সোমবার, ১৩ জুন, ২০২২

অণুগল্প * বিশ্বনাথ পাল

 


ণুগল্প সাহিত্যের একটি বিস্ময়কর শাখা। ' বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন ?' ঠিক তাও নয় যেন, বিন্দুতে সপ্তসিন্ধু দশ দিগন্ত চকিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সার্থক অণুগল্পে। তেমনই একটি অসাধারণ অণুগল্প এবার আমরা পড়ছি ,বিশ্বনাথ পাল-এর কলমে -----



বড়োলোক

বিশ্বনাথ পাল 


একটা লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করি। বন্ধু-লেখককে সৌজন্য সংখ্যা দিতে বিকেলে সাড়ে পাঁচটা-ছ'টায় তার বাড়ি যাব বলে হোয়াটসঅ্যাপে ঠিক হল। সাইকেলে মিনিট পনেরোর দূরত্ব। 

বিকেলে বেরোব বেরোব করছি এমন সময় বন্ধুর ফোন, "তুই আসছিস?"

---"হ্যাঁ, এই বেরোচ্ছি।" 

---"শোন তুই আসার সময় একটা কাজ করতে পারবি?"

---"কী কাজ?"

---"তুই আসার সময় একটু টক দই নিয়ে আসিস।"

---"কতটা? আড়াইশো?"

---"হ্যাঁ, নিয়ে আয়। আর একটু বেশি করে রাবরি। নেতাজীনগরের কমলা থেকে।"

বন্ধুর স্বতঃস্ফূর্ততায় আমি অবাক। বললাম, "কিন্তু আমি তো নেতাজীনগর হয়ে যাব না।"

---"আচ্ছা তাহলে তোদের ওখানকার কোনও  ভালো মিষ্টির দোকান থেকে। আর একটু ল্যাংচা।"

লাইন কেটে গেল। বন্ধু লেখক বেশ ক্ষমতাবান। এক বিখ্যাত কবির পার্টটাইম সহকারী হিসেবে কাজ করে। বন্ধুরা বেশ বড়োলোক। বাবা কলেজের অধ্যাপক। কিন্তু বন্ধুর ক্যারিয়ার সেই তুলনায় ম্রিয়মাণ।  একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক। কিন্তু লেখালিখির জগতে প্রায় সবাই চেনে।

মনে হল ফোন করে বলি, "আমি কি তোর বাবার চাকর?" 

কিন্তু ফোন করলাম না। হোয়াটসঅ্যাপে লিখলাম, "আমি এখন তোদের বাড়ি যাচ্ছি না...দুঃখিত।"





***********************************************************************



বিশ্বনাথ পাল


কাব্যগ্রন্থ 

বিজ্ঞাপনে বলা নেই  *  যারা দুধের ব্যবসা করি 

ব্যথাকে করেছি সামাজিক * সন্ধিপ্রস্তাব 

উপন্যাস 

জলে লেখা  


অণুগল্প * সুব্রত ভৌমিক

 


ণুগল্প সাহিত্যের একটি বিস্ময়কর শাখা। ' বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন ?' ঠিক তাও নয় যেন, বিন্দুতে সপ্তসিন্ধু দশ দিগন্ত চকিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সার্থক অণুগল্পে। তেমনই একটি অসাধারণ অণুগল্প এবার আমরা পড়ছি ,সুব্রত ভৌমিক-এর কলমে -----


নদী 

সুব্রত ভৌমিক 


কী নেই তার আজ! তিনতলা বাড়ি, দামি স্করপিও, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, শহর জোড়া নাম। এজন‍্য পথটা অবশ‍্য বিশুদ্ধ ছিল না। কিন্তু তাতে কী। এখন সে নামী, প্রতিষ্ঠিত। অনিমেষ স‍ান‍্যাল বললে এক ডাকে সারা শহর চেনে। তবু এমন জীবনটার ফাঁকে অনিমেষ হঠাৎ সুখটা থেকে পালিয়ে গেল, হারিয়ে গেল। 

     কোথায়? কেউ জানে না। 

     গাড়ি বহুদূর একটা টালির বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।

     এটা তাদের বাড়ি। পদচিহ্নের মতো ফেলে যাওয়া। কেউ থাকে না এখন। অনিমেষ গাড়ি থেকে নেমে ভিতরে ঢুকল। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগল। অপলক তাকিয়ে থাকল এক-একটা জিনিসের দিকে। অমনি একটা কুয়োতলা ফিসফিসিয়ে উঠল, 'এই?'

     চমকে উঠল সে। সিরসিরিয়ে উঠে তার কাছে গেল। গায়ে হাত বুলাল। পাশ থেকে অমনি আর-একটা বকুলগাছ নড়ে উঠে বলল, 'আমায় বুঝি ভুলে গেছ?' এভাবে আরও একটা পেয়ারার ডাল, গাদি খেলার উঠোন, ছায়া পড়া সিঁড়ি, পুবদিকের এক ধূম্র পাহাড়।

     সবাই একবার তাকে কাছে ডাকে। দেখতে চায়। কিন্তু দেখার পরই বলে উঠল, 'এ-মা! এ কে! এ-ই কি সেই সিঁড়ির ছাদে বসে একা একা বই পড়ত! নারকেল গাছের মাথায় উঠে অবাক হয়ে পৃথিবী দেখত!' বলেই একটা পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি, বিস্ময়। তারপর একটু-একটু চাপা হাসি। হাসিটা শিমুল তুলোর মতো ফাটতে থাকে। ছড়াতে থাকে। ছড়াতে ছড়াতে হঠাৎ বাড়িময় একটা উচ্চ হাস্যরোল! 

     অনিমেষ ঘাবড়ে গেল। কেঁপে উঠল। দু'হাতে কান চেপে হঠাৎ ছুটতে লাগল। ছুটতে ছুটতে চটার গেটটা পেরিয়ে পাশের একটা নদীর পারে এসে হাঁপাতে লাগল।

   

নদীটি এখনও আগের মতো। কাছে গেলে মোহনার গল্প শোনায়। হাত নেড়ে ডাকল। ঘাটে বসাল। দু'পায়ের পাতা কুলকুল শব্দে ভিজিয়ে দিল। তারপর স্মিতহাস‍্যে বলল, 'জানতাম তুমি ফিরবে।'






************************************************************************



সুব্রত ভৌমিক 

জন্ম ১৯ নভেম্বর ১৯৬৫, বনগাঁয়। সঙ্গীতপ্রিয় ও পেশায় শিক্ষক সুব্রত ভৌমিক-এর আপাতত দুটি গল্পগ্রন্থ। 'পর্ণা আজ বেরোবে' (একুশ শতক) এবং 'অন্তর ছিপে ওঠে না' (উবুদশ)। সদ‍্য প্রকাশিত একটি অণুগল্পের বই 'অণুগল্প সংগ্রহ' (অভিযান পাবলিশার্স)। পুরস্কার পেয়েছেন 'কবি বিশ্বনাথ মৈত্র পুরস্কার', উদ্ভাস, ই-হিউম‍্যান, বহুস্বর।



অণুগল্প * দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়


ণুগল্প সাহিত্যের একটি বিস্ময়কর শাখা। ' বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন ?' ঠিক তাও নয় যেন, বিন্দুতে সপ্তসিন্ধু দশ দিগন্ত চকিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সার্থক অণুগল্পে। তেমনই একটি অসাধারণ অণুগল্প এবার আমরা পড়ছি ,দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়-এর কলমে -----


সুখের লাগি

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়



মুসাফিরানার বেঞ্চে বসে আছে অপূর্ব ড্যামের জলের ঠান্ডা বাতাস গায়ে মেখে।মুকুটমণিপুর ওর কাছে বড়ো কষ্টের আশ্রয়। কাঁদে, তবুও আসে। জীবন হারিয়ে এখানেই জীবন যোগ হয় যেন ওর।ড্যামের জলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ও। প্রবল বাতাসে জলের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বাঁধের ওপর পাথরের গায়ে।বুকের মধ্যেও আছড়ে পড়ছে ঢেউ এলোমেলো স্মৃতির ঝোড়ো হাওয়ায়।

      প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে অপূর্ব ও সুমনা সেবার বেড়াতে এসেছিল মুকুটমণিপুর। সবুজের বুকে আর এক সবুজ আনার স্বপ্ন ওদের তখন।সোনাঝুরি বনের ভেতর কটেজ। ঠিক যেন স্বর্গ ! শরীরের তানপুরায় বেজে চলেছে আনন্দভৈরবী ওদের।এতো সুখ থাকে শরীরে ! এতো ভালোলাগা থাকে ভালোবাসায় !মুকুটমণিপুর সত্যিই যেন সৌন্দর্যের এক অনিন্দ্য মুকুট ।

      সেদিন বিকেলে ওরা এসে বসে মুসাফিরানায়। পাহাড়ের মাথা কেটে একটা পার্ক ড্যামের ওপর।এক কথায় প্রকৃতির বুকে যেন এক অনাবিল আনন্দের ঠিকানা।লকগেট থেকে প্রায় দু কিলোমিটার।ওরা একটা ইঞ্জিন চালিত ভ্যানে  এসেছে।বেশ কিছু পর্যটক এদিক ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।কোন দিকে ওদের খেয়াল নেই যেন।হাতে হাত নীরব দর্শক ওরা হাওয়ায় নাচতে থাকা বাঁধের জলের। স্পর্শের মাদকতায় বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে।ওরা উঠে পড়ে নীচের রাস্তা থেকে একটা  ইঞ্জিন ভ্যানগাড়ি ধরে।দুপা ঝুলিয়ে গাড়ির কাঁপনে ওরা এগিয়ে চলে।গাড়ির কাঁপন যেন লেপ্টে থাকা দুই শরীরেও ছড়িয়ে পড়ছে আপন বন্যতায়।

        হঠাৎ একটা বিকট আওয়াজ করে পিছনের বাঁদিকের চাকা ফাটে।গাড়ি হুড়মুড়িয়ে গিয়ে ধাক্কা মারে বাঁধের বাঁধানো পাড়ে। প্রচন্ড জোড়ে ধাক্কায় ছিটকে পড়ে ওরা বাঁধের পাড় টপকে সাজানো পাথরের ওপর। প্রচন্ড একটা কষ্টে চোখ বুজে আসে অপূর্বর। একটা হইহই আওয়াজের মধ্যে জ্ঞান হারায় ও। একদিন পর জ্ঞান এলে জানতে পারে অ্যাক্সিডেন্টে সুমনা ও ভ্যানের ড্রাইভার মারা গেছে পাথরে মাথা থেতো হয়ে। সুমনা দূরে পাথরে ছিটকে পড়লে মাথা ফেটে ঘিলু বেড়িয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই সুমনা মারা যায়।ড্রাইভারেরও মাথায় চোট লাগে। প্রচুর রক্ত ক্ষরণের ফলে হাসপাতালে নিয়ে যাবার পথেই ও মারা যায়। অপূর্বর ডান পাটা কোমড়ের নীচে থেকে এমনভাবে থেঁতলে যায় যে পাটা বাদ না দিয়ে উপায় ছিল না। গ্যাংগ্রিনে অপূর্বও হয়তো মারা যেত তখন পা বাদ না দিলে। সুমনাকে দাহ করে ক্রাচ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল অপূর্ব সুমনার মা বাবার সাথে। সুমনার কথা মনে পড়লেই অভিরত অনুভবে অপূর্ব চলে আসে এখানে।মুসাফিরানায় বসে সুমনাকে খুঁজতে থাকে ড্যামের জলের বুকে।চোখ ভর্তি জল নিয়ে তখন ওর একাকী অস্তিত্ব খুঁজে ফেরে স্মৃতির বুকে সুমনার শরীরের স্পর্শ।

      হঠাৎ ড্রাইভার মনজয়ের ডাকে সম্বিৎ ফেরে:" সাব, অন্ধকার হয়ে গেছে। এবার উঠুন।"

হো হো করে হেসে ওঠে অপূর্ব।মনজয়ের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে :" আমার জীবন জুড়েই এখন অন্ধকার। অন্ধকারে ভয় কি ভাই !"

মনজয় ক্রাচে ভর দিয়ে এগিয়ে আসতে থাকা    সাহেবের  জলভরা চোখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।


**********************************************************************



দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় 


  রয়েল কমপ্লেক্স ,কাঠালবাগান ,উত্তর পাড়া, হুগলী থেকে লিখছেন পেশা: শিক্ষকতা ,নেশা : কলম চারিতা ,সাপলুডো খেলা শব্দ নিয়ে ,অণুগল্প ,ছোট গল্প ,কবিতা, প্রবন্ধে  সুখ-দুঃখ ,হর্ষ-বিষাদ, আড়ি ভাবের অনুভবে থাকা ,জীবনের দুই স্তম্ভ রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দের আদর্শ মনন, যাপন ও শীলনে.. স্বপ্ন: পৃথিবীকে ভালবাসার যৌথ খামার বানানো..দিক চক্রবালে হিরণ্যগর্ভ আলোর খোঁজ ..পাখি ,গাছ আকাশের সাথে মন কি বাত.. সূর্যের নরম আলোয় সুখের আবিরে মানুষের সাথে হোলি খেলা..

গল্প * বিরথ চন্দ্র মণ্ডল



ডিভোর্স / বিরথ চন্দ্র মণ্ডল 


হ্যালো  ;

          ঐন্দ্রিলা, ক ' দিন ধরে  একটা কথা তোকে বলবো বলবো করে ও বলা হয়নি  । 

কথাটা ঋক বাবুকে নিয়ে। কিছু ভেবেছিস ইনাকে নিয়ে  ? তোর মতামতের অপেক্ষায় আছি। 


ফোনের ভেতর থেকে একটি মেয়েলি গলা ভেসে আসে - হ্যাঁ মা ; তুমি তো আগে ও বলেছিলে উনার কথা। আমি উনাকে দেখিনি যদিও। তোমার কাছে যতটুকু শুনেছি, -আমার তো মনে হয় -উনি খুব ভালো মানুষ। আমার এতে কোনো আপত্তি থাকবে না। 

আর একটা কথা মা  -তোমার প্রত্যেক সিদ্ধান্ত সময়ের সাথে সাথে একদমই খাঁটি হয়ে যায়। আমাদের খুব ভালো হয়ে যায়। একারণে  , তোমার প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস আর ভরসা আছে মা। 

তাছাড়া, তোমার কাছে আমি আর ক' দিন বা থাকবো বলোতো   ? 

সমস্যা হবে হয়তো আমার বিয়ে নিয়ে। সেও না হয় হয়ে যাবে। 

কিন্তু তুমি এমনিতেই অসুস্থ। তোমার একাকিত্ব থেকে রক্ষা পেতে ঋক বাবুর মতো একটি মানুষের প্রয়োজন তোমার। সেটা আমি বুঝি। তা না হলে...... 


কথা চলতে থাকে এইভাবে। প্রায় চল্লিশ - পঁয়তাল্লিশ মিনিট। মা মেয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন। ফোনে ফোনে। 


সবে আঠারো পেরিয়েছে মেয়েটি। সংসারের চালচিত্তির  , সম্পর্কের বাঁধন -ফাটল - একাকিত্ব... এসবের কতটুকু ই বা টের পেয়েছে মেয়েটি। অথচ ; তার বাচন - ভঙ্গিমা  একদমই পরিণত মানুষের মতো। 


 এসব যত ই শোনে - তত ই স্তম্ভিত হয়ে যায় ঋক। 

সৃজার সাথে পরিচয় মাস ছ'য়েকের। এর ই মধ্যে সৃজাকে বেশ বুঝেছে। 

এক দৃঢ়চেতা স্বভাবি মানুষ। আদ্য-প্রান্ত সৎ  , কাজ পাগল  , সময়ের কাজ সময়ে করে নেবার তীব্র প্রবণতা । 

ঋক বুঝতে পারে - এই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার জন্য একটু বেশি তৎপর সৃজা। ওর সারাক্ষণ একা একা থাকার ভয়। 

কারণ - রূপে সৃজা বেশ রূপসী। দুধে আলতো আলতা মেশানো  গায়ের গড়ণ। মুখের সাধারণ কমনীয়তা য় সত্যিই যাদু আছে। 

সে জায়গায়  , ঋক একজন জ্ঞানী মানুষ। শ্রদ্ধার মানুষ। 

কিন্তু সে ওতো আজ বিদ্ধস্ত। তার কষ্টগুলো  বহু বছর , মনের এক নির্দিষ্ট জায়গায় মুহুর্মুহু  দলা পাকায়। মোচড় দেয়। ঠিকরিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়। 

সব থেকে ও কিছু না থাকার যন্ত্রনায় ক্লীষ্ট দিনের পর দিন। 

সেই কঠিন জায়গা থেকে বার বার বেরিয়ে আসতে চেয়ে ও পারেনি। 

তার গাড়ি - বাড়ি - চাকরি  , মান -সম্মান - যশ - প্রতিপত্তি.... সব থেকে ও আজ মনের বড্ড কাঙ্গাল। 

বার বার চেষ্টা করে ও পুরোনো বাঁধন থেকে বেরোতে পারেনি। 

কারণ -মান- সম্মান হারানোর ভয়। 

সবে মণী - নীলরতন এক সন্তান। তার ভালবাসা, তার স্বপ্ন। সর্বপরি তার অসীম ধৈর্য। 

সমস্ত ভুল সেই আবর্তককে ধৈর্যের শিকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে নিজেকে। 

দিনের পর দিন। 


তেমন করে ভালোবাসার মতো এমন কাউকে খুঁজে পায়নি হয়তো। 

আর যাই হোক  -সৃজা তাকে ভালোবাসে। অন্তর থেকে চায় তাকে। 

সে চাওয়ার কোন খাদ্  নেই। 

আবার বিয়ে করে নতুন সংসারী হতে চায় সৃজা। 

এই প্রসঙ্গে কথায় কথায় ঋক বলেছিল -

----আর বিয়ে নয়। আমরা লিভ-টু-গেদারে থাকবো। 

সেই কথায় সৃজা বিপক্ষে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বলেছিল -

-----না -না। একদমই নয়। লিভ-টু-গেদারে থাকার মতো হাইফাই সোসাইটি প্রয়োজন। অথচ, আমরা থাকবো একটি মিনি টাউনে। এখানে কোন লিভ-টু- গেদার নয়। সোজা বিয়ে। 

তাছাড়া লিভ-টু-গেদার তোমার সমাজ, পাড়া - প্রতিবেশী -ভালো চোখে একদমই নেয় না। 

আর একটা কথা -- বিয়ের বাঁধন এমন একটি  সম্পর্ক... এমনিতেই খুব কাছের হোওয়া যায়। অন্য কিছু তে এমন হয় না। কোথায় যেন বাধো বাধো ঠেকে। 


গড় - গড় করে বলে যাচ্ছিল সৃজা। বলছিল - আমি তোমাকে একদমই আপন করে পেতে চাই । 

সেই যখন একসাথে থাকবো - শুধু বিয়ে করে নিলে ক্ষতি কী বলো....? 

সৃজাকে কোন ভাবে এ কথায় হারাতে পারেনি ঋক। সারাদিনে দু ' চার বার ফোন করে সৃজা। 

মৌপিয়ার সামনেই কথা বলে ঋক। জড়তাহীন ভাবে কথা বলে। কোন রাখ -ঢাক থাকে না সে কথায়। 

আজ  পনেরো বছর মৌপিয়ার সাথে সম্পর্ক প্রায় তলানিতে। 

যতটুকু টিকে আছে শুধু ছেলের ভবিষ্যৎ ভেবে। 


মৌপিয়া চাকরি করে। বেশ ভালো আছে। 


ভালো নেই ঋক। এক বন্ধুর প্রয়োজন তার। সৃজা তার তেমন এক বন্ধু। সৃজার সাথে হোয়াটসঅ্যাপ এ কথা বলে মৌপিয়ার সামনেই। কোন ভ্রুক্ষেপ করে না। 

নিজেদের সম্পর্ককে সেই আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার জন্য বার বার মৌপিয়ার কাছে ছুটে গেছে। কোন বরফ গলে নি। বার বার সেধেছে। মনের কথা তো দূর -ফিরে ও তাকায়নি মৌপিয়া। স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে মৌপিয়ার চোখে মুখে সে সময়কার অস্বস্তিকর হাবভাব। 

আজ সপ্তাহ খানিক হল, মৌপিয়া কারণে -অকারণে হুড করে রেগে যাচ্ছে। ছেলেটার সাথে পর্যন্ত ভালো করে কথা বলছে না। দেখে মনে হয়, কিছু একটা গভীর ভাবনায় মানষিক ভাবে জর্জরিত। বিপর্যস্ত। 

কীইবা কারণ হতে পারে...? হোক.. এসব নিয়ে আর ভাবে না ঋক। 

এই সব ভেবে ভেবে সে ওতো ক্লান্ত। 


মৌপিয়া ভীষণ চাপা স্বভাবের। মন খুলে কিছু বলে ও না। সংসারের ভালো - মন্দ... কিচ্ছু না। 

 এ নিয়ে কী আর করা যায়...? সুতরাং, যেখানকার জল সেখানেই থাক। ঘেঁটে লাভ নেই। 


সন্ধের সময় হঠাৎ গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল মৌপিয়া। ওর এমন ই স্বভাব। যখন - তখন চাইলেই ঘুমিয়ে যায়। ঋক পারে না এমনটা। হাজার চেষ্টা করে ও ঘুম আসে না তার। 


সকালে হোয়াটসঅ্যাপ এ কথা হয়েছে সৃজার সাথে। আবার ফোন করল সৃজা। 

---হ্যালো ঋক। ডিভোর্স টা কখন করছো বলো... ! 

সৃজার কথায় যেন অধিক আগ্ৰহ ফুটে উঠছে। 

ঋক উত্তর দেয় -----সে হয়ে যাবে। এ নিয়ে তুমি উতলা হয়ো না। 

সৃজা মুহুর্তে বলে -----না না। আমার সিগ্গির চাই। এসব নিয়ে ভাবতে আমার আর ভালো লাগছে না। আর ডিলে করোনা  প্লীজ। কাল - পর্শুর মধ্যে ডিভোর্স টা নিয়ে নাও। 

আর হ্যাঁ, বলে দাও মিউচুয়াল। কোনো দাবী - দাওয়া নয়! বুঝলে  ! আমার পর্শু চাই ডিভোর্স পেপার। আমি ও এক্স এর সাথে কথা বলেছি। আগামী কাল হাতে পেয়ে যাবো। বুঝলে ---বুঝলে ---কোন কথা বলছো না কেন...? 

ঋকের ফোনের সাউন্ড মৌপিয়া স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। ঋক জানে - ও এখনো ঘুমায়নি। 

কী কারণে, কী জানি , ঘুম উবে গেছে ওর। 

ফোন ধরা অবস্থায় কী উত্তর দেবে, বুঝতে পারছে না ঋক। 

কোন রকম বলল --- আচ্ছা, ঠিক আছে। দেখছি। 

মৌপিয়াকে আগাম বলেছিল --ডিভোর্স টা দিয়ে দাও। 

মিউচুয়াল। কোন দাবী থাকবে না আমার। তুমি তো জানো- আমাদের সম্পর্ক... শুধু কঙ্কালসার। 

উত্তরে কিছুই বলেনি মৌ। 

তাইকি এত ই ভাবনা  ? ওতো বেশ ভালোই আছে। 


ঋক দিনের পর দিন দগ্ধ হচ্ছে। স্থবির হয়ে যাচ্ছে দিনে  দিনে। 

সে ও তো মানুষ। তার ওতো মন আছে। যে ভাবে ও বেঁচে আছে --- ওটা বেঁচে থাকা নয়। 

এই ভাবে কেউ বাঁচে না। সুতরাং এই ভুল বোঝা -আর বুঝির  জীবন থেকে মুক্তি পেতে ডিভোর্সই একমাত্র পথ। 


কাজের মেয়ে এসে রান্না করে দিয়ে যায় ঋক দের। রাতের এবং সকাল, একসাথে। 

এখন রাত প্রায় দশটা বাজে। খাওয়া সেরে বিছানা করতে এসে ঋক দেখলো- তার বিছানা মৌ  করেছে। 

ঋক দেখছে আর অবাক হচ্ছে। আশ্চর্য হচ্ছে। 

অথচ ; আজ কয়েক বছর ওদের বিছানা আলাদা। 

দু 'জনের সাথে কথা তেমন হয় না। তাহলে..? 

ভেবে পাচ্ছে না ঋক। 

কী এমন হল যে - ওর বিছানা মৌ করল......? 

কিছু না বলে চুপচাপ যথারীতি বেড এ এলো। লাইট নিভালো। চোখ বন্ধ করল। 

মৌপিয়া সবার শেষে বেডে আসে। আজ ও এল। তবে তার নিজের বেডে নয়... ঋকের বেডে। 

ঋক অন্ধকারে এই সব দেখছে আর অবাক হচ্ছে। 


বিছানায় এসে ঠায় বসে রইলো মৌপিয়া। 

যেমনটি শুয়ে ছিল  - সেই শোয়া অবস্থায় ঋক ভাবতে থাকলো -- এখন  সে কী করবে  ? উঠে পালাবে  ? 

নাকি...? 

এই অন্ধকারে হাল্কা নাইট বাল্বের আলোয় দিব্বি বুঝতে পারছে, মৌপিয়ার চোখ থেকে ঠস্ ঠস্ করে জল  গড়িয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে শাড়ির আঁচল দিয়ে ভিজে যাওয়া নাক মুছে নিচ্ছে। 

উঠে বসল ঋক। বলল - কী  হয়েছে গো মৌ..? 

এতক্ষণে নিজের আবেগকে অতি বল পূর্বক এক রকম জোর করে  কন্ট্রোলে রেখেছিল  মৌপিয়া। 

ঋকের এমন দরদী কথায় তাকে আর আটকাতে পারলো না মৌ। মুহুর্তে ই হাউ হাউ করে কেঁদে ঋকের গলা জড়িয়ে ফেললো মৌপিয়া। 

কাঁদতে কাঁদতে বললো --

আমি তো খুব খারাপ মেয়ে। 

তোমার চোখে একদমই বাজে মেয়ে। ডিভোর্স চেয়েছিলে তো... ! কাল ই চলো --! 


ঋক বুঝতে পারলো - এ ক' দিন এই সব ভেবে ভেবে  , একদমই মনমরা হয়ে গেছিল। 

'থ' মেরে গেছিল। 

নিজের সাথে নিজের অহ রহ যুদ্ধ চালিয়ে গেছিল। 


কোন রকম সম্বিত  ফিরিয়ে এনে ঋক বললো -- কথাকি তোমার মন থেকে বললে, নাকি আমি চেয়েছিলাম বলে বললে....? 


ঋককে আলিঙ্গনে আষ্টেপৃষ্ঠে আরও বেশি করে জড়িয়ে ধরে মৌপিয়া  । 

অভিমানী সুরে বলল -- তুমি বুঝতে পারছো না - আমি  কী বলতে চাইছি...! 

সে বোঝার মানুষ.......... 

আর বেশি বলতে পারে না  মৌপিয়া। 

ডুকরিয়ে কেঁদে ফেলে....... 


**********************************************************************************



বিরথ চন্দ্র মণ্ডল 

দীর্ঘদিন সাহিত্যচর্চা করছেন ।
 আশাবরী সাহিত্য পত্রিকা (২৬ বছর)- সম্পাদক। লিখছেন 
কাঁথি ,পূর্ব মেদিনীপুর থেকে। মূলত গল্প এবং কবিতা লেখার চেষ্টা করেন । 

গল্প * মল্লিকা রায়


বিষের ছোবল

মল্লিকা রায়                    


রাত প্রায় দুটো। ফাঁকা শুনশান রাস্তায় ছুটে চলেছে সাদা এম্বুলেন্স। ওপরে নীল আলোর স্তম্ভটা বনবন ঘুরে জানান দিচ্ছে এমার্জেন্সীর। ভেতরে কে অথবা কারা সঠিক বোঝার উপায় নেই। আপাতত একুশ দিনের লক ডাউনের প্রিয়ডে আতঙ্কিত শহরবাসী বুঝে নিয়েছে হয় ভ্রাম্যমান মেডিকেল গ্রুপ অথবা আক্রান্ত কোন রোগীকে কোয়ারেন্টাইন কিংবা আইশোলেসনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অতএব নিস্তব্ধ শহরের ঘরে আরও গভীর হয় মানুষের শরীর হৃদয় মন। এককালে চরম দুর্বিনীতও আজ বড় শান্ত বাঁচতে চায় সংসারের মায়া প্রাঙ্গনে। ভুল ভুল ভুল পরকীয়া ভুল " গভীর ভাবাবেগে আগলে ধরেছেন মধ্যবয়স্ক প্রৌঢ় তার স্ত্রীর সান্নিধ্য। যতদূর চোখ যায় রাস্তা বরাবর দীর্ঘ এক কালো সরীসৃপ যেন এঁকে বেঁকে সটান শুয়ে রয়েছে শহরের মাঝখানে। কাছ থেকে ঠিক এইরকমভাবে শহরের ভাবমূর্তি দেখবার সুযোগ হয়নি প্রিয়মের।পেশায় সাংবাদিক সর্বক্ষণ কেবল দুর্যোগ থেকে অসময় থেকে তুলে এনেছে হরেক পোজের ফোটোগ্রাফ। বহুদিন হয়ে গেল  বন্ধ হয়েছে সেসব। আজ শুধু ঘুমের শহরে নিরিবিলি চলাফেরা। দূষিত পৃথিবীর পরে আজ পরিশ্রুতির সঙ্গম। তাই উলঙ্গ ধরিত্রী ঘুমে আচ্ছন্ন করে রেখেছেন প্রাণীকূলকে। উত্তপ্ত পৃথিবীর কাছে তাই প্রেমাস্পদের আগমনে নীরব সৃষ্টিরহস্য।

একলা ছাতে এসে দু'হাত মেলে ধরে প্রিয়ম। ঠান্ডা হিমেল বাতাস দুষ্টামি করে এলো করে দেয় চুল। মুখে গালে আলতো ছুঁয়ে দেয় একজোড়া সরস ঠোট। ঠিক তন্বীর মতো। উহ্ কতদিন দেখা হয়না। ভিডিও কলে যদিবা দেখা হয় ছোঁওয়া যায় না, ইচ্ছে মত জাপটে ধরে করা যায় না অনেক, অনেককিছুই......

এত রাতে ঘুমিয়ে পড়েছে ও। বিরক্ত করে লাভ নেই। টেবিলে অনেক রাত পর্যন্ত খবরের রেকর্ডগুলো সাজানো ওর অভ্যেস। লকডাউন প্রিয়ডে অনিমেষ দা রিপোর্টের কিছু অংশ কম্পিউটারের মেলে পাঠিয়ে দেন। সেগুলো এডিট করে ফেরত পাঠাতে বেশ অনেকটা রাত হয়ে যায় প্রিয়মের । মাঝে মধ্যে সময় দেওয়া হয় না তন্বীকেও। এই একটু অপেক্ষা কর প্লিজ লক্ষীটি আমিই কল দিচ্ছি......কত ঘন্টা মিনিট সেকেন্ড যে কেটে যায় একসময় ঘুমিয়ে পরে তন্বীও একরাশ অভিমান নিয়ে। আগেও রাতের ঘুমন্ত শহর দেখেছে প্রিয়ম তবে আজকে ঠিক এই সময়ের পৃথিবীটা অতি প্রাচীন এক সভ্যতার ভগ্নাবশেষ যেন সমস্ত তৎপরতা ও অভিপ্রায় সেরে কুপিয়ে খুন করে রাখা হয়েছে মনুষ্যত্ব। অবশিষ্টেরা নাকে মুখে কুলুপ এটে টু শব্দটি না করে সেঁদিয়ে রয়েছে গুপ্তকক্ষে। ভয় আর তরাসে গোটা পৃথিবী আজ শায়িত ঘাতকের উন্মত্ত আক্রমণে। মা বাবার আর ক্লাশ ফাইভে পড়া ভাই শ্রেয়মকে নিয়ে বালিগঞ্জ লেকের এই ফ্ল্যটে বছর ছয়েক হল এসেছে ওরা,  থার্ড ফ্লোরের সেকেন্ড রো'য়ের তিনটি ফ্যামিলির মধ্যে ওরাই পুরোনো। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কেউ কারুর সাথে কথা বলেন না খুব একটা। ফ্ল্যট কালচার বোধহয় একেই বলে।

এমনিতে খুব একটা মিলমিশ না হলেও এই সময় বিশেষত ফ্ল্যটের নীচে যখন নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর আনাজ,মাছ ফল ইত্যাদির ভ্যনগাড়ির বাঁশি বেজে ওঠে। মিসেস মিস্টারেরা ভীষণ তৎপর হয়ে ঘেষাঘেষি হতে দ্বিধা বোধ করেন না কেউ। কিংবা অমুক বৌদির অসাধারণ মিষ্টি মুখের ভাই" ডাক শুনে পেছন ফিরতেই ",ভাই আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না..... "  ঠিক আছে চেনার দরকার নেই,আনাজ লাগবে তো মাছ ফল,বেশ সবই লাগবে জানি। এনে দিচ্ছি বৌদি একমিনিট.......ঠিক এভাবেই "  !

বাহ্ আগে তো চোখ পরেনি। বেশ সুন্দরী। কি নাম কে জানে। হয়তো সবজিওলাই ভেবে নিয়েছে। নিক আপত্তি নেই। একটু ভদ্রতা বলে কিছু থাকে তো। দরজা সামান্য ফাঁক করে কোনমতে ব্যগটা টেনে নিয়ে দরজার বাইরে দুটো একশো টাকার নোট ফেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করতে করতে বলেন,সরি মাফ্ করবেন ভাই, বুঝতেই তো পারছেন লক ডাউন "। যাঃ বাব্বা।


প্রিয়ম " কোন দরকার ছিল কি গাল্ বাড়িয়ে থাপ্পর খাবার ? যাক্ আজ নয় চিনলেন না একসময় ঠিকই চিনবেন। ঠেলায় পড়লে মানুষ আবর্জণাও খুঁটে খায়।

মাথার পরে কাস্তের মত অর্ধ চন্দ্রের ধূসর কমলা আলোয় নিজেকে ছায়ামূর্তির মত দেখাচ্ছে। চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই।পাশাপাশি ফ্ল্যটগুলো ঠাসাঠাসি করে অদ্ভুতভাবে দাঁড়িয়ে আছে মানুষের নিয়ম অনিয়মকে তুড়ি মেরে সূর্য চন্দ্র গ্রহের জাগতিক ধারার উর্দ্ধমুখী প্রাণ সঞ্চারের তাড়ণায় প্রাণিত হতে।

সাইরেন বাজিয়ে হু হু করে ছুটে গেল আরও কয়েকটি এম্বুলেন্স। ওদের শহরে এখনও পর্যন্ত কোন সিম্পটম ধরা না পরলেও পাশের শহরে বেশ কয়েকজনের পজেটিভ ধরা পরায় ব্যরিকেডে ঘিরে দেওয়া হয়েছে শহরের প্রত্যন্ত জনবহুল অঞ্চলগুলি এছাড়া এলাকাটি রেড জোন হওয়ায় আগামী সাতদিনের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দোকান বাজার সব। দিনের শহরকে চোখ ভরে দেখতে অবাক লাগছে কিছুটা। ফ্ল্যটের ফার্স্ট ফ্লোরের ডঃ মিস্টার অর্নব নিযুক্ত আছেন দিনরাতের করোনা রোগীদের সেবায়। আপাতত তার বাড়িতে আসা বন্ধ। সেকেন্ড ফ্লোরের মিঃ চ্যটার্জীর স্ত্রী চব্বিশ ঘন্টার স্পেশ্যাল ডিউটিতে আছেন বেলেঘাটা হসপিট্যালে। সাত বছরের ছোট্ট তিন্নী বাবার কাছে জানতে চায় মাম্মাম কেন আসতে পারবে না বাড়িতে,কোন ব্যখ্যা খুঁজে পাননা অসহায় পিতা টিভি অন করে চালিয়ে দেন প্রিয় কার্টুন চ্যানেল। ফোর জি আই প্যাডে ইচ্ছেমত ডাউনলোড করতে বলেন চমকপ্রদ গেম। তবে এখন আর কোনকিছুই ভাল্লাগে না তিন্নীর।


**************************************************************************



মল্লিকা রায় 

এ পর্যন্ত দুটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। অনলাইনেই বেশিরভাগ লেখালেখিতে অভ্যস্ত। বারাসাত উত্তর চব্বিশ পরগণার স্থায়ী বাসিন্দা। বিভিন্ন পত্র পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। পদক্ষেপ" সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদিকা। গল্প,কবিতা,উপন্যাস ইত্যাদি লেখায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন 

গল্প * প্রদীপ দে



লেঙটির রোল 

প্রদীপ দে 

       

এক আকাশ মেঘ। বৃষ্টির কিন্তু দেখা নেই। মনা আনমোনা মামা মর্মর এরও পাত্তা নেই। সেই কখন যে এগরোল আনতে গেছে এখনো কোন খবর নেই।  

বিকাল পাঁচটার সময় আদর করে বললে --  কিরে আজ ক্যামন ওয়েদার দেখেছিস?

--  হ্যাঁ দেখেছি। মনে হয় ঝড় বৃষ্টি হবে।

--  তাহলে রোল খাবি?

--  মামা,  তুমি রোল খাবে ? তোমার না বুকের সমস্যা?

--  না না ডাক্তার রোল খেতে মানা করেনি।

-  ওহঃ তাই নাকি?


এরপর আর কথা বাড়ায়নি মর্মর মামা। থলে হাতে বেড়িয়ে পড়েছে।

মনা শুধু চেঁচিয়েছে --  তা থলে নিচ্ছো কেন?

--  আরে প্রতিবেশীদের সব বোঝাতে নেই। লুকিয়ে  আনবো। সবাই ভাববে বাজার করেছি।


সেই মামা এখনো ফেরে নি। মনা দেখে দু ফোঁটা জল জানলা দিয়ে মাথায় যেন পড়লো! 

হ্যাঁ  ঠিকই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। এবার মনা কি করবে ?


মামা মর্মরকে মোবাইলে ফোন করতেও পারছে না, মোবাইল নিয়ে যায়নি, দেখা যাচ্ছে যন্ত্রটি টেবিলে অবহেলায় পড়ে আছে।

দশ মিনিট মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে গেল। শিলও পড়লো।

তখন মনা র মাথায় একটা  বুদ্ধি খেলে গেল।

মোবাইলে ফোন লাগালো মামার ডাক্তার কে। উনি একেবারে লাগোয়া পাড়ার বাসিন্দা।

-- হ্যালো -হ্যালো - ডাক্তারবাবু আমি মনা বলছি --

--  হ্যাঁ - হ্যাঁ  -- বুঝেছি। আমি তোমার ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলাম।

মনা ভয় পায় --  কেনো দাদু?  কিছু  হয়েছে? মামা ফেরেনি তুমি কিছু জানো?

--  জানি না আবার?  মামার পিঠে ঢামা বেঁধে দিয়েছি। এই বয়সে লুকিয়ে রোল খাওয়া?  তাও আবার এগের? ধরে এনে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। এটাই ওর শাস্তি।

-- সে কি গো ডাক্তার দাদু মামা শাস্তি পাচ্ছে?  মামা যে বলছিল তুমি এগরোল খেতে মানা করোনি?

-- মনা,  তুমি চলে এসো এখনই।  ব্যাগে রোলগুলো ঠান্ডা মেরে যাচ্ছে --  এসো, তুমি আর আমি মিলে ওদের সদ্গতি করি।

--  আচ্ছা আমি এই এলাম বলে।

মোবাইল বন্ধ করে মনা হাঁটা দেয় ডাক্তার বাড়িতে।



বাড়িতে কলিংবেল বাজাতেই ঝাঁজখাই গলায় ডাক্তার গিন্নির চিৎকার শোনা যায় --  কে- কে?

--  আমি মর্মর মামার ভাগ্নী মনা।

--  ওহঃ এসো এসো ভেতরে এসো। ভালোই হয়েছে দুজনার শাস্তি দেখে যাও।


মনা অবাক --  দুজনার মানে?

বিশাল চেহারার ডাক্তার গিন্নির মুখ ভর্তি  হাসি --  তবেই না?  ডাক্তার হয়ে পেশেন্টকে শাস্তি দেওয়ার নামে এগরোল গুলো সাঁটানোই ছিল মুল উদ্দেশ্য। আমি ঠিক সময়ে চলে এসেছি। একেব্বারে দুজনাকেই কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। তুমি এসেছো, ভালোই হয়েছে আমরা দুজনা মিলে এবার সস দিয়ে এগরোল গুলো খাবো --  চলো উপরে চলো।


উপরে উঠেই মনা তাজ্জব। ডাইনিং রুমে ডাক্তার দাদু আর মর্মর মামা কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

ডাক্তার গিন্নি মনাকে নিয়ে সামনের ডাইনিং টেবিলে বসে পড়ে। মামার থলে টেনে নেয়। 

রোল বার করতে গিয়ে--   

উরিবাব্বা! একিরে? --  বলে চেঁচিয়ে ওঠে গিন্নি!


মনাও ভয়ে চমকে ওঠে, টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ে একটা  ভয়ে।


কান ধরা ছেড়ে ডাক্তার আর মামা দৌড়ে আসে।

গিন্নি ভয়ে বেসামাল। সব্বাই অবাক হয়ে দেখে একটা লেংটি ইঁদুর ব্যাগের মধ্যে থেকে লাফিয়ে বের হয়ে ভয়ে, এক লাফে পগাড়পাড়!


চারজনে ব্যাগ উল্টে দেখে - এগরোল দুটি কুচিকুচি করে অনেকটাই খেয়ে নিয়েছে ব্যাটার ছেলে ওই পুচকে লেংটিটি!


*************************************************************************



প্রদীপ দে 

লেখক  নেশায়। পেশা ছিল হিসেবনিকেশ।  বয়স -৬২ । কলকাতা নিবাসী। বিবাহিত।
নিজের লেখা কয়েকটি বই আছে।


গল্প * দেবাংশু সরকার



কুমিরের কান্না 

দেবাংশু সরকার


রজত রায় একজন এম এল এ। রাজনীতিবিদ হলেও এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। তিনি একজন রাজনীতিবিদ হয়েও অনান্য রাজনীতিবিদদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। একজন এম এল এ হলেও তার দলের অনান্য এম এল এ দের থেকে গুনগত, চরিত্রগত দিক দিয়ে যেন শত যোজন দূরে অবস্থান করেন। জীবনের সব ক্ষেত্রেই কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ চোখে পড়ে। রজত তেমনি এক ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ। সাধারনত রাজনীতিবিদরা নিজেদের একটা গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখেন। জনসাধারণের থেকে তারা যে আলাদা সেটা প্রচ্ছন্ন ভাবে বুঝিয়ে দেন। নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভীষণ ভাবে সতর্ক থাকেন। কিন্তু রজত সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতার মানুষ। নিজেকে জনসাধারণের একজন বলেই মনে করেন তিনি। তার সঙ্গে না থাকে সরকারি নিরাপত্তা না থাকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়ান কখনো একা, কখনো পার্টির নামমাত্র কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে। রোজ সকালে ব্যাগ হাতে বাজার করতে যান। বাড়িতে তিনটে গাড়ি থাকতেও অনেক সময়ে তাকে সাইকেল চালাতে দেখা যায়। সাধারন মানুষ শ্রদ্ধা মিশ্রিত অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে, আর ভাবে এতো বড় নেতা কিন্তু একেবারে মাটির মানুষ! বিন্দুমাত্র অহঙ্কার নেই!


      সত্যি একেবারে মাটির মানুষ রজত। দিনের বেশির ভাগ সময় পায়ে হেঁটে এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বেড়ান। এর ওর বাড়ি ঢুকে গল্প জুড়ে দেন। চা খাওয়ানোর আব্দার করেন। হাসি মস্করা করেন। এমনকি বাচ্চাদের সঙ্গে লুডো খেলতেও বসে যান। নিজের বিধানসভা এলাকার প্রতেককেই খুব ভালো ভাবে চেনেন। প্রত্যেকের সুখ দুঃখের খবর রাখেন। বিপদে আপদে, অসুখে বিসুখে সব সময়ে জনগণের পাশে থাকেন। কত রাত যে তার হাসপাতালে কেটেছে তিনি নিজেও মনে করতে পারেন না। আনন্দ উৎসবে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। পাড়ার পুজোয় চাঁদা তোলা থেকে বিসর্জন সবেতেই থাকেন সক্রিয়ভাবে । বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলতেও যান।   কোনো জোর জুলুম নেই, গৃহস্থের দিকে চাঁদার বিল বাড়িয়ে তাদের অনুরোধ করেন টাকার অঙ্কটা লিখতে। বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আবির মাখতে মাখতে ঠাকুর বিসর্জনে যান। কখনো ঢাক বাজান। কালীপুজোর পঙতি ভোজনে সপরিবারে অংশ নিতেও দেখা যায়। বলতে গেলে জনগণের সঙ্গে কোনো দুরত্বই নেই তার। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে কে নেতা, কে জনতা আলাদা করা যায় না। তাই তার পার্টি অফিস সবসময়েই রথের মেলার মত লোকারণ্য থাকে। সবার সঙ্গে তিনি ধৈর্য ধরে কথা বলেন।


      দেখতে দেখতে ভোট এসে গেছে। রজতও ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। প্রত্যেক দিন বিভিন্ন জনসভায় ভাষণ, মিছিল, বাড়ি বাড়ি প্রচার সব কিছুই শুরু হয়ে গেছে। নাওয়া খাওয়ার সময় নেই রজতের। সারা দিন দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। এবারের প্রচারে একটু অভিনবত্ব দেখা যাচ্ছে। এক কুখ্যাত দাগী আসামীকে রজত সঙ্গী করেছেন। যে কিনা কয়েক বছর আগে রজতের দলের বেশ কয়েকজন নেতা কর্মীকে খুণ করে জেল খেটে এসেছে। ভাষণ দিতে গিয়ে রজত সব জায়গায় সেই ব্যাপারেই বলছেন, "আমি বিশ্বাস করি পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়। তাই আমি কালুকে আমার দলে নিয়েছি। আমি আমার অহিংস আদর্শে চালিত করে অপরাধী কালু, পাপী কালুর মধ্যে থেকে মানুষ কালুকে বের করে এনেছি। আজ আপনারা যদি দশবার কালুকে আঘাত করেন ও একবারও প্রত্যাঘাত করবে না। কারন অহিংসা, মানবিকতা কি সেটা আজ ও মর্মে মর্মে বুঝতে পেরেছে। ওর জ্ঞান চক্ষু আমি খুলে দিয়েছি। আপনারা বিচার করে দেখুন গত কয়েক বছরে বিরোধী দলের কেউ খুণ হয় নি। হবে কি করে? আমাদের দলে আগে যেসব অপরাধীরা ছিল, তাদের সবাইয়ের চিত্তসুদ্ধি করেছি। তাদের অপরাধী সত্তাটাকে টেনে বের করে তাদের মানুষে পরিণত করেছি। আমরা রক্ত ঝরানো রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমরা অহিংস রাজনীতির লড়াইতে বিশ্বাস করি। খুণী কালু যখন বিরোধী দলে ছিলো, তখন আমাদের ছেলেরা খুণ হতো। আর আজ মানুষ কালু আমাদের দলে তাই বিরোধীরা নিরাপদে আছে। অথচ দেখুন আমাদের ছেলেরা  খুণ হয়েই চলেছে। একজন কালু ওদের দল ছেড়েছে, ওরা সঙ্গে সঙ্গে দশটা কালু তৈরী করে ফেলেছে। আমি বিশ্বাস করি একজন মানুষকে খুণ করা যায়, কিন্তু একটা আদর্শকে খুণ করা যায় না। আর পৃথিবীতে এমন কোনো অস্ত্র নেই যা দিয়ে অহিংসা, মৈত্রী, প্রেমকে ধ্বংস করা যায়। এখন আপনারা ভেবে ঠিক করুন আপনারা কোন দিকে। হিংসা, খুণ, অত্যাচারের রাজনীতির দিকে নাকি অহিংসা, সহমর্মিতার দিকে।" রজতের ভাষণে জনগণ আবেগাপ্লুত হয়ে যায়। হাততালি দিতে দিতে, রজতের নামে জয়ধ্বনি করতে করতে বাড়ি ফেরে। ভোটের বাক্সে তার প্রতিফলন ঘটে। 


      আবার একদিন খবর আসে রজতের দলের আর একজন ছেলে খুণ হয়েছে। সমস্ত কাজ ফেলে ছুটলেন রজত। মৃতদেহ নিয়ে বিরাট শোক মিছিল করলেন। মৃতের বাবা, মা, আত্মীয়দের কাছে শোক জ্ঞাপন করলেন। বিরোধীদের প্ররোচনায় পা না দেওয়ার জন্য দলের ছেলেদের সতর্ক করলেন। সর্বোপরি অহিংস নীতিকে আঁকড়ে ধরে থাকতে বললেন। মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে সদলবলে শপথ নেন যে এই রক্তের বিনিময়েই তিনি শান্তি, অহিংসাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। সন্ধ্যায় বের করলেন এক মোমবাতি মিছিল।  রাস্তার দুধারে হাজার হাজার মানুষ ভারাক্রান্ত মনে মিছিল দেখলো।


      শোক মিছিলে রজতের ঠিক পেছনে হাঁটতে হাঁটতে কালু ভাবতে থাকে তার অতীতের কথা। বেশ কম বয়সেই কালু তার বাবাকে হারায়। ঘরের সামান্য একটু অংশও তার কাকা জ্যাঠারা তাকে, তার মাকে দিতে রাজি নয়। নিজের ঘর থেকে বিতাড়িত হয় তারা। বাড়িতে জায়গা হারিয়ে মায়ের হাত ধরে তেরো বছরের কালীপদ ওরফে কালু এসে উঠলো তার মামার বাড়িতে  এক অলিখিত চুক্তির মাধ্যমে। বাড়ির ঝি চাকরের পুরো দায়িত্বটা তাদের মা ছেলেকে নিতে হলো। বিনিময়ে পেতো দুবেলা দুমুঠো। ক্লাস সেভেনে পড়তে পড়তে কাকা জ্যাঠাদের অত্যাচারে বাড়ি ছেড়ে ছিলো কালু। লেখা পড়ার ওখানেই ইতি। মামার বাড়ি ফাই ফরমায়েস খাটতে খাটতে একদিন প্রমোশন হলো। মামার সুপারিশে পেলো রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকানে কাপ ধোয়ার চাকরি। সামান্য তিনশো টাকা মাইনে, সেটাও মামা কেড়ে নিতো! 


      চায়ের দোকানে কাজ করতে করতে বাইরের জগৎটাকে চিনতে থাকে কালু। চায়ের দোকানে চা খেতে, আড্ডা মারতে আসে বিভিন্ন ধরনের মানুষজন। তাদের মধ্যে অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। পাড়ার এক রাজনৈতিক কর্মী স্বপন ও তার বন্ধুদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা কানে আসে কালুর। মাঝে মাঝে কালুও কিছু জানতে চায় স্বপনদের কাছে। ক্রমশ ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। মিটিং মিছিলে ভিড় বাড়ানোর জন্য স্বপন কালুকে নিয়ে যায়। পার্টি অফিসেও যাতায়াত শুরু করলো কালু। বলতে গেলে স্বপন কালুর হাতে খড়ি দেয় রাজনীতিতে। ক্রমশ সে শাসক দল, বিরোধী দল, ছাপ্পা ভোট, প্রক্সি ভোট, বুথ দখল, বুথ জ্যাম, প্রভৃতি শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে। চায়ের দোকানের কাজে যে কোনো ভবিষ্যত নেই সেটা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছে কালু। রিপ্লেসমেন্ট খুঁজছে। কিন্তু ক্লাস সেভেন অবধি পড়াশোনা করা ছেলেকে ভালো চাকরি কে দেবে? অগত্যা পার্টির নেতাদের ধরে যদি কিছু হয়। কিন্তু একটা অশিক্ষিত মূর্খ ছেলের পক্ষে তাত্ত্বিক নেতা হওয়াও সম্ভব নয়। অবশ্য রাজনীতির ময়দান থেকে পয়সা কামানোর আরো অনেক রাস্তা আছে। রাজনীতি করতে করতে ছোটোখাটো দোকান থেকে প্রোমোটারি, বিভিন্ন রকমের ব্যবসা করে অনেকেই দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু ব্যবসা শুরু করার মত শিক্ষা বা অভিজ্ঞতা কোনো কিছুই কালুর নেই। আবার স্বপন রাস্তা দেখালো। নিয়ে গেলো গোপন ডেরায়। বোমা বাঁধা, চেম্বার চালানো শিখতে খুব বেশি সময় লাগলো না কালুর। ভোটের সময়ে বুথ দখল, এলাকা দখল, বুথ জ্যাম, ছাপ্পা মারা ক্রমশ কালুর বাঁ হাতের খেল হয়ে দাঁড়ালো। শার্ফ স্যুটার হিসেবে দলের মধ্যে তার বেশ সুনাম হয়েছে। ক্রমশ দলের মধ্যে তার গুরুত্ব বাড়তে লাগলো। দলের বড় মাপের নেতারাও তাকে সমঝে চলে।


      ভোট এসে গেলো। নেতাদের অঙ্গুলি হেলনে কালুরা মাঠে নেমে পড়লো। প্রান ওষ্ঠাগত করে তুললো সাধারন মানুষের। সন্ধ্যা নামতেই বোমাবাজি, গুলির আওয়াজ, বারুদের গন্ধে আতঙ্কিত মানুষজন ঘরবন্দি। কিন্তু বিধিবাম। দূরদর্শী নেতারাও দেওয়াল লিখন পড়তে ব্যর্থ। ভোটের দিন ভোর হতেই ভোট কেন্দ্রে লম্বা লাইন। দুপুর বারোটার মধ্যেই সত্তর ভাগ ভোট পড়ে গেলো। কালুরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও খুব বেশি ছাপ্পা দিতে পারলো না। বোঝা গেলো রুলিং পার্টির ঔদ্ধত্য জনগণ মেনে নেয় নি। হয়ে গেলো পালা বদল। পাল্টে গেলো রং।


      নেতারা মেনে নিলেও, কালুরা এই হার মানতে পারলো না। শুরু হলো ভোট পরবর্তী সংঘর্ষ। আবার শোনা যেতে লাগলো বোমা গুলির শব্দ। বাতাস ভরে উঠলো বারুদের গন্ধে। কিন্তু ভোটে হারা দলের ক্ষমতা সীমিত। একে একে গ্রেফতার হতে লাগলো কালুরা। শুরু হলো বন্দি জীবন। বিচারাধীন বন্দি। কোর্টে তারিখের পর তারিখ পড়ে। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেটে যায়, জামিন মঞ্জুর হয় না। চলতেই থাকে জেলের ঘানি টানা। অসহ্য এক বন্দি জীবন!


      কয়েক বছর কেটে যাওয়ার পর বর্তমান রুলিং পার্টির নেতা রজত রায় জেলে কালুর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। জেলারের সামনেই কালুকে বললেন, "তুই তোর ছেলেদের নিয়ে আমাদের দলে যোগ দে। তোদের জামিনের ব্যবস্থা করে দেবো। আর একটা কথা, আমাদের দল অন্যভাবে চলে। জেলার সাহেবের সামনেই বলছি, কোনো দিন তোকে বলবো না বিরোধী দলের কাউকে খুন করতে। এমনকি সামান্য আঘাত করতেও বলবো না।"


      কালু এক কথায় রাজি। জেল বন্দি থেকে মুক্তি পাবে। তার ওপর আর কারও রক্ত ঝরাতে হবে না। কে আর চায় নিজের হাতে রক্ত মাখতে!


      জেল থেকে বেরিয়ে কালুরা সদলবলে রজত রায়ের দলে যোগ দিলো। বিশেষ কোনও কাজ করতে হয় না। পার্টি অফিস খোলা, খাতাপত্র গুছিয়ে রাখা, রজতের সঙ্গে এখানে ওখানে যাওয়া, জনগণের সঙ্গে হেসে কথা বলা, বিপদে আপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো, সাহায্য করা। এসবের জন্য কালুরা অবশ্য ভালো মাসোহারা পায়।


      ক্রমশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো। কালুর মত দাগীরা রুলিং পার্টিতে থাকা স্বত্বেও বিরোধীরা নিশ্চিন্তে আছে। কেউ তাদের গায়ে হাত দেয় না। রক্ত ঝরায় না। অবশ্য ভোট এলে ছোটখাটো গোলমাল যে হয় না যে তা নয়। কিন্তু দেখা যায় রুলিং পার্টির দু একজন খুণ হয়। বোঝা যায় বিরোধী দল আবার গোপনে শক্তি সঞ্চয় করছে। শোকার্ত রজত তার সতীর্থদের ধৈর্য ধরতে বলেন। বলেন অহিংস নীতিতে আস্থা রাখতে।


      এই ভাবেই কেটে যায় বছরের পর বছর। ভোট আসে ভোট যায়। প্রতিবারই রজতের দল পুরানো রেকর্ড ভেঙে আরো বড় ব্যবধানে জয়ী হয়। চার বারের নির্বাচিত এম এল এ রজত অবশ্য মন্ত্রীত্বের পথে পা বাড়ান নি। প্রস্তাব যে ছিল না তা নয়। কিন্তু রজত দলীয় সংগঠনকে মজবুত করা এবং জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।


      আবার ভোট আসছে। পার্টি অফিসগুলোতে আবার ভিড় বাড়ছে। ভোটের প্রচার, দেওয়াল লিখনের পরিকল্পনা চলছে। রজতও ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। যদিও কোনো দল এখনো প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না করলেও, রজত ভোটে  দাঁড়াবেন এবং আবার পুরানো রেকর্ড ভেঙে আরো বড় ব্যবধানে জয়ী হবেন সেটা পরিস্কার। এবারে তিনি কত ব্যবধানে জিতবেন তাই নিয়ে পার্টি অফিসে একটা সমীক্ষা চলছে। ভোটার লিস্টের প্রত্যেক ভোটারকে ধরে ধরে আলোচনা হচ্ছে । গত ইস্তাহার অনুযায়ী কতটা কাজ হয়েছে, কতটা বাকি আছে, তারও চুল চেরা বিশ্লেষন হচ্ছে।


      এমনই একদিন অনেক রাতে পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে রজত বাড়ি ফিরলেন। বাড়িতে কেউ নেই। কোনো এক আত্মীয়ের বাড়ির অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গেছে সবাই। কিন্তু রজতের পক্ষে যাওয়া সম্ভব হয় নি, ভোটের ব্যস্ততার জন্য। পার্টি অফিসেই রাতের খাওয়াটা সেরে নিয়েছেন। বাড়ি ফিরে বেশ অবাক হলেন। বাইরের দরজার তালাটা খোলা! এরকম ভুল তার সাধারনত হয় না। হয়তো ভোটের ব্যস্ততার জন্য তাড়াহুড়োয় তালা দিতে ভুলে গেছেন। ঘরে ঢুকলেন, আলো জ্বালালেন। একি! ভুত দেখার মত চমকে উঠলেন রজত।


       -কালু তুই এখানে?


      -হ্যাঁ রজত দা। তোমার সঙ্গে একটা জরুরি ব্যাপারে পার্সোনালি আলোচনা করতে এলাম। তোমার দরজার তালাটা ভাঙার জন্য ক্ষমা করো। এছাড়া আমার আর কিছু করার ছিলো না। তোমার সঙ্গে একান্তে কথা বলার জন্য এটাই একমাত্র পথ। আজ তোমার বাড়ি বেশ ফাঁকা। সব কিছুর জন্যই বেশ অনুকূল পরিবেশ।


     কোনো এক অজানা আতঙ্কে একটু যেন কেঁপে উঠলেন রজত। নরখাদক সিংহের সামনে অভিজ্ঞ রিং মাষ্টারের মত মুহুর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে স্বভাবসিদ্ধ দৃঢ় কন্ঠে বলে ওঠেন, "বল, কি তোর জরুরি ব্যাপার, যার জন্য মাঝরাতে এতো কান্ড ঘটালি।"


      "এবার কে টিকিট পাবে সেটা নিয়ে আলোচনা করতে এলাম। তুমিতো অনেক দিন রাজ করলে। এবার টিকিটটা আমাকে দাও।" কালুর কথায় আব্দার, হুমকি যেন মিলেমিশে আছে।

"সেকিরে! তুই দাঁড়ালেতো জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে।" সশব্দে হেসে ওঠেন রজত। একটু থেমে আবার বলতে থাকেন, "আগে পাবলিকের কাছে নিজের গ্রহণ যোগ্যতা প্রমান কর। তারপর ওসব ভাববি।"


      - কেন পনেরো বছরে কি সেটা তৈরি হয়নি? আমি কি এরমধ্যে বিরোধী দলের একজনকেও আঘাত করেছি?


      - সেতো আমার পলিশি। মানে আমাদের দলের পলিশির জন্য। না হলে কি যে ঘটিয়ে ফেলতিস কে জানে! ঠিক আছে মাথা ঠান্ডা কর। মন দিয়ে কাজ কর। কিছুদিন অপেক্ষা কর, তোকে একটা কাউন্সিলারের পোস্ট দেবো।


      - সেতো দাদা তিন বছর পর! ততদিনে তুমি সব ভুলে যাবে।


      - নারে, না। আমি কিছুই ভুলি না। জেলে দাঁড়িয়ে তোকে বলেছিলাম যে বিরোধীদের কাউকে খুণ করতে বলবো না। সেই কথা রেখেছি কিনা বল? আমার কথার একটা দাম আছে, সেটা মাথায় রাখিস।


      - কিন্তু বিরোধী দলের না হলেও, প্রতিবার ভোট এলে নিজের দলের কাউকে না কাউকে আমাকে দিয়ে খুণ করিয়ে তুমি কুমিরের কান্না কেঁদেছো।


      - ওরে, ভোট একটা পুজো। আর পাবলিক হচ্ছে দেবতা। দেবতার বর লাভ করতে হলে কিছু না কিছু উৎসর্গ করতে হয়। বলি দিতে হয়। আর বিরোধী দলের লোক মেরে লাভ কি? পাবলিকের সিমপ্যাথি অন্য দিকে চলে যেতে পারে। তাই ওদের পরোক্ষ ভাবে প্রোটেকশন দিতে হয়। বুঝলি রাজনীতিতে আমাদের সাফল্যের ইউ এস পি টা।


      - খুব ভালো ভাবেই বুঝেছি। তাই তৈরি হয়ে এসেছি। এবার আমি কুমিরের কান্না কাঁদবো। আর তুমি হবে ভোটের বলি। তৈরি হও।


      ঝলসে উঠলো সাইলেন্সার লাগানো আগ্নেয়াস্ত্র। ছলকে পড়লো রক্ত। আবার একটা বিশাল শোক মিছিল। রাস্তার দুধারে হাজার হাজার মানুষ চোখের জলে বিদায় জানালো তাদের প্রিয় নেতাকে। 


      শববাহী গাড়ির পেছনে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে, সজল নয়নে, কান্না ভেজা গলায়, স্লোগান দিতে দিতে চলেছেন কালীপদ বাবু - রজত রায় অমর রহে, রজত রায় অমর রহে।


************************************************************************



দেবাংশু সরকার

পেশা মেডিকেল রিপ্রেসেন্টেটিভ। স্কুলের পত্রিকায় নিয়মিত লেখার অভ্যাস থাকলেও। তারপর দীর্ঘ বিরতি। লকডাউনের প্রথম বছরটা(2020) কেটে যায় টিভিতে রামায়ণ, মহাভারত দেখে। লকডাউনের দ্বিতীয় বছরের (2021) অখন্ড অবসরে লেখালেখির দ্বিতীয় ইনিংসের শুরু ।

সাম্প্রতিক লেখা  - প্রজাপতি সাহিত্য পত্রিকা/ সৃজন সাহিত্য পত্রিকা/ রংমিলন্তি প্রকাশন/ কারুলিপি অনুগল্প সংকলন/ অবেক্ষন/ ড্যাস সাহিত্য পত্রিকা/ লেখা ঘর সাহিত্য পত্রিকা/ মৌনমুখর সাহিত্য পত্রিকা/ তুলি কলম আকাশ/ ঘোড়সওয়ার/ স্নিগ্ধা প্রকাশন/ নীরব আলো প্রভৃতিতে প্রকাশিত হয়েছে ।

                    

গল্প * শতদল মিত্র



দুয়োভূমি 

শতদল মিত্র 


প্রকৃতি জাগরসম্ভব হয়, এ জাগতিকতায় সময় টুকুন স্থানু, যেন বা থমমারা, যদিও তা পলমাত্র, কেননা পরক্ষণেই প্রাকৃত চোখে আঁধার মুছে আলোর ঝিলিক, ফলে নিথর বাতাস আবার মৃদুমন্দে ঘাই তোলে, এ ছন্দে আকাশ বলে-- আলো হবে, সকল বৃক্ষপাতা চোখ মেলে বলে-- আলো হবে, ঘুমের ঘরের থেকে তাবৎ প্রাণীকুল আলিস্যি ঝেড়ে বলে-- আলো হবে। ব্রহ্ম জাগে। ভোর হয়। তখন আচরাচরে কুসুম-কুসুম মায়া।

     সে মায়ায় শঙ্কর অবচেতন থেকে চেতনে ফেরে, আবার ফেরেও না, যেহেতু তার চৈতন্যে তখনও বেদনারঙিন পুরাণ স্বপ্নের রেশ। স্বপ্নে নদীটি তিরতির বয়ে যায় পথের পাশটি দিয়ে। তার ছলাৎ ঢেউ হাসে-- কতদিন পর এলে! পথের ধুলো পায়ে লুটোয়-- এলে তবে! তার মাথায় বৃক্ষপাতার ছোঁয়া-- ভালো আছ তো! এ মায়াটানে কোকিলের হঠাৎ কুহুতান পঞ্চমে ভেসে এলে ভোরখানি অঘোর হয়। নদীটির ওপারে দিগন্তের দরজা সপাট খুলে একটি দোচালা ঘর বসত করে সহসা। যার উঠোনে একটি আমগাছের শীতল ছায়া, তুলসীতলার পাশে জবা ফুলের পবিত্রতা, যা গেরস্তের সুখছবিই যেন। সে ঘরখানি থেকে সদ্যযুবতী এক সদ্যস্নানের স্নিগ্ধতা মেখে, যেন বা নৃত্যপারা আলোতে বার হয়।

    --মা, আসি। আজ ফিরতে বেলা হবে। কলেজের পর টিউশুনি আছে।

      --দুগ্গা! দুগ্গা! এ অস্ফুট রবের সঙ্গে মমতাময়ী এক ফুটে ওঠে, যার বসনজুড়ে তেল-হলুদের বাস।

     --সাঁঝ লাগাস না যেন।

     এর উত্তরে চিলতে হাসি নাচে মেয়েটির মুখে, যার দোহারকিতে তার হাতের সাইকেল আওয়াজ তোলে-- ক্রিঙ!  ক্রিঙ!

     সে ধরতাইয়ে বাণী ভাসে-- সত্যি! বাবাটা যে কী! এত বেলা হল, এখনও মাঠ থেকে ফিরল না। আবার অসুখ বাধালে তখন? দাদাটা বিভুঁই থেকে কত আর সামলাবে?

     এ বাণীতে ছায়া থাকায় তা সজলতার পরশ আঁকে শঙ্করের চোখে, যে সজলতায় মাটিবাসের একজন মানুষ পরম মমতায় নিরানি দেয় মাঠজোড়া গাভীন সবুজে। এক কাঁচ-কাঁচ ব্যথা ঘনায় শঙ্করের বুকে, যা কুয়াশা নামায় আজমিনআশমানে। আর সে কুয়াশা ঠেলে কিশোর শঙ্কর বাবার হাত ধরে মুঠ আনতে মাঠে যায় আমনশরীর আউশের ঘ্রাণ মেখে। যদিও সে আনন্দ যাত্রায় হঠাৎই হোঁচট লেগেছিল, কেননা তার নজর টেনেছিল বোবা একজোড়া কাতর চোখ। ধানবোঝাই গাড়ি কাঁধে এক বলদ নিরুপায় বসে পড়েছিল কাদায়। এ নেকনে তার গায়ে পিঠে মালিকের সপাং সপাং পাঁচনবাড়ির বোল ওঠে, নামে... বার বার, বারংবার।

     --শালা, নামুনে খাবে শুধু! কাজের বেলায় ঢুঁ ঢুঁ! আজ তোর একদিন কি আমার একদিন। হারামজাদা, বোদো! নেতার মারি তোর বোদোমির।

     তখনও, এখনও-- এ দৃশ্য অসহায় বিষাদমগ্ন হওয়ায় সে, শঙ্কর, এক পাঁজর নিংড়ানো শ্বাস ছাড়ে। এ ঘাতে নদীটির জল ছলাৎ ঢেউ ভাঙলে সময় চিড় খায়। সে ফাটল বেয়ে ক্ষীণ ধ্বনি উথলে ওঠে, ঘূর্ণি তোলে।

     --শঙ্করা রে, তোর বাবার শরিলটো জুতের লয় বড়। প্যাটের বেদনাটো কমছে না রে।

    --দাদা, আমি বিয়ে করব না। কলেজে পড়ব।

     সে ধ্বনির ঘূর্ণি পাক খায়, ওপরবাগে ওঠে, যেন বা শঙ্করকে দুমড়ে-মুচড়ে। সে টানে শঙ্কর তরতরিয়ে ওপরে ওঠে, উঠতেই থাকে। রাম-দুই-তিন... বিশতলা-বাইশতলা। হুই উঁচু থেকে সমগ্র শহর ছোটোপারা, সকল মানুষ, বাড়ি, গাড়ি, এমন কি লৌহপুরুষের বিরাট ধাতবমূর্তিখানিও খাটো, ঝুলনের পুতুল যেন। এ উঁচাই-এ মেঘ পরশ দেয়। বিহ্বল শঙ্কর মেঘবিলাসী হয়। এ মেঘই কি তাদের গাঁয়ে যাবে? তার ঘর? ভাবে শঙ্কর। এ মেঘস্বপনে ঘর দোলা দেওয়ায় মেঘ একদিন ডেকে নেয় শঙ্করকে তার ডানায়। ঘরকাঙাল শঙ্কর ভাসতে ভাসতে উড়ে চলে তার গ্রামপানে। ভাসতেই থাকে, ভাসতেই থাকে। কিন্তু কোথাও পৌঁছায় না। এবং মাঝপথে হারিয়ে যায় সে। নিমনাগরিক শঙ্করদের হারিয়ে যেতে দেওয়া হয়, যেহেতু সংবিধানে জীবনের অধিকার, সেহেতু শ্রম আইনে সুরক্ষা-নিরাপত্তামাখা কথাগুলো আবছা হলেও এখনও দেগে থাকে।

আবার নিয়তি এই যে হারিয়ে যাওয়া, বেঘর, ভাসমান শঙ্করদের শেষ স্বপ্নে আবহমানের ঘরই  ঘাই মারে, ফলে ঘর জিওল হয় তাদের আনজীবনে। আর সে ঘরটানে আমাদের শঙ্কর আপাতত ভেসে ওঠে তার গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট নদীটির পারে। এ মায়ায় একটি পাখি আনমনে ডেকে ওঠে-- চোখ গেল! অন্য একটি ডানার আলিস্যি ভেঙে জানান দেয়--ক্ব!  ওমনি ভোরেরআকাশ মুখ ধোয় নদীটির তির-তির জলে। নিশাচর ছায়াশরীরগুলো নদীতীর থেকে সরে গিয়ে সেঁধিয়ে যায় পুরাণ পাকুড়বৃক্ষের খোঁদলে। প্রাকৃত সে আঁধারে শেষতম বাদুড়টিও ঝুলে পড়ে ক্রমে। মাটি থেকে উদ্ভিন্ন বালখিল্য মুনি, ক্রাতব যে, ফুকরায়-- মায়া! মায়া! এই বলে তপঃক্লিষ্ট সে অমর মানব ফিরে যায় বাদুড় মায়ের বুকে, স্তন্যপানে মায়া-অবশ সাধনায়। এ অবসরে পুন্নাম মায়া জাগলে নদীটি উজিয়ে আমাদের শঙ্করের পা ভিজিয়ে দেয়। শঙ্কর ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তীর ছেড়ে জলে নামে। এক বাঁও, দু বাঁও... জল আহ্লাদে টেনে নেয় তাকে তার বুকের আদরে। আপাতত শঙ্কর বিন্দুবৎ, বা কয়েকটা বুদবুদ ঘূর্ণি, দূর স্রোতের। পেছনে পড়ে থাকে তার বাতিল ছায়াসমূহ-- যা ভোটার কার্ডের, আধার পত্রের বায়োমেট্রিক কুহকতার।

     এবং কুহক কথাটি মোহময়, তাই এই ক্ষণে নদীটির ওপরে দিগন্তের দরজা আবারও সপাট খুলে যায়। খোলা দিগন্তে ফুটে ওঠে একলা এক ভোরের স্বপ্ন, দুয়োভূমির এক মায়ের—শঙ্করা এলি!

     রাত চিরে জবাকুসুম আলো জাগে। যেমন জেগেছিল গতদিনে। যেমন জাগবে আগামীতেও। 



*****************************************************************************



শতদল মিত্র 

জন্ম: বৈশাখ 1368(ইং-1961)
আদি নিবাস: লাভপুর, বীরভূম। 
বর্তমানে কলকাতা নিবাসী।
পেশা: মুদ্রণ প্রযুক্তিবিদ
সম্পাদক: "কথক"
*প্রকাশিত বই:
কবিতা:
গড়িয়ে দিলাম কথা
লিখি নদীজল
মুনিবান 
পোড়া মৃত্তিকা হারানো জন্ম
রাত্রি লিখি রোদ্রের আখরে 
বিভাব কবিতাগুচ্ছ
গল্প: 
শালগাছ কিংবা অতিলৌকিক আখ্যানগুচ্ছ 
নরেন ভাণ্ডারীর জীবনবৃত্তান্ত 
উপন্যাস
মাটির দুর্গের সেনা 
খননডিহি
জিওলবট কিংবা নিমজীবন কথা