আমার বাবা গৌরীশঙ্কর দে
তনুকা দে
গৌরীশঙ্কর দে আমার বাবা। তিনি কবি। অকপটে স্বীকার করি, কবি গৌরীশঙ্কর দে-র সম্পর্কে কিছু লেখার যোগ্যতা আমার নেই। যোগ্য জনেরা কিছু কিছু তা লিখেছেন, ভবিষ্যতেও লিখবেন, আশা করি। বাবা হিসাবে আশৈশব আমি তাঁকে যেমন দেখেছি, এখানে সেই বিষয়ে দুই চার কথা বলার চেষ্টা করছি মাত্র।
########################################
কর্মসূত্রে আমি বিদেশে থাকি। অস্ট্রেলিয়ায়। প্রতিদিন বাবার সঙ্গে আমার কথা হত। প্রবাসী কন্যার জন্য তাঁর পিতৃহৃদয় সর্বদা উৎকণ্ঠিত থাকতো। আমি তাঁকে আশ্বস্ত করতাম। আমি ভালো আছি, শুনে নিশ্চিন্ত হতেন। আমি তাঁর একমাত্র সন্তান হওয়ায় আমিই ছিলাম তাঁর সর্বস্ব। আমি তাঁর কাছে নেই, এই অভাববোধ, তাঁর মনের মধ্যে একটা শূন্যতা তৈরি করত, টের পেতাম। কিন্তু কিছু করার ছিল না। জীবন আমাদের পিতা-পুত্রীর জন্য পূর্ব থেকেই এমনটা নির্ধারণ করে রেখেছিল হয়তো।
বাবা আমার সমস্ত কাজের প্রেরণাস্বরূপ ছিলেন। তিনি আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এবং সেই স্বপ্নের দরজায় পৌঁছে দিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন। তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। আর কবিতার প্রতি ছিল তাঁর অসম্ভব ভালোবাসা। শেষ দিন পর্যন্ত কবিতার প্রতি তাঁর সেই ভালোবাসা লক্ষ করেছি। তাঁর মেধা ও ভালোবাসার ছোঁয়া তাঁর কাব্য-কবিতাকেও ছুঁয়ে যেত নিশ্চয়ই, তা না হলে তিনি কী করে রাতের পর রাত নির্ঘুম রজনী যাপন করতেন, কবিতাকে সামনে রেখে?
‘আমার নিভৃতাবাস’ করনাকালীন দুঃসময়ের
দিনগুলিতে লেখা বাবার এই কবিতার বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলাম আমি, পিকাসোর একটি ছবি অবলম্বনে। কী যে খুশি হয়েছিলেন দেখে । কর্মজগৎ থেকে অবসর গ্রহণের পর বাবা প্রায়ই বলতেন, এবার একটা উপন্যাস লিখবেন, সেটা আর হয়ে উঠল না। হাঁপানির মতো একটা দুঃসহ রোগ সারা জীবন বাবা বয়ে বেড়িয়েছেন।
বাবা চলে গেছেন, যেখানে গেলে মানুষ আর ফেরে না, আজ বুঝতে শিখেছি ঠিকই, তবু আমার মনে হয়, বাবা বুঝি আমার পাশের ঘরটিতে বসে ঠিক একই রকম ভাবে কবিতা লিখে চলেছেন। দৌড়ে কাছে যাই, দূরে সরে যায় সেই ছায়া। সে ছায়া কার! সে কি আমার মরীচিকা বাবা!!
কোথায় যাবে তুমি, বাবা? কতদূর? কোন মহাশূন্যে?? যেখানেই যাও আমি জানি, তুমি আছো আমার হৃদয় জুড়ে, যেমন ছিলে এক দিন...।
**অ্যাগোরা স্পেস, ৯ সি লর্ড সিনহা রোড-এ কবি প্রজিত জানা এবং সৈয়দ কওসর জামাল আয়োজিত ‘গৌরীশঙ্কর দে স্মরণ সভা’য় নিজের পিতা সম্পর্কে একটি বক্তব্য রেখেছিলেন গৌরীশঙ্কর-কন্যা তনুকা। এটি তারই অনুলিখন। অনুলেখক— তন্ময় রায়।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন