সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬

‘স্বরবর্ণে’ প্রকাশিত কবি গৌরীশঙ্কর দে-র কবিতা





শব্দের অন্তর্গত নিস্তব্ধতা 


আমি জন্মাইনি—  

শুধু একটি ভুল উচ্চারণের ভেতর  

একটি অনুপস্থিত নামের মতো ভেসে উঠেছি।


আমার ছায়া নেই,  

তবু প্রতিটি দেয়ালে  

আমি নিজেকে দেখি  

একটি অদৃশ্য আয়নার ভেতর।


সময় এখানে  

একটি ভাঙা ঘড়ির ফাঁকে  

নিজেকে খুঁজে ফেরে,  

যেন অতীতই ভবিষ্যতের ভুল বানান।


আমি হাঁটি—  

একটি শব্দহীন শহরের ভেতর,  

যেখানে প্রতিটি রাস্তা  

একটি কবিতার অসমাপ্ত স্তবক।


মৃত্যু আসে না,  

সে শুধু অপেক্ষা করে  

একটি অক্ষরের ভুল ব্যাখ্যার মতো,  

যেখানে জীবন নিজেই  

নিজেকে অস্বীকার করে।


আমি লিখি না—  

আমি শুধু মুছে ফেলি  

যে ভাষা আমাকে চিনতে চায়,  

তাকে অচেনা করে তুলি।



কেন লিখি? 


আমি লিখি না,  

আমার আঙুলে এক মৃত পাখির ছায়া লিখে যায়  

আকাশের উল্টো পিঠে।


জীবন তখন  

একটি ঘুমন্ত ঘড়ি,  

যার কাঁটা সময়কে নয়,  

শুধু অনুপস্থিতিকে মাপে।


মৃত্যু আসে না—  

সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে  

একটি দরজার মতো,  

যার চাবি প্রতিটি কবিতার ভেতরেই হারিয়ে যায়।


আমি লিখি—  

"আজ আমি একটি শব্দের অন্তর্গত শূন্যতা,  

যেখানে ব্যাকরণ নিজেই আত্মহত্যা করেছে।"


তারা গোনে না,  

তারা শুধু ঝরে পড়ে  

একটি অদৃশ্য ক্যালেন্ডারের পাতায়,  

যেখানে দিনগুলো কেবল  

অস্তিত্বের ভুল বানান।


আমার কলমে রক্ত নেই,  

তবু প্রতিটি অক্ষর  

একটি মৃত আত্মার পুনর্জন্ম।


আমি লিখি,  

যেন লিখছি না—  

শুধু অনুপস্থিতির দিকে  

একটি অন্ধ চোখ ছুঁড়ে দিচ্ছি।



অভয়া দশমী 


১.

যে লুপ্ত প্রণয় তুমি গুপ্ত রেখেছিলে আমাদের 

দুজনের মধ্যে, আজ তার বাঁধ ভেঙে দিলে,

প্রোটন-ইলেকট্রন-নিউট্রন কণা যেখানে ট্রিনিটি 

ভেঙে যায় অথচ প্রকৃতপক্ষে ভাঙে না কিছুই...

লেপটন ভেঙে যায় প্রথমে ইলেকট্রনে দশম মন্ডলে

আসীৎ তমসা গূঢ়মগ্রেহমের অন্ধকার কোলে,

দুধ-জল এক কারণ সে পরম তমসা, টিটি 

নেই, কে দেখবে টিকিট, ট্রেন চলে প্রতিপলে ঢের

সময় গড়ায়, মৃত্যু দীর্ঘ দাবা খেলে, কোনো রুই,

কাৎলা, মৃগেল সে নয়, বঁড়শি ডুবে আছে স্থির, মাচা বেয়ে পুঁই—



২.

সুদীর্ঘ পতন হয় 'সা' 'নি' এসে মেশে যেই স্পেস নড়ে যায়,

সময় ঘামায় না সে মাথা,  ফাৎনায়, দাবার বোর্ডে

কেবল বেড়ায় ভেসে চিদাকাশে কী অবলীলায় 

চলে যায় পশ্চিম দিগন্তে জয়সীমা, চান্দু বোরদে,

অবশেষে সুনীল গাভাসকার, সৌরভ গাঙ্গুলি...

শতেক শতাব্দী ধরে ফুটে ওঠে গাছে ফুলগুলি...

মানুষ তাদের নিয়ে দেবতার পায়ে ছোঁড়ে ওদিকে আর জি 

করে

কেঁদে মরে বিচারের আশায় আশায় অভয়ার কায়াহীন 

ছায়া, মাথা খোঁড়ে মিছিলে মিছিলে ওরা রাত্রিদিন

কাঁদে, প্রতিবাদে অন্ধকার রাতে অতন্দ্র প্রহরে। 



৩.

দশ পংক্তি বিভাজিত দশদিক ঢাকা হাহাকারে, 

গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে  নীরবে ছড়ায় এক তীব্র প্রতিবাদ—

যেখানে দাঁড়ায় মেঘ কিছুক্ষণ বন্যা এসে শেষে কাটা ঘা'য়

লবণ ছিটিয়ে তাকে আরো গূঢ়তর রুদ্ধ দ্বারে

বন্দী করে রাখে ঘোরতর হিটলারি কায়দায়, 

পুড়ে ছাই হয়ে যায় জতুগৃহের সে আগুনে নিরপরাধ 

অন্য পাঁচ ভাই, ভাবি তাই বিচার কোথায় মহাভারতের 

কাল থেকে আজো! দুঃশলাকে বিবাহ করাই কি জয়দ্রথের

ভুল ছিল, রথ থেকে এক ধাক্কায় মাটিতে ফেললে ট্রিনিটির

আজ্ঞায় অর্জুন ছুঁড়ে দেন পুত্রের মায়ায় প্রতিহিংস্র তীর?



সনেটগুচ্ছ 


কড়ি


আবার রাতের পাখি মেলে দিলো ঘুম,

চোখের নিস্তব্ধ তীরে বেহিসাবি নীড়।

জমাট কান্নার জল চাতক পাখির,

বৃষ্টির অধিক প্রিয় নিবিড় নি:ঝুম। 


বৃষ্টি পড়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্তাক্ত নিশীথ, 

একা একা হেঁটে যায় হিমেল মৌসুম। 

পায়ের তলায় ভাঙা ডিমের কুসুম,

কুসুমিত আলস্যে কি ডাকে পরভৃৎ? 


নীচে রক্ত উপরেও রক্তাক্ত পৃথিবী—

ও পৃথিবী কবে বল কোল পেতে নিবি?


বিদায়ের পদধ্বনি অতীব নির্জন।

অক্লান্ত ঘড়ির শব্দে একাকী পাগল,

হেঁটে যায় স্বপ্নে তার সঙ্গিনী মরণ,

সঙ্গ নেয় চোখ ভরা যোনি—অশ্রুজল।



বরগা


প্রৌঢ়ত্বে আচ্ছন্ন পুরুষের স্ত্রীকে বহু

নিকটের বলে বোধ হয়। এ বিজ্ঞান

শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের, অবসন্ন লহু,

মাঘ মাসে মার্জারের রতির আহ্বান।


যৌবন দামাল নৌকা, তার পাড় ভাঙা 

কাজ। সে লুণ্ঠন করে চলে মাতৃদুগ্ধ,

তার জন্য একটি নারীর কামরাঙা 

শরীরে প্রলুব্ধ হয়, 'যেন' দিলে ক্ষুব্ধ 


হয় কবিতার বহুতল। 'মতো' শব্দে

ভস্ম মেখে পড়ে থাকে শব্দের জাঙাল,

পেরিয়ে প্রান্তর, খুঁজে নিতে সে প্রারব্ধে

তালগাছে বসে থাকে  বাবুই কাঙাল। 


বাসা বাঁধে রাধিকাকে নিয়ে ঘনঘোর,

নূপুরের এই ধ্বনি শান্ত মনোহর।



খিলান 


মেশিনের পাশে শুয়ে রয়েছে মেশিন ।

মেশিনে মেশিনে রোদ-বৃষ্টি বিনিময় 

চলে কিছুক্ষণ, পরে প্রচন্ড প্রণয়

জন্ম দেয় এইদেশে প্রজন্ম নবীন ।


এখানে নরম থাবা বিছিয়েছে চীন।

'মুসলিম ঘৃণা করি' আজো লেখা হয়,

যন্ত্রের নিয়মে চলে এদেশে সময়,

রোদেলা কান্নায় ভেজে মুড়িমাখা দিন।


এখানে সনেট ভালো চলে কবিতায়,

কুকুর-বেড়াল নিয়ে মেশিনেরা চড়ে।

শনি-রবি ফূর্তি আর সোম-শুক্রে কাজ,

সেলফোনে বাবা-মাকে বেশ দেখা যায়,

কেবল যায়না দেখা ভয়ের বিবরে,

করুণ শ্বাসের শব্দ, সাপের আওয়াজ।



গম্বুজ 


এলো কী কান্তার ভেঙে নতুন কবিতা, 

আন্দালুসিয়ায় বসে আমি তা লিখেছি 

অন্তিম শব্দের জন্মদাতা আদি পিতা 

আমি শব্দে শব্দ ঠুকে অগ্নি জ্বালিয়েছি। 


এলিজাবেথের যুগ থেকে শুরু করে

এখনো চলেছি লিখে সনেট কত যে!

আমার বনেটে তাই পড়ে না নজরে 

বসেছে সুপর্ণাদুটি প্রেমের সহজে। 


ঘরে ফাঁদ পাতা আছে মরেছে ইঁদুর। 

গন্ধে তার সন্ত বসে আছে মাদারির,

আশ্চর্য খেলায় মেতে করি ঘুরঘুর,

মৃত্যুর সেতারে তুলি মীড়ের আবির,


কী ফিনকি দিয়ে রক্ত দোলপূর্ণিমায়,

সনেট সমীপে ছোটে মুগ্ধ কবিতা



ওমর খৈয়ামের রুবাই

অনুবাদ  * গৌরীশঙ্কর দে 



Rubai No.10 of Omar Khayyam


With me along some Strip of Herbage strown

That just divides the desert from swon,

Where name of Slave and Sultan Scarce is known,

And pity Sultan Mahmud on his Throne.


* From the translation of  Edward FitzGerald



ওমর খৈয়ামের রুবাই-১০


চলো আমার সঙ্গে কোনো ভেষজ বনের কুঞ্জ পথে 

মরুভূমির ভেদ যেখানে শস্যশীলা ক্ষেত্র হতে, 

উধাও যেথা বাদশা গোলাম সব ভেদাভেদ এ জগতে, 

এবং যামুদশা-ও তুচ্ছ তখতে আসীন কোনোমতে।



Rubai No.11 of Omar Khayyam


Here with a loaf of bread beneath the Bough, 

A Flask of Wine, a Book of Verse- and Thou 

        Beside me singing in the Wilderness-

And wildness is Paradise enow.


* From the translation of Edward FitzGerald



ওমর খৈয়ামের রুবাই-১১


এইখানে এই বৃক্ষশাখার নীচে নিয়ে স্বল্প আহার, 

এক পাত্র সুরা, একটি কাব্য গ্রন্থ— এবং তার

     মধ্যে আমার কাছে বসে তুমি মরুভূমির মাঝে- 

হঠাৎ মরুর মধ্যে পেলে যথেষ্ট জান্নাতের বাহার।



Runbai No.12 of Omar Khayyam


'How sweet is mortal Sovarnty'—think some: 

Others—'How best the Paradise to come!'

    Ah, take the cash in hand and waive the rest; 

Oh, the brave Music of a distant Drum


*From the translation of Edward FitzGerald



ওমর খৈয়ামের রুবাই-১২


কেউ ভাবে— 'এই নশ্বরতার রাজত্বটা কী সুমধুর' : 

কারোর কাছে—'স্বর্গলাভই সবচে ভালো আসন্ন সুর! 

আহ্, যাও তো নগদবিদায় করে এবার বিশ্রামেতে, 

ওহ্, শ্রবণ বন্ধ রাখো শেষের বাদ্যি নয়রে সুদূর!



Rubai No.13 of Of Omar Khayyam


Look to the Rose that blows about us-'Lo, 

Laughing, she says, 'into the World I blow;

   'At once the silken Tassel of my purse 

Tear, and its Treasure on the Garden throw.'


* From the translation of Edward FitzGerald.



ওমর খৈয়ামের রুবাই-১৩


মোদের তরে গোলাপবালার মনভুলানো হাসিটা—'দেখ, 

হাসছে,' বলছে, 'ধরার পরে বইছি আমি এটাই অনেক;

    'এক্ষুনি এই রেশমি বাঁধন ছিন্ন করে টাকার থলির

ঐশ্বর্যের ভাণ্ডটা এর করছি বাগিচায় নিক্ষেপ।'



Rubai No.14 of Omar Khayyam


The Worldly Hope Men set their Hearts upon 

Turns Ashes— or it prospers; and anon,

    Like Snow upon the Desert's dusty Face 

Lighing a little Hour or two- is gone.


*From the translation of Edward Fitzgerald.



ওমর খৈয়ামের রুবাই-১৪


পার্থিব আশা যার উপরে মানুষ করে হৃদয় স্থাপন 

ভস্মে মিলায়-সমৃদ্ধ হয়, ও ঘটে তার সঙ্গেই বিস্মরণ, 

       মলিন মরুর বুকে বরফের মতো তার মুখ

ঝলসায় দু'এক মুহূর্ত—আর চলে যায় সুমধুর ক্ষণ।



Rubai No.15 of Omar Khayyam


And those who husbanded the Golden Grain, 

And those flung it to the Winds like rain,

     Alike to no such aureate Earth are turn'd 

As, buried once, Men want dug up again.


*From translation of OEdward FitzGerald



ওমর খৈয়ামের রুবাই -১৫


আর যারা সঞ্চয় করেছ শস্যদানা স্বর্ণাভ ফল, 

আর যারা নিক্ষেপ করেছ হাওয়ায় যেন বৃষ্টির জল, 

    দোঁহার কাছেই ঝলমলে এই পৃথিবীটা দেয়না ধরা 

যেমন কবর পেলে মাটি খোঁড়েনা আর মনুষ্যদল।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন