শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২

রম্যরচনা * দেবাংশু সরকার



কালাচাঁদের সিদ্ধিলাভ

দেবাংশু সরকার


                        এক

আবার পুজো এলো। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে  মানুষের ভিড়। ছেলে বুড়ো সবাই পুজোর আনন্দে মেতে উঠেছে। কিন্তু কালাচাঁদের মনে কোনো শান্তি নেই, কোনো  আনন্দ নেই। 

      দেখতে দেখতে এক বছর হতে চললো। দুর্গাপুজোর পর কালীপুজো, তার কদিন পরেই কার্তিক পুজো। অর্থাৎ বছর ঘুরতে আর বেশি বাকি নেই। অথচ কালাচাঁদ যেন কিছুতেই সেই দিনটাকে, বিশেষ করে সেই রাতটাকে ভুলতে পারছে না। যতক্ষণ দোকানের কাজে ব্যস্ত থাকে বেশ ভালো থাকে। কিন্তু কাজের অবসরে যখন সে একা থাকে, তখন উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে গত বছরের সেই রাতটার কথা।   ভাবতে ভাবতে হারিয়ে যায় সে! কোথায় যেন হারিয়ে যায়!

   কালাচাঁদ মিত্তিরের জীবনে কোনো কিছুরই অভাব নেই। সে একজন সফল ব্যবসায়ী। তার মুদিখানা দোকানের ব্যবসা ক্রমশ ফুলে ফেঁপে উঠেছে। কয়েক বছর হল সে একটা তেলের ঘানি খুলেছে। সেটাও দিনে দিনে লাভ জনক হয়ে উঠেছে। তার ব্যাঙ্কের খাতাগুলোতে টাকার পাহাড় তৈরি হয়েছে। কালাচাঁদ টাকার ব্যাপারে বেশ হিসেবী। নিন্দুকেরা অবশ্য তাকে হাড় কিপটে বলে। পারিবারিক দিক দিয়েও সে বেশ সুখী। দুই উচ্চ শিক্ষিত ছেলের বাবা সে। বড় ছেলে রবীন ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে একটা বহুজাতিক সংস্থায় চাকরি করে। কিছু দিনের মধ্যেই সে বিদেশে পাড়ি দেবে। তার বিয়েও হয়েছে। ছোট ছেলে রমিত ডাক্তারী পড়ছে। তারও ভবিষ্যত উজ্জ্বল। 

      পরিবার নিয়ে, ছেলেদের নিয়ে কালাচাঁদের কোনো চিন্তা না থাকলেও একটা দুশ্চিন্তা তার মনের মধ্যে কাঁটার মত বিঁধে রয়েছে। এতবড় ব্যবসা, সমুদ্রের ঢেউয়ের মত টাকা আসছে, কিন্তু এর ভবিষ্যত কি? কালাচাঁদের বয়স বাড়ছে। ষাট পেরিয়ে গেছে বেশ কয়েক বছর আগেই। তার অবর্তমানে কে দেখবে এই ব্যবসা? তার উচ্চ শিক্ষিত দুই ছেলের কোনো আগ্রহ নেই এই ব্যবসাতে। রবীনতো কিছু দিন পরেই বিদেশে যাবে। আর রমিত কি ডাক্তার হয়ে মুদি দোকানের দাঁড়ি পাল্লা ধরবে! এই একটা চিন্তা কালাচাঁদকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

       আজ মহাসপ্তমী। কিন্তু পুজোয় মেতে ওঠার মানসিকতা কালাচাঁদের আর নেই। কর্মচারীদের ছুটি দিয়ে সে একা বসে আছে তার দোকানে। ফাঁকা দোকান। কোনো খদ্দের নেই। একা বসে থাকতে থাকতে আবার তার মনে পড়ে যাচ্ছে গত বছরের কথা।  গত বছরে  পুজোর পর কালাচাঁদ একটা ফিসফিসানি শুনতে পায় যে, রবীনের বন্ধুরা কার্তিক পুজোটা একটু ভালোভাবে এনজয় করতে চায়। এবার তারা নববিবাহিত রবীনের বাড়িতে কার্তিক ঠাকুর ফেলবে। হাড় কিপটে কালাচাঁদ শুনেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। তার হাড় মাস কালি করা খাটুনির টাকায় ভুত ভোজন হবে! এটা সে কিছুতেই মানতে পারছে না। পরে যখন মাথা ঠান্ডা হয় তখন অন্য কিছু তার মাথায় আসে। চুপ করে যায় সে। হাসি মুখে মেনে নেয় রবীনের বন্ধুদের পরিকল্পনা। এমনকি ঠাকুর আনা, পুরুত ডাকা, পুজোর আয়োজন, অতিথি আপ্যায়ন যাতে সুচারু রূপে হয় তার পরামর্শ সে দেয় রবীনের বন্ধুদের।

      মহা ধুমধামে কার্তিক পুজো হলো কালাচাঁদের বাড়িতে। হাসি মুখে অতিথি আপ্যায়ন করলো সপুত্র কালাচাঁদ। অনেক রাত অবধি চললো খাওয়া দাওয়া, হৈ হুল্লোড়, গান বাজনা। প্রায় মধ্যরাতে এক এক করে বিদায় নিলো অতিথিরা। ক্রমশ বাড়ি ফাঁকা হল।

      ক্লান্ত অবসন্ন কালাচাঁদের বাড়ির সদস্যরা যে যার ঘরে ঘুমোতে গেল। কিন্তু কালাচাঁদের চোখে ঘুম নেই। ধীর পায়ে সে ঢুকল পুজো মন্ডপে, পদ্মাসনে বসে, সে ঘোর তপস্যা করতে লাগলো, "ভগবান, লোকে  আমাকে কিপটে বলে। কিন্তু সত্যিই কি আমি কিপটে? আমার দুই ছেলেকে আমি লেখা পড়া শিখিয়ে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার তৈরি করলাম আমার রক্ত জল করা খাটুনির টাকায়। তারা বড় হল, মানুষ হল কিন্তু আমার সাধের ব্যবসার দিকে ঘুরেও তাকালো না। সেই ছোট থেকেই আমি কি অমানুষিক পরিশ্রম করেছি। এক একটা টাকার হিসেব নিকেষ করেছি তাই আমাকে লোকে কিপটে বলে। কিন্তু ভগবান আমি কি সত্যই কিপটে? তোমার পুজোয়, তোমার আরাধনায় কি আমি কোনো রকম কার্পণ্য করেছি? শুধু টাকা খরচ নয়, আমি নিষ্ঠার সঙ্গে উপবাস করে তোমাকে অঞ্জলি দিয়েছি। ওরা তো  সব খেতে আর ফুর্তি করতে এসেছিলো। ওদের মধ্যে আমার মত কোনো নিষ্ঠা ছিল না। ভগবান আমি তোমার শ্রেষ্ঠ ভক্ত। আমাকে বরদান কর।"


                           দুই

      রাজ সভা বসেছে স্বর্গলোকে। রাজ সিংহাসনে বসে আছেন দেবরাজ ইন্দ্র। অনান্য দেবতারাও যে যার আসন অলংকৃত করে বসে আছেন। হঠাৎ দেব সেনাপতি কার্তিক উঠে দাঁড়িয়ে দেবরাজকে বললেন, "দেবরাজ আমাকে অনুমতি দিন, আমাকে এখনই মর্ত্যলোকে যেতে হবে।'" 

      কিছুটা অবাক হয়ে দেবরাজ প্রশ্ন করলেন, "কেন দেব সেনাপতি? মর্ত্যে কি অসুরেরা আবার অত্যাচার শুরু করেছে? তুমি কি সেনাদল নিয়ে মর্ত্যে যাবে?"

     ময়ূর বাহন দেবরাজকে আশ্বস্ত  করে বললেন, "না রাজন, আমি যুদ্ধে যাচ্ছি না। এখন আর যুদ্ধের পরিস্থিতি নেই। কারন অসুরদের রাজা মহিষাসুরের মনে আর কোনো যুদ্ধের বাসনা নেই। তাছাড়া সে খুব অসুস্থ। বুকের যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে।"

      অত্যন্ত উদ্বীগ্ন হয়ে দেবরাজ প্রশ্ন করলেন, "কি হয়েছে আমার প্রিয় মহিষের?"

      কার্তিক ঠাকুর উত্তর দেন, "আমি বিশেষ কিছু জানি না। দেব বৈদ্য অশ্বিনী কুমার যথাযথ  উত্তর দিতে পারবেন।"

      দেবরাজ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন দেব বৈদ্যের দিকে।

      দেব বৈদ্য বলতে থাকেন, "রাজন, মহিষের অসুখ অতি পুরানো। মা দুর্গা মহিষকে ত্রিশূল দিয়ে আঘাত করার পর তাকে অমরত্ব প্রদান করেন। ফলস্বরূপ তার আঘাত অমর হয়ে যায়। সেই আঘাতজনিত ঘা আর শুকোয় নি। এখনো  রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে। যখন মহিষ আমার ডিস্পেনসারিতে এলো, প্রথমে ওর ইনজুরিটা দেখে  বিনাইন মনে হলেও, ওটা ম্যালিগন্যান্ট ছিল। পরে পজিটিভ কার্সিনোমাতে টার্ণ করে। অমরত্ব লাভের ফলে মহিষ জীবিত থাকলেও ক্যান্সারের ফোর্থ স্টেজের যন্ত্রণাটা সহ্য করতে হচ্ছে।"

      হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দেবরাজ বলেন, "দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বল না। যে ভাষা আমার বোধগম্য সেই ভাষা প্রয়োগ কর।''

      হাত জড়ো করে অশ্মিনী কুমার বলতে লাগলেন, "ক্ষমা করবেন  রাজন। স্বর্গলোকে অমৃতের কারনে চিকিৎসা বিদ্যা প্রয়োগের সুযোগ খুব কম । সেই হেতু আমি অবসর সময়ে  ছদ্মবেশে মর্ত্যে গিয়ে ওখানকার চিকিৎসালয়গুলোতে ঘুরে বেড়াই। ওদের চিকিৎসা পদ্ধতি দেখি। ওদের কথাবার্তা মন দিয়ে শুনি। সেই কারনে  ওদের ভাষাতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। যাইহোক মহিষের আঘাত প্রথম থেকেই জটিল ছিল। পরে কর্কট রোগে পর্যবসিত হয়। মর্ত্যলোকের কেউ হলে বহু পুর্বে পরলোক গমন করতো। অবশ্য মহিষের ব্যাপারটা স্বতন্ত্র।


       অশ্মিনী কুমার থামার পর দেব সেনাপতি বলতে শুরু করলেন, "আমার এক পরম ভক্ত  আমার তপস্যা করছে। তার ডাকে সাড়া দিতেই আমাকে অবিলম্বে মর্ত্যলোকে যেতে হবে। আপনি অনুমতি দিন। রাজন, আপনিতো জানেন পিতাশ্রী মহাদেব এবং কৃষ্ণ ঠাকুরের দাপটে মর্ত্যলোকে আমার ভক্ত সংখ্যা অতি নগণ্য। এমন কি ভ্রাতা গনপতিও আমার থেকে এগিয়ে। অবশেষে একজন একনিষ্ঠ ভক্ত আমি পেয়েছি। তার ডাকে সাড়া দিতেই হবে।

      দেবরাজের অনুমতি নিয়ে ময়ূর বাহন পবনের বেগে মর্ত্যলোকে প্রবেশ করলেন।


                       তিন 

মধ্য রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে এক মনে তপস্যা করে চলেছে কালাচাঁদ। হঠাৎ চারিদিক আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। তীব্র আলোর ঝলকানি সহ্য করতে না পেরে চোখ বন্ধ করে নিলো কালাচাঁদ।

      - বৎস তোমার তপস্যায় আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। বল কি বর চাও?

      - ভগবান আমার ডাকে সাড়া দিতে তুমি স্বয়ং এসেছো! তার মানে আমি তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করেছি! আমি ধন্য। আমার একটাই প্রার্থনা, আমার ব্যবসাটা যেন রক্ষা পায়।

      - পরিস্কার করে বল, তুমি ঠিক কি বর চাও?

      - ভগবান, আমার ছেলেদের আমার ব্যবসার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। আমার বয়স এখন উনষাট বছর। আমার অবর্তমানে কে দেখবে এই ব্যবসা? আমার যোগ্য উত্তরসূরী চাই, যে আমার এই সাধের ব্যবসাটাকে টেনে নিয়ে যেতে পারবে। আরো বড় করবে। রবীন সবে বিয়ে করেছে, ওর কথা পরে ভাবলেও চলবে। এখন আমাকে কৃপা কর।

      - তথাস্তু। তুমি আমার পরম, একনিষ্ঠ এবং সম্ভবত একমাত্র ভক্ত। তোমাকে আমার অদেয় কিছুই নেই। তুমি এক চাইলে আমি একশো দেবো। সুতরাং এক নয়, তুমি অবিলম্বে শত পুত্রের জনক হবে। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তোমার বানিজ্য বিশেষ ব্যাপ্তি লাভ করবে। এই ধরাধামের সর্বোত্তম বানিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হবে।

      - কিন্তু ভগবান আমি এখন বৃদ্ধ। আমার পক্ষেতো এখন সন্তান উৎপাদন সম্ভব নয়।

      - ওসব নিয়ে চিন্তা কর না। তোমাকে দ্বিতীয় বর দান করছি। তুমি এবং তোমার পত্নী অবিলম্বে যৌবন ফিরে পাবে এবং অতি দীর্ঘ জীবন যৌবন লাভ করবে।

      - আমি ধন্য প্রভু।

      - কেবল আমার বর দান নয়। আমি স্বর্গলোকে প্রত্যাবর্তন করে মাতা ষষ্ঠী ঠাকরূণকে অনুরোধ করবো যাতে তার কৃপা দৃষ্টিও তোমাদের উপর বর্ষিত হয়। তোমার মঙ্গল হোক।

      - প্রভু আমার পুত্ররা কি এক সাথে জন্ম গ্রহণ করবে, নাকি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভূমিষ্ঠ হবে?

      - বৎস, এটা দ্বাপর যুগ নয়। ঘোর কলি। সেই কারনে প্রকৃতিগত এবং পদ্ধতিগত নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে তোমার পুত্ররা জন্ম গ্রহণ করতে থাকবে। যতক্ষণ না তোমার শেষতম পুত্র জন্ম গ্রহণ করছে ততক্ষণ তোমাদের যৌবন অক্ষত থাকবে। অর্থাৎ তোমরা শতবর্ষব্যাপী যৌবনের আনন্দ উপভোগ করতে পারবে।

      কথা শেষ করেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন ময়ূর বাহন।

      একশো বছর ধরে যৌবনের মজা! ভাবতে ভাবতে 'উরে ব্বাস' বলে চিৎকার করে প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লাফিয়ে ওঠে কালাচাঁদ। নিজের শারীরিক সক্ষমতা দেখে সে নিজেই অবাক হয়ে যায়।

     কার্তিক ঠাকুর চলে যাওয়ার পর আবার চারিদিক অন্ধকারে ঢেকে যায়। কালাচাঁদ অন্ধকারের মধ্যেই আড়ামোড়া ভেঙে নিজের শারীরিক ক্ষমতা পরখ করলো। তারপর নিজের ঘরে গিয়ে তার গিন্নীকে ঘুম থেকে তুলে সব খুলে বললো। সারা দিনের খাটা খাটুনি, পুজোর জোগাড়, অতিথি আপ্যায়নের পর অসময়ে ঘুম ভাঙাতে মিত্তির গিন্নীর মেজাজটা বেশ খিঁচড়ে গেছে। তারপর আবোল তাবোল কথা শুনে সপ্তমে চড়লো তার মেজাজটা। শুনিয়ে দিল দু চারটে কথা।

      - আহা, গিন্নী তুমি রাগ করছো কেন? আমাকে দেখো, আমার শরীরে এখন অসুরের শক্তি। এবার তুমিও যৌবন  ফিরে পাবে। আসলে মেয়েদের শরীর কিছুটা জটিলতো, তাই তোমার যৌবন ফিরে পেতে একটু দেরি হচ্ছে।

      - ওরে বাবারে, সারাদিন খাটা খাটুনির পর রাত দুপুরে ঘুম ভাঙিয়ে মুখপোড়া মিনষে কি আষাঢ়ে গল্প জুড়েছে!

      - গিন্নী আমাদের আরো একশোটা ছেলে হবে। তার মানে আরো একশো বছরের যৌবন, প্রেম, ভালোবাসা, আরো কত কিছু! উরি বাবা আমি ভাবতে পারছি না!

      - বলছিলাম কি, আমিও শরীরে কেমন যেন জোর পাচ্ছি। বাতের ব্যথাটাও মনে হচ্ছে আর নেই।

      - হবেইতো গিন্নী, এসব দেবতার বরদান। কিছুক্ষনের মধ্যে তোমার সাদা চুল কালো হবে। শরীর টানটান হয়ে উঠবে।

     আচমকাই দাঁত খিচিয়ে ওঠে মিত্তির গিন্নী,  "সেতো হবে। কিন্তু মুখপোড়া মিনষে, তোমার কি কাণ্ডজ্ঞান নেই, দেব দ্বীজের কাছে মিথ্যে বলেছো কোন সাহসে? তোমার এখন ছেষট্টি বছর বয়স, আর তুমি কিনা ভগবানের কাছেও বয়স ভাঁড়িয়ে উনষাট বলেছো!" 

      চোখে মুখে চালাকি ভাব এনে কালাচাঁদ বলে "ওসব কথা ছাড়োতো। কার্তিক ঠাকুর বেশি দুর লেখা পড়া করেনি। অঙ্কতেও কাঁচা। সারা জীবনতো অসুরদের সঙ্গে লড়াই মারামারি করে কাটালো। যদি গনেশ ঠাকুর বা মা সরস্বতীর মত পাশ করা শিক্ষিত হতো তাহলে কি আর ওর কাছে বয়সে জল মেশাতাম! ওসব ছাড়ো, এবার আমাদের নতুন যৌবন এসেছে, কিভাবে আমোদ আহ্লাদ করবে সেটাই ভাবো দিকিনি। একশো ছেলে মানে একশো বার হানিমুন।"

     মাথার ঘোমটা কিছুটা টেনে মিত্তির গিন্নী বলে "মরণ! এতোখানি বয়স হলো, ঘাটের মড়ার তিন কাল গিয়ে এক কাল আছে কি না তার ঠিক নেই, এখনো হুলো বেড়ালের মত ছোঁকছোঁকানি গেল না! খালি যৈবন যৈবন করে চলেছে!"

      "আহা গিন্নী রাগ কর কেন?" নরম গলায় বলে কালাচাঁদ, "যৌবন নিয়ে খেলা করতে তোমার ভালো লাগে না? আগামী একশো বছরে তুমি কখনো হয়ে উঠবে হেমা মালিনী, কখনো শ্রীদেবী, কখনো মাধুরী, আবার কখনো...কি?"

      - কি?

      - কা - শ - মী - র     কি    ক - লি - ই!

      কথা শেষ করেই কালাচাঁদ গান গাইতে শুরু করলো,

      "ইয়ে, চাঁদ সা রওশন চ্যাহরা।

       ঝুলপো কা রং সুন্যাহরা..."

      দ্বিতীয় বার ফিরে পাওয়া যৌবনের উদ্দীপনায় জোরে জোরে হাততালি দিতে দিতে, গলা ছেড়ে গান গাইতে থাকে কালাচাঁদ। সঙ্গে চলে উদ্দাম নৃত্য।

      " ...তারিফ করুঁ শ্বশুর কি।

        জিসনে তুমে বানায়া ...।"

      নেচেই চলেছে কালাচাঁদ। গেয়েই চলেছে কালাচাঁদ। দাপুটে মিত্তির গিন্নীর বিকট দাবড়ানিও থামাতে পারছে না তাকে! বেশ কিছুক্ষণ পরে নাচ গান থামিয়ে একটা চেয়ারে বসে হাঁপাতে থাকে।

      "কি গা তোমার হাঁপানির ব্যামো আবার বাড়লো নাকি?" উদ্বেগের সঙ্গে প্রশ্ন করে মিত্তির গিন্নী।

      "হাঁপানি! আমার! হাসালে গিন্নী!" একটা বাঁকা হাসি খেলে যায় কালাচাঁদের মুখে, "আমি এখন টাট্টু ঘোড়া। টগবগ করছি হানিমুনে যাবো বলে। আসলে তুমি বুঝতে পারছ না এখন আমার হর্স পাওয়ার কত! বুঝবে বুঝবে। সময় হলে সব বুঝবে। এবার আসল কথা শোনো। এবার আর কিপটেমি নয়। এবার আমরা হানিমুন করতে গোয়াতে যাবো। ফাইভ স্টার হোটেলে উঠবো। হানিমুনটাকে এবার আমরা উৎসবে পরিনত করবো। গোয়াতে গিয়ে সকাল সকাল আমরা সুইমিং কস্টিউম পরে সমুদ্র স্নান সেরে এসে আমরা হোটেলের সুইমিং পুলে নেমে অনেকক্ষণ ধরে জলকেলি করবো। তুমি ডুব সাঁতার দেবে, আমি ভেসে উঠবো। আমি ডুববো তুমি ভাসবে, তুমি ডুববে আমি ভাসবো। তারপর এক সময়ে তুমি ছুটতে ছুটতে হোটেলের রুমে গিয়ে সুইমিং কস্টিউম ছেড়ে একটা নীল রঙের  স্লিভলেস টপ, লাল রঙের হটপ্যান্ট আর বেগুনি রঙের সানগ্লাস পরে ছুটতে ছুটতে ফিরে আসবে। তারপর আমরা সুইমিং পুলের ধারে বসে খুনসুটি করবো। কখনো তোমার ডান কোমরে কাতুকুতু দেবো, কখনো তোমার বাঁ কোমরে চিমটি কাটবো। তুমি খিকখিক করে হাসবে। কখনো তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ডান চোখ টিপবে, কখনো আমি তোমার দিকে তাকিয়ে বাঁ চোখ টিপবো। কখনো তুমি আমাকে...কখনো আমি তোমাকে ...। তারপর এক সময়ে হোটেলে ফিরে এসে বিকেল বেলাতেই হোটেলের দরজা বন্ধ করে 'ডু নট ডিস্টার্ব' বোর্ড ঝুলিয়ে দেবো। তারপর শুরু হবে আমাদের হানিমুনের মুল উৎসব। উরি বাবা! আর ভাবতে পারছি না! হামদোনো দোপ্রেমী এবার দুনিয়াকে দেখিয়ে দেবো কাকে বলে যৌবনের খেলা!" কথা শেষ করে, কোনো এক অনাবিল সুখের কথা ভেবে, আবার হাততালি দিয়ে লাফাতে থাকে কালাচাঁদ।

      - কি হল কি? বুড়ো মদ্দ রাত দুপুরে লাফাচ্ছো কেন?

      - না, না। আমি আর বুড়ো নই। আমি এখন জাম্পিং জ্যাক। যতক্ষণ না হানিমুনে যাচ্ছি, ততক্ষণ লাফাতে থাকবো।

      অবশ্য কিছুক্ষণ পরে লাফালাফি থামিয়ে, কিছুটা দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করলো, "যাক বাবা, এবার হানিমুনে গিয়ে আর ফ্যামিলি প্ল্যানিং নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। প্রথম বার হানিমুনে গিয়ে খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম। একটু এদিক ওদিক হলেই সব শেষ। হলোও তাই। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই রবীন এসে গেল। হয়ে গেল! জবানির মজা চলে গেল ভবানীর ভাঁড়ে! ডাক্তার তোমাকে ফ্যামিলি প্ল্যানিং নিয়ে কত কিছু বোঝালো। কোনো কথাই শুনলে না। মুখ্যু মেয়েছেলেদের নিয়ে অনেক জ্বালা!" স্পষ্টতই হতাশ লাগে কালাচাঁদকে। পরক্ষণেই হতাশা কাটিয়ে সে বলতে থাকে, "এবার অবশ্য ওসব ব্যাপার নেই। এখন আমরা ফ্রি প্লেয়ার। মানে মজা আন লিমিটেড। কাল সকালেই আমি সুইমিং কস্টিউম, হট প্যান্ট সব কিছু কিনে আনবো।"

      কালাচাঁদকে থামিয়ে আবার বাক্য বাণ ছুঁড়তে শুরু করে তার গিন্নী, "হ্যাঁ গা বেআক্কেলে মিনষে, তুমি যে একশো ছেলের বাপ হবে বলে আনন্দে নেচে উঠেছো, কিন্তু একশো ছেলেকে তোমার চার কামরার বাড়িতে কোথায় শুতে দেবে? অত ঘর, অত ক্যাঁথা কম্বল তোমার আছে? কি খেতে দেবে অতগুলো ছেলেকে? একশো ছেলের খোরাক! ট্যাঁকের জোর আছে? বেআক্কেলে মিনষের ওসব দিকে হুশ নেই খালি যৈবন যৈবন করে চলেছে। কোথা থেকে এলোরে আমার যৈবন ওলা। বুড়ো শকুনের পুলক জেগেছে, এখন গোয়া যাবে ডুব সাঁতার কাটতে! ঘরে ছেলে, ছেলের বউ রয়েছে সেদিকে খেয়াল নেই, উনি এখন যৈবনের খেলা দেখাবেন! ঝ্যাঁটা মারো অমন যৈবনের মুখে!" 

      চমকে ওঠে কালাচাঁদ। যেন তড়িতাহত হয়ে মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ে সে বলতে থাকে, "সত্যিইতো গিন্নী, এদিকটাতো ভেবে দেখিনি! হায় হায়! এতো মহা বিপদ হয়ে গেল আমার! কার্তিক ঠাকুরতো বর দিয়ে খালাস। কে হ্যাপা সামলাবে? দশরথের শাপে বর হয়ে ছিল। আমারতো বরে শাপ হয়ে গেল! ভগবান তোমার বর তুমি ফেরত নাও। আমার উত্তরসুরির দরকার নেই।"

      "ওসব বললেতো হবে না। বর বা অভিশাপ একবার দিলে আর ফেরত হয় না। তোমার হ্যাপা তোমাকেই সামলাতে হবে। এবার বোঝো যৈবনের ঠ্যালা। আরো লাফাতে থাকো যৈবন যৈবন করে!" টিপ্পনী কাটে মিত্তির গিন্নী।

      "আমিতো বরটা ফেরত নিতে বলছি না। দেবতার বর ফেরত দেওয়া মহা পাপ। আমি চাই একশোটা ছেলে হোক। একশো বার হানিমুন হোক। একশো বছর ধরে প্রেম, ভালোবাসা, আমোদ, আহ্লাদ,আর যা যা হওয়ার কথা ছিল সব হোক। আমি বলছি একশো ছেলের খাওয়া পরার দায়িত্বটা অন্তত কার্তিক ঠাকুর নিক। এক্ষুনি কার্তিক ঠাকুরের সঙ্গে কথা বলতে হবে।" হাহুতাশ করতে থাকে কালাচাঁদ।

      "তার মানে, তুমি ডুব সাঁতার কাটবে আর কার্তিক ঠাকুর হ্যাপা সামলাবে! কিন্তু সেতো অনেক আগেই চলে গেছে। এখন তাকে কোথায় পাবে? এখন বসে বসে মাথা চাপড়াও।" ফোড়ন কাটে মিত্তির গিন্নী।

      "যত দুরেই যাক, আমি তাকে ধাওয়া করে ঠিক ধরবো। দরকার হলে সশরীরে স্বর্গে যাবো। আমি চললাম। রক্ষা কর ভগবান। ত্রাহিমাম ত্রাহিমাম।" চিৎকার করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তার মোড়ে গিয়ে কালাচাঁদ উদভ্রান্তের মত দৌড়োদৌড়ি করতে থাকে। হয়তো সশরীরে স্বর্গে যাওয়ার রাস্তাটা খুঁজতে থাকে!


                  চার

      "কি হল কি? ভোগের খিচুড়ি খেয়ে পেট গরম হল না কি? সারারাত হাত পা ছুঁড়ছো, আর বিড় বিড় করে কি সব বলছো? এখন আবার কনুই দিয়ে গুঁতোতে শুরু করেছো। বাবারে, এই বুড়ো ভামকে নিয়ে আর পারা যায় না!" খেঁকিয়ে ওঠে মিত্তির গিন্নী।

      গিন্নীর ধমকানিতে ধড়ফড় করে উঠে বসে কালাচাঁদ, চোখ রগড়াতে রগড়াতে বলে, "একটা ভয়ের স্বপ্ন দেখছিলাম। একটা আইবুড়ো ছোঁড়া কি সব যেন বলে আমাকে ভয় দেখাচ্ছিল!"


********************************************************************************************************



দেবাংশু সরকার

পেশা মেডিকেল রিপ্রেসেন্টেটিভ। স্কুলের পত্রিকায় নিয়মিত লেখার অভ্যাস থাকলেও, তারপর দীর্ঘ বিরতি।লকডাউনের প্রথম বছরটা (2020) টিভিতে রামায়ণ মহাভারত দেখে কেটে গেলেও। লকডাউনের দ্বিতীয় বছরের অখন্ড অবসরে আবার লেখার দ্বিতীয় ইনিংসের শুরু। 

সাম্প্রতিক লেখা - প্রজাপতি সাহিত্য পত্রিকা/  সৃজন সাহিত্য পত্রিকা/  রংমিলন্তি প্রকাশনা/  কারুলিপি অনুগল্প সংকলন/  অবেক্ষন/  ড্যাস সাহিত্য পত্রিকা/  লেখা ঘর সাহিত্য পত্রিকা/  সমন্বয় পত্রিকা/  মৌনমুখর সাহিত্য পত্রিকা/ তুলি কলম আকাশ/  ঘোড়সওয়ার/  স্নিগ্ধা প্রকাশনী/ নীরব আলো পত্রিকা এবং স্বরবর্ণতে প্রকাশিত হয়েছে।

                

স্মরণ * বিপ্লবের বাঁশি * সম্রাট মুখোপাধ্যায়



[ শোভা সেনের জন্মশতবর্ষের শুরুতে 'বিপ্লবের বাঁশি' নিবন্ধটি লিখে এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা জানালেন স্বনামধন্য লেখক সম্রাট মুখোপাধ্যায়।]


বিপ্লবের বাঁশি 

সম্রাট মুখোপাধ্যায়


আমি হেলেনা ভাইগেলকে দেখি নি। কিন্তু তাঁকে দেখেছি। শ্রীমতী শোভা সেনকে। 'মহাবিদ্রোহ'এ যুদ্ধের প্রান্তরে,'তিতুমির'এ জ্বলন্ত কাস্তে হয়ে। 

বুঝেছি হেলেনা ভাইগেলের দীপ্তি কী ছিল!

আমি প্রভা দেবীকে মঞ্চে দেখি নি।কিন্তু শোভা সেনকে মঞ্চে দেখেছি।'কল্লোল'এ বিদ্রোহ আর বিষাদকে পাশাপাশি নিয়ে,'একলা চলো রে'তে আশ্রয়ের ডালপালা হয়ে।

বুঝেছি তাঁর প্রভা-মা কী দীপ্যমান ছিলেন!

শোভা সেন। আমার দেখা বঙ্গরঙ্গমঞ্চের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী। যিনি কথা বললে তেজে সহস্র সূর্য জেগে উঠত।

এক অদ্ভূত ভঙ্গিমা কথা বলার।যেন অভিনয় নয়,স্বগতভাবে ধারাবিবরণী দিয়ে চলেছেন!তার মাঝে মাঝে ছেদ-যতি-শ্বাসের অদ্ভূত কিছু  emphasis...যা আর কখনও কারো মুখে শুনি নি। একদম signature style সংলাপক্ষেপনের।

এই তো প্রকৃত ব্রেখটিয় নৈরাত্মরীতির অভিনয়।চরিত্র হয়ে উঠেছেন।অথচ চরিত্র সম্পর্কে সারাক্ষণ মন্তব্যও করে চলেছেন!

শোভা সেন পরবর্তী যুগের সমস্ত অভিনয় শিল্পীদের জন্য এক খোলা পাঠশালা।

যদিও জানি শোভা সেন একবারই জন্মান।তাঁকে অনুসরণ করা সম্ভব নয়।

'টিনের তলোয়ার'এ কাপ্তেনবাবুর সেই অমোঘ সংলাপ মনে হয়,"একমাত্র ঐ আঙুর ক'রে অভিনয়,আর তোমরা সব জলে দাগ কাটো।"


এই মহিয়সী মহিলার সংগঠন ক্ষমতাও ছিল মারাত্মক।আগুনের মতো এক প্রতিভাকে ঘিরে রেখেছেন বন্ধুত্বে,সাহচর্যে।তাই উৎপল দত্ত মাইকেল মধুসূদন দত্তের পরিণতিতে পৌঁছান নি।তাঁর সংগঠনকে সারা জীবন বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন।প্রয়োজনে নিজের অভিনয়জীবনকে কিছুটা উপেক্ষা করেও।এখন কেউ ভাবতে পারবেন না,শোভা সেন ছিলেন একসময় লাক্স'এর রূপলাবণ্যের বিজ্ঞাপনের মডেল।কিন্তু সে পুতুল-পুতুল 'গ্ল্যামার' ছেড়ে বেরিয়ে এসে হয়ে উঠেছেন শাণিত প্রতিবাদের ব্যক্তিত্বময়ী ফলা।

প্রায় পৌনে এক শতক আগে বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরের এক নারী তাঁর অগ্রবর্তী চেতনায় প্রাতিষ্ঠানিক বিবাহের চেয়ে পবিত্র মনে করেছিলেন হৃদয়ের ডাককে,ভালোবাসাকে।এমন প্রথাভাঙা ভালোবাসা উজাড় করে দেওয়া...তারপর তাকে নিঙড়ে শিল্পের ফুল বানানো ক'জন পেরেছে অবরোধের অন্দর কাটিয়ে এই বাঙালি জীবনে?

তাঁর আত্মজীবনীর নামে কাব্য নেই।আছে 'নবান্ন থেকে লালদূর্গ' এই উপশিরোনাম।তাতে আছে ইতিহাসের অমিত্রাক্ষর কবিতা।বাঙালির বিকল্প সংস্কৃতির জ্বলন্ত ইতিহাস।আর কোন বাঙালি নিজের জীবনকে উপশিরোনাম থেকেই এমন ইতিহাসের পেরেকে ঝুলিয়ে দিতে পেরেছে? 


শোভা সেনের কষ্টার্জিত অর্থে কেনা বাড়ি বন্ধকের টাকা দিয়েই সাথী উৎপল মিনার্ভা মঞ্চ ভাড়া নিয়েছেন,তবে তৈরি হয়েছে 'অঙ্গার','কল্লোল','মানুষের অধিকার'এর মতো সব কুতুব-মিনার।তিনি শুধু জানতেন বিপ্লব জায়মান।উৎপল গ্রেপ্তার হয়েছেন,বহু সাথী ভীত,তিনি নির্বিকার থেকেছেন শিশুকন্যাসহ।তিনি শুধু জানতেন গলন্ত লাভা ধরা আছে তাঁর দু'হাতে,তাকে চেহারা দিতে হবে।সেই তাঁকে ও উৎপলকে দল একসময় কার্যত বিতাড়ন করেছে,কুৎসিত অপমান ও কল্পিত অপবাদসহ...অপমানকারিদের সেই দলে থেকেছে এমনকি তারাও,যাদের তিনি ও উৎপল গড়ে উঠতে সাহায্য করেছেন!তবু তিনি মনোবল হারান নি।লিজের টাকার ঋণের প্রতিটি কপর্দক মিটিয়ে দিতে কমরেড উৎপলের পাশে থেকেছেন।তাঁর কি চোখের জল ছিল না?ছিল।কিন্তু জানতেন তাকে জীবনের গ্রিনরুমে ফেলে আসতে হবে।তিনি শুধু জানতেন তাঁকে হয়ে উঠতে হবে একজন সার্থক 'পিপলস আর্টিস্ট'।তাই আবার নতুন দল গড়েছেন। আবার তাকে সাফল্য এনে দিয়েছেন।তিনি শুধু জানতেন সাচ্চা কমিউনিস্টদের 'ফিনিক্স' পাখির রূপকথা হতে হয়।



এক ইস্পাতে গড়া নারী তিনি।যেন প্রাচীন রুশ উপকথার পাতা থেকে উঠে আসা!


আজ শোভা সেনের জন্মদিন।আজ শোভা সেনের জন্মশতবর্ষের শুরু।আজ অন্য দেবীপক্ষ।

উৎপল দত্ত প্রথম দেখায় প্রণাম করতে দেন নি মনে আছে।হাতটা দু'হাতের মধ্যে ধরে ফেলেছিলেন।হেসে উঠেছিলেন 'লাল সেলাম','লাল সেলাম' বলে।শোভা সেন প্রণাম নিয়েছিলেন।অন্য আর এক দিন।


আজ তাঁকে আর একবার প্রণাম।বিপ্লবী অভিনন্দন মিশিয়ে।


************************************************************************************************


***************************************************************************************************

স্মরণ * জাঁ লুক গোদার * কিন্নর রায়



[ অতি সম্প্রতি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন কিংবদন্তী চলচ্চিত্র পরিচালক জাঁ লুক গোদার । তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য জানালেন প্রথিতযশা কথা সাহিত্যিক কিন্নর রায়।]


জাঁ লুক গোদার - আমাদের বর্ণবিমোহনের তীরন্দাজ 

কিন্নর রায়


জাঁ লুক গোদারের সিনেমা আসলে সান্নিপাতিক জ্বর যেমন, সেভাবেই ঘুরে ঘুরে আসে, অথবা এও তো বলা যায়, জীবনানন্দ দাশ যেমন তাঁর আহত মননে জলের মূর্চ্ছনাকে ঘুরে ঘুরে আসতে দেখেন ও দেখান, 'সুতীর্থ' নামের আখ্যানে রাজনৈতিক নেতারা হয়ে ওঠেন গাধার টুপি পরা ভাঁড়, গোদারের তীব্র বিষাদ ও ইউরোপিয় এলিয়েনেশন, যা ভারতীয় বিষাদ - বিযুক্তি থেকে স্বতন্ত্র, এই বিষাদ -  বিযুক্তিই হল ভারতীয় এলিয়েনেশন, যা মহাভারতের কর্ণ ও ভীষ্মকে আচ্ছন্ন করে রাখে, হয়ত বা যুধিষ্ঠিরকেও তা খন্ড গ্রাসে রাখে মহাপ্রস্থানের পথে, তো সে যাই হোক, গোদার তাঁর সিনেমা - যাত্রাপথে দশ হাতা বিষাদের সঙ্গে চিপটেনি কাটা, ছুরি হেন খুব গভীরে রাখা প্রায় আন্ডারগ্রাউন্ড স্যাটায়ার তিন হাতা মিশিয়ে দেন । প্রেম, যৌনতা, না - যৌনতা--  সবই জাঁ লুক গোদারের কাছে সিদ্ধিগঞ্জের মোকামবিহীন যাত্রা।


জাঁ লুক গোদার আমাদের যাবতীয় গুরুগম্ভীরপনা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে, পুঁজিবাদী হ্যাংওভারকে অনায়াসে 'আউট' বলে  সঙ্গীত ও নারীর প্রেমে উদাসীন এক বাঁশিওয়ালা হয়ে বুনেছেন নিষ্ঠুরতার রূপকথা। এক পরম্পরা হীন আপাত বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনি আসলে পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী শেকল ছেঁড়ার কথাই বলেছেন ক্যামেরাকে রাইফেলের ভূমিকায় এনে।


গোদার  নাকী সেলুলয়েড যাপনে কখনও কোনো গল্প বলেন নি অথবা বলতে চাননি গল্প। কিন্তু পুঁজিবাদ যখন তার দাঁত - নখ নিয়ে বাজার খুঁজতে বেরিয়ে হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, তৈরি করে বা করতে চায় নতুন নতুন উপনিবেশ,  --- জাঁ লুক গোদার এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ক্যামেরা হাতে দাঁড়ান। মৃণালদা -- মৃণাল সেনের 'কোরাস' -এর কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, গোদারিয় ঘরানার সিনেমা বলে। এর সঙ্গে মৃণালদার আরও দুটি ছবির কথা  উল্লেখ করা যায় অনায়াসে -- 'চালচিত্র', 'পরশুরাম'।


আমাদের কারও কারও সিনেমা মন্ত্রে, সিনে উচ্চারণে ফেলিনি, বার্গম্যান, ত্রুফো, লুই বুনুয়েল, আকিরা কুরোশাওয়া, ঋত্বিক কুমার ঘটক এবং অবশ্যই জাঁ লুক গোদার। মৃণালদা --  মৃণাল সেন প্রভাবিত ছিলেন গোদারে, বিশেষ করে তাঁর 'কোরাস' দেখলে তো তেমনই মনে হয়েছে আমাদের কারও কারও। ফেলিনির দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন হিচকক, সেটি পরে গ্রন্থ হয়। ভাবি, এইভাবে গোদারকে চুলচেরা বিশ্লেষণ যদি করতেন তেমন কোনো চিত্রপরিচালক !


আমাদের কারও কারও সেলুলয়েড স্বপ্নপথ ছিলেন জাঁ লুক গোদার। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের কথাও তিনি বলেছিলেন তাঁর ফ্রেমে , পুঁজিবাদ বিরোধী উচ্চারণ ছিল তাঁর লেন্সে। আ দিউ গোদার। আ দিউ ।

জাঁ লুক গোদার -- পথে পথে সিনেমা যাপনে,  পুঁজিবাদ বিরোধিতায়, ক্যামেরাই যখন মেশিনগান। বিদায় সিনেমা ক্রান্তিক। আমাদের  অনেকেরই জীবন  চারণে সকালবেলার আলো, বিদ্যুতের ঝলক, সাংস্কৃতিক  তরঙ্গ, নব তরঙ্গের নিয়ত বাদন  জাঁ লুক গোদার, ৯১ বছরের জীবন মহিমায়  বিউগিলে বেজে  উঠল লাস্টপোস্ট। দাস ভিদানিয়া গোদার।


 ****************************************************************************************************


****************************************************************************************************

অণুগল্প * প্রদীপ দে



" নীল ফেনা'র বাঁচা মরা "

   

প্রদীপ দে            

-- দেখেছো নদী কেমন তিরতির করে বয়ে চলেছে ? স্নিগ্ধ শান্ত অথচ বহমান।  

--  আর তার উপরে ? চোখ খুলে তাকাও। দেখো বিশাল পাহাড়। বিচিত্র বর্ণে,  বিভিন্ন বৃক্ষকে বুকে নিয়ে আকাশকে ছুঁয়ে বৃষ্টির সম্ভাষণ করছে।

--  আর নদী সেই পাহাড়কেই তার নির্মল জলরাশি দিয়ে ধৌত করে সজীব করে রেখেছে।

-- হ্যাঁ সেই শৈলশিখরে আমরা, যার নাম হিমালয়।

--  নীচে প্রবাহিত তারই শিখরদেশ থেকে নেমে আসা গঙ্গা।

উপরে আকাশ 'নীল', সাদা 'ফেনা' মেঘকে তারই বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।

নীলের বুকেই ফেনা।

একেবারেই নিভৃতে …

সকলের অগোচরে।

নীল আর ফেনা এখন ঘরে ফেরার অপেক্ষায় অপেক্ষমান। পুরো টিম এখন ব্যস্ত তাদের পরিভ্রমন সমাপ্তিকরণে।

হঠাৎই নীলাকাশ কালো কর্কশ হয়ে উঠলো। গুমোট হয়ে গেল সবকিছু। গঙ্গোত্রী কে চেনা দায়!

হিমালয় এই মূহুর্তে নিজেকে হিংস্র করে তুললো। একটা প্রবল হাওয়া, না ঝড় বয়ে গেল। দিশেহারা, লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার প্রয়াস প্রকৃতির। তাঁবু রাখা মুশকিল। আকাশভাঙা বৃষ্টি শুরু হতেই উপরের টিলা ভেঙে কর্দমাক্ত জলের স্রোতে ধাবিত হতে শুরু করলো। পুরো টিম নাস্তানাবুদ। ভেসে যাচ্ছে সব।

নীল আর ফেনা স্রোতধারায় ভাসমান। জুজবার শেষ চেষ্টায় কারোরই খামতি নেই। মানুষের আর প্রকৃতির লড়াই। বাঁচার আর মারার!

আর পারা গেল না, প্রবল শ্বাসকষ্ট!  অসম লড়াইয়ে হেরে, ফেনা বুক পরিত্যাক্ত হয়ে যেতেই নীল ঠোক্কর খেল এক প্রস্তর খন্ডে।

তারপর শুধু নামা আর নামা, খানাখন্দ পেরিয়ে, নিস্প্রাণে পাহাড় হতে নদীতে …











******************************************************************************************



প্রদীপ দে 

লেখক  নেশায়। পেশা ছিল হিসেবনিকেশ।  বয়স -৬২ । কলকাতা নিবাসী। বিবাহিত।
নিজের লেখা কয়েকটি বই আছে।




অণুগল্প * মানসী কবিরাজ



সুপ্ত ইচ্ছারা

মানসী কবিরাজ

সবার সব ক্ষমতা থাকে না । কিন্তু ক্ষমতা নেই বলে ইচ্ছাও জাগবে না তেমন তো নয় । কাজে কাজেই  অনুপমের মনের গুপ্ত কুঠুরিতে একটা সুপ্ত  ইচ্ছা বাসা বেঁধেছে বেশ কিছুদিন হল ।  শুধু অনুপমই  সেই ইচ্ছার গোঁড়ায় সার জল কিছু দেয়নি। কে আর খাল কেটে কুমীর আনতে চায় যেচে !আসলে  প্রথম প্রথম কিন্তু শুভ্রা মানে অনুপমের এক এবং অদ্বিতীয় বউ  বেশ রসেবশেই দাম্পত্যালাপ চালাত । বিয়ে যত পুরানো হচ্ছে  রস তো নয় আস্ত কর্পূরের ড্যালা  উবে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই।  শুভ্রার এখন কথায় কথায়  খোঁটা ।  অনুপমের নাসিকা গর্জনের ঠ্যালাতে নাকি পাড়াতে  চোরের উপদ্রব কমে গেছে , অনুপম প্লেটে ঢেলে বিশ্রী শব্দ করে চা খায় ( আগে তো এটাই  শুভ্রার জারা হট্ কে টাইপ লাগত ) , বাজারের যত কানা বেগুন , পাকা ঢ্যাঁড়স , নরম পেটের মাছেরা নিজেরাই যেন  অনুপমের থলিতে ঝাঁপিয়ে এসে পড়ে ! নেহাতই শুভ্রার হাতের ক্যারিশ্মা  রান্নাগুলো এত সুস্বাদু হয় । অনুপমকে নিয়ে শুভ্রার  অভিযোগের তালিকা যাকে বলে শ্রাদ্ধের ফর্দের চেয়েও  লম্বা ।


এদিকে  অফিসে , বাজারে এমনকি  ঠেকের আড্ডাতেও  বচনবাগীশ হিসাবে অনুপমের বেশ একখানা নামডাক আছে  । কিন্তু হায় ! বাইরে যতই অনুপমের বুলির ঝুলি উপছে উঠুক না কেন বউএর সামনে এলেই যাবতীয় পুরুষ- সিংহের মতো তারও সব বোলচাল পুরো ঘেঁটে- ঘ হয়ে যায় । কিন্তু সহ্যেরও একটা সীমা নিদেনপক্ষে একটা  এক্সপায়ারি ডেট থাকে তাই শেষ অবধি শান্তি চুক্তি ভেঙে অনুপম একদিন বোমাটা ফাটিয়েই ফেলল। স্লগ ওভারে সপাটে ছক্কা হাঁকিয়ে বলে দিল ঘুমের সময় শুভ্রার মুখ বোয়াল মাছের মতো হাঁ হয়ে থাকে । আগে ছিল  আটাশ ইঞ্চির তন্বী কোমর এখন ছেচল্লিশের কুমড়োপটাশ । গলার স্বর শুনলে রাস্তার কুকুর অবধি ঝগড়া থামিয়ে দেয় আর রান্নার কথা না তোলাই ভালো । সেসব বস্তু কী স্বাদে কী গন্ধে একেবারে জেলখানার চেয়েও খারাপ । নেহাতই  অনুপম ঋষিতুল্য মানুষ তাইই প্রশান্ত চিত্তে কোনরকম  উচ্চবাচ্চ না করেই সেসব গলধঃকরণ করে । ঝড়ের গতিতে ভিতরের ঝাল উগলে বেশ আত্মপ্রসাদের সঙ্গে অনুপম ভাবল জব্বর একখানা চাল দেওয়া গেছে । এক চালেই মিসেস শুভ্রা  একেবারে কিস্তিমাৎ ! যাক বাবা এবারে আয়েশ করে সিগারেটে একটা টান দেওয়া যাক এই ভেবে  যেই অনুপম লাইটার জ্বালাতে গ্যাছে ওমনি আঙুলে এক মোক্ষম ছ্যাঁকা !  দূর থেকে ভেসে আসছে শুভ্রার  অমোঘ বচন ‘ আর কখন ঘুম থেকে উঠবে কুম্ভকর্ণের বংশধর ? বলি এরপর কি দোকান বাজারের ঝাঁপ গুটাতে যাবে !”  ধড়মড় করে চোখ খুলেই   অনুপম দেখে , কখন যে বেড সাইড টেবিলে চায়ের কাপ রেখে গেছিল শুভ্রা ঘুমন্ত অবস্থায় সে ঐ গরম চায়েই আঙুল ডুবিয়েছে !



************************************************************************************************



 মানসী কবিরাজ

জন্ম বহরমপুরে। পড়াশোনা মালদা এবং কোলকাতা মিলিয়ে মিশিয়ে। পেশায় সরকারি আধিকারিক। চাকরি সূত্রে  শিলিগুড়ি এবং  এখানেই স্থায়ী বসবাস।পছন্দ বই সিনেমা বাগান আড্ডা এবং ভ্রমণ। লেখালিখি বানিজ‍্যিক পত্রপত্রিকায়  এবং  লিটল ম‍্যাগাজিনে। প্রকাশিত কবিতার বই --পতঝড়  এবং অনন্ত সাঁতারের ক্লাস।


অণুগল্প * বিশ্বনাথ পাল



প্রার্থনা


বিশ্বনাথ পাল

প্রতিদিন ঠাকুরের আসনে ফুল দেওয়া অনেক দিনের অভ্যেস। ফুল কিনব বলে ফুটপাতের রেলিঙে হেলান দিয়ে সাইকেলটা দাঁড় করিয়েছি, হঠাৎ মনে হল চাবিটাও লাগাই। ফুলের দোকানে ভিড়, খানিক ক্ষণ দাঁড়াতে হবে। এই ফাঁকে সাইকেলটা যদি কেউ হাওয়া করে দেয়! ইতিপূর্বে দু’বার আমার সাইকেল চুরি হয়েছে।

ফুটপাতে ফুলের দোকানের পিছনে গির্জার দেয়াল। না, পুরোটা দেয়াল নয়, বেশ খানিকটা ফাঁকা অংশে গ্রিল। তার ভেতরে পাথরে সাজানো পাহাড়ে মাতা মেরী। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে এখন অনেককেই দেখি এই মাতা মেরীর সামনে মোম জ্বালিয়ে প্রার্থনা জানিয়ে যায়।

ফুলের দোকানের ভিড়টা প্রায় হালকা হওয়ায় আমার ফুলের অর্ডারটা দিলাম। হঠাৎ একটা লোকের গলা কানে গেল, ‘আমি তোমার সামনে একশোটা মোমবাতি জ্বালাব। আমার সাইকেলটা যে শুয়োরের বাচ্চা চুরি করেছে, সে যেন এক সপ্তাহের মধ্যে অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়।’

খুব ইচ্ছে হল লোকটার মুখ দেখার। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি মাতা মেরীর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে দ্রুতপায়ে হেঁটে যাচ্ছে লোকটা।  



****************************************************************************************************








**************************************************************************************************



বিশ্বনাথ পাল


কাব্যগ্রন্থ 

বিজ্ঞাপনে বলা নেই  *  যারা দুধের ব্যবসা করি 

ব্যথাকে করেছি সামাজিক * সন্ধিপ্রস্তাব 

উপন্যাস 

জলে লেখা  


অণুগল্প * দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়



এসো বারেবারে


দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়

মানুষ আমাকে একাকীত্বের ঘুণপোকার হাত থেকে মুক্তি দেয়।তাই ভিড়ের মধ্যে চলে যাই মাঝে মাঝে। রথের মেলায় অফিস ফেরতা রোজ ঢুকি। মানুষ দেখেই কিছুটা সময় কাটে আমার। বাড়ি ফিরতে হয় মায়ের জন্য। দীর্ঘ আট মাস পক্ষাঘাতে পঙ্গু মা শয্যাশায়ী।রেনীমাসি মায়ের  কাজে সদা সতর্ক। অফিস থেকে ফিরে চায়ের কাপ হাতে মায়ের সঙ্গে কিছু কথা। সারাদিনের অফিসের গল্প বলা অথবা তিতলির দুষ্টুমির গল্প শোনা মার কাছে। তিতলির কথা বললে মায়ের চোখে মুখে একটা আলাদা ঔজ্জ্বল্য।বুঝি কারণটা। একটা নাতি নাতনির মুখ দেখে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা মায়ের।

কিন্তু মায়ের এই অবস্থায় বিয়ে মানে জোর করে সমস্যা ডেকে আনা। আজকাল যা শুনছে সব !

     তিতলি পাশের ফ্ল্যাটে থাকে।স্কুল থেকে ফিরে রোজ মায়ের কাছে আসে।ওর দিদুনের সাথে আড্ডা দিতে নাকি ভালো লাগে ‌!আজ সকালে অফিস বেরনোর সময় ওর স্কুল যাওয়ার ভ্যানে উঠতে উঠতে বলেছে জিলিপি পাঁপড় খাওয়ার কথা।ওর জন্য আর বাড়ির জন্য আজ জিলিপি পাঁপড় নিয়ে যাবো। তৃতীয় চায়ের কাপ শেষ করে উঠে চললাম জিলিপির দোকানে। দোকানের সামনে কয়েকজন ক্রেতা দাঁড়িয়ে।ভিড় সেরকম নেই।মেলায় এবার লোকজন খুব কম। চায়ের দোকানদার বলছিল,অন্যবারের তুলনায় এবারে কেনাবেচা ভালো নয়।লাভ হচ্ছে না বললেই হয়। বুঝলাম কাজ হারিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে।হাতে পয়সা না থাকলে মেলার আনন্দ তো কাঁঠালের আমসত্ত্ব !

    জিলিপির দোকানের বাঁদিকে ছোট্ট দুটো ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে। ছেঁড়া জামাকাপড়।দেখেই বোঝা যায় দারিদ্র্যের সখ্যতায় ওদের বেড়ে ওঠা।দোকানি মাঝে মাঝেই ওদের তাড়াচ্ছে। ওরা তাড়া খেয়ে ভয় পেয়ে একটু পিছিয়ে আবার ফিরে আসছে। একমনে জিলিপির দিকে তাকিয়ে। বুঝলাম সব। কৌতুহলী হয়ে দোকানিকে জিজ্ঞাসা করতেই বেশ রেগে গেল সে।বিকেল থেকেই নাকি ঐ দুজনে ওরকম করছে। ওদের পয়সা নেই।অথচ জিলিপি চাইছে খাবে বলে।দোকানি খুব উত্তেজিত হয়ে একটা খারাপ কথা বলে উঠলো।

  রাগ হলো খুব। চিৎকার করে দোকানিকে বলে উঠলাম :" ওরা জিলিপি খেতে চেয়েছে। চুরি তো করে নি। তাহলে এভাবে গালাগালি করছেন কেন ওদের? ওদের গালাগাল দেওয়ার আগে আপনার বাড়ির বাচ্চাটার মুখটা মনে করে দেখুন।" দোকানি বেশ বিরক্ত হলো আমার ওপর। উৎসাহী দু একজন এখন তৎপর। তাদের মুখে নীতি কথার ঝড় এখন। হাসি পেল খুব।কবে যে শিরদাঁড়াটা সোজা হবে এদের !

     বাচ্ছা দুটোকে কাছে ডাকলাম। ওরা ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এলো। দোকানিকে দু জায়গায় এক কেজি করে জিলিপি ও চারটে করে পাঁপড় ভাজা দিতে বললাম। দোকানিকে টাকা পয়সা মিটিয়ে বাচ্ছা দুটোর হাতে জিলিপি ও পাঁপড়  তুলে দিলাম।ছোট ছোট হাতে তখন সব পেয়েছির আনন্দ। ওদের চোখে মুখে খুশির বন্যা। জিলিপি নিয়েই দুজনে দে ছুট। মনটা আনন্দে ভরে গেল। মায়ের কথাটা মনে পড়লো।মা বলেন : " মানুষের জন্য বাঁচিস। সেখানেই জীবনের সার্থকতা।"ঝাপসা চোখে হঠাৎ দেখি বাচ্ছা দুটো ফিরে এসে সামনে দাঁড়িয়ে। ছেলেটি  জিঞ্জাসা করে উঠলো :" তুমি কি ঈশ্বর? " চমকে গেলাম। ছেলেটি বোনের হাত ধরে বলে উঠলো :" মা বলে যখন কিছু মন থেকে চাইবি তখন ঈশ্বর আসেন সাহায্য করতে।বোন জিলিপি খাবার বায়না করছিল। পয়সা নেই আমাদের।দ্যাখো তুমি ঠিক কিনে দিলে ।" উত্তরের অপেক্ষা না করে চিৎকার করতে করতে আবার ছুট লাগালো :" মাকে গিয়ে বলবো, আজ ঈশ্বর দেখেছি!" একরাশ কান্না বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে । জলভরা চোখে ভাই বোনের ভিড়ের মধ্যে ছুটে চলা আমার অন্য এক ভাইবোনের কাশফুলের মধ্যে দিয়ে রেলগাড়ি দেখতে ছুটে চলার দৃশ্যটা চোখের সামনে মেলে ধরলো।











*********************************************************************************************



দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় 


  রয়েল কমপ্লেক্স ,কাঠালবাগান ,উত্তর পাড়া, হুগলী থেকে লিখছেন পেশা: শিক্ষকতা ,নেশা : কলম চারিতা ,সাপলুডো খেলা শব্দ নিয়ে ,অণুগল্প ,ছোট গল্প ,কবিতা, প্রবন্ধে  সুখ-দুঃখ ,হর্ষ-বিষাদ, আড়ি ভাবের অনুভবে থাকা ,জীবনের দুই স্তম্ভ রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দের আদর্শ মনন, যাপন ও শীলনে.. স্বপ্ন: পৃথিবীকে ভালবাসার যৌথ খামার বানানো..দিক চক্রবালে হিরণ্যগর্ভ আলোর খোঁজ ..পাখি ,গাছ আকাশের সাথে মন কি বাত.. সূর্যের নরম আলোয় সুখের আবিরে মানুষের সাথে হোলি খেলা..


গল্প * বিরথ চন্দ্র মণ্ডল



সম্পর্ক  

বিরথ চন্দ্র মণ্ডল 


গ্রাম থেকে শহরে আসার পথে এক বট গাছ । অসংখ্য ঝুরি নেমে গেছে চারপাশে। এই বট গাছের পাশ দিয়ে যে কেউ হেঁটে গেলে একটু বসতে হয়  তাকে। এক মায়াবী টান গাছটার। প্রখর রোদ। গাছের পাতা একদম স্থির। কিন্তু এই বট গাছের গোড়ায় বসলে, হাওয়া গুলো কোথা থেকে যে আসে কে জানে !এক আশ্চর্য গুণ  গাছটার। কেউ পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে ,কিংবা তার গোড়ায় বসলে, ডালপালা পাতা সমূহের উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়। গাছটা গর্ব অনুভব করে মনে মনে। 

তিয়াস মাঝে মাঝে আসে এই রাস্তায়। এলেই বসে এই গাছের গোড়ায় । সময় না থাকলেও বের করে নেয় দু' চার মিনিট ।  একটার পর একটা টিউশন সাজানো। বসার আর জো কোথায়? তবুও এখানে বসলে তার চিন্তাভাবনার শেকড় গুলো বটঝুরির মতো আস্তে আস্তে নামতে থাকে। এক মাদকতায় ভরে যায় ।  

মাঝে মাঝে এই বটগাছ যেন নানা রকম অঙ্গ ভঙ্গিমায় তাকে নানা প্রশ্ন করে দেয় -- পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর মধ্যে মানুষ ই বুদ্ধিমান এবং বুঝদার ।তবে সে ভুল করে কেন  ? 

তিয়াস উত্তর দেয় -- তার ব্যক্তিস্বার্থের জন্য - বুঝে ও না বুঝার ভান করে ।  তাই। 

আবার প্রশ্ন করে --এই ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য অনেক ক্ষতি ও তো হয়ে যায় ,  তাহলে !

তিয়াস বলে --এ পর্যন্ত বুঝে ওঠার জায়গায় সে  থাকে না। তাই ।

আর যখন বুঝতে পারে, ফিরে আসার কোন রাস্তায় থাকে না। এই ভাবে গাছের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উঠতে পারে না। আর , যা যা পারে না ,গ্রামের ভিকু দাদুর কাছে জেনে নেয়। দাঁড়িওলা  ভিখু দাদুকে সিদ্ধ যোগীর মতো মনে হয়।ভীষণ  কম কথা বলা মানুষ তিনি।

শহরে আসার আর এক রাস্তা হয়েছে ইদানিং। নতুন রাস্তা দিয়ে মানুষের চলাফেরা। স্বভাবতই লোকজন বটগাছের  রাস্তার ধার ঘেঁষে না ।

তিয়াস  সাইকেল ছুটায় । বট গাছের ধার দিয়ে। যেতে আসতে তাকায়। বটগাছের ক্রমশ ফ্যাকাশে  দৃষ্টি । শরীরের ভাজে ভাঁজে তার তেজস্ক্রিয়তা ,চাক চিকনটা  হারাচ্ছে ধীরে ধীরে। তিয়াস সাইকেল দাঁড় করায় ।  বসে। গাছ

 মন খারাপের সুরে তিয়াসের  উদ্দেশ্যে বলে -- এখন কেউ আর আমায়  ভালোবাসে না। কেউ আসে না এখানে । শুধু তুমি ছাড়া। তিয়াস শুনে কথাগুলো ।  কোন উত্তর  দিতে  পারে না। 

এর আগে বট গাছের অনেক কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। 

মানুষ ইদানিং বড় ব্যস্ত যে । 

ঘর আসে তিয়াস।

হাত মুখ ধুয়ে ছেলেটার কাছে বসে পড়ল। 

সব স্কুলে দিয়েছে ছেলেটাকে। শিশু শ্রেণী হলে কি হবে? অনেক পড়াশোনার বোঝা এই শিশুটারও। ছেলেটিকে একটু ঝুমুতে দেখে, বকুনির সুরে ধমক দেয় তিয়াস। ছেলেটা কেঁদে ফেলল চিৎকার করে ।  

রনিতা ছুটে আসে। --তুমি কি ছেলেকে মারলে   ? বলে কোলে তুলে নিল। 

--আধা ঘন্টা দাও , আমি  দেখিয়ে দিই  একটুকু।

---না না  ঢের হয়েছে !তোমাকে আর মাস্টারি করতে হবে না । এসেই তো কাঁদিয়ে দিলে।গলায় ঝাঁজ রনিতার। --আমি কি শুধু কাঁদাই  ! তাছাড়া এমন করলে তো ছেলেটা লাই পেয়ে যাবে  ! কাউকে মানবে না ।

এইভাবে এক কথায়  লেগে গেল।  


তিয়াসের শুধু টিউশনিতে ভালো ভাবে সংসার চলে না। রনিতা সাহায্য করে । এক বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করে সে। মাইনেও বেশি।  কিন্তু ; এই যে , কিছুই বোঝে না ।  হঠাৎ কিছু মানেও নিতে চায় না। যা বুঝে তাই করে। এই নিয়ে প্রবল অশান্তি ।

এই সেদিন পকেট হাতড়ে  কয়েকটা ফোন নাম্বার নিয়ে সে কি উল্টোপাল্টা প্রশ্ন ! 

এটা কার ফোন নাম্বার !

এ এই কবিতা আবার কাকে নিয়ে লেখা !

সবসময় এমনটা ভালো লাগে না তিয়াসের। 

প্রশ্ন জাগে - সত্যিই কি রনিতা ভালোবাসে ? 

নাকি বেকার টিউশনি করা এক পাগলকে বিয়ে করে হাঁপিয়ে  উঠেছে  ! 

এই কারণে কি দিন  দিন অশান্তি ! 

বুঝে উঠতে পারে না তিয়াস। সন্ধ্যে  কিংবা রাত্রি হলেও বট গাছ টায় গিয়ে বসে। 

এখানে এলে যেন কিছুটা শান্তি। এই বট গাছটাই  তাকে বোঝে । অনেক কিছু শেয়ার করে দুজন । কথায় কথায় রনিতা সেদিন মিউচুয়াল ডিভোর্স চেয়ে বসল। বট গাছের কাছে জানতে চাইল  তিয়াস ।

বটগাছ বলল -- তোমাকে একটু বাজে নিতে চাই হয়তো।


 তিয়াস বলে -- যদি তাই হয় ; ও তো মোটা টাকা মাইনে পায়। 

ও ১০০ টাকা দিলে, খরচের পাই টু পাই হিসাব দিই। তবুও তাতে  সন্তুষ্ট হয় না 

পরন্ত, ও দু' হাতে টাকা ওড়ায়। 

কোন হিসাব রাখে না। 

আমি ওসবে কিছু মনে রাখি না । মনে রাখার প্রয়োজনও মনে করি না । 

বটগাছ হেসে উত্তর দেয় -- আসলে বন্ধু , মেয়েরা এরকমই হয় । 

এ নিয়ে মাথা ঘামিও না। তিয়াস চুপ করে বাধ্য ছেলের মত বটগাছের সব কথা শুনে। 


সে নিজেও মনে মনে ভাবে -- রনিতা বোধ হয় আমাকে ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছে না। তাকে আরো বেশি করে ভালবাসতে হবে । সংসারের উন্নতির জন্য দুজনকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে ।এর জন্য দূরের পালাতে ও কোন দোষ নেই। 


ঠিক করল সে কলকাতা যাবে। 

কলকাতায় কোম্পানির কাজে যোগ দিলো তিয়াস। কিন্তু দূরে গিয়েও বেশি দিন থাকতে পারে না। 

বারবার ছুটে আসে ,সন্তানের জন্য ,রনিতার জন্য । 

মন পাগল পাগল মনে হয়।


 ঝড় ,বর্ষা ,বাস ধর্মঘট , কোন কিছু পরোয়া করে না তিয়াস। মনটা পাগলপারা হলে ,ছুটে  আছে রনিতার  কাছে ।

ট্রেনে দু ' একটা জিনিস...সিজিনের ফলমূল  কিনলে, রনিতা ওসবে  হাত দেয় না । তিয়াস অনেক পিপাসা নিয়ে ছুটে আসে। রনিতার কাছে কোন সাড়া পায় না। 

মনে অনেক ভাবে ,-বোধ হয় কলকাতা যাওয়ার সায়   দিলেও ,হয়তো মন থেকে মেনে নিতে পারেনি রনিতা  ....


এই ভেবে কলকাতা ছাড়লো সে । 

টিউশনগুলো সব হাতছাড়া। 


কলকাতা থেকে হোলসেলে মাল কিনে রিটেলে বেচতে শুরু করল। 

মুনাফা ও দেখল কিছুটা। 



রণিতার নিজের অফিস, বাড়ির কাজকর্ম , ছেলের পড়াশোনা ,এতকাজ একা সামলাতে পারেনা ।

এক কাজের মেয়ে আসে। ঘর মোছা ,রান্না-বান্না ছেড়ে চলে যায়।তিয়াসকে  তাড়াতাড়ি বের হতে হয় । 

অনেক দোকানপাট ধরা। সবাইকে সঠিক সময়ে মাল ডেলিভারি না দিলে ব্যবসার ক্ষতি ।

সকালে বালতি নিয়ে বাথরুমে  ঢোকার মুখে সজোরে আছাড় খেলো তিয়াস । 

কাজের মেয়েটা সামনে ছিল। মেয়েটা হেসে উঠলো হি হি করে ।

কোমরে বেশ লেগেছে। কাজের মেয়ের সামনে এমন হাসির ঘটনায় নিজের মান রক্ষার্থে সে ও হেসে ফেলল ফিক করে। 

রনিতা ঘরের মধ্যে কিছু গোছ গাজ   করছিল ।

এদের হাসি শুনে বেরিয়ে এসে, কিছু একটা  আঁচ  করলো,

 তারপর ফোঁস করে উঠলো -- কিসের এত হাসাহাসি আঁয়..

তলে তলে এত । বলি -আমি এক আদ দিন সকালে না থাকলে , আরো কি না কি হয়!!রনিতারর মুখের কথা  শুনে কাজের মেয়ের মুখ  একেবারে শুকতো। 

  তিয়াস বুঝতে পারছে না  , সে কি করবে! 

বলল কি শুনলে, কি বুঝলে  ?এমন বাজে   রকম এণ্ডিকেট  করছো ?

--আমি ঠিক ঠিক  বুঝেছি  ! ভেবেছো ডুবে ডুবে জল খেলে শিবের  বাবা টের পাবে না!!!রনিতা চিৎকার করতে করতে ব্যাগ গোছাতে লাগলো  । 

তিয়াস জানে  , এই ব্যাগ গোছানো মানে ,হয় বাপের বাড়ি ।নয়তো মাসির বাড়ি। 

ছেলেটাকে কোলে নিয়ে, গট গড করে বেরিয়ে গেল রনিতা, কাজের মেয়ে ততক্ষণে হাওয়া।  

কি করবে বুঝতে পারছে না সে। যে কাজের যাবার জন্য এত তোড়- জোর । সব যেন ভুলে গেছে সে ।কিবা দেখল রনিতা ! মিছিমিছি একটা খারাপ কিছু সন্দেহ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। 

তার আসা-যাওয়া , চলাফেরা, হাসিঠাট্টা, কোন কিছু ভালো চোখে দেখতে পারছে না রনিতা। 

কিন্তু কেন ? ভালোবাসা থাকলে মনে মনে টান থাকলে তো  - এত কিছু হওয়ার কথা নয়। 

রনিতা তো এতকিছু ভুল করে। কই  ;সে তো কিছু বলে না !

সেদিন মানত করে পুজো করা হলো বাড়িতে । রাতুলের নামে। 

পুজোর যা যা করার তার বাবার বাড়ির লোক আর সে করলো। তিয়াস 

শুধু অড়ারি খেটে গেল ।কোন প্রতিবাদ ছাড়া। 


আত্মীয় - বন্ধু - বান্ধব, এদের নেমন্তন্ন  রক্ষার্থে, উপহার কি হলো  - কিছু  জানতে পারেনা সে। 

 আবার উপহার সামগ্রী সে নিজে কিনলে  রনিতার পছন্দ হয় না । সে যত দামি হোক। এভাবেই সে ব্রাত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে দিন দিন । 

এতদিন শুধু এডজাস্টমেন্ট করে এই পর্যন্ত।

 আজ যেন ক্লান্ত সে আর পারছে না তিয়াস। 

এই অশান্তি মিটমাট হবার আশায় নিজেদের মধ্যে বিশেষ বয়োজ্যেষ্ঠ জনা কয়েক নিয়ে বসাও হয়েছে। তবু শান্তির কোন দিক খুঁজে পায়নি সে ।বরং বেড়েই চলেছে ।এইসব ভাবতে থাকে সে । ভাবতে ভাবতে  সকাল গড়িয়ে দুপুর। দূপুর গড়িয়ে  বিকেল  । দিন দিন এই অশান্তি নিয়ে বেঁচে থাকার কোন মানে হয় না। তার কাছে কাছে অর্থহীন  এসব। 

শুধু  ছেলেটাকে নিয়ে ভাবনা। সে জানে ,বাবা- মা'র মধ্যে সম্পর্কের এই জায়গায় , কোন সন্তান উপযুক্ত মানুষ হয় না। তিয়াস বেঁচে থাকলেও ছেলেকে মনের মত মানুষ করে তুলতে পারবে কিনা সন্দেহ  তার  ।

 সুতরাং বেঁচে থেকে লাভ নেই। 

কাছে একটা মোটা দড়ি পড়ে থাকতে দেখল তিয়াস। দড়িটা যেন কাছে টানছে থাকে। মাথাটা খুব ঘুরছে তার। বুকটা জ্বলে যাচ্ছে ।

কি থেকে কি হয়ে গেল  ! 

শুধু একবার নয় । 

বার বার !

কি এমন পাপ করেছে সে! এজীবনে কোনদিন  শান্তি নেই। 

 সারা জীবন শুধু কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকা। 

 শুধু দীর্ঘশ্বাস আর দীর্ঘশ্বাস  ! সংসারের জন্য  আর কি বা করতে পারে সে ! 

শুধু একটু ভালো থাকার জন্য কি না কি করে চলেছে  ! অথচ কি চায় রনিতা? এখনো সে বুঝতে পারল না।

 অথচ তাকে সে পাগলের মত ভালবাসে। অথচ একটা দিনের জন্য ও রনিতা তিয়াসকে  কাছে টেনে নেয় নি । কাছে গেলে আজ ভালো লাগছে না বলে পাশ  ফিরে শুয়েছে। 

দিনের পর দিন একটাই  কথা  বুঝিয়ে এসেছে ---তিয়াসকে  সে চায় না --চায় না  --চায় না! দড়িটা হাতে নিয়ে সিলিং ফ্যান এর দিকে তাকালো সে।  সত্যি তো!!!

মরে যাওয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই তার!!!

একমাত্র বুঝতে পারত বট গাছ। 

 গতকাল গাছটার কাছে গিয়ে তার পিলে চমকানির মত অবস্থা ।তখন অনেক রাত্রি। কাজের থেকে ফেরার সময় গাছের নিচে পায়ে পায়ে  মচমচ আওয়াজ। 

এত শুকনো পাতা  !

 গাছটার উপর দিকে তাকিয়ে দেখেছিল -জোছনার অন্ধকারে পাথরের মূর্তির মত খায় দাঁড়িয়ে গাছটা। 

বট গাছের সাথে নিজের তুলনা করে তিয়াস ।সে ওতো  কত স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়েছিল। কত সাধ, কত স্বপ্ন ,কত যত্ন করে মানুষের এই বেঁচে থাকা -- এই ভাবে জলাঞ্জলি হয়ে যায় !!!

না সময় নষ্ট করে না।আর। উঠে দাঁড়ালো সে । 

মরলেই তবে রনিতার শান্তি। তবেই প্রাণ খুলে হাসতে পারবে রনিতা। 


তাহলে তার সন্তান !!!

তার আদরের সন্তান কি শুধু খেয়ে পরে  বড় হবে!!

মানুষ কি সত্যি হতে পারবে..??


প্রশ্নটা করে উঠলো তিয়াসের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা অন্য কেউ । 

-না -সে তিয়াস নয়।

 বুঝতে পারছে তার মন দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। 

মনে - মনে তিয়াস  উত্তর দেয় --- মানুষ হবে হয়তো। কিন্তু শিক্ষিত হয়ে ক' ত জন বা আর  মানুষ হচ্ছে  ???

সুতরাং খেয়ে পডরে  বড় হওয়াটাই বা কম কোথায়???


আচ্ছা আত্মহত্যা করলে কার লাভ  ???

তিয়াসের না রনিতার  ???

লাভ-ক্ষতির হিসাব জানে না সে। রনিতার কতটা লাভ হবে, সে কথা বলতে না পারলেও  কারণে  - অকারণে এই  অশান্তি ও আর সহ্য করা যায় না । সে বুঝে গেছে। 

ক্রমাগত মনের ভেতরে পক্ষে-বিপক্ষে এই যুক্তি-গ্রাহ্য সওয়াল হয়েই চলেছে। 

দুটি খন্ডিত মনের মধ্যে এই যুদ্ধে ও  চেতনে কিংবা অবচেতনে - সে জানেনা....দড়ির প্যাঁচ কোষের চলছে। এবং  দৃষ্টি সেই সিলিং ফ্যানে বরাবর। নিচে তাকালো ।  পায়ের তলায় কখন সে চৌকি টেনে রেখেছে অন্যমনস্কতায় , বুঝে উঠতে পারছেন না ।

দেখল কখন দরজা বন্ধ করে দিয়েছে সে নিজে ও জানেনা। আজ তার কেউ নেই এ পৃথিবীতে । কেউ তাকে বোঝে না  । 

সময় নষ্ট না করে গলায় দড়িটা পড়ে ফেলল  সে। দেখল - ফ্যানে দড়িটা বাধা আছে। ছোট চৌকি পা দিয়ে ঠেলে ঝুলে যাওয়ার মুহূর্তেই -  দরজায় ঠকঠক আওয়াজ। একটি নারী কন্ঠের আর্ত চিৎকার ।

চিৎকার বাড়ছে । 

দরজার আওয়াজ ক্রমশ দরজা ভাঙার উপক্রম।একটি শিশু  বলে চলেছে ---

 দলজা তুলো বাবা........

.দলজা তুলো বাবা.........


দলজা তুলো বাবা......... 


****************************************************************************************************



বিরথ চন্দ্র মণ্ডল 

দীর্ঘদিন সাহিত্যচর্চা করছেন ।
 আশাবরী সাহিত্য পত্রিকা (২৬ বছর)- সম্পাদক। লিখছেন 
কাঁথি ,পূর্ব মেদিনীপুর থেকে। মূলত গল্প এবং কবিতা লেখার চেষ্টা করেন ।