বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

গল্প * দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়




বিবেক

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়


আর্থিক বছরের শেষ মানেই একটা অদৃশ্য পাথর যেন মাথায় চেপে যায়।দম ফেলার ফুরসত থাকে না তখন।তার ওপর নতুন ম্যানিজিং ডিরেক্টরের ফরমান,কামাই এখন নৈব নৈব চ।অন্যথায় কড়া পদক্ষেপ। প্রতিদিনের কাজ শেষ করে তবে চেয়ার ছাড়ো।যতো রাত হয় হোক। "ডু ইট নাউ "।পরের দিন যেন নতুন দিন, নতুন কাজ। ফিরতে কদিন খুব দেরিই হচ্ছে  অনন্যর।রাত  এগারো-সাড়ে এগারো হয়ে যাচ্ছে প্রায় দিনই। ফিরে চান সেরে খেতে বসতে বসতে সাড়ে বারোটা বাজছে।মাকে অতোরাত জেগে থাকতে বারণ করে।কে কার কথা শোনে ! সেই মাতৃত্বের অপত্য জারণ। ছেলে না খেয়ে থাকবে আর আমি খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়বো ? এ হয় কখনো ? বেশি জোর করলে জলচোখে বলে উঠবে : " তুই মা হলে বুঝতিস"! এর পর আর কথা চলে না।

বাড়িতে মাকে নিয়ে অনন্য বেশ ভালোই আছে। তবে বাবার অভাব বুঝতে পারে সব সময়।অনন্যর অফিসের কাজের চাপের জন্য বাজার দোকান বাবাই করতো। মাঝে মাঝে মা সঙ্গ দিতো। তাছাড়া ছুটির দিনগুলোয় অনন্যর বেশির ভাগ সময় কাটে বিছানায়। সারাদিন যেন মরার মতো পড়ে থাকে। মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় চায়ের আড্ডায় যায়। তবে তাও এক ঘন্টার বেশি নয়। শান্তা মাসির বাড়ি যাবার তাড়া থাকে। শান্তা মাসি সারাদিন মায়ের সাথেই থাকে। সন্ধ্যা বেলা বাড়ি যায়।মাসির বাড়ি দমদম ইন্দিরা কলোনি।মাসিকে রাতে থাকার কথাও বলেছিল অনন্য মায়ের জন্য। কিন্তু নাতির টান।বাড়ি ফিরবেই।একটু দেরি হলেই ছটফট করে।বলে "নাতি, ঠাম্মি ফিরতে দেরি করলেই কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। " রাতে ঠাম্মিকে জড়িয়ে ধরে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমায় ও। শান্তা মাসির এটাই যেন এক সুখ ! মা বোঝে।তাই মাঝে মাঝে গাড়ি করেও পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করে মা। অনন্য কিছু বলে না।একটু তেল পুড়লে যদি একটা মানুষ অতোটা সুখ পায় তাহলে তা অনন্যর ভালোই লাগে। ছেলেবেলায় ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরে ও তো শুয়ে শুয়ে গল্প শুনতো লালকমল নীলকমলের। ঠাকুমার জন্য তখন ওর বুকে মনখারাপের কালো মেঘ ! কান্না পায় খুব তখন। কাঁদতে পারে না। বাবার কথা মনে পড়ে।বাবা বলতেন :" পুরুষ মানুষ কাঁদতে পারে না প্রকাশ্যে। ওদের কান্না লুকিয়ে অন্তরালে ভেতরে ভেতরে"।যতো বয়স বাড়ছে ও বুঝতে পারে বাবার কথার অর্থ।

মা অনন্যর বিয়ের জন্য শুরুর দিকে জেদাজেদি করতো। আগে এ বিষয় নিয়ে রাগ দেখাতো খুব। মায়ের চিন্তা, মা মরে গেলে দেখবে কে ওকে? হেসে উঠতো অনন্য।মাসিকে দিয়েও বলাতো বিয়ের কথা।মাসি কখন যেন এ বাড়িতে ওর স্বঘোষিত অভিভাবক হয়ে উঠেছে।অনন্য চারিদিকে ঘটতে থাকা ঘটনার কথা বলে ওদের থামাতো। বিয়ের পর যদি বউ মায়ের সাথে থাকতে না চায়।" এখন তো প্রদর্শন প্রভাব চারিদিকে।"বন্ধু নিজের ফ্ল্যাটে কেমন স্বাধীন থাকে ।অতএব আমিও ...!" রোজ ঝগড়া করতে পারবে না ও।মাকে ছেড়ে থাকার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না অনন্য।বাবা মারা যাবার সময় ওর হাত ধরে বলেছিল, মাকে দেখিস।ছেলের এহেন যুক্তিতে মাও যেন দিশেহারা হয়ে পড়ে।অনন্য জানে, এটা ইয়র্কার।মা বোল্ড হবেই। মাসতুতো দাদা  মাসিকে বউবাজারের বাড়িতে একা রেখে বউকে নিয়ে টালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে থাকে। অনন্যর এসব কথায় মাসির ছবি ভেসে ওঠে মায়ের মনে। কষ্ট পায় খুব মা মাসির কষ্টে। মাসিকে নিজের কাছে এনে রাখতে চেয়েছিল মা।অনন্যও রাজি ছিল। কিন্তু মাসি আসতে চায় নি।অনন্য বোঝে, লজ্জায় কুঁকড়ে থাকে মাসি।যাকে সব দিয়ে বড়ো করে তুললো সেই ছেলেই বৃদ্ধ মাকে ফেলে.....।

   শ্যামবাজার থেকে বাঘা যতীন যাবে অনন্য। প্রতিদিন মেট্রোয় এই সময়েই ট্রেন ধরে।হাজরাদা, কার্তিক,পরেশ,ব্যানাজীদা, নয়ন --জনা দশেকের টিম ওদের। আড্ডা গল্পে বেশ সময় কেটে যায়। ব্যাচেলর বলে অনন্যকে নিয়ে ওরা ঠাট্টা ইয়ার্কি করে বেশি। একদিন অনন্য এক সুন্দরী তরুণীকে বার বার দেখছিল। চোখগুলো যেন চুম্বক মেয়েটার।মেয়েটিও তাকাচ্ছিল আড়চোখে। ব্যানার্জীদার নজরে পড়ে। ডাকাবুকো ব্যানার্জীদা সোজা গিয়ে হাজির মেয়েটির কাছে। স্পষ্ট ভাষায় অনন্যর সমস্ত খবর দিয়ে বলে ওঠে :" ওকে পছন্দ । আপনার বাড়ির ঠিকানা দিন। আপনার মা- বাবার কাছে ওর সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিই তাহলে।"চমকে ওঠে মেয়েটি। মুচকি হেসে সরে যায় ভেতর দিকে।আর কোনদিন ওকে দেখে নি। ব্যানার্জীদা এরকমই। সেই থেকে সুন্দরী মেয়ে দেখলেই ও ইচ্ছা করলেও আর তাকাতে পারে না। ব্যাচেলর অনন্য যেন ওদের খোরাক ! অনন্য বিষয়টাকে গম্ভীর ভাবে নেয় নি কখনো।মজাই লাগে ওর।বোঝে, দিল্লীকা লাড্ডু খাওয়াতে চায় ওকে।তারপর "জয় মা" বলে পাঠা বলি !

 ডানদিকের গেটের কাছে ওরা থাকে। জায়গা পেলে বসে। তবে অধিকাংশ দিনই দাঁড়িয়ে থাকে। খুব ভিড় হয় ট্রেনটায়। চূড়ান্ত ব্যস্ততা অফিস যাত্রীদের এই সময়টায়। অন্যদিনের মতো আজও ওরা দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প মসগুল। রাজনীতি, সিনেমা, খেলা, বাড়ির সমস্যা ---সবই আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসে বারে বারে।আজ কোহলির ব্যাটিং ফর্ম নিয়ে আলোচনা চরমে।হাজরাদার যুক্তি, নতুন বিয়ে করেছে সবে। এনার্জি অন্যদিকে একটু চলে তো যাবেই।" ব্যানার্জীদার সহাস্য মন্তব্য :" ঠিক যুক্তি। তবে মাঠটা বদলে গেছে"! হো হো করে হেসে উঠে ওরা সবাই।এইরকম মন্তব্যে ব্যানার্জীদা লা - জবাব। এতো সহজভাবে কথাগুলো বলে দেয়!

 হঠাৎ আগের গেটটার বাঁদিকে একটা গন্ডগোলের আওয়াজ।কয়েকজন অল্পবয়সী অবাঙালী ছেলে এক বয়স্ক লোকের সাথে তুমুল ঝগড়ায়। একটি ছেলে প্রচন্ড উদ্ধত ভঙ্গীতে।এই মারে, সেই মারে অবস্থা। বৃদ্ধ ভদ্রলোক ছেলেগুলোকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু ওরা শুনতে নারাজ। বৃদ্ধকে গালাগাল দিচ্ছে। আশপাশের দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন মজা দেখছে নীরব দর্শক হয়ে। হঠাৎ সেই ছেলেটির এক ধাক্কায় বৃদ্ধ পড়ে যায় লোকজনের গায়ের ওপর। অনেকক্ষণ ধরে অনন্য দেখছিল দৃশ্যটা। বৃদ্ধকে ধাক্কা দিতেই ও এগিয়ে গেল ওদের দিকে।যে ছেলেটি ধাক্কা দিয়েছিল তার কাঁধটা পিছন থেকে চেপে ধরে ও।ক্যারাটের ব্ল্যাকবেল্ট অনন্য জানে কি করে কায়দা করতে হয় এই সময়ে। ছেলেটি বড়োসড়ো চেহারার অনন্যর এরকম প্রতিক্রিয়ায় একটু চুপসে যায় যেন। নিজেকে ছাড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করতে থাকে। ওদের অন্য দুজন সঙ্গী অনন্যর মুখে ঘুসি চালাতেই অনন্য সজোড়ে মারে ওদের মুখে। ছিটকে পড়ে দুজন। এবার প্রতিপক্ষ শক্তিধর দেখে ওরা পিছোতে থাকে। আশপাশের লোকজন এতোক্ষণ যেন বুঝতে পারে এবার সকলের জাগার প্রয়োজন।কয়েকজন এগিয়ে এসে ওদের ধরে ফেলে। ইতিমধ্যে ব্যানার্জীদারাও এসে দাঁড়িয়েছে ওর পাশে।

বৃদ্ধের দিকে তাকালো অনন্য। চোখ ভর্তি জল।এই বয়সে এসে এরকম ব্যবহার বোধহয় ভাবতেও পারেনি। ছেলেগুলোর উগ্রমূর্তির কারণ জিজ্ঞাসা করতেই আশপাশের কয়েকজন বলে উঠলো :" গেটের মুখটায় দাঁড়িয়ে অসভ্যতামি করছিল। নোংরা ভাষায় কথা বলছিল। উনি একটু ভেতরের দিকে ওদের যেতে বলতেই ওরা চড়াও হলো।অনন্য বৃদ্ধের দিকে তাকাতেই কেমন মায়া হলো। ষাটোর্ধ হবে। ওনার কাঁধে হাত রেখে অনন‌্য স্বভাববিরুদ্ধ গলায় আশপাশের লোকজনের উদ্দ্যেশ্যে চিৎকার করে উঠলো :"ও আপনাদের ঘুম ভেঙ্গেছে তাহলে? জাগুন বন্ধু, এবার একটু জাগুন "!


 


  

     *************************************************************************************        




দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় 


 রয়েল কমপ্লেক্স ,কাঠালবাগান ,উত্তর পাড়া, হুগলী থেকে লিখছেন পেশা: শিক্ষকতা ,নেশা : কলম চারিতা ,সাপলুডো খেলা শব্দ নিয়ে ,অণুগল্প ,ছোট গল্প ,কবিতা, প্রবন্ধে  সুখ-দুঃখ ,হর্ষ-বিষাদ, আড়ি ভাবের অনুভবে থাকা ,জীবনের দুই স্তম্ভ রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দের আদর্শ মনন, যাপন ও শীলনে.. স্বপ্ন: পৃথিবীকে ভালবাসার যৌথ খামার বানানো..দিক চক্রবালে হিরণ্যগর্ভ আলোর খোঁজ ..পাখি ,গাছ আকাশের সাথে মন কি বাত.. সূর্যের নরম আলোয় সুখের আবিরে মানুষের সাথে হোলি খেলা..


অনুবাদ কবিতা * জয়িতা ভট্টাচাৰ্য

 




নাজিম হিকমতের কবিতা

ভাষান্তরঃ জয়িতা ভট্টাচার্য 


নাজিম হিকমত শুধু তুরস্ক নয় বিশ্বের  অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার। জন্ম ১৫ জানুয়ারি ১৯০২ ও মৃত্যু মস্কোয় ৩ জুন ১৯৬৩। বামপন্থী আন্দোলন ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তাঁকে কুড়ি বছর কারাগারে কাটাতে হয়। সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য ৫৬ বছরের জন্য সাজা ঘোষণা করা হয় এই তুর্কি কবির বিরুদ্ধে। তাঁর কবিতা গীতিময়তায় ঋদ্ধ। নাজিম হিকমতকে "রোমান্টিক কম্যুনিস্ট ",কখনও জেলখানার কবি বলা হয়। ১৯৫০ সালে তাঁকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। গত সংখ্যার পর, এখানে আমরা নাজিম হিকমতের আরো কয়েকটি কবিতা পড়ছি, কবি জয়িতা ভট্টাচার্যের অনুবাদে---



আত্মজীবনী

     

আহা,দুপাটি জুতোই  ঝাঁ চকচকে আমার 

এবং অক্ষত আছে  টুপিটা

আমার জামা ১৯২২...

আমার জীবনও ঠিক এই রকম




২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫

        

এখনও পার হইনি অরূপ সাগর

এখনও দেখিনি আমরা

সুন্দরতম দিনটি'

আর সবথেকে মধুর কথাটি,

    এখনও তোমায় বলা বাকি।




ডাক


এশিয়ার সুদূরতম কোণ থেকে ধাববমান  হয়ে

ভূমধ্যসাগরে ঝাঁপ 

ঘোটকির মাথার মতো __

এই আমাদের দেশ 

রক্তাক্ত মণিবন্ধ আর দাঁতে দাঁত চেপে,নগ্ন পায়ে টিঁকে আছি

 রেশমের মতো কার্পেটে মোড়া সবুজ মাটিতে

এই আমাদের স্বর্গ 

এই আমাদের নরক

_____আমাদের মাতৃভূমি।

এই দাসত্ব ঘুচে যাক

ঘুচে যাক গোলামির দিনপাত

বন্ধ হোক মানুষের এই মানুষ বন্দনা

এই আমাদের আহ্বান 

বৃক্ষের মতো একক হোক যাপন

অরণ্যের মতো হোক সৌভাতৃত্ব ___

কতকাল ধরে এই আকাঙ্খা আমাদের।







************************************************************************************************* 




জয়িতা ভট্টাচার্য 

কলকাতা নিবাসী সাহিত্যিক জয়িতা ভট্টাচার্য পেশায় শিক্ষক। অল্প বয়স থেকে লেখালিখি। প্রধানত মানবাধিকার বিষয়ক বুলেটিন ও খবরের কাগজে লিখতেন। প্রথম প্রেম কবিতা। এযাবৎ চারটি কবিতার বই,একটি গল্পের বই ও একটি উপন্যাস প্রকাশিত। লিখেছেন অসংখ্য সংকলনে। এছাড়াও নিয়মিত    প্রবন্ধ, ও অনুবাদ কবিতা লেখেন বৈদ্যুতিন ও মুদ্রিত পত্রিকায়। পেয়েছেন সরকারি ও সাহিত্য গোষ্ঠীর নানা সম্মান।


গুচ্ছ কবিতা * মনোজ বাগ

 



কবিতাগুচ্ছ * মনোজ বাগ 

বিভূতি 


ঠিক ঠিক জানলে আর কেউ বাগাড়ম্বরে যায় না।

অতিকথা , অতিশব্দ শুধুই ভার বাড়ায়, বাড়তি তর্কের ।


ব্রহ্মে চারণ করি ।

আমার জন্ম-জীবন-মৃত্যু, সবই এই ব্রহ্মে। 

অর্থাৎ ঈশ্বরে ।


ঈশ্বরই সবটা জুড়ে আছেন ।

ঈশ্বরই আমার সবটা ।


মুঠো মুঠো মাটি, 

মুঠো ভর্তি সোনা, 

আমার সমস্ত অঙ্গ মাখা ধূল-ময়লায় ।

এই সব ধুলো-ময়লাই আমার সারা দেহের দ্যুতি। 

আমার সমস্ত অঙ্গের বিভূতি ।



আহূতি 


"দ্বিধা দ্বন্দ্বে জ'রে আছ !

রসে বশে হও, সব সয়ে যাবে।"


এই আত্মজ্ঞান, আত্মশুদ্ধি ,

যে খুইয়েছে -- হন্যে হয়ে খুঁজছে ।

যার আছে, নিরন্তর স্নান করছে নিজেই নিজের অগ্নিতে ।


অগ্নি-স্নাত ওই সব মানুষও --

অর্ঘ্যের মতো নিজেকে ধরে দেয় , 

সেই সেই প্রতীকের কাছে --

শাস্ত্রত যা পরমরূপ ।


আপাত একটা সমাজ ব্যবস্থায়,

আপাত বহু সংস্কারের মধ্যে থেকেও 

এর-ম অজস্র আত্মবোধ সম্পন্ন মানুষ 

এই মরজীবনেই  জাগিয়ে রেখেছেন সেই আলো, 

যা আমাদের লোক-ভাবনার অনেক ঊর্দ্ধের।



দ্রষ্টা 


অরণ্য সেজে উঠছে ,

সমাজও। 


অরণ্যকে সাজাচ্ছে প্রকৃতি ।

সমাজকে, মানুষ। 


এই প্রকৃতি ও মানুষ একে অন্যতে ওতোপ্রোত।

একে অন্যের পরিপূরক। 


আমি সাক্ষী!

যত দূর দৃষ্টি যাচ্ছে দেখছি।


ধড়ে প্রাণ থাকলে দেখছি ।

ধড়ে প্রাণ না থাকলে, আমিও 

জড় পদার্থের মতো পড়ে থাকছি ।



আত্ম দর্শন 


তুমি দুঃখ পাও !

আনন্দে উল্লাস করো ।

ধ্যান তন্ময় হয়ে কখনো 

স্থির ও গম্ভীর হয়ে যাও দীর্ঘক্ষণ । 


স্থির দৃষ্টিতে আমি তোমাকে দেখি ।

দেখতে দেখতেই তন্ময় হয়ে যাই ।


তুমিও কী আমার মতো, আমাকে দেখে এ রকম তন্ময় হও !

তুমিও কী আমার মতো স্থির দৃষ্টিতে 

আমাকে দেখো !


অভিনিবেশ জ্ঞানের অন্তরায় ।

অভিনিবেশ জ্ঞানের দরজাও । 


সমস্ত আড়াল-আবডাল ভেদ করে তবুও যত দূর দেখা যায় দেখি ।


সবার, সবটাই জেনে ফেলার বড় ইচ্ছা আমার  ।


জগতের সবটাই নিজের চোখে দেখার,

নিজের কানে শোনার,

নিজে বোঝার ইচ্ছা আমার।



নিস্ক্রোমণ


তল্পিতল্পা নিয়ে কেউ এগিয়ে যাচ্ছে,  

কেউ এক ঠাঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠায় ।


পরিস্থিতি জরিপ করছে আবহ ।

ঘটনার পরম্পরা একের পর এক গেঁথে রাখছে কালচক্র ।


সামগ্রিক ভাবে যা মহাজাগতিক ।

খন্ড খন্ড ভাবে সেটিই জগৎ । 

উদ্ভব আর উৎসর্জন, এ-ই শুধু আছে এর সবটুকু জুড়ে ।


কালক্ষেপের সময় একটু একটু ক'রে পার ক'রে 

গড়িয়ে যাচ্ছি তবু মহানিষ্ক্রোমণে -- 

এখানে আর ফিরে আসা কার্যত অসম্ভব জেনেই ।



******************************************************************

গুচ্ছ কবিতা * রিজভী হাসনাত




কবিতাগুচ্ছ * রিজভী হাসনাত


গবেষণা


পৃথিবীর কোন গবেষণা গার,

কেন বরেণ্য  গবেষক 

চিন্তক,দার্শনিক বা বৈজ্ঞানিক বলতে পারবেনা

কোন পরিসংখ্যান বু্রো দেখাতে পারবেনা 

 অতীত,বর্তমান বা সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে 

তোমার প্রতি আমার ভালবাসা বিলুপ্ত প্রায়

কেউ না......



তোমাকে


তবু আকড়ে ধরি তোমাকে

যেমন করে টিকিটিকি আকড়ে  থাকে দেয়াল,

মাকড়সা তার জাল।




মিস! 


একদিন বৃষ্টি এসে  ধুয়ে যাবে,

মুছে যাব দুঃখ।



আদ্যোপান্ত


শুক্র শনি বা রবি নয় সপ্তাহ, মাস জুড়ে এমনকি    

বিশেষ বিশেষ দিনগুলিতে আমি ভীষণ রকম একা

আর

বছর গুলো বিভীষিকাময় নির্জনতায় মাখা



শৌভিক


জানিস তো!

সবার সাথে দর কষা কষি করতে নেই

সবাই ত আর বাড়ি ঘর ব্যাংক ব্যালেন্স করে  না, 

হাত মুখে দেয়,

হ্যাঁ রে!



দৈনিক কাগজ


উড়ে গেছ?

বিশাল আকাশের কোন কোণে

কোন পথ দিয়ে হেটে গেলে?

ছেড়ে যাবে?

ও কথা মুখে নিও না

দৈনিক কাগজে ছেপে যাবে

বিষাদের খবর

কলামের শিরোনাম 

'তুমি আমি  জোড়া কবুতর'।















*************************************************************





রিজভী হাসনাত 


 পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সম্পন্ন করেছেন  স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। সম্পাদনা করছেন আলোকছটা( নান্দনিক কবিতাপত্র)  নামে একটি কবিতার ছোট কাগজ। লিখে চলেছেন বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের বিভিন্ন ম্যাগাজিন,পত্রিকা এবং ছোট কাগজে। 


গুচ্ছ কবিতা * স্বপ্নদীপ রায়

 



কবিতাগুচ্ছ * স্বপ্নদীপ রায়








১.

স্বর্ণযুগ  স্বর্ণযুগ 

ভাবতে ভাবতে সূর্য ঠেলে আমি ক্রমশ

আমার পথের দিকে এগিয়ে যাই।

প্রথম দরজাটা খুলে গেলে দ্বিতীয় দরজার 

জন‍্য ...  তারপর তৃতীয়... 

একে একে শস‍্যের ক্ষেত উপুড় করে দেওয়া হয় আমার

পাকস্থলীতে,

যারা ঢেলে দেয় তাদের আমি দেখিনি

শুধু ভরাট হওয়ার এক স্বপ্নাতীত অভিজ্ঞতা

আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়;

শ্বাসের গভীরে আশ্বাস কথা বলে,

আমি স্বর্ণযুগে চলেছি  ... স্বর্ণযুগ!


অথচ আজ গোরস্থানের মতো ছোটবেলার

এই পরিত‍্যক্ত ছাদে দাঁড়িয়ে 

চতুর্দিকে মরা আগাছা আর অবাধ‍্য কালচে শ‍্যাওলার সঙ্গে 

যুঝতে যুঝতে

পোড়ো চিলেকোঠার বুকে হাত রেখে

বুঝলাম ...

ও বেঁচে আছে আমাদের মায়েরই মতন

... সন্তানের মঙ্গল কামনায় 


আপনি ছায়াতে লীন ...



২.

ক্রমশ আরও অসহায় হচ্ছে প্রতিরোধ 

আর আমার চোখ দিয়ে নেমে আসছে একটা মজা নদী


এখানে স্মৃতি ছাড়া আর কীই'বা আছে

একটানা ধূসর রঙ ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে সমস্তরকমের

সোনালী রূপোলী স্বপ্নচারা

আর থেকে থেকে একটা আর্তনাদ ডেঙ্গুর 

জ্বরের মতো মাথাচাড়া দিচ্ছে অভাবে স্বভাবে


এভাবে কতোক্ষণ ধরে রাখব নিজেকে?

কতোক্ষণ একটানা নেশা করা যায় ধূলো ধোঁয়ায়

জনপদে ফিরে শুঁকে নেওয়া যায়

চেনা মাছের গন্ধ?

জানি পারবে না তবু অপেক্ষায় থেকো ...

সে'দিনের ... যেদিন মানুষ গড়ার দুইহাতে উঠবে

ঈশ্বর ভাঙার অস্ত্র!



৩.

প্রাণপুষ্প! প্রাণপুষ্প! দরজা খোলো!

তোমার ধ্বনির রিনরিন

দলিল দস্তাবেজ ভেদ করে তাকিয়ে থাকে অপলক আমার

 দু'চোখের দিকে

আমি কি তার মাগন আষাঢ়?

... জানিনা!


দরজা খোলো --- একটিবার,...


আমি মেঘমুলুকে মেঘ হয়ে 

বাতাসবাড়িতে হাওয়ার ঘোরে 

তিরতির বয়ে যাচ্ছি আয়ু ধরে,

তবু রাতের পিঠে রাত জমে

আরও ভালোবাসে অন্ধকার...

তার উত্তম প্রেমে বিধুর হই 

ভাঙন হই আর 

আলোর মতো মিশে যাই 

কথকতার উপকূলে

সাঁতরে উঠে আসি তোমার 

গোলোকঘরের দরজাটার কাছে!


ছিঁড়ে ফ‍্যালো! আরেকবার ছিঁড়ে ফ‍্যালো

সকল আরামের দেহলিজ

তোমার বিজনঘরে ফুটে উঠি

প্রথমবার   

            শেষবার   

                        একবার

ফুলের নকশায় যতো চুম্বনের ক্ষত ____



৪.

আমি চলে গেলে কে তোমাকে ডাকবে?

কে বলবে তার মৃদুল পাখাদুটি তোমার দিকে এগিয়ে  :

' আলো! একটু আলো দাও কবি!"


তাই'কি এমন প্রগাঢ় আকর্ষণে কৃষ্ণা

হয়ে উঠেছ, প্রসবের সমস্ত কলঙ্ক ভুলে আদিম হয়ে উঠেছে

তোমার লোমকূপ?

যা কিছু স্বর্গ অথবা স্বর্গাদপি গরীয়সী

রেখেছ তাদের আলোর'ও  ওপারে, কীটদষ্ট?


আমি চোখ বুজলে দেখি,

শমীবৃক্ষের মতো তোমার লিঙ্গটিতে আয়ু হয়ে ফুটেছি মধ‍্যযামে ---

আমি চোখ বুজলে দেখি,

তোমার ত্বকের রস তুলিতে ভিজিয়ে অন্ধকার 

এঁকে চলেছে মাতৃত্বের একটি উতরোল

ছবি ___



৫.

একটু একটু করে       জ্বর ছাড়াই 

পুড়ে যাচ্ছি আমি আর

তুমি হো হো করে হাসছ তাই দেখে


এমন উদগার!


ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে পায়ের নীচের ছায়াটুকুও

অথচ আমি অপারগ


আমি নতুন করে গলা মোমে কোনদিন 

আগুন দিইনি অথবা 

দাউ দাউ চিতায় পর্যাপ্ত নিরুত্তাপ 


সে পথ জানলে এই বাঁধভাঙা কলধ্বনির নীচে ঠিকই খুঁজে পেতাম,

তোমার এতোকালের জমানো

শুকনো লবণাক্ত বরফখণ্ডগুলোর ঠিকানা!













****************************************************************************


                                           

স্বপ্নদীপ রায়


জন্ম:৮ঐ আগস্ট --২২'শে শ্রাবণ,১৯৮৬_স্থান:বর্ধমান। শিক্ষা :বর্ধমান শহর। পেশায় দন্ত চিকিৎসক।সাহিত‍্যের প্রতি শৈশব থেকে অনুরাগী। কবিতা লেখালেখি হঠাৎই শুরু। বিগত তিনবছর থেকে টানা চলছে কর্মজীবনের বাইরে এই আত্মানুসন্ধান! সেই থেকে ধ্বনি আর চেতনার মাঝে বিচ্ছিন্ন কথামালাদের একত্রীভবনের এই নিরন্তর প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত হয়েছে অন্তর।সাম্প্রতিক বহু ম‍্যাগাজিনে লেখালেখির বিষয়ে যুক্ত --কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হল__"মান্দাস","ছায়াবৃত্ত","টার্মিনাস","স্বরবর্ণ"....। প্রকাশিত কাব‍্যগ্রন্থ- আরুশি, বিসর্গ জীবন, আঘাত কতটা গভীর ... 


গুচ্ছ কবিতা * সঞ্জীবন রায়

 



কবিতাগুচ্ছ * সঞ্জীবন রায়

গ্রীষ্ম বিষয়ক এবং




মেয়েদের বাংলা স্কুলে শুরু হল 

প্রভাতী প্রার্থনাসংগীত।

মুছে যাচ্ছে নিদ্রাহীন রাত্রির তাপ।

চিত্রিত প্রজাপতির ডানায় শান্ত , 

বিমূর্ত- বিষণ্ন অতীত।




রোদ মিনারের অযুত শীর্ষে

কাঁপছে সময়।

শূন্য থেকে শূন্যতার দিকে

যাওয়ার সময়-অমোঘ পিছনে

ফিরে চিনতে চাওয়া শ্যামলিমা।

এসো, শিখি কিভাবে রুখব এই

সীমাহীন ক্ষয়।




স্বেদ ও রক্তের বদলে বেশি  

কি ইচ্ছা করেছি?

ইচ্ছেগুলো,ধূলোট বিকেলের 

দমকা হাওয়ার মতোই দিশাহীন

হঠাৎ বেগের মন্দনে।

সমবেত অনুকম্পার পাশে একাই 

প্রবল হাসছি।




লাল মোহক তরমুজ, ভালোবাসতে

খুব তুমি।

বালির পাহাড়ের পাদদেশে গড়িয়ে

আসা দুপুরের আয়নায় ,

হঠাৎই ভেসে উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে লাল।

পড়তে পড়তেও কি আশ্চর্য? ছুঁয়ে আছি 

এই ভূমি।




আলোকবর্ষ পেরিয়ে এসে 

গুঞ্জিত মেহফিল।

কেন যে মনে পড়ছে প্রিয় বন্ধুর

স্মিত ও কোমল মুখ?

ঘন হচ্ছে রাত, কে যেন 

গোপনে কাঁদছে।

মৌতাতের আঁচে পুড়ছে সকলেই,

ঝিলমিল,ঝিলমিল।




*************************************************************************



                                 সঞ্জীবন রায়

বিজ্ঞাপন তার কাজের জগৎ। প্রায় চার দশক ধরে জড়িয়ে আছেন লেখালেখির সঙ্গে। কবিতা ছাড়াও লিখতে ভালবাসেন প্রবন্ধ। দিল্লি থেকে প্রকাশ করেছেন "বঙ্গচেতনা" নামে এক লিটল ম্যাগাজিন প্রায় এক দশক ধরে। প্রিয় সখ আড্ডা ও ভ্রমণ।


গুচ্ছ কবিতা * অর্ণব সামন্ত

 


 

কবিতাগুচ্ছ  *  অর্ণব সামন্ত 

ছত্রিশ বসন্তের গপ্পো 


ছত্রিশ বসন্ত যখন ভেঙে পড়ে আলোক ঝর্ণায় অনেক অন্ধকার গুহা তাদের অন্দরে হোমাগ্নি জ্বালায় 

নৈবেদ্য ও নিবেদন মিশে যখন দেবী মানুষী হতে চায় চোখে জ্বলে ধ্রুবতারা , ব্ল্যাকহোলে থরে থরে সাজানো 

ইচ্ছাকুসুমের আলো , কামনাবাসনা ঘনীভূত মাধ্যাকর্ষণবিরোধী টান 

প্রলয়ের গান গেয়ে ফোটায় সৃজনকুসুম 

ধ্বংসের মিনারে ওড়ায় ভালোবাসার অদ্বিতীয় পতাকা 

 শেখড়ে শাখায় সঞ্চারিত হয় সেই আগ্নেয় লাভা , আগুন 

অথচ চিরভঙ্গির নম্রস্নিগ্ধতায় চাঁদের গায়ে ঢলে পড়ে চাঁদ 

সম্মোহিত আবেশ কাটে , যখন খাবার দের ওপারে ডেকে ওঠে অপত্য চাঁদ 

মেদিনীর মায়ামমতাসমেত সে ঝাঁপায় দিবারাত্রির কাব্যকে লালনে পালনে 

ছত্রিশ বসন্ত পদপ্রান্তে রেখে সে পায় ঈশ্বরীর অধিকার , স্বাধীনতা  

সৌর পরিবারে এক কবিতার জন্ম হওয়ার পরেই সে ছায়াপথ রচনা করে 

নাভিমূল থেকে সহজের গান প্লাবিত করে কেন্দ্রের 

প্রথম শব্দ , প্রথম আলো আবার সমান্তরাল 

নেমে পড়ে রাস্তায় নিজের অবয়ব খুঁজে পেতে 

সহজিয়া সুরে সহজ গান সঞ্চারিত হয় জীবনে , যাপনে 

নির্যাসে রাখো দোহনযোগ্য ভাটিয়ালি , ভাওয়াইয়া স্রোতে রাখো গভীর গভীরতরে গভীরতমের দিকে যাওয়ার 

কামনাবাসনা রেখে ক্রিয়ায় ক্রিয়ায় প্রতিক্রিয়াস্বরূপ মুক্তির ডানা মেলায় শুভ লগ্ন , ফিসফিস স্বরে 

কথার পেটে কথা , তার পেটে কবিতা , গান জলজ্যান্ত প্রাণবন্ত যে জীবন বসে থাকে সহজ গান হয়ে 

যে যাপন সহজ কবিতার চেয়েও সহজ , স্বতঃস্ফূর্ত অবাধ্য , অবাধ 

যে জলছবি অম্লান , চিরভাস্বর আনন্দস্পন্দের নৃত্যশীলতায়  

নয়নতারায় ফোটে ধ্রুবতারা , ঠোঁটে ঠোঁটে অমৃতের পুষ্টির স্বাদ !



সম্রাজ্ঞীর সাম্রাজ্য  


জন্মজন্মান্তর বসে থাকে রানি কবিতার অপেক্ষায় জন্মজন্মান্তর বসে থাকে সহজ গান হতে চেয়ে 

ডোবে ও ডোবায় তাকে যে প্রাণ প্রাণের চেয়েও বেশি ভাসেও ভাসায় তাকে যে ভাবনায় নোয়ার নৌকা হতে চায়

আসম্রাজ্ঞীমুকুটনখ যে প্যাশনে অবশেষনে জ্বলেছে পুড়েছে 

তাকে দিয়েছে আলো , ছায়াপথ , সমস্ত জগৎ উজাড় করে 

তবু সে নির্ভেজাল কবিতা পায়নি কিম্বা সহজিয়া সহজের গান 

অথবা নৃত্যের তালে তালে আনন্দস্পন্দ দ্রিমি দ্রিমি কম্পন সুখ 

জলছবি আঁকতে পারেনি নদীটির বুকে ও স্রোতে ঘূর্ণিজল যেতে চায় আরও গভীরে ডুবুরি সাঁতারপ্রিয় মন্থনে মন্থনে সমূহ গরল পরিবর্তিত করতে চায় সমস্ত অমৃতে 

মুহুর্মুহু মুহূর্তকে বিতাড়িত করে অনন্ত দ্রাঘিমার অভিসারে 

কখনও বিষুবরেখা , কর্কটক্রান্তি , মকরক্রান্তি দূরত্ব রেখে নিরন্তর মেরু চৌম্বকীয় আকর্ষণে 

কোষে মেদে মজ্জায় রক্তে ওঠে সহজের গান স্বরবর্ণে , ব্যঞ্জনবর্ণে 

কথায় , টুকরো কথায় নামে কবিতা ভাবব্যঞ্জনায় জন্মজন্মান্তর অপেক্ষায় সম্রাজ্ঞী সাম্রাজ্য দিতে চেয়ে সমর্পণে 

শুধু হতে চায় একটি নির্ভেজাল কবিতা কিংবা সহজ গান !



সহজ গানের কিসসা 


জলছবিতে ভেসে উঠে সেই চলছবি জীবনের 

আলো ছায়া জাফরিকাটা ছায়াপথের পথে 

এক বুকে অজন্তা, অন্যবুকে ইলোরার কারুকার্য নিয়ে 

মৎস্যপুরাণে মৎস্যকন্যা হয়ে ডুবসাঁতার দিলে 

বুঝে নিলে জল কিভাবে জলের আরও গভীরে যেতে চায় 

অরূপরতন ডুবে গেল রূপের সাম্রাজ্যে 

হে সম্রাজ্ঞী নতজানু সম্রাট মুখে বলে দেহি পদপল্লবমুদারম 

শিকারী শিকার হয়ে মৃত হল অমৃত জ্যোৎস্নার পানে কোষে কোষে উঠল গান মনকেমন ইমনের সুরে মোৎসার্ট সিম্ফনি বাজল স্নায়ুতে রক্তে মেদে মজ্জায় 

রেমব্রান্ট্রের হলুদ আঁধারে জেগে থাকল নষ্ট ধ্রুবতারা চোখ 

সোরা সাইকোসিস সিফিলিস নিয়ে সমুদ্রসৈকতে সেজনের জ্যান্ত ছবি 

পিকাসোর স্পর্শে স্পর্শাতুর তুলি গ্যালন গ্যালন রঙ ঢালল

গহীন থেকে আরও গহীনে গভীরতম অসুখ নিঙড়ে দিয়ে 

দিবারাত্রির কাব্যের সে প্রস্ফুটিত হল সহজ কবিতায় এসো তবে এসো সহজ গান হয়ে সহজিয়া সুরের গমকে 

স্বয়মাগতা জ্যান্ত ছবি কোলাজে মন্তাজে সাবলীল সুললিত 

নৃত্যরত আনন্দ স্পন্দের ছন্দভাঙা অবিচ্ছিন্ন দ্রিমিদ্রিমি সুখ

দেবী হে পূজারীকে নৈবেদ্য করে রমণে রমণে প্রলয়ে সৃজনে 

দ্রাঘিমা অগ্রাহ্য করে আকাশ অমান্য করে সহজিয়া জীবনের 

স্বরবিতান গীতবিতানসমেত সহজ গান হয়ে যায় ...!




ভাঙা মঞ্জরী , ভাঙা ভাঙা জীবনের গান 

   

মঞ্জরিত হতে হতে ডাক আসে সাইক্লোনের এলোমেলো হয়ে যায় ঢেউগুলি , মোহনাটি , অরণ্য , উপত্যকা  

পান্ডুলিপি খসে খসে পড়ে ভূমিকন্যার পদপ্রান্তে 

ভাটি মিলিয়ে উজান আসে উজিয়ে আসে 

কত শব্দ কত সুর সহজ সহজ কত কবিতা গান দীর্ঘশ্বাস বলে যায় বিচ্ছেদ বিরহ হর্ষ উচ্ছ্বাসের কথা তাথিয়া তাথিয়া নাচতে নাচতে কখন যে ভাঙা ধামে ভঙ্গিতে স্থিত 

অপরূপ জলছবি গড়ে ঢেউয়ে ঢেউয়ে রূপে ও লাবণ্যে 

ব্ল্যাকহোলে বেজে ওঠে সহজ গান , সরল আলোর জমাট অভিমান 

দুধেল জ্যোৎস্নায় খন্ড খন্ড হতে হতে অপত্য খুঁজে পায়

কোষে কোষে শব্দচাষের সারি গান , স্নায়ুতে স্নায়ুতে সারেঙ্গী দীপক 

কখনও মেঘমল্লারে ভেসে অশ্রুকেও করে দেয় হীরের চেয়েও দামী 

রক্তমেদমজ্জার দরবারে কে জ্বালে এত আলো আঁধারের পরিপ্রেক্ষিতে ? 

মঞ্জরিত ঠোঁট পুষ্টি চায় , ঢেউয়ের বুক শালবৃক্ষ চায় এভাবে খননে খননে মন্থনে গোপনে কখন যে সহজিয়া সহজ গান হয়ে যায় ! 

শব্দগুলি ভাঙা ভাঙা ক্রমশঃ নৈঃশব্দে হারায় 

ছন্দগুলি রেখে আসে সৈকতে সমুদ্রঢেউয়ের ধাক্কায় ভাবগুলি পাগলি যেন দ্রাঘিমায় দ্রাঘিমায় বদলায় ভঙ্গিগুলি কাছে দূরে অক্ষরেখায় অক্ষরেখায় ভেসে যায় 

মারিয়ানা খাত নিজেই জানে না এভারেস্টে সাফল্যকে অন্তরীণ করে 

আছে নেই আপেক্ষিক আপেক্ষিক ভাঙা কবিতা কবিতা গানের অভিপ্রায় 

এভাবেই ভেঙে ভেঙে ভেঙে হতে হয় সহজ গান এভাবেই ভেঙে ভেঙে ভেঙে আসে সহজ কবিতার উত্থান 

এভাবেই জীবনের চলন বলন ভাবভঙ্গি দ্রিমিদ্রিমি নৃত্যসম্ভব 

এভাবেই জলছবি কোলাজ মন্তাজ চলছবি হয়ে যায় ! 

তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভাঙা ভাঙা জীবন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জীবনে বর্তায় !

  


ফসলের গান 


এভাবে মাঝির ফসলের স্তনে দুধ জমে 

হিমেলের শূন্য বুক থেকে জাগে অপত্য আলো 

সোঁদামাটির গন্ধে উথাল পাথাল নদী 

জ্যোৎস্নার মধুবনে নেশায় টালমাটাল গান 

ভুলে যায় সামাজিক স্বরূপ , সংস্কার , প্রচ্ছদ 

আদি সুরে বইতে থাকে ছত্রিশ রাগ ও রাগিনী 

এককের ঝংকারে কাঁপে কোষস্নায়ুমজ্জামেদরক্ত 

বিদ্যুচ্চমকে বিদ্যুচ্চমকে চলে যায় জগতের বাইরে 

ব্ল্যাকহোলে সৃজিত হয় সহজের গান সহজিয়া ভাবে

সন্তোষে ও সুখে ফসল তুলে আনে ঘরে , মনের মনিকর্ণিকায় 

দোলাচল গেরস্থালি ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া দোহনে দোহনে

সুব্রতাসম্ভব সহস্র গান নিজেরাই গাইতে থাকে নিজেদেরকে 

ভাঙা কবিতার মতন বসে থাকে পথের মোড়ে পথিকের বুকে 

নৃত্যশীল আনন্দস্পন্দ এসে ধাক্কায় ভেতরে বাইরে 

অসম্ভব ছবির মতন সুন্দরভাবে ভঙ্গিমায় স্থির থাকে জ্যামিতিক কোলাজে

করিও কোমলে নোয়ার নৌকা পাড়ি দেয় সাত সমুদ্র 

দিগন্ত দিগন্ত পেরিয়ে পারস্পরিক আবিষ্কারে নতুন দেশ 

নতুন পৃথিবীতে জ্বেলে দেয় সদ্যোজাত অপত্য আলো

এভাবেই ফসলের স্তনে মুখ রাখে , ব্ল্যাকহোলের গর্ভে রাখে 

 গ্যালন গ্যালন জ্যোৎস্নার আলো থরে থরে তড়িৎ চুম্বকীয় সজ্জায় 

অপত্যের কবিতা , গান হয়ে প্রকাশিত্য হবে বলে যথা দ্রাঘিমায় , যথা অক্ষরেখায় !

    


 পল গঁগ্যার নারী 


প্রতীক্ষায় থাকে বিদ্যাধরী সবুজ অরণ্য ঢেউগুলি নিয়ে 

সুপ্ত আগ্নেয়গিরি নিয়ে দহনে দহনে সারাটি জীবন ঢেউগুলি ছলাৎ ছলাৎ শব্দে মিশে যায় সফেন সমুদ্রে সোরা ও লাল কাঁকড়ার যৌনতামুখর লাবণ্য দিনরাত্রি 

দিনের পর দিন যায় , রাত্রির পর রাত্রি অতিক্রান্ত তবু আসেনা লাভা মাখানোর সেই পীরিতি মানুষ চারিদিকে চলে নাচগান , হুল্লোড় পলিনেশিয়ান সংস্কৃতির সন্ধ্যা 

চারু নষ্টনীড়ের নষ্ট ধ্রুবতারা হয়ে জেগে থাকে 

পাহাড় পর্বত একদিন নেচে ওঠে আলোড়িত দহনে , মন্থনে 

পল গঁগ্যার নারী হয়ে দাঁড়ায় সংস্কারমুক্ত ইনহিবিশনমুক্ত তাহিতি বনচ্ছায়ায় 

মুহূর্তকে অনন্ত দ্রাঘিমা করে ভেতরে বাইরে তরমুজ থালি নিয়ে !

  

                                                                      
**********************************************


       
                                অর্ণব সামন্ত 

ইংরাজী ভাষার ছাত্র । ইংরাজীতে এম. এ ; বি . এড ।উনিশশো তিয়াত্তর সালে দক্ষিণ ২৪ পরগণার বাসন্তীতে জন্মালেও স্কুল জীবনের পর থেকে শহরতলীতে আবাস । শিক্ষকতা পেশা , নেশা কবিতা ও গল্প লেখা । এ পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ , ৪টি - গোলাপ এবং , ঝরা সময়ের উপকথা , পারমিতা , বামাক্ষী । পেশাগত সময় বাদে গান শোনা , বইপড়া , ফোটোগ্রাফি , কবিতা ও গল্প লেখাকেই জীবন যাপনের একমাত্র উপায় বলে মনে করেন।


গুচ্ছ কবিতা * গৌতম রায়




গৌতম রায় * কবিতাগুচ্ছ  

গোঁসাই বাগান


১.

লালন কুটিরে এসে বসি,

এগিয়ে এলে দোতারা

পরিখা সরে সরে যায়।

নাভিকুণ্ড থেকে জেগে ওঠে লোকগান,

টুমনি অজয় দামোদর সুর সৌরভে রূপনারায়ণ 

হয়।

চরে চরে কে করে কাঞ্চন আবাদ?

যার দীধিতিতে খোলে অমোঘ দিন।

শ্রীখোল মন্দিরা বরফ হলে 

নেমে আসে নিকষ আঁধার।


২.

জোড়া শালিকের মত জোড়া হেরিকেন অনাদি 

আলো রেখে যায়,

সে দৃশ্যমানতায় রাঙাপথে তোমাকে কুড়োই 

বাউলকবিতা,

রূপান্তরে উঠে আসে সৌরলন্ঠন।

সাঁকো পেরিয়ে এলাম

আলোহীন অন্ধকার নেই,

ফুটে থাকে সর্ষের তরুণদানা শিষ।

আয় নগরকীর্তন

পারাবত সম্মেলনে বিশ্বসংসারে ছড়াই নির্মল সম্ভব।


৩.

এবার বাউল পাতারা বসন্তের উতল হাওয়ায় নেয়নি ভূমি আসন।

এতো বারুদ আগুন বাতাসে

পলাশ পোয়াতি তবু শিশুর বৃদ্ধি আছে থমকে।

এ জরতী সময়ে আমি মেঘের কাছে যাবোঃ

হাত জোড় করে চাইবো সাধ ভক্ষণের বসন্তবৃষ্টি।


৪.

ভাদুঘরটি সাজিয়ে রাখি অতিযত্নে

শুধু টুমনির পাড়ে গোঁসাই বাগানে নয়

সারা বিশ্ব জুড়ে।

আপাত বিসর্জনের পরেও দিই না বিসর্জন,

একটি জানলা রাখি খুলে

সরস কাঁসাই শিলাবতী এসে এগিয়ে দেয় পুষ্টি,

লতিয়ে আসে পৃথিবীত্ব,

আঁকড়ে ধরি সবুজ।

ভাদু চিরকাল জেগে থাকে

জেগে থাকে আমাদের আত্মীয়তার স্নায়ু সংযোগ।


৫.

শিমুলগুলি শ্রদ্ধায় তোমার হাতে তুলে দিতেই

শিমুলিয়ানায় জেগে উঠলো ডুংরির অক্ষরমালা।

এই আরক্তিম শিমুলের অকালে শহীদ হওয়া বসন্তে

সমকোণে দাঁড়িয়ে আছে স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার 

মাতৃভাষা।

আমি লিখি প্রণাম

লিখি সহিষ্ণুতা-----

লিখি আগ্রাসন থেকে বাংলাভাষাকে বাঁচানোর মহৎ তপোবনগুলি।


৬.

জনপদ দেবতার টেরাকোটা ঘোড়া হাতিতে চোখ ফেলি,

মানতের মান্যতা থেকে ঘোড়ীয় ঘ্রাণ আসে উঠে।

গতি পেয়ে অন্তরবাহী টুমনি ছোটে  পথে পথে,

লক্ষ্য চিহ্নিত।


৭.

এখন সত্যকে চাপা দিচ্ছে এ আই মায়াবী প্রলেপ,

এস কুনূর, এস টুমনি, ধুয়ে ফেল প্রলুব্ধ কাই,

উপত্যকায় সর্ষে গমের পাশে

সূর্যমুখী বাউল।

সত্য তো অপরাজিত

অর্জনে উঠে আসুক অজয়।



********************************************************************************



                                গৌতম রায়


কবি গৌতম রায় ত্রিশ বছরের অধিক কবিতা সৈনিক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা পনেরোটি। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য চোখের পা, জল সিন্থেসাইজার, স্থাপত্য স্টেশন, দর্শন মিনার, সাদা কলম ছাড়াই  ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ। "কৃত্তিবাস" থেকে "কবি সম্মেলন" ছোট বড়ো অনেক পত্র পত্রিকায় লিখে চলেছেন নিয়মিত। পেয়েছেন নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। কবি বিশ্বাস করেন যিনি মিথ জানেন, তিনি মিথ ভাঙার সাহস দেখান। কবি পুরুলিয়ার ভূমিপুত্র ।