সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬

দেবদাস রজক

 




শব্দের ভেতর বিরল এক বালক। কবি গৌরীশঙ্কর দে


দেবদাস রজক 


‘আমি যাই

বালুকাবেলায় ঝিনুক কুড়াতে কুড়াতে  

স্বপ্নের শেষ প্রান্তে,  

যেখানে শব্দেরা আর কথা বলে না,  

শুধু নিঃশব্দে ভেসে ওঠে  

একটি মৃত পাখির ডানা।


গতিপথ বেগতিক,  

কারণ পথ নিজেই নিজেকে অস্বীকার করে—  

আমি হাঁটি,  

একটি অদৃশ্য সেতুর উপর দিয়ে  

যার নিচে মৃত্যু দাঁড়িয়ে,  

কিন্তু সে আর মৃত্যুর মতো নয়,  

সে যেন এক পুরাতন আয়না  

যেখানে আমার মুখ নেই।‘ ( স্বপ্নের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মৃত্যু, ১৮/ ০৯/২০২৫, ফেসবুক)


কবির মৃত্যুর মাত্র চারমাস পূর্বে লেখা এই কবিতাটি। নিজের সম্পর্কে কী অমোঘ সত্য কথাটি বলে গেলেন কবিতায়। এই কারণেই বুঝি কবিদের বলা হয়ে থাকে অন্তর্যামী! গৌরীশঙ্কর দে আসলে সেই অন্তর্যামীময়-কবি। আমরা যারা শ্রদ্ধেয় কবি গৌরীশঙ্কর দে’র কবিতা পড়ি বা পড়েছি তারা জানি, কবি মূলত ছন্দ আর শব্দের আশ্চর্য গলিপথ দিয়ে তৈরি করেন কবিতার মোহজাল এবং পরাবাস্তবতা। আমরা সেই অতীন্দ্রিয় মোহজাল ভেদ করতে করতে কবিতার অন্তর্গহনে পৌঁছে যাই, সেখানে দাঁড়িয়ে নির্বাক পৃথিবীর আরও এক সত্তাকে দেখে স্তম্ভিত হই। একটি কবিতা দিয়ে শুরু করা যাক,

‘একটি অন্ধ চশমা,  

যার কাচে প্রতিফলিত হয়  

এক মধ্যচল্লিশের অনুপস্থিতি।


একটি বয়সহীন রেখা,  

যা কামনার ঘূর্ণিতে  

নিজেকে ছিন্ন করে।


তার ছায়া—  

একটি নিষিদ্ধ প্রতীক,  

যা জলের উপর আঁকা  

কিন্তু কখনো ভেজে না।


আমি—  

একটি অসম প্রেমের ঘ্রাণ,  

যা শব্দহীন,  

তবু প্রতিদিন উচ্চারিত।


একটি কবিতা,  

যা লেখা হয়নি,  

তবু প্রতিটি পাঠক  

তাকে অনুভব করে  

নিজের ভিতর।‘ (শূন্যের ভিতর এক অনুপস্থিতি হাঁটে)

  অসামান্য একটি কবিতা, শূন্যের ভিতর এক অনুপস্থিতি হেঁটে যায়, অনন্তপথ ধরে, কবিতার শব্দের ভেতর গভীর আন্তরিকতা না থাকলে এমন লেখা সত্যিই অসম্ভব। তাঁর শব্দের দক্ষতা আমাকে অবাক করেছে বারবার।

     আমি ব্যক্তিগতভাবে কবি ‘গৌরীশঙ্কর দে’কে চিনেছি, দেখেছি। এমন সরল মনের মানুষ সত্যিই আজকের পৃথিবীতে বিরল। কবিতাকে আপাদমস্তক আকন্ঠ করেছিলেন, মৃত্যুর শেষদিন পর্যন্ত বাংলা কবিতাকেই আঁকড়ে বাঁচতে চেয়েছেন।  আমার সঙ্গে রাতের পর রাতে বাংলা কবিতার হালহকিকত নিয়ে কথা হতো, আমার ‘দেশপোড়া গন্ধ’ কবিতার বইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন ‘কলমে কারুকৃতি’ পত্রিকায়। সমগ্র আলোচনাটি  বাই-ফোনে শুনিয়েছিলেন।  দরাজ কণ্ঠ, অমায়িক গুরুগম্ভীর ও ভারি গলা। অবশ্যই মদ্যপান করতেন, তা শুধুমাত্র বাংলা কবিতার ভিতর আজন্ম ডুবে থাকার জন্যই। পিতার মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করে ছিলেন ভীষণ। গুরুগম্ভীর সেই মানুষটির মধ্যে আমি সহজেই খুঁজে পেয়েছিলাম বিরল এক বালককে, এত নিষ্পাপ, এত সরলতা, এত শিশুসুলভ আর কোনও কবির মধ্যে সম্প্রতি দেখেছি বলে মনে হয় না। 

প্রসঙ্গত-ই বলতে হয় কবি ‘গৌরীশঙ্কর দে’র শেষ প্রকাশিত কবিতা ‘সান ইসিদ্রোর বারান্দা’, যা তিনি আমারই সম্পাদিত পত্রিকা ‘বারান্দা’র (আরেক সম্পাদক কৌশিক বড়াল) বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য পাঠিয়ে রেখেছিলেন আগেই। সেই কবিতাটির দুটি স্তবক তুলে ধরা হল,

‘কলম তাঁর ভাঙা তরী, ভেসে চলে নদীর শিরায়। 

তিনি ছুঁয়ে দেন হাতের আলো, শব্দ ফোটে রক্তের মায়ায়। 

সান ইসিদ্রোর পাথরে নাম, অচেনা, তবু চেনা ছায়া। 

তাঁর পায়ের ধ্বনি আয়নায়, মাটি ছোঁয় না, ভাসে মায়া।


তিনি চলে গেলে তারা পড়ে, স্বপ্নের শেষে জন্মায় ধ্বংস। 

বারান্দায় রয়ে যায় শব্দ, তাঁর হাসির শেষ অপেক্ষা। 

বাতাসে ভাসে তাঁর কথা, আলোর গানে মেশে তাঁর নাম। 

সান ইসিদ্রোর নিঃশ্বাসে, কবিতায় জেগে ওঠে অনন্ত ধাম।‘


মনে হয়েছে কবিতাটি বাংলা কবিতাকেই উৎসর্গ করে লেখা, সান ইসিদ্রোর নিঃশ্বাসে কবিতা যেন সাধকের মতোই জেগে আছে অনন্তকাল ধরে।

              কয়েকদিন আগেই পড়ে শেষ করলাম কবি গৌরীশঙ্কর দে’র কাব্যগ্রন্থ ‘কোম্পানির কাগজপত্তর’। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৫ কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায়। ‘পাটাতন প্রকাশনা’ থেকে প্রকাশিত তিন ফর্মার মূলত সনেটগুচ্ছ এই বই। সনেটের তিন ধরণের রীতি পেত্রার্কীয়, শেক্সপিয়ারিয়ান এবং ফরাসি সনেট এই বইয়ে ব্যবহৃত হয়েছে, রয়েছে মোট ৩০টি কবিতা। এই কাব্যগ্রন্থের কিছু কিছু কবিতা বিশ্লেষণ করে দেখব শব্দের অনবদ্য ব্যবহারগুলি। যেমন ‘প্রবাসের পাতা ১’ কবিতার দুটি লাইন-

‘মদ, শূন্য পাত্রে, আর কিছুদিন পরে ঘরে ফিরে, 

যাব তোর মহাদেশ থেকে স্বপ্নের স্খলিত নীড়ে।‘

পার্থিব থেকে অপার্থিব সত্তার দিকে যাত্রা। ব্যথাহীন আকাশে ওড়ে ভাঙা ভাঙা ট্যাম্বুরিন। রক্ত মাংসের শরীর থেকে অনন্তে যাওয়াআসা।


অথবা


‘প্রবাসের পাতা ২’ কবি বললেন-

‘মেশিনের পাশে শুয়ে রয়েছে মেশিন। মেশিনে মেশিনে রোদ-বৃষ্টি বিনিময়

চলে কিছুক্ষণ, পরে প্রচন্ড প্রণয় 

জন্ম দেয় এইদেশে প্রজন্ম নবীন।‘


কিম্বা 

‘জাহাজ, মাস্তুল আর মাস্তুলের শীর্ষে ছায়াপাখি। 

আঙুলে রক্তের দাগ কী নৃশংস এই হারাকিরি, 

যেইসব না থাকলে আজ সর্ব প্রকাশ বিচ্ছিরি, 

বাবুইপাখির ঘরে কল্পনার গোবরে জোনাকি।‘ ( প্রবাসের পাতা ৯)


আবার ‘বায়ু’ কবিতায় কবি বললেন ‘মৃতের যন্ত্রণা জীবিতের চেয়ে ঢের বেশি বলে মনে হয়।‘ এমন বধির সময়, লোলুপ জিহ্বা মেলে থাকে গোধূলির নগ্ন হিমেল বাতাসে...! অন্ধ সমাজের বুকে ‘শিউলি ফুল শিশিরে বিব্রত’! অনবদ্য রূপকের ব্যবহার। কবি গৌরীশঙ্কর অলংকারকে বিচিত্র আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন-

‘ঘনিষ্ঠ আলোয় দেখি চরাচর জুড়ে, কাঠামো রয়েছে পড়ে মূর্তি ধুয়ে গেছে। রাঁদার চিবুক ভেঙে গিয়েছে কুমুড়ে পোকার প্রাণান্তকর প্রয়াস রয়েছে’


অথবা

‘পথে হেঁটে যায় ঘড়ি, কাঁখে মহাদেশ, কখন গিয়েছ চলে সঠিক জানিনা। ট্রেন না ট্রামের নীচে ঝাঁপ দিয়ে শেষ চিহ্ন টেনে চলে গেছে অ্যানা কারেনিনা’

(এলিজি জীবনানন্দ দাশ)


পথে হেঁটে যায় ‘ঘড়ি’ একটা অনন্ত সময়, আমাদের আশ্চর্য কবি জীবনানন্দ যেন সময়ের দাবি মেনে হেঁটে চলেছেন জীবনের পথে, কাঁখে মহাদেশ। অপূর্ব এক সমাসোক্তি অলংকারের উদাহরণ।

কবির কলমে উঠে এসেছে ক্ষতবিক্ষত সময়, দগদগে ঘা আমাদের চেতনাকে হাতুড়ির ঘা মারে। ‘অকালবোধন’ কবিতায় রক্ত ধরা পড়ল-

‘মায়ের হাতে ব্রহ্মাণ্ড মায়ের হাতে সব আমার হাতে নীল গোধূলি নির্যাতিতার শব। 

মা’ই অভয়া, তিলোত্তমা দেখবি এবার পুজোয়, 

কীভাবে মা শোলের কাঁটা জুতোর নীচে লুকোয়’


‘আর্কিমিডিসের মৃত্যু’ কবিতার কিছু কিছু লাইন আমাকে মুগ্ধ করেছে-


‘ধাক্কা খেয়ে নিহত ফুসফুস রমা মন্ডলের কণ্ঠ ছুঁতে গিয়ে চিরে দিচ্ছে 

যখন পাঁজর, মেঘে মেঘে একলা পাগল তখন আপনমনে হাসছে...’


অনেক কবিতাতেই দ্রোহকালের চিহ্ন বহন করে এনেছেন কবি গৌরীশঙ্কর, তেমনি একটি কবিতা ‘বিসর্জন’-


‘চীৎকার... অদূরবর্তী ধ্বনি, ডপলার ক্রিয়া। প্রিয়া প্রিয়া বলে যে সুড়ঙ্গ খোড়া হয়েছিল সেই কালে তার জ্বালাপোড়া দিয়ে এই তরঙ্গ সাজানো, কলকাতার’


খেলা শেষে পড়ে থাকবে চিল আর চন্দ্রবোড়া, ট্রামলাইনের শেষে দগ্ধ পিচ মোড়া নগ্ন দেহ, ছেঁড়া শাড়ি। এ এক বীভৎস চিত্র অথচ সুনিপুণ ৮+৬ মাত্রায় সনেটের অবয়বে আমাদের আকৃষ্ট করে নিয়ে যায় শেষ পর্যন্ত।

              কাব্যগ্রন্থে একটি ভূমিকা লিখেছেন ‘কলমে কারুকৃতি’ পত্রিকার সম্পাদক সোমা দত্ত। যথার্থ আলোচনা করেছিলেন। ঝকঝকে সুন্দর এই বই পাঠ করলে অবশ্যই পাঠক সমৃদ্ধ হবেন। এই বই আশা রাখব ভবিষ্যতে এক সময়ের দলিল হয়ে থাকবে। নিচে কবি গৌরীশঙ্কর দে সম্পর্কে কিছু তধ্য দিয়ে আলোচনাটি শেষ করব।

             কবির জন্ম ১৯৬০ সালের ২২ নভেম্বর, মৃত্যু ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি। জন্মস্থান হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে। শেষদি পর্যন্ত তাঁর বাসস্থান ছিল কলকাতায়। পেশা অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক (AGM)। আটের দশকের প্রথমভাগ থেকে লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। বালুরঘাটের ‘মধুপর্ণী’, ‘স্পন্দন’ প্রভৃতি পত্রিকা,  এছাড়া  ‘দেশ’ পত্রিকা ও অন্যান্য অনেক লিটল ম্যাগাজিনেও নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হয়েছে। পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। প্রথম কবিতাগ্রন্থ “অশ্রুপ্রপাতের নিচে”(১৯৯০), তার পর একে একে “স্খলিত স্বপ্নের নীড়”(১৯৯৪), “ভাষামাতৃক্রোড়”(১৯৯৭), “আদিসপ্তগ্রাম”(২০০৪), “অনৈশ্বর্য”(২০১৮), “নির্বাচিত কবিতা”(২০১৯), “আমার নিভৃতাবাস”(২০২২), ২০২৫ সালে পাটাতন প্রকাশনা থেকে তাঁর শেষ কবিতার বই   ‘কোম্পানির কাগজপত্তর’  প্রকাশিত হয়। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ‘উত্তরপক্ষ’ কবিতা পত্রিকার পক্ষ থেকে পেয়েছেন ‘মাধুরী অধিকারী ‘জীবনকৃতি’ সম্মাননা। কবিতার পাশাপাশি কিছু কাব্যনাটক, প্রবন্ধ, গ্রন্থসমালোচনাও লিখে গিয়েছেন।




********************************************


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন