এক গ্রীষ্মের দুপুর, বালিগঞ্জ: ভারি হয়ে উঠছে মন
দেবার্ঘ সেন
স্মৃতি, আসলে এমন এক দীর্ঘ-সরণী, যা ধরে অনায়াসে কাটিয়ে আসা যায় অতীতের মুহূর্তগুলোয়। এই যেমন আমাকে এখন বেরিয়ে পড়তে হবে একদা এক গ্রীষ্মের দুপুরে বালিগঞ্জের উদ্দেশ্যে। যার মধ্যে রয়েছে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা, স্বীকৃতি, সম্মান এবং সান্নিধ্য।সুতরাং এই বেরিয়ে পড়া আমার কাছে এক-প্রকার কোমল আবেগের। আর যাকে ঘিরে এই আবেগ, এই শিশুসুলভ চঞ্চলতা, তিনি আর কেউ নন আমাদের গৌরীদা— কবি গৌরীশংকর দে।
বহু সাক্ষাৎ, বহু কথা, বহু টেলিফোন, বিভিন্ন বিষয়ের আদান-প্রদান ইত্যাদি সমস্ত কিছু অমলিন থাকলেও, শুরুতেই এক গ্রীষ্মের দুপুর, বালিগঞ্জ অর্থাৎ তাঁর নিবাসের উদ্দেশ্যে আমার বেরিয়ে পড়ার এই যে পূর্বোল্লেখ— তা সম্পূর্ণই আলাদা এক অনুভূতির, যা ব্যক্তিগত দিক থেকে আমার কাছে ভীষণ রকম সোনালী ও ততোধিক উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
গত ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ থেকে গৌরীদা আর নেই, নেই অর্থাৎ শারীরিকভাবে আমরা তাঁকে আর পাবো না কোনোদিনই। কিন্তু যাঁরা তাঁর অকৃত্রিম স্নেহস্পর্শ পেয়েছি কেবল তাঁরাই জানি গৌরীদা আমাদের কাছে কতখানি সপ্রাণ জীবিত হয়ে থাকবেন।
ফিরে আসি গ্রীষ্মের সেই দুপুরের কথায়, যেদিন প্রথম নিমন্ত্রিত ছিলাম গৌরীদার বাড়িতে। মুখ্যত যার কারণ ছিল, তিনি আমার জলরঙে আঁকা একটি ছবি সংগ্রহ করছেন। যা ঘিরে আমার মধ্যে তৈরি হয়েছিল এক রোমহর্ষক উন্মাদনা, আর গৌরীদার ছিল হাতে পাওয়ার অপেক্ষাজনিত অস্থির এক পাগলামো। যে পাগলামো মানুষের মাঝে মানুষকে ব্যতিক্রম করে তোলে, মানুষের ভেতর মানুষকে মহান করে তোলে। সারাটা পথ যেতে যেতে সেই সময়ও আমি এই সবই ভাবছিলাম আর পাশাপাশি এও ভাবছিলাম, যে ছবিটি তিনি সমূল্যে সংগ্রহ করছেন তার মধ্যে তো আমি কোনও বিশেষত্ব পাইনি। উজ্জ্বল দিবালোকে এক রেলস্টেশনে দুটি ট্রেনের (একটি লোকাল, আরেকটি দূরপাল্লার) পাশাপাশি অবস্থানের সামান্য এক আউটডোর কম্পোজিশন, কী এমন ভাবালো তাঁকে যার জন্য তিনি আমায় ছবিটির অরিজিনাল সংগ্রহ করতে চেয়ে বিশেষ বার্তা পাঠালেন। আসলে হয়তো শিল্প-সৌন্দর্যের নির্দিষ্ট কোনও সূচক থাকে না। যার ফলে কার যে, কখন কোথায় হৃদয় নেচে ওঠে তা বুঝে ওঠা মুশকিল, যদিও কোনোভাবেই তা বুঝতে চাওয়া আবশ্যিকও নয়।
বাংলা ভাষার কবিতা চর্চায় প্রকাশ্যে এসেছি বছর আট-নয় হলো। অজস্র অনুষ্ঠান, মঞ্চ, আলো— এসবে কোনওদিনই আমার বিশ্বাস ছিল না। কাজেই বরাবরই আমার বিশ্বাস আমাকে যে পথ দেখিয়েছে, সে পথে পেয়েছি প্রকৃতের খোঁজ ও সঙ্গ। যেখানে কোনও চাটুকারিতার ভ্রম নেই। আর বিশ্বাসই তো সেই পথ, যে পথে একই বিশ্বাসের মানুষের সাথে আলাপ হয়ে যায়। বছর চার-পাঁচ আগে সেই ভাবেই কবিতার মধ্য দিয়ে কবি গৌরীশংকর দে-র সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রপাত। মূলত, দশকে বিশ্বাসী না হ'লেও, কবির যাত্রাপথ বোঝার সুবিধার্থে দশকের প্রয়োজন এসে পড়ে। গৌরীদা সেই দিক থেকে আট-এর দশকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কবি।
আটের দশক অর্থাৎ উত্তাল সাতের দশক পরবর্তী যে দশক ছিল এক নতুন যোগাযোগমুখী ও আত্মসচেতন ধারার সূচনাকাল। সেই সময়ের কবিতায় উঠে এসেছিল আত্মকেন্দ্রিকতার বদলে সামাজিক বাস্তবতা ও নাগরিক জীবন। স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল কবিতার ভাষা। প্রথাগত ধারণা-শৃঙ্খল ভেঙে সে দশক দিয়েছিল নতুন কাব্যশৈলী ও শব্দের ব্যবহার।
আটের দশক সংক্রান্ত এই অতিসংক্ষেপিত ভূমিকার যে কারণে জরুরি উদ্রেক তা, গৌরীদার কবিতাকে বুঝতে ও বোঝাতে প্রবলভাবে প্রক্ষেপিত করে। এই যেমন আমরা যদি তাঁর রচিত ''অশ্রুপাতের নীচে'' কাব্যগ্রন্থের 'প্রাইভেট সেক্রেটারি' শীর্ষক কবিতাটি পড়ি, যেখানে তিনি লিখছেন—
'সাজানো ছিল অনেকগুলো কারণ
ধ্বংস এসে ঢেকে দেবার ফাঁকে
দু-চোখ মেলে দেখি, সে অসাধারণ
পুনঃ পুনঃ প্রণাম করে মাকে।
উপড়ে নিতে গিয়ে গোলাপচারা
কেউ কি আর কাঁটাকে ভয় পায়;
পারলে কিছু শিকড়েই দেয় সাড়া
পাতারা ধূলিমলিন, অসহায়।
পতন চায় সমূহ বৈরাগ্যে
যেভাবে ছাড়ে সন্ন্যাসীকে মা,
তেমনি কোনো গভীরতর আজ্ঞায়
সুদূরে যাক বিপথগামী পা।
তথাপি ছিঁড়ে পড়তে পারে শিকে,
ধ্বংস আনে পতনে চোরাটান।
সাক্ষী রাখে অবোধ জননীকে
মা বলে: রিনা চাকরি খুঁজে আন।
ফেরে না মেয়ে চাকরি শেষে ঘরে
রাত্রি আসে, রাত্রি ফিরে যায়।
সহসা দেখি প্রভাতি অক্ষরে:
বোসপুকুরে ভাসছে রিনা রায়!'
কবিতাটির শুরু থেকে শেষাবধি যে অন্তর্গত স্বর, যেখানে প্রকট হয়ে ওঠে সামাজিক বাস্তবতা, নাগরিক জীবন, যা সময়কে মাথায় রেখে প্রত্যক্ষভাবে যোগাযোগ স্থাপন করতে চায় পাঠকের সঙ্গে, জানিয়ে দিতে চায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, বুঝিয়ে দিতে চায় অর্থ-সংকট, দাসত্ব এবং তার নৈপুণ্য শিকার। ঠিক একইরকমভাবে কবি গৌরীশংকর দে-র অজস্র কবিতার উল্লেখ ক'রে বারবারই বাংলা কবিতার ক্রমবিবর্তনের যে অন্তর্দহন তা তুলে ধরা যায় অচকিতেই।
স্মৃতি-সাম্রাজ্যের পরিব্যপ্তি যতই হোক না কেন, কোথাও যেন সবটা বলতে চেয়েও, বলা হয়ে ওঠে না। তাই কখনও কখনও তা অনির্বচনীয় হয়ে থেকে যায়। এই যেমন লিখতে লিখতে মনে পড়ে যাচ্ছে গৌরীদার অভিমান, চোখের কোণে জল, বসা-ওঠা, সকালের মতো হাসি, কথায় কথায় একদিকে শ্রীমা আরেকদিকে বদরক্তের উল্লেখ, আরও কতকিছুই না। সেই যে গ্রীষ্মের দুপুরের কথা বলতে বলতে জানি না কী হ'ল মাঝখানে হঠাৎই কবিতায় চলে গিয়েছিলাম, সেই দুপুর ডিঙিয়ে যখন তাঁর বাড়িতে পৌঁছাই তখন প্রায় বিকেল এবং সেইদিন তাঁর হাতে ছবি তুলে দেওয়া, জলখাবার সহযোগে কবিতার আড্ডা, সেদিনের সকালে-দুপুরে তাঁর লেখা কয়েকটি কবিতা শোনা এবং কবিতা পড়ে তাঁর স্বগতোক্তি 'বদরক্ত বের করে দিলাম' এরকম আরও কতকিছু।
গৌরীদা কবিতা রচনার প্রতি যতখানি নিবিড় ছিলেন ততখানিই সৎ ছিলেন, যে সততা আজকের দিনে প্রকৃতার্থে বিরল, যার প্রমাণ রাখে তাঁর ধারাবাহিক কবিতাচর্চা। ২০২৫-এর কলকাতা বইমেলায় 'পাটাতন' প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত কবি গৌরীশংকর দে-র 'কোম্পানির কাগজপত্তর' বইটিও সেই সাক্ষ্যই রাখে, এই প্রসঙ্গে এই বইয়ের 'বিসর্জন' কবিতাটির প্রথম স্তবকটি তুলে ধরি—
'চীৎকার...অদূরবর্তী ধ্বনি, ডপলার
ক্রিয়া। প্রিয়া প্রিয়া বলে যে সুড়ঙ্গ খোড়া
হয়েছিল সেই কালে তার জ্বালাপোড়া
দিয়ে এই তরঙ্গ সাজানো, কলকাতার
নাম হবে খেলা কিছু পরে। যে খেলার
শেষে পড়ে থাকবে চিল আর চন্দ্রবোড়া।
ট্রামলাইনের শেষে দগ্ধ পিচ মোড়া
নগ্ন দেহ, ছেঁড়া শাড়ি, গোলাপি ভাণ্ডার।'
কবিতাটির ছন্দের চলন, সৌষ্ঠব এইসকল কিছু তো সাধারণভাবে আমাদের যথেষ্টই ভাবায় কিন্তু কবিতার মধ্যে শব্দবিজ্ঞান-সংক্রান্ত যে ডপলার ক্রিয়া বা ডপলার এফেক্ট-র সাবলীল প্রয়োগ তা কোথাও কবিতাকে আরওই যেন বিজ্ঞান-প্রখর করে তোলে। এই প্রবণতাকে দোষ বা গুণে না বেঁধে সেই সীমাবদ্ধতা ছেড়ে আমরা বরং বাংলা কবিতার কল্যাণে একে উদ্ঘাটন হিসেবে দেখতে শিখি, যাতে লেক্সিক্যাল সিমেন্টিক্স কিংবা সেন্টেন্স সিম্যানটিক্সকে কবিতার অন্তঃস্থ জড়তা বা দুর্বোধ্য-যাত্রা হিসেবে স্বীকৃত না ক'রে, তার গভীরে প্রবেশ করার বা খনন করার জন্য সুগম এক হৃদয় তৈরি হয়।
লেখাটির যত উপান্তে এসে পড়ছি, সর্বস্ব ঘিরে ততই যেন মন ভারি হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে গৌরীদাকে নিয়ে এই লেখা ফেলে রাখি, কিছুই যেন বলা হয়নি। আরও অনেক কিছু আছে বলার, এ বলার বা লেখার যেন কোনও অন্ত নেই, কোথাও কোনও থামা নেই। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানানুসারে জীবনের সরণ আসলে শূন্যই। আমরা যেখান থেকে যাত্রা শুরু করি, আদতে ফিরিও সেইখানেই। তাই সেই যে স্মৃতির রাস্তা ধরে বেরিয়ে পড়েছিলাম, দুপুর গড়িয়ে বিকেল কাটিয়ে সেখানে এখন সন্ধের অভিসারে রাত্রি লেখা হচ্ছে। গৌরীদা, আমাকে বলছেন এই রাত্রিটুকু থেকে যেতে তাঁর কাছেই। ঘরের জানলা দিয়ে আবাসনের বাইরে ও ভেতরের দুটো গাছ, যে হাওয়ায় দুলে উঠে মিলে যাচ্ছে মাথায় মাথায়, সে হাওয়ার নাম সৃজন বললে ভুল হয় না হয়তো। কিন্তু আমার সাধ থাকলেও সে সাধ্য কই, ফিরতে হবে, ফিরতে হবেই— যারপরনাই গৌরীদাকে বোঝাই আবার আসবো একদিন, আপনি ভালো থাকুন, আপনি সুস্থ থাকুন, নিজের যত্ন নিন। গৌরীদার স্নেহ-সম্পৃক্ত মুখভার তখন যেন বলতে চাইছে, যে ক'জন তরুণ কবিদের তিনি হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে নিঃসঙ্কোচে আপন করে নিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে যাঁরা তাঁর সাথে প্রতারণা করেছেন, তুমিই জানো তুমি সেই দলে নাম তুলবে কি না! ভাষায় না প্রকাশ করলেও আমি যেন সেই গুমোট আবহাওয়ার একরকম পূর্বাভাস টের পাচ্ছিলাম, কেন না ইতিপূর্বেই ফোনে কথা বলতে বলতে এই অভিমান সংকেত তাঁর দিক থেকে স্পষ্ট হয়েছিল এবং যথেষ্টই যার সঙ্গত কারণ ছিল। ঠিক তখনই আমি গৌরীদার হাত দুটো চেপে ধরতেই, নিমেষেই যেন তাঁর সমস্ত অভিমানই জল হয়ে গেল। তিনি উঠে দাঁড়ালেন, বললেন চলো তোমাকে অনেকটা পথ ফিরতে হবে, আমি এগিয়ে দিয়ে আসি, আমি তাঁকে যতই বলি আমি চলে যেতে পারবো গৌরীদা, আপনি ব্যস্ত হবেন না, বাড়িতে থাকুন, তিনি ততই নাছোড়— অগত্যা বেরোনোর সময়, বৌদিকে আসছি জানিয়ে দরজার দিকে যেতেই গৌরীদা ইশারা করলেন উত্তর দিকের দেওয়ালটা, বললেন তোমার আঁকা ছবিটি এই দেওয়ালে টাঙাবো। মনে মনে কল্পনা করলাম কেমন লাগবে, তারপর বেরিয়ে সোজা আমাকে নিয়ে গেলেন বড় রাস্তার চার মাথার মোড়ে। বললেন, তুমি আজ ট্যাক্সি করে ফিরবে। আমি বললাম না গৌরীদা, এখনও এতোটা লায়েক হইনি, হতেও চাই না কখনও। ধমক দিয়ে বললেন, তুমি আজকে ট্যাক্সি করেই হাওড়া ফিরবে এবং ট্যাক্সি-ফেয়ার আমি দেব, এটা তোমার স্বীকৃতি, শিল্পীকে স্বীকৃতি না দিতে পারলে, কবে আর শিল্পকে কীভাবে স্বীকৃত করবো আমরা। বলেই সোজা ট্যাক্সিতে তুলে দিলেন, আমিও বাধ্য ছেলের মতো তাঁর মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে বসলাম এবং সারা রাস্তা সেদিন যে হাওয়া মেখে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম সেই হাওয়া আসলে হাওয়া নয় এমন এক অভিজ্ঞান, যা কবি গৌরীশংকর দে-কে নিয়ে এই স্মৃতিগদ্য লিখতে বসে, যার অধিকাংশটাই এই লেখাজুড়ে নিরঙ্কুশ ছড়িয়ে রইল।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন