বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

ছোটগল্প * কল্যাণ ভট্টাচার্য





প্রাগৈতিহাসিক মানুষ  

কল্যাণ ভট্টাচার্য 


যত দিন যাচ্ছে মনটা ভেঙে যাচ্ছে সজনীকান্তের। এবারও আশানুরূপ রেজাল্ট করতে পারল না ছেলেটা। বড়ো সংগ্রাম করে জীবনের পথে এগিয়ে যেতে হয়েছে সজনীকান্তকে। নিজে সারা জীবন ধরে চেষ্টা করেও একটা চাকরি পাননি কিন্তু নিজেকে বা তাঁর পরিবারকে কখনোই বিপদের মুখে ফেলতে দেননি। আসলে বুঝতেই দেননি সংসার নামক যাঁতাকলটি তিনি কিভাবে ঠেলছেন। জীবন সংগ্রামে অনেক কষ্ট করেছেন কিন্তু পরিবারের স্ত্রী পুত্র কাউকে কোনো কষ্ট টেরও পেতে দেননি। নানা ফাইফরমাশ খেটে অর্থ উপার্জন করেছেন কিন্তু সুযোগ পেয়েও অসৎ পথে হাঁটেননি। কাল কিভাবে চলবে এমন পরিস্থিতি এলেও বাড়িতে এসে লাফিং বুদ্ধার মতো হাসিটা ঝুলিয়ে রেখেছেন বহুবার । কিন্তু তাঁর কষ্ট যন্ত্রণা কাউকে বুঝতেও দেননি। তাঁর কেবল একটাই লক্ষ্য ছেলেটা যেন একজন ভালো মানুষ হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়। সজনীকান্তের বড়ো ইচ্ছে ছেলেটা নিজের মেধায় যেন একজন বড়ো মাপের ডাক্তার হয়। সেজন্য তিনি সব সব করতে পারেন। ছেলের সব সখ আহ্লাদ বলার আগেই পূরণ করেন। 

            সজনীকান্ত দেখেছেন ছেলে সুজন যথেষ্ট বুদ্ধিমান। সেই প্রি-নার্সারি থেকে পড়াশোনায় অদ্ভুত অদ্ভুত বুদ্ধি বের করে তাক লাগিয়ে দিত সে। একবার হয়েছে কি ৮ ঘরের টেবিল মুখস্থ করানোর কিছুক্ষণ পরে ২০ ঘরের টেবিল একবার দেখেই সে না দেখে হুবহু খাতায় লিখে দেয়। সজনীকান্ত বিস্মিত হয়ে যান  কি করে এটা সে পারল! জিজ্ঞেস করতেই সুজন  সেই শিশু বয়সেই সজনীকান্তকে সব কৌশল বুঝিয়ে দেয়। এমন আরো কিছু কিছু বিষয়ে তার কৌশলী বুদ্ধির পরিচয়ে সজনীকান্ত  চমকে যেতেন । ফলে তাঁর মনের মধ্যে বসে যায় যে এমন বুদ্ধিমান ছেলেকে তিনি তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে ডাক্তারী পড়াবেন। যতদিন গেছে বুদ্ধি সুজনের ক্ষুরধার হয়েছে কিন্তু অদ্ভুতভাবে উঁচু ক্লাসে গিয়ে রেজাল্ট ওর আশানুরূপ হয়নি। এই ভালো রেজাল্ট না হওয়ার পেছনের প্রেক্ষাপট কিছুটা হলেও জানেন সজনীকান্ত। ছেলে সুজনকে টানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাস। পাঠ্য বইয়ের বাইরের অনন্ত জ্ঞান ওকে দূরে নিক্ষেপ করে। ছেলেকে পড়াতে গিয়ে অনেকবারই দেখেছেন সজনীকান্ত সে পাঠ্য বইয়ের নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তরে সন্তুষ্ট না হয়ে লাইব্রেরী থেকে ওই বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ বই নিয়ে আরো গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। আবার কখনো কখনো ইন্টারনেটের সাহায্য নিয়ে ওই বিষয়ে ডিটেইলস জেনে নিচ্ছে। এমনকি স্কুলেও ক্লাস টিচারদেরকে কেন হলো, কিভাবে হলো ইত্যকার নানা প্রশ্নে জর্জরিত করায় তাঁরাও বিরক্ত প্রকাশ করে। তাঁরা সুজনের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারায় বাধ্য হয়ে গার্জেন কলও করেছেন। শিক্ষকরা সজনীকান্তকে এও জানিয়েছেন, সে কি ওই বিষয়ে গবেষণা করবে যে এমন প্রশ্নের উত্তর তার জানা চাইই! সজনীকান্তও বলে উঠেছিলেন সেসময়, নাহয় আপনারা একটু বিষয়ের গ্রাসরুটটা বুঝিয়েই দিলেন, তাতে তো কোনো ক্ষতি নেই!  প্রত্যুত্তরে সেই শিক্ষক তাঁকে জানালেন, এতো সময় আমাদের নেই। শুধু আপনার ছেলেকে আমাদের পড়াতে হয়না, চল্লিশ জনের গোটা ক্লাসকে দেখতে হয়। তবে আপনার ছেলে যেভাবে চলছে তাতে সে ভালো রেজাল্ট কিছুতেই করতে পারবে না। আর বাস্তবিক হলোও তাই। সজনীকান্তের ছেলের এই গভীর অন্বেষার বিষয়টা ভালো লাগলেও ভালো রেজাল্টের ক্ষতির আশংকা থেকে সাবধানও করেছেন মাঝেমধ্যে। কিন্তু সুজন একইরকম তার অন্বেষার কাজ চালিয়ে গেছে। আর একইরকমভাবে ভালো রেজাল্টের বিষয়ে উদাসীন থেকে গেছে। সুজনের এই রেজাল্টের বিষয়ে উদাসীনতা সজনীকান্তকে  চিন্তায় ফেলেছে। সজনীকান্ত ভালো রেজাল্টের কথা বললে সে বলে, খুব ভালো রেজাল্ট দিয়ে ভালো ছেলে বা ভালো মেয়ে হয় না বাবি। রেজাল্ট দিয়ে ভালো মন্দ বিচার করা যায় না। ভালো নম্বর একটা সংখ্যা মাত্র। আর যারা যেন তেন প্রকারেণ ফার্স্ট হওয়াটা প্র‍্যাক্টিস করে ফেলে তারা স্বার্থপর মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। তারা ভবিষ্যতে নিজেদের মেলে ধরতে খুব ভালো কেরিয়ার গড়বে কিন্তু মা বাবা বা কাউকে ভবিষ্যতে দেখবে না। সমাজের কথা তো ছেড়েই দাও।

            ওর এসব যুক্তি শুনে থমকে গেছেন সজনীকান্ত। ভাবতেই পারছেন না এ ছেলে এমন ভাবনা পোষণ করলে  কিভাবে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাবে। মনে মনে ভাবেন, আজো এই প্রথাগত শিক্ষা দিয়েই তো ছেলেমেয়েদের কেরিয়ার তৈরি হয়। তাই কেরিয়ারটা তো আগে গড়ে তুলতে হবে বাপু। কিন্তু এক অনিবার্য কারণে ছেলেকে কিছু বলে উঠতে পারেন না। 


[২]


            মাধ্যমিকে সুজন সাধারণভাবে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছে। কিন্তু ওর জ্ঞান বুদ্ধি অনুযায়ী একেবারেই সাধারণ। খুব আশা ছিল সজনীকান্তের ছেলেকে নিয়ে। কিন্তু জীবনের প্রথম বড়ো পরীক্ষাতেই হোঁচট খেল সুজন। এখনকার দিনে মাধ্যমিক পরীক্ষায় সাধারণভাবে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করাটা কোনো বড়ো বিষয় নয়। এই নম্বর নিয়ে সুজন কিভাবে ডাক্তারী পড়ার দিকে এগিয়ে যাবে! এই ভাবনা সজনীকান্তকে কুড়েকুড়ে খায়। নাহ,ছেলেটার সাথে একটু আলাদা করে বসতে হবে। কিন্তু কী বলবেন সজনীকান্ত? বলবেন, তুমি এবার থেকে শুধু পড়ার বইয়ের দিকে ফোকাস রাখো, জ্ঞানের গভীরে যাওয়ার জন্য পড়ার বইয়ের বাইরে কিছু পড়া বা জানার দরকার নেই? বলতে পারবেন একথা? বলাটা উচিত হবে? সজনীকান্ত দ্বন্দ্বে পড়ে যান, কী বলা উচিত হবে ছেলেকে? 

            এদিকে তাঁদের সীমান্তপল্লীর প্রায় সব ছেলে মেয়েরাই দারুণ দারুণ সব রেজাল্ট করেছে। সীমান্তপল্লীর ছেলে অপূর্বকে নিয়ে জৌলুস বেরিয়েছে। ও পুরো পশ্চিম বর্ধমান জেলা জুড়ে প্রথম হয়েছে। সেরা দশজনের মধ্যে আছে। 

             খবরটা সুজনই প্রথম দেয় ওর বাবা মাকে। বলে, আমার বন্ধু অপূর্ব জেলার ফার্স্ট বয় হয়েছে মা। চল ওকে একটু কনগ্র‍্যাচুলেশন করে আসি।

             ওর মা বলে ওঠে, তুই কী রে! তোর নিজের রেজাল্ট কি হলো সে খবর নেই, চললি বন্ধুকে কনগ্র‍্যাচুলেশন জানাতে!

             সজনীকান্ত স্ত্রী জয়াকে থামায়। বলে, ছেলের রেজাল্ট তো আমরা জেনে গেছি। পরের পরীক্ষায় ও দেখবে আরো ভালো রেজাল্ট করবে। ঠিক আছে তুমি এক প্যাকেট মিষ্টি কিনে ওর সাথে যাও।

             সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে সুজন, বাবি, শুধু মিষ্টি? একটা ভালো গিফট দেবো না ? 

             এ ছেলেকে কি বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারেন না সজনীকান্ত। একটা প্রচ্ছন্ন হাসি লেগে থাকে সজনীকান্তের ঠোঁটে। বলেন, ঠিক আছে তোমার যা গিফট দেবার কিনে দিয়ে দিও।

             সুজনের চোখে মুখে আনন্দ ঠেকরে বেরিয়ে আসে, চলো, চলো মা, তাড়াতাড়ি গিয়ে গিফটটা দিয়ে আসি। অপূর্ব খুব খুশি হবে। 

             সুজন আর তার মা জয়া এগুতেই দেখে এ বাড়ি ও বাড়ির মায়েরা  ছেলেমেয়েদের গর্বে পাড়ার রাস্তার মুখেই জটলা পাকিয়েছে। ওই জটলা পেরিয়ে এগিয়ে যেতেই সুজনের এক বন্ধু গৌরবের মায়ের মুখোমুখি। প্রি-নার্সারি থেকে একই সাথে পড়ত ওরা। দুই মা দুই বাচ্চাকে নিয়েই একসময় ওদের স্কুলে যেত। 

             কি গো সুজনের মা, চললে কোথায় ? মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোলো কিন্তু তোমার ছেলের রেজাল্ট জানলাম না তো?

             জয়া হাসে, তা তোমার ছেলেরও তো রেজাল্ট জানতে পারিনি গো! 

             গৌরবের মা বলে, আমার গৌরবের রেজাল্ট দেশসুদ্দু লোক জানে গো। এ লোকাবার জিনিস নয়। নাইন্টি ফাইভ পার্সেন্ট নম্বর পেয়েছে। আরেকটু হলে আমাদের পাড়ার অপূর্বকে ধরে নিতো। কপাল মন্দ! এবার তোমার ছেলের খবর বলো, সুজনও তো খুব বুদ্ধিমান ছেলে ছিল। ছোটবেলায় স্কুলে কত কম্পিটিশন হতো দুজনের মধ্যে। 

              সুজন বলে ওঠে, না না, আমাদের মধ্যে কোনো কম্পিটিশন হতো না গো কাকিমণি। গৌরব বরাবরই পড়াশোনায় ভালো ছিল। 

              তা বেশ বাপু। এবার তোমার রেজাল্টটা বলো দেখি। 

              জয়া দ্রুত বলে ওঠে, আমার ছেলেও খুব ভালোভাবে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছে। 

              তা কত পার্সেন্ট পেয়েছে বললে না তো? 

              ওই তোমার ছেলের মতোই। প্রায় নাইন্টি… 

              সুজন ওর মাকে থামিয়ে দ্রুত বলে ওঠে, না কাকিমণি, আমি সিক্সটি ফাইভ পার্সেন্ট নম্বর পেয়েছি। 

             আরো সব মহিলাদের মুখও এখন এদিকে। নিমেষে জয়ার চোখমুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। 

             অপূর্বর মা বলে ওঠে, ছোটবেলায় তুই কত ভালো ছেলে ছিলিস! এতো কম নম্বর কি করে হলো রে?

              আমি তো এখনো আগের মতোই আছি কাকিমণি! 

              না, এই কম্পিটিশনের বাজারে এতো কম নম্বরে কোথায় ভর্তি হবি, কি করে এগুবি! তোর বাবা বলছিলেন একদিন তোকে নাকি ডাক্তারি পড়াবেন। এখন কিভাবে…

             এসব কথাবার্তায় জয়া একেবারে কুঁকড়ে যায়। বলে, আসি গো গৌরবের মা। পরে আবার দেখা হবে। বলেই এগোনোর জন্য পা বাড়াতে যায়। হাত ধরে থামায় ওকে গৌরবের মা। বলে, দুঃখ করোনা গো সুজনের মা। আরো বড়ো পরীক্ষা তো বাকি আছে। তখন দেখো… তবে এই মেনিমুখো টিচারগুলোও হয়েছে তেমনি। আমার গৌরবকে তো ওরাই একটু কম নম্বর দিয়ে অপূর্বর থেকে নিচে করে দিল। নাহলে আমার গৌরব ঠিক এক থেকে দশের মধ্যে থাকত। তোমার ছেলেকেও দ্যাখো ওরা… 

            এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল সুজন। এখন বলে উঠল, না কাকিমণি, টিচাররা আমাদের ঠিক নম্বরই দিয়েছেন। 

            সুজনের কথায় যেন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল গৌরবের মা। বলে, তোর কথা আমি বলতে পারবো না রে। তবে আমার গৌরবকে যে ওরা কম নম্বর দিয়ে অপূর্বর পেছনে ঠেলে দিয়েছে এটা আমি বলতে পারি। বলেই অন্যান্য মহিলাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় গৌরবের মা। 

            এবার ছেলে সুজনের হাত ধরে নিজের পথ ধরে জয়া। যেতে যেতেই বলে, কি দরকার তোর ওর সাথে মুখ লাগানো। দেখলি তো ছেলেকে নিয়ে ওর কত গর্ব! আর সব সত্যি কথা ওদের সামনে বলতেই হবে! তুই তো খুব ভালো নম্বর তুলে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করিসনি। বললামই যদি তোর জন্য একটু মিথ্যে কথা। তাতে কি মহামারি হয় শুনি! 

           না মা, যা সত্যি তাই তো বলা উচিত! মিথ্যে বললে তো আমি আমি থাকবো না! মিথ্যে আমি হয়ে যাবো। আমি যা তাই থাকতে চাই মা।


[৩]


ক্রমশ সজনীকান্ত ছেলে সুজনের সাধারণের পথে যাওয়ার দিকে চেয়ে থাকেন । সুজনের অসাধারণ বুদ্ধি জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও নিজেকে এভাবে সাধারণ থেকে অতিসাধারণ দিকে নিয়ে যাওয়াটা ওঁকে বিস্মিত করে তোলে। যেন অন্য এক বোধিজ্ঞানে লিপ্ত সে। মহান নয়, মহানুভবতাই যেন ওর লক্ষ্য। সজনীকান্ত ক্রমশ যেন তাঁর ছেলেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। হ্যাঁ, আরো সাধারণের দিকে সে এগিয়ে চলেছে। মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক থেকে একাউনটেন্সিতে অনার্স — সবেতেই ভালভাবে উত্তীর্ণ হলেও সে অসাধারণ কিছু করতে পারেনি। বাবা সজনীকান্ত চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক, সাইন্স নিয়ে পড়ুক। কিন্তু সুজন নিজেকে সাধারণ একজন ছাত্র হিসেবে কমার্স নিয়ে পড়েছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা এম.বি.এ. নয়, সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে সাধারণ চাকরি চেয়েছে। বাবা সজনীকান্ত তাকে টিচার্স ট্রেনিং করিয়েছেন এই অবধি। কোনো সরকারি চাকরি নয়, সাধারণ চাকরিতেই সে সন্তুষ্ট থেকেছে। ভালো সরকারি চাকরিতেও সে নিস্পৃহ থেকেছে। যদিও না চাইলেও সে কোম্পানিতে ট্রেনি অফিসার হিসেবে জয়েন করেছে। কোম্পানিই তাকে এই পোস্ট দিয়েছে। এতেই সে সন্তুষ্ট। ওর বাবা সজনীকান্তকে বলেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করছে বাবি। আমিও তাদের মধ্যে একজন। আমার এতেই আনন্দ। তারা যদি ভালো থাকে, তাহলে আমিও ভালো থাকবো। চাকরির জায়গায় বেশ মানিয়ে নিয়েছে সুজন । সহকর্মীরা যেন ওকে চোখে হারায়। কোনো সহকর্মী বিপদে পড়লে তার  জন্য সে অনেক সময় ষোলো ঘন্টা, এমনকি একটানা কুড়ি ঘন্টাও ডিউটি করেছে। কিন্তু কোনো বিরক্ত প্রকাশ করেনি। একদিন বাড়ি এসে ওর মাকে জানায় সুজন, আগে কেউ কিছু কিনলে পাঁচ পয়সারও হিসেব হতো মা । আমি ওদের বলেছি, বন্ধুদের মধ্যে এমন চুলচেরা হিসেব করতে নেই । যে যেমন পারে খরচ করবে। তাতে কারো কিছু কম আর কারো একটু বেশি। এতে ভালবাসা অটুট থাকে। এখন আমাদের মধ্যে ভালবাসার টান আরো বেড়ে গেছে । এটাই আমার আনন্দ মা। 

           ওর বন্ধুরা কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, আবার কেউ ভালো সরকারি অফিসার হয়েছে। সুজন তার স্বভাব অনুযায়ী তাদের সাফল্যে উৎফুল্ল হয়ে তাদেরকে খাইয়েছে, গিফট দিয়েছে। অন্যের সাফল্যে ওর এতো আনন্দ কিভাবে হয় ভেবে বন্ধুরা পর্যন্ত অবাক হয়ে যায়। 

           আজ সুজন চাকরি করছে। হ্যাঁ, একটা সাধারণ কোম্পানিতে। মাইনেও খুব বেশি নয়। তবে চলে যায়। মাইনের সম্পূর্ণ টাকাটা সে তার বাবার কাছে পাঠিয়ে দেয়। হ্যাঁ, আগের মতোই ওর বাবার কাছে খাওয়া আর ট্রেন-বাস ভাড়ার টাকা নেয়। বন্ধুদের গর্ব করে বলে, আমার বাবা আমাকে হাত খরচ দেয়। বন্ধুরা কেউ কেউ বলে, তুমি তো এখন চাকরি করছো। এখনো বাবার কাছে…। তুমি কি এখনো সেই ছোটটি আছো!

           সুজন মৃদু হেসে বলে, বাবা-মায়ের কাছে তো ছেলেমেয়েরা ছোটই থাকে। বাবা-মায়ের কাছে ছোট হয়ে দেখো তোমরাও খুব আনন্দ পাবে। জয়া নিজেকে প্রশ্ন করে, আচ্ছা, আমাদের ছেলেটা কি কোনো দিনই বড়ো হয়ে উঠবে না?


[৪]


এই গল্পের উপসংহারে সাধারণ দৃষ্টিতে  সুজনের আরো অবনমন ঘটে। যত দিন যাচ্ছে পৃথিবীটা আরো জটিল হচ্ছে। আর সুজন তত সরলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কথায় কথায় ওর বন্ধুবান্ধবদের বলে, পৃথিবীটা বড়ো সুন্দর। সবাই কি ভালো মানুষ, না? যেন নিজেই প্রশ্ন করে নিজেই তার সঠিক উত্তরে সিলমোহর দেয়। তখন সহকর্মীরা এর ওর মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তাদের মধ্যে প্রশ্নটা যেন অনুরণিত হয়, সত্যি পৃথিবীটা সুন্দর! সুন্দর!  সুন্দর! সহকর্মীদের কেউ কেউ যেন ওর চরিত্রটা পড়ে নেয়। ওরা বোঝে, ছেলেটা সহজ সরল আর সেই সাথে বোকা। সুজন সহকর্মীদের ভালবাসে, বিশ্বাস করে। বাবা সজনীকান্ত ছেলের ভেতরটা চেনেন। তাই বারবার সতর্ক করেন, চোখ-কান খোলা রেখো ব্যাটা। সুজন বলে, হ্যাঁ বাবি, এখানে সবাই খুব ভালো। আমাকে খুব ভালবাসে। 

           সবাই একই জায়গায় চাকরি করে, অনেকেই পুরনো কর্মী হিসেবে সুজনের থেকে বেশি বেতন পায়। কিন্তু অনেকেই ওর কাছ থেকে ধার নেয়, কিন্তু শোধ দেওয়ার কথা ভাবে না। সুজনও সে টাকা চাইবার প্রয়োজন মনে করে না। কোথাও একসাথে খাওয়া দাওয়া হচ্ছে, তার বিল মেটাবে কে, না সুজন। না, এ বিষয়ে সুজনের কোনো হেলদোল নেই। আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের জন্মদিন বা কোনো উপলক্ষে কোথাও গিফট দিতে হবে সে একটা নয়, দুটো গিফট দেবে। এতেই ওর আনন্দ। ওর মা হয়ত ব'লে উঠল, দুটো গিফট কেউ দ্যায়! একটা গিফট দিলেই তো হয়! সজনীকান্ত চুপিচুপি জয়াকে বলে ওঠেন, ছেড়ে দাও, ওর দুটো গিফট দিতে ইচ্ছে হচ্ছে, দিতে দাও। ওর রাজা মনটাকে মেরো না। সহকর্মী বন্ধুবান্ধবরা বুঝে গেছে আসলে সুজন হচ্ছে সহজ সরলের সাথে সাথে বোকা মানুষ। তবে কোথায় কি করছে শিশুটির মতো সে এসে ওর বাবা মাকে সব বলছে। বলা শেষে একগাল হেসে বলে, কী করবো বলো, এতে ওরা খুশি হয়। যেন পৃথিবীর সব মানুষকে সব আনন্দ খুশি দেওয়ার ভার ওকেই দেওয়া হয়েছে। বাবা সজনীকান্ত ছেলের এসব কাজকর্ম দেখে মস্করা করে বলেন, ছেলে আমার লস প্রজেক্ট। নিজের জন্য নয়, সে অপরের জন্য বাঁচে।

           সুজন বলে, না বাবি, জীবনে চলাফেরাটা রাজার মতো হওয়া উচিত। অধমর্ণ নয়, উত্তমর্ণ হয়ে মানুষকে বাঁচতে হবে। তবেই জীবন থেকে  আনন্দ পাওয়া যাবে । 

           অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সুজন নানাভাবে ঠকছে বুঝতে পারেন সজনীকান্ত। সহজ সরল এই ছেলেকে সাবধান করতে একদিন সজনীকান্ত বললেন, সহজ সরল থাকা ভালো ব্যাটা, কিন্তু কেউ যেন তোমাকে বোকা না মনে করে। 

           সুজনের মুখে যেন উত্তরটা লেগেছিল। বলল, আচ্ছা বাবি, দেশের মানুষের কথা ভেবে মাত্র ষোলো বছর বয়সে ক্ষুদিরাম যে ফাঁসি নিয়েছিল, সে কি বোকা ছিল?

           এর উত্তর কি দেবেন জানা নেই সজনীকান্তের। 

          ছেলে সুজনই যেন বাবাকে সেখান থেকে উদ্ধার করতে বলে উঠল, তুমি আমাকে মাও সে তুংয়ের লেখা একটা গল্প শুনিয়েছিলে বাবি, মনে আছে? সেই যে একটা বোকা বুড়ো লোক যে একদিন পাহাড় সরিয়ে ছিল। তুমি বলেছিলে… একদিন  চিনের একজন অতি সাধারণ বুড়ো লোক পাহাড়ের চুড়োয় উঠে পাহাড় কাটতে লাগে। তার উদ্দেশ্য ছিল তার পরিবারের মানুষজন যেন সহজে পাহাড়ের ওপারে চলে গিয়ে নিজেদের কাজকর্ম সহজে করতে পারে। পরিবারের মানুষজনকে ভালবেসেই তো সে ওই অসম্ভব কাজটা করতে শুরু করেছিল বাবি। তারপর বুড়োকে যে দেখে সেই জিজ্ঞেস করে,  এই অসম্ভব কাজটা কিভাবে সে সম্ভব করবে। সে তখন উত্তর দিয়েছিল, সে হয়তো নিজের জীবনে এর শেষ দেখে যেতে পারবে না। কিন্তু এই কাজটা তখন তার ছেলে করবে। তার ছেলের পর তার নাতি করবে। তারপর তার নাতির ছেলে করবে। এভাবে কাজ চলতেই থাকবে। তাহলেই একদিন সম্পূর্ণ পাহাড় সরে যাবে। সেই কথা শুনে উদ্দীপনা পেয়ে ওখানকার লোকজন নিজেরাই পাহাড় সরাবার কাজে লেগেছিল। আর একদিন সেই পাহাড় সরেও গিয়েছিল। সাধারণ মানুষের চোখে বোকারাই তো অনেক বড়ো বড়ো কাজ করেছে বাবি। আর একটি কথাও আর বলেনি সেদিন। 

            এমন কথা সে কেন বলল খোঁজার চেষ্টা করলেন তিনি। ছেলে সুজন কি তাহলে পুরনো পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাইছে যেখানে একদিন পাপ ছিল না, পূণ্য ছিল না। কেবল এক অনাবিল আনন্দ ছিল। তবে কি সে ক্রমশ প্রাগৈতিহাসিক মানুষ হয়ে যাচ্ছে ?













**************************************************************************************************




কল্যাণ ভট্টাচার্য


বাংলা সাহিত্যাকাশে কল্যাণ ভট্টাচার্য এক বিশিষ্ট নাম। সারা ভারত জুড়ে অণুগল্প নিয়ে আন্দোলন করেন। সাহিত্য লহমা পত্রিকার মাধ্যমে এবং দূরদর্শনের বিভিন্ন চ্যানেলে অনুগল্প বিষয়ক অনুষ্ঠান করে সারা ভারতবর্ষে অনুগল্পকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। ছোট গল্প নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। প্রকাশিত হয়েছে ছোটগল্প কবিতা ও নাটকের বই। ইতিমধ্যে তার 'মানুষের ছবি' গল্পগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন শিলিগুড়ি থেকে এন. আর. ডি. এফ. অ্যাওয়ার্ড। অনুগল্পের শ্রেষ্ঠত্বের জন্য পেয়েছেন কলকাতা থেকে 'কফি হাউস' পুরস্কার ও 'ব্রায়ান অণুগল্প' পুরস্কার। কবিতার শ্রেষ্ঠত্বের জন্য পেয়েছেন 'এবং লোকায়ত পুরস্কার' 'বেলারানী দে স্মৃতি পুরস্কার ২০১৭ ,এছাড়া পেয়েছেন ছোট বড় সম্মান ও সম্বর্ধনা। পেয়েছেনকলকাতা থেকে "আরাত্রিক পুরস্কার,২০২২" ও সমগ্র সাহিত্যকৃতির জন্য "ফিনিক্স পরিবার পুরস্কার, ২০২২"।

1 টি মন্তব্য:

  1. অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই আপনাকে। স্বরবর্ণ একটি মুগ্ধকর ওয়েব ম্যাগাজিন। অনেক অভিনন্দন ও শুভকামনা রইল।

    উত্তরমুছুন