বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

ভ্রমণ * কৌশিকী দেব




পঞ্চচুল্লির পায়ের কাছে

কৌশিকী দেব

 

আমার কাছে ভ্রমণ মানে শুধুই ঘুরে বেড়ানো নয়, শুধুই দল বেঁধে হইহই করা নয়। আমার কাছে ভ্রমণ মানে একটা জায়গাকে তীব্রভাবে ভালোবাসা, সেই জায়গাকে নিয়ে পাগলের মতো স্বপ্ন দেখা। আমার কাছে ভ্রমণ মানে অপেক্ষা, সঠিক সময়ের অপেক্ষা, সঠিক সুযোগের অপেক্ষা, অপেক্ষা করতে করতে করতে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠা ভালোবাসাকে কাছে পাওয়ার অপেক্ষা।

দেখার আগেই একটি জায়গার মায়ায় পড়া হলো ভ্রমণের প্রথম ধাপ। তারপর আসে স্বপ্ন দেখা ও সেই স্বপ্ন সত্যি করার জন্য একরাশ অপেক্ষা নিয়ে  নিজেকে বিভিন্ন দিক থেকে প্রস্তুত করা। আর আমি তো পঞ্চচুল্লিকে একবার দেখে ফেলেছিলাম। সেই টান যে আরও তীব্র টান।




2016, ঘুরে দেখেছিলাম কুমায়ুন হিমালয়ের বেশ অনেকটা অংশ, হলদোয়ানি থেকে শুরু করে নৈনিতাল, সাততাল, ভীমতাল, মুক্তেশ্বর, বিনসর, আলমোড়া, চৌকোরি, মুন্সিয়ারি, বাগেশ্বর, বৈজনাথ, কৌশানী, রানীক্ষেত হয়ে কাঠগোদাম, সঙ্গে লখনউ, বারাণসীও ছিল। এতো কিছুর মধ্যে আঁটকে পড়েছিলাম কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে সারারাত জেগে মুন্সিয়ারি থেকে দেখা পঞ্চচুল্লির রূপে। মনে মনে ইচ্ছা রেখেছিলাম আবার একবার পঞ্চচুল্লির ভুবন-ভোলানো রূপ দেখবো কোন এক পূর্ণিমার রাতে।

মাঝে পেরিয়েছে ১০ বছর, ঘুরেছি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে। কিন্তু আর যাওয়া হয়নি পঞ্চচুল্লির আঙিনায়। এই বছর সেই ইচ্ছে আরও জোরদার হলো। সময়, সুযোগ সবাই বললো এবার অপেক্ষার অবসান হোক।

যথাসময়ে টিকিট কেটে, পছন্দের আস্তানায় মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে, যানবাহনের ব্যবস্থা করে শুরু হলো দিন গোনা। প্রধান গন্তব্য আদি কৈলাস ও পঞ্চচুল্লি বেসক্যাম্প।


 



আমি আজ বলবো দরমা ভ্যালি ও চৌদ্দ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত পঞ্চচুল্লি বেস ক্যাম্পের কথা। আমার দুর্বল শরীর নিয়ে ওই উচ্চতায় যাতে মানিয়ে নিতে অসুবিধা না হয় তাই কয়েক মাস ধরে অনেক চেষ্টা করেছি; হাঁটাহাঁটি, সঠিক খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে। অবশ্য আমি একা নই, আমরা তিনজনেই (আমি, আমার তেরো বছরের পুত্র ও তার বাবা) চেষ্টা করেছি শরীরকে ভালো অবস্থায় রাখার।

নির্ধারিত দিনে ট্রেনে উঠে স্বপ্নে বিভোর হয়ে নামলাম বরেলী জংশনে। ওভারহেড তার ছিঁড়ে ট্রেন ছয় ঘণ্টা লেট ছিল। আগে থেকে বুক করে রাখা গাড়িতে জিনিসপত্র তুলে দুপুর বারোটায় যাত্রা শুরু করলাম। টনকপুর পেরিয়ে পাহাড়ে চড়া শুরু হলো। চম্পাবতে চা বাগান ও বালেশ্বর মন্দির দেখে আমরা সেই রাত কাটালাম লোহাঘাটে। পরদিন কোলি ঢেক লেক, মিডো, স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিধন্য মায়াবতী আশ্রম, অ্যাবট মাউন্ট দেখে এগিয়ে গেলাম পিথোরাগড়ের দিকে। সেখানে আমরা দেখলাম অপূর্ব অবস্থানে থাকা মনের শান্তিদায়ক কামাখ্যা মন্দির, উল্কা মন্দির, ফ্ল্যাগ পয়েন্ট, ফোর্ট। এরপর আমরা এগিয়ে গেলাম ধারচুলার পথে, সঙ্গী হলো কালী নদী। নদীটি দীর্ঘ পথ ভারত ও নেপালের মধ্যে সীমানা টেনেছে। কালী নদীর ধার ধরে একসময় পৌঁছে গেলাম ধারচুলা। নদীর এপারে ভারতবর্ষের ধারচুলা, নদীর ওপারে নেপালের দারচুলা। ধারচুলায় নদীর ধারে ছিল সেদিনের রাত্রিবাস।

পরদিন কালী নদীর উপর ঝুলন্ত ব্রিজ পেরিয়ে নেপালের বাজারে কিছু কেনাকাটা করে ফিরে এসে রওনা দিলাম আদি কৈলাস ও ওম পর্বত দর্শনের উদ্দেশ্যে, রাত্রিবাস ছিল নাবি গ্রামে। দুই দিন সেখানে কাটিয়ে তুষারপাতের মধ্যে আদি কৈলাস ও ওম পর্বত দর্শন করে রওনা দিলাম শেষ গন্তব্য পঞ্চচুল্লি বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। নাবি গ্রাম থেকে কালী নদীকে সাথে নিয়ে যাওয়ার পথ ধরেই ফিরে এলাম তাওয়াঘাট ব্রিজে। সেখানে কালী নদীর সঙ্গ ছেড়ে শুরু হলো ধৌলি গঙ্গার সাথে পথ চলা।




পথ বেশ দুর্গম। একপাশে খাড়া পাহাড়, অন্যপাশে গভীর খাদ। এইরকম পথে চলার অভিজ্ঞতা আগেই হয়েছে, তাই ভয় তেমন লাগেনি। যারা প্রথম এমন দুর্গম পথে চলবেন তাদের বেশ ভয় লাগবে। ছোট বড় ধ্বস নামা এপথে খুব সাধারণ ঘটনা। এপথে এখনো পিচ ঢালা পথ তৈরি হয়নি, কাজ চলছে। আশা করা যায় দুই এক বছরের মধ্যে বেশ চওড়া ভালো রাস্তা তৈরি হয়ে যাবে।

আমরা এগিয়ে চলেছি পঞ্চচুল্লির টানে। সাথে চলেছে ধৌলিগঙ্গা নদী, কখনো পাশে পাশে, কখনো অনেক নিচে গভীর খাতের মধ্যে।

পথে মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে নিলাম। তাছাড়াও সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে দাঁড়াতে হলো বেশ কয়েকবার। নদীটির উপর বেশ কিছু ঝুলন্ত সেতু দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। পথে পড়লো ছিরকিলায় ধৌলি গঙ্গার উপর নির্মিত ড্যাম, একটি সুন্দর জলপ্রপাত যার নাম কাঞ্চবতী প্রপাত। বেশ কিছু ছোট বড় জলধারা পাহাড় থেকে নেমে রাস্তা পেরিয়ে ছুটে গেছে খাদের দিকে। রাস্তায় প্রবাহিত সেই জলধারা পার হতে বেশ শিহরণ জাগে। এক সময় দেখা দিল তুষার শৃঙ্গ।

হঠাৎ আকাশে মেঘের ঘনঘটা। মেঘ কুয়াশা মেখে এগিয়ে যেতে যেতেই হালকা বৃষ্টি নামলো। পথের পাশের জায়গা গোলাপী হয়ে আছে কোন এক ফুলের জন্য। নেমে ছবি তুললাম।


গন্তব্যের কাছাকাছি এসে প্রথমেই পেলাম দুগতু গ্রাম। বেশ কিছু হোমস্টে রয়েছে এখানে। এই গ্রাম থেকে পঞ্চচুল্লি দৃশ্যমান নয়। কিন্তু বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু হয় এই গ্রাম থেকেই। গ্রাম ছাড়িয়ে এগোতেই চোখে পড়লো নেওলা ইয়াংতি নদীর ওপারে নদীর ধারে আমার পছন্দ করা কটেজ। নাম তার নীল হলেও রং তার লাল। কটেজ ছাড়িয়ে আর একটু এগিয়ে গেলে নদীপথ থেকে কিছুটা পাহাড়ের উঁচুতে দান্তু গ্রাম, এখানেও বেশ কিছু হোমস্টে আছে। এই গ্রাম থেকে পঞ্চচুল্লি দৃশ্যমান। ব্রিজে নদী পেরিয়ে কটেজের সামনে নেমে বৃষ্টির মধ্যেই দৌড়ে গেলাম রিসেপশনে। তারা পৌঁছে দিলেন আমার পছন্দ করে রাখা শেষ কটেজটিতে। অপূর্ব পরিবেশ, কটেজ চত্বর বিভিন্ন ফুলে সাজানো।

কটেজের কাচের জানলা দিয়ে সবটুকু দৃশ্যমান। কিন্তু পঞ্চচুল্লি তখন মেঘের আড়ালে। টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যেই মন্ডল বাবু প্রথমে জল দিয়ে, তারপর চশমা পরিষ্কারের জন্য আনা লেন্স ক্লিনার দিয়ে জানলার কাচ পরিষ্কার করলো। ঘর থেকেই ওঠা-বসায়, ঘুমে-জাগরণে শুধু পঞ্চচুল্লি। আমরা জিনিসপত্র গুছিয়ে একটু ফ্রেশ হতেই বৃষ্টি থামলো। আমরা হাঁটতে শুরু করলাম এদিক ওদিক। ব্রিজের দিকে এগোতেই দেখি মাটির কাছাকাছি রামধনু উঠেছে। সে এক অপরূপ দৃশ্য। রামধনুর সাতটি রং এত স্পষ্ট ভাবে আমি আগে কখনও দেখিনি।

ন্যাওলা ইয়াংতি নদীর পাশেই ছিল এক ছোট্ট মন্দির। ব্রীজ পেরিয়ে সেখানে গেলাম, অসীম শান্তি বিরাজ করছে সেখানে। নদীর ধারে কিছুক্ষণ বসলাম, গায়ে মেখে নিলাম নদীর স্পর্শ, আর মনে মেখে নিলাম তার কলতান।

মেঘ সরে ক্রমশ দৃশ্যমান হলো পঞ্চচুল্লির চারটি শৃঙ্গ, এত কাছে যেন মনে হয় হাত বাড়িয়ে ছোঁবো। এখান থেকে চারটি শৃঙ্গই দেখা যায়, একটি আড়ালে থাকে। দেখতে পেলাম পঞ্চচুল্লির পায়ের কাছে বরফ গলে  জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে।  তবে পঞ্চচুল্লি ছাড়াও জায়গাটি চারদিক থেকেই বরফাবৃত পাহাড় দিয়ে ঘেরা। সেগুলির রূপও বর্ণনাতীত। সবুজ উপত্যকায় ঘুরে ঘুরে দেখলাম পঞ্চচুল্লি ও আশপাশের সৌন্দর্য।



কটেজে দুটি খরগোশ ছিল। আমার পুত্র কিছুক্ষণ সুন্দর সময় কাটালো তাদের সাথে।

বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলো। পকোড়া ও চা সহযোগে আমাদের সান্ধ্য আড্ডা জমে উঠলো পঞ্চচুল্লিকে সাক্ষী রেখে। একটু পর আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠলো। আর সেই জ্যোৎস্নায় স্নান করে ঝলমল করতে লাগলো মোহময়ী পঞ্চচুল্লি। চোখের পলক ফেলতে পারছিলাম না।

তাপমাত্রা তখন শূন্যের কাছাকাছি, ভীষন ঠান্ডা, রিসর্টের লোকেরা বুখারী জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন। সেই উত্তাপে মাটির ঘর আরও কিছুটা গরম হলো। রাতের সুস্বাদু খাওয়া সেরে ক্লান্তিহীন তাকিয়ে থাকলাম জোৎস্না ভেজা পঞ্চচুল্লির দিকে। সেই রাত চন্দ্রাহত হওয়ার রাত, সেই রাতে ঘুম আসে না কিছুতেই। তবু বিশ্রাম প্রয়োজন, মনকে বোঝালাম শুয়ে শুয়ে পর্দা সরালেই তাকে দেখতে পাবো।

তাই রাত গাঢ় হলে মনকে বুঝিয়ে নদীর কলতান শুনতে শুনতে ঘুমের দেশে পাড়ি দিলাম। মাঝরাত্রে ঘুম ভাঙলো বৃষ্টির শব্দে। বিশ্বাস হচ্ছিল না কিছুতেই, এই তো ঝলমলে চাঁদ দেখে শুতে গেলাম! উঠে বাইরে আসতে বাধ্য হলাম বিশ্বাস করতে। চারদিক মেঘে ঢাকা, বৃষ্টি পড়ে চলেছে, কোথাও পঞ্চচুল্লির চিহ্ন মাত্র নেই। খুব মন খারাপ হলো। পথে ধ্বস নামার আশঙ্কাও এলো মনে।


ভোরবেলা উঠে সূর্যোদয় দেখার বদলে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে হতাশ দৃষ্টি নিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। আজ হাঁটবো বেস ক্যাম্পের পথে, কিন্তু এই বৃষ্টিতে কীভাবে সম্ভব? মন ভারী হয়ে উঠলো।


সাতটা নাগাদ বৃষ্টি থামলো সাময়িক, কিন্তু চারপাশ মেঘাচ্ছন্ন। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে সকালের খাওয়া সেরে একজন গাইডকে নিয়ে রওনা হলাম দুগতু গ্রামের দিকে। সেখানে ট্রেকিংয়ের জন্য নাম নথিভুক্ত করে, টিকিট নিয়ে, ভাড়ায় লাঠি নিয়ে গাইড দাদার সঙ্গে শুরু করলাম পথ চলা। প্রথম দিকে চড়াই অংশ, পথে পাথর ফেলা আছে। ধীরে ধীরে সময় নিয়ে উঠতে থাকলাম।

চারপাশে অসংখ্য ছোট ছোট ফুলের বাহার চোখ টানতে থাকলো।

কিছুটা ওঠার পর পাখির চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম দান্তু গ্রাম, দুগতু গ্রাম, আমাদের কটেজ ও নেওলা ইয়াংতি নদীটিকে। উপর থেকেই দেখলাম নদীর উপর আমাদের কটেজের কাছের ব্রিজটি ছাড়াও আরও একটি ব্রিজ আছে। ঠিক করলাম সেদিন বিকেলে ওই দ্বিতীয় ব্রিজটির দিকে হাঁটতে যাবো।

চড়াই পেরিয়ে এলো ঘন পাইন ফারের জঙ্গল। এই অংশে চড়াই তেমন ছিল না।

এই জঙ্গলে একটি বিশেষ গাছ গাইড দাদা দেখালেন। বার্চ গাছ বা ভোজপত্র বা ভূর্জপত্র গাছ, যে গাছের ছালে শিক্ষার ইতিহাসে প্রথম লেখার কাজ হতো। ওই পাহাড়ে এই গাছ অনেক রয়েছে।


ফার (স্থানীয় ভাষায় দেওদার) গাছের ফল থেকে হতো কালি। সেই ফলও দেখলাম, নীল রঙের।

জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতেই আবার বৃষ্টি এলো। আমরা আমাদের সঙ্গে থাকা আদি কৈলাসে কেনা রেনকোটগুলি পরে নিলাম। জঙ্গল পেরোনোর পর এলো অফুরান সৌন্দর্যে মোড়া বুগিয়াল। বিভিন্ন গাছ, বিভিন্ন ফুলের বিস্তার চোখ ধাঁধিয়ে দিল।

একসময় পৌঁছে গেলাম পঞ্চচুল্লি বেস ক্যাম্পে। এখানে আগে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। পরে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভবনায় ডোম আকারের থাকার জায়গাগুলি পরিত্যক্ত হয়। এখন সেগুলো ভেঙে পড়ে আছে। আমরা ওই ভাঙা ঘরগুলিতে কিছুক্ষণ বিরতি নিলাম বৃষ্টির জন্য।

বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ নেই। আমরা আবার এগিয়ে চললাম। যদিও পঞ্চচুল্লি মেঘের আড়ালে তবু চারপাশে উঁচু উঁচু তুষারশৃঙ্গ, তার মাঝে উঁচু নিচু পথ ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি ফুলের বাহারের মাঝখান দিয়ে। কখনও কখনও পার হচ্ছি ছোট ছোট জলধারা।

একসময় বুগিয়াল জুড়ে সাদা, গোলাপী রডোডেনড্রনের শোভা মন্ত্রমুগ্ধ করে দিল। হইহই করে ছবি তুলতে থাকলাম বৃষ্টির মধ্যেই।

বৃষ্টি থামলো, আরও এগিয়ে দেখতে পেলাম মেঘের মাঝে পঞ্চচুল্লির আভাস, নেওলা ইয়াংতি নদীটি সৃষ্টির আভাস। চারপাশের সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।


ফিরতে ফিরতে আবার বৃষ্টি নামলো। সাবধানে নামতে থাকলাম। একসময় পৌঁছে গেলাম দুগতু গ্রামে। কিন্তু আমাদের গাড়ি সেখানে পেলাম না। ফোনের নেটওয়ার্কের সমস্যায় ড্রাইভার ভাই-এর সাথে কোন যোগাযোগও করতে পারলাম না। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে, তার মধ্যেই আবার হাঁটতে শুরু করলাম কটেজের দিকে। গাইড দাদা পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন। সংক্ষিপ্ত পথ হবে বলে সেই উপর থেকে দেখা ছোট ব্রিজটি দিয়ে নদী পার হলাম যেখানে বিকেলে আমাদের যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এই পথের সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। কটেজে পৌঁছতে পৌঁছতে কিছুটা ভিজে গেলাম।

ভিজে জামাকাপড় বদলে ছাতা নিয়ে আমরা খেতে গেলাম কটেজের ডাইনিং - এ। ডাইনিং থেকেও চারপাশের অফুরান সৌন্দর্য দৃশ্যমান। খেতে খেতে মনের মাঝে আগের রাতের ভয়টা ফিরে এলো।ভাবছিলাম এত বৃষ্টিতে ধ্বস নেমে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে না তো? বেশ ভয় পাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম খেয়ে কটেজ ছেড়ে নিচে নামার জন্য রওনা দেবো কি না। কিন্তু তখন দুপুর প্রায় তিনটে। অত দেরিতে ওই দুর্যোগের মধ্যে ধ্বসপ্রবণ পথে নামা ঠিক হবে না। তাই যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিলাম তিনজনে। বিকেল হতেই কটেজের কর্মীদের অনুরোধ করলাম আজ সময়ের আগেই বুখারী জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য। তারা দিলেন। ভেজা জামাকাপড়, ভেজা মানুষগুলো সেই উত্তাপে বেশ তাজা হয়ে উঠলো।

ইতিমধ্যে বৃষ্টি কমেছে, তবে কখনও থামছে কখনো পড়ছে। সন্ধ্যাটা গান গল্পে সুন্দর কাটালাম তিনজনে। জামাকাপড়, ব্যাগ সব ঠিকঠাক করে গুছিয়ে রাখলাম। রাত্রে যখন খাওয়ার জন্য ডাইনিং গেলাম তখন বৃষ্টি থেমেছে, তবে মেঘের ঘনঘটায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। খেয়ে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম সকলে।



রাত বারোটায় হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। জানলার পর্দা সরাতেই চমকে গেলাম। তাড়াতাড়ি বাইরে এসে দেখি জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ, চন্দ্রালোকে রূপোর সাজ পরে জ্বলজ্বল করছে মাউন্ট পঞ্চচুল্লি। সেদিন আবার আমি চন্দ্রাহত হলাম। সেই রাতে আর ঘুম আসেনি ঠিকমতো। হালকা তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেও বার বার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল, আমি জানলা দিয়ে বাইরে দেখছিলাম।

ভোর পাঁচটায় উঠে বাইরে এলাম। হালকা মেঘ এদিক ওদিক রয়েছে। পঞ্চচুল্লির চূড়ার উপরের অংশ কিছুটা মেঘের আড়ালে রয়েছে। চেয়ার নিয়ে বসে থাকলাম আমার কটেজের সামনে। ক্রমশ আকাশ আরো পরিষ্কার হলো। এক সময় সূর্যোদয় হলো। দিনের নতুন আলোয় ঝলমল করে উঠলো চারপাশ। শুধু পঞ্চচুল্লি নয় চারপাশের সবগুলি তুষারাবৃত পাহাড় যেন হেসে উঠলো। চা খেলাম ওখানে বসেই। তারপর তৈরি হয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম। এবার যেতে হবে।

         মন চাইছে না, তবু যেতে হবে। নীল আকাশ আর ঝলমলে সূর্যালোকে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ালাম চারপাশে। মাউন্ট পঞ্চচুল্লি ফিসফিস করে বললো , " আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ ছিল ঠিকই, কিন্তু তোমার তো কিছুই অপূর্ণ রাখলাম না কন্যা।" না, অপূর্ণ কিছু ছিল না। তীব্র ভালোবাসা অনুচ্চারিত প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয়। আমার সেই ভালোবাসাতেই পঞ্চচুল্লি তার না বলা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলো। আমি ধন্য হলাম।

সেই খরগোশ দুটির সঙ্গেও দেখা করলাম। তারপর পিছনে তাকাতে তাকাতে গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি ব্রীজ পেরিয়ে নদীর ওপারে যাওয়ার পর দূর থেকে দেখতে পেলাম আমাদের রিসর্টের একটু আগে ছেড়ে আসা আমার কটেজটি, দরজা খোলা। এক তীব্র পিছুটান অনুভব করলাম। তবুও এগিয়ে যেতেই হবে।

সেই একই পথ ধরে ফিরে চললাম। পথে বৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও ছোটখাটো পাথর পড়েছে, তবে বড় কোন ধ্বস কোথাও ছিল না। তবে যেহেতু রাস্তা পিচের নয় তাই কিছু জায়গায় বেশ কাদা হয়ে গিয়ে কিছু গাড়ির সমস্যা হচ্ছিল। এইরকমই একটি গাড়ি ঠিকমতো উঠতে পারছিল না বলে আমাদেরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। রাস্তায় বেশ কিছু জায়গায় কাজও চলছিল।

সব পেরিয়ে নিরাপদে আমরা নেমে আসি তাওয়াঘাট, সেখান থেকে ধারচুলা হয়ে চম্পাবত। পরের দিন বরেলি জংশন থেকে ফেরার ট্রেন বিকালে।

মনের মাঝে ঘোরের মতো আসতে থাকে ফেলে আসা কয়েকটি দিন, ফেলে আসা কিছু মুহূর্ত, সেই চন্দ্রাহত হওয়ার রাত। বিদায় পঞ্চচুল্লি, জীবন সময় দিলে আবার আসবো।

কীভাবে যাবেন - ট্রেনে কাঠগোদাম, লালকুঁয়া বা বরেলি পৌঁছে সড়ক পথে ধারচুলা যেতে হবে। দূরত্ব যথাক্রমে 271 কিলোমিটার, 296 কিলোমিটার ও 374 কিলোমিটার। ধারচুলা থেকে সড়ক পথে দরমা উপত্যকা কম বেশি 80 কিলোমিটার। কিন্তু রাস্তা খারাপ হওয়ার জন্য সময় লাগবে 4 থেকে 5 ঘণ্টা।

কোথায় থাকবেন - দুগতু বা দান্তু গ্রামে অনেক হোমস্টে আছে থাকার জন্য। এছাড়া গ্রাম দুটির মাঝে নদীর ধারে দু একটি কটেজ রয়েছে।



***************************************************************************************


1 টি মন্তব্য:

  1. অত্যন্ত সুন্দর লেখনী। ভ্রমণের passion ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে যা অন্যদের বাইরে বেরোতে উৎসাহিত করবে। ভবিষ্যতে আরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটুক, শুভকামনা রইলো।

    উত্তরমুছুন