপানও
করে সকলে মিলে একসাথে উৎসব অনুষ্ঠানে। তবে বেসামাল হয়ে নয়। নেহাতই আনন্দটুকু উপভোগ
করতে যেয়ে সেই বিশেষ বিশেষ দিনগুলিতে। তারা কেউই নিয়মিত ঝন্টুদার দোকানের মদের খরিদ্দার
নয়। আবার এদের মধ্যে কেউ কেউ চাকরিবাকরিও করে। আমার মতো কেউই গোপালক নয় বা আপন আনন্দে
কবিতাও লেখে না। এদেরকেই কখনো কখনো দেখি মিছিলের আগে আগে চলতে, ‘মানছি না মানবো না’
বলে মুষ্টিবদ্ধ একটি হাত উঁচিয়ে তুলতে তুলতে লাইন ধরে মানুষজনের সঙ্গে মিছিলে হাঁটতে
থাকে।
সে যে যেমন যে দলকে নিয়ে পছন্দ মতো হাঁটতে
থাকুক। তাতে আমার আর কী! এর মধ্যে আবার কেউ কেউ প্রেমে ভালোবাসায় একেবারে বিভোর। চায়ের
দোকানের বেঞ্চিতে বসে বসে কারোর জন্যে হয়তো অপেক্ষা করে কখন তার পছন্দের মানুষটি এই
পথ দিয়ে ঘরে ফিরবে। হয়তো তারা কেউ চাকরিবাকরি করে! হয়তো কেউ কলেজ থেকে ফেরে এই সময়
। তারপর দূর থেকে তার প্রিয় পাত্রীকে দেখে তাকে অনুসরণ করতে থাকে দেখি। এতক্ষণ যে
অপেক্ষা, এরপর তাদের কথাবার্তা চলতে চলতে পথ হাঁটা, সবটাই কত রকম ভাবে একেক জনের সঙ্গে
একেক জনের সেই যে হাঁটাহাঁটি সবটাই চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে বসে একেক সময় একাকীই
দেখতে থাকি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের ফিরে আসতেও দেখি। তখন তাদের মুখের উজ্জ্বলতার
বর্ণটিই আলাদা রকমের যেন। কী প্রশান্তির! আবার কোনো কোনো দিন বিমর্ষ হয়েও ফেরে একেক
জন তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে কথাবার্তার পরে। সবটাই দেখি চেয়ে চেয়ে। তখন হয়তো আমাকেও
দুকাপ চা বেশিও খেতে হয় তাদের সঙ্গে। আবার কেউ হয়তো কারোর জন্যে ছুটতে ছুটতে এসে
জিজ্ঞাসা করলো, এই দেখেছিস নাকিরে ওঁকে? হয়তো সে জানতে পারলো সে চলে গেছে অনেকক্ষণ।
তখন হয়তো সে মুখটি চুপসে যেয়ে বললো, যা! চলে গেল!
এই যে তাদেরকে চেয়ে চেয়ে দেখবার মুহূর্তগুলি,
তাদের তারপরের আকুলিবিকুলি করা মুখটিকে দেখে কি এক অদ্ভুত অনুভব হতো যে, তা ঠিকঠাক
বলবার ভাষা জানা নেই যেন।
আর ঠিক তখনই পথ দিয়ে হয়তো কিছু কেনাকাটা
করতে নান্টুকে দেখতাম কালীবাড়ি মুখো যেতে। আমাকে দেখে বলতো, চল না রে, আয় না, একটু
মোড়ের মাথা থেকে ঘুরে আসি।
কিম্বা হয়তো রমনীদার দোকানের সামনের সেই
জ্বলজ্বলে চোখের মেয়েটিকেও দেখতাম হয়তো হেঁটে যেতে রাইফেল ক্লাবের দিকে। কেন জানি
না ওকে দেখলেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধড়াস ধড়াস করে উঠতো।
সে চলে গেলে মনে হতো, আচ্ছা, একে দেখলে এ রকম হয় কেন?
দিদির বাড়ি থেকে বাড়ি ফেরার পথেই রমনীদার
দোকান এবং ওদের বাড়ির পথটাকে পেরোতে হয়। ফেরার পথে তাই হয়তো কখনো কখনো রমনীদার কাছে
শুনেছি, রিক্সাওয়ালা নিতাই বা বিষনি ভাই কেউ এসেছিলো কিনা দানাভুসি নেবার জন্যে। ঠিক
সেই সময়ে সেও হয়তো তাদের ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে রাস্তা পার হয়ে যেকোনো জিনিস
নেওয়ার অজুহাতে রমনীদার দোকানে চলে আসে। এই ঘটনা শুধু একদিন হলে কাকতালীয় মনে হতেই
পারতো, কিন্তু সেটা তো না, এই ঘটনা অনেকদিনই ঘটে, তখন মনে হয়েছে একে নিছক কাকতালীয়
ঘটনা ভাবা যায় না তো একেবারে! এ ইচ্ছাকৃত! তা না হলে সময়টা এইরকম ভাবে মিলে যায়
কেন? কেনই বা ওই সময়টাতেই তার একাধিক সময় জিনিসপত্র কেনাকাটার দরকার পড়ে? আবার ঝন্টুদার
দোকানের সামনে দিয়েও হাঁটাহাঁটির প্রয়োজন পড়ে যখন আমরা এখানে আড্ডা দিই। আগে তো
কোনোদিন এদিকে দেখিনি! এই তো, কিছুদিন এদিক দিয়ে চলাচল করতে করতে দেখছি তাকে! সময়টা
এইভাবে মিলে যায় শুধু শুধুই বা কী জন্যে ?
ঘটনাটা অনেকদিন ধরেই এইরকম ঘটে চলেছে। অথচ
কেউ কারোর সঙ্গে কোনো পরিচয় নেই বা নিতান্ত কথাবলাবলিও না।
আজকাল এই যে হাঁটতে চলতে এমন কোনো কথা ছুঁড়ে
দিলো হয়তো, যা শুনলে খুব সহজেই বুঝে নেওয়া যেতো সে তার পাশে পাশে চলা বন্ধুটিকেই
শুধু বলছে না সেই কথাগুলি, হয়তো তার বলা কথাটির ভেতর এমন কিছু কথা থাকতো যা বহুকেন্দ্রিক
অর্থ বোধক।
কেন মনে হতো এমনটা? সত্যি সত্যিই তার কোনো জবাব আছে আমার কাছে !
এই ধরণের ছোঁড়া কথার বিষয়টা রমনীদার
কানেও ধরা পড়েছে নাকি। একদিন তাই সেও জিজ্ঞাসা করে বসলো, এই বিষয়টা কী হচ্ছে গো?
তোমাকে দেখলেই ও বাড়ির বর্ণালীর ঘরের বাইরে ঘোরাঘুরি বেড়ে যায় কেন? এমনকি তুমি আসলেই
ও আমাদের দোকানে বারবার চলে আসে কেন?
হঠাৎ করে কোনো জড়তা না রেখে এমন ভাবে রমনীদা
যে আমাকে জিজ্ঞাসা করতে পারে এমনটা আমি কখনোই ভাবতে পারিনি! তাই আকাশ থেকে পড়বার মতো
হয়ে যাই যেন। কিছুক্ষণ তার জিজ্ঞাসার উত্তরও দিতে পারি না। কিন্তু এক সময় তো কিছু
বলতেই হয় তাকে! তাই বললাম, ও রমনীদা, এই যে আপনি ওর নামটা বললেন, আমি তো সেটাও জানি
না! ওর নাম যে বর্ণালী সেটাও তো এই আপনার মুখ থেকেই জানতে পারলাম আজকেই! তাহলে আপনার এই কথার কী উত্তর দিই তাই বলুন তো?
কিন্তু সে যাক আপনার কেন মনে হলো বা কীভাবে অনুমান করলেন আপনিও সেটা বলুন তো আমাকে?
আমি নিজেই তো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ছি, আপনি কীভাবে বুঝতে পারলেন সে কথাই ভাবছি এখন আমিও!
রমনীদা হাসতে থাকলেন। মেয়েটির চলাচল অনেকদিন
ধরেই সে লক্ষ্য করেই আজকে আমাকেই প্রথমে জিজ্ঞাসা করে জানতে চাইছে, আদোও বিষয়টা আমি
জানি কিনা বা বুঝতে পেরেছি কিনা?
তাতে বেশ খানিকটা নিঃসংকোচেই তার কাছেও আমি জানতে চাই, এই যে আপনি আমাকে যেভাবে
জিজ্ঞাসা করতে পারলেন, সেটা কি ওর কাছেও পারবেন?
সে তাতে বেশ নির্দিধায় বলে, হ্যাঁ তা
সে পারবে। কারণ তাদের সঙ্গে তার সম্পর্কের বাঁধন এমনই। কিন্তু তার আগে সে আমার কাছে
শুনে নিল। এবং আমি যদি সন্মতি দিই তাহলে সে জানতেও পারে তার কাছে।
কেন জানি না, তাকে বিরত করলাম এ বিষয়ে।
এবং বললাম, সে যেন এখনি কিছু শোনাশুনি না করতে যায়। হয়তো তার কথা ভেবেই তাকে থামিয়ে
দিলাম। কারণ আমার সঙ্গে এই মেয়েটির সরাসরি পরিচয়টাই তো নেই। শেষে রমনীদা যদি পুরো
বিষয়টিতে জিজ্ঞাসা করতে যেয়ে অপ্রস্তুত হন! তাই তাকে থামিয়ে দিই, এই নিয়ে কিছু
শোনাশুনি সে যেন না করতে যায় আগবাড়িয়ে। এ ছাড়াও আর একটি বিষয় তো রয়েছেই। সে কথা
রমনীদাকে জানাই, আমরা যে এই মুহূর্তে কিছুদিন এখানে থাকছি না সেই কথাটি। গোরুর খাদ্য
খাবারের প্রয়োজন যা সে সব নিতাই বা বিষনিভাই সামলাবে। আর ওই বিষয়ের প্রসঙ্গে তাঁকে
আর একটি কথাও বলে দিলাম, এই সব নিয়ে সে যেন বিশেষ ভাবিত না হয়। কারণ এগুলি সবই এই
বয়সের অস্থিরতা একটি। তবে তার ধারণা যে সঠিক সে কথাটিও স্বীকার করলাম তার কাছে।
রমনীদা সবটা শুনে এবার আমার যাবার বিষয়ে বেশ খানিকটা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা
করলেন, কবে তুমি তাহলে বাংলাদেশে যাচ্ছো?
বললাম, ভিসা এলেই যাবো।
সে জানতে চাইলো আমরা তিনজনেই যাচ্ছি নাকি?
বললাম, হ্যাঁ, আমরা সকলেই যাচ্ছি। কারণ
দিদিমার শরীরটা খারাপ, চিঠি এসেছে।
ওদেশে যাচ্ছি শুনে সে বেশ আপ্লুত হয়ে
গেল দেখতে পেলাম। তাঁর মুখচোখের উপর কী যে এক আনন্দের তরঙ্গ উঠে ভেঙে যেতে দেখলাম তা
কি বলবো। সে আনন্দের ঢেউ কথা বুঝিয়ে কাউকে বোঝানোর নয়। সে বলতে থাকে, বা বা যাও,
বেড়ায়ে আসোগে, এদিকের এইসব নিয়ে ভেবোনা। ওসব আমি নিতাই বা বিষনিকে দিয়েই সামলে
দেবো। ভারি মনডা চায় জানো! কিন্তু তা তো আর হয়ে ওঠে না! এই যে তোমরা যাচ্ছো এইটা
শুনেই আমার দেশের কথা মনে হচ্ছে জানো, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে কোই? দেশের বাড়ির সেই
যে গাছগাছালি ঘেরা আমাদের বাড়িটি, আজও রয়েছে, জানো? তোমার যাবার কথা শুনে চোখের সামনে
সব ভেসে উঠলো। যাও, যাও ঘুরে আসো গে; কোনো চিন্তা করো না। যাও, ভালো ভালোই ঘুরে আসো
গে, যাও চলে, কোনো ভাবনা-চিন্তা রেখো না এখানকার বিষয় নিয়ে।
রমনীদাকে
সেদিন দেশে যাবার কথা বলে সমস্ত বিষয়টিকে হালকা করে দিয়েছিলাম যেমন সে তো ঠিক আছে
কিন্তু পরে কী যে অস্বস্তি হতে লাগলো! কেবলই মনে হতে লাগলো, আচ্ছা, কী এমন কিছু দেখলো
সে যাতে এতটা সহজেই আমাকে এই রকম একটি বিষয় নিয়ে এত সহজেই জিজ্ঞাসা করতে পারলো? তাহলে
কি আমার চোখমুখের ভেতর এমন কোনো অস্থিরতা রমনীদা অনেকদিন ধরেই লক্ষ্য করে আসছিলো! সত্যিই
কি তেমন কোনো চঞ্চলতার প্রকাশ কখনো ঘটেছে আমার ভেতরে? আমি তো তেমন কোনোভাবেই কখনো কাউকে
এই নেহাত ছেলেমানুষী বিষয়টিকে কখনোই বলিনি! এই নিয়ে নিজের মধ্যে এমন কোনো স্বপ্ন
আকাঙ্ক্ষারও স্থান দিইনি! তাহলে? তবে হ্যাঁ, সে সামনে আসলে একটুখানি অস্বস্তি যে তৈরি
হয়নি সেটা বললে মিথ্যা বলা হয়, হতো, তবে সেটা অন্য কারোর বোঝার মতো না! এই যেমন পথে
চলতে চলতে কখনো হঠাৎ যদি দেখা হয়ে গেল তাহলে অদ্ভুত এক ধরণের অস্বস্তি যে দুজনেরই
তৈরি হতো সেটাও তো অন্য কারোর চোখে ধরা পড়বার মতো নয়! তাহলে কোন সূত্র ধরে রমনীদা
আজ আমাকে এইভাবে দেখে ফেললো? তাহলে কি কোনো এক চোরা পথে সেই ভাববিহ্বলতা মুখ চোখের
উপর বাসা বেঁধে ফেলেছে যে কোনো অন্তরালে যার স্বরূপটি রমনীদার চোখে ধরা পড়ে গেছে?
আর সে জন্যেই সেই বুক ঢিপঢিপ করা এক অনুভব এসে তাকে এমন একজন বানিয়ে তোলে, যাকে দেখলেই
যতো অস্বস্তি তৈরি হয়ে যায়!
আগামী পর্বে
***********************************************
প্রেজেন্ট প্লিজ S I R
শতদল মিত্র
লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল মানুষটা। সেই ভোর থেকে, আলো তেমন না ফুটতেই। গণতন্ত্রের দোহাই, মানুষটা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। দাঁড়িয়েই ছিল। তারপর সূর্য উঠল। দিন ফুটল। দিন বড় হল। রোদ বিললো। ছায়া ছোটো হতে হতে পায়ের নীচে গুটোলো। মানুষটা পড়ে গেল। হঠাৎ।
বেভুল লাইন টলল কি টলল না, টাল সামলে কেবল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল এক দমকে,
--হায় ভগবান! মরে গেল নাকি শেষে!
ফলে চৈত্রের ঝলাস টাল খেল কি খেল না মানুষটা উঠে দাঁড়াল রোদ গুঁড়িয়ে। হাতের যত কাগজ ইঁট চাপা দিয়ে বলল,
--লাইনটা রইল আমার। দেখো। প্রভু ডেকেছেন। একটু দেখা করে আসি।
মানুষটা ডানা ঝাপটে উবে যেতেই পুরো লাইনটা মুহূর্তে পটপট ঝরে গেল।
আর সে শূন্যতাকে পূর্ণ করতেই যত কাগজ পতপত উড়তে লাগল, উড়তেই লাগল!
কাগুজে ছায়াগুলো আবারও বাড়তে থাকে। বাড়তে বাড়তে একসময় অন্ধকার ছোঁবে তারা, ছোঁবেই!
প্রভুর দিব্যি!