কবিতাগুচ্ছ * দণ্ডী কুমার
মেহেরগড়ের চাষী
দেখা হয়ে গেল মেহেরগড়ের এক চাষীর সঙ্গে
সে এসেছে বহুদূর থেকে। রূপার, লোথাল কিম্বা কালিবোঙ্গান পার হয়ে ।
সে এখন ঘর বেঁধেছে কংসাবতী নদীর তীরে।
একখণ্ড লাজুলি পাথরও সে আনতে পারে নি
শুধু কাঁধে করে বয়ে এনেছে একটা কাঠের লাঙল
এই লাঙল দিয়ে সে মাটি থেকে অন্ন তুলে আনে --
লাজুলি পাথরের থেকেও যা বেশি দামী।
মেগালিথ
ওরা বলে হাড়গাড়া। কবরের উপর পাথর পোঁতা সমাধি, মৃত পূর্বপুরুষের হাড় মাটিতে পুঁতে এভাবেই সমাধি বানাতো ওরা। পলাশ শিমূল ফুল ঝরিয়ে শ্রদ্ধা জানাতো। এখন তো শুধুই স্থান নাম, টিকে আছে মানুষের মুখে মুখে। পরিযায়ী সময় ইতিহাসকে এনে ফেলেছে অন্য এক যুগে।
পরিযানের পিছনে লুকিয়ে আছে বিতাড়নের ইতিহাস
সেই কবে মাটি হারিয়েছে ওরা ; হাড়গাড়ার মাটিটুকুও আজ তাদের নেই ; দামোদরে গিয়ে চোখের জলে অস্থি ভাসায়।
বোলান গিরিখাতের ধারে বিলুপ্ত কৃষিসভ্যতা, মৃৎশিল্পের সভ্যতা, সিন্ধু হরপ্পার জননী মেহেরগড়কে, স্মৃতি হাতড়ে পাওয়া যায় না। দামোদর উপত্যকায় অস্থি-কবরের রীতি এবং ভাঙা ভাঙা ভাষার স্মৃতিতে
আজও ভাসে মেহেরগড়ের মুখ।
খোদা
ভাষা ছিল না, ছিল নিজেকে প্রকাশ করার আকুতি, সামুহিক নৃত্য ও হুঙ্কারে কেঁপে উঠতো গুহাগৃহ
লতাকুঞ্জের আড়ালে আদিমানবীর চুম্বন
শুধু ক্ষুধা নয়, প্রজনন নয়, হৃৎপিণ্ডের ভিতর থেকে গড়িয়ে
পড়তো প্রেম৷
লিপি ছিল না, লিখন ছিল, ছবির মতো লিখন - গুহাগাত্রে, ফুল, ফল, পশু,পাখি, নৃত্য ও শিকারের দৃশ্য। মানুষ আজও বহন করছে সেগুলি শরীরের ক্যানভাসে, পায়ে, গলায়, বাহু, বুক ও পিঠ জুড়ে। এরই নাম 'খোদা'। এ তো সেই প্রেম যা শরীরে আজও খোদাই করে রাখে মানুষ।
সভ্যতাকে ফেলে এসেছে ওরা, সঙ্গে এনেছে সংস্কৃতি
মাছ, ফুল পাখি কিম্বা লতাপাতার চিত্রায়ণে অতীতের
ইতিহাসের কথা লিখে রাখে।
এ ইতিহাস কেউ কি পড়বে কোনওদিন?
পরিযান
গুহা ছেড়ে দেশান্তরী মানুষ বাসা বেঁধেছিল বনান্তরে
বিন্ধ্যাঞ্চল থেকে বোলানে, সিন্ধু সোয়াত কুররম উপত্যকা অযোধ্যা পাহাড়ের বনাঞ্চলে দামোদর উপত্যকায়, কুমারী কাঁসাই সুবর্ণরেখার ধারে, নির্জন পাহাড়ী গাঁয়ে।
ইতিহাস মাটি চাপা পড়ে আছে বুজে আসা পাহাড়ী সোঁতার ধারে, নবপোলীয় যুগের আয়ুধ ছেনি ও হাতকুঠারে, লাল কালো ধূসর মৃৎভাণ্ড ও অযোধ্যা পাহাড়ের মাইক্রোলিথিক হাতিয়ারে। ইতিহাস মাটির অধিকার চাইছে। ইতিহাস বিস্মৃতির হিসেব চাইছে।
চাকার দাগ
যুদ্ধের পরেও মাটিতে থেকে যায় রথচক্র ঘর্ষণের দাগ
বিনষ্ট সভ্যতার চিহ্নগুলি পড়ে থাকে ছত্রাকার
প্রস্তরিভূত কঙ্কাল, প্রাচীন হাতিয়ার, মানব বসতির চিহ্ন মৃৎভাণ্ড ও শস্যকণা। সভ্যতা হারিয়ে গেলেও কিছু দাগ রেখে যায় পথে প্রান্তরে। সেই দাগ ধরে এগোতে পারলেই খুঁজে পাবে প্রপিতামহদের জগতে।
পথ আজও অপেক্ষা করে আছে সেই পথিকের জন্য যে পায়ে পায়ে পৌঁছে যাবে সেই গুহাগৃহে, গাছ-ঘর কিম্বা পর্ণকুটিরে, প্রাচীন মানবের ঘরে- ইতিহাস যাদের আদিম বর্বর আধামানব বলে সম্বোধন করে। অথচ সভ্য মানুষের ধমনিতে আজও সেই আদিম রক্ত।
****************************************************************
জন্ম - ২৩শে নভেম্বর, ১৯৫৯ সালে পুরুলিয়া জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ভাড্ডিতে একটি গরীব কৃষক পরিবারে জন্ম। আর্থিক প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশোনা । রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পাশ করে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে ২০১৯ অবসর গ্রহন করেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি ও ৮এর দশক থেকে পত্রিকা সম্পাদনার শুরু। প্রথম পত্রিকার নাম ছিল শালপলাশ। পরে ৯এর দশকের শেষ দিকে 'মালভূমি বাংলা' নামে একটি সাপ্তাহিক সংবাদ সাহিত্য সম্পাদনা করেন। ৯এর দশকে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'সহমরণের চিতা' প্রকাশিত হয়। এ সময় পুরুলিয়া ও অন্যান্য জেলার বিভিন্ন পত্রপত্রিয়ায় প্রবন্ধ ও কবিতা প্রকাশিত হয়। কিন্তু লেখাগুলি অগ্রন্থিত থাকে। এরপর দীর্ঘদিন কবি সাহিত্য জীবন থেকে দূরে থাকেন। তবে ব্যক্তিগত লেখালেখি কখনই বন্ধ হয় নি। ১৯২৩ সালে আবার জনসমক্ষে এসে 'স্রোত' নামে একটি কাব্যগ্রন্থ 'সহমরণের চিতা'র সঙ্গে "দিগন্তে যেটুকু আঁধার' নাম দিয়ে যৌথ কাব্যগ্রন্থ রূপে প্রকাশিত হয়। পরের বছর প্রকাশিত হয় পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ 'দাহভূমি' ও একটি গবেষণা গ্রন্থ " নৃতত্ত্ব ও সমাজতত্ত্বের আলোয় মানভূমের আদি ঝুমুর"। বিগত বছর(২০২৫) একটি ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস "চুয়াড় নেত্রী রানি শিরোমণি" প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে চতুর্থ ভুবন নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করছেন।




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন