জীবন জারণ
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
এই পাথরটার ওপর বসলে কেমন যেন পূর্ণ পূর্ণ মনে হয় নিজেকে অনুভবের। ফাঁকা হৃদয় যেন আপন ছন্দে ভরে ওঠে। চারিদিক হাতড়ে বুকের ঝোলায় ভরে নিতে চায় সবকিছু।পাথরটার ওপর বসলেই কেমন এক চেনা আপনপন। মনে হয় যেন মায়ের কোলের ওপর বসলাম। মায়ের শরীরের চেনা গন্ধটা ফিরে আসে ওর বৃত্তে।এই সময়টায় এদিকে কেউ আসেনা সচরাচর।উৎসাহী দু একজন পর্যটক অথবা একটু প্রয়োজনের আড়াল খুঁজতে থাকা প্রেমিক যুগল। তখন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে অনুভব। ওরা লজ্জা পায় প্রথমে।তারপর নিজেরাই একান্ত বলয় বানিয়ে আনন্দ অভিসারে নামে।অনুভব ভাবে তখন,এই মুহূর্তগুলোতেই হয়তো বাঁচতে হবে একসময় ওদের জীবন অনুভবে।কারণ বারবার একই ভোগ পরের দিকে সেই সন্তুষ্টি আর দেয় না।এটা অর্থনীতির পরিভাষায় ' ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি' । দাম্পত্যের ক্ষেত্রেও অনেক সময় তাই ঘটে।প্রথম দিকের সুখ উধাও হলেও অনেক সময় টেনেহিঁচড়ে শেষ দাঁড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া।এ এক ট্রাজেডি তখন ! মানুষ বলেই হয়তো টেনে যায় ইচ্ছের বিরুদ্ধে ! অনুভবের চারিদিকে এখন প্রকৃতির সরলমুখ।ও এই সময় প্রকৃতি গিলে গিলে খায় যেন। দুচোখ ভরে দ্যাখে।দুকান ভরে শোনে। এতো রকমের যে পাখির ডাক হতে পারে ও জানতোই না !কি অপূর্ব ! প্রত্যেক ডাক আলাদা অথচ কি মিষ্টি।লেজ নাড়িয়ে খেলে বেড়ায় ওরা এদিক ওদিক। অনুভবকে ওরা চিনে গেছে এ কদিনে।তাই বোধহয় আরো আপন করে নেয় ওকে।ভয় সরিয়ে কাছে এসে কিচিরমিচির করে।ও বোঝে,ওর কথা জানতে চায়।হাত বাড়িয়ে ঝুরি ভাজা , বিস্কুট দিলে মুচকি হেসে খেতে থাকে।একদল চলে গেলে আর একদল আসে। তারপর আর একদল।কখন যে সময় কেটে যায় ওর।রোদ একটু চড়া হলে হোম স্টের ছেলেটা ওকে নিতে আসে গাড়ি করে। এতোটা রাস্তা এই গরমে ! ওদের ভয় বুড়ো মানুষ যদি মাথা ঘুরে পড়ে যায়।বিপদ হয়ে যাবে তখন ।
দিন পনেরো হলো হোম স্টেতে আছে। প্রতিদিন সকালে একটু কিছু খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে এখানে।প্রাত:ভ্রমণও হয়। নিরালা প্রায় নির্জন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বাবার কথা খুব মনে পড়ে অনুভবের। প্রতি রবিবার ভোরবেলা ও বাবার হাত ধরে বের হতো হাঁটতে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেলে ঘাসের ওপর চুপ করে বসে থাকতো দুজনে।বাবা ঐ সময় কথা বলতে বারণ করতো।বলতো, দুচোখ ভরে সকাল দ্যাখ, শোন। পাখিদের ডাক,রোদের আদর সব কেমন যেন মায়াবী লাগতো।তারপর একসময় উঠে পড়ে বাড়ি ফেরা।ঐ রবিবারের সকাল অনুভবকে প্রকৃতি দেখতে শিখিয়েছে।বাবা পাখির ডাক চিনিয়েছে। চোখের কোন দুটো ভিজে আসে যেন।মা বাবাই ছিল অনুভবের পরম সম্পদ !
আসলে অনুভব পালিয়ে এসেছে বৃদ্ধাশ্রম থেকে। ছাব্বিশে জানুয়ারি বৃদ্ধাশ্রম ' নিরালা'র নিয়ম একটু শিথিল থাকে।একটু নিজেদের মতো ভেতরের বাগানে ঘোরাঘুরি করতে দেয়। সারাদিন খাওয়া দাওয়া আড্ডা। গেটের তালা খোলা থাকে। কোথায় আর যাবে বুড়োগুলো এই বয়সে? হাঁটতে পারে না, দাঁড়াতে পারে না ! নিরালা কর্তৃপক্ষ কখনো ভাবতেও পারেনি অনুভবের মতো বাহাত্তরের এক বুড়ো পালাতে পারে অ্যাডভেঞ্চার করতে।
চুপিচুপি এক ফাঁকে গেট দিয়ে বেড়িয়ে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা হাওড়া স্টেশন।টিকিট কেটে সোজা পুরুলিয়া। আগে ওর বউ অনিতাকে নিয়ে একবার এসেছিল অযোধ্যা পাহাড়ে দোলের সময় পলাশ দেখতে।আজ অনিতা মারা গেছে বছর দশেক হলো। অনিতা মারা যেতেই শুরু অনুভবের দুর্দশা। বাড়িতে বৌমার অত্যাচার যেন বাড়তে লাগলো। পোশাকের শালীনতা উধাও। নোংরা বস্তির ভাষা শুরু হলো। ছেলেকে বলতে ও বলেছিল , মেনে নাও।এতেই সংসারে নাকি শান্তি। শেষমেষ ছেলে বৌ পরিকল্পনা করে পাঠালো এই বৃদ্ধাশ্রমে। লজ্জায় যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া মন প্রতিবাদ করতে পারেনি।এও সম্ভব ! নিজের সর্বস্ব দিয়ে , নিজেকে বঞ্চিত করে যে ছেলেকে মানুষ করলো সেই ছেলেই তাড়িয়ে দিল বাড়ি থেকে ! হাসি পায় এখন অনুভবের। বড়ো প্রত্যাশা করেছিল ও ছেলে বৌমার কাছ থেকে। নিজের বাড়ি থেকে বিতাড়িত সেই কারণেই বোধহয়।শেষের দিকে অনিতা প্রায়ই বলতো,ওর নাকি চিন্তা হয় ও মরে গেলে অনুভবের কি হবে ! তখন অনুভব ওসব অকারণ চিন্তা বলে হেসে উড়িয়ে দিতো।আজ ও বেঁচে থাকলে ওকেও বোধহয় আসতে হতো অনুভবের সঙ্গেই এই বৃদ্ধাশ্রমে।
প্রথম দিকে ছেলে মাসের শুরুতে একবার আসতো বৃদ্ধাশ্রমের খরচ দিতে।মাস ছয়েক হলো তাও বন্ধ।আর আসে না। অনুভব পেনশনের টাকা থেকে দিয়ে দেয় এখন।ভাগ্যি পেনশনের টাকাটা ছিল। নাহলে না খেতে পেয়ে মরতে হতো এই বয়সে !তাই ও ঠিক করে নিয়েছে আর ফিরবে না। এখানেই একটা ঘর বানিয়ে শেষ কটা দিন থেকে যাবে এই সরল মানুষগুলোর মাঝে।বাবা বলতেন ,যাদের বুকে সবুজের বাস তারা প্রকৃতির মতো পবিত্র নির্মল হয়। এখানকার মানুষগুলোর চোখেমুখে ভরসা দেখতে পায়। বিশ্বাস করা যায় এদের নি:সঙকোচে।
সামনে তাকিয়ে দেখল কয়েকটা বাঁদর এক ডাল থেকে আর এক ডালে লাফাচ্ছে।এটা ওদের খেলা। কিছুক্ষণ পরেই ওরা চলে যাবে। এদিকটা একদম নির্জন।হোম স্টের মালিক পরামাণিক ওকে এদিকে আসতে বারণ করেছিল। ভয়ঙ্কর বিষধর সব সাপ আছে এদিকে। ওর কথা শুনে মুচকি হেসেছিল অনুভব। মানুষের থেকে বিষধর আর কিছু আছে নাকি? হঠাৎ গাছের পড়ে থাকা শুকনো পাতা মাড়ানোর আওয়াজ।পিছন ফিরে তাকাতেই দেখল , ছেঁড়া জামা গায়ে একটা বছর দশেকের বাচ্ছা ছেলে ছাগল নিয়ে এগিয়ে আসছে। ছেলেটাকে আগে দেখেছে অনুভব।ও উল্টোদিকের জঙগলটায় বসে থাকে। ছাগলগুলো চড়ে চড়ে খায় আর ও নজর রাখে।আজ হঠাৎ এইদিকে।
ওকে জিজ্ঞাসা করতেই বললো , এদিকের জঙ্গলে কারা সব গাড়ি করে এসেছে।কি সব মাপজোক করছে। বলছে নাকি ওদিকের পাহাড়টা বিক্রি হয়ে যাবে। ছেলেটার চোখে জল। এ পাহাড়টা বিক্রি হতে দেবে না অনুভব। ওরা এদিকে এলে পাথরটাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়বে ' চিপকো আন্দোলনের' মতো।ছেলেটার চিন্তা, যদি পাহাড় বিক্রি হয়ে যায় তাহলে ও ছাগল ছড়াবে কোথায় ? তাহলে মালিক তো পয়সাও দেবে না।ও আর ওর মা খাবে কি তাহলে? ছেলেটার কথা শুনে বুকে ধাক্কা লাগলো অনুভবের। মায়ের কথা ভাবছে ছেলেটা।ছাগল চড়িয়ে দিনের শেষে যা পায় তা দিয়ে ওদের মা ছেলের চলে যায়। ছেলে মায়ের কথা ভাবছে!আর ওর ছেলে বাবাকেই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে.....!
দুচোখ জলে ভরে এলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে কান্না লুকানোর চেষ্টা করলো অনুভব। ছেলেটা হাঁ করে চেয়ে আছে ওর দিকে। বুড়ো মানুষটা কাঁদছে কেন , হয়তো ওর মনে প্রশ্ন। প্রসঙ্গ এড়াতে ওকে অনুভব জিজ্ঞাসা করলো, সারাদিন তুই তাহলে কি খাস?খিদে পায় না তোর? ছেলেটা মুচকি হেসে বলে উঠলো ,এই ছাগলের দুধ খাই তখন। একটা ছাগলের বাচ্ছা গুলো দুধ খাচ্ছে মায়ের দুধ ভর্তি থলির বাঁটে মুখ দিয়ে।ছাগলটার দুপায়ের ফাঁকে শুয়ে পড়ে বাঁটে মুখ দিয়ে অন্য বাচ্চাগুলোর মতো ছেলেটাও চুকচুক করে দুধ টানতে লাগলো। স্বর্গীয় দৃশ্য ! বুকের কালবৈশাখীতে অনুভবের মায়ের কথা খুব মনে পড়তে লাগলো।
*************************************************************************************
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
রয়েল কমপ্লেক্স ,কাঠালবাগান ,উত্তর পাড়া, হুগলী থেকে লিখছেন। পেশা: শিক্ষকতা ,নেশা : কলম চারিতা ,সাপলুডো খেলা শব্দ নিয়ে ,অণুগল্প ,ছোট গল্প ,কবিতা, প্রবন্ধে সুখ-দুঃখ ,হর্ষ-বিষাদ, আড়ি ভাবের অনুভবে থাকা ,জীবনের দুই স্তম্ভ রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দের আদর্শ মনন, যাপন ও শীলনে.. স্বপ্ন: পৃথিবীকে ভালবাসার যৌথ খামার বানানো..দিক চক্রবালে হিরণ্যগর্ভ আলোর খোঁজ ..পাখি ,গাছ আকাশের সাথে মন কি বাত.. সূর্যের নরম আলোয় সুখের আবিরে মানুষের সাথে হোলি খেলা..




খুব সুন্দর।
উত্তরমুছুন