কবিতাগুচ্ছ * অর্ণব সামন্ত
ছত্রিশ বসন্তের গপ্পো
ছত্রিশ বসন্ত যখন ভেঙে পড়ে আলোক ঝর্ণায় অনেক অন্ধকার গুহা তাদের অন্দরে হোমাগ্নি জ্বালায়
নৈবেদ্য ও নিবেদন মিশে যখন দেবী মানুষী হতে চায় চোখে জ্বলে ধ্রুবতারা , ব্ল্যাকহোলে থরে থরে সাজানো
ইচ্ছাকুসুমের আলো , কামনাবাসনা ঘনীভূত মাধ্যাকর্ষণবিরোধী টান
প্রলয়ের গান গেয়ে ফোটায় সৃজনকুসুম
ধ্বংসের মিনারে ওড়ায় ভালোবাসার অদ্বিতীয় পতাকা
শেখড়ে শাখায় সঞ্চারিত হয় সেই আগ্নেয় লাভা , আগুন
অথচ চিরভঙ্গির নম্রস্নিগ্ধতায় চাঁদের গায়ে ঢলে পড়ে চাঁদ
সম্মোহিত আবেশ কাটে , যখন খাবার দের ওপারে ডেকে ওঠে অপত্য চাঁদ
মেদিনীর মায়ামমতাসমেত সে ঝাঁপায় দিবারাত্রির কাব্যকে লালনে পালনে
ছত্রিশ বসন্ত পদপ্রান্তে রেখে সে পায় ঈশ্বরীর অধিকার , স্বাধীনতা
সৌর পরিবারে এক কবিতার জন্ম হওয়ার পরেই সে ছায়াপথ রচনা করে
নাভিমূল থেকে সহজের গান প্লাবিত করে কেন্দ্রের
প্রথম শব্দ , প্রথম আলো আবার সমান্তরাল
নেমে পড়ে রাস্তায় নিজের অবয়ব খুঁজে পেতে
সহজিয়া সুরে সহজ গান সঞ্চারিত হয় জীবনে , যাপনে
নির্যাসে রাখো দোহনযোগ্য ভাটিয়ালি , ভাওয়াইয়া স্রোতে রাখো গভীর গভীরতরে গভীরতমের দিকে যাওয়ার
কামনাবাসনা রেখে ক্রিয়ায় ক্রিয়ায় প্রতিক্রিয়াস্বরূপ মুক্তির ডানা মেলায় শুভ লগ্ন , ফিসফিস স্বরে
কথার পেটে কথা , তার পেটে কবিতা , গান জলজ্যান্ত প্রাণবন্ত যে জীবন বসে থাকে সহজ গান হয়ে
যে যাপন সহজ কবিতার চেয়েও সহজ , স্বতঃস্ফূর্ত অবাধ্য , অবাধ
যে জলছবি অম্লান , চিরভাস্বর আনন্দস্পন্দের নৃত্যশীলতায়
নয়নতারায় ফোটে ধ্রুবতারা , ঠোঁটে ঠোঁটে অমৃতের পুষ্টির স্বাদ !
সম্রাজ্ঞীর সাম্রাজ্য
জন্মজন্মান্তর বসে থাকে রানি কবিতার অপেক্ষায় জন্মজন্মান্তর বসে থাকে সহজ গান হতে চেয়ে
ডোবে ও ডোবায় তাকে যে প্রাণ প্রাণের চেয়েও বেশি ভাসেও ভাসায় তাকে যে ভাবনায় নোয়ার নৌকা হতে চায়
আসম্রাজ্ঞীমুকুটনখ যে প্যাশনে অবশেষনে জ্বলেছে পুড়েছে
তাকে দিয়েছে আলো , ছায়াপথ , সমস্ত জগৎ উজাড় করে
তবু সে নির্ভেজাল কবিতা পায়নি কিম্বা সহজিয়া সহজের গান
অথবা নৃত্যের তালে তালে আনন্দস্পন্দ দ্রিমি দ্রিমি কম্পন সুখ
জলছবি আঁকতে পারেনি নদীটির বুকে ও স্রোতে ঘূর্ণিজল যেতে চায় আরও গভীরে ডুবুরি সাঁতারপ্রিয় মন্থনে মন্থনে সমূহ গরল পরিবর্তিত করতে চায় সমস্ত অমৃতে
মুহুর্মুহু মুহূর্তকে বিতাড়িত করে অনন্ত দ্রাঘিমার অভিসারে
কখনও বিষুবরেখা , কর্কটক্রান্তি , মকরক্রান্তি দূরত্ব রেখে নিরন্তর মেরু চৌম্বকীয় আকর্ষণে
কোষে মেদে মজ্জায় রক্তে ওঠে সহজের গান স্বরবর্ণে , ব্যঞ্জনবর্ণে
কথায় , টুকরো কথায় নামে কবিতা ভাবব্যঞ্জনায় জন্মজন্মান্তর অপেক্ষায় সম্রাজ্ঞী সাম্রাজ্য দিতে চেয়ে সমর্পণে
শুধু হতে চায় একটি নির্ভেজাল কবিতা কিংবা সহজ গান !
সহজ গানের কিসসা
জলছবিতে ভেসে উঠে সেই চলছবি জীবনের
আলো ছায়া জাফরিকাটা ছায়াপথের পথে
এক বুকে অজন্তা, অন্যবুকে ইলোরার কারুকার্য নিয়ে
মৎস্যপুরাণে মৎস্যকন্যা হয়ে ডুবসাঁতার দিলে
বুঝে নিলে জল কিভাবে জলের আরও গভীরে যেতে চায়
অরূপরতন ডুবে গেল রূপের সাম্রাজ্যে
হে সম্রাজ্ঞী নতজানু সম্রাট মুখে বলে দেহি পদপল্লবমুদারম
শিকারী শিকার হয়ে মৃত হল অমৃত জ্যোৎস্নার পানে কোষে কোষে উঠল গান মনকেমন ইমনের সুরে মোৎসার্ট সিম্ফনি বাজল স্নায়ুতে রক্তে মেদে মজ্জায়
রেমব্রান্ট্রের হলুদ আঁধারে জেগে থাকল নষ্ট ধ্রুবতারা চোখ
সোরা সাইকোসিস সিফিলিস নিয়ে সমুদ্রসৈকতে সেজনের জ্যান্ত ছবি
পিকাসোর স্পর্শে স্পর্শাতুর তুলি গ্যালন গ্যালন রঙ ঢালল
গহীন থেকে আরও গহীনে গভীরতম অসুখ নিঙড়ে দিয়ে
দিবারাত্রির কাব্যের সে প্রস্ফুটিত হল সহজ কবিতায় এসো তবে এসো সহজ গান হয়ে সহজিয়া সুরের গমকে
স্বয়মাগতা জ্যান্ত ছবি কোলাজে মন্তাজে সাবলীল সুললিত
নৃত্যরত আনন্দ স্পন্দের ছন্দভাঙা অবিচ্ছিন্ন দ্রিমিদ্রিমি সুখ
দেবী হে পূজারীকে নৈবেদ্য করে রমণে রমণে প্রলয়ে সৃজনে
দ্রাঘিমা অগ্রাহ্য করে আকাশ অমান্য করে সহজিয়া জীবনের
স্বরবিতান গীতবিতানসমেত সহজ গান হয়ে যায় ...!
ভাঙা মঞ্জরী , ভাঙা ভাঙা জীবনের গান
মঞ্জরিত হতে হতে ডাক আসে সাইক্লোনের এলোমেলো হয়ে যায় ঢেউগুলি , মোহনাটি , অরণ্য , উপত্যকা
পান্ডুলিপি খসে খসে পড়ে ভূমিকন্যার পদপ্রান্তে
ভাটি মিলিয়ে উজান আসে উজিয়ে আসে
কত শব্দ কত সুর সহজ সহজ কত কবিতা গান দীর্ঘশ্বাস বলে যায় বিচ্ছেদ বিরহ হর্ষ উচ্ছ্বাসের কথা তাথিয়া তাথিয়া নাচতে নাচতে কখন যে ভাঙা ধামে ভঙ্গিতে স্থিত
অপরূপ জলছবি গড়ে ঢেউয়ে ঢেউয়ে রূপে ও লাবণ্যে
ব্ল্যাকহোলে বেজে ওঠে সহজ গান , সরল আলোর জমাট অভিমান
দুধেল জ্যোৎস্নায় খন্ড খন্ড হতে হতে অপত্য খুঁজে পায়
কোষে কোষে শব্দচাষের সারি গান , স্নায়ুতে স্নায়ুতে সারেঙ্গী দীপক
কখনও মেঘমল্লারে ভেসে অশ্রুকেও করে দেয় হীরের চেয়েও দামী
রক্তমেদমজ্জার দরবারে কে জ্বালে এত আলো আঁধারের পরিপ্রেক্ষিতে ?
মঞ্জরিত ঠোঁট পুষ্টি চায় , ঢেউয়ের বুক শালবৃক্ষ চায় এভাবে খননে খননে মন্থনে গোপনে কখন যে সহজিয়া সহজ গান হয়ে যায় !
শব্দগুলি ভাঙা ভাঙা ক্রমশঃ নৈঃশব্দে হারায়
ছন্দগুলি রেখে আসে সৈকতে সমুদ্রঢেউয়ের ধাক্কায় ভাবগুলি পাগলি যেন দ্রাঘিমায় দ্রাঘিমায় বদলায় ভঙ্গিগুলি কাছে দূরে অক্ষরেখায় অক্ষরেখায় ভেসে যায়
মারিয়ানা খাত নিজেই জানে না এভারেস্টে সাফল্যকে অন্তরীণ করে
আছে নেই আপেক্ষিক আপেক্ষিক ভাঙা কবিতা কবিতা গানের অভিপ্রায়
এভাবেই ভেঙে ভেঙে ভেঙে হতে হয় সহজ গান এভাবেই ভেঙে ভেঙে ভেঙে আসে সহজ কবিতার উত্থান
এভাবেই জীবনের চলন বলন ভাবভঙ্গি দ্রিমিদ্রিমি নৃত্যসম্ভব
এভাবেই জলছবি কোলাজ মন্তাজ চলছবি হয়ে যায় !
তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভাঙা ভাঙা জীবন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জীবনে বর্তায় !
ফসলের গান
এভাবে মাঝির ফসলের স্তনে দুধ জমে
হিমেলের শূন্য বুক থেকে জাগে অপত্য আলো
সোঁদামাটির গন্ধে উথাল পাথাল নদী
জ্যোৎস্নার মধুবনে নেশায় টালমাটাল গান
ভুলে যায় সামাজিক স্বরূপ , সংস্কার , প্রচ্ছদ
আদি সুরে বইতে থাকে ছত্রিশ রাগ ও রাগিনী
এককের ঝংকারে কাঁপে কোষস্নায়ুমজ্জামেদরক্ত
বিদ্যুচ্চমকে বিদ্যুচ্চমকে চলে যায় জগতের বাইরে
ব্ল্যাকহোলে সৃজিত হয় সহজের গান সহজিয়া ভাবে
সন্তোষে ও সুখে ফসল তুলে আনে ঘরে , মনের মনিকর্ণিকায়
দোলাচল গেরস্থালি ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া দোহনে দোহনে
সুব্রতাসম্ভব সহস্র গান নিজেরাই গাইতে থাকে নিজেদেরকে
ভাঙা কবিতার মতন বসে থাকে পথের মোড়ে পথিকের বুকে
নৃত্যশীল আনন্দস্পন্দ এসে ধাক্কায় ভেতরে বাইরে
অসম্ভব ছবির মতন সুন্দরভাবে ভঙ্গিমায় স্থির থাকে জ্যামিতিক কোলাজে
করিও কোমলে নোয়ার নৌকা পাড়ি দেয় সাত সমুদ্র
দিগন্ত দিগন্ত পেরিয়ে পারস্পরিক আবিষ্কারে নতুন দেশ
নতুন পৃথিবীতে জ্বেলে দেয় সদ্যোজাত অপত্য আলো
এভাবেই ফসলের স্তনে মুখ রাখে , ব্ল্যাকহোলের গর্ভে রাখে
গ্যালন গ্যালন জ্যোৎস্নার আলো থরে থরে তড়িৎ চুম্বকীয় সজ্জায়
অপত্যের কবিতা , গান হয়ে প্রকাশিত্য হবে বলে যথা দ্রাঘিমায় , যথা অক্ষরেখায় !
পল গঁগ্যার নারী
প্রতীক্ষায় থাকে বিদ্যাধরী সবুজ অরণ্য ঢেউগুলি নিয়ে
সুপ্ত আগ্নেয়গিরি নিয়ে দহনে দহনে সারাটি জীবন ঢেউগুলি ছলাৎ ছলাৎ শব্দে মিশে যায় সফেন সমুদ্রে সোরা ও লাল কাঁকড়ার যৌনতামুখর লাবণ্য দিনরাত্রি
দিনের পর দিন যায় , রাত্রির পর রাত্রি অতিক্রান্ত তবু আসেনা লাভা মাখানোর সেই পীরিতি মানুষ চারিদিকে চলে নাচগান , হুল্লোড় পলিনেশিয়ান সংস্কৃতির সন্ধ্যা
চারু নষ্টনীড়ের নষ্ট ধ্রুবতারা হয়ে জেগে থাকে
পাহাড় পর্বত একদিন নেচে ওঠে আলোড়িত দহনে , মন্থনে
পল গঁগ্যার নারী হয়ে দাঁড়ায় সংস্কারমুক্ত ইনহিবিশনমুক্ত তাহিতি বনচ্ছায়ায়
মুহূর্তকে অনন্ত দ্রাঘিমা করে ভেতরে বাইরে তরমুজ থালি নিয়ে !



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন