'পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে'
অমিতাভ সেন
মাখনরঙা প্রেক্ষিতে স্থানু পাখিশরীর ধারণ করে প্রাণপানে ধাবিত অজস্র পাখি। প্রশান্ত সরকারের প্রচ্ছদ ও অলংকরণের অশেষ উপাদানে উজ্জ্বল শাশ্বত বোস প্রণীত বাইশটি ছোট গল্পের সংকলন 'পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে'। 'লেখক পরিচিতি' পাঠকের সঙ্গে লেখকের অতি সহজেই সম্পর্কনির্মাণে সাহায্য করে। উৎসর্গপত্রে শাশ্বতর উচ্চারণ নাভিমূল নির্গত অতিসরল আশ্বাসবাণী। সারাংশে গ্রথিত লেখকের স্বগতোক্তি। সূচিপত্রের ক্রমিকধারা অনুসরণ করে সংকলনের আলোচনার যথাসাধ্য প্রয়াসে নিরত থেকে জানাই শাশ্বতগদ্য বাংলা সাহিত্যের গড়পড়তা নিটোল গপ্পোনিয়মের বাইরে স্থাপন করতে সুসক্ষম এক স্বতন্ত্র ও সবল কথাকাহিনী ধারা।
তিন পৃষ্ঠা বরাবর ('"বিপ্লব " একটি পাখির নাম') লেখক সর্বজ্ঞভূমিকাপালনে অবিরাম অবিচল থাকা সত্ত্বেও নামহীন 'ছেলেটার' স্থায়ী স্নায়ুলেখনির্মাণে অতিসমর্থ। 'জামবনি থেকে কলকাতায়' অনায়াসে যাত্রারত চেতননির্মাণের সংবেদী যান। আবহ সৃষ্টি হয়েছে অতিজরুরি ডিটেলে ("...সহস্রাধিক এঁটো বাসন আর মেগা সিরিয়ালের শব্দব্যঞ্জনা।") । বটগাছটার অজস্র চোখের 'অল্প আঁচে' ছেলেটার বুকে বাজে 'গোত্রহীন যান্ত্রিকতার উপনিষদ '। চরিত্র আকার পেল সংকেতধর্মী বিবরণে। 'কমরেড লাখাই' ছেলেটার আদর্শ হয়ে ওঠে। নৈর্ব্যক্তিকতা বজায় রাখার অসামান্য ক্ষমতা শাশ্বতগদ্যে প্রোজ্জ্বল। 'শত বৈবস্বত কাল' জুড়ে ঘটে যাওয়া সাম্যহীনতায় জীর্ণ আকাশের কাছে প্রশ্ন রাখে আখ্যানটি।
মন্থর তালে হরেনবাবুর গপ্পো ('চলতি ভ্যালেন্টাইনের গপ্পো') শুরু হলেও পর্যবেক্ষকের সজাগ দৃষ্টি ও বোধ তাড়া করে পারিপার্শ্বিক স্থিতি ও অস্থিরতা। প্রজন্মগত বৈষম্য অতিস্পষ্ট সুচারু কৌতুকের অবলম্বনে। গপ্পোর মাত্রা বৈপ্লবিক স্তরে উন্নীত হয় স্ট্যালিন মুসোলিনির 'স্থিতি বিভ্রাটে'। নির্মম উদাসীন বাস্তবতা 'সন্ধ্যের নিমতলা ঘাটের অন্ধকার পিছন সিঁড়িটার মতো'। জীবনমধ্যাহ্নের যৌনতার স্বর মনস্তত্বের জটাজাল এড়িয়ে স্বচ্ছন্দ প্রকাশ পায় '... মানে ভ্যালেন স্টালিন' - এ।
অস্তিনাস্তির অগম পারে নিয়ে ফেলে 'আমিময়' চরিত্রটির 'সুন্দরবনের গহীন মানচিত্রে' ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা ('হিমজ্যোৎস্নায় বনবিবি')। ক্ষেত্র সমীক্ষার আদলে ঘটনার বিন্যাস সাবলীল অথচ গভীর। "মুঈন মণ্ডল" -- এর শ্রেণীপরিচয় ও ব্যবহারজাত বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ জগতের বেড়াজাল পার করে এগিয়ে নিয়ে যায় গ্রামীণ সংস্কৃতি ও সংস্কারের ভরকেন্দ্রে।
"ভুলাকন্যা" প্রাগৈতিহাসিক সত্যবলিষ্ঠতার সামনে দাঁড় করায় সমকালকে ('নষ্টভূমি ও ঈশ্বরী বনজ্যোৎস্না')। জীবনের ছবির 'গন্ধটায় নেশা ধরে যায়' যেমন তেমনই রূপ পায় '... নৈসর্গিক অন্ধকারের প্রতি অমনোযোগী, সূর্যশোক'। ডগরের শরীর কখন যে ধরিত্রীর অংশ হয়ে ওঠে ঘন কথার বুননে টের পাওয়া কঠিন।
লক্ষ্মী রানী মাহাতর কাহিনিবয়নে ('বন্য রাতের ঘুমহীন চুপকথারা') ভৌগোলিক সংকীর্ণতা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে অনুভূতির গর্ভে তীব্র মোচড় সৃষ্টি করে। 'ময়ূরের পালক' নিয়ে চলে সম্ভবত প্রাকপুরাণের নিবিড় আয়োজনে। 'একই জঙ্গলের দুই প্রাক্তন প্রেমিকার মত বাঘিনী ও লক্ষ্মী চুপচাপ সরে যায়, ...' চিহ্নিত হয় কোনো নতুন দৃশ্য উন্মোচনের সম্ভাবনা।
'একটা ভীষণ টাটকা বডি' চেয়েছিল সমীরণ গোটা জীবন ধরে। মনের ভিতরে চলাফেরা করে চলে 'ধীর এক্সপ্রেশন' অথচ ছবি থেকে যায় অসম্পূর্ণ ('শূন্য দৃশ্যের ছবিওয়ালা')। সমীরণের শরীরে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সত্তার স্থিতাবস্থা সৃষ্টি করে গভীর জটিলতা। ক্ষত চিন্তার অক্ষত রূপ ধরা পড়ে অক্ষরে অক্ষরে।
স্বগতোক্তির ধারায় বিস্তার লাভ করে না-কাহিনির যাত্রা পুরাণ হয়ে এসে থিতু হয় 'অমলের গায়ে'। নারীশরীরে আশ্রয়প্রার্থী স্বরটি বরাবরই মেনে চলে প্রাণের তাগিদে বেঁচে থাকার সংগ্রাম ('মনু পক্ষের এক "কৌরব"')। 'স্ববিবাদী দ্বিধা দ্বন্দ্বের সমীকরণ নিপুণ তুলিতে আঁকা হতে থাকে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে'।
'একা ঘুমহীন রাত জাগে শোভনা' -- খণ্ডিত বাক্যটির ওপর ভর করেছে অখণ্ড শূন্যতার ইতিবৃত্ত ('অদাহ')। বেওয়ারিশ লাশ পোড়ানোর ডোম, শোভনা একদা ছিল 'মাথায় আঁচল জড়ানো মলিন গৃহবধূ'। রাজনীতির শিকার শোভনা বাঁচে 'মৃত্যুর গন্ধটাকে বুকে করে'। শেষরক্ষা হয় নি তবু যতই 'ক্ষিপ্র, ভয়ংকর, চণ্ডালিনী' সে হয়ে উঠুক না কেন পরিস্থিতি অনুযায়ী। শাশ্বতগদ্যের সংবেদী দিক কেবল বর্ণনায় সীমিত নয়। প্রতিটি শব্দ অন্তর্ভেদী ব্যঞ্জনানির্মাণে ক্রিয়াশীল।
স্মৃতিবর্তিকায় আলোকিত মনের গোপন কন্দরে রচিত 'যৌথজীবনের গল্প '। ('ছাই রঙের মাটি') প্রতীকী প্রবাল ফের প্রশ্ন হানে 'বুলু নামটার সাথে কি ওই সুন্দর মুখটার আদৌ কোন সম্পর্ক আছে?' 'ইঁটভাটার ছবি' আছড়ে পড়ে 'চুর্ণী নদীর বাঁকে'।
'দেল সন্ন্যাসীর ব্রত পালন' পর্যবেক্ষণ গদ্যশরীরে যুক্ত করেছে বিশ্বাসজনিত আচারের অলংকার। হিন্দু-মুসলিম মিশেলে বাংলার সাংস্কৃতিক চালচিত্র কথাকাহিনির প্রধান উপজীব্য। ('খেজুর সন্ন্যাসী') 'গাজী পীর এই নয়ন পোঁতার দেবতা' -- বাক্যটি কাহিনির যাত্রাপথ নির্ধারণে সহায়তা করে।
মায়াময় আরম্ভের পর অপেক্ষা করে 'আত্মশ্লাঘার গুমনামী শর্বরী'। উত্তমপুরুষে গ্রন্থনা অগ্রসর হয়, স্মৃতিধারাপ্রসার লাভ করে ('অনন্ত বিকেলের রূপকথার') 'কিশোরী বেলার অভ্যাস' সমক্ষে আসে অনায়াসে। "ইন্দ্রাণী ঘোষ" বিশ্বাস করেন তাঁকে 'ছিঁড়ে উপড়ে ফেলা যাবে না'।
গল্পের ভিতরে গল্প যেন বিনি সুতোয় গ্রথিত। 'উদয়হাটি'র উজ্জ্বল উপস্থিতির পাশে কিছুমাত্র ম্লান নয় 'বিশ্ব মানচিত্রের এক আজব নকশা'। ভ্রমের অজস্র অনুষঙ্গ কাহিনির যাত্রাপথে বহুস্তরীয় মাত্রা সংযোজন করেছে। ('ডরাইয়া মরে') প্রতিটি ক্ষণস্থায়ী দৃশ্য ও ঘটনা চেনা পরিসর অতিক্রম করেছে সুনিপুণ গদ্যগুণে।
ব্যক্তি প্রীতম সহজেই এসে মেশে ফুড ব্লগার প্রীতমে। "আপনি কি কাউকে খুঁজছেন"? বিরামহীন লয়ে পৌঁছে দেয় প্রীতম-কুসুমের হৃদবাসরে। ('বই পাড়ার মাটন কারি') 'মাটন কারি' নিমিত্ত মাত্র ভূমিকায় সক্রিয় গোটা আখ্যান জুড়ে। সামাজিক পরিমণ্ডল এড়াতে চাইলেও উপেক্ষা করা যাবে না এমন গতিময় বিন্যাসের কৌশলে।
ভাবনা ও ভাষার নিবিড় দাম্পত্য অবস্থান সৃষ্টি করে অমোঘ উচ্চারণ। সুলগ্না-কৌশিক-নমিতা বিচরণ করে অবাধে নিজ নিজ আধার অবলম্বন করে। ('জতুর্থ কলম ও রুইতন রেজোন্যান্স') 'সেই রাতের পর থেকে ওপারের যতিহীন নিস্তব্ধতা ঢেকে ফেলেছিল কৌশিকের সব ঋতুর উৎসবময় জীবন'।
'কলিম শেখ' চরিত্রটির সামনে আসার প্রস্তাবনা নির্মাণে তন্নিষ্ঠ পাঠের প্রয়োজন রয়েছে। ('আফুটানির গপ্পো এবং সেই লোকটা') কাহিনির নির্দিষ্ট পথরেখা না ধরে দৃষ্টিপাত দাবি করে 'পাণ্ডুয়া ব্লকের পশ্চিমের গ্রামগুলো'। সংবাদদাতার নিয়মে প্রকাশ পায় 'কলিম শেখ' -- এর অস্তিত্বের মূলমন্ত্র। হয়তো মনে হতেই পারে 'সবটাই আফুটানির গপ্পো'।
'শেষবারের দেখা ট্রামটা' তাড়িয়ে নিয়ে ফেরে আখ্যানশরীরে। ভঙ্গুর নাগরিকতায় রিক্ত মৃদুলা আঁকড়ে ধরে ট্রামযাপন। যুগসঞ্চিত অবক্ষয় ধরা পড়ে নিত্যনৈমিত্তিক জীবনচর্যার ভাঁজ ভাঁজে। ('মিছিলের ঠিক পরের ট্রামটা') 'সটান উঠে বসে আধখোলা জামাটা গায়ে দিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা লাগায় সন্দীপ। মৃদুলা ওর দিকে চেয়ে থাকে শুধু'।
গ্রন্থনাম -- 'পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে'
লেখক -- শাশ্বত বোস
প্রকাশক -- রাজর্ষি ঘোষ, অনিমিখ পাবলিকেশনস্
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ -- প্রশান্ত সরকার
মূল্য -- ৪০০ টাকা
যোগাযোগ: ৮৫৮৫০৬১২৬২ / ৯০০৭১৮২১০৬
########################################
অমিতাভ সেন
জন্ম: ৯ অক্টোবর ১৯৬৮।'রেখায় লেখায় : ইতি অমিতাভ সেন' (২০১৯), 'ছড়া জোড়া মন' (২০২০), 'চতুর্দশপদী অন্তরিন' (২০২১), 'চতুর্দশপদী ক্রমবর্ধমান' (২০২২), 'আজানে-আহ্নিকে' (২০২৩), 'ঝরে জল' (২০২৩), 'ফারাক' (২০২৪), 'বেইমান' (২০২৫) -- আটটি পদ্যগ্রন্থে অমিতাভ সেন নিয়ত ভ্রাম্যমাণ। 'বান্ধবনগর', 'কবিতা বুলেটিন', 'আবহমান বাংলা ওয়েব পত্র', 'চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম', 'কক্ষপথ', 'বল্মীক', 'এবং অধ্যায়', 'পুরোগামী সাহিত্য', 'এই সময়', 'রোববার.ইন' ইত্যাদিতে এযাবৎ অমিতাভর পদ্য আলোচিত ও প্রকাশিত। 'The Antonym - Global Literary Magazine' - এ প্রকাশিত ওঁর অনূদিত দুটি ছোটগল্প 'Raghunandan's Death Report' এবং 'The Hyena'। 'Chime of Time : Yearbook of Bengali Poetry in Translation', পঞ্চাশটি কবিতার সংকলনে সতেরোটি কবিতা বাংলা থেকে ইংরেজিতে অমিতাভর অনূদিত।



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন