বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

গুচ্ছ কবিতা * পার্থসারথি মহাপাত্র





কবিতাগুচ্ছ * পার্থসারথি মহাপাত্র


বার্ধক্যের আকাশে শৈশব


তখন আকাশটাই ছিল আমার ক্যানভাস

মনের রঙে প্রতিদিন আঁকতাম স্বপ্ন।

ছেলে-মেয়ে ভেদ ছিল না কোথাও,

সবাই ছিলাম আকাশের সমান তারা।

একটা মাঠজোড়া সবুজ দৌড়,

কৃষ্ণচূড়া-ফোটা লাল উত্তাপে

ঝলমল করত কৈশোরের দিন।

আজ বার্ধক্যে বিছানার সাদা চাদরে

নীরব হয়ে শুয়ে থাকে শরীর।

ইচ্ছে হয় চোখে চোখে থাকুক আপনজন,

কিছুক্ষণ ভুলে যাক পৃথিবী তার বয়স,

আর আমরা বার্ধক্যের আকাশে

শৈশব হয়ে মাঠের ঘাসে ঘাসে 

দু’দণ্ড ইকড়ি–মিকড়ি খেলি।



বার্ধক্যে একা 


আড্ডাবাজ, প্রাণচঞ্চল জীবনটা

আর আড্ডার ভিড় জমায় না!

হৃদরোগের মত অনিহাও 

এখন আমার পরম আত্মীয় 

হতাশার গাঙে নিমজ্জিত হয়ে 

একাকীত্বে ভোগার সময়টাই বার্ধক্য!

দেওয়ালে গোটাকয় ছবি এঁকেছি

হাসি, কান্না, আনন্দ, দুঃখ, ভাবুক আরও..... 

আমার যা কথা বলার বলি ওদেরকেই,

দেওয়ালেরও কান আছে কিন্তু 

বাড়ির অন্যদের মতো ওরা বকে না

দেওয়ালের মুখ নেই।



বার্ধক্যবেলা


সারাজীবনের অর্জিত ধারণা ভ্রান্ত 

প্রমাণিত করার চেষ্টা চলছে আজ

ছেঁড়া কাপড়ের শেষ পরিনতি ন্যাতা 

নোংরা সাফ করলেও 

নোংরা হয়েই পড়ে থাকে ঘরের কোণে 

জীবন সায়াহ্নেও একইভাবে  

পড়ে থাকে অপাংক্তেয় বার্ধক্যবেলা।

জীবনটা আজ বোঝা হয়ে উঠলো 

এ ভার আর বইতে চায় না কেউ।

অমোঘ গোধূলি থমকে দাঁড়িয়ে 

ঐ বুঝি দু'চোখের ঝাপ নামাতে আসছে ঢেউ।



মোহনার দিকে


ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে রক্ত মাংসের গভীরে,

রোদে পোড়া দিনের মতো নিঃশব্দে।

যে পা ছিল স্রোতস্বিনী,

সে এখন ব্রততী, পর ভরসায় রোহিণী।

চোখের ভেতর জমে আছে 

ঋতু বৈচিত্রের পিচুটি, 

ভাঙা সাঁকোর ওপারে

ফেলে আসা দিনের ডাক।

ধমনী নয় শিরায় শিরায় বয়ে চলে সময়

যেন শুকনো নদীর বুকে

মাটি ফুঁড়ে ওঠা পুরোনো স্রোতের স্মৃতি।

কথা কমে আসে,

কিছু নীরবতা লিখে যায় ইতিহাস।

যারা একদিন নাম ধরে ডাকত,

তারা অনেকেই দূরের কুয়াশা।

এই নিঃশব্দ পথচলা জীবনের আরেক রূপ

যেখানে নিরবতা ভীড় করে,

আর গভীরতা বাড়ে।

বার্ধক্য তুমি ক্লান্তি নও,

এক দীর্ঘ পথের শেষে সমুদ্র মোহনা 

যেখানে জল ধীরে ধীরে বয় 

অবশেষে সাগরে মিলিয়ে যায়  

আর আকাশটা উদার দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।


""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""



************************************************************



                     পার্থসারথি মহাপাত্র 


৯ এর দশক থেকে লেখালেখির সাথে যুক্ত পুরুলিয়া জেলার বলরামপুরের পার্থসারথি মহাপাত্র। বাংলার বিভিন্ন ছোট পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা বিচ্ছিন্ন ভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে। কবিতা ছাড়াও ছোট গল্প ও অণুগল্প নিয়মিত লিখে চলেছেন । তাঁর লেখা দুটি কবিতার বই 'বড়মুকরুর ছা'( মানভূমী ভাষায়),পোয়াতি মেঘ এবং 'ক্ষুধার স্পর্শে বর্ণমালা কেঁপে যায়' সমাদৃত। এখনো কোনো গল্পের বই প্রকাশিত হয়নি। পরবর্তী ক্ষেত্রে প্রকাশ করার সম্ভাবনা আছে। 





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন