রবিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২২

প্রবন্ধ * স্বপন নাথ



বৈতরণীর  সাতকাহন 

স্বপন নাথ 


ব্যবহারিক জীবনে আমরা প্রায়শই  এমন কিছু শব্দ বা শব্দ গুচ্ছের সঙ্গে পরিচিত হই , যার  অর্থ ব্যঞ্জনা  আদিতে যা ছিল বর্তমানে তা নেই। হয়তো তা ব্যাপ্তির বিড়ম্বনায় ডানা ছেঁটে বনসাই । কিংবা বিস্তারে বিবৃত আকাশ । নয়তো নিম্ন  গতি নদীর স্রোতহারা আবেদন  অশ্বক্ষুরের বিপ্রতীপে বহমান নোনা লাগা দ্বীপ।

              শব্দার্থ পরিবর্তনের  এই ধারা অর্থ সংকোচন , অর্থ বিস্তার , অর্থের  উৎকর্ষ , অর্থের  অপকর্ষ  প্রভৃতি  রীতিকে অবলম্বন করে চলে। এই রীতির পরাকাষ্ঠায় শব্দ কখনো কখনো আদি অর্থের ব্যাঞ্জনাকে নিছক পুঁথিগন্ধময় ধর্মীয় বাতাবরণে বেঁধে দেয় । আবার কখনো বা মোটা দাগের কোনো ভাবনাকে  ইঙ্গিতায়িত করে । 

            আমরা তার অন্তর্গত আলো খোঁজার চেষ্টা করি না । আর তা না করেই আমরা আমাদের অজ্ঞতার বিমূঢ় বাটখারা চাপিয়ে অতীত  ঐতিহ্যের মহ্ত্ত্ব  বা মানস বিকাশকে খাটো করি। অলৌকিক ঈশ্বর তত্ত্বের  উপর স্ট্যাম্প সিল দিই।

            তেমনি  একটি শব্দ "বৈতরণী "। শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে পুরাণ প্রসঙ্গ  এসে পড়ে।এসে পড়ে স্বর্গ নরক প্রভৃতি কাল্পনিক ছবি।

             কিন্তু আমি বলতে চাই শব্দটি নিছক কোনো ঈশ্বর লোককে ইঙ্গিতায়িত করে না। বরং শব্দটি সেই যুগের মানস চৈতন্যের  ঊর্ধতন বিকাশ সামর্থ্যকেই প্রকাশ কেরছে । অর্থাৎ শব্দটির মাধ্যমে তথাকথিত  ঈশ্বর বলে কোনো বস্তগত স্থানের কথা বলা হয়নি । বা অলৌকিকতাকে প্রকাশ করেনি।

           সংস্কৃত "বৈতরণী "র ব্যুৎপত্তি গত অর্থ বিন্যাস =  বিতরণ+ অ+ই/ঈ ।পুরাণ মতে যমদ্বারের নিকটস্ত নদী । ইংরেজি  অভিধানে বলা হচ্ছে "The River of Hades ( হেইডীজ)" ।  Hades থেকে এসেছে  Hades শব্দটি , যার ইংরাজি প্রতিশব্দ Hell . বাংলায় নরক । মতান্তরে "The abode of the dead " বা মৃতের আলয়। এবং The under world বা পাতালও বলা হচ্ছে ।


             এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে প্রতিটি শব্দ বা প্রতিশব্দের  সঙ্গে  যুক্ত রয়েছে অবক্ষয় , অবনতি  ও নিম্নরুচির সীমা লঙ্ঘনের  এক যন্ত্রণাময় পরিণতির ছবি। তা শারীরিক , মানসিক , সামাজিক ও রাষ্ট্রীক্ সর্বত্রগামী । যা ক্ষিতি, অপ,  তেজ, মরুৎ,  ব্যোম --- এই পঞ্চধারার ভিতরে ভিতরে "তুঁষের  অঙ্কুর সম ক্ষুদ্র কিন্তু তীক্ষ্মতম ।" 

             সেই অস্বস্তিকর পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির বোধই  মনে হয় "বৈতরণী পার " পদবাচ্যটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত ।

             অন্য মতে " বৈকুণ্ঠে গমন কারী নৌকো" ব্যাস বাক্যটিও সাজুয্য দেয় বৈতরণীকে । 

             সুতরাং বৈতরণীর সঙ্গে পারাপারের সম্পর্ক চলে এলো । কাজেই এপার ওপার প্রসঙ্গও ।তাহলে পেরিয়ে কোথায় যাওয়া । স্বর্গে  ? সেই স্বর্গ কোথায়  ? জানি না । সে ব্যাখ্যায় ধর্মীয় বাতাবরণ অপার্থিবের এলাকা থেকে পার্থিবের  এলাকায় টেনে নামানোরও প্রয়োজন দেখি না ।

               বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক  আবুল ফজল "মানবতন্ত্র" প্রবন্ধে  তথাকথিত আচরণসর্বস্ব ধর্ম পালনের মদমত্ততায় লৌকিক জীবন কিভাবে দূর্বিষহ হয়ে ওঠে তা দেখাতে গিয়ে লিখেছেন--- "যা অপার্থিব তা অপার্থিবের র্অলৌকিক বিশ্বাসেই থাক । সেই অলৌকিক জীবনকে পার্থিবের লৌকিক জীবনে টেনে আনলে সে বিরোধ মুহূর্তে হয় বারুদ  ।" 

             তাই পুরাণ কথিত স্বর্গ নরকের অলৌকিক ঘরানায় না গিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের মতটি গ্রহণযোগ্য ---" মানুষের মাঝেই স্বর্গ নরক মানুষই সূরাসুর।" পার্থিবের এই প্রসঙ্গটিকেই যদি প্রাধান্য দিই তবে স্বর্গ শব্দটির সঙ্গে দুঃখ কষ্ট হীন , যন্ত্রণা হীন, স্নেহ প্রীতি পুর্ণ প্রাণোচ্ছল প্রবাহের চিত্রটি মজ্জাগত হয়। তেমনি নরক্ শব্দটির সঙ্গে  অস্বাস্থ্যকর অপ্রীতিকর নৈরাজ্যের যন্ত্রণাক্লীষ্ট চিত্রটি ফুটে ওঠে । 

             সুতরাং এই নৈরাজ্যের নিঃসীম নিরানন্দ থেকে আনন্দময় মননের মরমীয়ানায়  উত্তীর্ণ হওয়াটি কী বৈতরণী পারের সামিল নয় ? মনে হয় শিল্পীর সঙ্ঘবদ্ধ বিবেকী চেতনায় ধরা পড়ে ঐতিহ্যের অতীত ।

 

শব্দটির  আদি উৎসের দিকে পশ্চাৎগমনের  উদ্দেশ্য এটাই যে যাকে আমরা অলৌকিক জগৎ বলে ভাবছি তা হয়তো আদৌ অলৌকিক ছিল না । সেই সময়ের মেধা মনন বিশ্লেষণে তা হয়তো উক্ত বাস্তবতাকেই সাব্যস্ত করে। কিন্তু আমরা আমাদের  অজ্ঞতা দিয়ে একটা অলৌকিক জগতে বেঁধে দিয়েছি। এবং অন্ধ ভাবে অনুসরণ করতে করতে  ইহোকাল পরোকালের পরাকাষ্ঠায় আগলে সেপারেশান করে ফেলেছি ।


                সুতরাং স্বর্গ ও নরকের পাশে পার্থিবের উক্ত প্রতিচ্ছবি গুলো যদি বাগ্ময় হয় তবে বলা যায়, অজ্ঞানতার  অন্ধকারে ডুবে থাকাই নরক। আর যে বা যারা থাকে সে বা তারাই অসুর বা রাক্ষস । বিপ্রতীপে  অজ্ঞানতার অন্ধকার সরিয়ে প্রাণময় চৈতন্যে উত্তীর্ণ হওয়ায় স্বর্গযাত্রা । এবং সেটা যে বা যারা করে সে বা তারাই সুর অর্থাৎ দেবতা।

                এখানে বলে রাখা ভালো যে দেবতা প্রসঙ্গে  এমনটাই বলেছেন বিভিন্ন মণীষী। বলেছেন  দেবতা , "অলীক ঈশ্বর নয়"। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর বৈদান্তিক দর্শন প্রবন্ধ গ্রন্থে জানাচ্ছেন " সুউচ্চ মেধা ও সুতীক্ষ্ণবোধ শক্তি সম্পন্ন মানুষই হলো দেবতা ।"

               এমনকি মানুষের কল্যাণে উৎস্বর্গীকৃত নিম্নতর  প্রাণ কিংবা নিষ্প্রাণ বস্তুকেও (চাঁদ, সূর্য, গ্রহ,তারা ,পাহাড়, পর্বত,নদী)বৈদান্তিক পুরুষ দেবতাজ্ঞান করে মরমের  অন্তর্গত প্রণাম জানিয়েছেন । অর্থাৎ দেবতা বলতেও আমরা আমাদের  অজ্ঞতায় যা ঈশ্বর মেনে  অপার্থিবের এলাকায় ঠেলে দিয়েছি তাও ছিল সম্পূর্ণ পার্থিব  এবং বাস্তবও বটে।


 2


এই বাস্তবতার নিরিখেই যদি "বৈতরণী "শব্দটি রাখি এবং বিশ্লেষণ করি তবে তার পরিবর্তিত অর্থও পার্থিবের  এলাকায় তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। যেমন শব্দটিকে যুক্তাক্ষরের মোড়ক থেকে বের করে আনলে পাই " বই+তরণী " অর্থাৎ বই নৌকা বা বইয়ের নৌকা ।

               গোল বাধলো বোধহয় ! নৌকা কী আবার বইয়ের হয় ? স্বাভাবিক প্রশ্ন । কিন্তু নৌকার কাজটি ভাবুন । ভার বহন। আবার ভার মানেই কী শুধু  ওজন ? বাধা বা প্রতিবন্দকতা হয় না ? শব্দের সম্প্রসারণ করে এবার ভাবুন -- বোধবুদ্ধি হীন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন , নিশ্চল , জড়ত্বযুক্ত মনোভাব প্রগতির পথে কি অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না ? এবং সেটা তো এক প্রকার বাধাই ।

                আবার খুটিনাটি কথার মারপ্যাঁচে কিংবা গোপনীয় কোনো তুচ্ছ  কথার আড়ালে আমাদের মনের দিগন্তের স্তব্ধ হয়ে যাওয়া । হাঁফ ধরা । একটা বোবা দীর্ঘশ্বাস ! যেন একটা  অদৃশ্য দেয়াল লম্বা হয়ে যাচ্ছে কোথাও  । এমন মনে হওয়া । এ সবই কী প্রতিবন্ধকতারই নামান্তর নয় ? 

                 এই সমূহ বাধা দূর করে শুদ্ধজ্ঞান যা সরবরাহ করে বা বিতরণ করে সাযুজ্য দেয়  সংস্কৃত "বিতরণ+ অ+ই/ঈ" নামক ব্যুৎপত্তিকে । তাহলে বইয়ের নৌকা অভিধা তাৎপর্য পেয়ে গেল নাকি! অর্থাৎ বই হলো বাহন । এখন প্রশ্ন, কার বাহন ? স্বামী বিবেকানন্দ বৈদান্তিক ভাষ্য বিশ্লেষণ করে জানাচ্ছেন 'সমগ্র জগৎ তোমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ।' সেই তোমার বাহন। এখানেও প্রশ্ন,  'কে তুমি  ? ' সেখানেও  তিনি বেদকে পার্থিবের বাস্তবতায় বিশ্লেষণ করে দেখালেন, ' আই অ্যাম হি '/আমিই সে।' ব্রহ্মের পূর্ণ স্বরূপ ' । সেই স্বরূপের যে " তুমি " তাঁর বাহন। অর্থাৎ মানুষের বাহন। বেদে যাকে বলা হয়েছে " অমৃতস্য পুত্র" সেই অমৃত পুত্রের বাহন ।

               আবার তোমার মধ্যে আমার বা আমির মধ্যে তোমার উপস্থিতির যে অখণ্ড সত্ত্বা উপলব্ধি  সেও তো ব্রহ্মত্বেরই সামিল। অর্থাৎ গোটা জগতের বাহন (বই+ তরণী) বৈতরণী ।


                 বিজ্ঞানী  ই হেকেল তাঁর " অনটোজেনি রিপিটস  অফ ফাইলোজেনি " বা পুনরাবৃত্তি সূত্রে সেই মানব সন্তানকেই সমর্থন করলেন  তবে অন্য পরিভাষায় । তিনি বললেন "মাতৃগর্ভে প্রস্ফুটিত ভ্রূণের মধ্যে নিম্নতর জীবের জীনগত বৈশিষ্ট্য ক্রমরূপান্তরের পর সর্বোত্তম মনুষ্য জীনের বিকাশ ঘটে।" সেই উৎকৃষ্ট জীনের পূর্ণ প্রকাশ স্বরূপ যে মানুষ রূপ, সেই তুমি বা আমির বাহন।

                তাহলে বৈতরণী শব্দটির অলীক ঈশ্বরত্ব ঘুচিয়ে বাস্তবের অনৈস্বর্গীক দ্যোৎনায় বই+ তরণী  সাযুজ্য পেল নাকি  ?


*********************************************************************************



স্বপন নাথ 

পিতা : বলাই চন্দ্র দেবনাথ।মাতা:শ্রীমতি মায়া নাথ।গ্রাম-বেটিয়ারী, ডাকঘর- নলপুর,  থানা-সাঁকরাইল, জেলা- হাওড়া,পেশা- শিক্ষকতা ।
নেশা-লেখা , মূলত কবিতা ও প্রবন্ধ ।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : আটটি। প্রথম প্রকাশ (2006)বাতুল বালিয়াড়ি। পর্যায়ক্রমে মৃত্যুজপ শীলিত পরিক্রমা, চন্দ্র হলো না,সেই হরিণী যেই হরিণী, দ্বীপজন্ম, আয়াত পেরনো জল, গ্রহণ,   প্রভৃতি । সবকটিই শ্রদ্ধেয় কবি শঙ্খ ঘোষের তদারকিতে প্রকাশিত । প্রকাশিতব্য "ছিপ ধরা প্রহর "2022কোলকাতা বইমেলা ।
"আয়াত পেরনো জল" কাব্যগ্রন্থটি 2020 অন্নদাশঙ্কর রায় স্মৃতি পুরস্কারে মনোনিত হয়েছিল। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আবৃত্তি বিভাকর সম্মানে ভূষিত ।

অনুবাদ কবিতা * সুধাংশুরঞ্জন সাহা


কবি Seamus Heaney সিমাস হিনি-র কবিতা


অনুবাদ : সুধাংশুরঞ্জন সাহা

----------------------------------------

কবি সিমাস হিনি (Seamus Heaney)-র জন্ম উত্তর আয়ারল্যান্ডে । ১৯৩৯ সালে। তিনি একজন আইরিশ কবি। প্রথম জীবনে ফ্রীলান্স লেখালেখি ও প্রচারের কাজে যুক্ত ছিলেন, পরে অধ্যাপনা । বহু পুরস্কারে সম্মানিত । কবিতার জন্য পেয়েছেন Whit bread book of the year award ১৯৮৭ এবং ১৯৯৬ সালে এবং সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ১৯৯৫ সালে। তাঁর লেখায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ন্যায়বিচার । তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে-- Death of a Naturalist(1966), Wintering out(1972), The Haw Lantern (1987) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । নোবেল জয়ী এই কবি ২০১৩ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন



কন্ঠপ্রতিভা

---------------


শেষ গ্রীষ্মের মধ্যরাত।

আমি অনুভব করলাম ধাতু গলানো উত্তাপ।

হোটেলে, আমার জানালার পাশে, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা।

আমি শ্বাস নিচ্ছিলাম বিচ্ছিন্ন লেকের কর্দমাক্ত, উদাসীন রাতের।

আর দেখছিলাম ডিস্কোঠেক ফেরৎ

ভিড়েঠাসা অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের।


তাদের উচ্চস্বর ছিল নিবিড় এবং আরামদায়ক।


প্রেরিত মিঠে জলের মাছের ভোজ্যসামগ্রী ছিল

তৈলাক্ত বুদবুদের মতো।

সেই সান্ধ গোধূলি ছিল চটচটে মিঠে জলের মাছে ভরপুর।

এঁটেল মাটির কারণে এগুলোকে বলা হতো 'ডাক্তার মাছ'।

বলা হতো মাছের ক্ষত সারানোর জন্য এই মাছ,

যা আমাদের আবেগপীড়িত করেছিল।


সাদা পোশাক পরিহিত একটি মেয়ে

আমার প্রণয় প্রার্থনা করেছিল গাড়ির ভিড় থেকে।

তার কন্ঠস্বরে ছিল মৌমাছির গুনগুন,

যা হাসির খোরাক জুগিয়েছিল।

আমার মনে হয়েছিল দীর্ঘদিনের পুরনো বল্লমের কালশিটে দাগ।

আমি ভাসতে চেয়েছিলাম নরম উচ্চারণে ভরা জীবন ছুঁয়ে।











ব্রোয়াঘ

----------


নদীতটে জাহাজের লম্বা রজ্জু

শেষ হচ্ছে চওড়া জাহাজঘাটে,

এবং শামিয়ানার গদি বিস্তৃত ছিল

পায়ে হাঁটা রাস্তা অব্দি।


এক পশলা বৃষ্টির পর গোড়ালিতে

 ইংরেজি ও-অক্ষরের কালোচিহ্ন এঁকে দেয়ার মতো

বাগানের কাঠামোকে সহজেই থেঁতলানো সম্ভব ছিল।


ব্রোয়াঘে ঝোড়ো বাতাসে

গ্রাম্য গাছপালা এবং রেউচিনি পাতায় পাতায়

অগভীর উল্কি আঁকা প্রায় শেষ।


আচমকা শেষের মতোই

অপরিচিত লোকের কাছে

খুব কঠিন ছিল এই পরিস্থিতি সামলানো।


(নোট : ব্রোয়াঘ একটি স্থানের নাম)


***********************************************************************************

 


সুধাংশুরঞ্জন সাহা

জন্ম ৩০ ডিসেম্বর ১৯৫৭। বেড়ে ওঠা পূর্ব কলকাতায়। ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্কের অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক।আটের দশক থেকে লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা লিখেই তার যাবতীয় পরিচিতি । কবিতা ছাড়াও গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ এবং বিদেশি কবিতা অনুবাদ করতে ভালোবাসেন। সম্পাদনা করেন একটি অনিয়মিত লিটল ম্যাগাজিন 'অন্যসাম্পান' । প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : ১৬, গল্পগ্রন্থ : ২, ছড়াগ্রন্থ : ২  উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : অপহৃত রাত্রির চর্যাকথা * নিরুত্তর তারার স্বপ্ন * পূর্বাভাস * পাগল চাকা ঘুরছে অবিরাম * একা দুপুর * শ্রেষ্ঠ প্রেমের পদ্য * সময়ের এস্রাজে বেজে যায় অবুঝ দুপুর * বেলুনের কোন জন্মদিন নেই * নির্বাচিত কবিতা ১০০  ইত্যাদি। 


গল্প * দেবাংশু সরকার



ওরা এসেছিলো

দেবাংশু সরকার 



অনেক দিন ধরেই বরুণ বদলির চেষ্টা করছিল। এমনকি কর্নেল সুরিন্দার সিংয়ের কাছেও একান্তে আবদার করে বারে বারে বলেছিল যে, সে স্রেফ প্যারেড করার জন্য আর্মিতে ভর্তি হয়নি। ট্রেনিং পিরিয়ডে সে যা শিখেছে সেটাকে কাজে লাগিয়ে সে দেশ মাতৃকার সেবা করতে চায়। সে চায় তার মাতৃভূমির দিকে কুদৃষ্টি দেওয়া বিদেশী শত্রুদের চোখ উপড়ে নিতে। দেশের সীমানাকে সুরক্ষিত করতে।

      অবশেষে বরুণের ইচ্ছা পুরণ হল। সে বদলি হল উত্তেজনা প্রবণ লাদাখে। কয়েক দিনের মধ্যেই সে চলে আসে। অবশ্য সে একা নয়, প্রায় কুড়ি হাজার সেনাকে আনা হয়েছে লাদাখে।কর্নেল সিংও এসেছেন।

       কি অপুর্ব এই মালভূমি! প্রকৃতি দেবী যেন নিজের হাতে সাজিয়েছে এই মালভূমির কোনো কোনো অঞ্চলকে। বরফের মুকুট পরে মালভূমিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে পর্বতমালা। রুক্ষ্ম ধুসর পাহাড়ের মাঝে, সমতলে সবুজ বনানী। নাম না জানা হাজারো ফুলের মেলা। পাহাড়ি মানুষগুলো ভীষণ সাদাসিধে। সর্বদাই তাদের মুখে লেগে থাকে অনাবিল হাসি। মাঝে মাঝে বের হতে হয় বরুণকে পেট্রোলিংয়ের জন্য, সেই সঙ্গে  প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে উপভোগ করে। 

      গোয়েন্দা সুত্রে খবর এসেছে বিদেশী শত্রু একটু একটু করে সক্রিয় হতে শুরু করেছে লাদাখ সংলগ্ন বর্ডারে। সীমানার ওপারে শুরু হয়েছে রাস্তা তৈরী। ত্রিপল ছাউনির ফরওয়ার্ড ক্যাম্পগুলো যেন একটু একটু করে এগিয়ে আসছে! শুরু হয়েছে বিদেশী হেলিকপ্টারের সীমানার আকাশে আনাগোনা। কখনো সীমানা লঙ্ঘন। কখনো কখনো উড়ন্ত ড্রেন চোখে পড়ছে। কমান্ডার মিটিংয়ে অবশ্য অনিচ্ছাকৃত ভুল স্বীকার করলেও, ভুলগুলো বড়ই দৃষ্টিকটু। 

      বারে বারে মিটিং হচ্ছে আর ব্যর্থ হচ্ছে। হলুদ মুখো বিদেশী শত্রুদের উৎপাত ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বিদেশী শত্রুরা কিছুতেই যেন তাদের আগ্রাসী মনোভাব থেকে বের হতে পারছে না। বারবার শেনপাও পর্বতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে হলুদ মুখো বিদেশী শত্রুরা। এল,এ,সির এপারেও ভীষণ ভাবে বেড়েছে সেনা সমাবেশ। পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, বিহার রেজিমেন্ট থেকে আসা প্রায় কুড়ি হাজার সেনাকে মোতায়েন হয়েছে লাদাখে। তুরতুক থেকে গালওয়ান পুরো এলাকাটাতেই প্রায় সর্বক্ষণ চলছে সেনা টহলদারি। এমনকি নুব্রা ভ্যালি, দুরবুকেও সেনা তৎপরতা চোখে পড়ছে। ডি এস ডি বি ও রোড ধরে সার দিয়ে চলছে সেনাবাহিনীর গাড়ি। লেহ্ থেকে ডি এস ডি বি ও রোড দুরবুক হয়ে দৌলত বেগ ওল্ডি এয়ার বেস অবধি নির্মিত হয়েছে। এই রাস্তায় সেনা তৎপরতা নজরে পড়ছে। এছাড়া গালওয়ানমুখী লিঙ্ক রোডেও সেনা তৎপরতা বিশেষ ভাবে নজরে পড়ছে। ব্যস্ততা বাড়ছে টাংসেতেও। 

      যুদ্ধকালীন তৎপরতা দৌলত বেগ ওল্ডি এয়ার বেসেও। এসে জড়ো হয়েছে এস ইউ থার্টি, এম কে আই এস, মিগ টোয়েন্টি নাইন এস, রাশিয়ান ইলিউশন সেভেনটি সিক্স, অ্যান্তনভ থার্টি টু, আমেরিকান সি সেভেনটিন, সি ওয়ান থার্টি জে। এছাড়াও এসেছে চিনুক হেলিকপ্টার। ঘটঘট শব্দে আকাশটাকে চষে বেড়াচ্ছে অ্যাপাচে। ফাইটার বিমানগুলোও রাত এগারোটা থেকে চক্কর দিতে শুরু করেছে। সারারাত ধরে টহল চলছে। সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় ওড়া মিগ টোয়েন্টি নাইন এর বিকট শব্দ শত্রুর বুকে কাঁপন ধরিয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পাহাড় থেকে পাহাড়ে। নাইট ভীষণ গগলস পরা সেনা পাইলটদের তৎপরতার খবর হয়ত পৌছে যাচ্ছে সীমানার ওপারে।

      বরুণের পোস্টিং হয়েছে তুরতুক গ্রামের কাছাকাছি একটা আর্মি ক্যাম্পে। রুক্ষ্ম ধুসর পাহাড়ে ঘেরা তুরতুক গ্রামটিতে যেন সবুজের সমারোহ। সম্ভবত উত্তর পশ্চিম প্রান্তের শেষ গ্রাম। নাম না জানা হাজারো ফুল গাছের অবস্থান এই গ্রামে। কেউ কেউ একে 'ওয়ান্ডার ল্যান্ড' বলে। গ্রামের একদিকে ন্যুব্রা ভ্যালি, অন্যদিকে পাহাড়ের আড়ালে বালটিস্থান। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে শ্যায়ক নদী। ঝর্ণা, ছোট নদীগুলো যেন গ্রামটাকে আরো সাজিয়ে তুলেছে। ট্যুরিজম এখানকার অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলেও, এই মুহুর্তে জনসমাগম খুব কম।

      মাঝে মাঝে বরুণকে সদলবলে পেট্রোলিং করতে আসতে হয় এই গ্রামে। গ্রামের প্রাকৃতিক রূপ দেখে মোহিত হয়ে যায় সে। অবাক হয় অস্থায়ী নদীগুলোকে দেখে। সকালে হয়তো কোনো শুকনো জায়গা দিয়ে হেঁটে গেছে। দুপুরে ফেরার পথে সেই জায়গা দিয়েই তিরতির করে বয়ে চলেছে পাহাড়ের বরফ গলা জলে সৃষ্টি হওয়া কোনো ছোট নদী। অবাক হয়ে বরুণ ভাবে এমন স্বর্গরাজ্যও মাঝে মাঝে ভরে ওঠে বারুদের গন্ধে! 


      ক্রমশ ঘোরালো হয়ে উঠছে প্যাঙগং লেকের আশেপাশের এলাকা। বিদেশী শত্রুদের শকুনের দৃষ্টি পড়েছে গালওয়ান উপত্যকায়। প্রায়শই ছোটখাটো সংঘর্ষের খবর আসে। দুএক জন আহত হয়। কিন্তু এবারে এসেছে মারাত্মক খবর। তুমুল সংঘর্ষ হয়েছে গালওয়ানে। একজন কর্নেল সহ কুড়িজন জওয়ান শহীদ হয়েছেন। বন্দুক কামানের গুলিতে নয়। লোহার কাঁটা লাগানো মুগুরের মত হাতিয়ার দিয়ে আঘাত করতে করতে তাদের মারা হয়েছে। ভারতীয় জওয়ানেরাও কারো থেকে কম শক্তিশালী নয়। তারাও খালি হাতে পাল্টা মার দিয়ে অনেক বেশী ক্ষয় ক্ষতি করেছে বিদেশী শত্রুদের ।

      সমস্ত খবর বরুণের কানে আসে। মনে মনে ছটফট করতে থাকে সে। তার সতীর্থরা মার খাচ্ছে অথচ সে হাত গুটিয়ে বসে আছে! ভৈরবও তার অমিত তেজ, শক্তি প্রয়োগ করতে পারছে না!

      আবার কমান্ডার মিটিং। আবার মেকি হাসি। আবার নিয়মমাফিক হাত মেলানো। আবার অস্থায়ী শান্তি। কিন্তু সমস্যা সমাধানের যেন কোনো পথ নেই। সেনা সমাবেশ যথারীতি আছে। পেট্রোলিং যথারীতি চলছে। কেবল অস্থিরতা কিছুটা কমেছে। তবে বেশ বোঝা যাচ্ছে এই নিস্তব্ধতা ঝড়ের পূর্বাভাস। বরুণ ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে, সে চাইছে একবার অন্তত শত্রুর মুখোমুখি হতে। আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াই লড়াই কাকে বলে সে দেখিয়ে দিতে চাইছে দুনিয়াকে। ভয় কি? সঙ্গেতো ভৈরব আছে। অবসর সময়ে ভৈরবের দিকে তাকিয়ে বরুণ ভাবে সেইসব দিনগুলোর কথা।

      ছোটবেলা থেকেই বরুণ ছিল অন্য ধরনের।   তার অনান্য বন্ধুদের থেকে সে ছিল অনেক বেশি প্রাণশক্তির অধিকারী। খেলাধুলোতেও সে ছিল বন্ধুদের মধ্যে সেরা। কিন্তু তার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ছিল খেলনা বন্দুকের দিকে। যতক্ষণ সে একা ঘরে থাকতো, খেলনা বন্দুক দিয়ে সে লড়াই চালাতো অজানা শত্রুদের সঙ্গে। রাস্তায় পুলিশের কাঁধের রাইফেলের দিকে সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। বরাবরই আগ্নেয়াস্ত্রের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ তার মনে।

       বড় হয়ে স্কুলের গন্ডি টপকে, কলেজে পড়তে পড়তেই সে সুযোগ পেল সেনাবাহিনীতে। ভর্তি হল বিহার রেজিমেন্টে। দেখতে দেখতে ট্রেনিং নিতে যাওয়ার দিন এসে গেল। বরুণতো আনন্দে আত্মহারা। ঠিক মনের মত চাকরি সে পেয়েছে। বাড়ির লোকজন ছাড়াও পাড়া প্রতিবেশীরা এসেছে, বরুণকে বিদায় জানাতে। সবাইয়ের মুখে হাসি। কারো আবার কোনো অজানা আশংকায় চোখের কোনটা যেন চিক চিক করছে।

      "অলক নিরঞ্জন।" জলদ গম্ভীর কন্ঠ থেকে উচ্চারিত হল অমোঘ বীজমন্ত্র। এসে দাঁড়িয়েছেন জটাজুটধারী এক সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। বরুণের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুই দেশের হয়ে লড়াই করতে যাচ্ছিস। এটা সঙ্গে রাখ।" নিজের ঝোলা থেকে একটা ছুরি বের করে বরুণের হাতে দিলেন। বললেন, "এটা সব সময়ে সঙ্গে রাখবি। এটা কোনো সাধারণ ছুরি নয়। এটা মা ভবানীর আশীর্বাদ। এর নাম ভৈরব। শিবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর চক্র, ইন্দ্রের বজ্রের সম্মিলিত শক্তির আধার এই ভৈরব। যতক্ষণ ভৈরব তোর সঙ্গে থাকবে, ততক্ষণ রণাঙ্গনে তুই অপরাজেয়। কেউ তোর কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না। ভুলেও কখনো হাত ছাড়া করবি না। ভৈরব ঢাল হয়ে তোকে রক্ষা করবে, আবার তলোয়ার হয়ে শত্রু নিধন করবে। কিন্তু হাতছাড়া করলে সমূহ বিপদ। প্রাণ সংশয়ও হতে পারে। আবার বলছি সাবধান। কোনো অবস্থাতেই ভৈরবকে হাতছাড়া করবি না। তাহলে বিপদ।ভীষণ বিপদ।"

      ধিরে ধিরে স্বাভাবিক হচ্ছে লাদাখের পরিবেশ। ফৌজি বিমানের উড়ানের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। ধাপে ধাপে চলছে সেনা প্রত্যাহার। ধির গতিতে হলেও ফিরে আসছে শান্তি। এমন সময়ে গোয়েন্দা সুত্রে খবর এসেছে অরুণাচলে আবার বেড়ে উঠেছে বিদেশী আগ্রাসন। মাঝে মাঝেই সীমানা টপকে ঢুকে পড়ছে এদেশে। তাসরি চু নদীর তীরে জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলগুলোতে বাড়ি ঘর তৈরি করছে। বসতি তৈরি করে কলোনি বানানোর চেষ্টা করছে। উত্তর সুবনসিরি জেলা জুড়ে এই অপচেষ্টা চলছে।

      নতুন করে নজরদারি শুরু হল অরুণাচলে।   শুরু হল সেনা পোস্টিং। লাদাখ থেকে বহু সেনাকে সরিয়ে নিয়ে আসা হল অরুণাচলে। সেই দলের সঙ্গে বরুণ এসেছে। কর্নেল সুরিন্দার সিং এসেছেন। ব্রিগেডিয়ার খুরাণা কাঁধে গুরু দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন অরুণাচলে।

      নিয়মিত পেট্রোলিং চলছে। চলছে তল্লাশি। বরুণকে নিয়মিত দলের সঙ্গে বের হতে হয়। অঞ্চলটাকে সে ভালোভাবে চিনে নেওয়ার চেষ্টা করে। গাছ গাছালিতে ভরা এই অঞ্চলটাতে রয়েছে হাজারো অর্কিডের মেলা। ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী গুলো বয়ে চলেছে অরুণাচল জুড়ে।  জঙ্গল জুড়ে হাতি, হরিণ, লাল পান্ডার সঙ্গে বাঘ, চিতার উপদ্রবও রয়েছে। লোক সংখ্যা তুলনায় কম হলেও বিভিন্ন জন বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে। বাংলাভাষীও চোখে পড়ে বরুণের।

      রুটিন পেট্রোলিং সেরে দলের সঙ্গে ক্যাম্পে ফিরেছে বরুণ। কিন্তু কোন এক অজানা কারনে মনের মধ্যে যেন এক অস্থিরতা কাজ করছে। কিছুতেই যেন স্থির হতে পারছে না। মাথাটাও ধরেছে। আবার ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে পড়ে সে। একাই। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে সে পৌছে যায় তাসরি চু নদীর তীরে। নদীর তীরে হালকা ঝোপ জঙ্গল। আসে পাশে কয়েক ঘর চাকমা উপজাতির বাস। নদীর অপর পারে ঘন জঙ্গল। সামনেই একটা কাঠের ব্রীজ। ব্রীজের পাশেই এক জায়গায় বসে পড়ে বরুণ। নদীর ঠান্ডা হাওয়ায় মাথা ধরাটা একটু একটু করে কমছে।

      - নমস্কার সেনাপতি জি।

      ঘুরে তাকায় বরুণ। দেখে পিটো নামের এক চাকমা তরুণ তার পেছনে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় মানুষজনদের সাথে এর মধ্যে মিশুকে বরুণের বেশ আলাপ পরিচয় হয়ে গেছে। পিটো তাদের মধ্যে একজন।

      - পিটো, নদীর ওপারে কি আছে রে? শুধু জঙ্গল নাকি লোক বসতি আছে?

      - ওদিকে শুধু জঙ্গল। জঙ্গলে শের আছে। লোকজন থাকে না। তবে ইদানিং কিছু নাক চ্যাপ্টা বানজারা এসেছে। ঘর বেঁধেছে। একদিন কার্লো ওপারে গিয়েছিল কাঠ কাটতে। বানজারার দল কার্লোকে ইংরাজিতে খুব বকেছে। শের, ভালুর ভয় দেখিয়েছে। ওদিকে যেতে বারন করেছে। কার্লো দেখেছে ওরা অনেকগুলো ছোট ছোট ঘর তৈরী করেছে।

      - বানজারা ইংরেজিতে বকুনি দিয়েছে! ব্যাপারটা সুবিধের মনে হচ্ছে না রে! দেখতে হচ্ছে ব্যাপারটা কি।

      - ওপারে যেও না সেনাপতি। ওদিকে শের আছে।

      - ভয় পাস না পিটো, আমার সঙ্গে সওয়া শের আছে।

      কথা শেষ করেই বরুণ হাঁটতে থাকে ব্রীজের ওপর দিয়ে। পিটো 'হাঁ' করে তাকিয়ে থাকে।


      প্রায় এক ঘন্টা হয়ে গেছে এখনো বরুণ ফিরছে না! চিন্তা বাড়তে থাকে পিটোর। কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে আলোচনা করে, তাদের সঙ্গে মিলিটারি ক্যাম্পে গিয়ে খবর দেয় পিটো।

      খবরটা শুনে তেলে বেগুনের জ্বলে ওঠেন ব্রিগেডিয়ার খুরাণা। চিৎকার করে বলতে থাকেন, "এই সব ছেলেগুলোর মধ্যে না আছে ডিসিপ্লিন না আছে রেসপন্সসিবিলিটি। এরা জানে না একজন  জওয়ানকে হারালে আমাদের কতটা কষ্ট হয়, কতটা দুঃখ হয়। কোন প্ল্যান ছাড়া একা অ্যাকসনে চলে গেল! কার অনুমতি নিয়েছে? হি স্যুড বি পানিশড্।"

      "কি বলছেন ব্রিগেডিয়ার!" বলতে থাকেন কর্নেল সিং, "গালওয়ানেও কোনো প্ল্যান ছাড়া মুভমেন্ট হয়েছিল। আমার মনে হয় হি স্যুড নট বি পানিশড্। হি স্যুড বি রিওয়ার্ডেড।"

      "কিন্তু সেখানে একজন কর্নেল ছিলেন তিনিও শহীদ হয়ে ছিলেন।" তর্ক থামিয়ে ব্রিগেডিয়ার বলেন, "লিভ ইট নাউ। এখন আমাদের বরুণের পাশে দাঁড়াতে হবে। মিনিমাম এক কোম্পানি ফোর্স নিয়ে যেতে হবে। হারিআপ এন্ড লেট্স মুভ।"

      এক কোম্পানি ফোর্স নিয়ে কুচ করলেন ব্রিগেডিয়ার খুরাণা, কর্নেল সিং।

      নদী পার করে ব্রীজ থেকে নেমে হাঁটতে থাকে বরুণ। জঙ্গলের অজানা পথ। বেশ কষ্ট করেই এগোতে হচ্ছে। জঙ্গল ক্রমশ ঘন হচ্ছে। কোথাও কিছু নেই। বরুণ একবার ভাবে ফিরে যাবে। আবার ভাবে এতটা যখন এসে পড়েছে আরো কিছুটা দেখা যাক। আরো বেশ কিছুটা এগোতে চোখে পড়লো একটা ফাঁকা জমি। বেশ কয়েকটা কুঁড়ে ঘর রয়েছে সেখানে। খুব সন্তর্পণে এগোতে থাকে। দেখে শুনে মাটিতে পা ফেলে। শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনিও বিপদ ডেকে আনতে পারে। আরো কিছুটা এগোতেই বরুণ দেখে বেশ কয়েকজন হলুদ মুখো বিদেশী এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। গুনে দেখে কুড়িজন। জঙ্গলের আড়াল থেকে বরুণ তাদের গতিবিধি লক্ষ করতে থাকে। হাতে তুলে নেয় ভৈরবকে। একবার ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে বিদেশী শত্রুদের উপর। ছারখার করে দেবে তাদের। আবার ভাবে অভিমন্যু হয়ে এই চক্রব্যুহে ঢোকাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এতজনের সঙ্গে একা লড়তে গেলে গেরিলা যুদ্ধ করতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে সঠিক সময়ের জন্য।


দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর চার ভাগে ভাগ হয়ে চার দিকে ছড়িয়ে পড়ে ঐ কুড়ি জনের দলটা। সব থেকে বড় দলটা যায় নদীর দিকে। তিনজনের একটা ছোট দল যেন বরুণের দিকে এগোতে থাকে। বরুণ পিছোতে থাকে এক পা এক পা করে। বরুণের প্রায় গা ঘেঁষে এগিয়ে যায় দলটা। সব থেকে পেছনে যে ছিল তার মুখটা বাঁ হাতে চেপে ধরে গলায় বসিয়ে দেয় ডান হাতে ধরে থাকা ভৈরবকে। সঙ্গীর পতনের শব্দে অপর দুজন পেছন ঘুরতেই মুষ্ঠাঘাতে একজনকে ধরাশায়ী করে, অপরাজনের গলায় ঘষে দেয় ভৈরবকে। নলি কাটা অবস্থায় ছটফট করতে করতে নিথর হয়ে যায় দেহটা। তৃতীয় জন উঠে দাঁড়ানোর আগেই তার ভবলীলা সাঙ্গ করে বরুণ।

      চারটে দলের মধ্যে একটা দলকে শেষ করে বরুণ এগোতে থাকে অন্যদিকে। কিছুটা গিয়ে সে দেখতে পায় পাঁচ জনের দলটাকে। কিছুটা অসতর্ক দলটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বরুণ। বিদ্যুতের মত চমকাতে থাকে ভৈরব। একে একে পাঁচটা দেহ ভূপতিত হয়। দুটো দল খতম হয়েছে। আরো দুটো দল বাকি আছে। বড় দলটা গেছে নদীর দিকে, অন্য দলটা গেছে গভীর জঙ্গলের দিকে। ছোট দলটাকে আগে টার্গেট করলো বরুণ।

      ব্রিগেডিয়ার খুরাণা, কর্নেল সিংএর নেতৃত্বে বেশ বড় একটা সেনা দল এসে হাজির হয়েছে নদীর তীরে। সঙ্গে পিটোরাও রয়েছে। নদীর তীরে এসে চমকে ওঠে সবাই। কাঠের ব্রীজটা ভেঙে ফেলা হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার নির্দেশ দেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নতুন ব্রীজ তৈরী করতে হবে। পিটোরা ছুটলো গ্রামের দিকে লোক ডাকতে ব্রীজ তৈরীর জন্য।


      ক্রমশ অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। গভীর জঙ্গলের অজানা পথ ধরে এগিয়ে চলেছে বরুণ। ভরা পূর্ণিমার চাঁদের আলোটুকু ভরসা। আবার কিছুটা ফাঁকা জায়গায় আরো কয়েকটা কুঁড়ে ঘর। ছোট্ট খুপরি জানালাগুলো  দিয়ে সে দেখলো প্রতিটা ঘরেই একজন করে শুয়ে আছে। সাপ যেভাবে পাখির বাসায় হানা দেয়, বরুণ সেভাবে সন্তর্পণে এক একটা ঘরে ঢুকে খতম করতে লাগলো। 


      আর একটা দল বাকি আছে। যেটা নদীর দিকে গেছে। বেশ বড় দল। বরুণ বুঝতে পারে এই লড়াইটা সব থেকে কঠিন। সঙ্গে কয়েকজন সহযোদ্ধা থাকলে লড়াইটা সহজতর হত। অবশ্য এসব ভেবে এখন আর লাভ নেই। সতর্ক ভাবে নদীর দিকে এগোতে থাকে সে। এই পথ ধরেই সে এসেছে। চেনা পথ। খুব একটা অসুবিধে হচ্ছে না।

      কিছুটা এগিয়ে বরুণ দেখে, একজন মাটিতে পড়ে আর্তনাদ করছে। তিনজন তাকে ঘিরে মাটিতে বসে আছে। মনে হয় সাপ বা বিষাক্ত কিছু কামড়েছে। অপর তিনজন তার শুশ্রূষা করছে। নিঃশব্দ তাদের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায় বরুণ। কেউ টের পায়নি। নিমেষের মধ্যে ভৈরবকে ঘষে দিল বসে থাকা তিন জনের গলায়। জীবিত তিনজন মুহুর্তের মধ্যে লাশে পরিনত হল।

      হাতে অস্ত্র নিয়ে চিতাবাঘের সতর্কতায় নদীর দিকে এগোতে থাকে বরুণ। আচমকা দুজন হলুদ মুখো বিদেশীর মুখোমুখি হয়ে যায়। চকিতে একজনকে আঘাত করে সে। অপরজন দৌড়ে পালায়। উত্তেজিত বরুণ ছুঁড়ে দেয় হাতের  অস্ত্র। অব্যর্থ নিশানায় আঘাত করে ভৈরব। তীব্র আর্তনাদ করতে করতে দৌড়ে পালায় বিদেশী শত্রু। বরুণ তাকে ধাওয়া করে। কিন্তু ধরতে পারে না। ভৈরব হাতছাড়া হয়ে গেল! তবে কি মহাবিপদ ধেয়ে আসছে তার দিকে? অজানা আতঙ্কের একটা স্রোত যেন নেমে যায় তার শিরদাঁড়া দিয়ে। যা খোয়া গেছে সেটা নিয়ে বেশি ভেবে লাভ নেই। ভারতীয় সেনা দেশ মাতৃকার চরণে আত্মবলিদান দিতে কখনো পিছপা হয় না। নিজেকেই যেন বোঝায় বরুণ। তাছাড়া অপারেশন প্রায় কমপ্লিট। যদিও দু একজন বেঁচে থাকে তাদের জন্য বরুণের দুটো হাতই যথেষ্ট।

      হঠাৎ পিঠে তীব্র আঘাত পেয়ে চিৎকার করে পিছনে ফিরে দেখে আরো একজন হলুদ মুখো বিদেশী পেছন থেকে তার পিঠে একটা ছুরি বসিয়ে দিয়েছে। বজ্র মুষ্টিতে তার গলা চেপে ধরে বরুণ। বিদেশীটা এলোপাহাড়ি ছুরি চালাতে থাকে বরুণের শরীরের উপর। কাঁধে, বুকে, গলায় পরপর আঘাত হানতে থাকে। অবশ্য বরুণের হাতের চাপ বেশিক্ষণ সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে সে।

      বরুণ মাটিতে বসে পড়ে। দেখে পুরো পোশাকটা রক্তে লাল হয়ে গেছে। প্রচুর পরিমাণে রক্তক্ষরণ হয়েছে। বরুণ ভাবে সামান্য অঞ্জলিই সে দিয়েছে দেশ মাতৃকাকে। প্রয়োজনে সে শেষ রক্ত বিন্দুও দিতে প্রস্তুত।

      ঠান্ডা বাতাসে আহত, ক্লান্ত, অবসন্ন বরুণের চোখ বন্ধ হয়ে আসে। বহমান ঠান্ডা বাতাস যেন বরুণের সামনে এসে স্থির হয়ে যায়। সে বলে ওঠে,

       - জাগো বরুণ, চোখ খোলো। ওরা যে আসছে।

      - কারা?

      - যারা স্বর্গগত, তারা এখনো জানে, স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি। তুমি একার হাতে ওদের জন্মভূমিকে রক্ষা করেছো। তাইতো ওরা আসছে তোমার কাছে। চোখ খোল, তাকিয়ে দেখো।

      আস্তে আস্তে চোখ খোলে সে। অবাক বিস্ময়ে দেখে আলোয় আলো আকাশ। শত সহস্র আলোর বিন্দুতে ভরে গেছে আকাশটা। আলোর বিন্দুগুলো ক্রমশ যেন এগিয়ে আসছে তার দিকে। আরো, আরো কাছে এসেছে। ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে আলোর বিন্দুগুলো। বরুণ দেখছে এতো আলোর বিন্দু নয়, এতো তার চেনা! ভীষণ চেনা! জন্ম জন্মান্তরের চেনা! দিব্য জ্যোতিতে আলোকিত মহামানবরা! ঐতো, বরুণ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ফাঁসির মঞ্চে জয় গান গেয়ে যাওয়া বীর কিশোর! গলায় ফাঁসির দড়ির দাগটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ঐতো, ঐতো তিন অলিন্দ যোদ্ধা! ঐতো মাস্টার দা! ঐতো ঐ দিকে হ্যাট পরা উন্নত শিরের শিখ যুবক! ঐতো বুড়ি বালামের তীরের লড়াকু বীর, অমর শহীদ! ঐতো, ঐতো......!

      বরুণ দুহাত বাড়িয়ে দিয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ীদের চরণ ছোঁয়ার জন্য। ওরাও হাত বাড়িয়েছে তার দিকে। শত সহস্র হাত থেকে ঝরে পড়ছে শ্বেত শুভ্র পারিজাত। স্বর্গীয় পুস্পে ঢেকে যাচ্ছে বরুণের দেহ।

      ভোর থেকেই গ্রামবাসীরা জড় হয়েছে নদীর ধারে। কারো হাতে ফুলের তোড়া, কারো হাতে মালা। কারো আবার জড়ো হওয়া দুহাতে উজাড় করে দেওয়া শ্রদ্ধা। সবই বরুণের জন্য। তারা অপেক্ষা করছে বরুণের প্রত্যাবর্তনের জন্য। অধীর আগ্রহের অপেক্ষা! অবশ্য গ্রামবাসীরা নদীর ধারে আসার অনেক আগেই  ব্রিগেডিয়ার  তার দলবল নিয়ে চলে গেছেন নদীর ওপারে।

      জড়ো হওয়া গ্রামবাসীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে বরুণকে নিয়ে।

      - মনে হয় বরুণ পাঞ্জাবের ছেলে। চেহারাটা দেখেছো যেমন লম্বা তেমন চওড়া।

      - কিন্তু ওতো ভালো বাংলা বলে। মনে হয় বাঙ্গালী।

      - আমি দেখেছি কথা বলার সময়ে দক্ষিণীদের মত দুদিকে মাথা নাড়ে। তামিল বা হায়দ্রাবাদীও হতে পারে।


      সরল গ্রাম্য মানুষগুলো হয়তো  জানে না, বাংলা, পাঞ্জাব বা তামিলনাড়ুর গন্ডিতে বরুণদের আবদ্ধ করা যায় না। কোনো রাজ্য বা ভাষা বরুণদের পরিচয় নয়। বরুনদের একমাত্র পরিচয় তারা দেশ মাতৃকার সন্তান।

      যখনই দেশ মাতৃকার  ভাগ্যাকাশে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, তখন ঘরে ঘরে বরুণেরা সন্ধ্যা প্রদীপ হয়ে জ্বলে উঠে অন্ধকারকে সরিয়ে দেশ মাতৃকাকে আলোর দিশাতে ফিরিয়ে আনে

      নদীর ওপারে একদল সেনাকে দেখে সবাই চুপ করে যায়। দলটা ব্রীজের উপর দিয়ে আসছে। কর্নেলের কোলে বরুণ। এপারে এসে কর্নেল বললেন, "গ্রামবাসীগন, তোমাদের বন্ধু আজ আমাদের গর্ভ। অমর শহীদ বরুণ আমাদের গর্ভ... "। কথা শেষ  না করেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন কর্নেল। গ্রামবাসীদের হাত থেকে পড়ে গেল ফুলের তোড়া, ছিঁড়ে গেল  মালা। কেবল রয়ে গেল অপরিসীম শ্রদ্ধা আর টুকরো কিছু স্মৃতি।

      কর্নেলের ঠিক পেছনেই ব্রিগেডিয়ার। তার চোখও জলে ভেজা। রোদে পোড়া ফর্সা মুখটা অসম্ভব থমথমে। মাথাটা ঝুঁকে রয়েছে। ব্রিগেডিয়ার ভাবছেন মাত্র বাইশ বছর বয়সেই দেশ রক্ষার জন্য একটা তাজা প্রাণ মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়লো! নাকি নিজের কাজ সাঙ্গ করে অমৃতের পুত্র পাড়ি দিল অমৃত লোকে!

               মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়ঃ

                        ওং শান্তি 

  

**********************************************************************************************************       



দেবাংশু সরকার

পেশা মেডিকেল রিপ্রেসেন্টেটিভ। স্কুলের পত্রিকায় নিয়মিত লেখার অভ্যাস থাকলেও। তারপর দীর্ঘ বিরতি। লকডাউনের প্রথম বছরটা(2020) কেটে যায় টিভিতে রামায়ণ, মহাভারত দেখে। লকডাউনের দ্বিতীয় বছরের (2021) অখন্ড অবসরে লেখালেখির দ্বিতীয় ইনিংসের শুরু ।

সাম্প্রতিক লেখা  - প্রজাপতি সাহিত্য পত্রিকা/ সৃজন সাহিত্য পত্রিকা/ রংমিলন্তি প্রকাশন/ কারুলিপি অনুগল্প সংকলন/ অবেক্ষন/ ড্যাস সাহিত্য পত্রিকা/ লেখা ঘর সাহিত্য পত্রিকা/ মৌনমুখর সাহিত্য পত্রিকা/ তুলি কলম আকাশ/ ঘোড়সওয়ার/ স্নিগ্ধা প্রকাশন/ নীরব আলো প্রভৃতিতে প্রকাশিত হয়েছে ।

                               

গল্প * শরদিন্দু সাহা

 



মহাপ্রস্থানের পথে

শরদিন্দু সাহা


নিঃশ্বাসটার চলন তখনও ঘন ঘন। এত দ্রুত যে ঘটনাটা ঘটে যাবে অমৃতলাল ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। চারপাশের গরম হাওয়াটা যেন চু  কিত কিত খেলছে। দু-একটা মশামাছি কোন ফাঁকে এসে নাকের ছিদ্রের মধ্যে জয়ধ্বনি করছে এমন করে যেন বেঁচে থাকাকেই চাগিয়ে তুলছে। ওদের বনবন শব্দই একান্ত আপন হয়ে ওকে আগলে রাখছে, পরম আত্মীয় ছাড়া কিইবা ভাবা যায় এই অসময়ে। সময়টা যে এত অনাদরে এসে জড়িয়ে নেবে কে আর জানত। খাঁচাটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে যেন। কখন যে কে এনে এখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে, সেটাও যে কিভাবে? চলন্ত ট্রেনের দম আটকানো এক বগির কায়াহীন ছায়াময় এক ছবির  মুহুর্তটাই ডুব সাঁতার কাটার সময়ে স্মৃতি-বিস্মৃতির মায়াজালে কারণে অকারণে ঘোরাফেরা করে।


 সময়টা জানিয়ে দিচ্ছিল অনেক কথাই বোঝা না বোঝার মাঝখানে। এ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ, স্মরণ-বিস্মরণের অতল তলে। জানার কথা তো অনেক কিছুই ছিল। কোনরকমে নাকে-মুখে গুঁজে বউয়ের আঁচল টেনে মুখটা মুছে সেই যে চণ্ডীমণ্ডপে নমস্কার সেরে দৌড় লাগালো সে তো আর থামলোই না। পথে দু-একটা বড় বড় গর্তের মুখ থেকে ধেড়ে ইঁদুরগুলোও ওর দৌড়ে যাওয়ার দিকে পলকহীন নেত্রে দেখল। ওরাও ওর পথের নিশানায় ছুটল, এই বুঝি বাঁচার রসদ জোগাড় করবে বলে একঘর ঢুঁ মেরে দেওয়া। ধুলো মাটির উপর সদ্য মোরাম মাটির রাস্তার দুধারে কাঁচাপাকা ঘাসগুলোর উপরই পা ফেলে ফেলে দমবন্ধ করে ছুটে যাওয়া। একগোছা ধান হাতের মুঠোয় ধরে কাস্তেটা উপরে তুলে করিম চাচা মাঠের মাঝখান থেকে ডাক দেয় – ও অমৃত, আস্তে যা, হোঁচট খাবি যে, পেটে খিদে নিয়ে এমন করে দৌড়তে আছে। সব কথাই কানে এসেছে। ভাবিস নি, সব ঠিক হয়ে যাবে। কাজে যাচ্ছিস যা, মাথাখানা ঠান্ডা রাখিস। গাঁ গঞ্জের  মানুষ আমরা, শহুরে মানুষগুলোর সঙ্গে মানিয়ে গুনিয়ে নিস।


আচ্ছা গো আচ্ছা, ছোটার বেগটা না হয় একটু থামিয়ে দিলুম, কিন্তু ওদিকে যে ট্রেনটা ছুটে যাবে। একবার চলে গেলে আর ধরব কেমন করে, সেই তো আবার বেলা গড়িয়ে গেলে…।


পায়রার গল্পটাই পাক খেয়ে হৃদয়ের পাঁজরে এসে ধাক্কা মারলো। খাঁচাটাও নড়েচড়ে উঠলো। মনটা তো বেজায় খারাপ। পায়রার ডিমগুলো জানালার নিচ থেকে বাসাশুদ্ধ এমন নিষ্ঠুর ভাবে লাঠির ঘায়ে টান মেরে ফেলে দিতে হল, পড়ে গিয়ে ফটাস ফট। মা পায়রা  কখন যে কোথায় উড়তে বেরিয়ে গেছে, কে জানে। উপায় তো ছিল না, এমন বিদঘুটে গন্ধ, গায়ের পোকাগুলো শেষে কানের  কাছে এসে  না বাসা বাঁধে। ঘরে ছেলেপুলে রয়েছে, ব্যামো হলে সারাবার কি কোন উপায় আছে? পাঁচ-সাত মাইলের মধ্যে কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। ডাক্তার তো দূরের কথা, কোয়াকই না হয় সই, তাও-বা মিলে কই। মনের মধ্যে দলা পাকানো ব্যথাটা ওর দৌড়ানোর ফাঁকে-ফাঁকেই এসে ঝাঁকিয়ে দিচ্ছে বারে বারে। আরো তো অনেকটা পথ, জিরোতে তো একটু হবেই। অমৃতলাল বুকে হাত দিয়ে রাস্তার এক কোনেই বসে পড়ে। সাইকেল ভ্যানটা বেসামাল হয়ে কোমরে ধাক্কা দিলে ছিটকে বিলের ধারে পড়ে যায় – ও কাকা, লেগেছে বুঝি। দু চারজন এসে ধরাধরি করে উপরে তুলে বসিয়ে দেয়।

'নাগো, তেমন কিছু হয় নি, তোমাদের তো রোজ-এর কাজ। যাও কাজে যাও।' একটু ধাতস্থ হলে অমৃতলাল হাত-পা-টা ডানে-বাঁয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি করে আবারো দৌড়াতে শুরু করে। ট্রেন কি আর দাঁড়ায়? স্টেশনের কাছে আসলেই ট্রেনের গতিটা ড্রাইভার সাহেবের দয়ায় একটুখানি ধীরগতি হলে অমৃতলাল কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে মাটির নিচ থেকে দু-হাতেই হ্যান্ডেলটা তড়িঘড়ি করে জাপ্টে ধরে। ভিড়ে ঠাসা ট্রেনে দু'একজন টেনে তুললে ও কোনার দিকে একটু জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। কি জানি কেউ যদি আবার ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়, তাইতো লোহার রডটা উল্টো দিক থেকে হাত ঘুরিয়ে শক্ত করে চেপে ধরা।


ছবিটা ক্যামেরার রিলের মত ঘুরে ঘুরে এই অব্দি এসে আবার মিলিয়ে যায়। অবচেতন স্তর থেকে চেতন স্তরে ফিরে আসতে কত না সময় লাগে। গতি কখনও কখনও এগিয়ে তো দেয়ই না, পিছিয়ে দেওয়ার খেলা খেলে। কাছের ছবি, কত দূরের ছবি এসে ধরা দিতে শুরু করে, একটা অন্যটার উপর চেপে বসে। ইচ্ছে তো হয় দুই হাতে জড়িয়ে ধরে কিন্তু কোথায় যে ফাঁকতালে ফুরুত করে চলে যায়, ওর ঘরের কোনের কাছে জঙ্গলের শেয়ালগুলো হুক্কা হুয়া ডাক ছেড়ে যেমন করে পালায়। কত তো শব্দ আসছে - খচর-মচর, ধুপধাপ, ধমাস ধমাস, মচাৎ মচাৎ। সেইসব শব্দের বাজনাগুলো আজ যেন বড় বেশি করে বেজেই চলেছে, থামতেই চায় না। চোখের পাতাটা যে মেলে ধরে আলোর মেলায় খুনসুটি খেলবে, তা তো হওয়ার নয়, ভুলেই তো গেছে কেমন করে সেই খেলা শুরু করতে হয়। 


ফিরে ফিরে যায় অমৃতলাল খাঁচা টপকে ট্রেনের বগির দম বন্ধ হয়ে আসা জনরবে। খাঁচাটা ডানে-বাঁয়ে মোচড় খেয়ে ছুটে চলে যায়। উড়াল পুলটার ডানাটা সোজা নাক বরাবর গিয়ে বেঁকে গেছে একটু একটু করে। ব্রেকডাউন হওয়া গাড়িটার পেছনে থমকে গেলে কথাগুলো ভাঙতে শুরু করে। আরম্ভ তো করেছিল ওরা, যা মন চায়। গল্পের ফিরিস্তি কি আর থামে, যা নয় তাই বলে। এমন যে সেই গল্পের রস, জমাট বাঁধার আগেই ছড়িয়ে গিয়ে এর তার স্বরসন্ধিতে গিয়ে ধাক্কা মারে। কি নেই সেই গল্পে। চল্লিশ বছর আগের জমির মালিক হওয়ার গল্প, বাপ ঠাকুদ্দার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জমি চাষের গল্প। কবে ভাগের মা গঙ্গা পায়নি, সেই সব দিন ফুরিয়ে যাওয়ার গল্প। মুখ থেকে সেই কথা টেনে নিয়ে কেউ আবার গৌড় বঙ্গের গল্প শোনায়।  আরেক জন যাত্রী এসে উঠতে না উঠতেই শরীরটাকে ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টায় অমৃতলালকে কনুইয়ের গুঁতো মারে। হোঁচট খেয়ে আরো এক পা পিছিয়ে যায়। দরদর করে ঘামতে শুরু করে, এক সময় গেঞ্জিটা ভিজে গিয়ে নোনা ঘাম জামার সামনে-পিছনে চুনের দাগের মতো ফুটে উঠলে অমৃতলাল ভয়ে চমকে যায়। বিড়বিড় করতেই থাকে - এইরে সর্বনাশ, এখন কি হবে? বাবু তো দরজা দিয়ে ঢোকার মুখেই হিড়হিড় করে বের করে দেবে। কত তোষামোদি করেই না চাকরিটা পেয়েছিল। না করেই বা উপায় কি ? পঞ্চায়েতে নালিশ জানিয়েও তো কোন ফয়সালা  হয়নি। হারু গায়েন, জোতদার নারু গায়েনের ছেলে জোর জবরদস্তি করে অপারেশন বর্গার সময়ে পাওয়া বাপকেলে তিন ফসলি জমিটা কেড়েই নিয়েছিল, হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল সামান্য কটা টাকা, বড় মেয়ের বিয়ের পণের টাকা না হয় কিভাবেই বা জোগাড় করতো। জামাইকে ফুসলিয়েই না হারু এইভাবে ওর জমিটা বাগিয়েছে। শুধুই কি জমি, গোপনে জানতে পারল ভিটে থেকে উচ্ছেদ করার অংক ও কষছে। দোষের মধ্যে এই ছিল যে  মেয়েটাকে  ভোগের জন্য ওর হাতে তুলে দেয় নি, তাই ওর এত কারসাজি। 'বাপ হয়ে এমন জল্লাদের হাতে মেয়েটাকে তুলে দিতে পারি আমি?' পেটে ভাত জুটছে না বলে পাশের পাড়ার দেবদাসদাকে হাতে পায়ে ধরাতে বলল, 'সিকিউরিটির কাজ করবি তো দেখতে পারি।' মাস দুয়েক পরে হাটে যাওয়ার পথে নদীর ঘাটে একটা লম্বা-চওড়া শব্দের অনুরণন কানে বাজলো – খবর আছে অমৃতলাল। 'কি খবর গো দাদা?' 'জবর খবর। একটা হিল্লে হয়েছে তোর। আর তোর কোন দুঃখ থাকবে না। জমিটাও ছাড়িয়ে নিতে পারবি।' কথাটা বিশ্বাস না করে পারলো না অমৃতলাল। শুনেছিল বটে, দেবদাস একটা ট্রান্সপোর্ট আর কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সুপারভাইজার, মাইনেকড়িও নেহাত কম নয়। ঠাটবাট দেখেই অনুমান করা যায়। পাড়ার লোকেরা, হিন্দু-মুসলমান সবাই কথায় কথায় নমস্কার আর সেলাম ঠোকে। দেবদাসও বদান্যতা দেখাতে কসুর করে না। পরম আত্মীয়র মতো পরিবার-পরিজনদের ভালো-মন্দের খবর নেয়।  কোম্পানিতে যে ও বড় সাহেবের একেবারে ডান হাত, একথাটা পাড়ার লোকের মুখে মুখে ফেরে। কত ক্ষমতা, হেন কাজ নেই, দেবদাস আদায় করতে পারে না। সাহেবও নাকি অন্ধের মত বিশ্বাস করে। মারোয়ারি কোম্পানির বাঙালি সাহেব। 'স্যার, গাঁয়ের ছেলে, একটা ব্যবস্থা করে দিতেই হবে, যে করে হোক।' দেবদাস নাছোড়বান্দা,  না করে আর উপায় কি, কথায় যেন মধু ঝরে, তাতেই সাহেব গলে যায়। এমন একজন লোকের কথাকে ঘোড়ার মুখের কথা না ধরলে চলে। আহা, কী বড় মানুষের মন! না হলে আজকাল কে কার কথা মনে রাখে। কথায় কথায় সে কবে আর বলে রেখেছিল। 'অ দাদা, তোমার চরণে গড় করি গো।' নিজের মনেই বলতে থাকে অমৃতলাল

– লোকে বলে ভালো মানুষের আকাল পড়েছে, কই  তেমনটা তো নয়।


 হাজার পাঁচেক টাকা বেতন বটে, সারাদিন তো ওই গেইট আগলে বসে থাকা, খোলা আর বন্ধ করা। পেচ্ছাপ পেলে যে বাথরুমে ছুটবে তারও কি উপায় থাকবে, সেই তো চেপে বসে থাকতে হবে যদি দেখতে না পেয়ে বাবুর গোস্সা হয়, গালাগাল দিয়ে ভুত বানিয়ে দেয়, মোটা চামড়া না হলে সহ্য করা যারপরনাই  মুশকিল। দেবদাস  ডেকে বলল,'বুঝলি অমৃতলাল  অধৈর্য হলে কোম্পানিতে চাকরি টিকবে না। মন দিয়ে কাজ করিস। সাহেবের দয়া হলে বেতনটা দিনে দিনে ঠিক বাড়বে আর যদি মালিকের নজরে পড়ে যাস, তাহলে তো কথাই নেই, কপাল খুলতে সময় লাগবে না।  কথায় আছে না সবুরে মেওয়া ফলে।' বিশ্বাস না করেই বা উপায় কি। কি জানি বাবু আর দেবদাসের মাঝে অন্য হিসেব আছে কিনা, সে তো আর ওর জানার কথা নয়। কিন্তু আজ যে কি দশা হবে, ঈশ্বর জানে। বাবু নাকি বড্ড খুঁতখুঁতে, সিঙ্গেল লাইনের হাল হকিকত তো ওর জানার কথা নয়। লোকটা আবারো কনুই দিয়ে গুঁতো দিল। এবারের গুঁতোয় একদম সোজা গিয়ে তলপেটে এমনভাবে ধাক্কা খেলো নাড়িভুঁড়ি সব বের হয়ে যাবার জোগাড়। লোকটাকেই বা দোষ দেয় কি করে? ওর শরীরের অর্ধেকটাই তো বগির বাইরে ঝুলছে, লোহার পিলারের ধাক্কা খেলে মাথা ফেটে চৌচির হয়ে ছিটকে পড়বে ঝোপ-জঙ্গলে। ঘুঘনির ডেকচি মাথায়, আঁচার-মুড়ি-চানাচুরের বাক্স  কাঁধে ঝোলানো হকাররাও তো হোঁ হোঁ করে ধুস্ বলে গোত্তা মারছে।  অমৃতলালের পেটে শুরু হয় এক অসহনীয় যন্ত্রণা। কি যে করা যায়, কাকেই বা দুঃখের কথা বলবে। বগির বাকি সকলে ঘেঁষাঘেঁষি করে নানা গল্প-গুজবে মত্ত,  পাখাটাও এত জোরে বন বন করে ঘুরছে, কারো কথাই কানে আসছে না, ব্যথাটার কথা জানিয়ে যে জ্বালা জুড়োবে, তারও কি জো আছে। তবুও কথা যে বলেই চলে, কি জানি পথচলার কষ্টটা হয়তো ঝিমিয়ে থাকে। 


স্মৃতিটা আবারও যেন খানিকটা বেসুরো গাইল। অনেক করেও টানাটানি করল, কিছুতেই যেন কিছু হল না। মনে হল পাড়াগাঁয়ের হ্যারিকেনের সলতে উসকানোর মতো কে যেন এসে ডান দিক ঘোরালে জ্বলে উঠছে আবার বাঁ দিক ঘোরালে নিভে যাচ্ছে। অমৃতলালের বুকের দুপাশে হাত দুটো লম্বা হয়ে কাপড়ের সঙ্গে সেঁটে আছে, নড়াচড়ার ইচ্ছেটুকু ভোজবাজির মতো উবে গেছে। ভাবনাগুলো টুকরো-টাকরা হয়ে ছিটকে যাচ্ছে, আবার জমাট বাঁধছে। জীবনটা এমন করে কি দাগা দিয়ে যায়? একটা অবোধ কষ্ট ওর দুচোখের ভেতর থেকে টপটপ করে জল হয়ে গড়ালো। গড়িয়ে গড়িয়ে ওর জিভের ডগায় এসে ছুঁল। কই কোনো স্বাদ তো পেল না। তবে কি…। এবার ইচ্ছে করেই ও পা-দুটো গোড়ালি দিয়ে ঘষটাতে লাগল, না তেমন তো কোন শোধবোধ নেই, সবটাই অসাড়। চোখ দুটোও ঘোরাবার চেষ্টা করল, কই  কোন অনুভূতি এসে ধাক্কা তো মারল না! কি আর করে, আবার নিজে থেকেই নিজের ভুবনে ডুব দিল। কত কথাই তো ভেবেছে। কতবার করে মা ঠাকুমার কথা নিয়ে কত গল্পই না শুনিয়েছে ছেলেপুলেকে। বানভাসি জলে কতবার তো মাটির দেয়াল ভেঙ্গে তলিয়ে গেছে, হাঁড়িকুড়ি আর বাকি যে সম্বলটুকু ছিল, সেও কি আর বেঁচেছে। প্রতিবারই তো ভাঙ্গে আর সরে সরে যায়  দু-তিনশ ফুট দূরে দূরে মাথা গুঁজবে বলে। যেবার অমৃতলাল-এর ঠাকুরমা জলে ভেসে গেল, ঠিক তার তিন বছরের মাথায় মা-ও গেল ভেসে। কত কাঁদাই তো কাঁদল। মাটি আঁকড়ে পড়ে রইল, মাথা ঠুকলো, সান্তনা দেবার কেউ তো ছিল না হাতের কাছে। এসেছিল বটে দিন কয়েক বাদে দুরসম্পর্কের এক পিসি, সে আর কি বলবে! ওঁর কোমরটা তো ভেঙ্গে দিয়ে গেছে ভিটের অংশীদারিত্বের দাবি নিয়ে ভাসুরের ছেলেমেয়েরা। অবস্থা বুঝে ছেলে বউ দিয়েছে ভিন্ন করে। লাঠিতে ভর করে এসে মাথায় হাতখানা রাখলে জড়িয়ে ধরে ঝর ঝর করে কাঁদল অমৃতলাল, বলল, 'পিসি গো, তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? একটিবার সময় হলো না দেখে যেতে, কেমন আছি। তুমি ছাড়া আপন বলতে আমার আর কে আছে বল। তোমার চরণ দুটো দাও দেখিনি একটু পায়ের ধুলো মাথায় নি।' এতদিন বাদে ছয়-ছয়বার বাস্তুচ্যুত হবার পর সাত মাইল দূরে বিডিও সাহেবের দয়ায় ঘর বাঁধলে স্বস্তি হলো বটে, তবে কিনা এতদিনের সব হারানোর যন্ত্রণা কি পূরণ হয়! দুঃসময়ে কে আর এসে দুঃখের ভাগবাটোয়ারা করে। একি আর সেই সুখের দিন যে বসতে দিলে  শুয়ে পড়বে, পাত পেতে খেতেও লাজলজ্জার বালাই থাকবে না। সব কথাই এখন জাপটে ধরেছে এক এক করে। 


খাঁচাটা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। অমৃতলাল-এর শরীরটা জোরে এক ঝাঁকুনি খায়। মিছিলের পাশ কাটাতে গিয়েই কী এমন দশা হল! শত শত লোকের কণ্ঠস্বরই ওর মিছিলের স্মৃতিকে উসকে দেয়। পঞ্চায়েত থেকে আবাস যোজনার টাকার লোভে, নাকি বিনে পয়সায় শহর দেখার টানে ছুটে এসেছিল ফ্ল্যাগ হাতে করে, সে এখন আর মনে পড়ে না। তবে বেশ লেগেছিল। শহরের বাবুরা, বউ-ঝিরা অফিস আদালত ঘরবাড়ির জানালা আর ছাদ থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখেছিল ছাপোষা গেঁয়ো লোকগুলোর কাণ্ড কারখানা। লাখো লোকের সমাবেশে নিজেকে মনে হয়েছিল এইটুকুনি অথচ ওদের চার গাঁয়ে নিজেকে কত্ত বড় লাগে। 'কেন এমনটা হয় কি জানি? জীবনটাই বোধহয় এইরকম,  গরিব-গুরবো মানুষগুলোর জন্য এক নিয়ম আর বাবুলোকদের জন্য আরেক নিয়ম। কত তো নিয়মকানুন, ওরা কি ছাই জানে। গায়ে গতরে খেটেও তাদের দুবেলা দু'মুঠো ভাতই জোটে না, নিয়ম জেনে কী লাভ! আর নিজের কথা! তা বলতে কি কিছু আছে? ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো ওরাইতো পিঠ পেতে বসে আছে কখন বড়দা মেজদাদের কিল-চড় খেতে হবে, সে যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা কি ওর আছে? তবে হ্যাঁ, ওদের গাঁখানা কিন্তু মনের মতো, তবুও কারা যেন সব ছারখার করে দিয়ে আহ্লাদে আটখানা হতে চায়। সকলের বলার ঢং আর ভাষাগুলো এখন কেমন যেন রসকস হারিয়েছে। দু'চারখান ঘরে, ক্লাবে টিভি এসেছে কিনা। সব গাঁয়ের মানুষগুলোকে কি গেলাবে আর কেমন করে গেলাবে, ওরা সব কায়দাকানুন জানে। কেমন সুন্দর গিলিয়ে দেয়। কিন্তু একটা জিনিস ওরা জানেনা, ওদের ঘরগেরস্তি, চাষবাসের রীতিনীতি আর জ্ঞানগম্মী। এ কথাখান ঠিক, ছেলেপুলেরা এখন আর মাঠের পানে যেতে চায়না। দোষের কি আছে ওদের! রোজগারপাতি তেমন আর আছে কই আগের মতো?  ফসলের দামও তেমন আর মেলেনা। ও কি নিজেও জানত, এই মনহীন শহরে এসে একদিন মাথা গলাতে হবে। ওদের গাঁয়ের মানুষের মনগুলোও কি কেউ চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে? খাল-বিলের জলের রং টা তাই কী এত লাল! পোড়া শরীরের গন্ধ ভাসে হাওয়ায় হাওয়ায়!


অমৃতলাল-এর মাথার স্নায়ুগুলো কেমন আপনা আপনি ঘুরতে থাকে। কত কথাই না মনে করে নিজেকে নেড়েচেড়ে দেখতে চায় – ঠিক আছে কি নেই, থাকলে কোথায় আছে? কোথায় যাবে ও এখন? তবুও নিজের বাড়ি ঘরের কথা ভাবে। কত পরিকল্পনাই না ছিল, সামনের ঘরখানার পাশাপাশি আরেকখানা ঘর তুলবে। মাটির হোক তাও সই। ঘরের চালে এবার খড়ের ছাউনি না দিয়ে এসবেস্টার দেবে। ভবিষ্যতের কথাটা ভাবতে হবে তো। ছেলেটা সেয়ানা হচ্ছে, এখন কত গোপনকথা জন্মাবে, কত আলোছায়ার জীবন এসে টানাহ্যাঁচড়া করবে। তা করছে করুক, বাপ হিসেবে একটা কর্তব্য তো আছে তার, নাকি।


এবার স্নায়ুগুলো একটু জ্যান্ত হতে শুরু করলে মনে করার চেষ্টা করে ঠিক কখন উল্টো দিক থেকে সজোরে হুড়মুড় করে চারপাঁচ জনের একটা ধাক্কা এসে ওকে আরো একটু পিছনের দিকে ঠেলে নিয়ে গেল। প্লাস্টিকের চটিটার উপরে দুপায়ের পাতায় চেপে ধরে। কিছু বলার আগেই ওরা নানা কথা বলাবলি করে। কথাটায় জাতপাতের প্রসঙ্গ উঠে আসলে একজন তো চিৎকারে গলা ফাটায় 'মশাই কি ছিলাম আমরা? পর্তুগিজ আর ওলন্দাজরা এইজন্যই আমাদের হীদেন (ধর্মহীন) বলতো।' 'আর এক যাত্রী তো বেফাঁস মন্তব্য করেই ফেলে, 'এই তো বাঙালির দোষ, আত্মসম্মান বলে কিছু নেই, এটা একটা হুজুকে জাত, নাচানাচি ছাড়া আর কি বা জানে।' আরেকজন তো তেড়েই মারতে আসে,'গুনে বলুন তো বাঙালিরা কটা নোবেল পুরস্কার পেয়েছে? সত্যজিৎ রায় ঋত্বিক ঘটক মৃণাল সেনদের একটা করে চলচ্চিত্রের নাম মনে আছে ?' 'হ্যাঁ ওদের ভেজে আর কতকাল খাবেন?' 'জীবনানন্দের নাম শুনেছেন? কে ছিলেন বলুনতো লোকটা?' 'হ্যাঁ শুনেছি, দু'চারটে কবিতা লিখে ট্রামে কাটা পড়েছেন।' 'তাই বুঝি!' ' বুঝলেন না, এখন মনে হচ্ছে রবি ঠাকুর ভুল জায়গায় জন্মে গেছেন' 'অতীত না হাতড়িয়ে এখন কি হচ্ছে বলুন?' 'ভালো করে চোখ মেলে দেখুন, তবেই না দেখতে পাবেন। রোজ রোজ তো মনীষী জন্মায় না! এই আপনাদের মতো নিন্দুকরা থাকলে ওরা আসবে কোন দুঃখে। কত অপমানই তো ওদের কপালে জুটেছে। বাংলা মায়ের কোলে আপনাদের মতো  সুসন্তানরা থাকতে ওঁদের আসার কি দরকার বলুন?' নজরটা ওদের হঠাৎই অমৃতলালের দিকে চলে যায়। 'উত্তরটা তুমি কি জান?' 'এটা আবার কেমন কথা! আমাকে দেখে মনে হচ্ছে এসব প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারব? আমি বরঞ্চ বলতে পারি, কখন আউশ আমন বরো ধানের চাষ হয়, কেমন করে বীজতলা তৈরি করতে হয়, কখন চারাগাছ রুইতে হয়, কি করে ধান ছাড়িয়ে খড়ের গাদা তৈরি করতে হয়। কেমন করে গোলায় ধান রাখতে হয়। আপনারা কিন্তু মোটেও রাগ করবেন না বাবুরা। এসব মামুলি কথা অবশ্য আপনাদের জেনে আর কোন কাজে লাগবে? আমাদের আবার এইসব কথা না জানা থাকলে না খেতে পেয়ে মরতে হবে যে, চাষাভূষা মানুষ তো।' 'তাহলে কলকাতা শহরে ছুটছ কেন?' উত্তরটা মুখ থেকে বেরোতে যাবে, ঠিক তক্ষুনিই ওকে আরো কয়জন এসে চেপে আরো দু'তিন হাত পেছনে ঠেলে দেয়। 


অমৃতলাল যেন জীবনের ফেলে আসা কিছু সময়ের সঙ্গে  এই পিছু হটার মিল খুঁজে পায়। নিজের মনের জানালাটা খুলে দিলে রাক্ষুসী নদীর ছবিটাই তো ভেসে ওঠে। কতবার যে ওদের ঘরছাড়া করেছে। তাহলে কি এই মানুষগুলোর অভিসন্ধিও তাই, ওকে এক সময় ঠেলতে ঠেলতে কোনঠাসা করে দিয়ে এমন জায়গায় নিয়ে ফেলবে আর ফেরার পথটুকু থাকবেনা। এই হাঁপধরা অবস্থায় ওর ভেতরে যেন একটা তোলপাড় শুরু হয়েছে, ভাঙ্গনের চেয়ে কমই বা কিসে!


প্রথম দিনের অভিজ্ঞতাটা  কেমন পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে, কেমন আলাদা ঢঙের। ওর মতো আকাট মূর্খের সঙ্গে এত বড় বড় শহুরে পণ্ডিতদের কথা চালাচালি। এদের মধ্যে একজন বঙ্গের উত্তর প্রান্তের যাত্রী ছিল, গর্ব করে কিছু বলার মত ইচ্ছে হলো ওর। কথাটা যখন সাধারণ জ্ঞানের মতই ফরফরিয়ে উঠল, তখন বলেই ফেলে, 'আচ্ছা বলেন দেখি মধ্যযুগের ছাগল ভেড়া কুকুর বিড়াল পাখিদের জন্য কোথায় হাসপাতাল ছিল?' কথাটা শুনে হো হো করে সে কি হাসি, একজন দুজন করে গোটা বগি যেন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে, 'সেটা তো আমরা বেশ বুঝতে পারছি, তা না হলে এত কিছু থাকতে এমন প্রশ্ন কে আর করবে!' দু'চারজন ভদ্রলোক লোকটাকে এই কথা বলার জন্য বাহবা দেয় – যারা না-মানুষদের জন্য এত ভাবিত ছিল, না জানি মানুষদের জন্য ওদের কত প্রাণ কাঁদত। 'এইভাবে ব্যঙ্গ করতে একটুও লজ্জা হচ্ছে না আপনাদের!' 

অমৃত লাল একটু সংকোচের সঙ্গে মাথাটা বাড়িয়ে দু-চার কথা বলতে চায়। 'ও তুমিও বলবে? তবে বলেই ফেল।' 'যাদের নিয়ে এত কথা হচ্ছে, এরা সকলেই কিন্তু আমাদের রক্ষা করে। গরু ছাগল ভেড়ার পাল দেখেছেন, এরা কিন্তু একটা নিয়মে চলে, আর আমরা মানুষরা যা করে বেড়াচ্ছি তাকে বেনিয়ম ছাড়া কিইবা বলব বলেন, অধম আর কি।' এমন একটা উত্তর যে ও দিতে পারে ওদের ভাবনায়ও আসেনি। আগুনে ঘি পড়ল। কিল চড় ঘুসি লাথি এসে টপাটপ অমৃতলালকে টেনে-হিচড়ে অন্য যাত্রীদের পায়ের তলায় ফেলে দেয়। প্রাণটা আদৌ আছে কি নেই ফিরেও তাকায় না –  চেহারা সুরতখানা গাঁইয়া কিনা, অমানুষ না হয়ে যায় কোথায়।  ভাগ্যিস দেবদূতের মতো লম্বা-চওড়া স্বাস্থ্যবান লোকটা পেছনে ছিল। মায়া মমতায় মাখামাখি হলে মাথাটাকে আলতো করে সিটে বসাতে চেয়ে কত কসরতই না করল। 'এলেম আছে মশাই আপনার!'  'মনের জোর ছাড়া আমাদের  আছেটা কি? বাঙালিরা শংকর জাত, আর্য অস্ট্রিক দ্রাবিড় মিলেমিশে এই যে আমরা, কেউ লম্বা-বেঁটে-মাঝারি, আবার কেউ ফর্সা-শ্যামলা-কালো কুচকুচে আর ধর্মে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-জৈন-খ্রিষ্টান হয়েও সকলে বেঁচে-বর্তে তো আছি কেমন ঠাসাঠাসি করে। একই ডিঙিতে তো চড়েবসা, গঙ্গা-পদ্মা-মেঘনা-যমুনার খাঁড়িতে বাঁধা না পড়লে কেমন তরতরিয়ে এগিয়ে তো যেতাম বলেন। কী যেতাম না?'


এত মধুর বাক্য আর প্রবচন সবকিছু মিলে শব্দের এত রেষারেষি, এরই মাঝে কে যেন থু করে একদলা থুতু ফেলল পায়ের কাছে। অমৃতলাল জবাবটা দিয়েই দিল, 'একি করলেন দাদা?' 'ফেলবো না বলছেন, ঘেন্না হচ্ছে?' 'তাই বলে পায়ের কাছে!' 'বেশি কথা আর বাড়িও না, এক ধাক্কায় পিষে দেব, যেটুকু বাকি আছে, তাও যাবে।' বারংবার ধাক্কা খেয়ে অমৃতলাল সজাগ হয়ে যায়। লাথির ঘায়ে পেটের যন্ত্রণাটা বেড়েই চলে। উপশমের জন্য হঠাৎই হরিবোল হরিবোল শব্দে দু'হাত তুলে নাচতে শুরু করে, মুখে কীর্তনাঙ্গের গান…যদি হরি বলে মরতে পারি, এই জনমে নাইবা পেলাম।'  মানুষের স্রোতও যে বাঁধ মানে না। কে আর দরদ দিয়ে ভাবে, সকলেই তো চোখ উল্টে দেয় যে যার মতো।


কোলাহলের এই উৎসবে অমৃতলাল ক্রমশ যেন নিস্তেজ হতে থাকে। কখন যে ভুলে বসে যায়, ট্রেনের কোন এক বগিতে ও চৈতন্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর স্টেশন এরপর স্টেশন চলে যাচ্ছে, হাজারো মানুষের ভিড়ে কেউ যেন তোয়াক্কা করছে না ওর কী দশা হতে চলেছে। ঠিক এই সময় জানালার ফাঁকফোকর দিয়ে ঘাসুড়ে  পোকাগুলো ট্রেনের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কানের কাছে এসে বনবন করতে শুরু করে। যে লোকটা এতক্ষণ হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎই ছিটকে গিয়ে ওর কাঁধের উপর গিয়ে পড়ল। অমৃতলাল মানুষের মুখগুলোই দেখছিল, খিদেতে পেটটা চোঁ চোঁ করে উঠল, সংগে জুড়ে গেল বাড়তি টেনশন। কখন যে গিয়ে ম্যাডান স্ট্রিটের উঁচু বাড়িটার চারতলার কাঁচের দরজার কাছে টুল নিয়ে বসে পড়ে মানুষের আসা-যাওয়ার হিসাব করবে আর প্রয়োজনে বেগতিক দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরাপত্তারক্ষীর ধর্ম পালন করবে, এই মুহূর্তে ফুঁড়ে বেরোল ওই চিন্তাগুলো। ক্ষণিকের জন্য হলেও এ ভাবনাটাও আসল – দেবদাসদা কেন যে এমন একটা জায়গায় এনে ঢুকিয়ে দিল? ধাক্কাটা আবারো গেট থেকে হামলে পড়ে পায়ে পায়ে লাথি খেতে খেতে অমৃতলালের শরীরে এসে ঝাঁপাল। মুখগুলো মুছে গেল, ঘরবাড়ি স্টেশন প্ল্যাটফর্ম উধাও হল, অফিসের জনজোয়ার সব উবে গেল চোখের নিমেষে। এরকমটাই বোধহয় হয়। কতগুলো লোকের চিৎকার চেঁচামেচিতে অমৃতলাল-এর কণ্ঠস্বর মিলিয়ে গেল হুই আকাশে। গুলির শব্দটা স্পষ্ট শুনতে পেল, ওর খাঁচার পাশ ঘেঁষে ছিটকে বেরিয়ে গেল যে। দুপাশ থেকে লোকজন বলে উঠল, 'গেল গেল গেল, ওই খাঁচাটাই  ভাঙল আর কি … মরা মানুষকেই মারতে হলো…পাগল নাকি…শহরে এরকম পাগল এখন রোজই আসছে…ওই মেয়েটাই শেষে…হায় হায় রে, যার গেল, তার গেল…রক্ত রক্ত, তাল তাল রক্ত.. কত রকমের পাগল যে হয়… এ দেশটা এখন পাগলের রাজত্ব…মাথার রোগ আছে বটে…। অমৃতলাল এই টুকরো-টাকরা কথার ভুবনে নিজেকে কখন যে জড়িয়ে ফেলে নিজেই জানে না। জন্ম মৃত্যুর মাঝখানের দেয়ালটা সাদা হয়ে গেলে ব্যবধানটা মুছে যেতে থাকে। তবে কি এই অনিশ্চল অবস্থাকেই মৃত্যু বলে? অনুভবটা কোন কষ্ট কল্পিত অবয়ব কিনা উত্তরটা ওকে খুঁজে বের করতেই হবে। কোনটা সত্য? ওর ফেলে আসা অতীত, না ঘটমান বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের নিরুত্তর ছবি। ভিআইপিদের গাড়িগুলো সাইরেন বাজিয়ে চলে যায়। কালচে হয়ে যাওয়া দেয়ালগুলো চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে থাকে মানুষের যাত্রাপথে কখন বেলাশেষের ছায়াগুলো এসে কোলাকুলি করবে। বৃষ্টিস্নাত গাছ-পাখিরা নেচে নেচে বেড়াবে। অমৃতলাল-এর খাঁচায় ঘটবে একরাশ ঘোমটা পরা অন্ধকার আর কৃত্রিম আলোর মুখ দেখাদেখি। দিগন্ত জোড়া মাঠে নাইবা হল চন্দ্রিমা আর সবুজ ঘাসের চুমুচুমি। শেষের বেলায় আবার কবে হবে এমন মিতালি। ঘরে তো ফিরে যাবে রাস্তায়  হেঁটে চলা অগণিত মানুষ, অনিশ্চিত জীবনে পা বাড়িয়েছে যারা, হেরে যাওয়া যাদের ভবিতব্য। কত কথাই না মনে আসে অমৃতলালের।


স্মৃতির ভান্ডারটা মস্তিষ্কের কোষে কোষে আবারো জ্যান্ত হয়ে উঠতে চাইল। হঠাৎই মনে হল হু হু করে কত ট্রাম বাস মিনিবাস ট্যাক্সি বেরিয়ে যাচ্ছে। ও কেন এমন একটা খাঁচার মতো গাড়িতে  চড়ে যাচ্ছে? ক্রিং ক্রিং করে শব্দ হল। কিছু কথার প্রতিধ্বনি কানের পর্দাটা ফাটিয়ে দিচ্ছে। কাদের এত কথা চালাচালি। দেবদাসদাকে কেউ যেন শাঁসাচ্ছে। হাতে পায়ে ধরে যেন কত উপরোধ, অনুরোধ ওর –'স্যার, আপনি চিন্তা করবেন না, ও ঠিক এসে যাবে। নিশ্চয়ই কোথায় আটকা পড়ে গেছে, অনেকটা দূরের পথ কিনা।' দেবদাসদা বারবার করে বলে দিয়েছে 'প্রথম দিন কাজে যাচ্ছিস, পৌঁছে যাবি কিন্তু ঠিক সময়ে। সময়ের এদিক ওদিক হলে সাহেব কিন্তু ছেড়ে কথা বলবেনা। কালকের মিটিংয়ে  কত  হোমরা চোমরারা আসবে, এ কথাটা মনে রাখিস। সত্যিই তো বাবু যদি বলে বসে, 'এখনো বেটার দেখা নেই। গায়ে তেল হয়েছে, ছাল ছাড়িয়ে যদি ডুগডুগি না বাজিয়েছি তো…..'। কথাগুলো বড্ড তেতো। কিভাবে যে কানের লতিটা ধরে আটকে দেয়। অমৃতলাল যখন বগির শেষ প্রান্তে এসে সেঁটে গিয়েছিল তখনো এই শাসানোর শব্দগুলো ওকে এসে জাপটে ধরেছিল। হাঁকডাক করেছিল যদি হাত বাড়িয়ে দরজাটা ছুঁয়ে ফেলতে পারে। কেউ কোনো সুযোগ করে দেয় নি। ট্রেনের গতিবেগ যখন আরো বেড়ে গেল, যেন নেই, নেই কিছু নেই, কেমন নিস্তেজ হয়ে গেল শরীর। শিরা উপশিরাগুলো চিচিং ফাঁক হয়ে দৌড়োদৌড়ি শুরু করল অন্দরে, ভেতরে যেন বয়ে চলল রক্তের স্রোত।


চলতে চলতেই গাড়িটা দুম করে কোন এক গর্তে এসে পড়ল। অমৃতলালের এখন কত তাড়া, না হলে যে দেবদাসদাও আস্ত রাখবে না। কত মানুষের কণ্ঠস্বর এসে এক জায়গায় জড়ো হল। গাড়িটা ঠেলে সরিয়ে দিতেই ছুটল তীব্র গতিতে। 'দেবদাসদার গলা না! কি যেন বলতে চাইছে। খানিকটা এরকম – হ্যাঁরে অমৃত, তুই এখন কোথায়? গেস্টরা আসতে আরম্ভ করেছে। ছি ছি, এইভাবে তুই আমার মান-সম্মান ডোবাচ্ছিস? কেন যে তোর নামটা আমি বলেছিলাম? আমার কপাল তো ফাটলই, সাহেবের রাগের পারদ যা চড়ছে, তোর মুণ্ডু না চটকায়।' সত্যি সত্যি শুনল তো! অমৃতলাল উত্তর দেওয়ার তাগিদে কিছুক্ষণ ছটফটালো, ভেতরটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো তোলপাড় হলো, শেষে গরুর মতো দেয়ালে মাথা ঘষটানোর ইচ্ছে হল, নিজেই নিজের চুল ছিঁড়তে চাইল। মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলোর ইতঃস্তত ওঠানামায় আর বুকের ধুকপুকানিতে যে হাতটাকে টেনে তুলবে, তা আর সম্ভব হল না। অগত্যা পা-টাকে ঝাঁকিয়ে নিজেকে জানান দিতে গিয়ে মনে হল কোথাও ভেসে বেড়াচ্ছে, ও কিছুতেই খাঁচাটা ছেড়ে এক পা-ও বেরুতে পারছে না। কত কথাই না মনে এলো।  গাঁয়ের ছাপোষা মানুষগুলো কি এমনি করেই সব খাঁচায় বন্দি হয়ে আছে? ওদের মুখে কারা যেন সেলুটেপ মেরে দিয়েছে, পিছমোড়া করে বেঁধে রেখেছে হাতগুলো। মুখের সামনে থালায়  ছড়িয়ে রয়েছে ফ্যানে ভাত, কাঁচা পেঁয়াজ আর লঙ্কা, খাবার মুখে তুলতে পারছে না। লোকগুলো যাবে কোথায়? ভয়ে সিঁটিয়ে আছে যে। কারা যেন হাতে বন্দুক ছোরা আর বোমা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে, দাবি দাওয়া অপূরণ হলেই ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করে দেবে, কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। ভয়ে জুজু হয়েই ছিল। হরু কাকার যুবতী মেয়েটা চোখের সামনেই নষ্ট হয়ে গেল, দরজা জানালা বন্ধ করে চুপটি করে বসে ছিল দশ-ঘর লোক। ওরা এতটাই চমকায় লাফায় ঝাপায় দাপায়,  জড়োসড়ো হয়ে জোড় হাত করে বসে থাকা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। নালিশ শোনার লোকগুলোই যে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। কী এক অদ্ভুত দৃশ্য! কোথায় যাবে এখন অমৃতলাল? ট্রেনের বগি আর এই খাঁচা যেন একই সূত্রে গেঁথে গেছে। খাঁচার ভেতরে ভেসে বেড়াচ্ছে সেই দৃশ্যটা– বুকে লাথি খেয়ে  গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে ফসফস করে। কারা যেন চ্যাংদোলা করে রেখে দিয়ে এল প্লাটফর্মে। অমৃতলালের বুকের ভেতর বেজে উঠছে কত রকমের বাজনা। সেই বাজনায় মেয়েটার অন্তর্ভেদী কান্নার শব্দ ভেঙেচুরে খান খান হয়ে যাচ্ছে – বাবা, ওরা আমার ইজ্জত লুটছে, আমার শরীর ছিঁড়ে খাচ্ছে, জানিনা প্রাণে বাঁচবো কিনা, তুমি একবার আসো না বাবা। এবারও খাঁচাটা জোরে জোরে দুলে উঠল, অথচ কারো নজরেই এলো না।


 খাঁচাটা ওকে নিয়ে আরো জোরে ছুটছে।  ওর চিন্তার দরজাগুলো সপাটে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রেল পুলিশের রাইফেল হাতে উর্দি পরা চেহারাগুলো একে একে একে জায়গা নিল ওর স্নায়ুতে। এবার পেছনের কোন এক যান থেকে শব্দগুলো ভাসতে ভাসতে এসে খাঁচার বাহিরে থেমে গেল – বাবা, ও বাবাগো।


কেন? কেন এমন রোদন? তবে কি ও…!


কেউ নেই, কেউ নেই এখানে। বুড়োকাকা নেই,মনু জেঠু নেই, ঝুনু কাকিমা, অন্তরা জেঠি, কেউ কোথাও নেই। কোথায় বা আছে দেবদাসদা? অমৃতলাল এখানে বড় একা। কেউ জানে না। ওর জীবনের স্পন্দনটা ওকে ঘিরে এখন গোল্লাছুট খেলছে। কে যেন ওকে জিজ্ঞেস করছে,'কিরে ভাত খাবি?'

খাব, খাব। দাও, দাও। শব্দগুলো নেই, আবার শব্দগুলো আছেও। শব্দগুলো জুড়ে জুড়ে আছে। কথা হবে, কথা হতে চাইছে, শুধুই অমৃতলাল-এর কথা – কই দাও। পেটটা চোঁ চোঁ করছে গো।

নে নে খা – মায়ের মুখ, বউয়ের মুখ, নিজের বছর-ষোলর মেয়েটার মুখ ভাসে।

খাঁচাটা ছুটছে ওকে নিয়ে। কোথায় যে নিয়ে চলে যাবে? ওরা জানে, কোথায় নিয়ে যাবে। আসলে কি জানে এই যাত্রার শেষ কোথায়?

ঘন কালো আকাশের মুখটা আরো গম্ভীর হয়ে গেল মুহূর্তে। আঁধার আঁধার। কোন দৃশ্য নেই। অদৃশ্যের সীমানায় আটকে গিয়ে শুরু হয়ে গেছে সকলের হাপিত্যেশ। সবকিছু চুরমার হয়ে যাচ্ছে। শুধুই কান্নার রোল। কেউ বলছে আমাদের বাঁচতে দাও, আমরা বাঁচতে চাই। বাঁচার অধিকারটুকু দাও হে গণদেবতা। ওরা মরতে গিয়েও বাঁচতে চায়, বাঁচাতে চায়। খাঁচাটা দ্রুত বেরিয়ে গেল।


অমৃতলাল-এর খাঁচাটা তখন দাঁড়িয়ে পড়েছে আর বলছে – বাবু আমি আসছি। গেটের পাশে টুলটায় আমি  বসে থাকবো, এক পা-ও নড়ব না। একটা স্বপ্ন এসে সবকিছু ভুলিয়ে দেয় মুহূর্তে – ওদের ছোট্ট গাঁ। গাঁয়ের মাঝে  কংক্রিটের রাস্তা, হাসপাতাল, কাজকারবারের রমরমা, স্কুলবাড়ি, বড় বড় পুকুর, ক্ষেত খামার, বাগানে বাগানে ছয়লাপ, সকলে ধেই ধেই করে নাচছে, মানুষে মানুষে কত তো কোলাকুলি, দুবেলা  ভরাপেট খেয়ে রাতের বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুম। অমৃতলালের চোখ জুড়ে গভীর নীরবতা , স্বপ্নগুলো সব ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। কে যেন কানে কানে এসে বলে যায় 'অমৃতলাল তোর সময় ফুরিয়ে এসেছে'। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কত মরা মানুষের মুখ। ওরা এক এক করে চুল্লিতে ঢুকে যাচ্ছে। গনগনে আগুনের বিরামহীন এই যাত্রাপথ। নিজের শরীরের পোড়া গন্ধটা ওর নাকের দুই পাশে এসে ঘুরঘুর করল, কখন সেঁধিয়ে যাবে।


অমৃতলাল চিৎকার করে উঠল – ও মাগো! আমি চাইনা, মানুষ হতে চাইনা আমি, আমি গাছ হতে চাই, বনে বনে হাওয়া হয়ে হাওয়ার সঙ্গে দুলতে চাই। বাঘ সিংহ আর হরিণের দেশে চলে যেতে চাই, সেটাই ঢের ভাল। কতকাল তো নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকা যাবে।


শোরগোলটা কাছাকাছি এলে কারা যেন কানাকানি শুরু করে দিল। অস্ফুট অনেক অজানা না-শোনা কথার উৎপত্তি হয়ে গেল মুহূর্তেই। শব্দের দাপটে অমৃতলালকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়, ওই রেলগাড়ির বগির সহযাত্রীরা যেমন করে ওকে পিষে দিয়েছিল কথার হুল ফুটিয়ে। অফিসের বাবু,  গ্রাম পঞ্চায়েত, যাত্রীদের মুখগুলো সব একই পংক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে ওকে কোণঠাসা করবে বলে। ওই তো দূরে ডোম দাঁড়িয়ে আছে। মুখের ভাবে ও উচ্চারণে ওর স্বাভাবিক আচরণ ডিঙ্গিয়ে জন্ম নিচ্ছে অন্য স্বর, অন্য সুর  – ওরে মানুষটা তো মরে নি, চোখের মনি ঘুরছে, হৃদপিণ্ডটা ধড়াস ধড়াস করছে। তোমরা বাপু জ্যান্ত লোককেই নিয়ে এসেছ। শেষে আমি কি পাপের ভাগী হবো?

অনাত্মীয়দের কর্তাব্যক্তি বলল, তুমি কি ডাক্তার নাকি হে যে মরা-বাঁচার নিদান দিচ্ছ? অতশত জানিনা, তোমার যা কাজ, তুমি তাই করো।

না। না। না। না। মরা মানুষ পোড়াই বলে আমি কি মানুষ নই! উপরওয়ালা এসে যদি জানতে চায়, কি জবাব দেব। 

আর মানুষ যদি প্রশ্ন করে? 'মানুষের অত প্রশ্ন করার মুরোদ নেই বাবু! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালিয়ে বাঁচে। তিন পুরুষের পেশা বাবু, সব নাড়ীনক্ষত্র আমি জানি। বেওয়ারিশ মাল তো, তাই কারো জ্বালা নেই। ডোম বলে কি মানুষ নই, আমারও একটা মন আছে। পারবো না বাবু,জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে মারতে।

অমৃতলালের খানিকটা হলেও স্বস্তি হল, বাঁচার ইচ্ছাটা আবার যেন চাগাড় দিয়ে উঠলো। বাইরে থেকে চুল্লির গনগনে আগুনের উত্তাপ ওর শরীর ছুঁয়ে গেলে জীবনের কাছে শেষবারের মতো ও ভিক্ষা চাইল। মনে মনে বলল, 'এবারের মত বাঁচিয়ে দাও ডোম বাবাজি'।

বাঁচবে তো, বাঁচতে তো তোমাকে হবেই। বউ ছেলে মেয়ের মুখ দেখবে না?

কথাটা শুনে অমৃতলালের বাঁচার সাধ জাগলো, চোখটা টানটান হলো। হৃদপিণ্ডটা আর পাঁচ জনের মতই সচল হয়ে চলতে শুরু করল যেন।

শুনতে পেল দেবদাসের সেই ডাক,'ওঠ, ওঠ, কিরে কাজে যাবি না, অমৃতলাল ?'

ঘর যাব গো, দেবদাসদা।


*******************************************************************************



শরদিন্দু সাহা

জন্ম:  ১৯৬০ এই পর্যন্ত প্রায় একশো কুড়িটার বেশি গল্প, দশটা উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্য মুদ্রিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, বাংলাদেশ মিলিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্যপত্রে লিখে চলেছেন। এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাহিত্যপত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন। ১৯৯৮ সালে 'কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার পুরস্কার' পান। ২০০৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত 'সোমেন চন্দ স্মারক' পুরস্কার পান। ওই বছরই কাটোয়া লিটিল ম্যাগাজিন মেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। 'ইন্ডিয়ান অয়েল' কর্তৃপক্ষ তাঁকে 'হল্ অব্ ফেম'-এ সম্মানিত করেন। ২০০৫ সালে 'ভাষা শহিদ বরকত স্মরণ পুরস্কার' পান। ২০০৭ সালে সাহিত্য আকাদেমি'র আমন্ত্রণে গৌহাটিতে বাংলা-অসমিয়া গল্পকার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। প্রসার ভারতীর আমন্ত্রণে বিভিন্ন সাহিত্য সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। ২০১৩ সালে 'আমি সারা বাংলা কবিসভা' কর্তৃক সংবর্ধিত হন।

প্রকাশিত গ্রন্থ : উপন্যাস--উজানি মঙ্গল * নিষ্ক্রমণ * ভিটে মাটি *  চরণামৃত * মাটির মানুষ *  একটি শব্দের জন্য *  শব্দ কাঙাল * শব্দ-নৈঃশব্দ্য * আত্মগত আর্তনাদ * অনাত্মীয় আলাপন

    উপন্যাস সমগ্র ১

    উপন্যাস সমগ্র ২       

গল্প গ্রন্থ ---মেঘজীবন *  গুনাহর পটভূমি * চৈতন্য প্রাঙ্গণ *  পোস্টমর্টেম * হাওয়া বদলে যায় *  রোদপাখি

   গল্প সংগ্রহ

        


       

 



          


       




      



        

 


            


অণুগল্প * সোমা মুখোপাধ্যায়



ণুগল্প সাহিত্যের একটি বিস্ময়কর শাখা। ' বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন ?' ঠিক তাও নয় যেন, বিন্দুতে সপ্তসিন্ধু দশ দিগন্ত চকিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সার্থক অণুগল্পে। তেমনই একটি অসাধারণ অণুগল্প এবার আমরা পড়ছি ,সোমা মুখোপাধ্যায়-এর কলমে -----


গ্রাম্য মুহূর্তরা

সোমা মুখোপাধ্যায়


অনেকদিন আগের কথা আমরা তখন খুব ছোট ।গ্রামে আমাদের একটা বাড়ি ছিল ।আমার দাদু শহরের কোলাহল ছেড়ে মাঝে মাঝেই সেখানে গিয়ে থাকতেন ।আমরা বছরে দুবার যেতাম ।গরমের ছুটির সময় আর পুজোর ছুটির সময়। খুব মনে পড়ে ওখানে তখনও কোন বাড়িতেই ইলেকট্রিকের আলো ছিল না ।শুধু বড় বড় রাস্তাগুলোতে আলো জ্বলতো। সন্ধ্যের পরই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসত।পূর্ণিমারত থাকলে তখন আশপাশের সবকিছু দেখা যেত। পাশের বাড়িতে যেতেও হারিকেন নিয়ে যেতে হতো। এমনকি রাস্তা দিয়ে যে লোক গুলো যেত তারাও হারিকেন হাতে করে নিয়ে যেত ।তবে হালকা আলোয় লোকগুলোকে দেখা যেত না।সন্ধ্যেবেলায় আমরা বাইরের বারান্দায় একসাথে বসে দাদুর কাছে গল্প শুনতাম। 

রাস্তা দিয়ে লোক গেলে দাদু জিজ্ঞাসা করতো, " কে যাও "

ওরা নিজেদের নাম করে বলত "আজ্ঞে, আমি যাই কর্তা ।"

দিনগুলো যেন মনের ক্যানভাসে আজও উঁকি দেয়।


************************************************************************************************




সোমা মুখোপাধ্যায়

গল্প,কবিতা ও নাটক লেখেন । ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ। বাংলা সাহিত্য নিয়েই পড়াশোনা। "অথপথ "পত্রিকার সহ সম্পাদক হিসাবে কাজ করেন । সোমার একটি শ্রুতিনাটকের দল আছে। শ্রুতিনাটক লেখেন ও নির্দেশনা দেন ।


অণুগল্প * মানসী কবিরাজ



ণুগল্প সাহিত্যের একটি বিস্ময়কর শাখা। ' বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন ?' ঠিক তাও নয় যেন, বিন্দুতে সপ্তসিন্ধু দশ দিগন্ত চকিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সার্থক অণুগল্পে। তেমনই একটি অসাধারণ অণুগল্প এবার আমরা পড়ছি ,মানসী কবিরাজ-এর কলমে -----


উপশম

মানসী কবিরাজ



নিজের নামে সে প্রোফাইল  খুলতে পারেনি । পারেনি , কারণ জন্মবাহিত গুচ্ছ গুচ্ছ অন্ধকার তাকে সেই ছোট থেকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে যায় আরও এক অন্ধকার  টানেলের দিকে।


      ইস্কুলের পরীক্ষায় ক্রমশ পিছিয়ে যাওয়ার অন্ধকার , টিউশনে ফিরোজা কুর্তি মেয়েটির পাত্তা না পাওয়ার অন্ধকার , ভালো  কলেজে ভর্তির সুযোগ না পাবার অন্ধকার , চাকরী না হওয়ার অন্ধকার , বোনের বিয়ে না দিতে পারার অন্ধকার , মায়ের চোখের জলের অন্ধকার , বাবার হাহুতাশের অন্ধকার…  অন্ধকার অন্ধকার আর অন্ধকার । ধূধূ তেপান্তরের মাঠের মতো ঠাসা শুধুই অন্ধকার


      অথচ তার প্রতিটি আঙুলের ভাঁজে  ভাঁজে , না কোনও নিকোটিন শিখা নয় সত্যি সত্যি  আলোর আগুন লেগে ছিল , যেন সে নিজেই এক আস্ত চকমকি পাথরের স্তূপ । তবু বন্ধু নেই তার কোনও । এমনকি ইথার তরঙ্গের অনন্ত দেয়ালেও সে নিজের নামে কোনও প্রোফাইল খুলতে পারেনি । নিজেরই আগুনে নিজেই জ্বলে পুড়ে খাক  হয়ে যাওয়ার অন্ধকার তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় নিজেরই কাছ থেকে । অথচ তার ভিতরে কিন্তু আগুন ছিল । আগুন ছিল প্রতারণা না করার , আগুন ছিল মিথ্যে না বলার , আগুন ছিল ছলে বলে কৌশলে শুধু নিজের স্বার্থ সিদ্ধ না করার ……  আর তার ভিতরের সেসব  সত্যি সত্যি আলোর আগুন জমতে জমতে জমতে জমতে টলমল করে ওঠে তার চোখের গলুই ।


         শেষে যখন ঘুলঘুলি  চুঁইয়ে আসা বাতাসও ফিকে হয়ে যায় , সে একদিন প্রোফাইল খোলে ইথার দেওয়ালে । না নিজের নামে নয় । সে প্রোফাইল খোলে ‘ নিঃসঙ্গ চোখের জল ‘ এই ছদ্ম আবহে । আর ঠিক তখনই , ঠিক তখনই তার প্রোফাইলে প্রথম  বন্ধুত্বের  অনুরোধ আসে যে তরঙ্গ থেকে তার নাম ‘ তোমাকে আশ্রয় দিলাম’




************************************************************************************************



 মানসী কবিরাজ

জন্ম বহরমপুরে। পড়াশোনা মালদা এবং কোলকাতা মিলিয়ে মিশিয়ে। পেশায় সরকারি আধিকারিক। চাকরি সূত্রে  শিলিগুড়ি এবং  এখানেই স্থায়ী বসবাস।পছন্দ বই সিনেমা বাগান আড্ডা এবং ভ্রমণ। লেখালিখি বানিজ‍্যিক পত্রপত্রিকায়  এবং  লিটল ম‍্যাগাজিনে। প্রকাশিত কবিতার বই --পতঝড়  এবং অনন্ত সাঁতারের ক্লাস।


অণুগল্প * দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়


ণুগল্প সাহিত্যের একটি বিস্ময়কর শাখা। ' বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন ?' ঠিক তাও নয় যেন, বিন্দুতে সপ্তসিন্ধু দশ দিগন্ত চকিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সার্থক অণুগল্পে। তেমনই একটি অসাধারণ অণুগল্প এবার আমরা পড়ছি ,দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়-এর কলমে -----



বাঁচার ঠিকানা

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়


মনখারাপের মহল সারা ষ্টেশন জুড়ে। প্রতিদিনের সেই চিৎকার ,ব্যস্ততা উধাও। সকলের গলায় আটকে থাকা কান্নার ছটফটানি।কাজে মন নেই কারো। ঠাকুমার জন্য সকলের চোখে জল !

          ষ্টেশনের অঘোষিত অভিভাবক 'ষ্টেশন ঠাকুমা'। ঠাকুমার ইতিহাস কেউ জানে না। শুধু জানে ঠাকুমার মমতাময়ী আঁচল সারা ষ্টেশন জুড়ে।কোন অন্যায়,পাপ আর নয়। ষ্টেশন মাষ্টার,রেল পুলিশের বড়বাবু,হকার, নিত্যযাত্রী সকলেই খুশি। ষ্টেশনের নোংরা আবর্জনা সাফ হয়ে এক শান্তিনিকেতন যেন ! হকারদের কাছ থেকে তোলা চাওয়া নেই। রাতে মদ খেয়ে ষ্টেশনে অসামাজিক কাজকর্ম নেই। হঠাৎ এদিক ওদিক দোকান দিয়ে যাত্রীদের অসুবিধা করা নেই।রেলপুলিশের কাজ গেছে কমে। তবে রেল পুলিশ ঠাকুমার সুরক্ষায় সদা সতর্ক। তবুও এলাকার অপরাধ জগতের স্বঘোষিত বাদশা গালকাটা বিল্টুর হাত থেকে ভাগ্যের জোরে দুবার বেঁচেছে ঠাকুমা।

           ঠাকুমা ষ্টেশনের বাচ্চাগুলোকে আলোর পথ দেখিয়েছে।বোতল বিক্রির টাকায় ডেনড্রাইটের নেশায় আসক্ত বাচ্চাদের মনে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছে প্রাণের প্রৈতিতে। ছেলেমেয়েগুলো এখন সকাল সন্ধেয় পড়াশোনা করে ঠাকুমার কাছে। ওদের গলায় " আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে" সত্যিই ষ্টেশনে প্রাণের পরশ এনেছে। ছেলেমেয়েগুলো বেড়ে উঠছে এক আনন্দময় পরিবেশে।রেলপুলিশ খুশি। বড়বাবুর উদ্যোগে রেল কোয়ার্টারের পিছনে পরিত্যক্ত দুটো ঘর মেরামত করে বাচ্চাগুলোর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। ঠাকুমা নাম দিয়েছে ' জীবনের আশ্রয়' ! ষ্টেশনে এক অন্তর্লীন ভালোবাসার বন্ধন গড়ে উঠেছে একটু একটু করে। বড়বাবু ও ষ্টেশন মাষ্টারের সাহায্যে বাচ্চাগুলোর দুবেলা খাবার, জামাকাপড়ের ব্যবস্থা হয়েছে।'গুড আর্থ' নামে কলকাতার এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাচ্চাগুলোর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছে।এক আলোমুখী ভবিষ্যতের দিকে বাচ্চাগুলোকে নিয়ে চলেছে ষ্টেশন ঠাকুমা বনস্পতির ছায়া হয়ে।

           বিল্টুর রাগ ওখানেই।আগে ষ্টেশনের বাচ্চাগুলোকে বোতল কুড়োনো, নেশা ধরানো, ছোটখাটো অপরাধের কাজে লাগাতো ও। সেই 'সাপ্লাই লাইন' এখন বন্ধ ঠাকুমার সৌজন্যে।যে কাজ রেলপুলিশ দীর্ঘদিন করে উঠতে পারেনি,তা ঠাকুমা একাই বাচ্চাগুলোকে ভালোবেসে করে চলেছে। মৃত্যুর পরোয়া নেই।এই শেষ বয়সে এসে জীবনকে আঁকড়ে ধরা আষ্টেপৃষ্ঠে। মুচকি হেসে মাঝে মাঝে বলে :"পৃথিবীতে এসেছিস যখন,দাগ রেখে যা"!

মুগ্ধতার রেশ তখন সকলের মনে।

          আস্তে আস্তে ঠাকুমার কাছে বাচ্চার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ডেনড্রাইটের নেশায় আসক্ত বাচ্চাদের জীবনমুখী করার প্রয়াসে রেল পুলিশ ঠাকুমার নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে নিয়ে আসে। ওদের মধ্যে বাঁচার নেশা জাগিয়েছে ঠাকুমার ভালোবাসা।আর কোনরকম পাপকাজ নয়,আগুন চোখে ওদের অঙ্গীকার।এই জায়গাতেই বিল্টুর রাগ দিনে দিনে বাড়ছে।আগে ষ্টেশনের বড়ো মেয়েগুলোকে বিল্টু দেহব্যবসায় নামাতো জোর করে ।সেটাও এখন পুরোপুরি বন্ধ ঠাকুমার সতর্ক প্রহরায়। কিছুদিন হলো চাঁপা বলে মেয়েটিকে বিল্টু বিরক্ত করছে খুব।ওর ঠাগর শরীর বিল্টুকে লোভী করে তুলেছে ।

         কাল সন্ধ্যায় ঘটনাটা ঘটলো। ষ্টেশনে বাচ্চাগুলোর পড়াশোনা চলছে ঠাকুমার কাছে। চাঁপা একটু বাইরে গেছে প্রকৃতির ডাকে। অনেকক্ষণ হলো চাঁপা আসছে না। ঠাকুমার উদ্বিগ্ন মুখ। হঠাৎ একটা ছেলে খবর দিল বিল্টুর ছেলেরা চাঁপাকে তুলে নিয়ে গেছে বাঁধের ধারে। ঠাকুমা বুঝলো সব। পাশে পড়ে থাকা লোহার রড তুলে ছুটলো আগুন চোখে। পিছনে পিছনে বাচছাগুলোও চললো।রেলপুলিশে খবর দিল ষ্টেশনের হকাররা।

        ঠাকুমা বাঁধে গিয়ে দেখলো চাঁপা প্রায় উলঙগ। বিল্টুর দুই সাগরেদ চাঁপাকে শক্ত করে মাটিতে চেপে ধরেছে। বিল্টু ওকে জোর করে ধর্ষণ করার চেষ্টা করছে। ঠাকুমা দিগ্বিদিক জ্ঞান শূণ্য হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওদের ওপর। লোহার রড দিয়ে লাগাতার আক্রমণ চালাতে লাগল ওদের। ঠাকুমা যেন রণ চন্ডী তখন ! ঠাকুমার হঠাৎ আক্রমণে ওরা দিশেহারা।এই শীর্ণকায় মানুষটার গায়ে এতো জোর ওরা ভাবতেও পারেনি। বিল্টুর সঙ্গী দুজন মাটিতে পড়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। বিল্টু উঠে ছুরি নিয়ে ঠাকুমাকে আক্রমণ করতে গেলেই ঠাকুমা শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে লোহার রড বসিয়ে দিল বিল্টুর মাথায়। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো। ছিটকে পড়লো বিল্টু ।কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করতে করতে আস্তে আস্তে নেতিয়ে গেল ও। প্রায় অচৈতন্য চাঁপার শরীর নিজের আঁচলে জড়িয়ে ঠাকুমা চললো 'জীবনের আশ্রয়ে'।

           রেলপুলিশ এলো। বিল্টু ও দুই সাগরেদকে হাসপাতালে পাঠালো তৎক্ষণাৎ। বিল্টুর শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হয়েছে প্রচুর। বাঁচার আশা কম। বড়বাবু দুহাত তুলে কান্না ভেজা চোখে বিল্টুর জীবন প্রার্থনায়। বিল্টু বেঁচে গেলে ঠাকুমা খুনের হাত থেকে বেঁচে যাবে। নাহলে, বাচ্চাগুলো 'মা' হারা হবে ! ওদের বড়ো হবার স্বপ্ন ভেসে যাবে ! এই প্রথম সকলে দেখলো এক কুখ্যাত অপরাধীর প্রাণ বাঁচাতে রেল পুলিশ প্রার্থনায় !









******************************************************************************



দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় 


  রয়েল কমপ্লেক্স ,কাঠালবাগান ,উত্তর পাড়া, হুগলী থেকে লিখছেন পেশা: শিক্ষকতা ,নেশা : কলম চারিতা ,সাপলুডো খেলা শব্দ নিয়ে ,অণুগল্প ,ছোট গল্প ,কবিতা, প্রবন্ধে  সুখ-দুঃখ ,হর্ষ-বিষাদ, আড়ি ভাবের অনুভবে থাকা ,জীবনের দুই স্তম্ভ রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দের আদর্শ মনন, যাপন ও শীলনে.. স্বপ্ন: পৃথিবীকে ভালবাসার যৌথ খামার বানানো..দিক চক্রবালে হিরণ্যগর্ভ আলোর খোঁজ ..পাখি ,গাছ আকাশের সাথে মন কি বাত.. সূর্যের নরম আলোয় সুখের আবিরে মানুষের সাথে হোলি খেলা..

            

অণুগল্প * শুভাশিস ঘোষ



ণুগল্প সাহিত্যের একটি বিস্ময়কর শাখা। ' বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন ?' ঠিক তাও নয় যেন, বিন্দুতে সপ্তসিন্ধু দশ দিগন্ত চকিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সার্থক অণুগল্পে। তেমনই একটি অসাধারণ অণুগল্প এবার আমরা পড়ছি ,শুভাশিস ঘোষ-এর কলমে -----

       

বিলম্বিত প্রেম

শুভাশিস ঘোষ 



পাঁচটা বাজতে এখনো মিনিট আষ্টেক বাকি। সবার আগে সাইকেল নিয়ে সোজা মিলের গেটে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল রতন। ঠিক পাঁচটায় বাজবে সাইরেন, তার পর খুলবে গেট। এক শিফটের লোক ঢুকবে, অন্য শিফটের ছুটি। চটকলের কাজের শিফটের একটা বিশেষ রীতি আছে। এক টানা আট ঘন্টার বদলে দু'খেপে শ্রমিকেরা যাতায়াত করে। এ শিফটের ছুটি পাঁচটায়। আজ হপ্তার দিন। পকেটে হপ্তার টাকা, এক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল, হা পিত্যেস করে দাঁড়িয়ে রতন। কখন বাজবে পাঁচটা। সাইরেন বাজতেই রতনের বুকের মধ্যে একটা ঢেউ খেলে গেল। বুঝি অবসান ঘটল এক অনন্ত অপেক্ষার ।


গেট খুলতেই হুড়োহুড়ি। এক বিচিত্র কৌশলে অন্যদের পিছনে ফেলে সবার আগে বাইরে আসে রতন। আজ হপ্তাবাজার। চটকলে হপ্তার দিনে মিলের গেটে বসে অস্থায়ী বাজার। অনেকটা সাপ্তাহিক হাটের মতো। রতন জানে কাজলি কোথায় দোকান সাজায়। এগিয়ে চলে কাজলির দোকানের দিকে। কাল ছিল উল্টোরথ। আজ মধুময়রার গরম জিলিপি কাজলিকে খাওয়াবার ইচ্ছেটা এক সপ্তাহ ধরে মনে পুষে রেখেছে রতন। সপ্তাহে এক দিন মাত্র কিছুক্ষণের জন্য একটু দেখা, দুটো চারটে সাধারণ কথাবার্তা হয় কাজলির সাথে। তাই হপ্তার দিন সকাল থেকেই মনটা একটু লাবডুব লাবডুব করে বৈকি । গত সপ্তাহে কাজলি লজ্জার মাথা খেয়ে একটা কথা অবশ্য বলেছিল রতনকে। এড়িয়ে গেছে সে। আজ খদ্দেরের চাপ কমলে গরম জিলিপি খেতে খেতে উত্তরটা দেবে রতন। সাত দিন ধরে মনে মনে রিহার্সাল করছে সে। আজ ফাইনাল ষ্টেজ। তাই একটু ভালো লাগা, একটু উৎকন্ঠা মেশানো অনুভূতি নিয়েই হাজির হল কাজলির দোকানের সামনে। রেডিমেড জামা কাপড়ের দোকান। বেশ ভিড় লেগেছে আজ। দুটো দোকানের ফাঁক দিয়ে পিছনে গিয়ে সাইকেলটা ঠেকালো শিউলি গাছের গায়ে। অনুসন্ধানী চোখ দুটো খুঁজছে কাজলিকে। কিন্তু সে কোথায় ? আজ দোকান দিয়েছে ঘেঁটু। কাজলির মাসির ছেলে। আগে দু একবার ঘেঁটুকে অবশ্য দেখেছে রতন। কিন্তু কাজলি কোথায় ?

ভিড় বাড়ছে দোকানে। দু'হাতে খৈনি ডলে আর দুচোখে কাজলিকে খুঁজে চলে রতন। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে এ দোকান একাই সামলায় কাজলি। যে দিন যে মিলে হপ্তা সেখানেই চলে ওর ভবঘুরে দোকান। মেয়েটা একাই সাইকেল চালিয়ে এদিক ওদিক দোকান নিয়ে ঘোরে। অবশ্য এই ভবঘুরে দোকানদারদের একটা দল আছে বটে। প্রতি সপ্তাহেই মিল থেকে বেরিয়ে রতন একটু জিরিয়ে নেয় এই শিউলি গাছের তলায়। প্লাষ্টিকের ছাউনীর নিচে বসে দোকান সামলায় কাজলি। ভিড় বাড়লে মাঝেমধ্যে দোকানে একটু হাত লাগায় রতন। বেশিরভাগ দিনই খাস্তা বিস্কুট আর চায়ের খরচ মেটায় রতন। মাঝেমধ্যে বাড়ি থেকে মোচার ঘন্ট, লাউ চিংড়ি নিয়ে আসে কাজলি। দোকানে খদ্দের কমলে একটু গল্পসল্প করে দুজনে। মামার বাড়ির পাশেই যে থাকে ওরা। কাজলিদের মা-মেয়ের সংসারে পুরুষ বলতে কেউ নেই। তাই একটু কর্তব্য করে রতন। ভিড় কমতেই রতন বলে, "ও ঘেঁটু, কাজলি কোথায় রে ?"

- ওমা তুমি জানুনি ? কাজলি দিদির তো কাল বে হয়ে গেল গো । এবার থেকে এ দোকান আমি দেকবো। ওর আর দোকান করার দরকার নেই গো। ওর বরের কোটাবাড়ি, বড়ো ব্যওসা!

বুকের ভিতরে যেন সজোরে ধাক্কা দিল কে! কিন্তু কেন ? রতন তো কোনো দিন কাজলিকে মনের কথা কিছু বলনি। বরং গত সপ্তাহে কাজলিই বলেছিল,"রতনদা, তুমি বিয়ে করছো না কেন ?" কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল হেসেছিল রতন। ঘেঁটু জানায় কাজলির বাবার অসুখের সময় ছ'হাজার টাকা ধার দিয়েছিল রেশন ডিলার তিনকড়ি। গত বছর তার বউটা মরেছে করোনায়। সাত বছরের মেয়েকে তার মামার বাড়িতে পাঠিয়ে কাজলির মাকে তিনকড়ি ঋণ মকুবের প্রস্তাব দেয়। তারপর ...


পিছনের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে চোখ তুলে শিউলি গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে রতন। চোখ দুটো  ঝাপসা হয়ে আসে। আকাশে ক্রমশ কালো হচ্ছে মেঘ। বৃষ্টি আসবে একটু পরেই। হঠাৎ মৃদু স্বরে স্বগক্তি করে রতন, "একটু দেরি হয়ে গেল"।


******************************************************************************************



শুভাশিস ঘোষ 

জন্ম ২৫ আগষ্ট ১৯৬৬। বেড়ে ওঠা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার শিল্পশহর বজবজে। বানিজ্য বিভাগে স্নাতকোত্তর, ইনস্টিটিউট অব কষ্ট এন্ড ওয়ার্কস এ্যাকাউন্টেট অব ইন্ডিয়ার স্বীকৃত পেশাদার। পেশা সূত্রে বিভিন্ন কর্পোরেট হাউজ ঘুরে বর্তমানে রিলায়েন্স জিও-তে কর্মরত। দক্ষিণ বঙ্গের সংবাদ সাপ্তাহিক 'বার্তা এখন'-এর প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বে ২০০২ থেকে। সংবাদ প্রতিবেদন, প্রবন্ধ, রম্যরচনায় বিচরণ তিন দশকের ওপর। ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা,ছড়ায় সমৃদ্ধ লিটলম্যাগ সহ বিভিন্ন বানিজ্যিক পত্র-পত্রিকা। প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন একটি, গল্প সংকলন দুটি। 'শিল্পের জন্য শিল্প' নয়, 'মানুষের জন্য শিল্প'তে পূর্ণ বিশ্বাস। তাই কঠিন বাস্তবের মাটিতে পা রেখেই সাহিত্য চর্চা।