বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

উপন্যাস * দীপংকর রায়

 




কথা দিয়েছিলাম হেমন্তের নিয়রে 

পর্ব * ২২

দীপংকর রায়


একেক সময় একেক জনের কাছ থেকে একেকটি গ্রন্থের নাম শুনি আর সেই নামের তালিকা মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলি, ব্রজদাকে দিয়ে দিও তো মা….

       মা তার অফিসের সেই মানুষটির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ও ব্রজদা, দ্যাখেন তো ছেলে আবার কোন 

কোন তালিকা পাঠিয়েছে?

       সেইসব তালিকা হাতে পেয়ে ব্রজদা বলে, দিদি, আপনার ছেলে তো কিছুই বাদ রাখছে না দেখছি, ও আসলে কী করতে চায় তাই বলুন তো? 

       মা বলে, তা তো জানি না ব্রজদা! তার কাজই হচ্ছে এসব নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকা; 

        তাতে সেও বলে, না না, সে ভালো, তবে এমন সব বই এই বয়েসে পড়তে চাইছে কেন সেটাই ভাবছি, এছাড়া একেকবার ভাবছি, আসলে এর উদ্দেশ্যটা কী? সেটা কি নিতান্তই ভালোবাসা, না অন্য কোনো ভাবনাচিন্তা থেকে? তাই ভাবছি, একদিন ওর সঙ্গে কথা বলবো, ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে দিদি, বলবেন তো একদিন আসতে; আসুক না, আসাতে তো কোনো সমস্যা নেই! ওর সঙ্গে একটু কথা বলবো;


        মা সবটাই বাড়িতে এসে বলে। তবে ব্রজদার সংশয় নিয়ে একটি কথারও কোনো সমাধানের ভেতর মা প্রবেশ করতে চায় না কখনোই। এই সমস্ততে তার সন্মতির কোনো অভাব কোনোদিনও খুঁজে পেয়েছি বলে মনে করি না। এসবে নির্দিধায় তাঁর প্রশ্রয় পেয়েছি বরাবরই নিঃশব্দে। অনুভব করেছি, মা হয়তো আমার এই চলার পথকে সমর্থনই করে। আর তা যদি না করতো তাহলে এত অর্থাভাবের ভেতর, এই সামান্য কটি টাকা উপার্জন থেকে ব্রজদাকে এতগুলি টাকা সে মাসে মাসে নির্দিধায় দিতে পারতো না কখনোই।


         একেবারে ধারাবাহিক ভাবে ব্রজদার পাঠানো শরৎ রচনাবলীর একেক খন্ড হাতে পেলে সে দিনটা বেশ অন্যরকমের মনে হতো। সঙ্গে সঙ্গে অনুভবের ভেতর সকাল বেলার সব আলোরা যেন আহ্লাদে আটখানা হয়ে উল্লাস করে উঠতো একান্ত মনে, সে কথা আর কেউ টের না পেলেও নিজে অনুভব করতাম খুব ভালো করেই।

         ইতিমধ্যে রচনাবলীগুলি শেষ হয়ে আসলো। সেটা চলতে চলতেই ব্রজদাকে দিয়ে আরো কত অন্য 

বইও তো আনিয়ে নিয়েছি, সেও‌ নির্দিধায় সংগ্রহ করে এনে দিয়েছে উপনিষদ থেকে আরম্ভ করে পুরানের কয়েকটি খন্ডও। সে যেমন আছে, তার মধ্যে বিবেকানন্দের যোগগুলিও রয়েছে। আবার সেগুলি‌ দিতে না দিতেই হয়তো আবার বললাম, কোরান শরীফের কথাটিও। আবার হয়তো লিখে পাঠালাম, এ.টি দেবের ডিকশনারি, ইংরাজী বাংলা, বাংলা ইংরাজী অভিধানের কথাটিও। সমস্যা হচ্ছে বলে আঞ্চলিক ভাষার অভিধানের কথাটাও বলে দিলাম একদিন। বললাম, ব্রজদাকে বলে দেখো তো এইগুলি পাওয়া যায় নাকি? 

         আবার কিছুদিন যেতে না যেতে তাঁকে লিখে পাঠালাম, বাংলা অনুবাদে রাশিয়ান গ্রন্থগুলির কথা। ভস্তকের কী অসম্ভব প্রোডাকশন সে সব! তাতে মূল্য ও তো বেশি না! হাতে পেলে বড় ভালো লাগতো। তাই নিয়েই একেকটি দিন কেটে যায়‌…। সে কীই না এনে দেয়নি ব্রজদা; পুশকিন থেকে তলস্তয়, ম্যাক্সিম গোর্কি থেকে লেলিন কার্ল মার্ক্স, কী নেই! আবার সেগুলি‌ হয়তো সব পড়াও হয় নি, তার মধ্যেই বললাম, জীবনানন্দের কাব্যগ্রন্থ গুলির কথা। বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে বোদলেয়ারের কথা। জঁ আর্তুর রেবোর কথা। ফরাসি লেখক শিল্পীদের কথা জানতে বেশ কিছুদিন পেয়ে বসেছে, সে একেবারে রিলকে থেকে রঁদা। এ ছাড়াও আরো অনেকেই ছিলেন তার বাইরে,‌ এছাড়া তাঁর পছন্দ করে আনা দু’একজনের ভালো ভালো বইপত্রও পেয়েছি দু’একখানি। হয়তো লিখে পাঠালাম বাঙালি কবিদের এই সময়ের নির্বাচিত কবিতাগুলির সব নামধাম একসঙ্গে। হয়তো লিখে দিলাম, আধুনিক কাব্য পরিচয় নিয়ে কয়েকটি লেখকের নামও। এমনও হয়তো দেখা গেল, এই কেউ বললো, এই বইটা পড়েছো? ছন্দ নিয়ে কী সুন্দর লেখা! একবার পড়ে দেখো ছন্দ সম্মন্ধে একটা পরিস্কার ধারণা তেরি হয়ে যাবে। এরপর মাইকেল মধুসূদন থেকে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গুলি তো আছেই। তাছাড়াও হঠাৎ মনে হলো বা কারোর কাছে শুনতে পেলাম হয়তো, সুর বা রাগ রাগিনী গুলি নিয়ে একবার একটু পড়াশোনা করে দেখো। অমনি ছুটলাম, কোথায় পাওয়া যাবে সে সব? 

  

        প্রতিমাসে ব্রজদাকে এইভাবে একেকটি লিস্ট পাঠিয়ে দি, আর  ব্রজদাও এক পরিশোধ না হতে হতেই আর এক সংগ্রহ করে এনে দিয়ে চলেছেন ধারাবাহিক ভাবে… একেক অধ্যায়ে, নির্দিধায়। কত টাকা পাওনা থাকলো তাঁর খাতায়, তার জন্যে তাঁর বই পৌঁছানোতে কোনো খামতি নেই। শুধু মাসটি পড়লে তিনি তাঁর কাঁধে ঝোলানো ঝোলা ব্যাগটির ভেতর থেকে একখানি বাঁধানো খাতা বের করে হিসাব লিখতে থাকেন কত কার কাছে পাওনা থাকলো। টাকা জমা করেন একেকজনের নামের তালিকা বের করে ।


        তাঁর মতো এই ধরণের মানুষ না থাকলে কে এমনভাবে যা অর্ডার করা হয় অমনি সেটাই পৌঁছে দিত কয়েকদিনের মধ্যেই! সে না থাকলে কে আমার মতো মানুষের চাহিদা পূরণ করতো এইভাবে? একসঙ্গে নগদ টাকা দিয়ে কিনবার ক্ষমতা কি আমার মায়ের ছিলো? 

  

        ইদানীং বই-পত্রের খোঁজ পেয়ে যাই দেশ পত্রিকার সাপ্তাহিক সংখার ভেতর বিজ্ঞাপনের পাতা থেকে। সেখান থেকেই জানতে পাই অনেক প্রকাশকের নাম ধাম ঠিকানা বা বই-পত্রের খোঁজ-খবর অনেককিছুই। এক টাকা দিয়ে সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকা নিতেও যেন কত টানাটানির মধ্যে পড়তে হয়! তার সঙ্গে আবার যদি একেকদিন যুগান্তর আনন্দ বাজার বা বর্তমানের আরো দৈনিকগুলি নিতে যাই, তাহলেই আরো গ্যাঁড়াকল দেখা দিলো। ইদানীং আবার শুনছি কলেজস্ট্রিট নামেরই আর একটি পাক্ষিক না মাসিক পত্রিকা বের হবে নাকি!

         কিন্তু তা তো হলো, নির্বিবাদে একের পরে এক বইপত্র তো নিয়ে যাচ্ছি, আমার জন্যে মাসে মাসে এতগুলি টাকা গুনতেও হয় মাকে; তাতে তো সংসার খরচাতেও একটু টান পড়ে? কোনো মাসে গোরুর দুধের উপার্যনের থেকে হয়তো কিছু মায়ের হাতে তুলে দিতে পারি, আবার কোনো মাসে কিছুই হয়তো পারি না‌। তখন মা হয়তো বোঝে কোথা থেকেই বা দেবে; কিন্তু ভাই ছাড়ে না, সে বলে, দাদার জন্যে তো মাসে মাসে এতগুলি টাকা ব্রজদাকে দিতে পারো, আর আমার বেলায় তো অষ্টরম্বা! যাকগে তা-না-হয় ছেড়েই দিলাম, তার বিনিময়ে আমার জন্যে তো কিছু আনতে পারো? 

         মা বলে, তুই দাদার মতো পড়াশোনা কর, তোর জন্যেও আনবো। স্কুলের পড়াতেই তো মন নেই, তার আবার দাদাকে নিয়ে বিচার করতে বসিস! তোর মাস্টার, স্কুল, বই-খাতা-পত্র এই সব নিয়ে—  তারপর এটা চাই, ওটা চাই তো আছেই, কই, তা নিয়ে তো দাদা কিছু বলে না! তাহলে তোর মনে এত হিংসা কেন? কাজের বেলায় তো কিছুই না! 

         সেও ছাড়ে না, বলে, আমি তো ইস্কুলের পড়া পড়ি, ও ওসব কীসের পড়া পড়ে এতো? গাদা গুচ্ছেক বই মাসে মাসে তোমাকে দিয়ে নিয়ে আসে! কী হবে, ওই সব দিয়ে? 

        দেখতে পাই, মা তাতে একটুও আশ্চর্য হয় না। সে তার উত্তরে বলে, ও যাই করুক, তুই-ও ওর মতো দিনরাত পড়াশোনা নিয়ে থাক; তাহলে তুইও যা চাইবি তোকেও তাই এনে দেবো। 


        দিন যত যাচ্ছে ততোই দেখছি এরকম সব নানা রকম নতুন নতুন আগ্রাসী চিন্তাভাবনার থেকে সে ভীষণ ভাবে দিনদিন প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে উঠছে। স্কুল থেকে কোনোরকমে ঘরে ঢুকেই বইপত্রের ব্যাগটাকে বিছানার উপরে ফেলে দিয়েই ছুট লাগায় পাড়ায়। সে বাড়িতে আসতে না আসতেই দেখি একেকজন রাস্তার ওপর থেকে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে। এদের অনেককেই চিনে উঠতে পারি না। কোথায় তাদের বাড়িঘর তাও জানি না। বুঝি, এরা কেউই কাছেপিঠে থাকে না। ওরা যে এই পাড়ার ছেলেপেলে না সেটাও বুঝি। কারণ ওর এই পাড়ার বন্ধুবান্ধবদের আমি ইতিমধ্যেই চিনে ফেলেছি। তারা লেখাপড়া নিয়ে লেগে থাকে। আর এরা যারা, তাদের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় তারা কেউই লেখাপড়া করে না। এদের দেখলেই বোঝা যায়, এদের চেহারায়  শৃংখলার ছাপ নেই কোনো। কেন জানি না, এদেরকে দেখে এবং খানিকটা বুঝেও এদের সম্পর্কে কোনো কথা বলি না কখনো।


        দিন যত যাচ্ছে ততোই দেখতে পাচ্ছি ঘরে ফিরতে তার সন্ধ্যা উতরে যাচ্ছে। তারপর হয়তো হাতে-পায়ে এক হাঁটু কাদার দাগ নিয়েই বিছানায় গড়িয়ে পড়লো। আর উঠলো না। মা বাড়ি ফিরে ডাকাডাকি করার পর, তখন হয়তো উঠলো। সন্ধ্যাবেলায় একেকজন মাস্টাররা এসে তারা হয়তো আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ফিরে চলে গেল। সে নিতাইদা এলেও একই‌ অবস্থা, আমি বাড়িতে না থাকলে কাজের দিদির হাতে চা-টা খেয়ে ফিরে চলে যায় সেও। আবার ডেকেডুকে উঠোতে পারলে তখন হয়তো কিছুক্ষণ পড়তে বসলো তার সঙ্গে। কিন্তু বৃদ্ধ হরির বাবা মেসোমশাই, তিনি আর সেটা পেরে ওঠেন না । সে নানাভাবে দুঃখ প্রকাশ করতে করতেই হয়তো চলে যায়। বলতে থাকেন, শুধুশুধু মাস গেলে পারিশ্রমিক নিতে ভালো লাগে নাকি কারোর! তুমিই বলো না মাসি? অর্থাৎ কাজের দিদিকে উদ্দেশ্য করে এই কথা বলেন তিনি। 

        এই জিনিস যতো দিন যাচ্ছে ততোই ঘটে চলেছে। 

        তাকে নিয়ে সবসময়ই চিন্তিত থাকতে হয়; ওর এই যে স্বাভাবিক জীবনযাপনের প্রতি একধরণের অবহেলা সেটা দেখেই। সবসময়ই একটা উৎকন্ঠা তৈরি হতে থাকে ভেতরে ভেতরে; এই বুঝি বাড়ি ফিরে কাজের দিদির ওপরে-না হম্বিতম্বি করে, এই দেও ওই দেও, এটা করে রাখলে না কেন? এরপর তো আছেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়া। পরের দিন স্কুলের পড়া তৈরি না করা। তার মানে, পরের দিন ইস্কুল কামাই করা। এবং তার পরের দিন খুব ভালো মানুষের মতো অনুরোধ করা সেই আমাকে, এই দাদা, আমাকে একটা দরখাস্ত লিখে দে না বানিয়ে-বুনিয়ে। এই পেটে ব্যথা বা জ্বর-মাথাব্যথা কিছু একটা বলে লিখে দিলেই হবে সেটা। না হলে ক্লাসে বসতে দেবে না-তো স্যারেরা। তাই মাকে দিয়ে সাদা কাগজে সই করিয়ে রেখে দেয় আগেভাগেই, তারপর আমার কাছে বায়না, কিছু একটা বলে-কয়ে-বানিয়ে লিখে দিতেই হবে সেই অনুপস্থিতি সংক্রান্ত দরখাস্তটি।

         অনেক রকম ভাবে বোঝাতে চেষ্টা করি তখন। এটা তুই ঠিক করছিস না কিন্তু। প্রায়শই এই যে একটা মিথ্যা তোকে বলতে হচ্ছে, এটা কি ঠিক? আর এটা তো প্রতি সপ্তাহেই তুই লিখে নিয়ে জমা দিচ্ছিস স্কুলে; এটা কি ঠিক হচ্ছে, তুইই বল না? মাস্টার মশাইরা কি নির্বোধ? সবই বোঝেন তাঁরা, এটা জানবি কিন্তু! পরীক্ষার খাতায় কিন্তু এর প্রভাবটা বুঝতে পারবি। এর আগে তুই তো এমন ছিলি না? আর এইসব ছেলেপেলেরা কারা? কাদের সঙ্গে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াস তাই বল তো? আচ্ছা, তুই কি আলমারির কৌটো থেকে টাকাপয়সা নিয়ে নিস?  সত্যি কথা বলবি কিন্তু?

 

        এসব শুনে সে একেবারেই অস্বীকার করে বলে, আলমারির চাবি তো তোর হাতেই মা দিয়ে যায়; আমার হাতে তো দেয় না! তাহলে আমি কীভাবে ওখান থেকে টাকাপয়সা বের করে নেবো? কৌটোর কোনো খোঁজখবরই-তো আমি রাখি না! ভালো করে খোঁজখবর করে দেখ, কাউকে বিশ্বাস করবি না কিন্তু।


        এইসব নিয়ে দিদির বাড়িতে মার সামনে যতোই আলোচনা করতে যাই, মা সে কথায় কোনো গুরুত্ব দিতে চায় না। যতোই বলি কদিন তুমি একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে লক্ষ্য করে দেখো ও কাদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে। কাদের এত টানাটানি ওকে নিয়ে? সেটা খেয়াল করে দেখো অন্তত; পরে হাতের বাইরে চলে না যায় সমস্তটা। 

        মা সেসব খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে কিছুতেই ভাবতে চায় না। চেঁচামেচি হইহল্লা করে একটুখানি, তারপর হয়তো বোঝাতে চেষ্টা করে দুই একবার একটু খানি,‌ কিন্তু তার বেশি কিছুই না। তাতে সেও হয়তো দুই একদিন ঠিক সময় মতো বাড়িতে ফিরেও আসে সকাল সকাল, তারপর আবার সেই যে কে সেই অবস্থা। একইরকম ছন্দে ফিরে যায়। দশটা এগারোটা বাজিয়ে না হলে বাড়িতে‌ ঢোকা আর হয় না। কোনো কোনোদিন এগারোটারও ওপারে চলে যায় ঘড়ির কাঁটা। আর সেইসব সময়গুলিতে কাজের দিদিও চিন্তায় পড়ে; কেবলই বলতে থাকে, ও দাদা, রাস্তায় একটু এগিয়ে যেয়ে একবার দেখো-না-কেন, মার আসতে এত দেরি হচ্ছে কেনো? 

         হাঁটতে হাঁটতে রাইফেল ক্লাব ছাড়িয়ে রাস্তায় যেয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, তার ফেরার পথের দিকে চেয়ে। বেশ কিছু সময় পরে হয়তো দেখতে পাই হনহন করে হেঁটে আসছে ঐ তো…

        এরকম কত রাত্তির-যে কি রকম দুশ্চিন্তাতে কাটে আমাদের, তার ঠিক নেই। কাজের দিদিও ক্রমাগত তখন তাড়া দেওয়ার তালেই থাকে। নিরুপায় হয়ে হয়তো ঠান্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো যেয়ে, রাস্তায়। অন্যান্য ঋতুগুলিতেও-তো নানা প্রতিবন্ধকতা থাকে! কাজের দিদির নানা উৎকন্ঠা জনিত চিন্তাভাবনায় আমাকেও ব্যতিব্যস্ত হতেই হয়, এক সময় না এক সময়। মা যেমন তার এই ধারাবাহিকতা থেকে বেরোতে পারে না, তেমনই ভাইও দিনদিন একই নিয়মে সন্ধ্যা উতরিয়ে ঘরে ফিরে বিছানায় এসে এলিয়ে পড়ে। এরপর মা বাড়ি ফিরলে শুরু হয় তাকে ঘুম থেকে তোলার জন্যে ডাকাডাকি…

 

         দিন যত যাচ্ছে ততই দেকছি এইসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা বাড়ছে। এই তো, এই কিছুদিন আগেও আমি আমার ভাবনাচিন্তার ভেতরেই মগ্ন থাকতে পারতাম বেশ! আর এখন, কিছুই আর করে উঠতে পারি না। কেবলই তাকে নিয়ে ভেতরে ভেতরে একটা উৎকন্ঠা! মানসিকভাবে ভীষণ পাছড়ে ফেলছে যেন। কেবল একটি কথাই ভাবছি, ও তো মূল ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো! ওর এই লাগামছাড়া ভাব, হিংসা আশ্রিত মনোভাব, কথায় কথায় টাকাপয়সার প্রয়োজন হয়ে পড়া। সে সেই কুড়ি পয়সার আবদার থেকে এখন একটাকা দুই টাকায় পৌঁছেছে। প্রায় দিনই মার অফিস যাবার সময় এইসব নিয়ে মার আঁচল ধরে টানাটানি করে। টাকা না পেলে চিৎকার চেঁচামেচি। এইসব নিয়ে প্রায় দিনই তার অফিস কামাই হয়ে যায়। তারপর হয়তো খানিকক্ষণ তাই নিয়ে হাহুতাশ চললো! এরপরে দেখা যায় মা হয়তো অফিস না যেয়ে দিদির বাড়ির দিকে রওনা দিলো। সারাদিন সেখানেই কাটালো‌। পরে আমার একটি কথাই মনে হয়েছে, এইসব ক্ষেত্রে মা অধৈর্য্য না হয়ে যদি তারপরও ওকে বোঝানোর জন্যে সেই দিনটি অন্তত ওকে দিতে চেষ্টা করতো, তাহলে হয়তো বা ফলাফল কিছুটা ভালো হলেও হতে পারত। সেও যেন তখনকার মতো ছেলের সঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচি বা হাহুতাশ করেই হাল ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো মেয়ের বাড়িতে। এই বিষয়টি নিয়ে মাও হয়তো ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না আগামী দিনগুলির কথাটা কিছুতেই। কিম্বা হয়তো পারছে, কিন্তু বিরক্তি তাকেও হতাশ করে তুলছে। এই জন্যেই এখানে ওখানে সময় কাটিয়ে এসব ভুলে থাকতে চাইছে সেও। আর এমনও হতে পারে, নিজের সঙ্গে নিজে অনেকটা লড়াই করে করে এখন অনেকটাই ক্লান্ত সে। তাই হয়তো  ভবিতব্যের কাছে এইভাবে সবকিছু সমর্পণ করে সেও নির্লিপ্ত হয়ে থাকতে চাইছে এভাবেই। 

        এসব দেখে দেখে হতাশ হয়ে পড়ছি আমিও। মাকে একদিন সবটা বুঝিয়ে বলবার চেষ্টাও করি। সে তাতে বলে, আমি অনেক লড়াই করেছি‌ রে বাবা, এবার তুই দেখ— আমি হেরে গেছি, এই সংসার সংসার করে নিজের কথা কখনো ভাবিনি। রাস্তার কলের জল খেয়ে দিনের পর দিন কেটেছে আমার। পেটে একটি দানাও দিতে পারিনি। এই কথাটা কে বুঝলো বল তো? অনেক করেছি, আর পারছি না। ক্লান্ত হয়ে গেছি। তাই যেখানে একটুখানি শান্তি পাই সেখানেই যেয়ে বসে থাকি। কী করবো আর বল? কেউ বুঝলো না। তোদের ঠাকুমা এক কাপড়ে বের করে দিলো ভাড়াবাড়িতে। তোর বাবার মৃত্যুর পরেই। ভাগ্যিস মায়ের কেনা এই জায়গাটুকু ছিলো, তাই  মাথা গোঁজার একটুখানি আশ্রয় তৈরি করতে পেরেছি। তা না হলে খাসমহালে রুদ্র বাড়ির সেই দড়মার ঘরেই হয়তো ঝড় জলে‌ আর বানের জলে ভাসতে হতো। কে বুঝতে চেষ্টা করলো বল সেইসব কষ্টের দিনগুলির কথা? 


         মার মুখে এইসব শুনে হয়তো অনেক কিছুই বলার ছিল, বলতেও পারতাম, কিন্তু না, বলিনি। সত্যিই তো, তার জীবনের সেইসব সত্যের কাছে মাথা নত হয়ে আসে সবসময়ই। কিন্তু সবটার জন্যই কি ঠাকুমা ও দাদু একা দায়ী? নাকি তারও প্রচন্ড স্বাধীনচেতা মনোভাব এক্ষেত্রে খানিকটা দায়ী? সে যাই হোক, ছাব্বিশ বছরে বিধবা হয়েছে সে। চাকরির জন্যে দুয়ারে দুয়ারে পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছে। দিনে জলছবির কারখানায় কাজ, রাতে নার্সিং। এই করে সমস্ত দিন পথে পথেই কাটিয়ে দিয়েছে। তাই আজ সে ক্লান্ত হবে না তো কী হবে? আজ যদি দাদু ঠাকুমা আমাদেরকে কাছছাড়া না করতো তাহলে অন্তত আমাদের জীবনও এমনভাবে অন্য খাতে বইতে পারতো নাকি? তাই মায়ের এইসব কথায় হাঁ করে তাকিয়ে শোনা ছাড়া সত্যিই কি কোনো উত্তর আছে আমার কাছেও? নিজেও কি সেই জায়গায় অপরাধি নই একটুও? সংসারের মূল ধারায় আমিও কি নিজেকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছি একটিবারও? 

যে পথে অনিশ্চয়তা, সে পথেই তো আমিও ভেসে চলেছি। আমারও তো তার পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল। কই, আমিও কি পারছি সেভাবে? নাকি সেইভাবে পারার কোনো সম্ভাবনা দেখাতে পেরেছি কখনও? যেটুকু নিয়ে সে অন্তত একটুখানি নিশ্চিন্ত হতে পারে?


       ইতিমধ্যে আরও দুটি পোষ্যকে এনে হাজির করেছে ভাই। তাদের মধ্যে একটি হলো সাদা ইঁদুর, আর একটি হলো মিশ্র জাতের কুকুর। তাদের অবস্থান হয়েছে ইলেকট্রিক মিটার ঘরের মধ্যে। এবার তাদের দেখভাল করো তোমরা। তবে সাদা ইঁদুরগুলি কদিন যেতে না যেতে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল সেটা বোঝা গেলো না কিছুই। কুকুরটি থাকলো। সাদা ইঁদুরগুলি যেতে না যেতে সেখানে এসে হাজির হলো আর একটি খরগোশ ছানা। তাকে সম্ভবত আনা হয়েছিলো গড়িয়ার হাট থেকে। তার জন্যে বাজার থেকে কফির পাতা সংগ্রহ করে আনা হতো। এবার সে আমার সামনের ফুলের বাগানের ভেতর চরে বেড়াতে লাগলো। কখনো কখনো সন্ধ্যাবেলা হলে কোথায় যে গাছগাছালির ফাঁকে লুকিয়ে পড়ে! আবার কখন নিজের ইচ্ছাতেই বেরিয়ে আসে‌, তার কিছুই বোঝা যায় না। সে এক অদ্ভুত খেলা তার। এই পর্বও চললো বেশ কিছুদিন। আমরা বাড়ির সকলেই বেশ একটা মায়ায় জড়িয়ে পড়লাম। তাকে দেখলে মনে হতো আরেক ঘটনা— সেটাও সেই ওই দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর যখন আমরা ওদেশে ফিরে গেছিলাম, তার কিছুদিন পরেই হয়তো হবে, ওদেশেই পাশের বাড়ির পুরোনো দালানের চোরাকুটুরির মধ্যে যে বেজির বাসা ছিলো‌ দেখতে পেতাম, তার ভেতর থেকেই কিভাবে যেন একদিন  টিপটিপে বৃষ্টির ভেতর একটি বেজির বাচ্চা কিভাবে যেন দলছুট হয়ে উঠোনের উপর একাকি ঘোরাঘুরি করছিলো দেখতে পেলাম। তাই দেখে আমিও কিছু না ভেবে, তাকে খপ করে চেপে ধরে বেশ কিছুদিনের ভেতরেই তাকে বেশ পোষ মানিয়ে নিয়ে তার সঙ্গে অদ্ভুত এক খেলায় মেতে উঠেছিলাম যেন খানিকটা নিভৃতে। কখনো কখনো তীর ধনুক বানিয়ে তাই নিয়েই তার সঙ্গে অদ্ভুত কতো খেলায় মেতে উঠতাম যে, তার আর কি বলবো! সে যেন এক তীরধনুকের জগতের ভেতর ফিরে যাওয়া! তারই  এক ধরণের খেলা চলতো যেন তার সঙ্গে আমার। একেক সময় তাকেই তাক করে পাটকাঠির তীর ছুঁড়ে দিতাম তার দিকে! সে যেয়ে দিদিমার ব্যবসার জন্যে যে লাল চিনির বস্তা থাকতো সারি সারি, তার পাশে দুই একখানা মিল্ক পাওডারের বস্তাও দাঁড় করানো থাকতো, সেই বস্তার পেছনে যেয়েই লুকিয়ে পড়তো। কখনো কখনো মিল্ক পাউডার মেখে একেবারে হয়তো ভূত হয়ে বেরিয়ে আসতো সামনে। তাকে দেখে তখন কী মজাই না হতো! সে সবের গল্প আর কীই বা বলি? 

        সেই বেজির বাচ্চাটি যখন আরও একটু বড় হলো, তখনো তার এই লুকোচুরি করার অভ্যাসটা গেল না। দিদিমার ঘরে খাটের উপর যে ডাই করা পাটের গাঁটগুলি পাহাড়প্রমাণ উঁচু হয়ে পড়ে থাকতো, সে সেখানেও সেই পাটের গাঁটের উপর চড়ে বসতো। কিম্বা হয়তো আবারও খানিক গুঁড়ো দুধ মেখে সামনে এসে দাঁড়িয়ে যেত চুপচাপ বাবুটি হয়ে। বকাবকি করলে বুঝতে পারতো। তখন ক্ষেপেও যেত। ক্ষেপে গিয়ে ক্যাঁচর ম্যাচর করতো। ডাকতো কখনো ক্রে.. ক্রে.. ক্রে… ক্রে… করে। একেবারে অতিষ্ট করে তুলতো ডেকে ডেকে । ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিতাম তখন। এবং চুপ করে যেত তখনই। কীভাবে যেন বুঝতো সেই ধমক। অভিমান দেখাতো নানা ধরণের হাবভাব দেখিয়ে। বোঝাতো যেন, তোমার রাগই আমি দেখবো শুধু? আমার রাগ দেখবে না কেন একটুও? আমাকেই শুনতে হবে শুধু তোমার রাগ? বলতো যেন, আমি বেজির বাচ্চা না হয়ে মানুষের বাচ্চা যদি হতাম? তাহলে তো কেঁদে কেঁদেই একসার করতাম! তখন কী করতে বাছাধন?


        এরকম কতো যে কথোপকথন চলতো তার সঙ্গে! তারপর একদিন কোথায় যে বেপাত্তা হয়ে গেলো সে! কোথাও খুঁজে পেলাম না আর! ভীষণ মনমরা হয়ে থাকলাম বেশ কিছুদিন। কদিন খাওয়াদাওয়াও বন্ধ হবার দশা হলো। সব সময় মনে পড়তো তার কথাই শুধু। বহু খোঁজাখুঁজি করে একসময় খোঁজাখুঁজি বন্ধ করে দিলাম। মনে মনে ভাবলাম হয়তো ও ওর জাত ভাইদের সঙ্গেই কোথাও চলে গেছে। যদিও সেটাও তো হবার নয়! ওরা একবার দলছুট হয়ে মানুষের সঙ্গে থাকলে আর গ্রহণ করে না তাকে তাদের মধ্যে কোনোভাবেই। তারপরও এ বাগান ও বাগান কত চেয়ে চেয়ে দেখা! সেই যে সে— কখনো কখনো বাগানে চলে যেতো। আবার একসময় ফিরে আসতো নিজে নিজেই। তাই ওর সেই বাগানের থেকে ফিরে আসবার নির্দিষ্ট পথের দিকগুলির দিকে চেয়ে থাকতাম, যদি কখনো হুস করে বেরিয়ে আসে! কিন্তু না। আর কোথাও তার কোনো খোঁজ পাওয়া গেলো না। শেষে বেশ কিছুদিন পরে পাটের ব্যাপারিরা পাট কিনতে এলে, তারা যখন এক এক করে পাটের গাঁট বাইরে বের করে আনছে উঠানের ওপর হন্দরের মাপ দিতে, পাল্লায় তুলছে একে একে, তখন তারাই পাটের গাঁটের ভেতর থেকে তার শুটকে যাওয়া শরীরটা বের করে আনলো পাটের গাঁটের খাঁজের ভেতর থেকে। একেবারে শুটকে চেপ্টা হয়ে পড়েছিলো সেখানে। তারাই তাকে বের করে আনলো বাইরে। মনে মনে ভাবলাম, ঘরের ভেতরে এভাবে মরে পড়ে থাকলো অথচ তার দেহে পচন ধরলো না একটুও কেন! আমরা কেউ কখনো কোনো গন্ধ পেলাম না তো এতদিনেও? সেটা কী করে সম্ভব!

         শেষপর্যন্ত তার সৎকার কার্য ঘাটের বাগানের একটি কোণেই সবকিছু একেবারে মানবিক নিয়ম মেনেই সারা হলো। এবং সেই থেকে একেবারে নিজের কাছে নিজে শপথ নিলাম এই বলে, আর কোনোদিন কোনো জীবজন্তুকে পোষ মানাবার চেষ্টা করতে যাবো না। 

          এতদিন পরে আবারও কি সেই মোহজালে পড়ে ছটফট করতে যাবো নাকি? এই খরগোশ ও কুকুরটির সঙ্গে কেন জানি আবারও জড়িয়ে যাচ্ছিলাম যেন। এবং সেই জন্যেই হয়তো মনে পড়লো, কোন্ সে দূর অতীতের কথা— সে যেন আজও বলে চলেছে, এত দুর্বল মনের মানুষ তুমি? এতো প্রেম তোমার জীবনের জন্যে? খবরদার আর কখনো মুগ্ধ হতে যেয়ো না কিছুতেই।


         এইভাবে এখন এখানেও এই এক পর্ব শুরু হয়েছে। আর কোনো দিকে এখন বিশেষ মন নেই। মাঝে একটি চন্দনা পাখির বাচ্চাও এনে হাজির করেছিল সে। কিন্তু সে যাত্রায় তাকে অন্য কাউকে দিয়ে দেবার একটা ব্যবস্থা করতে তাকে বাধ্য করা হলো অনেক চিৎকার চেঁচামেচি করে। কাজের দিদি কিম্বা বিষনি ভাই দুজনের সকলেরই ইদানীং এইসব বাড়তি ঝামেলাতে সায় নেই। তাই তারাও সোরগোল তুললো। বিশেষ করে কাজের দিদি তো ঘোর বিরোধীতা করলো। কারণ ভাইয়ের সঙ্গে তার বনিবনা নেই একটুও। কাজের দিদির নাকি আমার প্রতি বেশি পক্ষপাতিত্ব দোষ আছে। সে তাকে সহোযোগিতা করে না একটুও। এবং এই জন্যেই নাকি সে তার নানা দোষ খুঁজে বের করে সবসময়।

   

         বিষয়টা নিয়ে একটুখানি লক্ষ করলেই বোঝা যায় যদিও, কাজের দিদি একজন পরের ঘরের মানুষ, সে হয়তো পেটের দায়ে কিম্বা আশ্রয়হীনতার কারণে, যে জন্যেই হোক, মানুষের বাড়িতে কাজের জন্যে এসেছে, আজ বেশ কয়েক বছর তো সে এই সংসারেই রয়েছে। এই সংসারের প্রতি তার একটা একাত্মতাও তৈরি হয়েছে। এই সংসারের মানুষজনের সবকিছুর প্রতিই। এবং সেটাই স্বাভাবিক। সেই জন্যেই হয়তো তার নিজের অবস্থানের কথাটা  ভুলে যায় সে কখনো কখনো। কিন্তু তাকে যদি কথায় কথায় সেই কথাটাই স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, এই বাড়িতে তার জায়গাটা ঠিক কোনখানে, তাহলে তো তার কষ্ট হবেই। সে তো সবটা বুঝতে পেরেই এইসব নানা অহেতুক কাজকর্মে বাধা দেয়। সে বুঝতে পারছে,  কীভাবে একটি ছেলে নানারকম ভাবে ভেসে যাচ্ছে। টাকা পয়সা সরিয়ে ফেলছে, তার দায়ও খানিকটা তো তার ওপরেও পড়তে পারতো! এরপর আরও নানা অনিয়ম তো আছেই। অসময়ে বাড়িতে ফিরেই খাওয়াদাওয়া রান্নাবান্না নিয়েও হুজ্জতি করা, স্নানের জল তুলে রাখার পরেও তাতে নানা রকমের ত্রুটির কথা বলে তার ওপরে নানা চিৎকার চেঁচামেচি, গালিগালাজ করা তো প্রতিদিনের ঘটনা। সেসব ভুলে  সবটা করে দিয়েও নানা দোষে দোষী হয় সে। কিন্তু তারও তো একটা বয়স হয়েছে। তারও তো একটা অভিজ্ঞতা আছে। সেও তো বুঝতে পারছে দিনের পর দিন তার এই অধঃপতনের কারণগুলো। তাই হয়তো চুপ করে থাকতে পারে না কখনো। সেই কারণে শত্রু হয়ে যায় সে। ভালোমানুষ থাকতে পারে না। পক্ষপাতিত্ব দোষে দোষী হয়ে যায়!


         এই যে নানা জীবজন্তু যোগাড় করে আনছে অথচ তাদের দেখাশোনার বেলায় অন্যদেরকেই সেটা করতে হচ্ছে। কুকুরের জন্যে মাংসের ছাঁট জ্বাল দিতে হচ্ছে, কয়লার উনুনে‌‌ কাটকুটো জ্বেলে শেষ আঁচে সেটাকে বসিয়ে দিতে হচ্ছে সেই কাজের দিদিকেই, তা না হলে আমাকে। এর পর থাকে কুকুরটিকে স্নান করানো, পায়খানা পেচ্ছাপ করাতে বাইরে নিয়ে যাওয়া, সময় মতো না নিয়ে গেলে সে হয়তো বারান্দার ওপরেই করে ফেলবে; তখন তার সেই মলমূত্র ধোয়াধুয়ি করা সেও তো তাকেই করতে হয়। কে করবে আর? এই নিয়ে সময়ে অসময়ে কাজের দিদির ধৈর্যচূতি হলে তখন হয়তো তার মুখ দিয়ে বেফাঁস কিছু কথা বের হয়ে গেল, তখন ভাই-এর মনে ভৃত্য মালিকের অবস্থান নিয়ে বাকবিতন্ডা শুরু হয়ে যায়। দিশাহীন হয়ে পড়ি সে সময় আমি। চেষ্টা করি সেইসব নিজের হাতে পরিষ্কার করতে। আপাতভাবে অন্তত সেই পরিস্থিতিটা যাতে সামলে যায়।

        সে তো গেল। ইতিমধ্যে আর একটি আশ্চর্য ধরণের এক ফাঁদ তৈরি করে ফেলেছে সে। তাই দিয়ে সামনের বাড়ির মাসিমাদের ছাদের ওপরে যে ছায়া পড়ে বাড়ির পাশের ঝাউজঙ্গলের, সেইখানে সে ফাঁদ পাতে টিয়া পাখি ধরবার জন্যে। ঝাউগাছের ওপরে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া পাখির ওড়াউড়ি। কীভাবে যেন তাদের ভেতর থেকে কেউ কেউ তার ঐ পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেই আটকে যায়। দড়ি দিয়ে বানানো সেই ফাঁদ পেতে দিয়ে সে মাসিমাদের ছাদের সিঁড়ি ঘরে চুপ করে বসে থেকে লক্ষ্য রাখে কখন টিয়াপাখিগুলি তার পাতা ফাঁদে পা দেয়। ধরা পড়লে এবার তাদের সে খাঁচায় পোরে। পাড়াতেও চাউর হয়ে গেছে তার এই বিশেষ কীর্তির কথা। এবার সে সেই টিয়াপাখিগুলি একে একে কুড়ি, পঁচিশ, পঞ্চাশ, একশো যা পায় তাতেই বেঁচে দেয়। 

         বিষয়টি প্রথম দিন দেখেই তাকে এই কাজ থেকে বিরত হতে বললেও সে কোনো গুরুত্বই দিতে চায় না। এবং বলে, থাম তো তোর যত যুধিষ্ঠিরপণা। মানুষজন তো ওদের খাইয়ে পরিয়ে আগলে রাখবে বলে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি? না হলে ওরা গাছে গাছে ঘুরে কীই বা এমন কিছু পায় তাই বল তো? তার চাইতে আমি তো ওদের একটা নতুন জীবন দিচ্ছি! খাবে আর কথা বলা শিখবে। এই তো কাজ? তা তোর ভালো লাগছে না কেন তাতে? যা তো, এইসব ধর্মজ্ঞান দিস না আমায়। আমি অনেক পুণ্যের কাজ করছি জেনে রাখিস। 

         বললাম, বুড়ো পাখি কি আর কথা বলবে! ছোটো বাচ্চা হলে হয়তো মানুষজনের কাছে থাকতে থাকতে মানুষের কিছু বুলি আউড়ালেও আউড়াতে পারে। 

       সে তাতে বলে, না না, বলবে। যাক গে, ওইসব নিয়ে তোর ভাবার দরকার নেই এতো! 

       তারপরও তাকে দু’ এক কথা বলে বোঝাতে চাইলাম, যদি বোঝে। বললাম, দেখিস একদিন ওরা আর তোর এই ফাঁদে ধরা দেবে না; যখন ওরা বুঝে যাবে বিষয়টা। মানুষজনও তেমনই— যখন দেখবে, পাখি আর কথা বলছে না, তখন তারাও আর নেবে না।

        তবুও বেশ কিছুদিন চললো। যতদিন পাখিগুলির বুঝতে সময় লাগলো। একদিন সত্যি সত্যিই আর একটি পাখিও সেই ফাঁদে পা দিতে নেমে এলো না সেই ফাঁকা ছাদের ওপর। তখন সে ক্লান্ত হয়ে নেমে এলো মাসিমাদের ছাদের ওপর থেকে একদিন দেখতে পেলাম। আমার দিকে চেয়ে ঠোঁট উল্টিয়ে বললো, না রে, তোর কথাই ঠিক হলো, ব্যাটারা টের পেয়ে গেছে, বুঝলি! বহুত চালাক হয়ে গেছে! আর হবে না রে। বাদ দিতেই হলো শেষ পর্যন্ত।

        কী আর বলবো! কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর চোখটা নামিয়ে নিয়ে বই-এর পাতার দিকে মন দিতে চেষ্টা করলাম। 

        বেশ কিছুদিন তার এইসব ক্রিয়া কর্মের দিকে আর নজর দিই না সেভাবে। যদিও তার এইসব কাজে প্রশ্রয় দেবার মত মানুষজনেরও অভাব নেই। পাড়ার অনেকেই আছে সেই দলে। এই পক্ষপাতিত্ব একটি ছেলের জীবনটা যে কত দূর নিয়ে যেতে পারে তাই নিয়ে তাদের তো আর ভাবনার কিছু নেই!


        নানাভাবে আমিও যেন কীভাবে কীভাবে সংসার থেকে নিজেকে এবারে একটুখানি আলাদা করে ফেলছি দিনদিন। সংসারের আর পাঁচ রকমের সমস্যা থেকে কেমনভাবে যেন নিজের কর্তব্য কর্মটুকু ছাড়া অন্য সব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি। বুঝিয়ে দিতে চাইছি যেন এইটুকু আমার, এর বাইরে যা কিছু সব তোমাদের। আমার ভাবনা বাড়াবার নেই আর এতকিছু নিয়ে।


         প্রতিদিন তাকে নিয়ে এইসব দেখতে থাকা, এটা যত দিন যাচ্ছে ততই বেড়ে চলেছে। প্রাইভেট মাস্টাররা এসে প্রতিদিন একজন না একজন ঘুরে চলে যান। তাঁরা ফিরে যাবার সময় নানাভাবে দুঃখ প্রকাশ করতে করতে চলে যান। মা যেন এসব জেনেশুনেও তাকে কঠিন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে যেটুকু শক্ত হওয়া প্রয়োজন, সেটা হতে পারছে না। সে মনে করছে আজ যা হলো তা হলো, আগামীকাল হয়তো আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু তা তো হয়ই না, বরং দিন যত যায় আরো জটিল থেকে জটিলতর হয় বিষয়টি। একদিকে কাজের দিদির বিরক্তি, মা বাড়ি ফিরলে প্রতিদিন একটা না একটা নালিশ, এই হয়েছে, ওই হয়েছে, এইসব। 

         সেসব শুনে মাকেও তার কোনো প্রতিকারের উপায় বের করতে দেখি না। দেখি না সেরকম কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে। সেখানে তার অপত্য স্নেহের কাছে সবটাই বিবশ হয়ে পড়ে। 

         সমস্ত পরিস্থিতিটা নিয়ে দিদির বাড়িতে আলোচনা হয় সকলে মিলে। কিন্তু সমাধানের পথ আবিষ্কার করা যায় না। বরং তাকে কিছু হাত খরচের বরাদ্দ করিয়ে দেওয়া হয়। সেই আবদার নিয়েই ক’দিন অশান্তি চলছিলো‌ যখন। এছাড়া স্কুলের নাম করে টাকা পয়সা তো একরকম প্রায়শই‌ নেয় সে। কিন্তু তাতেও হচ্ছে না ইদানিং। মূলত তার একটিই দাবি, আমাকে মাসে মাসে কিছু হাত খরচা দিতে হবে। কিন্তু কেন, কেন এই প্রয়োজন এত তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে উঠলো তার! সে কথা কিন্তু কেউ জিজ্ঞাসা করছে না তাকে। যদিও তার উত্তরও হয়তো তৈরিই থাকতো তার কাছে। কারণ দিন যত যাচ্ছে ততোই এই জিনিসটি অন্তত পরিষ্কার হয়ে উঠছে আমার কাছে, কারণ ও যা কিছু আবদার করছে, এবং সেটা না মানলে তাই নিয়ে যেরকম চিৎকার চেঁচামেচি করছে, সেগুলি করার কৌশল বা পদ্ধতির ভাষা বা বলার ধরণ ধারণ দেখে মনে হয় না সেগুলি সবটা ওর নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত।


         পরিস্থিতির অভিমুখ যেভাবে প্রতিদিন বিভ্রান্ত করে তুলছে, তাতে ভীষণ ভাবে মনে পড়ছে, যেবারে সেই ওদেশ থেকে এ দেশে চলে আসার জন্যে কমলেশ চক্রবর্তীর সঙ্গে চেষ্টা করে আবার ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম, সেই সময় দিদিমার আমাকে নিয়ে বিশেষ একটি উপলব্ধির কথাগুলি। সেগুলি ছিল এরকমই— ওকে বোঝাও ঠাকুরদা, ও ওই দেশে ফিরে যেয়ে আর পারবে না। ও আর ওখানের মতো কিছুই নেই! ও যে এই দেশের জল হাওয়ায় গড়ে উঠেছে… সে কথা ও ভুলে যায় কেন যে, সেটাই ভাবি! আমার এই কথাটা মিলিয়ে নিও একদিন, ওরও মনে পড়বে আমার এই কথাগুলি। একদিন ওকেও বুঝতি বাধ্য হতিই হবে, ওর এই সিদ্ধান্ত কতটা ভুল ছিল। সেদিন কিন্তু সে সব  বুঝতি পেরেও কোনো লাভ হবে নানে জেনো। কারণ সেদিন আর ফিরে আসতি পারার কোনো পথ থাকবেনানে ওর কাছে‌। তার চেয়ে এখনো ভালো চায় তো ওরে বুঝতি কও, আমার কথাডা। ওরে আমি ও দেশে যাতি দিতি চাচ্ছি নে, তা না। কিন্তু ওর এই একেবারের জন্যে ফিরে যাওয়াটা মাইনে নিতি পারতিছি নে আমি কিছুতিই। ঠিক আছে ও যাক না, পাসপোর্ট ভিসা করে। বেড়ায়ে আসুক গে, কিডা মানা করতিসে তারে? কিন্তু ওখানে থাকে যাবার চিন্তা যেন না করতি কও তাকে। তারপরেও যদি ও যাতি চায়, তাহলি কবো, একদিন এই অধমের কথাটা মনে পড়বে। সমস্ত জীবন ধরে মনে পড়বে— আমি নিষেধ করিছিলাম যে ওদেশে একেবারে চলে যাতি তারে ।

 

        সত্যি সত্যিই সে কথাগুলি আজ বড় মনে পড়ছে। তখন গুমরে থাকছি। কোনোভাবেই কোনো একটি দিককে খুঁজে পাই না। বারবার ভাবছি, কীভাবে, এই অবস্থা থেকে সবকিছুকে রক্ষা করা যায়? পরমুহূর্তেই ভাবি, এত ভার আমি নিচ্ছিই বা কেন! একে তো নিজের জীবনের এই দুর্গমতা। সেই নিয়েই দিশাহীন হয়ে থাকি মাঝে মাঝেই। যদিও কিছুক্ষণ পরেই ওসব ভুলে যাই সবকিছুই। ভুল হয়তো সঙ্গ দেয় বলেই তালবেতাল হই না! তা না হলে কি যে হতো, সেও কি জানি! ভেতরে ভেতরে এত তড়িৎ গতি চলে যে; সেকি সামলাতে পারতাম? সে তো সামলায় ওই ভুলই!




*************************************************************************

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন