কবিতাগুচ্ছ * অর্ণব সামন্ত
দেবী ও পূজারী
হে দেবী স্বয়মাগতা নৈবেদ্য সাজানো
শব্দগুলি ছন্দগুলি নৈঃশব্দ্যে আঁধারে ধায়
নাহ্ হারায় না তারা বরঞ্চ আরোহন করে সাফল্যচূড়ায়
প্রেমের মিনার গড়ে বালুচরে , মরুভূমে
হে দেবী স্বাধীন , স্বেচ্ছাচারী , স্বৈরিনী
নদীমাতৃক , নদীভিত্তিক সভ্যতার প্রবাহ ছোটায়
হে দেবী পূজারীভূক নৈবেদ্য ও কম লাগে
নিজেই যজ্ঞাগ্নিতে জ্বলে পুড়ে পূজারীকে পরিত্রাণ দেয়
আগুনে আগুনে অপত্য অগ্নির জন্ম দেয়
পূজারীর পদপ্রান্তে সমর্পনে উত্থান জাগায়
হে দেবী সর্বভুক , পূজারীকেও সর্বভুক করে
কামনাবাসনার অগ্নিতে অগ্নিতে পুড়ে পুড়ে
আরেক সর্বভুক অপত্য অগ্নির নবজন্ম দেয় !
ফসলের গান
এভাবে মাঝির ফসলের স্তনে দুধ জমে
হিমেলের শূন্য বুক থেকে জাগে অপত্য আলো
সোঁদামাটির গন্ধে উথাল পাথাল নদী
জ্যোৎস্নার মধুবনে নেশায় টালমাটাল গান
ভুলে যায় সামাজিক স্বরূপ , সংস্কার , প্রচ্ছদ
আদি সুরে বইতে থাকে ছত্রিশ রাগ ও রাগিনী
এককের ঝংকারে কাঁপে কোষস্নায়ুমজ্জামেদরক্ত
বিদ্যুচ্চমকে বিদ্যুচ্চমকে চলে যায় জগতের বাইরে
ব্ল্যাকহোলে সৃজিত হয় সহজের গান সহজিয়া ভাবে
সন্তোষে ও সুখে ফসল তুলে আনে ঘরে , মনের মনিকর্ণিকায়
দোলাচল গেরস্থালি ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া দোহনে দোহনে
সুব্রতাসম্ভব সহস্র গান নিজেরাই গাইতে থাকে নিজেদেরকে
ভাঙা কবিতার মতন বসে থাকে পথের মোড়ে পথিকের বুকে
নৃত্যশীল আনন্দস্পন্দ এসে ধাক্কায় ভেতরে বাইরে
অসম্ভব ছবির মতন সুন্দরভাবে ভঙ্গিমায় স্থির থাকে জ্যামিতিক কোলাজে
করিও কোমলে নোয়ার নৌকা পাড়ি দেয় সাত সমুদ্র
দিগন্ত দিগন্ত পেরিয়ে পারস্পরিক আবিষ্কারে নতুন দেশ
নতুন পৃথিবীতে জ্বেলে দেয় সদ্যোজাত অপত্য আলো
এভাবেই ফসলের স্তনে মুখ রাখে , ব্ল্যাকহোলের গর্ভে রাখে
গ্যালন গ্যালন জ্যোৎস্নার আলো থরে থরে তড়িৎ চুম্বকীয় সজ্জায়
অপত্যের কবিতা , গান হয়ে প্রকাশিত্য হবে বলে যথা দ্রাঘিমায় , যথা অক্ষরেখায় !
তানসেনের তানপুরা
তানসেনের তানপুরা হয়ে স্থিত চিরযৌবনা সময় আকাশ পেরিয়ে আকাশে সুরেলা সুগম্যতা
বিষুবরেখায় এককের গান গাইতে গাইতে
উড়ন্ত দ্রাঘিমার ডানায় পাশের প্রান্তরকে তেপান্তর বানিয়ে
দীপকে আগুন জ্বালিয়ে মল্লারে অশ্রু হয়ে ঝরে
দহনে দহনে জল যেতে চায় জলের পেটে
ইনহিবিশন খুলে রেখে সত্তা স্বয়ংপ্রভ প্রভায়
সরে যায় কাচের স্বর্গের বিভ্রম সত্য সরেজমিন , বাস্তবিক
মন্থনে দহনে গরল কখন যে অমৃত , লক্ষীমন্ত
শব্দের অমরত্ব আসে নৈঃশব্দ্যের ব্ল্যাকহোলে
আলো ছুটে যায় আলোর উৎসে প্রথম আলোয় নবজন্মে বেঁচে ওঠে প্রথম শব্দের চিৎকারে
তানসেন চলে গেছে সেই কবে কিংবদন্তী আজও
তবু ভুলে ফেলে গেছে সেই বাঁচার চাঁদপুরা
সেই তানপুরা সুযোগ পেলেই নিজের মর্জিমেজাজে বাজে
সুরকে ভাসায় উড়ন্ত অনন্ত দ্রাঘিমা ডানায় !
কলম্বাসের কম্পাস
এভাবেই ভাঙা গান শরীরে দিয়ে যখন তুমি পালাও দিবারাত্রির কাব্যে , গদ্যে নিরন্তর সেতারের ঝালা বাজাও
কোষে কোষে লিখে রাখো পারস্পরিক বিদ্যুচ্চমক চেনা
স্নায়ুতে স্নায়ুতে অকস্মাৎ বিহ্বল উদ্বেলতার হানা
সমস্ত সমর্পনে ফিরে পাও সমস্তর চেয়েও বেশি
হে মারিয়ানা উত্থানে ডাকো হে এভারেস্ট তোমার সাফল্যচূড়া
ভাঙা ভাঙা গান হয়ে জীবন যখন আরও ভাঙা ভাঙা ভাঙা
কবিতা এসে তার পদপ্রান্তে বসে প্রণম্য অক্ষরে অক্ষরে
কিছুই থাকে না তফাত , ভেদাভেদ অক্ষাংশ ব্যবধান অনন্ত দ্রাঘিমায় ভাসান দেয় দ্রাঘিমাংশের আনচান শুধু নষ্ট ধ্রুবতারা চোখে কম্পাস পেয়ে যায় পরিযায়ী কলম্বাস মন !
টাইম স্পেস ট্রাভেল
টাইম স্পেস ট্রাভেল করে একবার দুরন্ত কৈশোরে এলোমেলো কেশে ভেসে আসে পোস্টমডার্নের কারুকার্য
দমকা হওয়ার মতন কথা , রোদজ্যোৎস্নার মিশেল কথকতা
সহজ গানের সুর উঠে আসে নাভি থেকে মাদকতা নিয়ে
তবু নৈঃশব্দ্য ছাড়া কোন বিজ্ঞাপন থাকে না
তবু অহংকার ছাড়া থাকে না কোন আলো
ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়ার দাঁড়ের ঝপঝপ শব্দে নোয়ার নৌকা
দিন ফুরায় রাত ফুরায় কথা ফুরায় না
জীবন নাচে উজ্জীবনে মৃত্যুর চিতাগ্নিতে পুড়ে একা তোমার গায়ের উষ্ণতা লেগে থাকে হৃদয় ক্যানভাসে আগ্নেয় চুমুর প্রত্যাশী যত সুব্রতাসম্ভব গান
লাভা হয়ে জড়ায় আষ্টেপৃষ্ঠে চন্দ্রিমার স্নিগ্ধতা মেখে তুমি তখন ষোড়শী রক্তিমে আর আমি অষ্টাদশ স্পর্ধায় !
****************************** ****************
অর্ণব সামন্ত
ইংরাজী ভাষার ছাত্র । ইংরাজীতে এম. এ ; বি . এড ।উনিশশো তিয়াত্তর সালে দক্ষিণ ২৪ পরগণার বাসন্তীতে জন্মালেও স্কুল জীবনের পর থেকে শহরতলীতে আবাস । শিক্ষকতা পেশা , নেশা কবিতা ও গল্প লেখা । এ পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ , ৪টি - গোলাপ এবং , ঝরা সময়ের উপকথা , পারমিতা , বামাক্ষী । পেশাগত সময় বাদে গান শোনা , বইপড়া , ফোটোগ্রাফি , কবিতা ও গল্প লেখাকেই জীবন যাপনের একমাত্র উপায় বলে মনে করেন।



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন