কথা দিয়েছিলাম হেমন্তের নিয়রে
পর্ব ২৩
দীপংকর রায়

পথের এই ধারাবাহিকতা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্য কিছু ভেবে চলতে চেয়েছি বলেই হয়ত এত অন্তরায়। প্রকৃত প্রাকৃতিক ভাবে শিক্ষাকে শিক্ষার মতো মূল্য দিয়ে ভাবতে গেছি বলেই তো, এতো প্রতিবন্ধকতা। সেই ভাবে কোনো পরিচয় তৈরি হবার পথ তো সেখানে দেওয়া নেই! যে কারণে সকলের মাঝখানে যেয়ে নানা সংকট তৈরি হয় সেই জন্যেই! পরিচিতি কি কোনোকিছু সেইভাবে দেবার মতো আছে? সেটাও তো বুঝে পাই না।
এইটা হলে, ওইটা হতে পারত; এই ধরণের ভাবনাচিন্তাগুলি
আমরা করি ঠিকই, কিন্তু সেই মহা প্রবাহের গতি যে যে তোড়ের মধ্যে দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে
চলে, তার গতিমুখ কি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? সেই মহা প্রবাহতেই ভাসিয়ে নিয়ে চলে তার
আপন ছন্দে সবকিছু। সেখানে মানুষের নিয়ন্ত্রণ শক্তি কতটুকুই বা? নিতান্ত অসহায়তাকে
গেলা ছাড়া— আর তো কোনো উপায় দেওয়া নেই!
এইরকম সব ভাবনাচিন্তা করে যখন কোনো তালই
খুঁজে পাই না, তখন যেন ঘাড় ভেঙে বসে থাকি বারান্দার একটি কোণে একাকী। চেয়ে থাকি সামনের
অন্ধকারের মধ্যে সেই অনেকটা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাউগাছ গুলির মাথার দিকে। এই
দেখার বিহ্বলতা অধকার রাত্রিবেলাগুলিতেও যেমন, আবার জোছনার আলোর মধ্যেও তেমন। তখনো
তেমনি চুপচাপ চেয়ে থাকতেই বলে যেন কেউ। আবার কখনো কিছুটা বাতাস পেয়ে,
মাথা
দুলিয়ে যেন সাড়া দেয় এই বলে, কী এতো ভাবছো বসে বসে? আমার মত মাথা দোলাও দেখি, আবার থেমে যাও, আবার মাথা দুলিয়ে এই আলো অন্ধকারে
মাখামাখি করো তো দেখি কেমন পারো! সেই একটুখানি প্রাণের অস্তিত্বে ধরা দিয়েছো যখন,
তখন তোমার এইসব আকাশ পাতাল ভাবনায় কোনো কূলই এসে ধরা দেবে না জেনো তোমার কাছে। সেখানে
কেবলই ভেসে থাকা। ভাসমান এক গতির সঙ্গে তোমার ছুটে চলা শুধুই। এই নিয়ে অস্থির হয়ে
যেও না। তুমি শুধু সেই চলাকেই অভ্যাস করো কেবল। তার আগুপিছু নিয়ে এত ভেবে ভেবে সময়
নষ্ট করো না। তাই বলি কি, ভাবনাচিন্তা বাদ দিয়ে যা করছো, যা করলে তোমার মন শান্ত হয়,
আনন্দ পায়, তাই করে যাও। একদিন যে কথা রসিক দাদু তোমাকে বলেছিলেন— যা তোর মনে হয়,
যা তুই প্রতিদিন মনে করতে চাস, বা করে চলতে বাধ্য হোস, সেগুলিই লিখে রাখবার চেষ্টা
করবি যতোটা পারিস। আবার মাঝে মাঝে সেই লেখা গুলি একবার দেখবার চেষ্টা করবি কিন্তু!
তাহলেই তুই তোর ভালো মন্দ সব কিছুকেই খুঁজে পেয়ে যাবি সেখানেই। দেখতে পাবি সেখানে তুই কতোটা পেরেছিস আর কতোটা তুই পারিসনি।
আমার মনে হয় কি জানিস, এটা সকল মানুষেরই করা দরকার। সেটা না হলে, সে তার ভালো মন্দ
কোনোকিছুই বুঝতে পারবে না কোনোদিন।
সেদিন তাঁর কথা মেনে নিয়ে যেভাবে শুরু করেছিলাম,
তা আবার নানা কারণে বহুকাল থেমে আছে।
নিজের
মনে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করি— তাহলে কি আবার শুরু করবো? যদি লিখিও, তাহলে কীই বা বেশি
কিছু হবে? বড়জোর জানতে পারবো কতকগুলি দিন পরে সেই দিনগুলি কেমন ছিলো! যদিও সেই হিসাবের
খাতায় তো যা তাই-ই, শূন্য তো, সবই শূন্য— কিছুই হয়নি!
হওয়া
কাকে বলে?
যেমন ধরা যাক, আজ মূল্যবান এই কাজগুলি করছি।
কাল এইগুলি করবার কথাটা ভেবেছিলাম, অথচ এই এই জন্যে হয়ে ওঠেনি। ওই জন্যে হয়ে ওঠেনি।
এই তো মোদ্দা কথা!
না না, সেটা না। শুধু সেটাই না। আরো অনেক
কিছু। গতকালের ভাবনা, আর গত পরশুর ভাবনাচিন্তার সঙ্গে দেখা যাবে কত পাল্টে গেছে সব
কিছুই!
ক্রম পর্যায়ের এই অদ্ভুত এক স্রোত, যাকে
ওইভাবে দেখা না গেলেও, তাকে ইচ্ছা করলেই উপলব্ধি করতে পারবে তুমি। আর কাজ? কাজ তো কাজের
মতোই চলবে… আজকের কাজ আর কালকের কাজের মধ্যেও যে নিরন্তর এক পার্থক্য, দেখবে সে তোমাকে
অত্যন্ত ধীর গতিতে পাল্টে নিয়ে চলেছে… তা তুমি খুব গভীর ভাবে লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবে,
বা টের পেয়ে যেতে থাকবে। তখন তুমি আরো ভালো করে বুঝতে পারবে আজকের ভূমিকা তোমার কী
ছিলো? কালকের ভূমিকাই বা কেমন ছিলো? পরশুই বা তুমি কেমন ছিলে? সবটাই তোমার কাছে স্পষ্ট
হয়ে উঠেছে দেখতে পাবে।
এখানেও একটুখানি কথা থাকে যদিও, সেই কথাটাও
কি ঠিক! তোমার লক্ষ্য কতো দূরে? কতোটা অন্তর্ভেদি? তাকে তুমি কতোটা মগ্ন হয়ে ধরে রাখতে
পারছো? সব দেখবে ধরা পড়ে যাবে। ধরা পড়ে যাবে তোমার নিজের কাছেই।
এই রকম রাত-অন্ধকারে কতোদিন যে একা একা কাটতে
লাগলো বারান্দায় বসে বসে, সেই একটিমাত্র মোড়াটিকে সম্বল করে, আর সামনের সেই ঝাউগাছগুলির
সারিই হয়তো সেসব কিছুটা জানে। সেই মাসিমাদের বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে যারা সারি
সারি! আর জানে বাড়ির সামনের পথটা।
ইদানীং যখন পথে কাঠের ইলেকট্রিক পোলের মাথায়
একটি করে ডুমলাইট লাগিয়ে দিয়ে গেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। তার আলো এসে পড়েছে আমাদের বাড়ির
সামনের দিককার রংচিতে বেড়ার উপর। যদি কেউ ওই রাস্তার উপর থেকে আমাদের বাড়িটিকে এই
রাতের বেলায় লক্ষ্য করে, তাহলে দেখতে পাবে, পাশাপাশি দুইখানি টালির চাল দেওয়া ঘর।
তার এক বারান্দায় সামান্য একটি আলো জ্বেলে বসে আছে এই রাতের বেলায় একটি ছেলে। তার
বাঁ পাশটিতে লম্বা করে গোরুগুলির থাকবার যে জায়গা রয়েছে। সেখানে হয়তো সেই গোরুগুলির
মধ্যে কেউ ঠ্যাং মেলে শুয়ে আছে। কেউ শুয়ে থেকে এই হয়ত উঠলো। তারপর খানিকটা থপ থপ
করে নেদে দিয়ে পেচ্ছাপ করার শব্দও শোনা গেল ঝরঝর করে। কিম্বা কেউ হয়তো এই সময় একমনে
জাবর কেটে চলেছে….।
এ সময় জেগে নেই মানুষজন। হয়তো কুকুরগুলি
মাঝে মাঝে এদিক ওদিক দৌড়ে যাচ্ছে আসছে। না হলে একই জায়গায় আড়াইপাক ঘুরে শুয়ে পড়লো
হয়তো কারোর বাড়ির সামনের দরজার গোড়ায় ।
কিন্তু সে যে যেভাবেই থাকুক না কেন, কেউ
কারো সঙ্গেই কোনো ভাবনা আদানপ্রদান করছে না অন্তত। এই সময়ে, ওই গোরুগুলি, তারা তাদের
মধ্যে যেমন, এই বাড়িটিও সে তার মতোই। ওই পেছনের ঝাউগাছ গুলি, এই পথ, এই পথের কুকুরগুলি,
তাদের কখনো খুব ত্রস্ত পায়ে চলা, কখনো এপাশ ওপাশ শুঁকতে শুঁকতে চলে যাওয়া, এসবের
সঙ্গে কোনো ভাষা, ভাব কোনোকিছুই কি বিনিময় করছে না কেউ এখন, এই রাত্তিরে?
কেউ কারোর দিকেই তাকাচ্ছে না যেন। সবাই
তার যার যার স্বভাবের ছন্দে, এইখানে, এমন রাতের বেলায় এসে মাঝে মাঝে শুধু মাত্র চুপটি
মেরে বসে থাকে। তখন আমাদের সব ছন্দ কি আমরা জানি সবটা? ওই গোরুগুলির মতন তো আমিও! ওই
কুকুরগুলির মতোই তো আমিও হয়ে যাই যেন, যেন এদিক ওদিক কিছু খুঁজতে খুঁজতে শুঁকে চলি
শুধুই…; কিম্বা দৌড়ে ছুটে যাই ওই পথের মাথায়। তারপর আবার ফিরে আসি। এই রাতের বেলায়
আমিও যেন ওদেরই মতন একজন হয়ে যাই, তাছাড়া আর কীই বা!?
শংকর কখনো কখনো কলেজ ফেরত বিকালের দিকে
আসে। বলে, চল, যাবি নাকি?
কোনোদিন হয়তো যাই, একটু হাঁটাহাঁটি করে
ফেরার পথে বাঁশদ্রোণী বাজার হয়েও আসি একেকদিন। খড়বিচালির জন্যে টাকাপয়সা জমা দিয়ে
ফিরে আসি ঘরে।
এই ঘোরাঘুরির মধ্যে দিয়ে অনেকটা সময় ফুরিয়ে
যাচ্ছে যে সেটা বুঝি যখন, তখন ভীষণ অস্বস্তি হয় এক ধরণের। সেটা ঠিক কীরকম সে কথা
নিজেও জানি না। কীই বা এত ভাবি?
এই পথ হাটাহাটিতে খানিকটা হালকা ঠাট্টা-ইয়ার্কি,
পথের মানুষজন দেখা। কিম্বা এ ওর আগামীদিনের জীবনটা কেমন হলে কেমন কি হতে পারে, এই সব
হাল্কা হাসি-ঠাট্টা, এই সব। আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও তর্কাতর্কি থাকে না
যে তাও না। থাকে। থাকে বর্তমান রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা নিয়ে কিছুক্ষণ কারোর কারোর। হয়তো
দেশ জাতি পক্ষপাতিত্বের কথাও। সে সবে খুব একটা গা দিই না। অর্থাৎ ভালো লাগে না বলেই
হয়তো দিই না গা। খেলাধুলা নিয়েও অতিরিক্ত আলাপ আলোচনায় মাতামাতিরও কোনো কারণ আছে
তা মানি না ।
এই ঘোরাঘুরি, যত দিন যাচ্ছে ততোই এক ধরণের
অহেতুক এক উপলব্ধিতে পরিণত হচ্ছে। অন্তত আমার কাছে। মাঝেমাঝে বাড়ি ফিরে এসে মনে হয়,
আর না। এই খালিখালি ঘোরাঘুরি করে সময় নষ্ট না করে তার চাইতে ঘরেতেই বসে থাকি, সে বরঞ্চ
কাজের কাজ হবে। ওরা এলে বলে দিই, আজ ভালো লাগছে নারে ভাই, তোরা যা, ঘুরে আয় গে।
এতে যদিও ওরা বলে, কিইবা করবি এখন ঘরে বসে
বসে? এখন কি পড়াশোনা করবি, না লেখালেখি? তাও
তো না, তাহলে? ওসব মাঝরাতে করবি। দেখবি, তখন সবকিছু কেমন আপন গতিতে এগিয়ে চলছে।
উত্তরে বলি, মাঝরাতে করবো কী রে, আমাদের
তো একখানিই ঘর। আমি যদি মাঝরাতে আলো জ্বেলে বসে থাকি, বাকি মানুষজন তাহলে ঘুমোবে কীভাবে?
ওসব ছাড়, ওই সুবিধা তোদের মতো আমার কি আছে নাকি? যাক গে, আজ ভাল্লাগছে না, তোরা যা।
আমি যাবো না এখন।
ওরা চলে গেলে বাড়িতেই চুপ করে বসে বসে সময়
কাটিয়ে দিই। আবার কোনো কোনোদিন একাই বেরিয়ে যাই। খানিকটা একা একাই হাঁটাহাঁটি করে
শেষে রমনিদার দোকানে কিছুক্ষণ গল্প করে ফিরে আসি। না হলে ঠাকুমার বাড়িতে চলে যাই।
না হলে দিদির ওখানে যেয়ে খানিকক্ষণ টেলিভিশন দেখে সময় কাটিয়ে আসি।
একেকদিন আবার চলে যাই শৈলেন মামার বাড়িতে।
ওখানে মামির হাতের এক কাপ চা পান
করে
ছেলেপেলেদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসি। বাড়ি ফেরার সময় নান্টু আমাকে ওদের পাড়ার
একটি মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যায়, কুকুর আতঙ্ক থেকে স্বস্তি পাবার জন্যে। এই এগিয়ে
দেবার মধ্যে যেটুকু পথ পেরোনো ওর হাত ধরে, তার মধ্যেই চালান করে দেয় ও যেন খানিকটা
অন্য এক তরঙ্গ।
হাঁটতে হাঁটতে কিছুদূর এগোনোর পরে হয়তো
জিজ্ঞাসা করে, কীরে, এবার যেতে পারবি তো? কুকুরে তোর এতো ভয়? কাল আসিস কিন্তু সন্ধ্যাবেলায়।
তোর সঙ্গে একটু ঘুরে আসবো ওপারের দিকে। জানিস তো, তোর সঙ্গে গেলে কিন্তু মা কিছুই বলে
না। কিরে, আসবি তো কালকে?
—‘দেখি তো...’ এই রকমের কিছুটা অনিশ্চিত সম্ভাবনার
মধ্যে রেখে শেষ করি কথা। ফিরে আসি। আবার হয়তো দীর্ঘ বিরতির পরে কোনোদিন যাওয়া হয়
ওদের ওখানে। তখন আর হয়তো হয় না। কখনো হয়তো যেতে মন চাইলেও কোনো ধরণের একঘেয়েমির
কাছে নিজেকে এগিয়ে দিতে কেন জানি কেমন এক রকম মনে হয়। তাই কোনোদিন হয়তো বেশ দোটানায়
পড়ে শেষপর্যন্ত রাইফেল ক্লাবের মোড় ঘুরে আর ওদের ওদিকটায় ঘুরি না।
আবার বেশ কিছুদিন পরে হয়তো ওর মায়ের হাতে
অতি যত্নের এক কাপ চায়ের টানে পৌঁছতে মনটা টানে। সেই এক কাপ চা হাতে তুলে দেবার মধ্যে
কী যে আন্তরিক স্পন্দনের ছোঁয়া পাই— শুধু মাত্র সেই টানেই ঘুরেফিরে ওদের বাড়িতে
পৌঁছে যেতে যেন বাধ্য হই। সেই সঙ্গে কি ওর সংসর্গটুকু মোটেও টানে না! না, সে কথা একটুখানি
স্বীকার না করলেও তো মিথ্যা বলা হয়! হ্যাঁ, সে সংস্পর্শের টান থাকলেও, পেছনে লেগে
থাকতো আর এক ধরণের ভীতি। তাই ভালোলাগা মন্দ লাগা সব কিছুই নিছক ক্ষণিকের। তাতে চিরকালীন
কোনো স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা প্রবেশ পথ পেতো না সহজ ভাবে।
মুস্কিলটি হচ্ছে এই— দুদিকের টান। শংকররা
এলে ওদের সঙ্গ না দিয়ে এই যে আমি আমার মত করে একেকদিন একেক জায়গায় কাটাচ্ছি, এবং
ঘরে ফিরে এসে এমনই এক বিষাদগ্রস্ত পরিস্থিতির মধ্যে নিজের ভেতরে নিজেই গুমরে থাকছি।
তখন কেবলই যেন মনে হয়, না, এইভাবে কেন আমি সময়গুলি নষ্ট করছি? তার চাইতে ঘরে বসে
থাকি। একান্ত ভাবে বসে থাকি। তখন কে যেন বলে, এর মধ্যেই ভুলে গেলে সব? এইভাবে ঘোরাঘুরি
করেই সময়গুলি বইয়ে দিচ্ছো? যে কাজের ব্রত নিয়েছিলে একদিন, সেটার কথা মনে নেই তোমার?
যে জন্যে ফিরে এলে আবার। সেইসব ভাবনাচিন্তার কথা তো একেবারেই বিস্মৃত হয়ে বসে আছো!
একেবারেই তো সেসব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ঘাপটি মেরে ঘুরে বেড়াচ্ছো এদিক ওদিক!
নিরন্তর যেন দুপাশের চাপ। ঘরে বসলে বাইরে
যাবার জন্যে মনটা ব্যাকুল হয়, আবার বাইরে বেরোলে ঘরের আসনখানি আঙুল উঁচিয়ে ধমকায়।
কার কথা শুনি! একসময় নিজের ভেতরে নিজেই ক্লান্ত হয়ে চিত হই শুয়ে পড়ি কেন যে সে
কথা কাকে বলি!
খানিকটা চেঁচামেচি বকাবকি করে ইদানীং দেখছি
ভাই সময় মতো নিতাইদা এলে বইপত্র নিয়ে বসে যাচ্ছে। হরির বাবা মেসোমশাই এলেও তাড়াতাড়ি
ব্যাগপত্র গুছিয়ে গাছিয়ে নিয়ে বসে যাচ্ছে পড়তে। দেখেশুনে বেশ ভালোই লাগছে ইদানীং
তাকে। কিন্তু কাজের দিদির সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না কিছুতেই যেন তার। তার করে দেওয়া কোনো
কাজই মনঃপুত
হয়
না তার । এই গন্ডগোল, ওমা! আবার দেখি সব ঠিকঠাক হয়ে গেলো যেন। বুঝে পাই না এই পরিবর্তন
কতোটা চিরস্থায়ী হবে। যাক এখন তো যা দেখা যাচ্ছে সেটা ভেবেই কিছুটা নিশ্চিন্ত হই।
পরে যা হয় তা হোক। এখন যেটুকু হয়েছে সেটুকুকেই মঙ্গলের বলে ভাবি না হয়।
দেখতে দেখতে তিন-চারটি বছর কোথা দিয়ে যে
চলে গেল বুঝতে পারলাম না।
এখন এখানে বাম রাজত্ব চলছে। এসেছিলাম কংগ্রেস
আমলে। এখন মানুষের মধ্যে সমাজতন্ত্রের পালাবদলের দিন। সর্বত্র কাস্তে হাতুড়ি আঁকা
হয় দেওয়ালে দেওয়ালে। নির্বাচনের সময় সেবারে একেবারে হই হই করে মানুষজন সমর্থন করে
নিলো সমাজতন্ত্রের সাংবিধানিক রূপ। যেন ঘরে ঘরে লালের ছড়াছড়ি। তাহলে কি সত্যি সত্যিই
সমাজ বিপ্লব একেবারে রাতারাতি ঘটে গেল, সর্বত্র? ঘরে বাইরে এত বিপ্লবের ছড়াছড়ি! স্লোগান।
যেন ভাতের হাঁড়িতেও লাল দাগ লাগিয়ে নিলো মানুষজন। সে যে কী হই হই ব্যপার! তা আর কী
বলি!
মায়েরও সেবার ভোটের ফলাফল গণনার ডিউটি পড়েছিলো।
সমস্ত রাত জেগে রবীন্দ্র সদনে গননা চললো । শেষ রাতে অফিসের গাড়িতে বাড়ির সামনে নামিয়ে
দিয়ে গেল দেখলাম। এর মধ্যে মায়ের অফিসের বাড়ি সংস্কারের কাজও চলছিল। সেই কারণেই
মনে হয় সূর্য নগরের কাছে কিছুদিন বাড়ির থেকে পায়ে হেঁটে অফিস করে আসতে পারত মা,
দেখতে পেতাম।
‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’... এই ছিল তখন পথে পথের
স্লোগান। কিন্তু বিপ্লব কোথায় যে ঘটলো তা বোঝা গ্যালো না। একজনও আর অন্য কোনো রাজনীতি
করে না যেন আর! সকলেই রাতারাতি সমাজতন্রের নামাবলী গায়ে দিয়েছে যেন এখন। অথচ ভালো
করে লক্ষ করলে দেখা যায় একই মানুষেরা জামাপ্যান্ট পাল্টে নিয়ে রাতারাতি লাল হয়ে
গ্যাছে পোশাকপরিচ্ছদেও। কেউ যেন কোনো কালে অন্য কোনো রংই চিনতো না এর আগে। দলে দলে
মানুষজন সি পি এমের সদস্যপদ পেয়ে গেল।
আমবাগানে মেশামেশির দৌলতে অমরদা বলে একজন
মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সেই অমরদা একজন সমাজতান্ত্রিকের নাম বলতো প্রায়শই।
কীভাবে তিনি সেই আমলে রাশিয়ায় চলে যান যেন সমাজতন্ত্র জানার জন্যে। সেই সময় কমিউনিস্ট
পার্টির সদস্য পদ পেতে কত কঠোর পরীক্ষার পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল তাকে। কত অপেক্ষার
পরে তখন সদস্য পদ পাওয়া যেত। তারই একটা বর্ণনা করতো প্রায়শই অমরদা। অমরদা কথায় কথায়
সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা বলে গর্ববোধ করতো। তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আছে নাকি তার
এখনোও। আমাকে বলতো, যাবি নাকি? দেখে আসবি প্রকৃত কমিউনিস্ট কাকে বলে! বয়েস হয়েছে
যদিও, তবুও চল দেখিয়ে আনি তোকে, কবে থাকে না থাকে!
বলেছিলাম যাবো। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। রবীন্দ্রনাথের
বংশধর। সম্পর্কে সম্ভবত নাতিই হবেন মনে হয়। ভাই-এর ঘরের ছেলের ছেলে বা মেয়ের ছেলে।
এরকম কিছু হবে সম্পর্কটি কিছু একটা।
একদিন বাসে করে কোথাও যেতে যেতে রাণিকুঠির
ওখানে বাসটা দাঁড়িয়ে গেল বিজয় মিছিলের জন্যে।
মিছিলের সামনে একখানি ট্রাকের মাথার উপর প্রশান্ত সুর পা ঝুলিয়ে গলায় গেঁদাফুলের
মালা পরে বসে দুই হাত নাড়তে নাড়তে জনতার উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন তাদের বিজয়ের
আনন্দে। বাসের জানলা দিয়ে সে দৃশ্য দেখলাম। মানুষের ঢল নেমেছে যেন রাস্তায়। বেশ কিছুক্ষণ
বাসের মধ্যে বসে বসে ঘামতে থাকলাম।
ক্লাব-জীবনের একটি বছরের মধ্যে সেই সময়টি—
নিতাইদার জন্যেই ক্লাবের সদস্য হয়ে যাওয়া, এবং তার জন্যেই অত মানুষের মধ্যে নিজের
লেখা পড়েছিলাম।
বেশ কিছুদিন সেই যে সংকল্প ক্লাবের হয়ে,
সেই যে নমনি রায়ের বাড়ির ছাদের মাথায় একাঙ্ক নাটকের মহড়ায় যোগ দেওয়া অভিনয় করার
জন্যে, যা বেশ কিছুদিন চললো, যদিও শেষ পর্যন্ত সে নাটক মঞ্চস্থ হয়নি আর। নিতাইদার
জন্যেই কালীবাড়িতে ঝন্টুদার চায়ের দোকানের আড্ডায় সন্ধ্যেবেলা হলে দোকানের সামনের
বেঞ্চিতে বসে বসে রাত দশটা পর্যন্ত আড্ডা দিতাম। তখন নিজেকে কেন যেন বেশ একজন কেউকেটা
গোছের মনে হতো— কেন যে মনে হতো সেটা কিন্তু
জানতে পারতাম না। তবে যাদের মধ্যে বসে বসে নানা সমাজ বিপ্লবের জয়গান শুনতাম, কখনও
কখনও সন্মতি জানাতেও বাধ্য হতাম তাদের কথার, যদিও তারা সকলেই আমার থেকে বয়েসে বড়,
তবে নিতাইদা ব্যতীত তাদের মধ্যে আর কাউকেই আমি দাদা বলতাম না, তাদের সকলের সঙ্গেই শুরুর
অভ্যাসবসত নাম ধরে ডাকাডাকির সম্বোধনেরই ছিল। এই ক্ষেত্রে প্রথম সম্বোধনের অভ্যাসটিকে
কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারিনা আজও। কারণ দুই চার বছরের ব্যবধানকে দাদা সম্বোধনে বাঁধলে,
বন্ধুত্বের সূত্রটি যেন কেমন কেটে যায়। যদিও এই স্বভাব দোষে পরবর্তী জীবনেও অনেক সূচিবায়গ্রস্থের
পাল্লায় পড়ে নিজেকেও হাঁটু ভেঙে দ হয়ে যেতে হয়েছে কত জায়াগাতেই যে, সে আর কী বলবো!
ইদানীং ঝন্টুদার দোকানের সামনেটা সন্ধ্যাবেলার
সময়টা নিয়ে নিচ্ছে প্রায়শই। বাড়ির কাজকর্ম সেরে সন্ধ্যা লাগতে না লাগতেই ঝন্টুদার
চায়ের দোকানে যেয়ে সেই যে কথাটি দিয়ে শুরু হতো, ‘দেখি, একটাকে দুটো করে দাও ঝন্টুদা’....
সেই অভ্যাসটির ঘোরে পেয়ে বসেছিলো যেন বেশ কিছুকাল। এই নিয়ে শঙ্করদের কাছেও কত অনুযোগ
শুনতে হয়েছে যে তার আর কীইবা বলি! ওরা বলতো, কী রে তোকে তো এখন চায়ের দোকানের আড্ডায়
পেয়ে বসেছে দেখছি ভালো মতোই! তুই শেষে কিনা চায়ের দোকানে ভিড়ে গেলি! একেবারে সাব
স্ট্যান্ডার ব্যপারস্যাপার সব! তুই কি জানিস, ঐ দোকানে কী কী হয়? তোর এইরকম অধঃপতন
হলো শেষপর্যন্ত? যাক, যা ভালো বুঝবি তাই করবি, আমি আর বলে কী করবো বল! তোর তো আবার
মানুষজন নিয়ে কারবারের প্রয়োজন হয়েছে শুনেছি আজকাল! কিন্তু দেখিস, এই সব গাঁজাখোর
মাগিবাজদের দলে ভিড়ে নিজে আবার ফেঁসে যেন না যাস! মানুষ খুঁজতে যেয়ে শেষে তুই না
আবার সেইসব মানুষের ফাঁদে আটকে পড়িস।
এই সব একদিন বলে গেলো শংকর ওদের দলবল সঙ্গে
করে নিয়ে এসে।
যদিও ওদের ধারণা সবটা ঠিক না হলেও অনেকটাই
যে ঠিক সেটা কিছু দিন যেতে না যেতেই বুঝতে পারলাম। শংকরের এই ক্ষেত্রে জানাজানির বহরটি
যে অনেকটাই সঠিক সেটা জেনে যাবার পরে আমার ক্ষেত্রে বেশ ভালোই হলো। নানা ধরণের মানুষজনের
আনাগোনা যে ছিল ঝন্টুদার দোকানে তার বড় একটা কারণ ঝন্টুদা ইংরাজী বাংলা মিলে বেশ কিছু
ধরণের মদ গেলাসে ঢেলে গোপনে বিক্রি করতো। অনেকেই চায়ের বদলে বেঞ্চির আবডালে রেখে সেই
গেলাসে চুমুক দিতো একটু একটু করে। সেটা কদিন যেতে না যেতেই বুঝে গেলাম। যদিও এই ক্ষেত্রে
ঝন্টুদার দোষ হচ্ছে সরকারি ট্যাক্স না দিয়ে বিনা লাইসেন্সে সে মদ বিক্রি করছে! হয়তো
ভেঙে ভেঙে বিক্রি করছে বলে দামটাও একটু বেশিই নিচ্ছে সে। তাতে আর এমন কি বিশেষ দোষের
কাজই বা করছে সে?
বিষয়টা নিয়ে বাইরে বেঞ্চিতে বসে সকলের সঙ্গে একদিন ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসাও করলাম
অন্যদেরকে, এটা কী করছে রে ভাই ঝন্টুদা?
তারা
তাতে বললো, ঠিকই তো আছে, লাগবে নাকি তোর?
একটু রাত হলেই কতজন যে ঝন্টুদার খরিদ্দার
হয়ে যেতো আমাদের মধ্যে থেকেও কেউ কেউ। এবং তারা তার অনেকদিনের একপেগের বাঁধাধরা খরিদ্দারও
বলা যায় । এতদিন যে বিষয়টি চোখে পড়েনি আজ সেটা একবারে অনেকটাই খোলামেলা হয়ে গেল
যেন। যে কথা এতদিন আমার অজানা ছিল, সেই কথাটা শংকরের জন্যে একেবারে হাট আগলা হয়ে গেল
আজ।
তা তো জানা হলো। তবে বিভিন্ন ধরণের মানুষজনের
আনাগোনা সেটা দেখাও তো কম না। তাদের নানা ধরণের আলাপ আলোচনা শোনা সেটাই বা কম কী! ঘুগনির
ঝোলের দাগ লেগে থাকা খবরের কাগজ ওল্টাতে ওল্টাতে কিছু একটা ঘোরের মধ্যে বেশ কিছুদিন
সময় কাটানো। একদিন সত্যি সত্যি দেখতে পেলাম ঝন্টুদার কাছ থেকে গাঁজার পুড়িয়া কিনে
নিয়ে ভিসা ভিসার বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে রাইফেল
ক্লাবের
খাড়া পাঁচিলের অন্ধকারে একটুখানি আড়াল খুঁজে নিয়ে হাতের তালুর উপরে গাঁজার পাতাগুলি
ভালো করে দুইহাতের তালুর মধ্যে ডলে নিয়ে তার থেকে গাঁজার বিচিগুলি বেছে বেছে ফেলে
সিগারেটের ভেতরের তামাক খানিকটি ফেলে দিয়ে বাকি কিছুটা গাঁজার পাতার সঙ্গে মিশিয়ে
নিয়ে এবারে সেই মিশ্রিত তামাকটি আবার খালি সিগারেটের খোলের ভেতর একটু একটু করে পুরে
নিয়ে এবার সেই সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে নিয়ে সে যে কি মনের সুখের টান টানতে লাগলো,
সেই দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী তো আমিও সেদিন হয়েছিলাম। কিছুক্ষণ বাদে কী ভালো ভালো কথাবার্তা
বলাবলি সে আর কি বলি। এতে নাকি তাদের বিরাট মস্তি। মস্তি কথাটির অর্থ সেদিনই প্রথম
ভালো করে বোঝাও হলো।
এরপরেও তাদের সেই দলের কিছুদিন সঙ্গি হয়েছিলাম
কখনো কখনো। ভিসার ডাকে রাইফেল ক্লাবের পাঁচিলের সেই অন্ধকার ছাওয়ায় ঘুরে এসে আবার
চুপটি করে চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে থাকা। ওদের সঙ্গে যাওয়ার মজাটা ওরা যখন গাঁজা
পান করে ফিরে আসতো তখন কতো যে ভালো ভালো দার্শনিক কথাবার্তা আওড়াতো সেটা শোনার জন্যেই
ছিল আমার বিশেষ অপেক্ষার মজা। কিন্তু এই বিষয়ের মজা পাওয়ার আনন্দ ঘোর ভাঙলো যেদিন
সামান্য একটুখানির জন্যে নান্টুর ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে মাঠের ভেতরে দেখা হয়ে যাওয়াতে
বেশ খানিকটা অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। ভাবলাম ও কি ভাবলো! ও কি গন্ধ পাইনি গাঁজার? তাহলে
ও কি ভেবে নিলো আমিও গাঁজা পান করতেই এখানে এসেছি? এই কথা যদি মামিমাকে বাড়ি যেয়ে
বলে দেয়!
সেই আমার যেন জ্ঞান ফিরলো! সামাজিক ভাবে
সেই জিনিসটা যে স্বীকৃত নয় সেই কথাটা ভেবে। যদিও এতদিন পর্যন্ত এই যে ওদের সঙ্গ করেছি
কখনো ওরা আমাকে সাধেনি গাঁজা পান করতে।
হ্যাঁ,
একদিন যদিও বলেছিলাম, দে তো দেখি, কী এমন মস্তি আছে পরখ করে দেখি। কী আছে ওতে?
সেই দিনই শেষ দিন ছিল যদিও ওদের সঙ্গে গাঁজার
আসরে রাইফেল ক্লাবের পাঁচিলের ছাওয়ায় দাঁড়ানো। কারণ তার পরের দিনই নান্টুর ভাই-এর
সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায়— কি ভেবে যে আর কখনোই তাদের সঙ্গ করিনি কেন যে সেইদিনের পর
থেকে, তা নিজেও কখনো ভেবে দেখিনি আর।
রমনীদার দোকানের থেকে ঝন্টুদার চায়ের দোকান
খুব একটা দূরে নয়, শুধু রাস্তাটির বাঁক আলাদা, ঝন্টুদার চায়ের দোকানের সামনের পথটি
সরাসরি রাইফেল ক্লাবের দিকের, আর রমনীদার দোকানটি কালীবাড়ি থেকে কুদঘাট মুখো পথের
উপর পড়ে। দূরত্বের ব্যবধান খুব বেশি না। শুধু পথের দিকটি দুটো দুদিকে এই যা। তাই বেশ
কিছুকাল, অন্তত একটি বছর তো হবেই, সেই চায়ের দোকানের আড্ডায় নিয়মিত উপস্থিতি ছিল
আমার। সেই সুবাদে নানা ধরণের মানুষজনের সঙ্গে মেলামেশা করবার সুযোগ হয়েছিল। যদিও সেই
মেলামেশায় কোথাও কোনো শিল্পের যোগ ছিল কি ছিল না কিছুই তা জানি না, তবে যৌবনের প্রথম
পর্বের সেই দিনগুলিতে যে যে মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, তাদের দেখেছিলাম খুব কাছ
থেকে তাতে বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছিলো কি হয়েছিলো না, তাও জানি না, তবে মনে হয়েছিল
এরাও যে খুব একটা খারাপ মানুষজন, তাও তো না! এইসব সমাজ থেকে যারা দূরে দূরে থেকে যে
সব শিক্ষিত মার্জিত ছেলেপেলেরা নিজেদেরকে খুব একটা আলাদা করে রেখে সংস্কৃতিবান বা কালচারালাল
শ্রেণী বলে নিজেদেরকে দাবি করে, তাদের থেকে এই সব মানুষজনদের সঙ্গে মেলামেশা করে যতটুকু
বুঝতে পারলাম তারা আর যাই হোক মেলামেশায় অনেক বেশি একাত্ম। একে অন্যের আপদে বিপদে
তারা ছুটে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাহায্য করতে একবারের জন্যেও পিছুপা হয় না। প্রয়োজনে হসপিটাল
বাড়ি সকলটাই সকলের জন্যে নিজের মতো করে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাত জেগে বা সারাদিন এক করে
ছুটোছুটি করে একসঙ্গে দল বেঁধে একে অন্যের জন্যে সমান ভাবে ভাবে।
এরা আবার নাটক জলসাও করে। আবার গাঁজা মদ্যপানও
করে সকলে মিলে একসাথে উৎসব অনুষ্ঠানে। তবে বেসামাল হয়ে নয়। নেহাতই আনন্দটুকু উপভোগ
করতে যেয়ে সেই বিশেষ বিশেষ দিনগুলিতে। তারা কেউই নিয়মিত ঝন্টুদার দোকানের মদের খরিদ্দার
নয়। আবার এদের মধ্যে কেউ কেউ চাকরিবাকরিও করে। আমার মতো কেউই গোপালক নয় বা আপন আনন্দে
কবিতাও লেখে না। এদেরকেই কখনো কখনো দেখি মিছিলের আগে আগে চলতে, ‘মানছি না মানবো না’
বলে মুষ্টিবদ্ধ একটি হাত উঁচিয়ে তুলতে তুলতে লাইন ধরে মানুষজনের সঙ্গে মিছিলে হাঁটতে
থাকে।
সে যে যেমন যে দলকে নিয়ে পছন্দ মতো হাঁটতে
থাকুক। তাতে আমার আর কী! এর মধ্যে আবার কেউ কেউ প্রেমে ভালোবাসায় একেবারে বিভোর। চায়ের
দোকানের বেঞ্চিতে বসে বসে কারোর জন্যে হয়তো অপেক্ষা করে কখন তার পছন্দের মানুষটি এই
পথ দিয়ে ঘরে ফিরবে। হয়তো তারা কেউ চাকরিবাকরি করে! হয়তো কেউ কলেজ থেকে ফেরে এই সময়
। তারপর দূর থেকে তার প্রিয় পাত্রীকে দেখে তাকে অনুসরণ করতে থাকে দেখি। এতক্ষণ যে
অপেক্ষা, এরপর তাদের কথাবার্তা চলতে চলতে পথ হাঁটা, সবটাই কত রকম ভাবে একেক জনের সঙ্গে
একেক জনের সেই যে হাঁটাহাঁটি সবটাই চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে বসে একেক সময় একাকীই
দেখতে থাকি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের ফিরে আসতেও দেখি। তখন তাদের মুখের উজ্জ্বলতার
বর্ণটিই আলাদা রকমের যেন। কী প্রশান্তির! আবার কোনো কোনো দিন বিমর্ষ হয়েও ফেরে একেক
জন তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে কথাবার্তার পরে। সবটাই দেখি চেয়ে চেয়ে। তখন হয়তো আমাকেও
দুকাপ চা বেশিও খেতে হয় তাদের সঙ্গে। আবার কেউ হয়তো কারোর জন্যে ছুটতে ছুটতে এসে
জিজ্ঞাসা করলো, এই দেখেছিস নাকিরে ওঁকে? হয়তো সে জানতে পারলো সে চলে গেছে অনেকক্ষণ।
তখন হয়তো সে মুখটি চুপসে যেয়ে বললো, যা! চলে গেল!
এই যে তাদেরকে চেয়ে চেয়ে দেখবার মুহূর্তগুলি,
তাদের তারপরের আকুলিবিকুলি করা মুখটিকে দেখে কি এক অদ্ভুত অনুভব হতো যে, তা ঠিকঠাক
বলবার ভাষা জানা নেই যেন।
আর ঠিক তখনই পথ দিয়ে হয়তো কিছু কেনাকাটা
করতে নান্টুকে দেখতাম কালীবাড়ি মুখো যেতে। আমাকে দেখে বলতো, চল না রে, আয় না, একটু
মোড়ের মাথা থেকে ঘুরে আসি।
কিম্বা হয়তো রমনীদার দোকানের সামনের সেই
জ্বলজ্বলে চোখের মেয়েটিকেও দেখতাম হয়তো হেঁটে যেতে রাইফেল ক্লাবের দিকে। কেন জানি
না ওকে দেখলেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধড়াস ধড়াস করে উঠতো।
সে চলে গেলে মনে হতো, আচ্ছা, একে দেখলে এ রকম হয় কেন?
দিদির বাড়ি থেকে বাড়ি ফেরার পথেই রমনীদার
দোকান এবং ওদের বাড়ির পথটাকে পেরোতে হয়। ফেরার পথে তাই হয়তো কখনো কখনো রমনীদার কাছে
শুনেছি, রিক্সাওয়ালা নিতাই বা বিষনি ভাই কেউ এসেছিলো কিনা দানাভুসি নেবার জন্যে। ঠিক
সেই সময়ে সেও হয়তো তাদের ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে রাস্তা পার হয়ে যেকোনো জিনিস
নেওয়ার অজুহাতে রমনীদার দোকানে চলে আসে। এই ঘটনা শুধু একদিন হলে কাকতালীয় মনে হতেই
পারতো, কিন্তু সেটা তো না, এই ঘটনা অনেকদিনই ঘটে, তখন মনে হয়েছে একে নিছক কাকতালীয়
ঘটনা ভাবা যায় না তো একেবারে! এ ইচ্ছাকৃত! তা না হলে সময়টা এইরকম ভাবে মিলে যায়
কেন? কেনই বা ওই সময়টাতেই তার একাধিক সময় জিনিসপত্র কেনাকাটার দরকার পড়ে? আবার ঝন্টুদার
দোকানের সামনে দিয়েও হাঁটাহাঁটির প্রয়োজন পড়ে যখন আমরা এখানে আড্ডা দিই। আগে তো
কোনোদিন এদিকে দেখিনি! এই তো, কিছুদিন এদিক দিয়ে চলাচল করতে করতে দেখছি তাকে! সময়টা
এইভাবে মিলে যায় শুধু শুধুই বা কী জন্যে ?
ঘটনাটা অনেকদিন ধরেই এইরকম ঘটে চলেছে। অথচ
কেউ কারোর সঙ্গে কোনো পরিচয় নেই বা নিতান্ত কথাবলাবলিও না।
আজকাল এই যে হাঁটতে চলতে এমন কোনো কথা ছুঁড়ে
দিলো হয়তো, যা শুনলে খুব সহজেই বুঝে নেওয়া যেতো সে তার পাশে পাশে চলা বন্ধুটিকেই
শুধু বলছে না সেই কথাগুলি, হয়তো তার বলা কথাটির ভেতর এমন কিছু কথা থাকতো যা বহুকেন্দ্রিক
অর্থ বোধক।
কেন মনে হতো এমনটা? সত্যি সত্যিই তার কোনো জবাব আছে আমার কাছে !
এই ধরণের ছোঁড়া কথার বিষয়টা রমনীদার
কানেও ধরা পড়েছে নাকি। একদিন তাই সেও জিজ্ঞাসা করে বসলো, এই বিষয়টা কী হচ্ছে গো?
তোমাকে দেখলেই ও বাড়ির বর্ণালীর ঘরের বাইরে ঘোরাঘুরি বেড়ে যায় কেন? এমনকি তুমি আসলেই
ও আমাদের দোকানে বারবার চলে আসে কেন?
হঠাৎ করে কোনো জড়তা না রেখে এমন ভাবে রমনীদা
যে আমাকে জিজ্ঞাসা করতে পারে এমনটা আমি কখনোই ভাবতে পারিনি! তাই আকাশ থেকে পড়বার মতো
হয়ে যাই যেন। কিছুক্ষণ তার জিজ্ঞাসার উত্তরও দিতে পারি না। কিন্তু এক সময় তো কিছু
বলতেই হয় তাকে! তাই বললাম, ও রমনীদা, এই যে আপনি ওর নামটা বললেন, আমি তো সেটাও জানি
না! ওর নাম যে বর্ণালী সেটাও তো এই আপনার মুখ থেকেই জানতে পারলাম আজকেই! তাহলে আপনার এই কথার কী উত্তর দিই তাই বলুন তো?
কিন্তু সে যাক আপনার কেন মনে হলো বা কীভাবে অনুমান করলেন আপনিও সেটা বলুন তো আমাকে?
আমি নিজেই তো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ছি, আপনি কীভাবে বুঝতে পারলেন সে কথাই ভাবছি এখন আমিও!
রমনীদা হাসতে থাকলেন। মেয়েটির চলাচল অনেকদিন
ধরেই সে লক্ষ্য করেই আজকে আমাকেই প্রথমে জিজ্ঞাসা করে জানতে চাইছে, আদোও বিষয়টা আমি
জানি কিনা বা বুঝতে পেরেছি কিনা?
তাতে বেশ খানিকটা নিঃসংকোচেই তার কাছেও আমি জানতে চাই, এই যে আপনি আমাকে যেভাবে
জিজ্ঞাসা করতে পারলেন, সেটা কি ওর কাছেও পারবেন?
সে তাতে বেশ নির্দিধায় বলে, হ্যাঁ তা
সে পারবে। কারণ তাদের সঙ্গে তার সম্পর্কের বাঁধন এমনই। কিন্তু তার আগে সে আমার কাছে
শুনে নিল। এবং আমি যদি সন্মতি দিই তাহলে সে জানতেও পারে তার কাছে।
কেন জানি না, তাকে বিরত করলাম এ বিষয়ে।
এবং বললাম, সে যেন এখনি কিছু শোনাশুনি না করতে যায়। হয়তো তার কথা ভেবেই তাকে থামিয়ে
দিলাম। কারণ আমার সঙ্গে এই মেয়েটির সরাসরি পরিচয়টাই তো নেই। শেষে রমনীদা যদি পুরো
বিষয়টিতে জিজ্ঞাসা করতে যেয়ে অপ্রস্তুত হন! তাই তাকে থামিয়ে দিই, এই নিয়ে কিছু
শোনাশুনি সে যেন না করতে যায় আগবাড়িয়ে। এ ছাড়াও আর একটি বিষয় তো রয়েছেই। সে কথা
রমনীদাকে জানাই, আমরা যে এই মুহূর্তে কিছুদিন এখানে থাকছি না সেই কথাটি। গোরুর খাদ্য
খাবারের প্রয়োজন যা সে সব নিতাই বা বিষনিভাই সামলাবে। আর ওই বিষয়ের প্রসঙ্গে তাঁকে
আর একটি কথাও বলে দিলাম, এই সব নিয়ে সে যেন বিশেষ ভাবিত না হয়। কারণ এগুলি সবই এই
বয়সের অস্থিরতা একটি। তবে তার ধারণা যে সঠিক সে কথাটিও স্বীকার করলাম তার কাছে।
রমনীদা সবটা শুনে এবার আমার যাবার বিষয়ে বেশ খানিকটা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা
করলেন, কবে তুমি তাহলে বাংলাদেশে যাচ্ছো?
বললাম, ভিসা এলেই যাবো।
সে জানতে চাইলো আমরা তিনজনেই যাচ্ছি নাকি?
বললাম, হ্যাঁ, আমরা সকলেই যাচ্ছি। কারণ
দিদিমার শরীরটা খারাপ, চিঠি এসেছে।
ওদেশে যাচ্ছি শুনে সে বেশ আপ্লুত হয়ে
গেল দেখতে পেলাম। তাঁর মুখচোখের উপর কী যে এক আনন্দের তরঙ্গ উঠে ভেঙে যেতে দেখলাম তা
কি বলবো। সে আনন্দের ঢেউ কথা বুঝিয়ে কাউকে বোঝানোর নয়। সে বলতে থাকে, বা বা যাও,
বেড়ায়ে আসোগে, এদিকের এইসব নিয়ে ভেবোনা। ওসব আমি নিতাই বা বিষনিকে দিয়েই সামলে
দেবো। ভারি মনডা চায় জানো! কিন্তু তা তো আর হয়ে ওঠে না! এই যে তোমরা যাচ্ছো এইটা
শুনেই আমার দেশের কথা মনে হচ্ছে জানো, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে কোই? দেশের বাড়ির সেই
যে গাছগাছালি ঘেরা আমাদের বাড়িটি, আজও রয়েছে, জানো? তোমার যাবার কথা শুনে চোখের সামনে
সব ভেসে উঠলো। যাও, যাও ঘুরে আসো গে; কোনো চিন্তা করো না। যাও, ভালো ভালোই ঘুরে আসো
গে, যাও চলে, কোনো ভাবনা-চিন্তা রেখো না এখানকার বিষয় নিয়ে।
রমনীদাকে
সেদিন দেশে যাবার কথা বলে সমস্ত বিষয়টিকে হালকা করে দিয়েছিলাম যেমন সে তো ঠিক আছে
কিন্তু পরে কী যে অস্বস্তি হতে লাগলো! কেবলই মনে হতে লাগলো, আচ্ছা, কী এমন কিছু দেখলো
সে যাতে এতটা সহজেই আমাকে এই রকম একটি বিষয় নিয়ে এত সহজেই জিজ্ঞাসা করতে পারলো? তাহলে
কি আমার চোখমুখের ভেতর এমন কোনো অস্থিরতা রমনীদা অনেকদিন ধরেই লক্ষ্য করে আসছিলো! সত্যিই
কি তেমন কোনো চঞ্চলতার প্রকাশ কখনো ঘটেছে আমার ভেতরে? আমি তো তেমন কোনোভাবেই কখনো কাউকে
এই নেহাত ছেলেমানুষী বিষয়টিকে কখনোই বলিনি! এই নিয়ে নিজের মধ্যে এমন কোনো স্বপ্ন
আকাঙ্ক্ষারও স্থান দিইনি! তাহলে? তবে হ্যাঁ, সে সামনে আসলে একটুখানি অস্বস্তি যে তৈরি
হয়নি সেটা বললে মিথ্যা বলা হয়, হতো, তবে সেটা অন্য কারোর বোঝার মতো না! এই যেমন পথে
চলতে চলতে কখনো হঠাৎ যদি দেখা হয়ে গেল তাহলে অদ্ভুত এক ধরণের অস্বস্তি যে দুজনেরই
তৈরি হতো সেটাও তো অন্য কারোর চোখে ধরা পড়বার মতো নয়! তাহলে কোন সূত্র ধরে রমনীদা
আজ আমাকে এইভাবে দেখে ফেললো? তাহলে কি কোনো এক চোরা পথে সেই ভাববিহ্বলতা মুখ চোখের
উপর বাসা বেঁধে ফেলেছে যে কোনো অন্তরালে যার স্বরূপটি রমনীদার চোখে ধরা পড়ে গেছে?
আর সে জন্যেই সেই বুক ঢিপঢিপ করা এক অনুভব এসে তাকে এমন একজন বানিয়ে তোলে, যাকে দেখলেই
যতো অস্বস্তি তৈরি হয়ে যায়!
আগামী পর্বে
***********************************************

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন