সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬

গুচ্ছ কবিতা * শিবালোক দাস

 






কবিতাগুচ্ছ * শিবালোক দাস




কালকূট

হাড়ে ক্ষয়িষ্ণু পোষাক।

যে আবর্ত শীতল, তুলে দেখো,
কিছু বিনীত আজও সাক্ষী থাকে।

তুমি তাকে শেখাও মোচড়ে শ্বেতকায় আঁশ
ভুলে অরূপ হতে পারা যায় না, কেবল
ছড়িয়ে পড়ে,
সাদৃশ্য আর্দ্র হয়।

লুকানো বাঁশির ফুঁয়ে কেন খোঁজো
পুনরায় শেষ মানচিত্র ?



সঙ্কাশে


কতটা রক্তিম হতে পারো ?
কতটা পরাণ-সম্ভব ?

ছত্রে ছত্রে কেবল শুকিয়ে যাচ্ছে
অমৃতগান।

তবুও, যদি ওঠে বিরুপাক্ষ চোখ,
তোমার জন্যে অবনমিত নীলিমা
গাছ হয়ে যায় আড়ালে….




চক্রবাল


কম্বুরেখায় যে বেদনা ওঠে, 
তার পোষ্য নেই।
তবুও অণুমুখ, সেই প্রথম মাছের স্বচ্ছতা
আমার অর্ধচন্দ্রে এখনো নষ্ট হয়নি।

বিদ্ধ করো, উঠে আসি বালুকাময়,
নখাগ্রে, আরো নিপাট অর্ধতারায়….

তুমি ক্ষুধার এক নতুন নাম খোঁজো…



পরজীবী


ছক কষতে কষতে তরুণ‌ কাতর হল।
সর্বাঙ্গে তার অপর্যাপ্ত কিনার…
যে মুখ নিবিড়, তার প্রতিটি ভাস্কর্যে
এখনও সুষম সমস্ত বৃষ্টি…

ভিজতে ভিজতে ভুলে যায়, গানে গানে
ছিঁড়ে গিয়েছে অদৃশ্য সবুজ—
তার জন্যেই এতকাল ধরে রেখেছিল 
গর্ভস্বর, প্রতিটি কবিতা…

আলোর ওপারে সে দুহাত পেতেছে,
শীতল হতে...



একটি ফুঁ


একটি ফুঁয়ে কত সমারোহ,
রয়েছে খেলা, 
হেঁটে যাই সাদা কালোয়…

তবুও, পূর্ণ হতে পারি না।
সন্ধানে যাকে আনন্দ বলি, সেই 
আমাকে করেছে শূন্য—
ঘন শ্বাসে ঘুমিয়ে পড়লাম বলে 
তুমি কোনোদিন দেখাওনি আঁচে কিভাবে
ভাসাতে হয় তন্দ্রাহত ঘর…

এইমাত্র আগুন জ্বলল আমার একরত্তি শরীরে !






##################################




                                শিবালোক দাস 


তরুণ কবি শিবালোক দাসের  শৈশব কেটেছে মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি শহরে। বর্তমানে কলকাতার আই.পি.জি.এম.ই.আর. এবং এস.এস.কে.এম. হাসপাতালে এম.বি.বি.এস এর চূড়ান্ত বর্ষের ছাত্র। ক্লাস এইট থেকে কবিতা চর্চা শুরু। সাহিত্যকে ভালোবাসি এবং আলাদা আঙ্গিকে তুলে ধরার চেষ্টা করব। এখনও পর্যন্ত কোনও প্রকাশিত গ্রন্থ নেই। 





গুচ্ছ কবিতা * তাপস কুমার দে





কবিতাগুচ্ছ * তাপস কুমার দে 


ভেজা চুমু বিষয়ক দূরের আকাশ 


বোঝে না, প্রতিবাদ হৃদয়ে বিদ্ধ সেলাই যন্ত্র কেন্দ্রিক প্রেম পরিণামের রোষানলে অস্ত যাওয়া মায়ার বৃষ্টি মাতানো ফুলের কুয়াশা শুয়ে থাকা জল আয়নার মতন অনাবিল প্রতিচ্ছবি সংযত রূপক কর্ম পর্ব গুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন কিছুর উজ্জ্বল ঐশ্বর্য। ভুলগুলো দোল খাওয়া নাগরিক লেনদেন সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে চায় তখন। যাবতীয় অবকাঠামো ভুলে যায় যান্ত্রিক আকাশ স্পন্দিত, মুদ্রিত পরিনামের সংস্করণ। অথচ ভালোবাসায় ঝুলে থাকা মানুষ মানুষকে বিবর্তিত প্রজাতি হিসেবে গড়ে তোলে রংহীন আকাশ জারি করে। দিকে দিকে ছড়িয়ে গেছে গল্প হাওয়ার মুখ হীন অপরাধের   পুনরাবৃত্তি। ভারি করে তোলে বিরহ বৃষ্টির বর্ধিত নির্ভর নদী  আত্মকেন্দ্রীক অনেকটা বর্ষার ধারা। মনে হয় আরোপিত   মেঘের মতন শুতো কাটা ঘুড়ি আদ্রবাতাসের উৎসবে মেতে থাকে। বৃষ্টি বাহিকা প্রেমে শ্বাস ঝরা খুন ফুটে ওঠা রোদ ছায়া গুপ্ত অসুখের সুপ্ত সুখ। অন্ধকার  থেকে যায় জল গোপন গ্রীস্মের গান মোহনায়। শুভ্র সুত্র ভাঙা চোখে তার নববধূর শঙ্খসুর যেমন পাতায় পাতায় ঝরে যায় আর দ্রোহের মুদ্রায় জড়ো হওয়া  ভেজা চুমু বিষয়ক দূরের আকাশ  থেকে যায় গ্রীস্মহীন!



ঝাপসা নিঝুম রাত্রি


বিদায়ের ঘ্রাণ কি একটি নদীর মত স্মৃতি বিজড়িত ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে বেড়ে ওঠা হইচই! কাউকে চিনলে সহজে জমে যায়  কৃষ্টাল চাপা ঘরের মাঝরাত্রি কান্না।  তখন মানুষজনের পরসা কাঁচা দামের তরকারির মত ধুয়ে ধুয়ে রুক্ষতা প্রসন্ন ভাব বহতা শরীর।  পোষমানা শান্ত স্বভাবের উত্তরীয়। নতুন কোনো সঙ্গ ঘ্যাঁঘ্যাঁ সুরে বলবে অনেক দিন পরে অনামিকার আলো দেখলাম আবার আসবেন। শোরগোল পড়ে যায় গোধূলি নাকি এক শতাব্দী পর পরস্ত্রী , হাল দরজায় ছেড়ে দেয় খোলা চিঠি। প্রহর প্রান্তের প্রেম-লাবণ্য কমে রুক্ষ-ব্যঞ্জনায় আসক্তি   নাকি ক্রমশ সংসারে প্রভাব বিস্তার করছে এমন কিছু। উজ্জ্বল বৃষ্টিপাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। রহস্য সামনে আসার পর হতবাক প্রান্ত হঠাৎই চুলকাই নিরুদ্দেশের মাথা। বোধহয় চিন্তাগুলি সফেদ সমুদ্র অভিযানে উৎসব উন্মোচন চোখের রঙফুল জন্মানো আদি পুরুষ। ভেতরে উল্কার ছায়া, অস্থির কসাইখানার মাংসআলো যার পরতে পরতে আলাদা গল্প দিনের উজ্জ্বল ঐশ্বর্য সঞ্চয় করেও অন্ধকার পঁচা নারী  ভাসছে ঝরা পাতার মত। দার্শনিক অশ্রুর দু এক ফোঁটা জল ঝাপসা করে তুলছে তৃষ্ণার্ত  নিঝুম রাত্রি। তখন নক্ষত্র প্রেমে মহাজাগতিক স্রোত হৃদপরাজয়ের ধ্রুব আগুনে ছোঁয় জীবনের সব ভুল। জলের যৌবন পার হওয়া সমুদ্র পথিকের বেশে মানুষের রূপ। হ্যাঁ, বিলাসী চাওয়া ছিল সুগন্ধি ভেসে আসা সেই রূপের। শানবাঁধানো  জলের নামতায় গাঢ় হয়েছে জ্বলন্ত বাতাসের উনুন-হৃদয়। তাকে কি নরম কপাটে আটকে রেখে হৃদয়স্থ করা যায়! শেখানো যায় প্রেমলাবণ্যের রূপকথা। 



ব্যথাতুর বাতাস


সাতসকাল

ফলাফল শূন্য যোগবিয়োগের প্রান্ত

অচেনা কতো পথ  শিশিরে জমিয়ে রাখা 

অস্তাচল দৃষ্টি কোঠায় বয়স বাড়ছে


নগ্ন জানালার ওপাশে সমুজ্জ্বল স্মৃতি 

রোদ মগ্ন একমুঠো সুখ ছড়িয়ে দিলে বসন্ত নামে


হেলাফেলা দৃশ্যে ভেসে থাকতো চাঁদ 

জোছনা ছায়ায় ফোঁড় খাওয়া অন্ধকার ক্লান্ত শিকারি

পাখি উড়িয়ে তেষ্টায় পরিষ্কার আকাশ গেলে 


হাঁটছি আমি না-কি পথ

বুঝতে বুঝতে ছুঁয়ে ফেলি চার যুগ 


হঠাতই কান্নার মত ঝরে পড়লো পাতা সকল

পরতে পরতে অভিমান, জলভরা  অবিশ্বাসে পেঁয়াজের খোলস খোলা সূর্য 


নির্দয়তায় জ্বলে ওঠে জল দু’চোখে 

শব্দহীন চিৎকারে ডেকে গেলো কি কিছু ব্যথাতুর বাতাস।



শীতের বাহুডোর 


কুসুম আলো

সময়ের সব অভিমান নিয়ে দুঃখের গলা জড়িয়ে ধরে রাখে


অভিশাপের মত মিথ

ভেতর খোলা নৈঃশব্দের নাম ধরে চুপিচুপি  ডাকে 

খুব একটা গল্প রয়েছে এমনটা ভাবা অস্বাভাবিক। 


একটা কবিতা পড়লাম 

কিছু ছায়া রেখে যেতে পারে সভ্যতার সৌন্দর্যের ওপর  

মন মাচায় দুপুর টার দিকে এগিয়ে গেছে বোধের সবুজ


সুখ-শান্তি কান্না কুসুমের জলে ভাঙা ঢেউ ভোর হতেই জ্বলে উঠবে ঘরের দরজায় 

আস্তে আস্তে অশ্রুর ওপর থেকে রক্তের সুবাস নিয়ে স্রোতের নদীর মত হেঁটে যাবে মৃত অন্ধকারের বাড়িতে


 উত্তরে বাতাস 

কুয়াশায় চেপে ধরা দৃষ্টির ক্লান্তি মুছিয়ে সতর্ক স্নেহ-মায়ায়র সংসার দিতে চাইছে 

রোদের উজান জুড়ে উত্তাল হয়ে ওঠে দোদুল্যমান গাড়ো গোলাপি আকাশ

 যেখানে হৃদয় হাঁটে আকস্মিক আঘাতে 


আকাশ খোলা স্মৃতি শেষের বৃষ্টি  আনন্দ নিয়ে জীবনের জানালায়   অকৃত্রিম অমল বিশুদ্ধ রেখা সংযত প্রকৃতির মোহে স্বপ্নের অকৃত্রিম গ্লানি ছড়াবে

যেন দূরত্বের  শ্বাস করুণায় ঢুকে পড়ে শীতের বাহুডোরে। 



**************************************************************


তাপস কুমার দে 

 লেখালিখি শুরু--সেই স্কুল জীবন থেকে লেখালেখির হাতেখড়ি। 
 স্কুল জীবন থেকে বিভিন্ন রকম গল্পের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে এটা প্রবল হয় যখন আমার এক সহপাঠী বিভিন্ন রকম বই সংগ্রহের উদ্যোগ নেই কারণ সে পাঠাগার গড়ে তুলবে। আর এ কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করতে গেলে একটি বই দিয়ে অংশ গ্রহণ  করতে হবে। আমি অংশ গ্রহন করলাম এবং গল্প পড়তে পড়তে লেখার ইচ্ছে জাগে এবং একটি গল্প লিখেও ফেলি ওটাই আমার প্রথম লেখা। 
প্রভাব সৃষ্টিকারী লেখক অথবা কার কার লেখা পড়তে ভালো লাগে---- আমি যখন বেড়ে উঠি তখন হুমায়ুন আহমেদের যুগ তারপরও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্রের মতো লেখকদের লেখা ভালো লাগার তালিকায় উঠে আসে। 
আমি কেনো লিখি---- আত্মতুষ্টির জন্য খানিকটা তারচেয়ে বড়ো ব্যপার হলো মনুষ্যত্ব বিকাশের অবিচ্ছেদ্য অংশ যে সাহিত্য, তা নিজেকে ও সমাজকে বুঝাতে। যার ভেতর রয়েছে মহাজাগতিক আনন্দ। 
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের  পদক্ষেপ ---- লেখালেখির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বলতে নিজের বই প্রকাশ করার আপ্রাণ চেষ্টা আর সেই লক্ষ্যে পান্ডুলিপির কাজ চলমান।  
 বেশকটি সাহিত্য সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম তার মধ্যে অন্যতম খুলনা সাহিত্য মজলিস,  খুলনা কালচারাল সেন্টার। এখনও সম্পৃক্ত আছি খুলনা কালচারাল সেন্টারর সাথে।  




গুচ্ছ কবিতা * শিশির আজম

 




শিশির আজম * কবিতাগুচ্ছ 


কুসামার পঁচা মিষ্টিকুমড়া


ফুলেরা ঘুমিয়ে গেলে
প্রজাপতি মেলে ধরে ডানার আকাশ।

আকাশের মেঘ আছে বজ্র আছে,
ফুলেরা দেখে না।

'আমি কি কখনো ভালবাসিনি তোমাকে?'
-- মনে মনে এই প্রশ্ন করি।

কুসামা দেখেন আমাকে -- দেখেন ওর মিষ্টি কুমড়ার ভেতরটা
পঁচে গেছে!

কেন এতদিন দেখেননি উনি?
না কি ওটা আমিই এঁকেছি!





১ লাইনের কবিতা


জগতের সব জ্ঞানী আর গুরুজনেরা বলেন
স্বপ্ন দেখতে হলে বড় বড় স্বপ্ন দেখাই ভাল

অথচ আমার স্বপ্নে আসে
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পিঁপড়ে আর ছোট ছোট নদী

ছোট ছোট গাছ
ছোট ছোট আকাঙ্ক্ষা

ফ্রয়েড কী বলেন
আমার আকাঙ্ক্ষা কি খুব ছোট

এশিয়ার দক্ষিণে শস্যশ্যামল এক দ্বীপে আমি বড় হয়েছি
দ্বীপটা ছোট
কিন্তু সমুদ্র তো অনেক বড়
দেখো একদিন আমি লিখবো ১ লাইনের কবিতা
লিখতে পারবো
আর ঐ ১ লাইনের কবিতা
১ লাইনে
তোমরা পারবে না পড়ে শেষ করতে





এথেন্স


এ্যাক্রোপলিসে কতগুলো খিলান আছে
কেউ গুণে দেখেছে?

হাঙরটিকে মেরে ফেলার পর জানতে পারলাম
ওর প্রেমিকা আছে।

আর ভয় উপেক্ষা করে
সে ঘোরাফেরা করছে
উপকূলের কাছাকাছিই।

আকাঙ্ক্ষা করি হয় তো কোন একদিন কেউ প্রশ্ন করবে
মানুষ আর দেবতাদের
খানিকটা শিক্ষাদীক্ষা দরকার কি না
এ বিষয়ে।





আমি মরে গেলাম আর আমি জানলামই না


ধরো আমি মরে গেলাম
হ্যা আমি
আর আমি জানলামই না
তাহলে কিরকম লাগে

এইরকম আশংকা বা হতাশার কথা যা-ই বলি
সান্তিয়াগোয়
এক নৈশ ক্যাফেতে
গ্যাব্রিয়েল আমাকে বলেছিল
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

আশ্চর্য একই কথা গত পরশু বললো
গুণ দা
নির্মলেন্দু গুণ
ঢাকায়
দুপুরে
পাবলিক বাসে ঝুলতে ঝুলতে

এইটা কেন
এইটা তো সেমিনার করে আলোচনারও ব্যাপার না





মাছ


মাছগুলো এতক্ষণ চুপচাপ ছিল
এখন আর চুপচাপ নেই

জল থেকে ডাঙায় তোলার পর
কি ছটফটানি ওদের

তারপর ওরা তো চুপচাপই ছিল
এখন আবার তড়পাচ্ছে কেন

কীসের রাগ অভিযোগ অভিমান ওদের
ওদের প্রতি আমাদের তো বিদ্বেষ নেই

একটু পরেই ধারালো বটির ওপর ওদের তোলা হবে
এখন এরকম বিশ্রী আচরণ না করলেই কি নয়





শিশির আজম

জন্ম : ২৭ অক্টোবর, ১৯৭৮  জন্মস্থান, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : এলাংগী, কোটচাঁদপুর ঝিনাইদহ -৭৩৩০
                     বাংলাদেশ
কাব্যগ্রন্থসমূহ : ছাই (২০০৫) দেয়ালে লেখা কবিতা (২০০৮) রাস্তার জোনাকি (২০১৩) ইবলিস (২০১৭)
চুপ (২০১৭) মারাঠা মুনমুন আগরবাতি (২০১৮)
মাতাহারি (২০২০) টি পোয়েট্রি (২০২০) সরকারি কবিতা (২০২১) হংকঙের মেয়েরা (২০২২) বিষ (২০২৩)
সম্পাদিত ছোটকাগজ : শিকড়  (৫ টি সংখ্যা প্রকাশিত)
সম্পাদিত কবিতার ভাঁজকাগজ : বাংলা (৩ টি সংখ্যা প্রকাশিত)
বাংলা কবিতায় Tea Poetry Movement এর উশকানিদাতা


‘স্বরবর্ণে’ প্রকাশিত কবি গৌরীশঙ্কর দে-র কবিতা





শব্দের অন্তর্গত নিস্তব্ধতা 


আমি জন্মাইনি—  

শুধু একটি ভুল উচ্চারণের ভেতর  

একটি অনুপস্থিত নামের মতো ভেসে উঠেছি।


আমার ছায়া নেই,  

তবু প্রতিটি দেয়ালে  

আমি নিজেকে দেখি  

একটি অদৃশ্য আয়নার ভেতর।


সময় এখানে  

একটি ভাঙা ঘড়ির ফাঁকে  

নিজেকে খুঁজে ফেরে,  

যেন অতীতই ভবিষ্যতের ভুল বানান।


আমি হাঁটি—  

একটি শব্দহীন শহরের ভেতর,  

যেখানে প্রতিটি রাস্তা  

একটি কবিতার অসমাপ্ত স্তবক।


মৃত্যু আসে না,  

সে শুধু অপেক্ষা করে  

একটি অক্ষরের ভুল ব্যাখ্যার মতো,  

যেখানে জীবন নিজেই  

নিজেকে অস্বীকার করে।


আমি লিখি না—  

আমি শুধু মুছে ফেলি  

যে ভাষা আমাকে চিনতে চায়,  

তাকে অচেনা করে তুলি।



কেন লিখি? 


আমি লিখি না,  

আমার আঙুলে এক মৃত পাখির ছায়া লিখে যায়  

আকাশের উল্টো পিঠে।


জীবন তখন  

একটি ঘুমন্ত ঘড়ি,  

যার কাঁটা সময়কে নয়,  

শুধু অনুপস্থিতিকে মাপে।


মৃত্যু আসে না—  

সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে  

একটি দরজার মতো,  

যার চাবি প্রতিটি কবিতার ভেতরেই হারিয়ে যায়।


আমি লিখি—  

"আজ আমি একটি শব্দের অন্তর্গত শূন্যতা,  

যেখানে ব্যাকরণ নিজেই আত্মহত্যা করেছে।"


তারা গোনে না,  

তারা শুধু ঝরে পড়ে  

একটি অদৃশ্য ক্যালেন্ডারের পাতায়,  

যেখানে দিনগুলো কেবল  

অস্তিত্বের ভুল বানান।


আমার কলমে রক্ত নেই,  

তবু প্রতিটি অক্ষর  

একটি মৃত আত্মার পুনর্জন্ম।


আমি লিখি,  

যেন লিখছি না—  

শুধু অনুপস্থিতির দিকে  

একটি অন্ধ চোখ ছুঁড়ে দিচ্ছি।



অভয়া দশমী 


১.

যে লুপ্ত প্রণয় তুমি গুপ্ত রেখেছিলে আমাদের 

দুজনের মধ্যে, আজ তার বাঁধ ভেঙে দিলে,

প্রোটন-ইলেকট্রন-নিউট্রন কণা যেখানে ট্রিনিটি 

ভেঙে যায় অথচ প্রকৃতপক্ষে ভাঙে না কিছুই...

লেপটন ভেঙে যায় প্রথমে ইলেকট্রনে দশম মন্ডলে

আসীৎ তমসা গূঢ়মগ্রেহমের অন্ধকার কোলে,

দুধ-জল এক কারণ সে পরম তমসা, টিটি 

নেই, কে দেখবে টিকিট, ট্রেন চলে প্রতিপলে ঢের

সময় গড়ায়, মৃত্যু দীর্ঘ দাবা খেলে, কোনো রুই,

কাৎলা, মৃগেল সে নয়, বঁড়শি ডুবে আছে স্থির, মাচা বেয়ে পুঁই—



২.

সুদীর্ঘ পতন হয় 'সা' 'নি' এসে মেশে যেই স্পেস নড়ে যায়,

সময় ঘামায় না সে মাথা,  ফাৎনায়, দাবার বোর্ডে

কেবল বেড়ায় ভেসে চিদাকাশে কী অবলীলায় 

চলে যায় পশ্চিম দিগন্তে জয়সীমা, চান্দু বোরদে,

অবশেষে সুনীল গাভাসকার, সৌরভ গাঙ্গুলি...

শতেক শতাব্দী ধরে ফুটে ওঠে গাছে ফুলগুলি...

মানুষ তাদের নিয়ে দেবতার পায়ে ছোঁড়ে ওদিকে আর জি 

করে

কেঁদে মরে বিচারের আশায় আশায় অভয়ার কায়াহীন 

ছায়া, মাথা খোঁড়ে মিছিলে মিছিলে ওরা রাত্রিদিন

কাঁদে, প্রতিবাদে অন্ধকার রাতে অতন্দ্র প্রহরে। 



৩.

দশ পংক্তি বিভাজিত দশদিক ঢাকা হাহাকারে, 

গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে  নীরবে ছড়ায় এক তীব্র প্রতিবাদ—

যেখানে দাঁড়ায় মেঘ কিছুক্ষণ বন্যা এসে শেষে কাটা ঘা'য়

লবণ ছিটিয়ে তাকে আরো গূঢ়তর রুদ্ধ দ্বারে

বন্দী করে রাখে ঘোরতর হিটলারি কায়দায়, 

পুড়ে ছাই হয়ে যায় জতুগৃহের সে আগুনে নিরপরাধ 

অন্য পাঁচ ভাই, ভাবি তাই বিচার কোথায় মহাভারতের 

কাল থেকে আজো! দুঃশলাকে বিবাহ করাই কি জয়দ্রথের

ভুল ছিল, রথ থেকে এক ধাক্কায় মাটিতে ফেললে ট্রিনিটির

আজ্ঞায় অর্জুন ছুঁড়ে দেন পুত্রের মায়ায় প্রতিহিংস্র তীর?



সনেটগুচ্ছ 


কড়ি


আবার রাতের পাখি মেলে দিলো ঘুম,

চোখের নিস্তব্ধ তীরে বেহিসাবি নীড়।

জমাট কান্নার জল চাতক পাখির,

বৃষ্টির অধিক প্রিয় নিবিড় নি:ঝুম। 


বৃষ্টি পড়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্তাক্ত নিশীথ, 

একা একা হেঁটে যায় হিমেল মৌসুম। 

পায়ের তলায় ভাঙা ডিমের কুসুম,

কুসুমিত আলস্যে কি ডাকে পরভৃৎ? 


নীচে রক্ত উপরেও রক্তাক্ত পৃথিবী—

ও পৃথিবী কবে বল কোল পেতে নিবি?


বিদায়ের পদধ্বনি অতীব নির্জন।

অক্লান্ত ঘড়ির শব্দে একাকী পাগল,

হেঁটে যায় স্বপ্নে তার সঙ্গিনী মরণ,

সঙ্গ নেয় চোখ ভরা যোনি—অশ্রুজল।



বরগা


প্রৌঢ়ত্বে আচ্ছন্ন পুরুষের স্ত্রীকে বহু

নিকটের বলে বোধ হয়। এ বিজ্ঞান

শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের, অবসন্ন লহু,

মাঘ মাসে মার্জারের রতির আহ্বান।


যৌবন দামাল নৌকা, তার পাড় ভাঙা 

কাজ। সে লুণ্ঠন করে চলে মাতৃদুগ্ধ,

তার জন্য একটি নারীর কামরাঙা 

শরীরে প্রলুব্ধ হয়, 'যেন' দিলে ক্ষুব্ধ 


হয় কবিতার বহুতল। 'মতো' শব্দে

ভস্ম মেখে পড়ে থাকে শব্দের জাঙাল,

পেরিয়ে প্রান্তর, খুঁজে নিতে সে প্রারব্ধে

তালগাছে বসে থাকে  বাবুই কাঙাল। 


বাসা বাঁধে রাধিকাকে নিয়ে ঘনঘোর,

নূপুরের এই ধ্বনি শান্ত মনোহর।



খিলান 


মেশিনের পাশে শুয়ে রয়েছে মেশিন ।

মেশিনে মেশিনে রোদ-বৃষ্টি বিনিময় 

চলে কিছুক্ষণ, পরে প্রচন্ড প্রণয়

জন্ম দেয় এইদেশে প্রজন্ম নবীন ।


এখানে নরম থাবা বিছিয়েছে চীন।

'মুসলিম ঘৃণা করি' আজো লেখা হয়,

যন্ত্রের নিয়মে চলে এদেশে সময়,

রোদেলা কান্নায় ভেজে মুড়িমাখা দিন।


এখানে সনেট ভালো চলে কবিতায়,

কুকুর-বেড়াল নিয়ে মেশিনেরা চড়ে।

শনি-রবি ফূর্তি আর সোম-শুক্রে কাজ,

সেলফোনে বাবা-মাকে বেশ দেখা যায়,

কেবল যায়না দেখা ভয়ের বিবরে,

করুণ শ্বাসের শব্দ, সাপের আওয়াজ।



গম্বুজ 


এলো কী কান্তার ভেঙে নতুন কবিতা, 

আন্দালুসিয়ায় বসে আমি তা লিখেছি 

অন্তিম শব্দের জন্মদাতা আদি পিতা 

আমি শব্দে শব্দ ঠুকে অগ্নি জ্বালিয়েছি। 


এলিজাবেথের যুগ থেকে শুরু করে

এখনো চলেছি লিখে সনেট কত যে!

আমার বনেটে তাই পড়ে না নজরে 

বসেছে সুপর্ণাদুটি প্রেমের সহজে। 


ঘরে ফাঁদ পাতা আছে মরেছে ইঁদুর। 

গন্ধে তার সন্ত বসে আছে মাদারির,

আশ্চর্য খেলায় মেতে করি ঘুরঘুর,

মৃত্যুর সেতারে তুলি মীড়ের আবির,


কী ফিনকি দিয়ে রক্ত দোলপূর্ণিমায়,

সনেট সমীপে ছোটে মুগ্ধ কবিতা



ওমর খৈয়ামের রুবাই

অনুবাদ  * গৌরীশঙ্কর দে 



Rubai No.10 of Omar Khayyam


With me along some Strip of Herbage strown

That just divides the desert from swon,

Where name of Slave and Sultan Scarce is known,

And pity Sultan Mahmud on his Throne.


* From the translation of  Edward FitzGerald



ওমর খৈয়ামের রুবাই-১০


চলো আমার সঙ্গে কোনো ভেষজ বনের কুঞ্জ পথে 

মরুভূমির ভেদ যেখানে শস্যশীলা ক্ষেত্র হতে, 

উধাও যেথা বাদশা গোলাম সব ভেদাভেদ এ জগতে, 

এবং যামুদশা-ও তুচ্ছ তখতে আসীন কোনোমতে।



Rubai No.11 of Omar Khayyam


Here with a loaf of bread beneath the Bough, 

A Flask of Wine, a Book of Verse- and Thou 

        Beside me singing in the Wilderness-

And wildness is Paradise enow.


* From the translation of Edward FitzGerald



ওমর খৈয়ামের রুবাই-১১


এইখানে এই বৃক্ষশাখার নীচে নিয়ে স্বল্প আহার, 

এক পাত্র সুরা, একটি কাব্য গ্রন্থ— এবং তার

     মধ্যে আমার কাছে বসে তুমি মরুভূমির মাঝে- 

হঠাৎ মরুর মধ্যে পেলে যথেষ্ট জান্নাতের বাহার।



Runbai No.12 of Omar Khayyam


'How sweet is mortal Sovarnty'—think some: 

Others—'How best the Paradise to come!'

    Ah, take the cash in hand and waive the rest; 

Oh, the brave Music of a distant Drum


*From the translation of Edward FitzGerald



ওমর খৈয়ামের রুবাই-১২


কেউ ভাবে— 'এই নশ্বরতার রাজত্বটা কী সুমধুর' : 

কারোর কাছে—'স্বর্গলাভই সবচে ভালো আসন্ন সুর! 

আহ্, যাও তো নগদবিদায় করে এবার বিশ্রামেতে, 

ওহ্, শ্রবণ বন্ধ রাখো শেষের বাদ্যি নয়রে সুদূর!



Rubai No.13 of Of Omar Khayyam


Look to the Rose that blows about us-'Lo, 

Laughing, she says, 'into the World I blow;

   'At once the silken Tassel of my purse 

Tear, and its Treasure on the Garden throw.'


* From the translation of Edward FitzGerald.



ওমর খৈয়ামের রুবাই-১৩


মোদের তরে গোলাপবালার মনভুলানো হাসিটা—'দেখ, 

হাসছে,' বলছে, 'ধরার পরে বইছি আমি এটাই অনেক;

    'এক্ষুনি এই রেশমি বাঁধন ছিন্ন করে টাকার থলির

ঐশ্বর্যের ভাণ্ডটা এর করছি বাগিচায় নিক্ষেপ।'



Rubai No.14 of Omar Khayyam


The Worldly Hope Men set their Hearts upon 

Turns Ashes— or it prospers; and anon,

    Like Snow upon the Desert's dusty Face 

Lighing a little Hour or two- is gone.


*From the translation of Edward Fitzgerald.



ওমর খৈয়ামের রুবাই-১৪


পার্থিব আশা যার উপরে মানুষ করে হৃদয় স্থাপন 

ভস্মে মিলায়-সমৃদ্ধ হয়, ও ঘটে তার সঙ্গেই বিস্মরণ, 

       মলিন মরুর বুকে বরফের মতো তার মুখ

ঝলসায় দু'এক মুহূর্ত—আর চলে যায় সুমধুর ক্ষণ।



Rubai No.15 of Omar Khayyam


And those who husbanded the Golden Grain, 

And those flung it to the Winds like rain,

     Alike to no such aureate Earth are turn'd 

As, buried once, Men want dug up again.


*From translation of OEdward FitzGerald



ওমর খৈয়ামের রুবাই -১৫


আর যারা সঞ্চয় করেছ শস্যদানা স্বর্ণাভ ফল, 

আর যারা নিক্ষেপ করেছ হাওয়ায় যেন বৃষ্টির জল, 

    দোঁহার কাছেই ঝলমলে এই পৃথিবীটা দেয়না ধরা 

যেমন কবর পেলে মাটি খোঁড়েনা আর মনুষ্যদল।



তনুকা দে





আমার বাবা গৌরীশঙ্কর দে 


তনুকা দে



গৌরীশঙ্কর দে আমার বাবা। তিনি কবি। অকপটে স্বীকার করি, কবি গৌরীশঙ্কর দে-র সম্পর্কে কিছু লেখার যোগ্যতা আমার নেই। যোগ্য জনেরা কিছু কিছু তা লিখেছেন, ভবিষ্যতেও লিখবেন, আশা করি। বাবা হিসাবে আশৈশব আমি তাঁকে যেমন দেখেছি, এখানে সেই বিষয়ে দুই চার কথা বলার চেষ্টা করছি মাত্র।

      কর্মসূত্রে আমি বিদেশে থাকি। অস্ট্রেলিয়ায়। প্রতিদিন বাবার সঙ্গে আমার কথা হত। প্রবাসী কন্যার জন্য তাঁর পিতৃহৃদয় সর্বদা উৎকণ্ঠিত থাকতো। আমি তাঁকে আশ্বস্ত করতাম। আমি ভালো আছি, শুনে নিশ্চিন্ত হতেন। আমি তাঁর একমাত্র সন্তান হওয়ায় আমিই ছিলাম তাঁর সর্বস্ব। আমি তাঁর কাছে নেই, এই অভাববোধ, তাঁর মনের মধ্যে একটা শূন্যতা তৈরি করত, টের পেতাম। কিন্তু কিছু করার ছিল না। জীবন আমাদের পিতা-পুত্রীর জন্য পূর্ব থেকেই এমনটা নির্ধারণ করে রেখেছিল হয়তো।

     বাবা আমার সমস্ত কাজের প্রেরণাস্বরূপ ছিলেন। তিনি আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এবং সেই স্বপ্নের দরজায় পৌঁছে দিয়ে নিশ্চিত  হয়েছেন। তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। আর কবিতার প্রতি ছিল তাঁর অসম্ভব ভালোবাসা। শেষ দিন পর্যন্ত কবিতার প্রতি তাঁর সেই ভালোবাসা লক্ষ করেছি। তাঁর মেধা ও ভালোবাসার  ছোঁয়া তাঁর কাব্য-কবিতাকেও ছুঁয়ে যেত নিশ্চয়ই, তা না হলে তিনি কী করে রাতের পর রাত নির্ঘুম রজনী যাপন করতেন, কবিতাকে সামনে রেখে?

     ‘আমার নিভৃতাবাস’ করনাকালীন দুঃসময়ের 
দিনগুলিতে লেখা বাবার এই কবিতার বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলাম আমি, পিকাসোর একটি ছবি অবলম্বনে। কী যে খুশি হয়েছিলেন দেখে । কর্মজগৎ থেকে অবসর গ্রহণের পর বাবা প্রায়ই বলতেন, এবার একটা উপন্যাস লিখবেন, সেটা আর হয়ে উঠল না। হাঁপানির মতো একটা দুঃসহ রোগ সারা জীবন বাবা বয়ে বেড়িয়েছেন।

     বাবা চলে গেছেন, যেখানে গেলে মানুষ আর ফেরে না, আজ বুঝতে শিখেছি ঠিকই, তবু আমার মনে হয়, বাবা বুঝি আমার পাশের ঘরটিতে বসে ঠিক একই রকম ভাবে কবিতা লিখে চলেছেন। দৌড়ে কাছে যাই, দূরে সরে যায় সেই ছায়া। সে ছায়া কার! সে কি আমার মরীচিকা বাবা!!

      কোথায় যাবে তুমি, বাবা? কতদূর? কোন মহাশূন্যে?? যেখানেই যাও আমি জানি, তুমি আছো আমার হৃদয় জুড়ে, যেমন ছিলে এক দিন...।







**অ্যাগোরা স্পেস, ৯ সি লর্ড সিনহা রোড-এ কবি প্রজিত জানা এবং সৈয়দ কওসর জামাল আয়োজিত ‘গৌরীশঙ্কর দে স্মরণ সভা’য় নিজের পিতা সম্পর্কে একটি বক্তব্য রেখেছিলেন গৌরীশঙ্কর-কন্যা তনুকা। এটি তারই অনুলিখন। অনুলেখক— তন্ময় রায়।


########################################

দেবাশিস সাহা





যে ফোনটা আর কোনোদিন আসবে না 

দেবাশিস সাহা 


“সন্ধ্যাতারা নিভে গেছে, আকাশ পর্যাপ্ত নীল, হাওয়া 

থমকে আছে মায়াবীর দীঘল শরীরে 

কত স্বপ্ন হিরেকুচি জলের কোমল বিন্দু, ঝরে পড়ছে জল

এঁকে রাখি।”


                           ——  নদী, নিশীথিনী / গৌরীশঙ্কর দে।



"...কালীদহে কখন যে ঝড় কমলের নাল ভাঙে– ছিঁড়ে ফেলে গাংচিল শালিকের প্রাণ"  জীবনে মৃত্যুর চেয়ে অনিশ্চিত বোধহয় আর কিছু নেই। এত তাড়াতাড়ি কবি গৌরীশঙ্কর দে চলে যাবেন, আর তাঁর স্মৃতিচারণ করব কোনও পত্রিকায়, কোনওদিন ভাবিনি। আমাদের না-ভাবা কথাগুলোকে হয়তো এভাবেই ভাবাতে বাধ্য করে শিয়রে ওত পেতে থাকা গাংচিল। 

     ব্যক্তিকে উপেক্ষা করে কবি গৌরীশঙ্কর সম্পর্কে কিছু লেখা আমার পক্ষে অসম্ভব। তাই, কবির কাব্যকৃতি আলোচনা করতে গিয়ে অনিবার্যভাবে এ লেখায় এসে পড়বে, কবি গৌরীশঙ্কর দে-র সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা দিক। পাঠক তাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, আশা করি। তাছাড়া শুধু কবিতা কেন, কোনো সৃষ্টিই কি শেষপর্যন্ত ব্যক্তিনিরপেক্ষ? ব্যক্তিকে জানলে, তার সৃষ্টিকেও সম্যক জানা সম্ভব, বলেই আমার বিশ্বাস।

      কবি গৌরীশঙ্কর দে-র সঙ্গে আমার পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়, বছর পাঁচ-ছয়েকের। বয়সের পার্থক্যও বেশি নয়, বছর দুই। তবু আমি গৌরীদা বলতেই স্বচ্ছন্দবোধ করেছি বেশি। 

      ২০২০-এর মাঝামাঝি। তখন সবে করোনা ভাইরাস মহামারীর আকার নিচ্ছে। সারাদেশে লকডাউন ঘোষিত হল। নিমেষে চলমান পৃথিবীটা গৃহবন্দি হয়ে পড়ল। হাতে অগাধ সময়। জীবনের আনন্দকে ঘরের কোণে পিষে মেরে ফেলতে চাইছে মারণ ভাইরাস-আতঙ্ক । খবরে রোজই শুনতে পাচ্ছি, লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যুমিছিল। এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা এর আগে কখনো হয়নি! জীবনের আনন্দ, সৌন্দর্যান্বেষা তবে কি এভাবেই শেষ হয়ে যাবে? ভাবছি। হঠাৎ একদিন মনে হল, শুয়ে বসে খবর শুনে, মৃত্যুর বিভীষিকা প্রত্যক্ষ না-করে, ঘরে বসে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করলে কেমন হয়। সেই ভাবনা থেকে জন্ম হল ‘স্বরবর্ণ’ অনলাইন পত্রিকার। দোসর ফেসবুক। বিজ্ঞাপন দিতেই বন্ধুরা লেখা পাঠাতে থাকলেন। কখনো-বা নিজেই কারো লেখা ভালো লাগলে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। কেউ বিমুখ করছেন না। কবি-লেখকদের অযাচিত ইন্ধনে নিয়মিত বেরিয়ে চলেছে স্বরবর্ণ। দু’মাস পরপর। তবু কাজ প্রচুর। ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপে আসা লেখাগুলো খুঁটিয়ে পড়া, নির্বাচন করা, পত্রিকা সাজানো কাজ কম নয় ।

     হঠাৎ একদিন ফেসবুকে নজরে পড়ল গৌরীশঙ্কর দে নামে এক কবির কবিতা। রোজই প্রায় তিনি যখন-তখন ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করেন। সাগ্রহে পড়ি। কখনো মন্তব্য করি। কখনো করি না। গৌরীশঙ্কর দে-র প্রায় সব কবিতাই এত ভালো লেগে যায়, এক দিন স্বরবর্ণে লেখার আমন্ত্রণ জানালাম। আমন্ত্রণ পেয়ে তিনিও ভীষণ খুশি। ফোন করলেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। ধীরে ধীরে পরিচয় নেমে এলো ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে... তিনি কখনো কখনো সেই পরিচয়কে ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’তে নামলেও আমি পারিনি। যাহোক, সম্পর্কের এক পিঠে কবিতা অন্য পিঠে চলে আসতে লাগল পরিবারের অন্যরাও। জানলাম গৌরীদার পরিবারে বৃদ্ধ পিতা-মাতা রয়েছেন, আর তাঁরা স্বামী-স্ত্রী, তাঁদের একমাত্র কন্যা তনুকা থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। আমার পরিবারও মুখস্থ হল তাঁর ঠোঁটে। আমার ভাগনা, ছোটবেলা থেকেই আমার কাছে মানুষ, অধ্যাপনা করছে পুরুলিয়ায় সিধু-কানু ইউনিভার্সিটিতে। মেয়ে সৃজিতা বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষিকা। দু’দিক থেকেই প্রসারিত হল বন্ধুত্বের অটুট বন্ধন। 

      ইতিমধ্যে করোনা বিদায়ে ধীরে ধীরে জীবন তার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পাচ্ছে । ২০২২-এ কলকাতা পুস্তক মেলা চলছে তখন। গৌরীদা একদিন প্রস্তাব করলেন মেলায় আসার। দু’জন দু’জনের কাব্যগ্রন্থ দেওয়া-নেওয়া হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দু’জন দু’জনকে চাক্ষুষ করব। মুঠোফোনের কল্যাণে এতদিন পরস্পর পরস্পরকে কণ্ঠস্বরে চিনেছি, অবয়বে নয়। রাজি হয়ে গেলাম। দেখা হল। গৌরীদা তাঁর নির্বাচিত কবিতা এবং ‘আমার নিভৃতাবাস’ কাব্যগ্রন্থ দু’টি উপহার দিলেন। আমি দিলাম আমার ‘দু’এক কণা শৈশব’ গদ্যগ্রন্থ  এবং ‘মাছরাঙা ও অলীক ধুতুরো’ নামে কবিতার বই। দু’জনে মেলার বুক স্টলগুলো চষে ফেললাম। গৌরীদা আরো দু-একজন কবি বন্ধুকে তাঁর বই দিলেন। লিটিল ম্যাগাজিন মঞ্চে শুনলাম প্রতুল মুখোপাধ্যায় গাইছেন, আমি বাংলায় গান গাই...


       দু’চার দিন বাদেই ফোন,— তোমার গদ্যের বইটা পড়ে ফেললাম। দারুণ লাগল। শুধু তাই নয়, কোথায় কোথায়, কেন ভালো লেগেছে, তার আনুপুঙ্খ ব্যাখ্যা। আমি তো অবাক, ‘এত তাড়াতাড়ি পড়ে ফেললে?’

      ‘হ্যাঁ, কী করব, রাতে ভালো ঘুম হয় না। হয় পড়ি, না হয় লিখি। আমি তখন ওর নির্বাচিত কবিতা সবে পড়া শুরু করেছি। শেষ করে উঠতে পারিনি। কিছু কিছু ভালোলাগার কথা জানালাম। স্মৃতিতে গেঁথে থাকা কিছু পঙক্তি আবৃত্তি করলাম—


      নিশীথরাতের পাখি      পেয়েছিলে ব্যথা নাকি 

              অন্ধকারে, কোথাও পালকে?

     একা নিদ্রাহীন তুমি        সবাই ঘুমন্ত, ঘুমই 

              একমাত্র পথ্য ইহলোকে।


                                            ( কালিকা-পুরাণ )

কিংবা—

 আগুনে ঝলসে গিয়ে এ জীবন তবু যতদূর জেগে আছে     ছায়াসরণি প্রান্তে আমি তার উড়ে যাওয়া লেখচিত্র আঁকি।


                                                ( ছায়াপাখি )

বা—


কোমল শ্যামলতায় ভরা এ বাংলাদেশ---- এত কবি, এত 

কাস্তে, প্রাণ 

তবু এত আর্তনাদ কেন?

                                                  (অভিমান)

     এবং জানালাম, এইসব কবিতা, কবিতার পঙক্তিগুলি আমাকে ভালোলাগার কী এক আবেশে আচ্ছন্ন করে রাখছে। শুনে কী যে খুশি হলেন! বাড়ি-গাড়ি, বিত্তসম্পদ নয় ‘আপনার লেখাটি ভালো লেগেছে ’, আমার মনে হয়, কবিরা এই ছোট্ট কথাটি শোনার জন্য আজীবন উৎকর্ণ থাকেন। গৌরীদাকে বললাম, পড়া শেষ হলে লিখিত পাঠ-প্রতিক্রিয়া দেব। 

     দিন যায়। সম্পর্ক গাঢ় হয়। কথা যেন শেষ হয় না। ফোনে আধ-এক ঘন্টা কথা বলা হলেও মনে হয় যেন আরো কত কথা বাকি রয়ে গেল। কত কথা! কবিতা, শিল্প সাহিত্য থেকে শুরু করে খেলাধুলা, রাজনীতি, ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ বাদ যায় না কিছুই। কথায় কথায় কত রকম গৌরীশঙ্করের পরিচয় পাই, আর বিস্মিত হই। তিনি যে আদ্যোপান্ত একজন কবি এ প্রত্যয় তো গাঢ় হয়েছে অনেকদিনই। কিন্তু পাঠক হিসেবেও তিনি যে অনন্য, অসাধারণ উপলব্ধি হল শীঘ্রই। এই প্রসঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা কথা মনে পড়ছে "লেখক হতে গেলে পাঠক হতে হয়, অনেক পড়তে হয়। না পড়ে কোনো উপায় নেই। প্রচুর পড়ার পরেই নিজস্ব ভাষা আবিষ্কার করা যায়। যদি ভাষা আবিষ্কার করা যায় তাহলেই লেখক হওয়া যায়, নাহলে যায় না। যারা না পড়ে ফাঁকি দিয়ে লেখক হতে চায়,তারা বেশিদূর যেতে পারবে না।" তাঁর পড়ার পরিধি এতটাই বিস্তীর্ণ ছিল বলে গৌরীদা নিজস্ব এক কবিতা ভাষার কাছে পৌঁছতে পেরেছিলেন বলে আমার মনে হয়।

     যে কথা বলছিলাম, পাঠক গৌরীশঙ্কর এবং তাঁর গদ্যভাষার প্রসঙ্গ। তখন স্বরবর্ণ-এ ধারাবাহিকভাবে বেরোচ্ছে আমার ‘ধুলোর সিংহাসন’ উপন্যাস। প্রতিটি পর্ব গৌরীদা পড়েন এবং লিখিত মতামত দেন। ব্লগে। কখনো-বা হোয়াটসঅ্যাপে। ‘দারুণ’ ‘সুন্দর’ ‘অসামান্য’ ‘অপূর্ব’ জাতীয় ফেসবুকীয় পিঠচাপড়ানি নয়, সেইসব নাতিদীর্ঘ মন্তব্য থেকে আবিষ্কার করি এক মনস্ক পাঠক এবং গদ্যশিল্পী গৌরীশঙ্করকে। এবং প্রায় প্রতিদিনই রাতে আমার ছাত্র পড়ানো শেষ হলে বেজে ওঠে গৌরীদার ফোন। দীর্ঘক্ষণ চলে উপন্যাসের চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ। বলতে দ্বিধা নেই, কখনো কখনো তাঁর যুক্তি আমি মেনে নিই। এবং সেই মতো উপন্যাসের গতি বদলায়।

   এরপর দুটো ঘটনা ঘটল। উপন্যাসের অন্তিম পর্বে ব্যবহার করব বলে একটা কবিতার কোটেশন খুঁজছি অনেকদিন ধরে, যা উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহকে ভিন্নমাত্রায় উত্তরণ ঘটাবে। হঠাৎই একদিন নজরে এল গৌরীদার লেখা একটি সনেট— বাল গোপাল । লুফে নিলাম। অনুমতি প্রয়োজন। ফোন করে বলতেই অনুমতি তো দিলেনই আর তাঁর মনের আনন্দ-উচ্ছ্বাসও চাপা রাখতে পারলেন না, পরিহাসছলেই যেন বলে উঠলেন ‘এরপর আমি তো বিখ্যাত কবি হয়ে যাব দেবাশিস ’। আমার মতো অনামী লেখকের লেখায় গৌরীদার কবিতা থাকলে তিনি যে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যাবেন, এটা নেহাত কথার কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তা হলেও সেই কথার মধ্যে আনন্দের অভিব্যক্তি কিছু কম ছিল না।

      অনেকে বলেন প্রবল ছন্দাসক্তি গৌরীশঙ্করের কবিতার ক্ষতি করেছে। কথাটা হয়তো আংশিক ঠিক। মাঝে মাঝে তিনি বলতেন, জানো, ছন্দের ঘোরের মধ্য থেকে কিছুতেই বেরোতে পারছি না।

      A poet is a nightingale, who sits in darkness and sings to cheer its own solitude with sweet sounds. ইংরেজ কবি শেলির মতো তাই কি কবি গৌরীশঙ্কর দে লিখতে পারলেন—

       শব্দের ভিতর অরণ্যের, ঘোরানো সিঁড়ির 

                   অতল জলের 

                         আহ্বান আছে।

      শব্দের ভিতর অতলান্ত জলের আহ্বান তিনি শুনেছিলেন, তাই তাঁর কবিতায় শব্দ, ছন্দের ঝংকার এমন নিপুণ বেজেছে। কী অসাধারণ দক্ষতায় তিনি একের পর এক সনেট রচনা করেছেন— পেত্রার্কীয়, শেক্সপিয়ারিয়ান এবং ফরাসি তিন ধরনেরই । মনে পড়ে, স্বরবর্ণ-এর প্রথম সংখ্যাগুলোতে প্রত্যেক কবি সম্পর্কে পঠিত কবিতার উপর নির্ভর করে আমি সেই কবির কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার চেষ্টা করতাম। তখনো আমি গৌরীদার কোনো কাব্যগ্রন্থ পড়িনি। ইতস্তত কিছু কবিতা ও কবিতা-বিষয়ক গদ্য পড়েছি মাত্র। তবু, গৌরীদার পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছিলাম—

      গৌরীশঙ্কর দে বাংলা কবিতায় একটি পরিচিত নাম। ছন্দকুশলী এই কবি প্রতিনিয়ত আমাদের কাব্যপিপাসা পরিতৃপ্ত করে চলেছেন। গৌরীদার নির্বাচিত কবিতা পড়ার পর আজ মনে হয়, সেদিন খুব একটা ভুল লিখিনি। 

     জীবন সম্পর্কে তার উপলব্ধি আমাকে বিস্মিত করে। ‘এক আশির বাদকের পত্রলেখা’ কবিতায় তিনি লিখছেন—

     সে জীবনই এ জীবন---- মানবজীবন, 

     গভীর নিবৃত্তি থেকে প্রবৃত্তি, প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্তির দিকে

     বহমান।           

 

    জীবনের প্রবহমান স্রোত থেকে সেই আমার চেনা গৌরীদা আজ কোথায় হারিয়ে গেল! কোনোদিন আর তাঁর সঙ্গে কথা হবে না, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আটটা-সাড়ে আটটায় ছাত্র পড়ানো শেষ হলে কোনো কোনো দিন মনে পড়ে, এই সময়টাতেই গৌরীদা ফোন করতেন। সেই ফোনটা আর কোনোদিন আসবে না...




***********************************************


দেবদাস রজক

 




শব্দের ভেতর বিরল এক বালক। কবি গৌরীশঙ্কর দে


দেবদাস রজক 


‘আমি যাই

বালুকাবেলায় ঝিনুক কুড়াতে কুড়াতে  

স্বপ্নের শেষ প্রান্তে,  

যেখানে শব্দেরা আর কথা বলে না,  

শুধু নিঃশব্দে ভেসে ওঠে  

একটি মৃত পাখির ডানা।


গতিপথ বেগতিক,  

কারণ পথ নিজেই নিজেকে অস্বীকার করে—  

আমি হাঁটি,  

একটি অদৃশ্য সেতুর উপর দিয়ে  

যার নিচে মৃত্যু দাঁড়িয়ে,  

কিন্তু সে আর মৃত্যুর মতো নয়,  

সে যেন এক পুরাতন আয়না  

যেখানে আমার মুখ নেই।‘ ( স্বপ্নের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মৃত্যু, ১৮/ ০৯/২০২৫, ফেসবুক)


কবির মৃত্যুর মাত্র চারমাস পূর্বে লেখা এই কবিতাটি। নিজের সম্পর্কে কী অমোঘ সত্য কথাটি বলে গেলেন কবিতায়। এই কারণেই বুঝি কবিদের বলা হয়ে থাকে অন্তর্যামী! গৌরীশঙ্কর দে আসলে সেই অন্তর্যামীময়-কবি। আমরা যারা শ্রদ্ধেয় কবি গৌরীশঙ্কর দে’র কবিতা পড়ি বা পড়েছি তারা জানি, কবি মূলত ছন্দ আর শব্দের আশ্চর্য গলিপথ দিয়ে তৈরি করেন কবিতার মোহজাল এবং পরাবাস্তবতা। আমরা সেই অতীন্দ্রিয় মোহজাল ভেদ করতে করতে কবিতার অন্তর্গহনে পৌঁছে যাই, সেখানে দাঁড়িয়ে নির্বাক পৃথিবীর আরও এক সত্তাকে দেখে স্তম্ভিত হই। একটি কবিতা দিয়ে শুরু করা যাক,

‘একটি অন্ধ চশমা,  

যার কাচে প্রতিফলিত হয়  

এক মধ্যচল্লিশের অনুপস্থিতি।


একটি বয়সহীন রেখা,  

যা কামনার ঘূর্ণিতে  

নিজেকে ছিন্ন করে।


তার ছায়া—  

একটি নিষিদ্ধ প্রতীক,  

যা জলের উপর আঁকা  

কিন্তু কখনো ভেজে না।


আমি—  

একটি অসম প্রেমের ঘ্রাণ,  

যা শব্দহীন,  

তবু প্রতিদিন উচ্চারিত।


একটি কবিতা,  

যা লেখা হয়নি,  

তবু প্রতিটি পাঠক  

তাকে অনুভব করে  

নিজের ভিতর।‘ (শূন্যের ভিতর এক অনুপস্থিতি হাঁটে)

  অসামান্য একটি কবিতা, শূন্যের ভিতর এক অনুপস্থিতি হেঁটে যায়, অনন্তপথ ধরে, কবিতার শব্দের ভেতর গভীর আন্তরিকতা না থাকলে এমন লেখা সত্যিই অসম্ভব। তাঁর শব্দের দক্ষতা আমাকে অবাক করেছে বারবার।

     আমি ব্যক্তিগতভাবে কবি ‘গৌরীশঙ্কর দে’কে চিনেছি, দেখেছি। এমন সরল মনের মানুষ সত্যিই আজকের পৃথিবীতে বিরল। কবিতাকে আপাদমস্তক আকন্ঠ করেছিলেন, মৃত্যুর শেষদিন পর্যন্ত বাংলা কবিতাকেই আঁকড়ে বাঁচতে চেয়েছেন।  আমার সঙ্গে রাতের পর রাতে বাংলা কবিতার হালহকিকত নিয়ে কথা হতো, আমার ‘দেশপোড়া গন্ধ’ কবিতার বইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন ‘কলমে কারুকৃতি’ পত্রিকায়। সমগ্র আলোচনাটি  বাই-ফোনে শুনিয়েছিলেন।  দরাজ কণ্ঠ, অমায়িক গুরুগম্ভীর ও ভারি গলা। অবশ্যই মদ্যপান করতেন, তা শুধুমাত্র বাংলা কবিতার ভিতর আজন্ম ডুবে থাকার জন্যই। পিতার মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করে ছিলেন ভীষণ। গুরুগম্ভীর সেই মানুষটির মধ্যে আমি সহজেই খুঁজে পেয়েছিলাম বিরল এক বালককে, এত নিষ্পাপ, এত সরলতা, এত শিশুসুলভ আর কোনও কবির মধ্যে সম্প্রতি দেখেছি বলে মনে হয় না। 

প্রসঙ্গত-ই বলতে হয় কবি ‘গৌরীশঙ্কর দে’র শেষ প্রকাশিত কবিতা ‘সান ইসিদ্রোর বারান্দা’, যা তিনি আমারই সম্পাদিত পত্রিকা ‘বারান্দা’র (আরেক সম্পাদক কৌশিক বড়াল) বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য পাঠিয়ে রেখেছিলেন আগেই। সেই কবিতাটির দুটি স্তবক তুলে ধরা হল,

‘কলম তাঁর ভাঙা তরী, ভেসে চলে নদীর শিরায়। 

তিনি ছুঁয়ে দেন হাতের আলো, শব্দ ফোটে রক্তের মায়ায়। 

সান ইসিদ্রোর পাথরে নাম, অচেনা, তবু চেনা ছায়া। 

তাঁর পায়ের ধ্বনি আয়নায়, মাটি ছোঁয় না, ভাসে মায়া।


তিনি চলে গেলে তারা পড়ে, স্বপ্নের শেষে জন্মায় ধ্বংস। 

বারান্দায় রয়ে যায় শব্দ, তাঁর হাসির শেষ অপেক্ষা। 

বাতাসে ভাসে তাঁর কথা, আলোর গানে মেশে তাঁর নাম। 

সান ইসিদ্রোর নিঃশ্বাসে, কবিতায় জেগে ওঠে অনন্ত ধাম।‘


মনে হয়েছে কবিতাটি বাংলা কবিতাকেই উৎসর্গ করে লেখা, সান ইসিদ্রোর নিঃশ্বাসে কবিতা যেন সাধকের মতোই জেগে আছে অনন্তকাল ধরে।

              কয়েকদিন আগেই পড়ে শেষ করলাম কবি গৌরীশঙ্কর দে’র কাব্যগ্রন্থ ‘কোম্পানির কাগজপত্তর’। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৫ কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায়। ‘পাটাতন প্রকাশনা’ থেকে প্রকাশিত তিন ফর্মার মূলত সনেটগুচ্ছ এই বই। সনেটের তিন ধরণের রীতি পেত্রার্কীয়, শেক্সপিয়ারিয়ান এবং ফরাসি সনেট এই বইয়ে ব্যবহৃত হয়েছে, রয়েছে মোট ৩০টি কবিতা। এই কাব্যগ্রন্থের কিছু কিছু কবিতা বিশ্লেষণ করে দেখব শব্দের অনবদ্য ব্যবহারগুলি। যেমন ‘প্রবাসের পাতা ১’ কবিতার দুটি লাইন-

‘মদ, শূন্য পাত্রে, আর কিছুদিন পরে ঘরে ফিরে, 

যাব তোর মহাদেশ থেকে স্বপ্নের স্খলিত নীড়ে।‘

পার্থিব থেকে অপার্থিব সত্তার দিকে যাত্রা। ব্যথাহীন আকাশে ওড়ে ভাঙা ভাঙা ট্যাম্বুরিন। রক্ত মাংসের শরীর থেকে অনন্তে যাওয়াআসা।


অথবা


‘প্রবাসের পাতা ২’ কবি বললেন-

‘মেশিনের পাশে শুয়ে রয়েছে মেশিন। মেশিনে মেশিনে রোদ-বৃষ্টি বিনিময়

চলে কিছুক্ষণ, পরে প্রচন্ড প্রণয় 

জন্ম দেয় এইদেশে প্রজন্ম নবীন।‘


কিম্বা 

‘জাহাজ, মাস্তুল আর মাস্তুলের শীর্ষে ছায়াপাখি। 

আঙুলে রক্তের দাগ কী নৃশংস এই হারাকিরি, 

যেইসব না থাকলে আজ সর্ব প্রকাশ বিচ্ছিরি, 

বাবুইপাখির ঘরে কল্পনার গোবরে জোনাকি।‘ ( প্রবাসের পাতা ৯)


আবার ‘বায়ু’ কবিতায় কবি বললেন ‘মৃতের যন্ত্রণা জীবিতের চেয়ে ঢের বেশি বলে মনে হয়।‘ এমন বধির সময়, লোলুপ জিহ্বা মেলে থাকে গোধূলির নগ্ন হিমেল বাতাসে...! অন্ধ সমাজের বুকে ‘শিউলি ফুল শিশিরে বিব্রত’! অনবদ্য রূপকের ব্যবহার। কবি গৌরীশঙ্কর অলংকারকে বিচিত্র আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন-

‘ঘনিষ্ঠ আলোয় দেখি চরাচর জুড়ে, কাঠামো রয়েছে পড়ে মূর্তি ধুয়ে গেছে। রাঁদার চিবুক ভেঙে গিয়েছে কুমুড়ে পোকার প্রাণান্তকর প্রয়াস রয়েছে’


অথবা

‘পথে হেঁটে যায় ঘড়ি, কাঁখে মহাদেশ, কখন গিয়েছ চলে সঠিক জানিনা। ট্রেন না ট্রামের নীচে ঝাঁপ দিয়ে শেষ চিহ্ন টেনে চলে গেছে অ্যানা কারেনিনা’

(এলিজি জীবনানন্দ দাশ)


পথে হেঁটে যায় ‘ঘড়ি’ একটা অনন্ত সময়, আমাদের আশ্চর্য কবি জীবনানন্দ যেন সময়ের দাবি মেনে হেঁটে চলেছেন জীবনের পথে, কাঁখে মহাদেশ। অপূর্ব এক সমাসোক্তি অলংকারের উদাহরণ।

কবির কলমে উঠে এসেছে ক্ষতবিক্ষত সময়, দগদগে ঘা আমাদের চেতনাকে হাতুড়ির ঘা মারে। ‘অকালবোধন’ কবিতায় রক্ত ধরা পড়ল-

‘মায়ের হাতে ব্রহ্মাণ্ড মায়ের হাতে সব আমার হাতে নীল গোধূলি নির্যাতিতার শব। 

মা’ই অভয়া, তিলোত্তমা দেখবি এবার পুজোয়, 

কীভাবে মা শোলের কাঁটা জুতোর নীচে লুকোয়’


‘আর্কিমিডিসের মৃত্যু’ কবিতার কিছু কিছু লাইন আমাকে মুগ্ধ করেছে-


‘ধাক্কা খেয়ে নিহত ফুসফুস রমা মন্ডলের কণ্ঠ ছুঁতে গিয়ে চিরে দিচ্ছে 

যখন পাঁজর, মেঘে মেঘে একলা পাগল তখন আপনমনে হাসছে...’


অনেক কবিতাতেই দ্রোহকালের চিহ্ন বহন করে এনেছেন কবি গৌরীশঙ্কর, তেমনি একটি কবিতা ‘বিসর্জন’-


‘চীৎকার... অদূরবর্তী ধ্বনি, ডপলার ক্রিয়া। প্রিয়া প্রিয়া বলে যে সুড়ঙ্গ খোড়া হয়েছিল সেই কালে তার জ্বালাপোড়া দিয়ে এই তরঙ্গ সাজানো, কলকাতার’


খেলা শেষে পড়ে থাকবে চিল আর চন্দ্রবোড়া, ট্রামলাইনের শেষে দগ্ধ পিচ মোড়া নগ্ন দেহ, ছেঁড়া শাড়ি। এ এক বীভৎস চিত্র অথচ সুনিপুণ ৮+৬ মাত্রায় সনেটের অবয়বে আমাদের আকৃষ্ট করে নিয়ে যায় শেষ পর্যন্ত।

              কাব্যগ্রন্থে একটি ভূমিকা লিখেছেন ‘কলমে কারুকৃতি’ পত্রিকার সম্পাদক সোমা দত্ত। যথার্থ আলোচনা করেছিলেন। ঝকঝকে সুন্দর এই বই পাঠ করলে অবশ্যই পাঠক সমৃদ্ধ হবেন। এই বই আশা রাখব ভবিষ্যতে এক সময়ের দলিল হয়ে থাকবে। নিচে কবি গৌরীশঙ্কর দে সম্পর্কে কিছু তধ্য দিয়ে আলোচনাটি শেষ করব।

             কবির জন্ম ১৯৬০ সালের ২২ নভেম্বর, মৃত্যু ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি। জন্মস্থান হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে। শেষদি পর্যন্ত তাঁর বাসস্থান ছিল কলকাতায়। পেশা অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক (AGM)। আটের দশকের প্রথমভাগ থেকে লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। বালুরঘাটের ‘মধুপর্ণী’, ‘স্পন্দন’ প্রভৃতি পত্রিকা,  এছাড়া  ‘দেশ’ পত্রিকা ও অন্যান্য অনেক লিটল ম্যাগাজিনেও নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হয়েছে। পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। প্রথম কবিতাগ্রন্থ “অশ্রুপ্রপাতের নিচে”(১৯৯০), তার পর একে একে “স্খলিত স্বপ্নের নীড়”(১৯৯৪), “ভাষামাতৃক্রোড়”(১৯৯৭), “আদিসপ্তগ্রাম”(২০০৪), “অনৈশ্বর্য”(২০১৮), “নির্বাচিত কবিতা”(২০১৯), “আমার নিভৃতাবাস”(২০২২), ২০২৫ সালে পাটাতন প্রকাশনা থেকে তাঁর শেষ কবিতার বই   ‘কোম্পানির কাগজপত্তর’  প্রকাশিত হয়। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ‘উত্তরপক্ষ’ কবিতা পত্রিকার পক্ষ থেকে পেয়েছেন ‘মাধুরী অধিকারী ‘জীবনকৃতি’ সম্মাননা। কবিতার পাশাপাশি কিছু কাব্যনাটক, প্রবন্ধ, গ্রন্থসমালোচনাও লিখে গিয়েছেন।




********************************************


নিমাই জানা





কোয়ান্টাম মেথোডিক্যাল শ্মশান ,পরাবিদ্যা ,পারমানবিক অস্ত্রের কবিতা, যুদ্ধাস্ত্রের ইঙ্গিত নীল নিসর্গের চিন্তাশীল কবি গৌরীশংকর দে 


নিমাই জানা 


অলীক জন্ম নক্ষত্রের ভেতর মহাকালের অতিকল্পকালীন গাণ্ডীব হাতে নিয়ে অদৃশ্য জগতের এক মহাভৈরবীয় কথা লিখে যাওয়া পারলৌকিক অন্তরীক্ষের গিটার হাতে নিয়ে নিজেই নিজের সুচিত্রিত আগুনে জ্বেলে দেয় মহাপুরুষের অতৃপ্ত সঙ্গম মুহূর্ত, যার মহা ক্ষুরধার লেখনীতে কোয়ান্টামের ক্যাসপিড নীল নির্যাস বের করে অতি লিটমাসের ঘনত্ববিহীন প্রাগৈতিহাসিক সমর্পণের অন্তরীক্ষে বসে সুনিপুণভাবে চিত্রাংকন করতে পারেন তিনি আর কেউ নন তিনি পদার্থবিজ্ঞানের একনিষ্ঠ পারমাণবিক অন্তরীক্ষে হাঁটতে থাকা অজস্র মহার্ঘ পুরুষের হিরন্ময় দ্যুতি গুলো ছড়িয়ে পড়ছে আলোকিত ঝর্ণাধারার মতো তিনি কবি গৌরীশংকর দে । যিনি কবিতার অক্ষরকে বিভিন্ন মোটিভ বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল বিভিন্ন ডাইমেনশনে পরীক্ষামূলক সচেতনভাবে বিভিন্ন খাতে বইতে দিয়েছেন যেহেতু তিনি পদার্থ বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ অন্তঃসলিলায় সম্মোহিত হয়ে আছেন পেশাগতভাবে তাই তিনি পারমানবিক কোয়ান্টামের কুঠুরিতে স্নান করে উঠে আসা ঘর্মাক্ত লোমকূপে বয়ে যাওয়া শোণিত শিরাপথে তিনি বারবার আন্দোলিত হয়েছেন ব্রাউনিয়ান মোশানের মতো তাই তার প্রতিটি কবিতার অক্ষর আলাদা পৃথিবীর দিকে বয়ে যায় প্রতিটি কবিতার ভিতরে মহা দীর্ঘ চেতনার ভাব মহাজগতের দিকে নিয়ে যায় রজস্বলার গ্ৰহ থেকে বেরিয়ে জাইগোটিক এসেন্স অবধি তিনি কোয়ান্টামের তারা উপগ্রহ নক্ষত্র কক্ষপথ চাঁদ মহীয়সী মিল্ক অফ গ্যালাক্সির ফটো নিউট্রন হিলিয়াম সূর্যের কঙ্কাল ভৌতিক অস্তিত্বের আয়তন লাভা অস্তিত্বের ভূমিকা ক্ষেপণাস্ত্র নীলগিরির শ্মশান শৈলোৎক্ষেপ প্রদাহ ব্রহ্মাস্ত্রের ঢেউ রহস্যের অগ্নিবর্ণ পুরাণ মহাপুরাণ শিব পুরাণ উপনিষদ নৈঃশব্দের অদৃশ্য আকাশযাপন সমগ্র মস্তিষ্কে হিউমারের হেমারিং , "শংকর আকন্ঠ পান করলে নীল বিচ্যুতির বিষ/ গৌরী রণে রক্তবর্ণা বিদ্ধ হলো আঁধার মহিষ"

কবিতায় পুরাণের ইঙ্গিত কবিতায় শিব নীল বিচ্যুতের বিষপান করে এ পৃথিবীকে শস্য শ্যামলা সুন্দর মহার্ঘ্য অনন্ত গ্রহে পরিণত করেছে ঠিক তেমনি রক্তবর্ণে গৌরী সজ্জিত হয়ে চতুর্দিকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পাপের আচরণকারী তৃতীয় নয়নের অধিষ্ঠাত্রী দেবী তার সুনিপুণ নৃত্যের মুদ্রা কলার সাহায্যে তিনি প্রহার করছেন এ পৃথিবীর সমগ্র পাপাচার অপরাধীদের স্বৈরাচারীদের বলাৎকারীকে তিনি ধ্বংস করে দেবেন এ পাপের পুরী ছারখার করে দেবেন অগ্নি সংযোগ করবেন আবার পরক্ষণে তিনি রোপন করবেন পবিত্র অন্তঃসত্বার নীল শব্দের চন্দন বৃক্ষ। তপস্যার বৃক্ষ জ্ঞানবৃক্ষ , আবার কখনো কবি বলেন ""বৃক্ষলতার ফাঁকে / কখন যেন ভুলে গেলাম জীবন যন্ত্রণাকে "" অসাধারণ জীবনবেদ উপনিষদের বাক্যাংশ প্রক্ষেপণ করে যাচ্ছেন তার বিভিন্ন কবিতার ভিতর তিনি আসলে জ্ঞানযোগী নিস্তব্ধ নীরবে জ্ঞান পাঠ করেন তিনি সান্দীপনী মুনির মতো অনন্ত জ্ঞান আহরণের বৃক্ষলতার এক সংসার এমনই যৌনচেতনা যে সমগ্র জীবন যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে দেয়। যেখানে কোন পাপ নেই পুণ্যের নীলকন্ঠ সাপ তৃতীয় রশ্মি মন্ডল ভেদ করে নেমে আসেন পরশমনির পার্থিব স্ফটিক দণ্ড নিয়ে 

কবি কখনো বলেন ""নিঃশব্দের মাঝে প্রেমের রং / অদৃশ্য আকাশে ভাসে / অন্তহীন স্বপ্নে দুরাভাষে/ অজানা গন্তব্যে ফিরে আসে"" 

কবি সেই প্রেমের কথা বলেছেন যে প্রেমে মানুষ বন্ধন মোহ কামনা বাসনা সমগ্র জরার ভয় মৃত্যু সবকিছু উপেক্ষা করে অনন্ত শীর্ষে বসবাস করতে পারেন সব ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারেন সবকিছু ফুৎকারে উড়িয়ে অনন্ত জীবাত্মা পরমাত্মার সাথে অনন্ত শরীর দেহের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় যে অদৃশ্য অন্তহীন স্বপ্নে বারবার উচ্চকিত আলোর মেরুজ্যোতি বিস্তার করে যার কোন গন্তব্য নেই যার কোন অস্তিত্ব নেই যার কোন সীমা নেই যার কোন পরিসীমা নেই তিনি নিঃশব্দের মাঝে পরম প্রেমময় সেজে বসে আছেন অনিত্য কাল ধরে সেই প্রেম সেই পরমাত্মা নীল নির্জন অভয়ারণ্য যাকে নিয়ে গেছেন নিঃশব্দের অমরাবতী বরাবর , 

ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্যা মিস্ট কবিতায় তিনি সেই অতীত লুপ্তপ্রায় ঝিনুকের কথা বলেছেন যে ঝিনুক নিজস্ব রেতঃকাঠের ভেতর মুখ ঢুকিয়ে লুব্ধকের মতো যমজ অন্ধকারে নীল চুম্বকের শব্দ নিয়ে শব্দেত্তর তরঙ্গের জলকেলির আঘাতে অতি নির্ণেয়মান কুয়াশার দিকে নিয়ে যায় কুয়াশা বড় প্রাচীন দুর্ভেদ্য অথচ আর্যাবর্তের মতো দক্ষিণায়ন সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্রের ঔষধি লতার মতো ভেষজ অনুপ্রবেশ নিয়ে পাখনাময় জেগে থাকে কক্ষপথ বিহীন অন্তরীক্ষের ভেতর , এখানে নিশি জাগরনের এক ভয়ানক বিরজাক্ষেত্র জেগে ওঠে কবিতা সূক্ষ্ম পদার্থবিজ্ঞানের ব্ল্যাক হোল, কৃষ্ণগহ্বর জায়মান তারা চুম্বকের শব্দ মৃত্যুর কুয়াশা ট্রাম্পেট এঞ্জেলোপোউলুস ল্যান্ডস্কেপের মতো শব্দগুলো সূচতুর ভাবে তিনি ব্যবহার করেছেন কবিতার যান্ত্রিকতাকে কবিতার মহানুভবতাকে আরো ঊর্ধ্বমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার জন্য, নিয়ে গেছেন পরীক্ষা মূলক নিবিষ্ট কোয়ান্টাম হাসপাতালেয দিকে সেখানেই কবিতার অক্ষর শব্দ কবিতার অনুভব অনন্য মাত্রায় মহাভার্গবের মতো দক্ষিণমুখী যাত্রা সেরে সূর্য গমনের পেন্ডুলাম দোলাচ্ছে । 

কবি বলেন ""তোমার অনন্ত মুখ গহ্বরের কৃষ্ণ গর্ভ থেকে / উৎক্ষিপ্ত হয়ে সাজাচ্ছে নিশ্চিত আকাশ / জন্ম মৃত্যুর কুয়াশা খসে পড়ছে খসছে রহস্যমালা/ মায়াবী পর্দার আড়ালে বাজছে ট্রাম্পেট একটানা অ্যাঞ্জেলপউলুস "" এখানে অনন্ত গর্ভের থেকে উৎক্ষিপ্ত লালা লাভার কথা বলা হয়েছে যেখানে কৃষ্ণ গহ্বরের সাইক্লোট্রন বিগ ব্যাং থিওরির মৈথুন অন্তরীক্ষের নিউট্রন কণা ভয়ানক ফোটন দাঁতের মতো সূর্যের কঙ্কাল পোড়াচ্ছে সারারাত জুড়ে , মৃত্যু জেগে থাকে ঝিনুকের ভেতর অনন্ত মৃত্যুর প্রহরের তাণ্ডব নিয়ে সারারাত অতীতের ম্রিয়মান জাগরণ চলছে , সুষুম্না মন্ডলে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে নিদ্রার মতো মহাভৈরবী দাঁত , যে সারারাত নিস্তব্ধ ছদ্মবেশে মাথার ভিতরে ঘুরপাক খেতে খেতে মহাপ্রলয়ে ছিঁড়ে ফেলে অনন্ত সজ্জার যুদ্ধ ভৈরবীর যুদ্ধের দামামা , প্রতিটি কবিতায় কবি গৌরীশংক দের এক অনন্ত যাত্রা রয়েছে যা মায়াময় কুয়াশা ভেদ করে এক অনন্ত বিন্দু ছুঁয়ে ফেলার করুণ ও কাতর আর্তি ও তীব্র জিজ্ঞাসাবাদ রয়েছে জল তরঙ্গের কাছে তীব্র জিজ্ঞাসা সমস্ত আঘাতের কাছে সমস্ত জিজ্ঞাসা এ প্রাণময় ঘুমের কাছে সমস্ত জিজ্ঞাসা রহস্যময়ের কাছে সমস্ত জিজ্ঞাসা অধাতব পর্দার কাছে যার আড়ালে থেকে সমস্ত সৃষ্টি তত্ত্বের নীল নীহারিকা ধূমকেতুর মতো ফুলে উঠবে আর আমাদের শরীরে মৃততান্ত্রিক এক পেন্ডুলাম বাজাবে । কবি গৌরীশংকর দে আমাদের কাছে এক আলাদা প্রাপ্তি যিনি প্রতিটি অক্ষরে এক অনন্ত জিজ্ঞাসা রেখে যান , প্রতিটি জিজ্ঞাসা বোধহয় সেই একটি ফিজিওলজিক্যাল পার্টিক্যালের কাছে যার সমগ্র অঙ্গাণু জুড়ে স্পিরিচুয়াল বিষাদের নীল মহিষগুলো দাগ দিয়েছিলে নীলদর্পণের সমগ্রশীলতার কাঠে কবি মৃত্যুকে এলাচ দিয়ে পুষেছেন কবি তাইতো তিনি বলতে পারেন ""চিন্তা করো অবস্থাটা মৎস্যগন্ধা নারী /কোমর কোথায় ভ্রমর কালো রং বাহারী শাড়ি / জয় করে তবু ভয় কেন তোর যায়না চুপ করো/ এমন গোপন রঙিন আয়না বলছে ভেঙে পড়ো "" এটাই এক মস্তিষ্কের পিটুইটারির খেলা এটাই একটি সজীবতার অনঙ্গতার খেলা নিশাচর শরীরের ভেতর বোধহয় লোমশ কাঠের পোকাগুলো কিলবিল করবে আর সমগ্র শ্মশানের কথা শোনাবেন কবি গৌরীশংকর দে'কে যিনি মৃত্যুর শরীরে কাঁটার ঝোপ লাগিয়ে রেখেছেন মৃত্যুর শরীরে , কুয়াশার শেকল পরিয়ে দিয়েছেন। তাই তিনি চোখের নিমেষে এতগুলো কথা অকপটে বলতে পারেন।

ভয়ানক এক বাস্তববাদী অতি চিন্তাশীল কবিকে সাম্প্রতিক সময় আমরা হারিয়েছি কিন্তু কবির কবিতার অক্ষর তীব্রতম কোয়ান্টামের ধারালো তরোয়াল নিয়ে কেটে যাচ্ছে এক একটা যুদ্ধাস্ত্রের ঘোড়া । 



#########################################