যে ফোনটা আর কোনোদিন আসবে না
দেবাশিস সাহা
“সন্ধ্যাতারা নিভে গেছে, আকাশ পর্যাপ্ত নীল, হাওয়া
থমকে আছে মায়াবীর দীঘল শরীরে
কত স্বপ্ন হিরেকুচি জলের কোমল বিন্দু, ঝরে পড়ছে জল
এঁকে রাখি।”
—— নদী, নিশীথিনী / গৌরীশঙ্কর দে।
"...কালীদহে কখন যে ঝড় কমলের নাল ভাঙে– ছিঁড়ে ফেলে গাংচিল শালিকের প্রাণ" জীবনে মৃত্যুর চেয়ে অনিশ্চিত বোধহয় আর কিছু নেই। এত তাড়াতাড়ি কবি গৌরীশঙ্কর দে চলে যাবেন, আর তাঁর স্মৃতিচারণ করব কোনও পত্রিকায়, কোনওদিন ভাবিনি। আমাদের না-ভাবা কথাগুলোকে হয়তো এভাবেই ভাবাতে বাধ্য করে শিয়রে ওত পেতে থাকা গাংচিল।
ব্যক্তিকে উপেক্ষা করে কবি গৌরীশঙ্কর সম্পর্কে কিছু লেখা আমার পক্ষে অসম্ভব। তাই, কবির কাব্যকৃতি আলোচনা করতে গিয়ে অনিবার্যভাবে এ লেখায় এসে পড়বে, কবি গৌরীশঙ্কর দে-র সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা দিক। পাঠক তাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, আশা করি। তাছাড়া শুধু কবিতা কেন, কোনো সৃষ্টিই কি শেষপর্যন্ত ব্যক্তিনিরপেক্ষ? ব্যক্তিকে জানলে, তার সৃষ্টিকেও সম্যক জানা সম্ভব, বলেই আমার বিশ্বাস।
কবি গৌরীশঙ্কর দে-র সঙ্গে আমার পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়, বছর পাঁচ-ছয়েকের। বয়সের পার্থক্যও বেশি নয়, বছর দুই। তবু আমি গৌরীদা বলতেই স্বচ্ছন্দবোধ করেছি বেশি।
২০২০-এর মাঝামাঝি। তখন সবে করোনা ভাইরাস মহামারীর আকার নিচ্ছে। সারাদেশে লকডাউন ঘোষিত হল। নিমেষে চলমান পৃথিবীটা গৃহবন্দি হয়ে পড়ল। হাতে অগাধ সময়। জীবনের আনন্দকে ঘরের কোণে পিষে মেরে ফেলতে চাইছে মারণ ভাইরাস-আতঙ্ক । খবরে রোজই শুনতে পাচ্ছি, লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যুমিছিল। এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা এর আগে কখনো হয়নি! জীবনের আনন্দ, সৌন্দর্যান্বেষা তবে কি এভাবেই শেষ হয়ে যাবে? ভাবছি। হঠাৎ একদিন মনে হল, শুয়ে বসে খবর শুনে, মৃত্যুর বিভীষিকা প্রত্যক্ষ না-করে, ঘরে বসে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করলে কেমন হয়। সেই ভাবনা থেকে জন্ম হল ‘স্বরবর্ণ’ অনলাইন পত্রিকার। দোসর ফেসবুক। বিজ্ঞাপন দিতেই বন্ধুরা লেখা পাঠাতে থাকলেন। কখনো-বা নিজেই কারো লেখা ভালো লাগলে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। কেউ বিমুখ করছেন না। কবি-লেখকদের অযাচিত ইন্ধনে নিয়মিত বেরিয়ে চলেছে স্বরবর্ণ। দু’মাস পরপর। তবু কাজ প্রচুর। ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপে আসা লেখাগুলো খুঁটিয়ে পড়া, নির্বাচন করা, পত্রিকা সাজানো কাজ কম নয় ।
হঠাৎ একদিন ফেসবুকে নজরে পড়ল গৌরীশঙ্কর দে নামে এক কবির কবিতা। রোজই প্রায় তিনি যখন-তখন ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করেন। সাগ্রহে পড়ি। কখনো মন্তব্য করি। কখনো করি না। গৌরীশঙ্কর দে-র প্রায় সব কবিতাই এত ভালো লেগে যায়, এক দিন স্বরবর্ণে লেখার আমন্ত্রণ জানালাম। আমন্ত্রণ পেয়ে তিনিও ভীষণ খুশি। ফোন করলেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। ধীরে ধীরে পরিচয় নেমে এলো ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে... তিনি কখনো কখনো সেই পরিচয়কে ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’তে নামলেও আমি পারিনি। যাহোক, সম্পর্কের এক পিঠে কবিতা অন্য পিঠে চলে আসতে লাগল পরিবারের অন্যরাও। জানলাম গৌরীদার পরিবারে বৃদ্ধ পিতা-মাতা রয়েছেন, আর তাঁরা স্বামী-স্ত্রী, তাঁদের একমাত্র কন্যা তনুকা থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। আমার পরিবারও মুখস্থ হল তাঁর ঠোঁটে। আমার ভাগনা, ছোটবেলা থেকেই আমার কাছে মানুষ, অধ্যাপনা করছে পুরুলিয়ায় সিধু-কানু ইউনিভার্সিটিতে। মেয়ে সৃজিতা বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষিকা। দু’দিক থেকেই প্রসারিত হল বন্ধুত্বের অটুট বন্ধন।
ইতিমধ্যে করোনা বিদায়ে ধীরে ধীরে জীবন তার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পাচ্ছে । ২০২২-এ কলকাতা পুস্তক মেলা চলছে তখন। গৌরীদা একদিন প্রস্তাব করলেন মেলায় আসার। দু’জন দু’জনের কাব্যগ্রন্থ দেওয়া-নেওয়া হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দু’জন দু’জনকে চাক্ষুষ করব। মুঠোফোনের কল্যাণে এতদিন পরস্পর পরস্পরকে কণ্ঠস্বরে চিনেছি, অবয়বে নয়। রাজি হয়ে গেলাম। দেখা হল। গৌরীদা তাঁর নির্বাচিত কবিতা এবং ‘আমার নিভৃতাবাস’ কাব্যগ্রন্থ দু’টি উপহার দিলেন। আমি দিলাম আমার ‘দু’এক কণা শৈশব’ গদ্যগ্রন্থ এবং ‘মাছরাঙা ও অলীক ধুতুরো’ নামে কবিতার বই। দু’জনে মেলার বুক স্টলগুলো চষে ফেললাম। গৌরীদা আরো দু-একজন কবি বন্ধুকে তাঁর বই দিলেন। লিটিল ম্যাগাজিন মঞ্চে শুনলাম প্রতুল মুখোপাধ্যায় গাইছেন, আমি বাংলায় গান গাই...
দু’চার দিন বাদেই ফোন,— তোমার গদ্যের বইটা পড়ে ফেললাম। দারুণ লাগল। শুধু তাই নয়, কোথায় কোথায়, কেন ভালো লেগেছে, তার আনুপুঙ্খ ব্যাখ্যা। আমি তো অবাক, ‘এত তাড়াতাড়ি পড়ে ফেললে?’
‘হ্যাঁ, কী করব, রাতে ভালো ঘুম হয় না। হয় পড়ি, না হয় লিখি। আমি তখন ওর নির্বাচিত কবিতা সবে পড়া শুরু করেছি। শেষ করে উঠতে পারিনি। কিছু কিছু ভালোলাগার কথা জানালাম। স্মৃতিতে গেঁথে থাকা কিছু পঙক্তি আবৃত্তি করলাম—
নিশীথরাতের পাখি পেয়েছিলে ব্যথা নাকি
অন্ধকারে, কোথাও পালকে?
একা নিদ্রাহীন তুমি সবাই ঘুমন্ত, ঘুমই
একমাত্র পথ্য ইহলোকে।
( কালিকা-পুরাণ )
কিংবা—
আগুনে ঝলসে গিয়ে এ জীবন তবু যতদূর জেগে আছে ছায়াসরণি প্রান্তে আমি তার উড়ে যাওয়া লেখচিত্র আঁকি।
( ছায়াপাখি )
বা—
কোমল শ্যামলতায় ভরা এ বাংলাদেশ---- এত কবি, এত
কাস্তে, প্রাণ
তবু এত আর্তনাদ কেন?
(অভিমান)
এবং জানালাম, এইসব কবিতা, কবিতার পঙক্তিগুলি আমাকে ভালোলাগার কী এক আবেশে আচ্ছন্ন করে রাখছে। শুনে কী যে খুশি হলেন! বাড়ি-গাড়ি, বিত্তসম্পদ নয় ‘আপনার লেখাটি ভালো লেগেছে ’, আমার মনে হয়, কবিরা এই ছোট্ট কথাটি শোনার জন্য আজীবন উৎকর্ণ থাকেন। গৌরীদাকে বললাম, পড়া শেষ হলে লিখিত পাঠ-প্রতিক্রিয়া দেব।
দিন যায়। সম্পর্ক গাঢ় হয়। কথা যেন শেষ হয় না। ফোনে আধ-এক ঘন্টা কথা বলা হলেও মনে হয় যেন আরো কত কথা বাকি রয়ে গেল। কত কথা! কবিতা, শিল্প সাহিত্য থেকে শুরু করে খেলাধুলা, রাজনীতি, ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ বাদ যায় না কিছুই। কথায় কথায় কত রকম গৌরীশঙ্করের পরিচয় পাই, আর বিস্মিত হই। তিনি যে আদ্যোপান্ত একজন কবি এ প্রত্যয় তো গাঢ় হয়েছে অনেকদিনই। কিন্তু পাঠক হিসেবেও তিনি যে অনন্য, অসাধারণ উপলব্ধি হল শীঘ্রই। এই প্রসঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা কথা মনে পড়ছে "লেখক হতে গেলে পাঠক হতে হয়, অনেক পড়তে হয়। না পড়ে কোনো উপায় নেই। প্রচুর পড়ার পরেই নিজস্ব ভাষা আবিষ্কার করা যায়। যদি ভাষা আবিষ্কার করা যায় তাহলেই লেখক হওয়া যায়, নাহলে যায় না। যারা না পড়ে ফাঁকি দিয়ে লেখক হতে চায়,তারা বেশিদূর যেতে পারবে না।" তাঁর পড়ার পরিধি এতটাই বিস্তীর্ণ ছিল বলে গৌরীদা নিজস্ব এক কবিতা ভাষার কাছে পৌঁছতে পেরেছিলেন বলে আমার মনে হয়।
যে কথা বলছিলাম, পাঠক গৌরীশঙ্কর এবং তাঁর গদ্যভাষার প্রসঙ্গ। তখন স্বরবর্ণ-এ ধারাবাহিকভাবে বেরোচ্ছে আমার ‘ধুলোর সিংহাসন’ উপন্যাস। প্রতিটি পর্ব গৌরীদা পড়েন এবং লিখিত মতামত দেন। ব্লগে। কখনো-বা হোয়াটসঅ্যাপে। ‘দারুণ’ ‘সুন্দর’ ‘অসামান্য’ ‘অপূর্ব’ জাতীয় ফেসবুকীয় পিঠচাপড়ানি নয়, সেইসব নাতিদীর্ঘ মন্তব্য থেকে আবিষ্কার করি এক মনস্ক পাঠক এবং গদ্যশিল্পী গৌরীশঙ্করকে। এবং প্রায় প্রতিদিনই রাতে আমার ছাত্র পড়ানো শেষ হলে বেজে ওঠে গৌরীদার ফোন। দীর্ঘক্ষণ চলে উপন্যাসের চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ। বলতে দ্বিধা নেই, কখনো কখনো তাঁর যুক্তি আমি মেনে নিই। এবং সেই মতো উপন্যাসের গতি বদলায়।
এরপর দুটো ঘটনা ঘটল। উপন্যাসের অন্তিম পর্বে ব্যবহার করব বলে একটা কবিতার কোটেশন খুঁজছি অনেকদিন ধরে, যা উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহকে ভিন্নমাত্রায় উত্তরণ ঘটাবে। হঠাৎই একদিন নজরে এল গৌরীদার লেখা একটি সনেট— বাল গোপাল । লুফে নিলাম। অনুমতি প্রয়োজন। ফোন করে বলতেই অনুমতি তো দিলেনই আর তাঁর মনের আনন্দ-উচ্ছ্বাসও চাপা রাখতে পারলেন না, পরিহাসছলেই যেন বলে উঠলেন ‘এরপর আমি তো বিখ্যাত কবি হয়ে যাব দেবাশিস ’। আমার মতো অনামী লেখকের লেখায় গৌরীদার কবিতা থাকলে তিনি যে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যাবেন, এটা নেহাত কথার কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তা হলেও সেই কথার মধ্যে আনন্দের অভিব্যক্তি কিছু কম ছিল না।
অনেকে বলেন প্রবল ছন্দাসক্তি গৌরীশঙ্করের কবিতার ক্ষতি করেছে। কথাটা হয়তো আংশিক ঠিক। মাঝে মাঝে তিনি বলতেন, জানো, ছন্দের ঘোরের মধ্য থেকে কিছুতেই বেরোতে পারছি না।
A poet is a nightingale, who sits in darkness and sings to cheer its own solitude with sweet sounds. ইংরেজ কবি শেলির মতো তাই কি কবি গৌরীশঙ্কর দে লিখতে পারলেন—
শব্দের ভিতর অরণ্যের, ঘোরানো সিঁড়ির
অতল জলের
আহ্বান আছে।
শব্দের ভিতর অতলান্ত জলের আহ্বান তিনি শুনেছিলেন, তাই তাঁর কবিতায় শব্দ, ছন্দের ঝংকার এমন নিপুণ বেজেছে। কী অসাধারণ দক্ষতায় তিনি একের পর এক সনেট রচনা করেছেন— পেত্রার্কীয়, শেক্সপিয়ারিয়ান এবং ফরাসি তিন ধরনেরই । মনে পড়ে, স্বরবর্ণ-এর প্রথম সংখ্যাগুলোতে প্রত্যেক কবি সম্পর্কে পঠিত কবিতার উপর নির্ভর করে আমি সেই কবির কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার চেষ্টা করতাম। তখনো আমি গৌরীদার কোনো কাব্যগ্রন্থ পড়িনি। ইতস্তত কিছু কবিতা ও কবিতা-বিষয়ক গদ্য পড়েছি মাত্র। তবু, গৌরীদার পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছিলাম—
গৌরীশঙ্কর দে বাংলা কবিতায় একটি পরিচিত নাম। ছন্দকুশলী এই কবি প্রতিনিয়ত আমাদের কাব্যপিপাসা পরিতৃপ্ত করে চলেছেন। গৌরীদার নির্বাচিত কবিতা পড়ার পর আজ মনে হয়, সেদিন খুব একটা ভুল লিখিনি।
জীবন সম্পর্কে তার উপলব্ধি আমাকে বিস্মিত করে। ‘এক আশির বাদকের পত্রলেখা’ কবিতায় তিনি লিখছেন—
সে জীবনই এ জীবন---- মানবজীবন,
গভীর নিবৃত্তি থেকে প্রবৃত্তি, প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্তির দিকে
বহমান।
জীবনের প্রবহমান স্রোত থেকে সেই আমার চেনা গৌরীদা আজ কোথায় হারিয়ে গেল! কোনোদিন আর তাঁর সঙ্গে কথা হবে না, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আটটা-সাড়ে আটটায় ছাত্র পড়ানো শেষ হলে কোনো কোনো দিন মনে পড়ে, এই সময়টাতেই গৌরীদা ফোন করতেন। সেই ফোনটা আর কোনোদিন আসবে না...



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন