জীবন ও কবিতার মিশ্র শিল্প: গৌরীশঙ্কর দে
অনিরুদ্ধ সুব্রত
"কেঁপে ওঠে, ভরে যায় অশ্রুজলে লেক, কোঁচড়ে হৃদয় চুরি করে আনি, কেক
খেতে দিই ঘুম থেকে তুলে মেয়েটিকে--
বুড়ি চাঁদ চুমু খায় বুড়ো পৃথিবীকে।"
কবিতার চেয়ে হয়তো কবি বেশি নয়। তাঁর রচিত পংক্তিতে তাকে স্পর্শ করতে পারার সুখ সবচেয়ে বেশি। আর ঠিক সেখানেই প্রশ্ন আসে, কতটুকু পড়েছি তাকে ?
দু'হাজার কুড়ির আশপাশে কবি গৌরীশঙ্কর দে-র সঙ্গে পরিচয় আমার। এবং সেই পরিচয় একান্তই সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার নিয়মিত কবিতা পোস্টানোর অভ্যেস থেকে পাওয়া। নিয়মিত বেশ আলাদা রকমের কমেন্ট পেতাম ভদ্রলোকের থেকে। এভাবে একদিন তাঁর আগ্রহে প্রথম ফোনালাপ। আমাকে লেখা বিষয়ে সামান্য কিছু যুগপৎ প্রশংসা ও শিক্ষা দিলেন। এমন ভাবে, যা দীর্ঘদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে ঠিক ওরকম কখনো কারও কাছ থেকে পাইনি।
পাশাপাশি বেশ শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, আমার লেখায় লাইক দিয়ে চলে যাও, তেমন কোনো কমেন্ট দেখি না ? তার মানে তুমি ভালো করে পড়ো না আমার লেখা ? বললাম, পড়ি দাদা কিন্তু কমেন্ট করতে তো সাহস হয় না সবসময়। অবশ্য তিনি সেই এক্সকিউজ মেনে নিলেন না। বললেন, তোমার আলাদা করে তেমন ভালো লাগেনি বলেই হয়তো.. ! বললাম, এর পর খুব খেয়াল করে পড়ব, তারপর লিখব যতটা আমার যোগ্যতায় হয়।
হ্যাঁ, হয়তো কখনো তাঁর লেখায় মন্তব্য করেছি, কিন্তু সে আমার ধৃষ্টতা ছাড়া কিছু নয়। যদিও তিনি আনন্দ পেয়েছেন। এর আসল কারণ তাঁর লেখার মাত্রা আমাকে ছাড়িয়ে যায় অনেকটা উঁচুতে।
শেষ পাঁচ বছরের একজন বন্ধু আমি তাঁর। ফলত, তাঁর কবিজীবনের যাত্রাপথ আমার কাছে অজানা ছিল। প্রাথমিক ভাবে তাঁর লেখায় ছন্দোবদ্ধতা, আমাকে খুবই বিস্মিত করত। সূক্ষ্ম জীবনচেতনাকে তাৎক্ষণিক তুচ্ছ বিষয়ের রূপকে বেশ পরিমিত শব্দে উপস্থাপনের মোক্ষম গুণ ছিল তাঁর। বিশেষত বিজ্ঞানের মানুষ বলে কিনা জানি না, কবিতার অবয়ব গঠনে তিনি তীক্ষ্ণ স্থপতি।
রামকৃষ্ণ পরমহংস এবং সারদা দেবীর প্রতি তাঁর গভীর ভক্তিভাব তাঁর শেষ পর্বের কবিতার দর্শনে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। এমনকি ঠিক এই পর্বে ফল্গু ধারার মতো প্রতিটি লেখায় বয়ে গেছে কখনও মৃদু, আবার কখনো প্রকট মৃত্যু চেতনা।
পরিচয়ের পর যেদিন প্রথম তাঁর বালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে আমার যাওয়া, সেদিনই তাঁর থেকে উপহার পাওয়া তাঁর 'নির্বাচিত কবিতা ' বইটি। যা সত্যিকারে কবি গৌরীশঙ্কর দে -কে আরও খানিকটা বিস্তারিত ভাবে আমার চেনার সুযোগ হওয়া।
প্রচণ্ড জীবনীশক্তির অজস্র পংক্তিতে সেখান থেকে তাকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া। রক্ত মাংসের কবি, কবির স্বপ্ন, বাহাদুরী, শব্দের শেল ছুড়তে পারা, ছন্দে ফেলে ছন্দকে ভাঙা এবং দূরন্ত এক অশ্বের গতিশীলতা--- এই সব আবিষ্কার করা তার যৌবনের কবিতা থেকে কবিতায় অগণিত।
ষাটোর্ধ্ব এক যুবকের মতো থরথর করা রোমহর্ষ নিয়ে কবিতাকে পরিপূর্ণ রূপে যাপন করতেন তিনি। প্রেম তাঁকে শব্দে, ধ্বনিতে, অভিমানে, ক্রোধে ও কান্নায় ভিজিয়ে রেখেছিল সারাক্ষণ। এমন কিশোর-মন কীভাবে যে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বিরাজ করে একটি মানব শরীরে, আমি জানি না। প্রেম যে আসলেই বেদনা--- তা তাঁর কবিমনের একটুখানি ছুঁলেই স্পষ্ট বোঝা যেত।
মানুষ গৌরীশঙ্কর যেন অনন্ত প্রেমিক। অকৃপণ এক আতিথেয়তা প্রবণ প্রাণ। যে কেউ, খুব অল্প সময়েই তাঁর হৃদয়ের ভেতর বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারে। তিনি নিজেই আগন্তুককে হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে তুলবেন মূল মহলে। তারপর তাঁকে বলবেন, শিশু সারল্যে জীবনের নানা কথা। বলবেন, দেশ বিদেশের কবিতার কথা। আহারে, পানিয়ে, আদরে, স্নেহে ভাসিয়ে নিয়ে যাবেন স্বতন্ত্র এক পৃথিবীতে। যেখানে আদতে থরে থরে শুধু কবিতা। যার খানিকটা হয়তো লিখিত হয়েছে, খানিকটা লেখা হবে আগামী কোনো কালে।
সাধারণ হিসেবী মানুষ যাকে সংযম ও সৌজন্য বলেন, প্রকৃত কবির জীবনধারা কি সবসময় অমন পরিমিত হয় ? তাই পাগলামি বলে কত আশ্চর্য সত্য এড়িয়ে যায় আমাদের চোখ, আমাদের বোধ। কবির জীবন একটি আস্তো দীর্ঘ কবিতা। তা রুক্ষ, শুষ্কতার বিবর্ণ দিয়ে যেমন গড়া, তেমনি নব জলধারায় বিকশিত পাতার মতো সবুজে উন্মত্ত হয়ে ওঠে, আবার শিশিরে ভেজা থাকে উস্কোখুস্কো প্রতিটি প্রান্ত। কবি গৌরীশঙ্কর দে-র জীবন ও কবিতা কোথাও পরস্পরের মধ্যে মিশে গিয়ে তাঁর জীবন ও আচরণ--- আমার দৃষ্টিতে এক শিল্প দৃষ্টান্ত। এতটুকু মেকি, আত্মপ্রচার, অহং, হিংসা, দলবাজির ধার ধারেন নি।
এক মানুষ এসেছিলেন, জীবনের ঘাত গুলিকে কবিতা দিয়ে সাজিয়ে তুলবেন ভেবে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু'হাতে রং মেখে সেই ছবিই তিনি এঁকেছেন, একা একা দেখেছেন, পরোয়া করেন নি কারও কোনো প্রশংসা বা স্বীকৃতির। এবং এক্ষেত্রে তিনি সমকাল থেকে সম্ভবত বঞ্চনাই পেয়েছেন বেশি। তাঁর কবিপ্রতিভাকে যথার্থ মুক্ত স্বীকৃতি দিতে, যারা সময় নষ্ট করেছেন, একদিন তারা নিজেদের ব্যর্থতা উপলব্ধি করবেন বলেই মনে হয়।
******************************************************************************************************
জন্ম ১৯৭৪, বনগাঁয়। ছাত্রবয়স থেকে লেখালিখি শুরু। মূলত কবিতা। এছাড়া ফিচার ও ছোটো গল্প। এ পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ- ছয়টি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ- 'রোদ ও বোধের দ্বীপে'(২০০৩) এরপর 'আগুনের দিন গুলো নেই', 'নিভৃত আগুনের পদাবলী', 'এক গলিত যুদ্ধ স্রোত', 'কালো ছত্রাক', 'যাপন বিক্রির টেবিল'(২০২১)। সম্পাদিত পত্রিকা- 'উত্তর পক্ষ' । পেশা শিক্ষকতা, নেশা কবিতা। সম্প্রতি প্রকাশিত অ-নিরুদ্ধ সুব্রত-র কবিতার বই---





কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন