ছড়া : উৎপত্তি ও বিকাশ
তপন পাত্র
"ছড়া ছড়া ছড়া
নাড়লো কবে কড়া,
নানা মুনির নানা মত
আজব ও মনগড়া।"
বাংলা সাহিত্যে প্রথম কবে ছড়া রচিত হয়েছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচকের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। সেই সমস্ত মতামত যুক্তিগ্রাহ্য মনে না করে এক আধুনিক ছড়াকার ছড়া লিখেছেন, যা এই রচনার প্রথমেই উদ্ধৃত। এ কথাটি অবশ্যই ধ্রুব সত্য যে কে, কবে, কখন ছড়া রচনা শুরু করেছেন তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব।
সকল ভাষার প্রথম সাহিত্য অবশ্যই লোকসাহিত্য আবার লোকসাহিত্যের আদি সৃষ্টি ছড়া বলেই সকলে বিবেচনা করেন।সকল ভাষার মতো বাংলা ভাষার ছড়াগুলিও লোক সাহিত্যেরই অংশবিশেষ। স্বাভাবিকভাবেই লোকছড়াগুলি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন বলে বিবেচিত হয়ে এসেছে বিগত শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন বলে সাহিত্যের ঐতিহাসিকেরা উল্লেখ করেছিলেন খনার বচন এবং ডাক পুরুষের কথাকে। সেগুলি প্রবাদপ্রতিম। কিন্তু ১৯০৭ সালে মহা মহোপাধ্যায় পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় নেপালের রাজ দরবারের পুঁথিশালা থেকে চর্যাপদ আবিষ্কার এবং সম্পাদনা করে ১৯১৬ সালে কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশের পর বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতামত বদলে গেল। চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন বলে বিবেচিত হলো।
ছড়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে কোন কোন সাহিত্যের সমালোচক মন্তব্য করলেন চর্যাপদের প্রথম পদটি সহ আরো বেশ কয়েকটি পদ ছড়ার আঙ্গিকে স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত। কিন্তু এ কথা সর্বৈব অসত্য। এই পদের গঠন পদ্ধতিতে কোনভাবেই স্বরবৃত্ত ছন্দ অনুসৃত হয়নি, যা হয়েছে তা প্রাচীন মাত্রাবৃত্ত, সর্বোচ্চ ছন্দ হিসেবে মনে হলেও অন্তত এর বিষয়বস্তু ছড়ার বিষয়বস্তু নয়, একথা পাঠক মাত্রই বিবেচনা করবেন। আবার কোন কোন সমালোচক বলেছেন, অন্নদামঙ্গলের কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়ের কাব্যে প্রথম স্বরবৃত্ত ছন্দ অর্থাৎ ছড়ার ছন্দ ব্যবহৃত হয়েছে। একথাও যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কারণ তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এই কাব্য রচনা করেছেন। কাব্যে গঙ্গার তরঙ্গের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি যে চরণগুলি ব্যবহার করেছেন, সেখানে স্বরবৃত্ত ছন্দ অনুসৃত হয়েছে, কিন্তু বাংলা সাহিত্যে সেটি প্রথম স্বরবৃত্ত রীতির ব্যবহার নয়। আবার বৈষ্ণব পদাবলী এবং শাক্ত পদাবলীর কোথাও কোথাও অল্পস্বল্প স্বরবৃত্ত রীতি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু সেই অংশগুলোকে সঠিক অর্থে প্রকৃত ছড়া বলা যায় না।
তাহলে নানা মুনির নানা মতের ঘন অরণ্যে প্রবেশ না করে আমরা খুব সহজেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, প্রচলিত লোক ছড়া, খনার বচন, ডাক পুরুষের কথা ---এগুলোই ছড়ার আদি সৃষ্টি, আদি রূপ। যেহেতু মুখে মুখে ফিরেছে বাংলা ভাষার সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকেই, কিন্তু পাথর প্রমাণ অকাট্য যুক্তি নেই ঠিক কোন দিন, কে বা কারা এগুলো রচনা করলেন, হয়তো তাই বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন রূপে পরবর্তীকালে এগুলো বিবেচিত হলো না। পন্ডিতেরা চর্যাপদ কে প্রাচীনতম নিদর্শন বলে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে যত বেশি উঠে পড়ে লাগলেন লোক ছড়াগুলোকে ঠিক ততখানি গুরুত্ব দিলেন না। এর ফলে ছড়া প্রেমিক, ছড়া রচয়িতাদের অভিমান হতেই পারে। তাঁরা ছড়ার সৃষ্টিকাল নিয়ে, উদ্ভবকাল নিয়ে মন্তব্য দাতাদের বিরুদ্ধে ছড়া রচনা করতেই পারেন। তাঁদের মতামত কে "আজব" ও "মনগড়া" বলতেই পারেন।
একটু সুস্থ ভাবধারার মানুষ, নিরপেক্ষ বিচার প্রেমিক মানুষ মাত্রই স্বীকার করবেন যে, বিভিন্ন ধরনের লোক ছাড়া যেমন --- ছেলে ভুলানো ছড়া, ঘুম পাড়ানি ছড়া, মেয়েলি ছড়া, খেলাধুলার ছড়া, রা'তকথা বা ভাঙানির মতো ছড়ার আঙ্গিকে লেখা দু চার লাইনের রচনাগুলি আধুনিক ছড়ার পূর্ববর্তী প্রচলিত রূপ। এবং এ প্রসঙ্গে অবশ্যই খনার বচন ও ডাক পুরুষের কথা চলে আসে।
যতদূর জানা যায় খনা পালযুগ অর্থাৎ অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে কোন এক সময় জীবিত ছিলেন। প্রচলিত একটি কিংবদন্তি অনুসারে তিনি পশ্চিমবাংলায় অধুনা উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের কাছে দেউলিয়া গ্রামে বসবাস করতেন। অপর একটি কিংবদন্তি অনুসারে তিনি সিংহল রাজের কন্যা ছিলেন।
এই মহিলা বাঙালি জ্যোতিষী ছড়ার আকারে অনেক অনেক উপদেশমূলক বাক্যগুলি রচনা করেছিলেন যেগুলি কৃষিতত্ত্ব, আবহাওয়া, কৃষিকাজ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং শস্যের যত্নের নানান দিক সূচিত করে।ডাক পুরুষের কথা প্রসঙ্গে কেউ বলেছেন প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের কথা বা ছড়া, সকল কথায় আবহাওয়ার কৃষি জীবন প্রকৃতি ও সামাজিক নিয়ম-কানুন বিষয়ক উপদেশ রয়েছে। আবার অনেকেরই বক্তব্য 'ডাক' নামক একজন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের হীনযান শাখার তন্ত্র সাধক ছিলেন। তিনিও খনার সমসাময়িক। কিংবদন্তি আছে ডাক মানুষের দুঃখ দূর্দশা দূর করতে এবং ভবিষ্যতের জন্য উপদেশ দিতে পারতেন। আবার এমন কথারও প্রচলন আছে যে, ডাক পৃথিবীর মানুষের সংবাদ নিয়ে নাকি স্বর্গধামে পৌঁছে দিতেন। এই খবরাখবর প্রদানের কাজ করতেন বলেই তিনি ডাক পুরুষ নামে সুপরিচিত। কারো কারো মতে আবার ডাক পুরুষ হলেন পূর্ববঙ্গের একজন মানুষ এবং বৌদ্ধ সাধক। লোকছড়া, খনার বচন এবং ডাক পুরুষের কথা --এগুলিই ছড়ার প্রথম পর্ব এ বিষয়ে খুব একটা সন্দেহের অবকাশ নেই। সম্ভবত প্রসিদ্ধ ছড়াকার যোগীন্দ্রনাথ সরকার কলকাতার সিটি বুক সোসাইটি থেকে ১৮৯৯ সালে লৌকিক ছড়াগুলিকে প্রথম গ্রন্থভূক্ত করেন, নাম দিয়েছিলেন "খুকুমণির ছড়া"।
অনেকেই যেমন চর্যাপদের প্রথম পদটি সহ অন্যান্য কিছু পদকে স্বরবৃত্ত রীতিতে রচিত ছড়া বলেছেন , তেমনি কিছু কিছু বিদগ্ধ পণ্ডিত বলেছেন, স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত আধুনিক ছড়ার উদ্ভব মধ্যযুগীয় কাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এর ধামালি ছন্দ থেকে , কেননা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ব্যবহৃত ধামালি ছন্দে স্বরবৃত্তের পূর্ববর্তী রূপটি পরিলক্ষিত হয়। এ কাব্যের শব্দে যেহেতু হসন্ত(্) উচ্চারণ নেই এবং অকারান্ত শব্দ অকারান্ত রূপেই উচ্চারিত হয়, সেহেতু পর্বের আদিতে শ্বাসাঘাত স্পষ্ট না হলেও তার ইঙ্গিত রয়েছে। ধামালী হলো প্রাচীন বাংলা কাব্যের একটি লৌকিক ছন্দ রীতি,যাতে আদিরসাত্মক কোনো বিষয় বাদ্য-বাজনা সহযোগে গ্রামের প্রান্তে এক বিশেষ শ্রেণীর শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে গীত হতো। এই ছন্দ লৌকিক ছড়ার ছন্দ বা স্বরবৃত্তরীতির ছন্দের উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রসঙ্গত 'লাচাড়ি'র কথা আসে। বাংলার প্রাচীন সুরুচিসম্পন্ন লোকগানের লৌকিক রীতির ছন্দকে বলে লাচাড়ি। লাচাড়ি স্বরবৃত্ত বা শ্বাসাঘাত প্রধান ছন্দরীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। লাচাড়ির সঙ্গে ধামালীর পার্থক্য কেবলমাত্র বিষয় নির্বাচনে। ভদ্র, সংস্কৃত, সর্বদা সকলের উপস্থিতিতেই শ্রবণযোগ্য ও রুচিকর বিষয় হলে তাকে বলে লাচাড়ি, তা-ই যদি গ্রাম্য, অশ্লীল বা আদি রসাত্মক হয়, তাহলে তা হলো ধামালী। পঞ্চদশ শতাব্দীর কবি বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে প্রথম ধামালী শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সেখানে শ্রীরাধার প্রতি শ্রীকৃষ্ণের অশ্লীল ব্যবহারের ছবি ফুটে উঠেছে বারংবার এই ছন্দের মধ্য দিয়ে। ছান্দসিক আচার্য প্রবোধচন্দ্র সেন "ধামালী" শব্দটির অর্থ করেছেন --"ধাবমান" বা "দ্রুতগতি যুক্ত"। যেটাকে আমরা আধুনিক ছড়ার পূর্বসূরী বলে ব্যাখ্যা করতেই পারি। অন্তত ছন্দের দ্রুত গতির বিষয়টি লক্ষ্য রেখে।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের পর আসে বৈষ্ণব পদাবলীর কথা। বৈষ্ণব পদাবলির কবি লোচনদাসের পদাবলিতে স্বরবৃত্ত ছন্দের পর্বগত শ্বাসাঘাত সুস্পষ্ট, যাকে অতি সহজেই ছড়ার ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্যরূপে চিহ্নিত করা যায়। লোচন দাসের একটি পদে পাচ্ছি:
"কুল খোয়াবি বাউরি হবি লাগবে রসের ঢেউ।
লোচন বলে রসিক হলে বুঝতে নারে কেউ।।"
এরকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে বৈষ্ণব পদাবলীতে আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে,যেগুলোকে আধুনিক ছড়ার পূর্ববর্তী পদক্ষেপ বলা যায়।
বৈষ্ণব পদাবলীর সমসাময়িক ও পরবর্তী সময়ে শাক্ত পদাবলীতেও ছড়ার ছন্দ লক্ষ্য করা গেছে একটু বেশি বেশি পরিমাণেই। লোকপ্রিয় এই ছন্দকে রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত প্রমুখ শাক্ত কবিগণ খুব সুন্দর করে ব্যবহার করেছেন। যেমন --
(১) সারাদিন করেছি মাগো সঙ্গী লয়ে ধুলাখেলা,
ধুলা ঝেড়ে কোলে নে মা এসেছি গো সন্ধ্যাবেলা।
(২) শিহরি মা মনে হলে কাল সকালে নিয়ে যাবে,
মরি ত্রাসে কৈলাসে গো কেমনে মা দিন কাটাবে।
(৩) আর অভিমান করিস নে মা ক্ষমা দে মা ও শঙ্করী।
দু' নয়নে বহে ধারা মা হয়ে কি সইতে পারি।।
এক কথায় লৌকিক ছড়ার ছন্দ বা স্বরবৃত্ত ছন্দ, চর্যাপদ ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তন পেরিয়ে বৈষ্ণবপদাবলীর পথ অতিক্রম করে কাব্য সাহিত্যের ধারাবাহিকতায় অষ্টাদশ শতকে শ্যামা সংগীত,আধুনিক মঙ্গলকাব্য, গোপীচন্দ্রের গান, , বাউল গান, পাঁচালি ও মৈমনসিংহ-গীতিকার, এছাড়া প্রচলিত টুসু গান, ভাদু গানের বিবর্তনের মধ্য দিয়েও পরিপুষ্টি লাভ করে আধুনিক যুগে ছড়ার ছন্দরূপে পরিপূর্ণ ও স্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, জন্ম হয়েছে প্রকৃত আধুনিক সাহিত্যিক ছড়ার। উদাহরণ হিসেবে পুরুলিয়ার টুসু গানের মাত্র দুটি চরণ উদ্ধার করছি, যেখান থেকে ছড়ার ছন্দটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।
"পুরুলিয়ার পৎনি পকা উড়ে গেলে ধ'রব না।
যার সঙে যার ভালোবাসা, পরান গেলে ছা'ড়ব না।।"
এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে আজকের পার্থ চট্টোপাধ্যায় --যাঁরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করলেন, তাঁরা কিন্তু কেউ পৃথকভাবে ছড়াকে কোন স্থান দেননি। পদাবলী, কাব্য, নাটক, উপন্যাস,ছোটগল্প, প্রবন্ধ সহ বিভিন্ন শ্রেণী সাহিত্যের ইতিহাসে যুক্ত হলেও ছড়া হলো না। কেন হলো না জানি না। তার সদুত্তর খুঁজে পাই না। দুয়েক লাইনে কবিদের কবিতা প্রসঙ্গে তাঁদের ছড়ার কথা এসেছে নমো নমো করে। এ কথা সত্য যে, আমরা যদি লোক ছড়ার কথা বাদ দিই তাহলে তারপর থেকে খনার বচন , ডাক পুরুষের কথা থেকে শুরু করে বাংলা কাব্য সাহিত্যের ধারায় প্রায় সর্বত্রই স্বরবৃত্ত ছন্দ বা দলবৃত্ত বা শ্বাসাঘাতপ্রধান বা বলবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার থাকলেও সেগুলো সঠিক অর্থে ছড়া নয়, ছড়ার ছন্দে লেখা গান অথবা কবিতা; ধাঁধা অথবা ভাঙানি। প্রকৃত আধুনিক ছড়ার সৃষ্টি তারও অনেক পরে। কারণ প্রকৃত ছড়া সার্বিকভাবে শিশুর সঙ্গে, শিশু মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মূলত এর শ্রোতাও শিশু আর এর গঠন প্রকৃতির মধ্যেও যেন কোথায় রয়ে গেছে একটা শিশুসুলভ চপলতা, ছড়া শুনতে শুনতে বুড়ো জেঠুও হয়ে ওঠেন সবুজ কচি শিশু। শিশুই তো এই মায়াময়, মোহময় বসুন্ধরার বুকে চির নতুন ও চির পুরাতন প্রাণসম্পদ। তাই তাদের নিয়ে, তাদের জন্য, তাদের মতো করে যে সাহিত্য,যে ছন্দোবদ্ধ বাণী ঝংকার, সেই বেদমন্ত্রগুলি ব্যাকরণগত দিক থেকে অসঙ্গত হতেই পারে, অংশত অর্থহীন হতেও পারে, 'যা ইচ্ছে তাই' হতে পারে, আবোল তাবল হতে পারে,আর পারে বলেই তো সেগুলি ছড়া। এককথায় পর্বের আদি অক্ষরে শাসাঘাত যুক্ত, দ্রুত লয় আশ্রিত, চার মাত্রার পূর্ণ পর্বে গঠিত, যে সুপ্রাচীন লৌকিক ছন্দে শিশুদের উপযোগী, শিশুদের আনন্দ-বিনোদনমূলক ছোট ছোট আকারের ছান্দিক কবিতা, তারই নাম ছড়া। এতে(১) চরণের সঙ্গে চরণের কোন অর্থযুক্ত পারস্পর্য নাও থাকতে পারে,(২) অর্থের চাইতে ধ্বনি এবং লয়ের গুরুত্ব অধিকতর,(৩) এই সাহিত্য কণা কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নিগড়ে বাঁধা নয়, (৪) এর পাঠ ছন্দযতি অনুসারে, অর্থযতির ধার ধারে না, (৫) এতে কিছু কিছু অর্থহীন বর্ণগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়, যেগুলি ব্যাকরণসম্মতভাবে শব্দ নয় কিন্তু অনুভবে শব্দের মর্যাদা পেয়ে যায়। অনেক সময় এক ভাষার ছড়াকে অন্য ভাষায় কিছুতেই অনুবাদ করা যায় না, ছড়ার এ এক মস্ত যাদু!
বাংলা ছড়া সাহিত্যে যে নামগুলি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে, যাঁদের ছড়া শিশুদের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মতো মুখভার বয়স্ক মানুষেদেরও মন ভাল করে দেয় তাঁরা হলেন -উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, যোগীন্দ্রনাথ সরকার,সুকুমার রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, সত্যজিৎ রায়, লীলা মজুমদার, অন্নদাশঙ্কর রায়, জসীমউদ্দীন, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শিবরাম চক্রবর্তী, সুনির্মল বসু, নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, হেমচন্দ্র বাগচী, দীনেশ দাস, গোলাম মোস্তফা, বন্দে আলী মিয়া, ভবানীপ্রসাদ মজুমদার প্রমুখ আরো অনেক অনেক ছড়াকার। সময়ের সাথে সাথে ছড়ার রূপ বদল ঘটেছে। দ্রুতলের ছন্দ আরো দ্রুতগতি লাভ করেছে। ছড়ার প্রতিটি চরণে চার মাত্রার পর্ব থাকে চারটি। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। কখনো কখনো চার পর্বের চরণের জায়গায় দু পর্বের চরণ লক্ষ্য করা যায়। চার মাত্রার পরিবর্তে পাঁচ মাত্রার ও তিন মাত্রার ব্যতিক্রম পর্ব লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু মাত্রা গননায় হেরফের লক্ষ্য করা গেলেও উচ্চারণ প্রকৃতিতে ছড়াটি পাঠ করতে বা আবৃত্তি করতে কোন অসুবিধা হয় না। সম্প্রতি তো চার মাত্রার পরিবর্তে সম্পূর্ণ তিন মাত্রার পর্বেও ছড়া রচিত হচ্ছে। আধুনিক ছড়ার গতিপ্রকৃতি এবং বিষয়বস্তুর ক্রমপরিবর্তনগুলি ধরা একটি সুদীর্ঘ আলোচনার বিষয়। খুব সংক্ষেপে বলা সম্ভব নয় যে,
"লটে গাছটি মুড়োলো,
গল্প আমার ফুরোলো।"
তাই আপাতত তিন মাত্রার পর্ব বিশিষ্ট পাঁচটি পর্বের চরণে রচিত মাত্রা গণনার বিচারে সর্বাধুনিক একটি ছড়ার দুটি চরণ উল্লেখ করে এই আলোচনার ইতি টানছি ---
"সুমন ধন ফুল নেয় গো চুমু দেয় গো চুম নেয় গো সব জনায়,
তুল তুল তুল ফুল ফুল ফুল তার গাল ওই সব গাল ওই দেয় রাঙায়।"


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন