মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

প্রসঙ্গ স্বরবর্ণ

 




স্বরবর্ণে লেখা পাঠানোর আগে নীচের বিষয়গুলি নিশ্চিত হয়ে নিন -----



১.  স্বরবর্ণ দ্বিমাসিক ওয়েব ম্যাগাজিন । 

২. লেখা মনোনয়নের ব্যাপারে সম্পাদকমন্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

৩. প্রাপ্তি সংবাদ জানানো সম্ভব নয়। নিৰ্বাচিত লেখকসূচি আমরা একমাসের মধ্যে ফেসবুকে প্রকাশ করি । 

৪.পরবর্তী সংখ্যার জন্য আপনার মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা ( গল্প কবিতা প্রবন্ধ  অণুগল্প  অনুবাদ কবিতা  ভ্রমণ কাহিনি ইত্যাদি ) পাঠান । 

৫. শব্দসীমা অনির্দিষ্ট। 

৬. কবিতার ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুটি কবিতা পাঠাবেন।  

৭. লেখার সঙ্গে আপনার একটি ছবি এবং সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, প্রকাশিত গ্রন্থ (থাকলে)  ছবিসহ পাঠান । 

৮. "স্বরবর্ণ " সামগ্রিক চিন্তার ফসল। আগে থেকে লেখা পাঠান। লেখা পাঠাবেন ওয়ার্ড ফাইলে, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা
 ই-মেইল বডিতে টাইপ করে। পিডিএফ বা লেখার ছবি তুলে পাঠাবেন না।




* হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর   8777891532

*ই-মেইল --- debasishsaha610@gmail.com 



                                সম্পাদকমণ্ডলী                                                 

ড. শুভঙ্কর দে          ড. অলোক কোৱা

সৌম্যজিৎ দত্ত           দেবাশিস সাহা

তোমায় খুঁজে ফিরি * স্বামী বিরজানন্দ

 




পরমার্থ প্রসঙ্গ

স্বামী বিরজানন্দ


জ্ঞানমার্গে গোড়া থেকেই সমস্ত অস্বীকার করতে হয় -নেতি, নেতি -আমি এ নই, ও নই; যা কিছু দেখছি শুনছি, অনুভব করছি, কিছুই আমি নই। আমি দেহ নই, মন নই, ইন্দ্রিয় নই, আমার রোগশোক, সুখদুঃখ, শীতোষ্ণ জ্ঞান নেই। জগৎপ্রপঞ্চ সর্বৈব অসৎ, অর্থাৎ ত্রিকালে -ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমানে -এর অস্তিত্ব নেই। আমি অখণ্ড সৎ-চিৎ-আনন্দরূপে পূর্ণব্রহ্ম, পরমাত্মা, একমেবাদ্বিতীয়ম্। দেহাদি উপাধিবিশিষ্ট জীবের পক্ষে এরকম সাধন কি কখনও সম্ভব হয়! কাঁটা ফুটছে, আগুনে পুড়ছি, তবুও কোন যন্ত্রণা বোধ হচ্ছে না। এ হচ্ছে বিষয়সম্পর্কবর্জিত ত্যাগী সাধকের চরম অবস্থা, যা সমস্ত সাধন ও সিদ্ধির শেষ নির্বিকল্প সমাধিতেই উপলব্ধ হয়। ঠাকুর বলতেন, সে অবস্থায় একুশ দিনের বেশি শরীর থাকে না।


Towards the Goal SUPREME

 Swami Virajananda


Supreme love of God cannot be acquired without the attainment of Knowledge also that is to say, without realisation that my Chosen Ideal, God, is in all beings and individuals, that the animate and inanimate worlds have no separate existence apart from Him. The feeling of identity, or oneness, between the Supreme Self and the animate and inanimate worlds, as well as the inner-self, is itself Supreme Love and Supreme Knowledge. But the two paths and the modes of spiritual practice pertaining to each, differ according to the respective bent of mind and qualifications of the aspirants. Persons qualified to tread exclusively the path of Knowledge are rare in the world; the path is also extremely arduous. For this reason, Bhakti mixed with Jnâna is preferable.



*******************************************************************************

গ্রন্থ আলোচনা * অরিন্দম মুখোপাধ্যায়





কবি অমিতাভ সেন এর ভক্ত কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করলেন তরুণ কবি ও আলোচক অরিন্দম মুখোপাধ্যায় 


‘ভক্ত’: অন্ধত্ব থেকে অনুসন্ধানের যাত্রাপথ

অরিন্দম মুখোপাধ্যায়


‘ভক্ত’ বললে প্রথমেই যা মনে পড়ে তা হল ভক্তি। এখন প্রশ্ন হল, কীসের? তাঁর সদ্য প্রকাশিত কবিতার বইয়ের এই নামকরণের পর কবি অমিতাভ সেন আমাদের সেই ভক্তির সামান্য আভাস দিয়েছেন এই বইয়ের বিভাবে। তিনি লিখেছেন ঘরফেরতা রেলগাড়ির অনর্গল ছুটে চলার কথা, পথ খুঁজে না পাওয়ার কথা। এই বই সেই খোঁজকে বারবার মনে করায়। নিজেকে খুঁজে পাওয়ার পথে কবির বিভিন্ন পর্যায়ের উত্তরণের চিহ্ন বহন করে এই বইয়ের প্রতিটি কবিতা। জীবনের অসীমত্বের প্রতি কবির নিস্তব্ধ সাধনার প্রামাণ্য নথি হয়ে ওঠে এই বই।

অমিতাভ বই শুরু করেছেন যে কবিতা দিয়ে, তার নাম ‘ভেজাল জল’। প্রথম কবিতার, প্রথম লাইনেই তিনি এই জীবনের ক্ষুদ্রতাকে স্বীকার করেছেন। মৃত্যুকে দেখেছেন সামান্য, সহজের মতো, ‘জীবন যখন জন্মে, মরে সহজে/ কী করার আছে মানুষের সেক্ষেত্রে!’ অথচ পাঠক হিসাবে প্রশ্ন আসে, যে কবিতা শুরু হচ্ছে আধ্যাত্মিকতাকে লক্ষ্য হিসাবে রেখে, তার শিরোনামে ‘ভেজাল জল’ কেন? এর উত্তর আমরা পাই কবিতার শেষে এসে। কবি ব্রহ্মাণ্ডকে আলাদা কোনও শক্তি হিসাবে দেখতে চাননি, দেখতে চাননি কোনও দেবতার নৈমিত্তিক সৃষ্টি হিসাবে। তিনি মানুষ ও সৃষ্টিকে দেখেছেন একত্রে। মানুষের কর্মফলের চূড়ান্ত পরিণতি হিসাবে চিহ্নিত করেছেন এই ধ্বংসকে। পাঠককে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে অমিতাভ লিখছেন, ‘হদিস মিলবে না জেনে, মানুষ/ কেড়ে খায় ভাষা, জলহাওয়াবন/ যে-ভাষায় বলেছে কথা এতকাল।’

এই বইয়ের প্রতিটি কবিতা আমাদের চারপাশের সময়কে প্রতিফলিত করে। প্রতিফলিত করে সময়ের হতাশা, ক্ষোভ। অথচ তার সঙ্গে মিশে যায় কবির আত্ম-অন্বেষণের দৃঢ় চেতনার অনুভূতি। তাই অন্ধকারকে বিষয় হিসাবে বেছে নিলেও, প্রতিটি কবিতা নিজস্ব শরীরে জ্বালিয়ে রাখে আশার ক্ষীণতম আলো। তাই ‘ভক্ত’ বই হিসাবে সমসাময়িক সমাজ এবং সময়ের এক অদৃশ্য দলিলপত্র হলেও, আবেদনে সমস্ত পাঠকের কাছে সর্বাঙ্গীন হয়ে উঠতে পারে। ঠিক যেমন ‘কথোপকথন’ কবিতা অমিতাভ শুরু করেছেন মায়ের মৃত্যু সংবাদ দিয়ে। উঠে এসেছে এই নৃশংসতার পাশে ঘটে চলা উৎসবের ছবি, শিল্পপ্রদর্শনীর ছবি। অথচ কবিতার শেষে সেই মাতৃবিয়োগের শোককে বিসর্জনের পাশে বসিয়েছেন তিনি। নীরবতাকে দেখেছেন সমস্ত প্রশ্নের শেষতম উত্তর হিসাবে।

এই বইয়ের বেশ কিছু কবিতায় অমিতাভ দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করেছেন রূপকের বিপরীতে। চিত্রকল্পের ভিতর জন্ম দিয়েছেন আশ্চর্য কনট্রাডিকশন। নাম-কবিতার শুরুতেই ছবি এঁকেছেন কার্ফিউয়ের। যে দৃশ্য ক্ষতের গল্পে বলে, শোনায় রক্তের কাহিনি, তার পাশে লিখেছেন কোরবানির কথা, আত্মসমর্পণের কথা। মানুষের জীবনে নেমে আসা আকস্মিক এই অভিশাপকে পবিত্র স্নানের সমতুল্য করে তুলেছেন তিনি। ভক্তর মুক্তিতে দেখতে পেয়েছেন ঈশ্বরের মৃত্যুকে। শেষতম লাইনে এসে অধুনা দেশে বিচ্ছিন্নতার শ্রেষ্ঠ অস্ত্রকে খুন করিয়েছেন ভক্তের হাতেই। লিখেছেন, ‘কামড়ে ধরে ধর্ম/ চিবিয়ো মাস তুমি, ভক্ত।’

গোটা বই জুড়ে বিভিন্ন ফর্মের ব্যবহার করেছেন অমিতাভ। বিষয়ের উপযুক্ততা বিচার করে, বেছে নিয়েছেন প্রয়োজনীয় সামগ্রী। মুক্তছন্দের কবিতা, ছন্দের কবিতা, চতুর্দশপদী—প্রত্যেকেরই অবস্থান রয়েছে এই বইতে। এছাড়াও, অমিতাভর উর্দুর উপর দখল ও শব্দের ব্যবহার বেশ কিছু কবিতায় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। ‘বেকারার’ শব্দের সঙ্গে দিলের যোগাযোগ, অর্থাৎ মনের। অথচ অমিতাভ এই বিশেষণকে জুড়ে দিয়েছেন মস্তিষ্কের সঙ্গে। শারীরিক কামনার আকুতি, প্রেমের তীব্র নেশার যে ঘোর, পলাশের গন্ধের ন্যায় যার মধুরতা—সেই অনুভূতি উর্দুর ব্যবহারে যেন আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। অমিতাভ লিখছেন, ‘চক্রব্যূহ, গ্রাস করে সর্বাঙ্গ; পলাশ/ জ্বলে চোখে-মুখে, দিমাগ ভি বেকারার/ দেয় না দিল, শ্বাস নেওয়ার অবকাশ।’

কিছু কিছু কবিতা উপমা ও রূপক থেকে সরে এসে সরাসরি আঘাত করেছে প্রতিষ্ঠানকে। যে ক্ষোভ অমিতাভর ভিতর জমা হয়েছে এই সমাজের প্রতি, তা তিনি পাঠককে জানাতে চেয়েছেন কোনও মুখোশের সাহায্য ছাড়া। সেসব কবিতায় সততা ও ভয়াবহতা বিরাজ করেছে পাশাপাশি। এক্ষেত্রে পাঠকের মনের অস্বস্তি কবিতার দুর্বলতার পরিবর্তে সার্থকতার সমার্থক হয়ে উঠেছে। অমিতাভ লিখেছেন, ‘কালো হল দেহ তার/ শ্রমের ফেরে,/ আর রাষ্ট্র লেখে তথ্য/ মঞ্চের তরে’। এই প্রশ্ন পাঠককে শান্তি থেকে দূরে নিয়ে যাবে। তার অন্দরের নৈতিকতাকে ক্ষত-বিক্ষত করবে। রূপক যে অনুভূতিকে শোকার্ত করে তুলত, অমিতাভর শব্দের দৃঢ়তা তাকে জ্বলন্ত ক্রোধের দিকে ঠেলে দেয়। কবি এভাবেই তার কবিতার শরীরকে ব্যবহার করে তার অভিমুখ নির্দেশ করেন, যার হাত ধরে বক্তব্য কখনও কখনও বাণী হয়ে ওঠে।

শব্দের ব্যবহার যেমন এই বইয়ের শক্তি, তেমনই দুর্বলতাও। বেশ কিছু কবিতা সাধারণ শব্দের ব্যবহারে আরও বেশি সাবলীল হয়ে উঠতে পারত অথচ অতিরিক্ত তৎসম শব্দের ব্যবহার তাকে জটিল করেছে। শব্দের আধিক্যে বক্তব্য লঘু হয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। তবে সবরকম গুণ ও দোষ নিয়েও প্রত্যেকটি কবিতা তার স্বকীয়তা বজায় রাখে। যে ধারণা থেকে, যে বিভাব দিয়ে এ বইয়ের যাত্রার শুরু, সেই আগুনের আঁচ লেগে থাকে প্রতিটা পাতায়।

কবিতার বই হিসাবে ‘ভক্ত’ তবে কেমন? সরলও নয়, সহজও নয়। তবে কি জটিল? না, তাও নয়। তবে? ‘ভক্ত’ যেন এর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক অচেনা জগৎ, যে নিজস্ব পথের অপেক্ষায় দোদুল্যমান। সে উত্তর খুঁজছে—অস্তিত্বের, ন্যায়ের, জন্মের, মৃত্যুর। ঠিক একজন ভক্ত যেমন খুঁজে চলে তার ঈশ্বরকে।

 

বইয়ের নাম: ভক্ত

কবি: অমিতাভ সেন

প্রচ্ছদ: অমিতাভ সেন

প্রকাশক: ধানসিড়ি প্রকাশন

প্রথম প্রকাশ: মে ২০২৬

মূল্য: ২২০ টাকা

 

আলোচক পরিচিতি: অরিন্দম মুখোপাধ্যায় কবি ও গদ্যকার। সিনেমা, সংগীত, খেলাধূলা, সাহিত্য, এমন বিবিধ বিষয়ে তাঁর আগ্রহ, নিয়মিত লেখালেখিও করেন। এযাবৎ প্রকাশিত তাঁর দুটি বই ‘একহাত মাত্র দূরে’ (২০২২) ও ‘সামান্য জলের নেশায়’ (২০২৬)। প্রথমটি গদ্যের, দ্বিতীয়টি কবিতার।

প্রভাত ভট্টাচার্য





ধারাবাহিক রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনি 

প্রভাত ভট্টাচার্য

পর্ব -11


   ফেরার পথে সূর্য আর অনুজ কথা বলতে বলতে আসছিল। 

   স্যার আপনার প্ল্যান একদম দুর্দান্ত ছিল। অনুজ বলল। 

   আসলে সবাই মিলে একসাথে কাজ করে সবকিছু সম্ভব হয়েছে । আর আপনিও তো দারুন বাহাদুরির পরিচয় দিয়েছেন। 

    এখন আমাদের যেতে হবে আনন্দ স্যারের কাছে। উনি কথা বলবেন বলেছেন। 

    ঠিক আছে, কিন্ত তার আগে একটু চা টা খেয়ে নিলে ভালো হয়। 

    অফ কোর্স। 

    চা টা খেয়ে নিয়ে ওরা গেল আনন্দ কুমারের সাথে দেখা করতে। 

    কনগ্র্যাচুলেশনস স্যার। ইউ হ্যাভ ডান আ গ্রেট জব। বলে উঠলেন উচ্ছ্বসিত আনন্দ কুমার। 

    আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র। ওরা সাংঘাতিক কাজ করতে যাচ্ছিল। ওই রোবটগুলোর ক্ষমতা অপরিসীম। তাছাড়াও রাসায়নিক অস্ত্রও রয়েছে ওদের হাতে। ক্ষমতাপাগল লোকজন এসব দিয়ে অনেক কিছুই করতে পারে। হঠাৎ ওদের আক্রমণ করলে অনেক হতাহত তো হতই ,আর হয়ত ওরা এইসব নষ্ট করে ফেলত। এখন এগুলো আমাদের দেশের প্রতিরক্ষার কাজে লাগতে পারে। 

    হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছেন। ঐ সবকিছু আমরা সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করছি। 

    আর ঐ সুপার রোবটটাও। 

    অবশ্যই। আবার আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। 

    এর মধ্যে আবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফোন করলেন। তিনিও প্রচুর ধন্যবাদ জানালেন সূর্যকে। 

    এবারে আনন্দ কুমারের থেকে বিদায় নিয়ে সূর্য চলল তার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা হোটেলে । ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। একটু বিশ্রাম দরকার। 

     হোটেলের ঘরে বসে সে ফোন করল কৃষ্ণকে। 

    আমার যেন ধড়ে প্রাণ এলো । কৃষ্ণ বলে উঠল। কি চিন্তা যে করছিলাম। আর কেউ কিছু বলতেও পারছে না। যাক, তুমি ঠিক আছো তো  ?

     একদম। জানি তুই খুবই চিন্তা করছিলিস। কিন্ত কোন উপায় ছিল না রে। এতই গোপনীয় ছিল ব্যাপারটা। 

    ফিরছো কবে?

    কালকেই। ওরা ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে রেখেছে । সব কথা গিয়ে বলবো ।

    ঠিক আছে। আর হ্যাঁ, দিদিকে ফোন করে নাও। 

    হ্যাঁ, করছি। 

    এবারে উজ্জ্বয়িনীকে ফোন করল সূর্য। 

    কি ভীষণ চিন্তা করছি আমরা। সব ঠিক আছে তো ?

    সব ঠিক আছে। আমি ভালো আছি। কালকেই কলকাতায় ফিরবো, তখন সবকিছু বলবো। কৃষ্ণর সঙ্গেও কথা হয়েছে ।

    আচ্ছা।  খাওয়াদাওয়া করে নাও। 

   ঠিক আছে, করছি। 

   তারপরে দিদি সৃজাকে ফোন করল। সে এসব কিছুই জানে না। আর কৃষ্ণকেও বারণ করেছিল না জানাতে। জানলে দুশ্চিন্তা করত। 

    কি রে কেমন আছিস? দিদি বলল । কতদিন বাদে কথা হল।  আর শোন,  সামনের মাসে তিয়াশার জন্মদিন। আমি গিয়ে বলবো। চলে আসবি কৃষ্ণ আর উজ্জ্বয়িনীকে নিয়ে। তারা সব ভালো আছে তো  ?

    একদম ঠিক  আছে। আর তিয়াশা, জামাইবাবু সবাই ভালো আছে তো  ?

   সবাই ভালো আছে। 

     ফোন রেখে তারপরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, তার খেয়ালই নেই।


    আজ  ফেরা কলকাতায়। একফাঁকে একটু দিল্লিটা ঘুরে নিলে হত, কিন্ত একা একা আর ভালো লাগছে না। কৃষ্ণকে ছাড়া অভিযান তো বড় একটা হয় না। 

    আজ ভীষণ অলস লাগছে সূর্যের। বিছানা ছেড়ে আর উঠতেই ইচ্ছে করছে না। ঘরেই ব্রেকফাস্ট দিতে বলে দিল সে। 

   একটু পরেই বেল বাজল। 

   অনুজ এসেছে। 

   গুড মর্নিং। 

   গুড মর্নিং। এই একটু দেখা করতে এলাম। 

   দুজনে খানিকক্ষণ কথাবার্তা হল। 

   কলকাতায় এলে আমার বাড়িতে আসবেন। 

   অবশ্যই। ফোন করে নেবো। আমি আগে গিয়েছি কলকাতায়  ।

   আপনার বাড়ি কোথায়?

   বিহারের গয়াতে। । 

    বিখ্যাত জায়গা। 

    গেলে আমাকে বলবেন। 

    ঠিক আছে। 

    আর আপনার এই বিরাট কাজের জন্য আপনি পুরস্কার পাচ্ছেন, আমি জানতে পারলাম। 

    একটু পরে সে বিদায় নিল। 

    এর মধ্যে কৃষ্ণ, উজ্জ্বয়িনী ,দুজনেরই ফোন করা হয়ে গেছে। 

   প্লেনে বসে একটু ঘুম পেয়ে গিয়েছিল। 

   কলকাতায় এয়ারপোর্টে কৃষ্ণ আর উজ্জ্বয়িনী এসেছিল তাকে নিয়ে যেতে। 

    গাড়ি চালাতে চালাতে কৃষ্ণ বলল, আজ আমি নিজে রান্না করেছি। 

    বাঃ, তাই নাকি! বলে উঠল সূর্য। আজ তাহলে জমিয়ে আড্ডা হবে।


 পর্ব 12

সবকিছু সবিস্তারে


     বাড়িতে এসে গুছিয়ে বসার পর কৃষ্ণ বলল, এবারে বলি আজকের মেনু। 

   বল ।

    পোলাও, চিলি চিকেন, ফিশ ফ্রাই, চিংড়ির মালাইকারি, পায়েস। আর দিদি সন্দেশ এনেছে। 

    করেছিস কি  ! এ তো এলাহী আয়োজন। 

    এদিকে উজ্জ্বয়িনীও কফি বানিয়ে নিয়ে এসেছে। 

     এবারে তাহলে পুরো ব্যাপারটা শোনা যাক 

বলল উজ্জ্বয়িনী ।

    হ্যাঁ, বলছি। বলে কফির কাপ হাতে সূর্য বলতে শুরু করল, 

 ডিফেন্স আর ক্রাইম ব্রাঞ্চ থেকে জানতে পারে যে ঐ জায়গায় কোন গোপন পরিকল্পনা চলছে। কিন্ত ব্যাপারটা যে কি,সঠিক বুঝতে পারা যায় না। তখন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় ওখানে গিয়ে সব অনুসন্ধান করার জন্য। আমার সঙ্গে যায় দক্ষ অফিসার, অনুজ। আমি বিজ্ঞানী সাজি, আর অনুজ হয় কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ। 

     বাঃ তোমার নামডাক তো তাহলে দারুণ। গর্ব হয় তোমার জন্য। কৃষ্ণ বলল। 

   ওসব ছাড়। এখন শোন, অজয় নামে একজন ওখানে ঘাঁটি গেড়ে ছিল । জায়গাটার নাম হুকুমগড়, উত্তরপ্রদেশের এক নির্জন জায়গা কাছেই জঙ্গল। অজয় তার সায়েনন্টিস্ট কাকার বাড়ি আর ল্যাব পেয়েছিল । সেখানে অন্য অনেক কিছুর সাথে কয়েকটা রোবটও ছিল । অজয়ের মাথায় কি যে হয় , সে ভাবে সে দলবল পাকিয়ে নানা জায়গা আক্রমণ করবে আর সবকিছুর অধিপতি হবে। তাই সে রাজামশাই খেতাব নিয়ে কিছু উল্টোপাল্টা লোক জুটিয়ে সবকিছুর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। 

    বাবা, এ তো পুরো গল্পের মত। উজ্জ্বয়িনী বলল ।

   অনেকটাই। আর আমি নিজেকে বিজ্ঞানী পরিচয় দিয়ে বললাম যে আমার কাছে এক মারণাস্ত্র  তৈরির ফর্মুলা আছে। সে তাই বিশ্বাস করল । এদিকে আবার যথাসময়ে আবির্ভাব হল সম্রাট অশোকের ।

    সে আবার কোত্থেকে এলো  ? কৃষ্ণ বলল। 

    সে একজন বিজ্ঞানী । কাছেপিঠে ওৎ পেতে ছিল। সে সম্রাট হতে চায়। 

    সে যখন আমাকে ল্যাবে নিয়ে গিয়ে কথা বলছিল,  তখন আমি আর অনুজ স্বমূর্তি ধারণ করি, আর ওদের দুজনকে কাবু করি। তার আগেই আমি পুলিশকে আসার জন্য সিগন্যাল দিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর তো পুলিশ এসে সবাইকে অ্যারেস্ট করল। সরকারের লোক এসে পুরো জায়গাটার দখল নিল ।

    আর ওদের সুপার প্ল্যান ভেস্তে গেল। উজ্জ্বয়িনী বলল। 

     রোমহর্ষক ব্যাপার। তবে তুমি না থাকলে ওরা ওদের কাজ চালিয়ে যেত। ইউ আর দ্য বেস্ট। বলল কৃষ্ণ ।

   একদম ঠিক। উজ্জ্বয়িনী সমর্থন করল তাকে। 

   যাক, এবার তো বেজায় ক্ষিধে পেয়েছে । তোর পোলাও চিলি চিকেন আর সবকিছুর সদ্ব্যবহার করা যাক। 

   নিশ্চয়ই। বলে উঠল কৃষ্ণ।




************************************"**************************************************************




প্রভাত ভট্টাচার্য  

তিনি সব্যসাচী--- এক হাতে সামলান চিকিৎসকের গুরুভার দায়িত্ব আর এক হাতে ফোটান সাহিত্য সৃষ্টির ফুল। দ্য হার্ট, মিশন পসিবল, মাই ডটার, রাজবাড়িতে রক্তপাত , ডিটেক্টিভ সূর্য এবং কবিতা সংকলন - কাগজের মানুষ এবং ফিনিক্স পাখি তাঁর উজ্জ্বল সাহিত্যসৃষ্টি । সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর  তিনটি ভিন্ন ধরনের উপন্যাস - দশভুজা, কাগজের মানুষ ও মায়াবী গ্রাম। এছাড়াও তাঁর আর একটি মনভোলানো সৃষ্টি 'গুহা মানবের ডায়েরি'  




উপন্যাস * দীপংকর রায়




কথা দিয়েছিলাম হেমন্তের নিয়রে 

পর্ব ২৪

দীপংকর রায় 


নানা অভিযোগ সহ দিদিমার চিঠি এলো । তাতে জানা যাচ্ছে তার শারীরিক অসুস্থতার কথা। সে লিখেছে… “স্নেহের মা অঞ্জলী, বেশ কিছুকাল তোমরা কোনো সংবাদ নেও না আমার। এবং নেওয়ার  প্রয়োজনও বোধ করো না। এখানে আমি কেমন থাকি না থাকি তাতে তোমাদের কোনো ভাবনাচিন্তা নেই। তোমার বড়ছেলেও একটি চিঠি লেখে না।  রসিকদার চিঠির ভেতরে একখানি চিঠি লিখে সে যেন তার সব দায়িত্ব পালন করে ফেলেছে। মাঝে শুনলাম সঞ্চয়কেও সে  চিঠি দিয়েছিলো। তাই-তো সঞ্চয়ের মুখ থেকে যেটুকু জানতে পেরেছি। সে লিখেছে, সে নাকি নানা ঝামেলার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তোমার ছোটো ছেলে নাকি পড়াশোনা ঠিকমতো করছে চাইছে না। মনে হচ্ছে সেও মানুষ হলো না। তোমার বড়ছেলেকেও তো মানুষের মতো মানুষ করবার জন্যে কম চেষ্টা করিনি! সেও আমার কথা শুনলো কোই? তোমরা আমাকে দোষারোপ করতে পারবে না। তাকে এতো করে বুঝিয়েও পারলাম না। তুমিও একেবারে লেগে গেলে আদাজল খেয়ে লেগে গেলে তাকে এদেশ থেকে উৎখাত করবার জন্য । সেও চলে গেলো। এবার তোমার ছোটো ছেলে এলো কাইলের সঙ্গে। যতদিন সে এখানে ছিলো ততোদিন আমি নানা মানুষজনের‌ কথাবার্তা শুনেছি তাকে নিয়ে। সেসব সবটাই জানো। এবং সেই কারণেই তখন তাকে তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছিলাম তাড়াতাড়ি করে। তুমি নিয়েও গেছিলে। কিন্তু সেই-যে গেলে, তারপরে এতোকাল কাটলো, আর তার তোমাদের কোনো খবরাখবর কিছুই জানালে না । তোমার বড় ছেলের কথা বাদ দিয়ে যা বুঝি, সে তো অনেককিছুই বুঝে গেছে। তাকে আমি তো নানারকম ভাবে বুঝিয়েছিলাম, প্রয়োজন হলে তুমি এদেশের বড় কোনো শহরে যেয়ে থাকো।  তার জন্যে যা লাগে আমি ব্যবস্থা করবো। সেখানে বসে তুমি তোমার লেখাপড়া লেখালিখি যা পারো করোগে। আমার শান্তি শুধু তাতে এইটুকুই হতো, সে মাঝে-মধ্যে গ্রামে আসবে । এই দেশের ভেতরেই থাকুক অন্তত সে । ওদেশে যেয়ে তার কী হবে? কে কার কথা শুনতে চাইলো! বুঝতেও চাইলো না। সে ওই দেশে চলে যেতে একেবারে পাগল হয়ে উঠলো। তখন আর আমার জোর থাকে কোথায় বলো? তার ধারণা সে ওদেশে গেলেই তার সবরকমের সুযোগ সুবিধা পেয়ে যাবে। জানি না, সে কী এমন সুযোগ সুবিধা এতোদিনে পেয়েছে? কীই বা করতে পেরেছে ইতিমধ্যে সে, তাও জানি না । তুমি গ্যানেনদিরকে কথা দিয়ে গেছিলে। সেই বিষয়েও তো কিছুই জানালে না? তাকে জানানোটাও কি একটা ভদ্রতার মধ্যে পড়ে না ? সেটাও মনে করলে না কিছুই। সেই বিষয়ে তুমি তোমার শাশুড়ির সঙ্গেই-বা কী আলাপ আলোচনা করেছো ? তাও জানানোর দরকার মনে করলে না। 

     যাক সেসব। যা ভালো মনে করেছো সেটাই করেছো। আমি অবশ্য গ্যানেনদিরকে বলে দিয়েছি অন্য চেষ্টা করতে। আমার শরীর মোটেই ভালো না। মাথায় যন্ত্রণা। বুক ধড়পড় করে সব সময়। ডাক্তার বলছে গ্যাসের আধিক্য থেকেই বলছে এইসব হচ্ছে নাকি। প্রেসার বেশি। বিনেদপুরের বিজিত ডাক্তারকে দেখিয়েছি। সে ওষুধ দিয়েছে। তার ওষুধ খাওয়ার পরে নারানকে দিয়ে দেখিয়েছি প্রেসার। এখন প্রেসার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে । কিন্তু মাথার জ্বালা কমছে কোই ? সবসময় একটি ভিজে গামছা পেটে আর মাথায় দিয়ে রাখতে‌ হয়। মাঝেমাঝে মনে হয় এই বুঝি জীবনটা বেরিয়ে গেলো।‌ আর সেটাই যদি ঘটে যায়, তাহলে কী হবে ? এই সয়াল সংসারের সবই তো থাকলো পড়ে। এসবের কিছুই তোমরা পাবে না । তাই এই চিঠি পাওয়ামাত্র চলে এসো। এখানকার একটা বিহিতব্যবস্থা করতে চাও তো করো কিছু। আমি আর ভাবতে পারছি না। সবকিছুই চারদিকে ছড়ানো ছিটানো থাকলো পড়ে। ধানপাটের যা অবস্থা। একা পাইচো আর কতো সামলাবে? বর্ষায় ধানে মলন না দিতে পারার কারণে সব ধান গুমিয়ে উঠছে। কল বেরিয়ে যাচ্ছে। এখানে এসে না দেখলে সেটা বুঝতে পারবে না, এখানের কি দূরবস্থা। 

     সঞ্চয় তো এখন এখানে থাকে না। সে চূয়াডাঙায় তার দিদির ওখানে থেকে পড়াশোনা করতে চলে গেছে। মাঝেমধ্যে বাড়ি আসে। তাই কাকে দিয়ে যে একখানা চিঠি লেখাই, তেমন লোকও পাই না। দাদা এখন আর লিখতে পারে না ভালো করে। সে আর এখন ভালো চোখে দেখতে পারে না। তাই কাকে দিয়ে যে একখানা চিঠি লেখাবো, তেমন লোক ও পাই না। এই সঞ্চয় বাড়িতে এসেছিলো বলে, তাই তাকে দিয়ে  তোমাদের কাছে একটা খবরটা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তোমাদের আর কীভাবেই-বা সংবাদ পাঠাবো তাই  বলো ?

   যাই হোক, এই চিঠি পাওয়ামাত্র তোমরা চলে এসো। আমিও পাসপোর্ট করিয়ে রেখেছি। ভেবে রেখেছি তোমাদের আসার সংবাদ নিশ্চিত হলে ভিসা করতে দেবো। তাই যা হয় কিছু একটা জানিও  অন্তত। তোমরা জানালেই এদিককার গোছগাছ লোকজনকে ধরে-করে একটুখানি করে রাখবো। এই কারণেই তোমাদের আসার পথের দিকে চেয়ে‌ থাকলাম এখনে। সঙ্গে তোমাদের কুশল জানিও। ইতি তোমার নিত্য শুভাকাঙ্ক্ষী, মা —  সুরাজবালা"

                                               

     দিদিমার এই চিঠি পাবার সঙ্গে সঙ্গে মাকে দেখলাম বেশ উতলা হয়ে উঠতে। এবং এই প্রথম ভারতীয় পাসপোর্টের আবেদনপত্রে সহিসবুদ করে দিলাম আমি এবং ছোটো ভাই দুজনেই। এবং পাসপোর্ট ও খুব দ্রুত হয়ে চলে এলো। সেটা এই জন্যেই হয়ত, কারণ পাসপোর্ট অফিস তখন   মায়ের ডিপার্টমেন্টের নিচের তলাতেই। যেহেতু একই জেলাপ্রশাসকের অধীনে, তাই সেখানে একটু তদবির-তদারকিতেই কাজ হয়ে গেলো। সপ্তাহ খানিকের মধ্যেই পাসপোর্ট তৈরি হয়ে হাতে চলে এলো। 

     ওদিকে দিদিমাকে মাও একখানি চিঠি লিখে দিয়েছে এই বলে, “পরম পূজনীয়া মা, তুমি আমার প্রনাম নিও। সঙ্গে সঙ্গে এটাও জানাই তুমি একদম ভেঙে পড়ো না । তারপরেও ঠাকুর বলেছেন, যা ভবিতব্য সেটাই

হবে। সবটা তো আর আমাদের হাতে নেই! তবে আমার মনে হয়, আমার গুরুর আশির্বাদে তোমার কিচ্ছু হবে না। তবে দূর্ভোগ যেটুকু আছে সেটুকু তো ভোগ করতেই হবে। প্রারাদ্ধের হাত থেকে রেহাই নেই কারো। 

       কয়েকটি বাস্তব পরিস্থিতির কারণেই, তোমাকে এবারে ওই দেশ ছাড়ার কথা বলেছিলাম অনেক আগেই। তুমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলে না। ইতিমধ্যে এতগুলি দিন পেরিয়ে গেলো, তাও তুমি এদেশে চলে আসার একটুও চেষ্টা করলে না  ! অথচ দেখো, তোমাকে ওদেশে থেকে আনার জন্যে কী না আমি চেষ্টা করেছি ! তোমার জন্যেই এত সব, গোরু বাছুর সবই তো সংগ্রহ করলাম! এখন না হয় সেগুলির বংশ বৃদ্ধি হয়েছে। বড় পুত্র কেন জানি না ইতিমধ্যেই বেশ অনেকটাই বুঝেশুনে নিয়েছে বলে, ওদিক নিয়ে এখন আর আমার বিশেষ কিছু ভাবনাচিন্তা  থাকে না। বেশ কিছুটা চিন্তামুক্ত হয়েছি বলতে পারো, ঐ বিষয়ে। তবে ছোটো পুত্র কে নিয়েই এখন আমার যত দুশ্চিন্তা। তবে ইদানীং দেখছি একটু মতিগতি পাল্টেছে। পড়াশোনায়ও মন‌ দিয়েছে। এখন দেখা যাক, আবার এটা না ওটা নিয়ে বিগড়ে না গেলে, যদি এইভাবে চলে তাহলে কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে হয়ত। 

তুমি একদম চিন্তা করো না। আমি অতিসত্বর রওনা দেবার চেষ্টা করছি সেটাই জেনো। ওষুধপত্র ঠিকমত খাওয়াদাওয়া করে সুস্থ থাকার চেষ্টা করো। ভালো ডাক্তার দেখাও দরকার হলে আরো। তবে এবারে তোমাকে নিয়ে আসবো আমরা সঙ্গে করেই। ওখানে আর থাকা চলবে না‌ জেনে রেখে দেও। ওদেশের মায়া এবারে ত্যাগ করতে হবেই‌ তোমাকে। এই কথাটি ভালো মতো‌ করে বুঝে   নিয়ে গোছগাছ করে রেখো। আমরা যত তাড়াতাড়ি পারি চলে আসবো। প্রণাম নিও, ইতি, তোমার স্নেহের অঞ্জলী—-”

  

   দুপক্ষের এই চিঠি পত্র যাওয়া আসার মধ্যেই পাসপোর্ট হাতে এসে গেলো। ভিসাও হলো । এদিকে জানা গেলো ভবানিপুর বাড়ির বাবলু কাকাও ওদেশে যাবে। কথা হয়ে গেলো তার সঙ্গে আমরাও একই সঙ্গে একসাথে খুলনা হয়েই যাবো । বর্ডার পার হয়ে সরাসরি একেবারে খুলনা। সেখানে রাতটুকু কাটিয়ে একেবারে জলপথে লঞ্চে রাড়ীখালীর নদীর ঘাটে যেয়েই  নামবো। এমনিতে সড়ক পথে মাগুরা হয়ে গেলেও মাগুরা পৌঁছোতে পৌঁছতেই রাত হয়ে যেতো। তাই বিষয়টা একই হবে খানিকটা। সেই পরেরদিনেরই ঘটনা ওখানে পৌঁছোতে। 

তাই কতকাল খুলনা হয়ে মারও যাওয়াযায়ী নেই। সে তো সেই নতুন বউ হয়ে তখনকার যতো খুলনার ওই বাড়ির স্মৃতি। সে সব কতকাল আগের কথা! এইসব নানা কিছু হয়ত ভেবেই মারও ইচ্ছা হলো, সময় একটু বেশি লাগলেও সেটাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। তাছাড়া এইমুহূর্তে ঠাকুমার সৎমাও ওখানেই, যাকে আমরা বড়মা বলে ডাকি। সেও খুলনার বাড়িতেই রয়েছে। বাবলু কাকার সেই কারণেই ওদেশে যাওয়া। ওখানকার ওই স্টেটের নানা প্রয়োজনে ওদেশে যাওয়ার বিশেষ প্রয়োজন এসে গেছে তারও। বড়মা বারবার তাকে ওদেশে যাবার জন্যে তলব করছে। তাই আমাদের তার সঙ্গে কথা হলো একেবারে ট্যাক্সি ধরে শিয়ালদহতে পৌঁছে তার সঙ্গে সঙ্গেই এক সঙ্গে বনগাঁর ট্রেন ধরে একেবারে হরিদাসপুর বর্ডার পৌঁছানো। এরপর বর্ডার পেরিয়ে একবারে খুলনার বাস ধরে খুলনায় পৌঁছানো। 

  এদিকে বাড়িতে একেবারে গোছগাছের জন্যে, হুড়োহুড়ি পরে গেলো। কাজের দিদি এবং বিষনিভাই দুজনেই খুব খুশি। বিষনিভাই মাকে জিজ্ঞাসা করলো একদিন, মুলুক যাইয়েগা মাইঝি? যাইয়ে, কোই দিকত্ নেহি— ও আমরা সব সামালকে রাখুঙগা, কোই দিকত্ নেহি হোগা মাইঝি। আপ আরাম-সে যাইয়ে গা। কিৎনা দিন বাদমে আপনে যাওগে— কোই মুসিবৎ নেহি…. চলা যাইয়ে আরামসে।

    মা বললো, ঠিক হায় বিষনি। গোরু বাছুর এবং তোমরা দুজন মিলেমিশে সাবধানে থাকবে । নেশভাঙ কোরোনা কিন্তু! 

 

   তাতো সব হলো, এবার এর জন্যে ওটা, তার জন্যে সেটা, খুলনার বাড়ির জন্যে লৌকিকতা কি করা যায়? সেসব নিয়েই চিন্তাভাবনা শুরু হয়ে গেলো। শেষপর্যন্ত যাওয়ার দিনও স্থির হয়ে গেলো। দিদি অশোকদা বিশেষভাবে বলতে লাগলো বারবারই—- যাই করো আর তাই করো, দিদিভাইকে এবারে একেবারে নিয়েই আসবে কিন্তু বলে‌ দিলাম। আর ওখানে তাকে রাখার দরকার নেই। অশোকদারও একই কথা।

    সকলকেই জানানো হলো। ঠাকুমাকেও একদিন সকলে মিলে গঙ্গা পুরীর বাড়িতে গিয়ে বলা হলো এবারে খুলনা হয়ে আমাদের যাবার পরিকল্পনার কথা। শুনে ঠাকুমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে নামতে থাকলো দেখলাম। হয়ত তার খুলনায় থাকাকালীন সেইসব দিনগুলির কথা মনে পড়ে গেলো। সেই কারণেই হয়ত তার এই ভাববিহ্বলতা! 

হাজার হলেও শৈশব স্মৃতির কথা 

কে আর মনে না করে? 

যাইহোক চোখ দিয়ে তার একমুহূর্তে জল গড়িয়ে পড়লো যেমন, তেমন তাকে এবারে বেশ ভাববিহ্বল হয়ে যেতেও দেখলাম। কত কথা বলতে লাগলো ! কত পুরোনো দিনের স্মৃতি আজও তার কাছে কত স্পষ্ট! হবে নাই বা কেন, জন্মভূমি বলে কথা! কতো স্মৃতি ওই বাড়িটা ঘিরে তার। উল্লাসিনী তো তার নামেই খুলনায় পরিচিত। কিন্তু সেখানে সেই তো তার ব্যক্তি হিসেবে সেই প্রথম সন্তান! মাকে কে আর অত সহজে ভুলতে পারে? 

তাই তো কত পুরোনো কথা হয়ত তার মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক এক করে‌। সে বলতে লাগলো তার মতো করে উল্লাসিনীর কথা। বাটাকম্পানী বাড়ির কথা। ফজলু কাকার ওদেশে না যাওয়ার কারণে দেলদার ঘাটের উপরে পরপর যে তিনখানা বাড়ি,‌ তার সেই বাড়ি গুলির মালিক বিহীন খাস হয়ে যাওয়ার কথা । কত কষ্টের যে এইসব বিষয়সম্পত্তি তার বাবার একলার হাতে করা, আজ সেসব সব ভূতে খাচ্ছে যেন..! স্টেশন রোডের বাড়িগুলির কথাও বলতে লাগলো। সেগুলির কী হয়েছে সেকথা জানার জন্যে চেষ্টা করতে বললো, মাকে একবার অন্তত । বড়মার কাছে জানতে বললো। সেসব নিয়ে কত কাহিনী আজও তার স্মৃতিতে ! আমাকে বললো, তার ভাষুরঝি পাগলিটাকে দেখে আসতে। সে নাকি আমার পিসি হয়। সে নাকি তার বড় প্রিয় পাত্রী ছিলো। 

     তাই শুনে আমিও তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি তাহলে আমার সম্পর্কে কে হন ? 

      —- কেন, পিসি! রেবু তোমার যেমন পিসি হয়, সেও তো সেটাই হবে সম্পর্কে তোমার?... শুধু ওর স্বামীটি বড় বেয়ারা। তোমার দাদু একদম দেখতে পারতেন না তাকে। 

      —- ওনার নাম কী? 

      —- বিরেন । বা! বিরেনকে চিনলে না ? সেই যে, তোমার দাদুর মৃত্যুর সময় এসেছিলো এসেছিলো এই বাড়িতে! সেও তো সম্পর্কে তোমার দিদিমার আবার ভাগ্নে হয়। তোমার মায়ের বাবার আপন ভাগ্নে নাকি। ওদের আদি বাড়ি হলো নলদিতে । আমার বাবা ওকে ভালোবেসে তার কাছে রেখেছিলেন। এবং শেষপর্যন্ত-তো তোমার বড় দাদুর মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। সেও অনেক ইতিহাস ! বলতে গেলে অনেক কথা ! তাই থাক এখন ভাই। যাও,... আমার তো আর ইহো জীবনে যাওয়া হবে না‌ওখানে। তবু তুমি যাচ্ছ-যে, এতেই আমার শান্তি । খুব ভালো লাগছে শুনে।


   এইসব কথা শুনে, বিরেন নামক সেই আমার সম্পর্কে ঠাকুমার ভাষ্য অনুযায়ী, আমার সঙ্গে তার অতীত সম্মন্ধীয় কয়েকটি ঘটনার কথা স্মরণে আসছে-যে এইমুহূর্তে, সেই কথাগুলি বলে ফেলতে পারলাম মুহূর্তে, বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ এইবার মনে পড়েছে, এবারে ধরতে পেরেছি, তুমি যার কথা কচ্ছ, তাকে নিয়ে বেশ কিছু কথা মনে পড়ে গ্যালো…. সেই যে, ওদেশে থাকাকালীন সেই মানুষটিকে একেকদিন খুব ভোর ভোর কোথাথেকে যেন সাইকেল হাঁকায়ে উদয় হোতি দেখতাম জানো, প্রথম প্রথম জানতি চাইতাম না, উনি কন থেকে আসেন? পরে অবশ্যি জানতি পারি ছিলাম দিদিভইএর মুখির থেকে, ওনার বাড়ি না কি নলদিতে। কৌতুহল কেন হোত জানো, সেই আমরা সকলে ঘুমির থেকে  উঠার আগেই ওনার আগমন ঘটতো, ঘাড়ে একখান বন্দুক নিয়ে। তারপর সকালের খাওয়াদাওয়া করতেন। তারপরেই বাবুগের ঘাটে চলে যাতেন। বাবুগের যে জলের কূলিতে বটগাছটি রইছে, ওহেনে, যাইয়েই দমাদম কয়েকটি দাওড় করতেন। আর হরিয়াল পাখিগুলি তাই না শুনে ডানা মেলে উড়ে পালাতো ঝটাপট করে একেবারে। হয়ত কেউ গুলি খায়ে পড়েও যাতো দুই একটি হয়তো। আমার বুকির ভেতরটাতে বড় মোচড় মাইরে উঠতো অবশ্যি; মনে মনে লোকটারে নিয়ে বড় মনখারাপ হতি লাগতো, সঙ্গে সঙ্গে এও ভাবতাম, এই জন্যি লোকটা সেই এত পথ সাইকেল ঠেঙায়ে আইসে কিনা এই পাখিগুলিরে মারতি লেইগে গেছে শুধু শুধু…! 

তবে একটা কৌতুহল তো হোতোই ওই বন্দুকটি নিয়ে। নাইড়ে-চাইড়ে দেখতাম সে এদিক ওদিক গেলি, তার সেই বন্দুকির গুলির ছড়গুলিরে। কিছুক্ষণ পরে যদিও অতি সাবধানে সেগুলি যে জায়গায় বিছানার উপরে সে রাখে ছিলো তেমন করেই রাখে দিতাম। বন্দুকটি কেও ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাতে তুলে দেখতাম কিছুক্ষণ । তবে কেন জানিনা মানুষটিকে আমার মোটেও মাইনে নিতি ইচ্ছে করতো না । বড্ড চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলতো লোকটি। কথায় কথায় ভুলভাল ইংরাজি ভাষায় মাস্টারি ফলাতে চাইতো আমারে দেখলিই। আমার ভীষণ বিরক্ত লাগতো যে, একথাটাও তাকে বুঝোয়ে দিতি পারতাম না কিছুতেই। আর এখন শুনতিসি কিনা তিনিই হলেন গিয়ে আমার পিসেমশাই? তহনে তো আর এসব এত বুঝতি পারতাম না ! কেউ বলতোও না। তবে দিদিভাইকে যে বৌদি বৌদি বলে ডাকতো —- সেটা তো শুনতিই পারতাম। 


      ঠাকুমা কিছুক্ষণ মনযোগ সহকারে শুনলো আমার সব কথা। তাও সে বললো, যাকগে যাক ভাই, তুমি একবার তোমার সেই পিসিটা কে দেখে এসো, সময় যদি পাও তো। কেমন আছে সে। হাতে করে মানুষ করেছিলাম তো একদিন! তাই একটা টান আছে। ওদের কথা যখন শুনতে পাই কারো কাছের থেকে একটুখানি‌ তখন জানতে চেষ্টা করি। আর খুলনার আমাদের বাড়ির মধ্যেই থাকে দেখবে পঙ্কোজ দাদা। সেই যে বোম বাঁধতে যেয়ে যার হাতদুটি উড়ে গেছিলো গল্প করেছিলাম না, যার কথা! সেই মানুষটাকে একবার পারলে দেখে এসো অন্তত। কাছে যেয়ে প্রনাম করো । শুনেছি নাকি এখন আর হলে যেতে পারে না সে। ওঁরা তার জন্যে এস্টেট থেকে একটা মাসিক ভাতা দেয় । আর কি ! আসো গে ঘুরে। দেখে আসো গে আমাগের কত স্মৃতিভারাতুর সেই বাড়িটিকে। সবই  ভবিতব্য বুঝতে পারলে….. সবই ভবিতব্যের খেলা ! তাছাড়া আর কী বলিই বা !”

      এই এক জ্বালা, খুলনার কথা উঠলেই ঠাকুমার মুখটা কেমন হয়ে যায় যেন। সব কথা শেষ হলে একটা দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে বরাবর তার নাকমুখ দিয়ে। হয়ত তার নানা স্মৃতি মনে পড়ে বলেই এমনটা হয়! আসলে অতবড় সম্পদশালী মানুষের সন্তান সে, তাঁর কিনা বিবাহ হলো একজন সামান্য স্কুল মাস্টারের সঙ্গে! যার সঙ্গে জীবন যাপনে সেতো সেই স্বচ্ছন্দ জীবনে কোনোদিনই পায়নি! নিত্য অভাব অনটন টানাটানির মধ্যেই এই জীবনটা কেটে গেলো তার। তাই হয়ত অতীত দিনের সেই বৈভব ও স্বচ্ছন্দময় জীবনটার কথা মনে পড়ে যায় তার। তাছাড়া বিবাহের পরেও-তো বেশ কিছুকাল তারা একসঙ্গে খুলনাতেই বসবাস করেছে। সময়টা দাদু ঠাকুমার বিবাহের পরের কিছু দিনের কথার কথাই ভাবছি, যেরকম শুনেছি তার মুখে থেকে আগে কতবার নাজানি ! 


     খুলনার কথা বলতে বলতে ঠাকুমার মুখটা কেমন যেন হয়ে যায় মাঝে মাঝে! দমটাকে একবার চেপে নিয়ে আবার ছেড়ে দেয়। তারপর একটি দীর্ঘশ্বাস পড়ে। হয়ত নানা কথা মনে পড়ে । মনে পড়ে তার ছেলেবেলার সেই শহরটির কথা। বিবাহের পরেও বেশ কিছুকাল 

ওই শহরটাতেই-তো কাটানো । একটির পর একটি ভাড়া বাড়ি পাল্টানো দাদুর অস্থিরতার এবং অপছন্দের কারণে। কারণ খালিশপুরের পাঠ তো চুকে 

গেছিলো তার মধ্যেই। ভৈরব একদিন ভিটেবাড়ির বেশ খানিকটা গ্রাস করলে বাধ্য হয়ে উঠে চলে আসলো। 

     ঠাকুমার বাল্যবেলায় যে আচ্ছন্নতা তাকে এতকাল ঘিরে ধরে আছে, যে গল্প সে মাঝেমাঝেই শোনাতো আমাকে, বলতে বলতে বিমর্ষ হয়ে ও পড়তো খানিকটা, এবং দেখতে পেতাম তার সেঈ দমচাপা দীর্ঘশ্বাস খানিকটা যা আজও আমাকে ঘিরে আছে । তখন তাকে দেখলে মনে হতো যেন সে বুঝি কোনো অতল তলে ডুবিয়ে উঠলো বুঝি। মনে হতো এক ডুবে ডুব দিয়ে দেখে এলো সে, সেই জলের তলের দেশটাকে নানা স্মৃতিতে চুবিয়ে‌ নিয়ে বুঝি। 

ঠাকুমা যেমন তার ছেলেবেলার কথা ভুলতে পারে না, তেমন আর কেউ কি পারে, তার শৈশব বাল্যবেলার কথা ভুলতে কখনো ? 

   সেই জন্যেই তো দেখি তার সেই পঙ্কজ দাদার কথা এত করে বলে কেন ? তাই তো সেই সব কত বৈচিত্র্যময় ছেলেবেলা তাকে আজও আচ্ছন্ন করে বুকের ভেতর চেপে বসে আছে বুঝি! সেই যে, যে ছেলেবেলায় আমি তার কাছে গল্প শুনতে শুনতে কখন তার কোলের মধ্যেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তাম যখন‌। তখনকার দিনগুলির কথাই ভাবতে থাকছি এখন শুধুই।…ঠাকুমা আমি ঘুমিয়ে গেলে আমার দুইপাশে পাশবালিশ ধরিয়ে দিয়ে কখন তার রাতের রান্নাঘরের বাকি কাজ সারতে চলে যেতো। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙলে তার সেই খুলনার দিনগুলির বাকি গল্পের কথা, যা আমি শুনতে পাইনি সবটুকু, সেইটুকু শোনার জন্যে উশখুশ করতাম কেবলই। তার পেছনে পেছনে ঘুরঘুর করতাম । ঠাকুমা তখন হয়ত জিজ্ঞাসা করতো, “তোর মনে আছে ? কোন পর্যন্ত তুই গতকালকে শুনতে পেরেছিস বলতো ?”

    নিশ্চিন্তে বলে দিতাম। বলতাম,  “ওই তো, তুমি বলছিলে কীভাবে পঙ্কজ দাদুর হাতটা উড়ে গেলো বাজি বানাতে গিয়ে। তারপর পুলিশি ঝামেলা । থানা পুলিশ দারোগা। সে সময় স্বদেশী কাল। পুলিশ এসে তো সন্দেহ করলো বোমা বানাতে যেয়ে তার এই অবস্থা। তোমার বাবার যথেষ্ট ঝক্কি পোহাতে হয়েছিলো 

সেই ঘটনা নিয়ে। যখন তোমরা ছোটো ছোটো ভাইবোনেরা কোর্টে সাক্ষী দিয়েছিলে, প্রকৃত ঘটনার কথা বলে । কালীপুজোয় বাজি বানানোর মসলা বাটতে গিয়েই-যে, এই দূর্ঘটনা ঘটে সেই সত্য যখন জজ সাহেব কে বোঝানো গেলো, তখন বিষয়টা মিটলো । এই পর্যন্ত শুনেছিলাম মনে আছে।”

     এই স্মৃতি ঠাকুমাকে ভুলতে দেয়নি কোনোদিন । পঙ্কজ দাদু ছিলো তাদের ভাই বোনেদের মধ্যে টিম লিডার । ঠাকুমার ভাষায় সর্দার ছিলো সে । তাকে তারা সকলেই সমীহ করতো । তবে পঙ্কজ দাদু ঠাকুমার কেমন দাদা হয়, তা আমি কোনোদিন জানতে চাইনি। তবে নিজের দাদা তো নয়ই। 


    সেই পঙ্কজ দাদুকে খুলনায় যেয়ে যখন প্রথম দেখলাম, তখন আমার বেশ রোমাঞ্চ হয়েছিলো ভেতরে ভেতরে একটা। মনে হয়েছিলো একটি নাটকের জীবন্ত চরিত্রকে আজ সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করছি যেন ।


       ফচনের ঠাকুমা আজ দুদিন ধরে কথায় কথায় মাকে বলে আসছে এই কথাটাই— ও তোমার

চিন্তা করনের কোনো কারণ নাই মা, তোমরা হগ্গলে যাইয়া দ্যাশের থে ঘুইরা আসোগে, আমরা তো রইছি নাকি? কোনো অসুবিধা হইবো না। তয় একটা কথা কিন্তু স্মরণে রাইখ্যো দিদিমারে লইয়া আসন চাইই—- ওহেনে রাখনের কোনো কারণ  দেখিনা। ওহেনে তারে ফেলাইয়া রাইখ্যা, তোমরা আর ঝামেলায় থাইকো না তো। এদিকে আমারা সগ্গলে মিলে এগোরে খেয়াল রাখুম খানে। ও নিয়ে তেমন কিছু ভাবনের কারণ দেহি না। এইখানকার কথাটা ভুইলা যাও ঘুইরা আসগো।


        মা তাকে তা সত্তেও নানা সমস্যার কথা বোঝানোর চেষ্টা করছিলো। তাই সে বারবার একই কথা বলে—  তার কাছ থেকে খানিকটা ভরসা চাইছিলো হয়ত। তাই বলছিলো, সগ্গলে মিলে যাচ্ছি তো মাসিমা, এই জন্যেই এতটা ভাবছি। ওদের সঙ্গে করে যেতে চাচ্ছি এই জন্যে, মা যেভাবে লিখেছে, তাতে তো ভাবনা আসেই; শেষে যদি আর কারো সঙ্গে দেখা না হয় ।

   একেবারে মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ধমকের সুরে খানিকটা যেন নির্ভরতা দিতেই সে বলে উঠলো, ওসব 

কইতে হয় না ! কিচ্ছু হোইবো না দিদিমার । দেইখ্যা রাইখ্যখানে, আমার কথাডা মিলাইয়া লইয়োখানে ওহেনে যাইয়া। ভালো আছে দিদিমায়, দেইখ্যোখানে, যা কয়ে দিলাম দেইখ্যো মেলাইয়া আমার কথাখান। যত্ত সব কুকথা ! এইসব ভাইবো না এক্কেবারেই কিন্তু! 


    এই যে প্রতিবেশী মানুষজনদের মধ্যে সম্পর্কের একটি বাঁধন। এই যে অবলম্বন সূচক আশ্বাসবাণী, তা আর কোথাও টিকে আছে কিনা জানা নেই। এঁরা কেউ কারো রক্তের সম্পর্ক নয়। এমনকি একটি এলাকার মানুষ ও নয় । সকলেই দেশভাগের কারণে এই‌ দেশে এসে একে অন্যকে চিনেছে, মিলেছে, সংসর্গ তৈরি করে নিয়েছে। কিছুকাল আগেও কেউ কাউকেই চিনতো না জানতো না। হয়ত সকলে ভেসে ভেসে এই একটি জায়গায় এসে প্রতিবেশী হয়েছে। এছাড়া সকলেরই ওই দেশ থেকে এসে নানাভাবে এখানে ওখানে ভেসে বেড়িয়ে এই একটুখানি জায়গাজমি কিনে নিয়ে এই সদ্য শহরতলীর একটি প্রান্তে বসতি স্থাপন করে বসবাসের সূত্রেই পরিচয় । সম্পর্ক গড়ে ওঠা। এই ছাড়া তো আর কিছুই না! অথচ এইসব মানুষগুলোকে নিয়ে যত ভাবতে যাই, লক্ষ্য করতে যাই, তাঁদের এই মানবিক বন্ধনের জায়গাগুলির কোনো রহস্য মেলাতে পারি না। 

শুধু এই ক্ষেত্রেই না, এর আগেও তো নানা কারণে লক্ষ করেছি, তাতে বেশ খানিকটা বিস্ময়ই জাগে । কখনো কখনো বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি  তাঁদের মুখের দিকে নীরবে কিছুক্ষণ।

যদিও তাঁদের সেটা যে বুঝতে হবে  বা ভাবতে হবে সচেতন ভাবে, এমন দাবি করি না কখনোই। 


    যাইহোক সব দিক গুছিয়ে গাছিয়ে নিয়ে একদিন খুব সকাল সকাল একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে শিয়ালদহ স্টেশনে বাবলু কাকার সঙ্গে একজায়গায় দেখা করে আমরা বনগাঁর ট্রেনে উঠলাম যখন, তখন সকালের রোদ একটু একটু করে জায়গায় জায়গায় ঢুকে পড়ছে 

চলন্ত ট্রেনের জানালার ভেতর দিয়ে যে, সেটা দেখতে পাচ্ছি । 

কতকাল ধরে এই পথ চলেছি, কত সময়, কতরকম ভাবে, সেটাই ভাবছিলাম আজও । এর আগে পাকিস্তান আমলে মা বাবার সঙ্গে। দিদিমারা নাকি তারপরে ট্রেনে করে দর্শনা বর্ডার দিয়ে চলাচল করতো সেই সময়ে। সেই লাইনের নাম ছিলো তখন নাকি বার্ণপুর লোকাল। যদিও আমার সেটা মনে পড়ে না। কারণ ওই লাইনে কয়লার গাড়িও চড়েছি আমি খুব ছোটোবেলায়। যতদূর জেনেছি মায়ের মুখে বা দিদিমার কথায় বার্তায়, তাতে ওই লাইনে তখন যে ট্রেন চলতো দেশভাগের পরে পরে তার নাম ছিলো গোয়ালন্দ মেল। সেটা ওই পথ দিয়ে চলাচল করতো শুনতাম । আর এই পথে খুলনা মেল যাতায়াত করতো শুনেছি। দুই দেশ ভাগাভাগির 

পরেও কিছুকাল চলেছিলো। যা শুনেছি সকলের কাছ থেকে। 

  

   সে সব কতকাল আগের কথা! বাবলুকাকা হঠাৎ বললো, বুঝলে 

বউদি, আমাদের খুলনায় পৌঁছোতে খুব বেশি সময় লাগবে না। যদি অবশ্যি বর্ডারে খুব বেশিক্ষণ না দেরি  হয় ।

         মা বললো, তাই ? এর আগের বার তো সবকিছু খুব তাড়াতাড়িই হয়েছিলো । দেখা যাক কী হয় এবারে। 


   একাত্তরের পরে সেই তো কাইলে মামার সাথে এদেশে চলে আসা। তারপর আর কি এসেছি এদিকে ? মনে পড়ে না তো! যদিও একাত্তরের সময় এই পথ ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘোরার মধ্যে দিয়ে বিশেষ ভাবে পরিচিত হয়ে গেছিলো আমার কাছে। 

ট্রেন যতো একেকটি স্টেশন পেরিয়ে এগোতে থাকে, ততোই মনটা ওই দেশের জল মাটির গন্ধ পায়, কেন জানি। বাঁ পাশে চাষের ক্ষেত কতো। ধান-পাট গাছগুলির লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা… হাওয়া বাতাসে দোল খাওয়া… ওই তো দেখতে পাচ্ছি। বাতাসে যে হাওয়া বাতাসের একটি সুঘ্রাণ, তা যেন কেবলই মনে করায় সেই ফেলে আসা দিনগুলির কথাই খুব বেশি করে। কোথাও হয়ত বৃষ্টির জল বেধে খাল ভরে আছে। কোথাও হয়ত পুকুর খানাখন্দ ভরে আছে বর্ষার জলে। আবার কোথাও হয়ত সুখনো মাঠ। তাতে কেবলই সবুজের সমারোহ । তাতে ফসলের দোলা লেগে সে-যে-কি-এক অপরূপ গ্রামবাংলার শোভা তৈরি করছে 

তা আর কি বলবো! 

আবার কোথাও হয়ত ফলফলারীর গাছ। নাড়কেল সুপারি বাগান। তার ভেতরে একটি দুটি গোরু বাছুর চড়ছে। তারা আপন মনে খুঁটে খুঁটে ঘাস খেয়ে চলেছে। লতাপাতা টেনেও  কোথাও কোথাও গোরু ছাগলে খাচ্ছে দেখা যায়। বড় বড়  গাছগাছালির গা বেয়ে বেড়ে ওঠা সেই সব লতাপাতা টেনে টেনে নামিয়ে নিচ্ছে তারা ।

  এই সব দেখে কেবলই মনের ভেতরটায় কতদিন পরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে রাড়ীখালীর কথা। মনে মনে ভাবছি, কীই না দেখবো সেখানে যেয়ে এখন কে জানে ! সত্যিই কি তেমন বড় কোনো পরিবর্তন হয়েছে এই কবছরে তার? কি জানি! মাত্র তো বছর তিনেকের কথা। জানি না এর মধ্যে কতটা পাল্টেছে সে তার স্বরূপ ! না না বছর চার হয়েছে হয়ত। হয়ত একই রকম আছে 

আজও সবকিছুই—।  

আচ্ছা, দিদিভাই কি সত্যি সত্যিই খুব অসুস্থ হয়েছে ? নাকি সেরকম কিছু নয় ? এ আমাদের সকলকে একজায়গায় করার কৌশল নয় তো তার? হয়ত শরীর কিছুটা খারাপ হয়েছে। তবে তেমন কিছু না হয়ত। তা যদি হতো তাহলে এত গুছিয়েগাছিয়ে কি লিখতে পারত অত কিছু! 

যদিও সেকি নিজে হাতে কিছু লেখে? 

সেতো শুধুই বলে যায়…. তারপর লেখা হয়ে গেলে জিজ্ঞাসা করে, বলে, এই পড় দেখি। পড় তো, দেখি  কী লেহিছিস, পুরোটা পরে শোনা দেহি একবার। 


     এই সব সবটাই তো জানা। তার কোনো ধরণ কি আমার জানতে বাদ আছে! সবটাই মুখস্থ হয়ে আছে। একটুখানি ভাবতে পারলেই তার সব ধরনধারণ মনে পড়ে যায় একেবারে স্পষ্ট করে এখনো। এই যেমন যে চিঠি লিখে দেয় সেও বারবার পড়তে পড়তে সংশোধন করতে করতে একসময় হয়ত সেও বিরক্ত হয়ে যায় মনে মনে। কিন্তু কি করা আর ! এই মানুষটা বললে এড়িয়েও থাকতে পারে না । হয়ত এড়াতে গেলো,  কিন্তু তাকে এমন কথার প্যাঁচে 

ফেলে এমন কিছু বলবে, তখন তার ঠেলা সামলানো তার দায়। তাই এইসব বিষয়ে খুব একটা ছন্দ তাল কাটে না বড় দাদু, না হলে সঞ্চয় । যদিও বড় দাদু এখন আর চোখে তেমন ভালো দেখতে পায়না বলে 

সে বাদ। সেই জায়গা দখল করেছে সঞ্চয়। সে বুঝে যায় এরপর পিসিমা কি লিখতে বা বলতে চাইবে । কিন্তু সেখানে অন্য কেউ হলেই যত ঝামেলা তৈরি হয়। সঞ্চয় যখন থাকে না, তখন তো তাদেরকেই এই দায়িত্ব সামলাতে হয়। 


       যাইহোক দিদিমা হয়ত এরকমই কিছু একটা পরিকল্পনা করে ডেকেছে বলেই হয়ত এই যাওয়াটা হলো আজ এমনভাবে। তা না হলে হয়ত এখন হতো না । যাক খুলনাটা তো এই সুযোগে যাওয়া হবে । সেই কোন ছোটোবেলায় যাতায়াত করেছি মা বাবার সঙ্গে, তাতো স্মরণেও নেই। কত গল্প শুনেছি ঠাকুমার কাছে । যদিও কতটুকুইবা আর দেখতে পাবো! এইতো রাত্তির টুকু বড়জোর থাকা। তারপর ভোর বেলাতেই তো লঞ্চে উঠে চলে যাওয়া। এর পর সাড়াটা দিন জলপথ। সেই তো সেই বিকাল বিকাল পৌঁছানোর কথা। সেটাও যেমন দেখেছি এখানে থাকতে বিকেল বিকেল দক্ষিণ দিক থেকে জল কেটে ঢেউ তুলে ফিরে আসতে লঞ্চকে। ঠিক তেমনই হবে

হয়ত পৌঁছোতে পৌঁছোতে। যদি বিকেল বিকেল ও পৌঁছাতে পারি তাহলে তো ভালো। 

    যাক সে যা হয় হবে আগামীকাল আপাততো তো খুলনার রাত্তির টুকুর কথা ভাবি। ভাবছি এই রাত্তির টুকু সময়ের মধ্যেই যতটুকু পারি খুলনা শহরটার একটুখানি ভাপ নেওয়া। শুনেছি আমাদের আর পাঁচটা শহরের মতো খুলনাও নাকি অনেকটাই একই রকম। মধ্যরাত্তির নাহলে নাকি নিস্তব্ধতা নামে না। 

    সে যাইহোক আগে তো পৌঁছাই তারপরে দেখা যাবে সেসব কী হয়। 

    এই সব ভাবছি যখন সাতপাঁচ তার মধ্যেই মা‌ বললো বাবলু কাকাকে, আচ্ছা ঠাকুরপো এবারে শিবেকে তো দেখা গেলো না! শিবু ঠাকুরপোর কথা বলছিগো। এই সময়গুলোতে তো আগে ট্রেনের ভেতরেই দেখা হতো ! দমদম ছাড়িয়ে গেছে তো কখন! কোই, তাকে তো দেখলাম না এবারে! 

      বাবলু কাকা শুনে বললো, সেতো নানা কারণ হতে পারে বউদি, শরীরটরীর খারাপ হতে পারে হয়ত। তাছাড়া এত সকাল সকাল কে আর

চুড়ি বয়লা সেফটিপিন গেঞ্জির ফিতে লাইটার নেলকাটার এই সব কিনতে

চাইবে বলো ? হয়ত দ্যাখো এরপরের ট্রেনে হয়ত উঠবে। একটু বেলা হলে হয়ত। 

      মা আর বাবলু কাকার এই সব বলাবলি শুনে আমি মাকেই জিজ্ঞাসা করলাম, শিবে ঠাকুরপোটা আবার কে গো মা ? 

      মা বললো, তোদের কাকা হয়। 

      বললাম, সে আবার কেমন কাকা হয় গো ? 

       মা বললো, মন্টু কাকার ভাই। 

       জিজ্ঞাসা করলাম, মন্টু কাকা মানে যে বাইরে চলে গেছে যে? সেই তিলজলার মন্টু কাকা? 

      — ওইযে তোর ঠাকুমা সেদিন খুলনায় যে পিসির সঙ্গে দেখা করে আসবার কথা বললো না, সেই পিসির আপন ভাই। তোর দাদুর বড়ভাইয়ের বড় ছেলে। 

      ভাই তাই শুনে বললো, মন্টু কাকা কানন কাকিমা ? 

      মা বললো, হ্যাঁ রে। 

       ভাই জিজ্ঞাসা করলো, ওই কাকাকে কি আমরা কখনো দেখেছি? 

       —- হ্যাঁ হ্যাঁ দেখেছিস বোইকি! মনে নেই তোদের। তোরা তখন খুবই ছোটো। কৃষ্ণার মনে থাকলেও থাকতে পারে হয়ত। হ্যাঁ তাতো হবেই, একাত্তরের পরের থেকেই হয়ত ও হকারী শুরু করে দিলো! যদিও তারমধ্যে আমাদের ওদিকে গেছে কী! না, মনে হয় না। তোর দাদুর মৃত্যূর সময়েও যদি আসতো তাহলেও তো তোদের সঙ্গে দেখা  হওয়ার কথা তার! কিন্তু না, সে আসেনি তখন ও তো! 

     শুনে আমি মাকে বললাম, আচ্ছা মা, একাত্তরেও তো এই পথে বেশ কিছুদিন যাওয়া আসা হয়েছে আমার! যদিও তাহলেই বা কি হবে! তখন তো এরকম কতো হকারদেরই দেখা গেছে। যদিও তাঁদের মধ্যে কে আমাদের সম্পর্কে কাকা হতো সে কেই বা বলে দেবে তখন? আচ্ছা উনি হকারী করেন কেন ? বড় দাদুর তো শুনেছি ভালোই অবস্থা ছিলো! তাহলে ? 

      মা বললো, সে অনেক কথা। এখন ওসব থাক। পরে বলবো সেই সব না হয় । 

      বাবলু কাকা এসব শুনে আমার দিকে চেয়ে বললো, বদরাগী। খামখেয়ালী হুজুকে হলে যা হয় বুঝলি কি না ? তা না হলে কতোই তো দেখলাম ! দাদা, মানে তোদের বাবা কম চেষ্টা করেনি ! ওঁকে নিয়েই তো কুদঘাট বাজারে কী একটা ব্যবসা করেছিলো না ? 

     মা শুনে বললো, হ্যাঁ…. সেসব তো সবই তোমার ও জানা ঠাকুরপো! তোমার অজানা তো কিছুই নেই! তবে মন্টু ঠাকুরপো শুনেছি ভালো আছে এখন। কিছুদিন আগে একখানা চিঠি লিখেছিলো। জানিয়েছিলো সে ভালো আছে ব্যাঙ্গালোরে যেয়ে। যদিও এখানে থাকলে হয়ত অতটা ভালো থাকতে পারত না। জানতে চেয়েছিলো  সকলের কথাই। ভবানীপুর বাড়িরও খোঁজ নিয়েছিলো। সে যে মনে রেখে তাও দুই একখানা চিঠি দেয়‌, কিন্তু এতো কোনো যোগাযোগই রাখে না! ওই যাতায়াতের পথে দেখা হলে তখন যেটুকু কথাবার্তা বলে এগিয়ে আসে। তাছাড়া তো সে একেবারেই বিচ্ছিন্ন‌ হয়ে গেছে অনেককাল থেকেই। কী আর বলবো, তুমিই বলো একবার….!


     

      এসবের মধ্যে আমি কেবলই এক একবার ফাঁকা স্টেশনগুলির দিকে তাকিয়ে নিচ্ছি, ট্রেন স্টেশনে থামলেই। ট্রেন লাইনের পাশ দিয়ে  ওই যে যেসব মানুষজনগুলির জীবনযাপন, ঘর দুয়ার গুলি দেখা যাচ্ছে, কেন জানি না তাদের প্রতি বরাবরই একটা অদ্ভুত টান অনুভব করি। মনে হয় এই যে যারা ট্রেন থেকে নেমে একটা কিছু সামগ্রী 

হাতে করে ট্রেন লাইনের খানিকটা দূরে ওই যে সরু পথটা ওইদিকে সোজা চলে গেছে‌ দেখছি, সেটিকে ধরে দূরে কোথাও হয়ত এঁদের মতো আমারও কোথাও একখানি ঘর ছিলো, ওঁরা নয়, আমিই যেন হেঁটে চলেছি, ওই তো দেখা যাচ্ছে আমাকে, ওই তো পথটি পেরিয়ে হয়ত কোনো মাঠের পাশটি ধরে  হেঁটে চলেছি আমিও একা একা! 

ওই যে, এক দুইজন যেভাবে আগে পরে, কোথাও কোথাও বা এইরকম একটি দৃশ্যপট তৈরি করে যখন 

ট্রেন থেকে নেমে হেঁটে যেতে দেখতে পারছি যখন, কিম্বা ওই যে, কোথাওবা কয়েকটি টালির চাল দেওয়া বা এডবেস্টরের ছাউনি দেওয়া নিচু নিচু ঘরগুলি দেখা যাচ্ছে, তার ভেতর থেকে দুই একজন বাইরে বেরিয়ে এসে 

এই সকালবেলায় এটা ওটা একটা কিছু নিয়ে হয়ত এ ওঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলছে কিছু… সব দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, আর আমি কোথায় যে তাদের মধ্যে একাত্ম হয়ে পড়ছি‌ কেমন করে, সে কথা তো কাউকেই বলতে পারছি না কিছুই! 

কেবলই যেন মনে হচ্ছে,এদের কত কষ্টের জীবনযাপন হলেও, কী এক অভ্যাসের সঙ্গে এঁরা জড়িয়েঘড়িয়ে বেশ দিব্বি আছে; কিন্তু আমার কেন মনে হচ্ছে, আবার কী এক কারণে যেন ভেতরটা কেমন জানি মুচড়ে উঠছে যেন; মনে হয় এই তো, ওঁরা নয় আমিই যেন লাইনের ধারে ধারে ওইসব প্রাতকৃত্ত সারতে চাটাইয়ের দরজা খুলে ঢুকে গেলাম, ঘুম থেকে উঠে লাইনের ধারে ধারে? 

একটি ক্যানালের মধ্যে মুলি বাঁশের বেড়ার ঘেরদিয়ে যে পায়খানার জায়গা তৈরি করে নিয়েছে তারা, সেইসব জায়াগাতেই প্রাতকৃত্ত সেরে নিচ্ছি বুঝি আমিও এঁদের মতো! 

   ওই যে যারা বাবা মা ছেলে মেয়ে সকলেই একে একে আগে পরে হয়ত রোজই এইভাবে লজ্জা সংকোচ সব কিছুকে তুচ্ছ করে এই জীবনটায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে; 

   সেই মানুষগুলির নিত্যদিনের সঙ্গী যেন আমিও আজ। আমিও যেন তাদের মতোই একজন। যেখানে ব্যবহারের পরিস্কার জল নেই,‌ ব্যবহারের সাবান নেই, আছে শুধুই মাটি —- তাতেই হাত মাটি করে চলে‌ যাবে হয়ত, এইভাবেই নিত্যদিনের জীবনযাপন তাদের। 

হয়ত ছোটোখাটো কোনো জীবিকা আছে কোথাও তাদের । নিচু ঘরদুয়োর। কয়লার ধোঁয়া বের হচ্ছে কোথাও এখনো তোলা উনুনের মুখ থেকে গলগল করে। এই ভাবে, যে মানুষগুলির বেঁচে থাকা প্রতিদিনকার ঘটনা প্রবাহ —- সেকি সত্যি সত্যিই কোনো সভ্য জাতির বেঁচে থাকা?

 

    তবুও কেন জানিনা ওই মানুষগুলির পাশ দিয়ে যখন কোনো সময় ট্রেনে করে চলে যাই, তখন কেন জানিনা আমিও যেন তাঁদের মধ্যে নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে যাই যেন কীভাবে। কীভাবে যেন একরকম কিছু একটা হারানোর বেদনায় ভীষণ মনখারাপ হয়ে যায় কেন যে, তাতো জানি না। তবুও কেন জানি আবার তাদের জীবনের মধ্যেই ঢুকে পড়ে কীভাবে যেন এই মনটাকে তাদের জগতে চালান করে ফেলি কেন যে, তার কোনো কারণ খুঁজে পাইনা। 

    এই যে দুঃখ কষ্ট, নানা অসহনীয়তা ঘেরা যে জীবন, তার মধ্যেই প্রবেশ দুয়োর পায় কেন জানি আমার এই মনটাও। এইরকম ট্রেনে করে কোথাও যেতে যেতে যখন এইসব মানুষগুলির জীবনযাপনকে প্রত্যক্ষ করি, তখন আমিও তাঁদের সঙ্গের একজন হয়ে যাই‌ যেন কখন! 

  যদিও সেই সব বোধের সহযাত্রী হওয়া ছাড়া সেতো আর সত্যি না ! কিন্তু সত্যি সত্যিই এই জীবনটা‌ যদি  আমারও হতো, তাহলে কি এই আমি তখন আর এই আমি থাকতে পারতাম? না এইটুকু ভাবাবেগের কারণে যে আমির চেহারাটা এখন দেখা যেতে পারছে সঠিক ভাবে, তাকেও কি সত্যিকার ভাবে চিনতে পারি এখন! 


   কতকাল পরে এই বনগাঁ স্টেশনটি কে আবারও দেখতে পেলাম! এত সকাল সকাল তো খুব একটা আসা হয় না কখনো।‌কত পুরোনো দিনের কথাই না মনে পড়ে যায়! বহু কাল তার সঙ্গে তো এমনভাবে দেখা হয়নি কখনোই। বিগত দিনগুলির কথা মনে পড়ছিলো। যদিও সেই দেখার সঙ্গে আজকের দেখার‌ কোথাও কোনো মিল আছে নাকী ?

সবকিছুই পাল্টে গেছে। সেই একাত্তরে দেখা স্টেশন চত্বরটি কি এখন আর সেরকম থাকতে পারার কথা! পুরোনো সেই স্টেশনটি কে কি আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে  এখানে? যদিও ইতিমধ্যে আমার নিজের মধ্যে নিজের যে যে পরিবর্তন হয়ে গেছে, তাকে কি আমি নিজের মধ্যে নিজেই খুঁজে পাবো কোথাও? 

   এইভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো কতকিছুই তো ফেলে আসা হয়ে গেলো ! তাদের মধ্যেও কত পরিবর্তন ঘটে চললো… তার সবটা কি জানতে পারা হয়ে ওঠে আদেশও?



     দুখানি রিক্সা ভাড়া করা হলো। একটাতে বাবলুকাকার সঙ্গে আমি। আর একটিতে মা এবং ভাই। ইছামতীর উপর দিয়ে কাঠের ব্রিজ পার হতে হতেই বাতাসে সেই চিরপরিচিত পল্লী বাংলার আলাদা একটা সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়ায়। যা আমার নাকেই ধরা পড়ে হয়ত প্রথম । কোন দূর অতীতের কোনো এক গল্প কথায় শোনা যেসব মেহগনি জারুল শিশু কড়াই গাছেদের নিয়ে যে তীর্থযাত্রী মায়ের  পথশ্রম লাঘবের জন্যে এইসব গাছেদের কথা জানা গেছিলো লোক মুখে, তারা আজও যার যার নিজের মত করে সাজিয়ে নিয়ে নিজেকে এইসব পথপাশে রেখে দিয়েছে যেন। হয়ত কোথাও কোথাও বয়েসের ভারে একটু ন্যুব্জ হয়েছে ঠিকই— আবার কেউ কেউ এখনো ঝড়ে জলে তাদের ডালপালা ছেঁটে ছুটে একটু আলগা হয়েছে কোথাও কোথাও, আবার হয়ত কোথাও ঘনোঘনো হয়েই টিকে রয়েছে, সকলেই যেন তাদের ডালপালা নাড়িয়ে হাওয়াবাতাস বহিয়ে রেখেছেও বেশ। আজও এইসব পথিমধ্যে তারা তাদের জালিকাটা  আলোছায়া ছড়িয়ে বেশ একটা মজায় নীরবে নিঃশব্দে নানা খেলা খেলে চলেছে যেন;….তাতে কত জালিকাটা আলো বাতাসের হাসিঠাট্টা সবসময় লেগেই রয়েছে যেন, সেই পথের উপরে।


     কোন এক শৈশবে দেখা সামনে‌ ব্রিজের নিচে দিয়ে বয়ে যাওয়া যে  শাখা নদীটিকে দেখা যাচ্ছে কিছু কচুড়িপানা বুকে করে বয়ে যেতে শুনেছি সে পূবে একেবারে বাংলাদেশের ভেতরে যেয়ে প্রবেশ করেছে। তাতো করবেই। এরকম কত জায়গায় কতরকম ভাবে ভারতবর্ষে তথাকথিত সীমানা নির্ধারণ হয়েছে যে কতরকম ভাবে! তার জন্যে নদী তো আর দায়ী নয়! সেকি জানতো যে তাকে একদিন মানুষ তার প্রয়োজন মতো ব্যবহার করে যেখান সেখান থেকে আঙুল উঁচিয়ে বুঝিয়ে দেবে এই পর্যন্ত তুমি এই দেশের। ওই পর্যন্ত তুমি ওই দেশের মধ্যে? 

     যাইহোক সে যা করেছে তাতো করেছে, এখন তাকে দেখে আমার স্মৃতিতে যে ঘটনাটি সেই মুহূর্তে মনে পড়ে গেল তা হলো একবার শৈশবে এই পথ দিয়ে রিক্সায় করে বনগাঁর দিকে আসছিলাম সেবারে, পথে বর্ডার পেরোনোর পরে এখন যেমন বাংলাদেশে যাচ্ছি সেবারে ফিরে আসবার সময় এইখানে রিক্সা থেকে গড়াতে গড়াতে কেন যে কাইলে মামার মা নির্মলা দিদির সঙ্গে একেবারে এই নদীর পাউড়ি তে যে গড়িয়ে পড়েছিলাম তার কারণটি ঠিকঠাক মনে না থাকলেও ঘটনাটা ঘটে গেছিলো সেবারে। আজও চোখবুজে ভাবলে দৃশ্যটি মনে পড়ে পরিস্কার ভাবে । আমি নির্মলা দিদির কোলে ছিলাম রিক্সায় বসে।‌ সঙ্গে দিদিমাও ছিলো একই রিক্সায়। পেছনে মায়ের রিক্সা ছিলো।‌ মা আর কে যে ছিলো একসঙ্গে, সে কথা আজ আর মনে নেই। তবে কেউনা কেউ তো ছিলো। যদিও মাদের রিক্সা ঠিকই ছিলো। আমাদের খানাই বিভ্রাটে পড়েছিল শুধু। যদিও তেমন বেশি কিছু হয়েছিলো না। একটুআধটু ছড়েছিঠে গেছিলো শুধুই তবে সেই ঘটনার কথাটি মনে আছে বেশ। আজ আবার মনে পড়াতে মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, মা এই সেই জায়গাটা না ? এখানে গড়িয়ে পড়ে গেছিলাম না নির্মলা দিদির সঙ্গে ? 

    মা পেছনের রিক্সা থেকে শুনে বললো, ও বাবা, তোর মনে আছে ! তখন তো অনেক ছোটো তুই ! 

    মাদের রিক্সা আর আমাদের রিক্সা কিছুটা আগে পিছনে চললেও আবার কখনো কখনো পাশে পাশেই চলছিলো। কখনো আমাদের খানি আগে তো কখনো মাদের টা আগে। এরকম ভাবে । তাই চলতে চলতে কথা বলাবলি চলছিলো কখনো কখনো ।

    কাঠ জ্বালানি গন্ধ আসছিলো নাকে । শিশু মেহগনি গাছেরাও যেন সেই শ্বাস নিচ্ছিলো সেই জ্বালানি কাঠের সুবাসের মধ্যে দিয়ে একসঙ্গে। সব কিছু মিলেমিশে সেই খড়িকাঠ পোড়া গন্ধ আর আসপাশে পথের দুপাশের ঝোপঝাড়ের বুনো গন্ধ, ধোঁয়ায় ধোয়াক্কার খসপাশের প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় অদ্ভুত এক আবহের মধ্য দিয়ে কে যেন শতশত জানলা দরজা হাট করে খুলে দিচ্ছিল যেন। আমি যেন তাদের উঠোন চৌকাঠ বারান্দা পেরিয়ে কত ঝোপঝাড় ঘেরা পথটা অতিক্রম করছিলাম মনে মনে! সেইখানে বেশ স্পস্ট ভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল সেই আমার চিরপরিচিত আমজামজামরুল চালতা বিলিতি গাবগাছে ঘেরা ঝুপসি অন্ধকার করা বাঁশবনের মধ্যকার সেই পথ ও প্রান্তর গুলির সোঁদা গন্ধেরা হৃদয় মন মাতিয়ে কোথায় যে আমায় নিয়ে চলছিলো আপনমনে তা আমি নিজেও টের পাচ্ছিলাম না যেন কিছুই আর ।

      এই প্রকৃতি এরপরেও দীর্ঘকাল ধরে একই উদাসী বিষন্নতার মধ্যে ডুবিয়ে রাখতো যখন এই পথটুকু পার হতাম। এইটা যেন পূর্ববাংলা প্রবেশের প্রথম সিংহ দরজা। আর তার দুয়ারে দুয়ারে একেকটি মঙ্গল ঘটের মতোন  বসানো রয়েছে যেন এই সব মেহগনি শিশু কড়াই গাছেদের দুপাশের সার সার দেওয়া অবস্থান গুলিতে।

     সকালের রোদ-ছায়ার মধ্য দিয়ে যে আবহ…. যখন এই পথ চলা শুরু হতো; কতকাল ধরে? সে তো সেই কোন শিশু বেলা থেকে আজ অবধি

সে আমাকে অদ্ভুত এক মায়া পৃথিবীর টানে আচ্ছন্ন করে নিয়ে চলে, যেদিন থেকে অনুভব তৈরি হয়েছে একটুখানি জানি; তাই আজ আবার বেশ কিছু কাল পরে যৌবনের এই প্রথম পর্বে চলতে চলতে বিচিত্র সব শাখাপ্রশাখা মেলে আমার গায়ে মাথায় চোখেমুখে হাত বোলাতে লাগলো যেন। কী এক অদ্ভুত মুগ্ধতায় ঝিমুচ্ছিলাম। আমার সেই ঝিমুনির মুহূর্ত টুকু ধরে নিয়ে কে যেন উঁকি দিলো চকিতে। আমিও যেন সেই উঁকি দেওয়া মুখটির দিকে চেয়ে একটা ঝাঁকি অনুভব করলাম সমস্ত শরীর-মনে। তাকে দেখেই যেন প্রশ্ন ও করলাম, “কে তুমি? তোমাকে কি আমি চিনি! আর একটু পরিস্কার করো না কেন তোমার মুখটি, আমি একটু ভালো করে দেখতে পাই তোমাটে যাতে!”

      —-- অর্থাৎ, সেই সে !?

     —-- সে কে ? 

     —-- সে, সে, সেগো, সে ….!

তাকে আমি চিনি? না চিনি না ? এইই তার প্রথম দেখা দেওয়া? না না, তাকে তো কোন বাল্যকাল থেকে দেখে চলেছি যেন। তোমাকে একদিন প্রথম দেখেছিলাম নদীর কিনারে। নাকি বাঁশজঙ্গলের ছায়ায় ছায়ায় ঘেরা সেই যে নদীর কিনারে চড়ের উপরে দেখেছিলাম। 

      আর কোথায় কোথায় দেখেছি! 

      তোমাকে কি বর্ষার মাঠে মাঠে দেখেছি প্রথম ? 

       তোমাকে কি শীত রাতের কুয়াশায় কুয়াশায় ঘেরা সেই আমাদের ঠাকুর নালার মাঠেতে দেখেছি প্রথম কি ? 

         দেখেছি কি সেই যে আমাদের জঙ্গলে যাবার গলির মুখটাতে প্রথম দেখেছিলাম ? তুমি কি সেখানেই এতকাল দাঁড়িয়ে আছো আজও একরকম‌ ভাবে? তাই এখুনি যেন মুখটি বাড়িয়ে উঁকি দিয়েই চকিতে মিলিয়ে যাও এমনভাবে ?



    বি.এস.এফ চেকপোস্টে কিছুটা সময় দাঁড়াতে হলো। পাসপোর্ট দেখে ছেড়ে দিলো আমাদের রিক্সা। তারপর সেই দুপাশে সার দেওয়া গাছের সারি যেভাবে চলে গেছে এই দেশ ছাড়িয়ে একেবারে টানা মাঝে মাঝে কিছুটা কিছুটা দূরত্ব রেখে রেখে সেই গাছের নিচ দিয়েই এগিয়ে যেতে হলো। মানুষ যেখানে সীমানা নামক একটি কথায় নানা আইনকানুন দিয়ে বেঁধে ফেলেছে তাকে । ভাগ করেছে। তারই একপাশে লম্বা দুখানি ঘরের একখানিতে ইমিগ্রেশন আর একখানি তে কাস্টমস চেকিং। বাইরে একটা টেবিলের উপরে ফেলে আবার কখনো বা ঘরের ভেতরে, অন্ধকারাচ্ছন্ন টিমটিমে আলোর নিচেয় দাঁড় করিয়ে সন্দেহ হলে যাত্রীদের ব্যাগপত্র তল্লাশি চালাচ্ছে। না হলে বাইরের টেবিলের উপর ফেলে একটুখানি দেখাদেখি করে ছেড়ে দিচ্ছে। এরপর পাসপোর্টে সিলছাপ্পর দিয়ে তবেই ওদেশে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়। 

    এসব কর্মকান্ড মিটে যাবার পরে একপায়ে দুই পায়ে যখন এগোচ্ছিলাম তখন দেখতে পেলাম একটি দুটি বুনো টিয়াপাখি উড়ে গিয়ে ডাকতে ডাকতে বসলো গিয়ে ওপারের একটি গাছের ডালে। হয়ত বাসা বেঁধেছে তারা ওপারের সেই গাছের মাথাতেই। নিশ্চিন্তে গিয়ে বসলো দেখলাম উড়ে যেয়ে। ওদের কোনো দেশ নেই?না, পাখির আবার দেশ কীসের! ওদের কোনো সীমানা ও নেই। ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট পাসপোর্ট কাসটোম কিছুই নেই। মানুষের জন্যেই সব। এমনকি এপারের কুকুর ওপারেও একই এলাকার বলে মনে হলো। মানুষ এইক্ষেত্রে সবকিছু ভাগ করে নিয়েছে। নানা নিয়মকানুনে বেঁধে ফেলেছে নিজেদেরকে। 

    তাই সবকিছু নিয়ম পদ্ধতি এদেশের সারা হয়ে যাওয়ার পরে ওপারের নিয়মকানুন ও মিটে যাবার পরে আমরা খুলনার বাসে যেয়ে বসলাম হাঁপ ছেড়ে যেন। এবং কিছুক্ষণের ভেতরে বাস ও ছেড়ে দিলো। সেই বড় বড় শিশু মেহগনি গাছ গুলিও চললো যেন আমাদের পাশে পাশে। গাছগুলির ছায়াঘেরা লম্বা পথটা বিশেষ এক সুবাস ছড়িয়ে যেন আমাকে বেশ খানিকটা মুগ্ধতা দিতে থাকলো নীরবে। সেইসব সুবাস নাকে নিয়ে কোনো একদিন এই বাংলার ওই সবুজ শস্যক্ষেত্রের মাঝে গায়ে গা লাগিয়ে বেশ খানিকটা বড় হয়েছিলাম। তার ই খানিকটা মেঠো সুবাস ছড়িয়ে আছে আজ ও দুপাশের ওই দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠের উপর দিয়ে। কারো যেন চোখমুখের রঙ্গিন উজ্জ্বলতার ইশারায় এই প্রকৃতি আলোকিত হচ্ছিল যেন। এক উৎসবমুখর রঙ্গিন বর্ণ উজ্জল হয়ে উঠেছে চারদিকটা বুঝি। সেই উজ্জ্বলতার কত বর্ণের ভেতর আমার হৃদয় মন ভারি আহ্লাদিত হয়ে উঠতে চাইছে । আমি যেন বারবার উপলব্ধি করছিলাম ওই যে পথের দুপাশে কারা যেন যত আলো-অন্ধকারের অদ্ভুত এক মায়া ঘুরিয়ে‌ বেড়াচ্ছে, তাতে কত উৎসবের আমেজ বহিয়ে দিচ্ছে যে… তার ভেতরে একটি কিশোরী মুখের আন্দোলিত ঢেউ-তরঙ্গ ভেঙে যাওয়া

কত-যে উচ্ছাস প্রদর্শিত করছে বাতাসে বাতাশে সেই আলো তরঙ্গের দোলায়…. আমি কি তাকে চিনতাম কখনো কোনোদিনও? নাকি না চেনা সে চেনা দিতেই আমাকে আজ অভ্যর্থনা জানাচ্ছে তার আপন ছন্দের ভেতর দুলে দুলে? ওই তো,‌জানলার বাসের জানলার ওপাশে বাইরে, যেদিকে তাকিয়ে আজ আমার মন ও ভেসে যেতে চাইছে কোনো এক দূর অতীতের আনন্দমূর্ছনায় যেন।

   আচ্ছা আজ কেন সে অমন ভাবে সেই তার চিরপ্রত্যাশার কথাটিই মনে করাচ্ছে বেশি করে? যার কোনো কূল কিনারা নেই যেন কোথাও। কেবলই ভেসে চলেছি সেই কোনো এক পুরোনো চেনা সুবাসের সঙ্গে সঙ্গে… যেখানেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের বহনকারী বাসটি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। 

   কেবলই যেন মনে হচ্ছে এই দেশের সকল কিছুই তো আমার ই ছিলো! এইসকল দুঃখ সুখ আনন্দ বেদনার সঙ্গে তো আমি কতকাল ধরে পরিচিত ! তাহলে কী করেই বা আজ আমি হয়ে গেলাম খাতায় কলমে বিদেশী এক পর্যটক মাত্র?



      কোন দূর অতীতে ঠাকুমার কোলের ভেতর শুয়ে শুয়ে যে শহরটিকে রূপ কল্পনায় এঁকে নিতাম

যেভাবে, আজ তারই যেন খানিকটা মিল খুঁজে বেড়াতে লাগলাম চারদিকে চেয়ে চেয়ে। যদিও আমি তাকে মনে মনে যে রূপেই তখনকার মতো এঁকে থাকি না কেন ঠাকুমার মুখ থেকে শুনে শুনে। বাস্তবে সে তো তার কালের নিয়মে নিজের মত করে দেখাবে! হয়ত তার বাস্তবতার স্বরূপটি এখন তার মতো, ঠাকুমার এঁকে দেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে কিছুটা তো অমিল হবেই! যা ঠাকুমা হয়ত তিরিশ চল্লিশ বছর পূর্বের অবস্থান‌ বাস্তবতায় ধরে এঁকে দিয়েছিলো আমার মনের ভেতরে; তার সঙ্গে কিছুটা এদিক ওদিক তো হবেই। এই যে বাড়িটাতে এইমুহূর্তে প্রবেশ করলাম বাবলু কাকার পেছন পেছন, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাম ব্যাগপত্র নিয়ে,তারপর দ্বিতল এই বাড়িটার নিচের প্রধান দরজা পেরিয়ে উপরের ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলাম যখন তখন তার ঘরের ভেতরের চারপাশের আসবাবপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্রের সঙ্গে কলকাতার ভবানিপুরের অন্নদা ব্যানার্জী লেনের বাড়িটারই দ্বিতীয় সংস্করণের কথাটিই মনে এলো বারবার। 

   বড়মা— অর্থাৎ আমরা যাকে ছোটোবেলা থেকে বড়মা বলেই জেনে এসেছি তিনি এখন এখানে। এই খুলনাতে। আমরা ঘরের ভেতর

প্রবেশ করে সকলেই আমরা তাকে একে একে প্রনাম করলাম। মা জিজ্ঞাসা করলো তাকে, দিদাভাই ভালো আছেন তো ? 

    বড়মা মায়ের চিবুক ছুঁয়ে মাথায় হাত দিয়ে আশির্বাদ করতে করতে জানান— হ্যাঁরে ভাই— ওই একরকম আছি রে। নে তোরা বস এখন। তারপর চোখেমুখে জলটল দিবি গিয়ে। 

     আমি তখন যে লম্বা পালঙ্ক খানার উপরে বসলাম যেয়ে, এর আগে এতবড় পালঙ্ক আমি সাক্ষাৎ দেখেছি বলে মনে হয় না। সেখানে বসে পড়ার পরে আমার মনে হলো  আমাকে বেশ ছোটো দেখাচ্ছে যেন! তবে আসতে আসতে যেরকম ভেবেছিলাম, কী জানি, কীরকম জড়াতাবোধই যেন-না-হবে-যেন! কিন্তু না, তার কিছুমাত্রই হলো না। মনে হতে লাগলো এতো অন্নদা ব্যানার্জী দেশেরই আর একটি অংশ বুঝি। তাছাড়া আর কিছুই নয় তো। সেই বড়মা যাকে কতকাল ধরে ভবানীপুর বাড়িতেও দেখে আসছি! এখানেও তো সেই একই কর্তী সেই‌ তো। তার ছোটো বোনের মেয়ে অর্চনা । সেই ব্রজ দার স্ত্রী । যাকে এর আগে কতবার ভবানীপুরের বাড়িতেই তো দেখেছি। মনে আছে একবার আমাদের বাড়িতেও গেছিলো ব্রজদাকে সঙ্গে নিয়ে বাবলু কাকার সাথে। তাহলে? সেই তারাই তো সব এখানে! এখানেও একই রকম ভাবে রয়েছে ! হ্যাঁ, একজনকে আলাদাভাবে দেখতে পাচ্ছি, তার নাম হলো রাধা দি। এই গৃহটির রক্ষাকবচ যা শুনেছি কলকাতায় থেকে। যখন এখানে এঁরা কেউ থাকে না তখন এই রাধাদিই সবটা সামলায় একলা হাতেই। সে নাকি একাত্তরেও একাই সামলে ছিলো বড়মাকে খানসেনাদের হাত থেকে অনেকদিন পর্যন্ত শুনেছি বড়মাকে। তারপরে একদিন আর না লুকিয়ে রাখতে পেরে বড়মাকে নিয়ে নদী পার হয়ে কোনো একটি পল্লী গ্রামের আড়ালে চলে গেছিলো। এই বাড়িটি যে নদীটির কোলের ভেতর দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই নদীটি পেরিয়ে দূরে রাধাদির কোনো এক আত্মীয় স্বজনের বাড়ি ছিলো যেখানে সেখানে যেয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো তাঁরা। এবং সেখানেই নাকি নানা উৎকন্ঠার মধ্যে যুদ্ধকালীন সময়টার অনেকটাই পার করেছিল তাঁরা উভয়েই । 

  সেই রাধা দিই এখন আমাকে তাদের দক্ষিণের যে দরজাটি খুলে দিয়ে বাথরুমের দরজাটি দেখিয়ে দিলো। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য তার সামনে ঝুলবারান্দাটিতে এই মূহুর্তে প্রত্যক্ষ করতে লাগলাম। যখন সেই দৃশ্য দেখতে লাগলাম তখন মনে হতে লাগলো আমি যেন একটি জাহাজের উপরে দাঁড়িয়ে আছি এই বাড়িটাকে তখন একটি জাহাজ ব্যতীত অন্য আর কিছুই ভাবতে পারছিলাম না যেন। যার নিচেয় শুধুই জল আর জল ! চারদিক থেকে যেন শুধুই লঞ্চ স্টিমারের নানাধরণের হুইসেলের আওয়াজ আসছে। দূরে ডানদিকে নদীর পাড় ঘেঁষে একেরপর এক কত আরো লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা … মাঝে তারা কেউ ছেড়ে যাচ্ছে আবার কেউ যেয়ে নদীর কূলের দিকে জায়গা খুঁজছে একটু নোঙর করবার জন্যে। আহা! কী জোলোবাতাস এসে লাগছে সমস্ত শরীর মনে! চারদিক থেকে শুধুই লঞ্চ স্টিমারের হুইসেলের আওয়াজ। তাদের ঘুরানো সার্চলাইটের আলোর ঝলক এসে লাগছে যেন মাঝেমাঝেই মুখের উপরে। সে যে কী এক মনোরম দৃশ্যের সামনে এই বারান্দার দরজাটি খুলে দিয়ে রাধা দি আমায় প্রত্যক্ষ করালো এই সান্ধ্যকালীন নদীর শোভা এবং এই সব দৃশ্যপট যা মুহূর্তের মধ্যে আমাকে যেন ভীষণ বেঁধে ফেললো। এবং আচ্ছন্ন করে তুললো। মনে পড়তে লাগলো, এই তো আসার আগে কোনো একটি সাময়িকী তেই তো জীবনানন্দ দাশের উপন্যাস পড়লাম। হ্যাঁ তাইতো, সে তো এই নদীর ই কথা, এই নদীর স্টিমার ঘাটের কথাই তো কবি তার উপন্যাসে লিখেছেন, ওই তো দূরে যে সোরগোল তুলে লোটবহর ওঠা নামা করছে যে স্টিমারের পাটাতনের উপর মানুষজনেরা, হ্যাঁ, হ্যাঁ ওইতো রাধা দি বললো, ওই তো সেই রকেট স্টিমার একটু পরেই নাকি ছেড়ে যাবে বরিশালের উদ্দেশ্যেই….।


    সে কি, কী বলে কি রাধা দি? এইটা সেই খুলনার বরিশালের স্টিমার ঘাট ! যার কথা এই তো কদিন আগেই পড়লাম! যেভাবে এর আগে সত্যি সত্যিই কারো লেখায় এইভাবে পড়েছি বলে তো মনে হয় না ! এই সেই ঘাট? যেখানে লেখক বলেছেন, কোনো একদিন বিছানাপত্র ট্রাঙ্কখানি বগলদাবায় করে নিয়ে চলাফেরা করতেন? এই সেই প্রেতিনীর রূপকথা উপন্যাসটির বিনতা চরিত্রের মুগ্ধতা বুকে নিয়ে যে ছবিটি কবি উপন্যাসিক হয়ে আমাকে এমন এক ঘোরের মধ্যে ঘোরাফেরা করিয়েছিলেন সে কথা আর কীইবা বলবো! এই তো, কদিন আর আগের কথা পড়েছি যে উপন্যাসটি ! সমস্ত কিছুই এখনো যেন চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে… । এই তো, এইতো সেই স্টিমার ঘাটটিই বলছে রাধা দিও। যত বার শুনছি, সে ততোবার দেখিয়ে দিচ্ছে আঙুল তুলে বলছে ঐ তো, ঐ তো রকেট স্টিমার ঐ টা 

তো!

   আচ্ছা তাহলে এখান থেকে রেলওয়ে স্টেশনটি খুব কাছে নাকি গো, ও রাধা দি ? 

    রাধা দি সেটাও এখান থেকেই যেন সবটা দেখিয়ে দেবার মত করে বললো, সে তো ঐ দিকে—-

    রাধা দি যেদিকে আঙুল তুলে দেখালো তাতে মনে হচ্ছে উত্তরপশ্চিম কোনায় হয়ত। দেখি আগামীকাল যদি এখানে থাকি তাহলে অবশ্যই একবার কাউকে সঙ্গে করে হয়ত দেখে আসবো গিয়ে।

    আচ্ছা আগামীকাল কি আদেও থাকবো এখানে ? যদি থাকি তাহলেই তো কথা। যেখানে শুয়ে বসে ট্রেনের সময়ের অপেক্ষায় থেকে জীবনানন্দ দাশ দেখালেন আমায় বাংলার অন্য আর এক রূপ তাঁর ভাষাতে। কী যে বৈচিত্রময় সে বর্ণনা! আমি যেন অদ্ভুত এক আঙ্গিকে পড়তে পারলাম এক লেখা— যেখানে প্রতিমুহূর্তে মনেহচ্ছে এতো কোনো অক্ষম গদ্যকারের লেখা না ! এ যে কবির গদ্য। এ আর এক চলন! যে ধরণের লেখা এর আগে এমনভাবে কোথাও দেখতে পাইনি তো…!


     ভবানীপুর এবং আমার জন্য পাড়ায় অর্থাৎ ঠাকুমার বাড়ি যাকে বলি আমরা সকলেই সেই দুই জায়গাতেই আমার একটি অন্য ডাকনাম আছে। এখানে আসার পরে দেখলাম সেই নামটাই চালু হয়ে গেলো। এবং সেই কারণেই বড়মার বোনের ছেলে যে কিনা প্রায় আমার সমবয়সী। সেই গোবিন্দ সেও দেখছি ওই নামেই ডাকছে। তাকে আমি কলকাতা থেকেই চিনি। সেই সূত্রে তার বোন অর্চনা বা ব্রজদাদেরকেও তো একই ভাবে সেভাবেই চিনেছিলাম। গোবিন্দ অর্চনা এবং ওদের মা গোদন মাসিমাকে ও তো একইরকম ভাবে ভবানীপুর থেকেই চিনেছি। আসলে এ যেন ভবানীপুরের বাড়িটাকে ই তুলে এনে এখানে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে! শুধু এই বাড়িতে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যেয়ে তখন ডানপাশের বাসিন্দারা কেউ একজন আমারা যখন উঠে আসছি তখন রাধা দিকে উদ্দেশ্য করে এক মহিলা কন্ঠে জিজ্ঞাসা এলো, হ্যাঁরে রাধা এ দিলিপ মামার বউ ছেলেরা না ? 

    খুব ভালো লাগলো না এই ধরণে জিজ্ঞাসা করা টাকে এইভাবে রধাদি কে। 

    যদিও তাঁরাই এইখানে আমার অপরিচিত যা । পরে যা জানতে পারলাম বড়মার কাছে তাতে এরাই হচ্ছে সেই হাতকাটা পঙ্কজ দাদুর ছেলেমেয়েরা। তাঁদের মধ্যেই একজন কেউ হয়ত এইভাবে শুনলো রাধা‌ দির কাছে ।

    

    তাই সবটা মিলে আমার স্বভাবের সেই ত্রুটির দিকটাতে বিশেষ একটা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে না চলা বলাতে এই বাড়িটিতে। সেই অর্থে সকলেই একরকম পরিচিত শুধু একটুখানি অপরিচিত এই গৃহের আসবাবপত্র গুলিই হয়ত। তারমধ্যে ওই মস্তবড় পালঙ্ক খানার আছে। পরিচিত ছিলো না রাধাদির ওই মস্তবড় রান্না খাওয়ার ঘরটি। আর তার বাইরে যে দিকটা নদীর বুকের উপর যেন দাঁড়িয়ে যে এই দিককার বারান্দাখানি, সেইটা । যেখানটায়‌ জল ছলছলে হাওয়ায় হাওয়াময় আলোয় আলোয় ভরে যাওয়া স্টিমার লঞ্চের ভো-বাঁশি এরা কেউ আমার পরিচিত ছিলো না একটু আগেও। এই যে নৌকায় নৌকায় ভরে যাওয়া জলমগ্ন এক অদ্ভুত জগতের খোঁজ পেলাম যেখানে। যত দেখছি ততোই শুধু ভাবছি জীবনানন্দ দাশের সেই বর্ণনা করা স্টিমার ঘাটের কথা। কেবলই মনে হচ্ছে এইযে এইটুকু ঝুল বারান্দার সামনে যে পৃথিবী একে এমন রহস্যময় ভাবে কেন যে মনে হচ্ছে কেন শুধুশুধু ! কতক্ষণে যে আরো কাছের থেকে যেয়ে যদি দেখতে পারতাম তাহলে কী ভালোই না লাগতো বুঝি ! 

    আমি যখন বারান্দার গ্রিলে একবারে মাথা ঠেকিয়ে একরকম মুখ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি নানা কিছু ভাবনার মধ্যে তখন রাধা দি এসে আমাকে বললো, ও ভাই, তোমাকে যে কেউ একজন ওই ঘরে খোঁজ করে …

     আমি যেন রাধাদির কথা শুনতেই পাইনি। আমি শুধুই ভাবছি ওই স্টিমারের ডেকের উপরটাতে যদি একবার যেয়ে এই সময়টাতে দাঁড়াতে পারতাম তাহলে কি ভালোই না লাগতো! 

       রাধা দি আবারও উচ্চারণ করলো সেই রকেট স্টিমারের নামটি। বললো, হয়, বরিশাল যায় নাকি ওই স্টিমার, তাই তো শুনেছি ।


    সবটাই আগামীকালের অবস্থানের উপর তুলে রাখতে হয়। যদি থাকা হয় তো আরো ভালো করে দিনের বেলায় পারলে একবার যেয়ে দেখে আসবো । যদি অবশ্য কালকের দিনটা এখানে থাকা হয় তাহলেই।‌

সে যাক এখন দেখি গিয়ে ওই ঘরে কে আমাকে খুঁজছে ।




আগামী পর্বে 

****************************************************************************