সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬

সৈয়দ কওসর জামাল






আমার বন্ধু গৌরীশঙ্কর দে

সৈয়দ কওসর জামাল



“লিখতেই হবে? কবির মজুরি পাও

বিনা-সম্মেলন থেকে ফিরে?

বগলে কলম নিয়ে পাপোষে ঘুমাও

তোদের কি চৈতন্য হবেনি রে!”


কবিতা নিয়ে, কবিদের নিয়ে, এমন মশকরা করার প্রবণতা কম ছিল না গৌরীশঙ্করের। অথচ সে ছিল কবিতাপ্রাণ। কবিতালেখার ভাবনাই তাকে মাঝে মাঝে কৌতুকপ্রবণতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ কথা লেখার সময় আমি মনে করতে পারি গৌরীশঙ্করের কৌতুকপ্রিয় মুখটিকে। হয়তো এভাবেই কবিতা লিখে ও কবিদের সান্নিধ্যে জীবন কাটিয়ে দিতে চেয়েছিল সে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে জীবনই কৌতুক করেছে তার সঙ্গে, বাঁচতে দেয়নি তাকে। ৬৫ বছর খুব কি বেশি বয়স? সে তো আমার চেয়ে হিসেবমতো দশ বছরের ছোটো ছিল, কিন্তু আমাদের বন্ধু হতে বয়স বাধা হয়নি। 

আমাদের বন্ধুকবি তুষার চৌধুরীকে খুবই মান্য করত গৌরীশঙ্কর। তুষারকে প্রায় মধ্যমণি করে পার্ক স্ট্রিটের পানশালায় কবিদের যে আড্ডা জমে উঠত গোটা নব্বইয়ের দশকজুড়ে, সেখানেই একদিন তার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল। ধর্মতলার ছোটো ব্রিস্টলেও গৌরী যেত বলে শুনেছি কিন্তু পারতপক্ষে সেখানে যেতাম না। সেখানেও লক্ষ করেছি বন্ধুদের সঙ্গে তার মজা করার প্রবণতা। খুব সিরিয়াস আলোচনার মধ্যেও গৌরীর অভ্যেস ছিল হঠাৎ-ই মজা করে সব ঘেঁটে দেবার ইচ্ছে। অথচ কবিতা নিয়ে কম সিরিয়াস ছিল না সে। তুষারের মৃত্যুর পর ও মজা করেই বলত আমাকে, তুষারদা নেই, এখন তুমিই আমার দাদা ও অভিভাবক। টেলিফোনেও বলেছে। জানি যে তুষার চলে যাওয়ার পর আড্ডাও নেই, কিংবা অন্য আড্ডা থাকলেও শারীরিক কারণে সে কোথাও পৌঁছোতে পারত না। ফলত ওর কোথাও একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছিল মনের কোণে।

চলে যাওয়ার বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই শরীর সায় দেয়নি তার কাজে। কবিসভায় কম যেত, গেলেও স্ত্রীর সঙ্গে গেছে। মনে হয় শারীরিক কারণেই কোথাও আত্মবিশ্বাসের অভাব ঘটেছিল। দীর্ঘদিন ধরে অ্যজমা তাকে কাবু করে রেখেছিল। বছর ছয়েক আগে বন্ধু প্রজিতের (জানা) কাছে শুনলাম গৌরী খুব অসুস্থ, একদিন দুজনে ওকে দেখতেও গেলাম। আমাদের পেয়ে কোথায় অসুস্থতা! এত আড্ডা হল সারা সন্ধেজুড়ে যে মনে হল গৌরীর মতো সুস্থ আর কেউ নেই।

গৌরীশঙ্করের প্রিয় বিষয় ছিল আধ্যাত্মিকতা। ভালোবাসত ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে, তাঁর বাণী। এসব সে নিজেই আমাকে জানাত। পরক্ষণেই কৌতুকের সুরে বলত, তুমি তো আবার কিছুই মানো না! তবে যাই করুক, পাশাপাশি গীতবিতানকে রাখত নিজের কাছে। কবিতায় লিখেছে—

“আমার কলম এঁকে যাবে ছায়াপথ

যেখানে গীতবিতান, কথামৃত, এর

বিশ্বের জাগ্রত চোখে সাগর-পর্বত।‘


মনে করিয়ে দিই যে গৌরীশঙ্কর ছিল পদার্থবিদ্যার ছাত্র। ছাত্রজীবনের পরেও নিজের বিষয়ে তার পড়াশুনো ছিল। ব্যক্তিগত আলোচনাকালে দেখেছি পদার্থবিদ্যার কিছু কিছু বিষয় উঠে আসছে তার কথায়। আমি সাহিত্যের ছাত্র হওয়ার পদার্থবিদ্যার অনেককিছুই জানতে চাইতাম ওর কাছে। কবিতাতেও কি এসব বিষয় ধরা পড়েনি? গৌরী লিখেছে কবিতায় ‘হিগস-বোসন কণা’র কথা। এ ছাড়া আরও অনেক বিষয়, কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে আমার লেখাকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না।

গদ্যে পদ্যে অনেক কবিতা লিখেছে গৌরীশঙ্কর। ছন্দ ও অন্ত্যমিলের প্রতি দুর্বলতাও লক্ষ করেছি দুএকটি কাব্যগ্রন্থে। আবার ছন্দে লেখা কবিতা নিয়ে কৌতুক করতেও ছাড়েনি। সনেট লিখতেও ভালোবাসত। ওর লেখা অনেক সনেট আমারও পছন্দের। সবমিলিয়ে  গৌরীশঙ্কর কবি, সিরিয়াস কবি এবং ভালো কবি। একটি কাব্যগ্রন্থের ভূমিকা থেকে একটু অংশ পড়লে দেখবেন কবিতা সম্পর্কে তার গভীর ধারণার কথা—

“একজন কবিকে বাঁচতে হলে যা করতে হয় তা, কবিতানির্মাণ। সংকল্পের ধাঁচ্ব অবিরল কলম চালিয়ে যেতে যেতে কখনো সখনো কবিতার জন্ম হয়, প্রতিটি মুহূর্তে লাফ দিতে হয় উপরে-নীচে, ডাইনে-বামে, সামনে-পিছনে সময়ের পরিমিতিবোধে। এর বাইরে কোনও বিজ্ঞান হয়নি সম্ভবত আজও প্রমাণিত হলেও তা স্বীকৃতি পায়নি। চারমাত্রিক ভুবনায়নে স্ট্রিং থিয়োরির দশমহাবিদ্যা তাই ক্রমাগত আরও মাত্রার জন্ম দিতে চায়, মহীনের ঘোড়া বা উটের গ্রীবার মতো বিলীন প্রদোষে আশ্চর্যজনক! এই আশ্চর্য প্রাণময় এক বিস্ময়ই শাশ্বত।”

(কথামুখ, আমার নিভৃতাবাস, ২০২২)


হয়তো আড়ালে থেকেই লিখে গেছে এবং কখনও প্রচারের আলোয় আসার তাগিদ লক্ষ করিনি তার মধ্যে। কিন্তু আমার ধারণা কবি হিসেবে তাকে মান্যতা না দিয়ে উপায় নেই। নিজেকে কবি হিসেবেই তৈরি করেছিল সে। নিয়মিত চর্চার মধ্যে থেকেছে। চলে যাওয়ার আগে যখন প্রায় বেরোনো বন্ধ তখন কি মারাত্মক সব কবিতা ও লিখে গেছে ফেসবুকে। তার ফেসবুক বন্ধুরা এখনও ওর টাইমলাইনে গেলে দেখবেন প্রায় রোজই কবিতা পোস্ট করেছে। পত্রপত্রিকাতেও লিখেছে। শুনলাম ওর কবিতাসংগ্রহ প্রকাশের আয়োজন চলছে। খুবই আনন্দের কথা। চাই যে আমার বন্ধু কবি গৌরীশঙ্কর দে-র কবিতা আরও আরও পঠিত হোক।




*********************************************

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন