বিবেক
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
আর্থিক বছরের শেষ মানেই একটা অদৃশ্য পাথর যেন মাথায় চেপে যায়।দম ফেলার ফুরসত থাকে না তখন।তার ওপর নতুন ম্যানিজিং ডিরেক্টরের ফরমান,কামাই এখন নৈব নৈব চ।অন্যথায় কড়া পদক্ষেপ। প্রতিদিনের কাজ শেষ করে তবে চেয়ার ছাড়ো।যতো রাত হয় হোক। "ডু ইট নাউ "।পরের দিন যেন নতুন দিন, নতুন কাজ। ফিরতে কদিন খুব দেরিই হচ্ছে অনন্যর।রাত এগারো-সাড়ে এগারো হয়ে যাচ্ছে প্রায় দিনই। ফিরে চান সেরে খেতে বসতে বসতে সাড়ে বারোটা বাজছে।মাকে অতোরাত জেগে থাকতে বারণ করে।কে কার কথা শোনে ! সেই মাতৃত্বের অপত্য জারণ। ছেলে না খেয়ে থাকবে আর আমি খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়বো ? এ হয় কখনো ? বেশি জোর করলে জলচোখে বলে উঠবে : " তুই মা হলে বুঝতিস"! এর পর আর কথা চলে না।
বাড়িতে মাকে নিয়ে অনন্য বেশ ভালোই আছে। তবে বাবার অভাব বুঝতে পারে সব সময়।অনন্যর অফিসের কাজের চাপের জন্য বাজার দোকান বাবাই করতো। মাঝে মাঝে মা সঙ্গ দিতো। তাছাড়া ছুটির দিনগুলোয় অনন্যর বেশির ভাগ সময় কাটে বিছানায়। সারাদিন যেন মরার মতো পড়ে থাকে। মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় চায়ের আড্ডায় যায়। তবে তাও এক ঘন্টার বেশি নয়। শান্তা মাসির বাড়ি যাবার তাড়া থাকে। শান্তা মাসি সারাদিন মায়ের সাথেই থাকে। সন্ধ্যা বেলা বাড়ি যায়।মাসির বাড়ি দমদম ইন্দিরা কলোনি।মাসিকে রাতে থাকার কথাও বলেছিল অনন্য মায়ের জন্য। কিন্তু নাতির টান।বাড়ি ফিরবেই।একটু দেরি হলেই ছটফট করে।বলে "নাতি, ঠাম্মি ফিরতে দেরি করলেই কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। " রাতে ঠাম্মিকে জড়িয়ে ধরে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমায় ও। শান্তা মাসির এটাই যেন এক সুখ ! মা বোঝে।তাই মাঝে মাঝে গাড়ি করেও পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করে মা। অনন্য কিছু বলে না।একটু তেল পুড়লে যদি একটা মানুষ অতোটা সুখ পায় তাহলে তা অনন্যর ভালোই লাগে। ছেলেবেলায় ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরে ও তো শুয়ে শুয়ে গল্প শুনতো লালকমল নীলকমলের। ঠাকুমার জন্য তখন ওর বুকে মনখারাপের কালো মেঘ ! কান্না পায় খুব তখন। কাঁদতে পারে না। বাবার কথা মনে পড়ে।বাবা বলতেন :" পুরুষ মানুষ কাঁদতে পারে না প্রকাশ্যে। ওদের কান্না লুকিয়ে অন্তরালে ভেতরে ভেতরে"।যতো বয়স বাড়ছে ও বুঝতে পারে বাবার কথার অর্থ।
মা অনন্যর বিয়ের জন্য শুরুর দিকে জেদাজেদি করতো। আগে এ বিষয় নিয়ে রাগ দেখাতো খুব। মায়ের চিন্তা, মা মরে গেলে দেখবে কে ওকে? হেসে উঠতো অনন্য।মাসিকে দিয়েও বলাতো বিয়ের কথা।মাসি কখন যেন এ বাড়িতে ওর স্বঘোষিত অভিভাবক হয়ে উঠেছে।অনন্য চারিদিকে ঘটতে থাকা ঘটনার কথা বলে ওদের থামাতো। বিয়ের পর যদি বউ মায়ের সাথে থাকতে না চায়।" এখন তো প্রদর্শন প্রভাব চারিদিকে।"বন্ধু নিজের ফ্ল্যাটে কেমন স্বাধীন থাকে ।অতএব আমিও ...!" রোজ ঝগড়া করতে পারবে না ও।মাকে ছেড়ে থাকার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না অনন্য।বাবা মারা যাবার সময় ওর হাত ধরে বলেছিল, মাকে দেখিস।ছেলের এহেন যুক্তিতে মাও যেন দিশেহারা হয়ে পড়ে।অনন্য জানে, এটা ইয়র্কার।মা বোল্ড হবেই। মাসতুতো দাদা মাসিকে বউবাজারের বাড়িতে একা রেখে বউকে নিয়ে টালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে থাকে। অনন্যর এসব কথায় মাসির ছবি ভেসে ওঠে মায়ের মনে। কষ্ট পায় খুব মা মাসির কষ্টে। মাসিকে নিজের কাছে এনে রাখতে চেয়েছিল মা।অনন্যও রাজি ছিল। কিন্তু মাসি আসতে চায় নি।অনন্য বোঝে, লজ্জায় কুঁকড়ে থাকে মাসি।যাকে সব দিয়ে বড়ো করে তুললো সেই ছেলেই বৃদ্ধ মাকে ফেলে.....।
শ্যামবাজার থেকে বাঘা যতীন যাবে অনন্য। প্রতিদিন মেট্রোয় এই সময়েই ট্রেন ধরে।হাজরাদা, কার্তিক,পরেশ,ব্যানাজীদা, নয়ন --জনা দশেকের টিম ওদের। আড্ডা গল্পে বেশ সময় কেটে যায়। ব্যাচেলর বলে অনন্যকে নিয়ে ওরা ঠাট্টা ইয়ার্কি করে বেশি। একদিন অনন্য এক সুন্দরী তরুণীকে বার বার দেখছিল। চোখগুলো যেন চুম্বক মেয়েটার।মেয়েটিও তাকাচ্ছিল আড়চোখে। ব্যানার্জীদার নজরে পড়ে। ডাকাবুকো ব্যানার্জীদা সোজা গিয়ে হাজির মেয়েটির কাছে। স্পষ্ট ভাষায় অনন্যর সমস্ত খবর দিয়ে বলে ওঠে :" ওকে পছন্দ । আপনার বাড়ির ঠিকানা দিন। আপনার মা- বাবার কাছে ওর সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিই তাহলে।"চমকে ওঠে মেয়েটি। মুচকি হেসে সরে যায় ভেতর দিকে।আর কোনদিন ওকে দেখে নি। ব্যানার্জীদা এরকমই। সেই থেকে সুন্দরী মেয়ে দেখলেই ও ইচ্ছা করলেও আর তাকাতে পারে না। ব্যাচেলর অনন্য যেন ওদের খোরাক ! অনন্য বিষয়টাকে গম্ভীর ভাবে নেয় নি কখনো।মজাই লাগে ওর।বোঝে, দিল্লীকা লাড্ডু খাওয়াতে চায় ওকে।তারপর "জয় মা" বলে পাঠা বলি !
ডানদিকের গেটের কাছে ওরা থাকে। জায়গা পেলে বসে। তবে অধিকাংশ দিনই দাঁড়িয়ে থাকে। খুব ভিড় হয় ট্রেনটায়। চূড়ান্ত ব্যস্ততা অফিস যাত্রীদের এই সময়টায়। অন্যদিনের মতো আজও ওরা দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প মসগুল। রাজনীতি, সিনেমা, খেলা, বাড়ির সমস্যা ---সবই আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসে বারে বারে।আজ কোহলির ব্যাটিং ফর্ম নিয়ে আলোচনা চরমে।হাজরাদার যুক্তি, নতুন বিয়ে করেছে সবে। এনার্জি অন্যদিকে একটু চলে তো যাবেই।" ব্যানার্জীদার সহাস্য মন্তব্য :" ঠিক যুক্তি। তবে মাঠটা বদলে গেছে"! হো হো করে হেসে উঠে ওরা সবাই।এইরকম মন্তব্যে ব্যানার্জীদা লা - জবাব। এতো সহজভাবে কথাগুলো বলে দেয়!
হঠাৎ আগের গেটটার বাঁদিকে একটা গন্ডগোলের আওয়াজ।কয়েকজন অল্পবয়সী অবাঙালী ছেলে এক বয়স্ক লোকের সাথে তুমুল ঝগড়ায়। একটি ছেলে প্রচন্ড উদ্ধত ভঙ্গীতে।এই মারে, সেই মারে অবস্থা। বৃদ্ধ ভদ্রলোক ছেলেগুলোকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু ওরা শুনতে নারাজ। বৃদ্ধকে গালাগাল দিচ্ছে। আশপাশের দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন মজা দেখছে নীরব দর্শক হয়ে। হঠাৎ সেই ছেলেটির এক ধাক্কায় বৃদ্ধ পড়ে যায় লোকজনের গায়ের ওপর। অনেকক্ষণ ধরে অনন্য দেখছিল দৃশ্যটা। বৃদ্ধকে ধাক্কা দিতেই ও এগিয়ে গেল ওদের দিকে।যে ছেলেটি ধাক্কা দিয়েছিল তার কাঁধটা পিছন থেকে চেপে ধরে ও।ক্যারাটের ব্ল্যাকবেল্ট অনন্য জানে কি করে কায়দা করতে হয় এই সময়ে। ছেলেটি বড়োসড়ো চেহারার অনন্যর এরকম প্রতিক্রিয়ায় একটু চুপসে যায় যেন। নিজেকে ছাড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করতে থাকে। ওদের অন্য দুজন সঙ্গী অনন্যর মুখে ঘুসি চালাতেই অনন্য সজোড়ে মারে ওদের মুখে। ছিটকে পড়ে দুজন। এবার প্রতিপক্ষ শক্তিধর দেখে ওরা পিছোতে থাকে। আশপাশের লোকজন এতোক্ষণ যেন বুঝতে পারে এবার সকলের জাগার প্রয়োজন।কয়েকজন এগিয়ে এসে ওদের ধরে ফেলে। ইতিমধ্যে ব্যানার্জীদারাও এসে দাঁড়িয়েছে ওর পাশে।
বৃদ্ধের দিকে তাকালো অনন্য। চোখ ভর্তি জল।এই বয়সে এসে এরকম ব্যবহার বোধহয় ভাবতেও পারেনি। ছেলেগুলোর উগ্রমূর্তির কারণ জিজ্ঞাসা করতেই আশপাশের কয়েকজন বলে উঠলো :" গেটের মুখটায় দাঁড়িয়ে অসভ্যতামি করছিল। নোংরা ভাষায় কথা বলছিল। উনি একটু ভেতরের দিকে ওদের যেতে বলতেই ওরা চড়াও হলো।অনন্য বৃদ্ধের দিকে তাকাতেই কেমন মায়া হলো। ষাটোর্ধ হবে। ওনার কাঁধে হাত রেখে অনন্য স্বভাববিরুদ্ধ গলায় আশপাশের লোকজনের উদ্দ্যেশ্যে চিৎকার করে উঠলো :"ও আপনাদের ঘুম ভেঙ্গেছে তাহলে? জাগুন বন্ধু, এবার একটু জাগুন "!
*************************************************************************************




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন