বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

প্রসঙ্গ স্বরবর্ণ

  





স্বরবর্ণে লেখা পাঠানোর আগে নীচের বিষয়গুলি নিশ্চিত হয়ে নিন -----



১.  স্বরবর্ণ দ্বিমাসিক ওয়েব ম্যাগাজিন । 

২. লেখা মনোনয়নের ব্যাপারে সম্পাদকমন্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

৩. প্রাপ্তি সংবাদ জানানো সম্ভব নয়। নিৰ্বাচিত লেখকসূচি আমরা একমাসের মধ্যে ফেসবুকে প্রকাশ করি । 

৪.পরবর্তী সংখ্যার জন্য আপনার মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা ( গল্প কবিতা প্রবন্ধ  অণুগল্প  অনুবাদ কবিতা  ভ্রমণ কাহিনি ইত্যাদি ) পাঠান । 

৫. শব্দসীমা অনির্দিষ্ট। 

৬. কবিতার ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুটি কবিতা পাঠাবেন।  

৭. লেখার সঙ্গে আপনার একটি ছবি এবং সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, প্রকাশিত গ্রন্থ (থাকলে)  ছবিসহ পাঠান । 

৮. "স্বরবর্ণ " সামগ্রিক চিন্তার ফসল। আগে থেকে লেখা পাঠান। লেখা পাঠাবেন ওয়ার্ড ফাইলে, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা
 ই-মেইল বডিতে টাইপ করে। পিডিএফ বা লেখার ছবি তুলে পাঠাবেন না।




* হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর   8777891532

*ই-মেইল --- debasishsaha610@gmail.com 



                               সম্পাদকমণ্ডলী                                                 

ড. শুভঙ্কর দে          ড. অলোক কোৱা

সৌম্যজিৎ দত্ত           দেবাশিস সাহা




ধারাবাহিক রহস্য রোমাঞ্চ ও কাহিনি * প্রভাত ভট্টাচার্য

 



ধারাবাহিক রহস্য রোমাঞ্চ  কাহিনি  







প্রভাত ভট্টাচার্য 

পর্ব  7 

প্রস্তুতি


      কৃষ্ণ ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সূর্যদা তো এতদিন কখনও বাইরে থাকে না। বিশেষত তার সঙ্গে যোগাযোগ না রেখে। বলছে তো বড় একটা কাজ নিয়ে লেগে আছে, আর হয়তো বেশ গোপনীয় ব্যাপার। 

   উজ্জ্বয়িনীকেও জানাল ব্যাপারটা। 

    ঠিক আছে ,দেখা যাক। আমারও চিন্তা হচ্ছে। নতুন কিছু খবর পেলে আমাকে জানিও। 

    অবশ্যই। বলল কৃষ্ণ। 

   এদিকে অতীশ চলেছে শার্দুলের সাথে। 

    তোমার নাম কি? জিজ্ঞেস করল অতীশ। 

     কোন জবাব দিল না শার্দুল ।

     তুমহারা নাম কেয়া?

     এবারও কোন জবাব নেই। 

     আচ্ছা বেয়াদব তো! বোবা নাকি  ? বলে অতীশ তাকালো শার্দুলের দিকে। 

     শার্দুলের তীক্ষ চাহনির সামনে সাধারণত কেউ বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারে না।  কিন্ত এ তো কেমন অদ্ভুতভাবে চেয়ে রয়েছে । পাগলাটে লোক তো, তাই। ভাবল শার্দুল । অতীশ কে ঘর দেখিয়ে দিয়েই সে চলে গেল। তারপর সুমিতকে নিয়ে গেল অতীশের পাশের ঘরেই। 

    অতীশ ঘরের বাইরেই ছিল। সুমিতকে দেখে বলল,  তোমাকে দেখে তো সুবিধের লোক বলে মনে হচ্ছে না। 

     চুপ, পাগল কোথাকার। বলে সুমিত ঘরে ঢুকে গেল।

     যে বলে সে পাগল। বলে অতীশ ঘরে ঢুকে গেল। 

     একটু পরে একজন এসে চা বিস্কুট দিয়ে গেল। খাওয়া শেষ হতেই সে আবার এসে বলল,  চলো, স্যার ডাকছে। 

    কোন স্যার  ?

     আরে স্যার তো একজনই আছে। 

     ও, তোমাদের সেই কত্তামশাই  । চলো তাহলে যাই। 

    অজয় নীচে দাঁড়িয়েছিল। অতীশ নামতে বলল, চলুন আমার সঙ্গে। 

     তারপরে দেওয়ালের বোতাম টিপতেই দরজা খুলে গেল। 

     আরে বাবা, এ তো সেই আলিবাবার গুহার দরজা  ! বলল অতীশ। 

     সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল অজয়, আর ইশারায় বলল তাকে অনুসরণ করতে। 

     নীচে নেমে অতীশ বলল,  আরিব্বাস,   দারুণ জায়গা তো।  বেশ কিছু রোবট ও রয়েছে দেখছি। 

     পছন্দ হয়েছে সবকিছু ?

      গ্রেট! তোমার এলেম আছে তো ভাই। 

     রবিনসনকে ডেকে অতীশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল অজয়। তাকে বলল, ওনার যা প্রয়োজন, মেটাবে।  উনি একজন বড় বিজ্ঞানী ।এখন আমাদের হয়ে কাজ করবেন। 

   ও কে স্যার। 

   গ্ল্যাড টু মীট ইউ। সতীশ বলল রবিনসনকে। 

    মি টু ।

    রবিনসন কিন্ত মনে মনে অখুশি হল। ভাবল,  এ আপদটা আবার কোত্থেকে এলো। 

    আপনার খাবার ঘরে দিয়ে ডেকে নিয়ে যাবে। নিন, কাজ শুরু করুন। বলে অজয় চলে গেল। 

    সুমিত একটু ঘর থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। একটু দূরেই জঙ্গল। এ একদমই পাণ্ডববর্জিত জায়গা যাকে বলে। হঠাৎই এক অপার্থিব আওয়াজ ভেসে এল জঙ্গল থেকে  , যে আওয়াজ আগেও শোনা গিয়েছে। 

    তারপর তার মনে হল কেউ রয়েছে পাশে। দেখল শার্দুল কখন এসে দাঁড়িয়েছে ।সে আঙুল দেখিয়ে ঘরে যেতে বলল। 

     সুমিত তাই করল। এ কোথায়  এসে পড়েছে ! মনে মনে ভাবতে লাগল সে। 

     জঙ্গলের মধ্যে এই অদ্ভুত প্রাণীর ব্যাপারটা ভাবিয়ে তুলেছে অজয়কে। এটা একটা অস্বস্তির কারণ।  মেশিনগান থেকে গুলি চালিয়ে দেখেছে কিছুই হয় নি। শার্দুল বর্ষা ছুঁড়েছে। কিন্ত মনে হচ্ছে তো তাতেও লাভ হয় নি। এবারে জঙ্গলে রোবট পাঠাতে হবে ।

     যে কথা সেই কাজ। পাঁচজন রোবট গেল জঙ্গলের ভেতরে। তাদের ভেতরে প্রোগ্রামিং করে দেওয়া ছিল যে বড় কিছু স্ক্যানারে ধরা পড়লেই গুলি চালাবে। কিন্ত কিছুই ধরা পড়ে নি। 

    শার্দুলের দিকে তাকিয়ে অজয় বলল,  না রে  , কিছু হল না। 

    তারপর গিয়ে খেতে বসল দরজা বন্ধ করে , বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটটা খুলে রেখে। 

    কৃষ্ণ আর একবার সূর্যকে ফোন করে দেখল। সেই একই ব্যাপার।











************************************"**************************************************************



প্রভাত ভট্টাচার্য  

তিনি সব্যসাচী--- এক হাতে সামলান চিকিৎসকের গুরুভার দায়িত্ব আর এক হাতে ফোটান সাহিত্য সৃষ্টির ফুল। দ্য হার্ট, মিশন পসিবল, মাই ডটার, রাজবাড়িতে রক্তপাত , ডিটেক্টিভ সূর্য এবং কবিতা সংকলন - কাগজের মানুষ এবং ফিনিক্স পাখি তাঁর উজ্জ্বল সাহিত্যসৃষ্টি । সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর  তিনটি ভিন্ন ধরনের উপন্যাস - দশভুজা, কাগজের মানুষ ও মায়াবী গ্রাম। এছাড়াও তাঁর আর একটি মনভোলানো সৃষ্টি 'গুহা মানবের ডায়েরি'  





মুক্ত গদ্য * শাশ্বত বোস




শীত এবং তৃতীয় পক্ষ

শাশ্বত বোস


শীত বলতে আমার কাছে এক আঁজলা বেদান্ত আঁতুরঘর, স্থাবর বিছানা, চেতনাহীন ঘনিষ্ঠতা অথবা অনেক দূরের শ্মশ্মানের জমাট বাঁধা ধোঁয়ার মাঝে, আটকা পরে থাকা একান্নবর্তী প্রসেনিয়াম। আমার ছোটমামার খুব ফুলের শখ ছিল। তাই শীতকালের শুরুতেই আমার মামাবাড়ির চিলেকোঠার ছাতটা দেখতাম দিব্যি দখল করে ফেলেছে, লাল নীল মশারি, একটা হলুদ মরচে ধরা হোল্ডার, ছোট বড় মাঝারি বিভিন্ন মাপের টব আর অনুবাদপ্রবণ ডালিয়া-চন্দ্রমল্লিকা আর হলদে কমলা গ্যাঁদার দল। শীতের রূপ পাল্টানো প্যারাডক্সের পাশাপাশি এক অলৌকিক বহমান সুপ্তি যেন ঘিরে থাকতো ছাতটার পরিবর্তিত কল্পলোক জুড়ে! ছাতের অনেকটা জুড়ে বোঝাই করা থাকতো গুঁড়ো গুঁড়ো সূক্ষ্ম বালিকণা, এঁটেল মাটির সাথে ঝুরঝুরে হয়ে মিশে গিয়ে আগামী দিনে টবের দৈঘ্য প্রস্থ জুড়ে, এক অপার্থিব রহস্যকে ঘনিয়ে তুলবে এরা। গোটা নভেম্বর মাস জুড়ে বিদেশী ফুলের বীজ বোনা হতো হলদেটে বালিকণার গর্ভে। রাস্তা থেকে যখনই দেখতাম সন্ধ্যের হিমের আমেজ গায়ে মেখে, ছাতের ঘরে বিশ ওয়াটের বাল্বটা জ্বলে উঠেছে, ঠিক তখনই মফস্বলের অন্ধকার গলির বাঁকে, শহরতলীর অজস্র জীবন ষড়যন্ত্রের, কত সহস্র হোঁচট-জখম-রক্তপাত ভুলে একটা বায়বীয় পারলৌকিক জগৎ, একটা নির্জনতার ফিসফাসে নিমগ্ন আপাত মোলায়েম জীবন যেন ডাকতো আমায়! যেন ঐখানেতে পরম স্নেহে বোনা হয়ে চলছে এক বিচিত্র জীবন! নিষ্ক্রিয় অভিব্যক্তির মতো অনেকখানি স্থূল আরাম হয়তো মাখামাখি করে থাকতো ভাবনাটাতে! হয়তো নতুন শীতের ভোরে পায়ের গোড়ায় নীরব অবহেলায়, নিতান্ত মোলায়েম মিথ্যের মত গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকা লেপ কম্বলের মামুলি আরামের থেকেও অনেক বেশী ছায়াঘন একটা আরাম! টিউশন থেকে ফিরে এসে পড়তে বসতে আর ইচ্ছে করতো না হয়তো! ব্যাগ ফেলে ছুট দিতাম সোজা তেতলার ছাতে। একটা রৌদ্রমুখর দিনের শেষে ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যেটা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে তখন হীমশীতল কুয়াশাঘেরা অন্ধকারের দিকে! জীবনের বহুমুখী স্বরের মাঝে নিয়ম করে বেজে চলেছে এক সুর! অলীক জীবনের খাতায়, পরাবাস্তব লিপির দ্রাব্যতায়, পরিমিত অনুভবে যা খানিক সৌজন্যমূলক কবিতা লিখে রেখে যায়, তারপর মিশে যায়, ইট চাপা পড়ে থাকা অর্ধেক জীবনের খাঁজে! যেন শব্দের ভিড়ে প্রভাবিত কবির লেখা কোন কবিতা! একজন জন্মাবধি দুর্বল নবজাতককে যেমন ইনকিউবেটরে রেখে দেওয়া হয়, চোখ মেলার অপেক্ষায়! তারপর সব বিপদ কাটিয়ে ধীরে ধীরে সে চোখ মেলে একদিন! পুষ্ট হয়ে ওঠে তার সেই অর্ধেক হয়ে জন্মানো শরীরটি! ঠিক সেরকম কোন এক কুসুম কুসুম শিশিরমাখা ভোরে, গত দীপাবলীর রং মশালের নীল যখন মুখে গেছে, ঘুমন্ত খিদের গা থেকে ঝরে গেছে বারুদের গন্ধ, ঠিক তখন শীর্ণ দুটো হাত শূন্যে মেলে মাথা তুলতে চায়, প্যানজি-পিটুনিয়া-ক্যালেন্ডুলা-আজেলিয়ারা! সে অনুভব শুধু কাঞ্চনফুলের মতো সাদা, ঋতুপ্রবণ! শীত মানে তাই আমার কাছে কোন নিঃস্ব পরিধিতে প্রথম প্রাণের সঞ্চার! যেন হঠাৎ করেই চিঠি লিখতে চাওয়া কোন অনাথ শিশুকে!


শীত মানে সোনালী ধানক্ষেত আধখানা ন্যাড়া হয়ে আছে। আলু তুলে নেবার পর মাঠের ধারে ধুনি জ্বেলে মেঠো ইঁদুরের মাংস খাচ্ছে একপাল অসভ্য আদিবাসীর দল! কোন এক সময় এরা আমাদের প্রজা ছিল, তারপর ভাগচাষী! এখন এরা আমাকে হয়তো চিনতেও পারে না! অথচ জমি জঙ্গলের প্রাচীন হকদার হিসেবে ওদের আমরা চিরটাকালই সমীহ করে এসেছি! শীত মানে যেন গদ্য নির্ভরজীবনে বিপ্রতীপ চলনের কবিতা বোনা! হিম হিম অন্ধকারে বসে নষ্ট তারা খোসা দেখতে পাওয়া! শীতকাল মানে যেন আবার কোথাও গিয়ে মৃত্যু! যেখানে বেঁচে থাকাটাই একটা আশ্চর্য্য ঘটনা! এই হয়তো অনেক উৎসাহ নিয়ে বেঁচে আছি! পাতাঝরা কিছুটা শীতল বরফ যেন মুহূর্তে এসে সব কিছু ভেঙে চুরে চুরমার করে দিল! আসলে শুধু দেখে যাওয়া জীবনে মুহূর্ত নির্ভর আমাদের বেঁচে থাকা! বড় আশ্চর্য্য সে ভঙ্গিমা! যেন ঈশ্বরী চোখে গেঁথে যাওয়া চঞ্চল দৃশ্যের বিন্যাস থেকে হঠাৎই ফ্রিজ ফ্রেমে ফিরে আসা! যেন কোন এক দীর্ঘ্য রোগভোগের পর অনন্তের গা ঘেঁষে আমার ঠাকুমার চলে যাওয়া। বেঁচে থাকতে সারা শরীর জুড়ে তীব্র যন্ত্রনাময় বাত বেদনায় গোটা বিছানা জুড়ে যিনি শুধু গড়িয়ে যেতেন। মাঝে মাঝে চোখ খুলে শুধু বলতেন, “আমার হাড় মুড়মুড়াইসে!” মৃত্যুটি হয়তো সংক্ষিপ্ত পর্ব ছিল কিন্তু পরবর্তীতে তার পোস্ট স্ক্রিপ্ট হিসেবে জুড়ে যাওয়া শোককাল ছিল বড় অবিচ্ছেদ্য! শীত মানে আসলে স্থিরতা! একটা ঘটনাপ্রবণ জীবনের ভঙ্গুর আবর্তে বার কতক ঘুরপাক খেয়ে, মলিন স্মৃতির দোকান থেকে টুক করে ঘুরে, ফিরে আসা প্রাপ্তির জোয়ারে! বছর ঘুরে শীতকালে ফিরে এলে যেন বয়স হয়ে আসে! না ফুরোনো এই অনর্থক জীবনে সংযত প্রেম-সতর্ক হাসির অস্পষ্ট ইমেজারি তৈরী করে!


শীত মানে আসলে নিয়ন্ত্রিত ছয় ঋতু! যে চারাগাছ গত বর্ষায় বেগবতী হয়েছে, শরীরে যার ঠাসা হয়েছে বিজ্ঞাপিত মেদ, আত্মমন্থনের দোলায় আর্দ্র এখন যার অমলিন হৃদয়, পুঁতিগন্ধময় বর্জ্য উপেক্ষা করে শীতের উদ্বায়ী রোদের কাছে এখন সে স্বর্গীয় উত্তাপ খোঁজে! তার পরিণত চোখ জুড়ে শিশুকাল কৈশোর যৌবন টেনে এগিয়ে চলে অদ্ভুত সব স্বপ্নের এক ভ্রাম্যমান শর্টকাট! আমার কাছে স্মৃতির মানে শীত! শীত মানেই চেনা অচেনা নানা গন্ধ, হালকা হয়ে আসা বাতাস, নিবিড় ভাবে ঝিম মেরে যাওয়া এক নদী, এই কালান্তক শীতের মলাটে জমাট বাঁধা জনপদ জুড়ে যে বুনে দিয়েছে রবিশস্যের নির্বিবাদী বুনিয়াদ। শীত মানে নিঝুম হয়ে যাওয়া শব্দের দল। প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে ব্যবহৃত উপমার আড়ালে মুখ লুকোনো ক্যাসুয়াল কথাবার্তার রিফ্লেক্স! শীতকাল মানে পরিপাটি হয়ে বিয়েবাড়ি যাওয়া। খেয়েদেয়ে বাড়ি ফেরার পথে নবদম্পতির আশু বিচ্ছেদের দিনক্ষণ প্রেডিক্ট করা। ‘এখনকার বিয়েতে স্টেবিলিটি কাহা!’ মার্কা নির্বিষ আস্ফালন! এই একটু আগে অনুষ্ঠানবাড়িতে অনেকদিন বাদে দেখা হওয়া ব্যক্তি, “কেমন আছেন!” জানতে চাইলাম যার কাছে, দেশকাল-চাকরি-ব্যবসা-অর্থনীতি-মন্দা-অগ্নিমূল্য বাজার-সোনা রুপোর দর-জিনিসপত্রের দাম এসব নিয়ে গালভরা বাতেল্লা ঝাড়লাম যার কাছে, মুখ সরলেই মাথার মধ্যে স্পষ্ট রজঃমূলক প্রবৃত্তি এনে তার ভাবী নষ্ট দিনকালের পাটিগণিত কষি মনে মনে! মগজের গভীরে গিজগিজে পাঞ্চলাইনের ব্যাকড্রপে, জড়ো হওয়া এইসব এলেবেলে কনভার্সেশন, প্রত্যুত্তরের আশা রাখে না কখনোই! শুধু আশা থেকে যায় সাময়িক মনোযোগ আকর্ষণের! শোভাবাজার কিংবা হাতিবাগানের চুন সুরকি খসে পড়া পোড়ো বাড়ির ছাতে, তখন কৌতূহলহীন কাকটা অব্যর্থ নিশানার মতো ভেজা ভেজা রোদটুকু বেয়ে ছুটে এসে ফেটে গড়িয়ে পড়ে। নির্জনতা ও আধ্যাত্মিকতা মেশানো নির্ভেজাল কল্পনাশক্তির দুর্বলতম স্থানটুকু জুড়ে ততক্ষণে রোদ ফোদ সব হাওয়া! ততক্ষণে আর জি কর রোডের সার্সি জানলা ঘোরানো সিঁড়ি বসানো স্টাফ কোয়ার্টারের, দোতলার বেরিয়ে আসা ছাদের, ভেঙে আসা পাঁচিলে ঠেস দিয়ে, তখন পিসতুতো বোনের গালে হঠাৎ করে চুমু এঁকে দেয় আপন মামাতো ভাই! যৌবন বীজপত্র থেকে বেরিয়ে এসে সোনালী রঙের বিকেলে এসে দাঁড়ানো কিশোরীটি বাড়িয়ে দেয় ঠোঁট! শীতকাল তখন উদোম উৎকণ্ঠাদের বুকে করে জীবনের সবথেকে বিষন্ন সত্যকে চিনতে পেরে উর্বরতার কথা বলে! আহিরীটোলা ঘাটে ফিরতি স্টিমার এসে ভেরে। মৌলালি দরগায় আজান লাগে। পদ্মপুকুর বস্তি, পার্ক সার্কাস অঞ্চল থেকে ভেসে আসা ঝলসানো মাংসের গন্ধ, গ্রাম বাংলার নিরন্ন উনুনের ভাপে সিদ্ধ হওয়া পিঠে পুলির গন্ধ, নোনাপুকুরে বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম ডিপোয় টং টং করতে করতে ঢুকে যাওয়া শেষ ট্রামটার গন্ধ, এংলো পাড়ার লাল বাড়িটার গায়ে ক্রিস্টমাসের জিঙ্গল বেল হয়ে ঝুলে থাকা পর্ক সসেজ, মোমো আর চিকেন চাউমিনের গন্ধ, বহড়ুর রস ব্যবসায়ীর হাতে জাল খেতে খেতে শুকিয়ে আসা খেঁজুর রসের গন্ধ সব মিলে মিশে একাকাকার হয়ে যায়। শলাকার গোপন পাঁজরে ধ্বস নামে! সার্কাসের বামন জোকারটির চোখে তখন বুদ্বুদের ইশারা! শীতকালের শেষে, গেল শীতের স্মৃতিই বেশী করে ফিরে ফিরে আসে।



***************************************************************************************




শাশ্বত বোস


লেখকের জন্ম ১৯৮৯ সালের জানুয়ারী মাসে পশ্চিমবঙ্গের  হুগলী জেলার শ্রীরামপুর শহরে । হুগলী জেলারই রিষড়া শহরে শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম বিদ্যালয় থেকে স্টার মার্কস নিয়ে যথাক্রমে ২০০৫ ও ২০০৭ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন । ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখির সাথে যুক্ত। বিভিন্ন নামী পত্রিকা যেমন সন্দেশ, জোয়ার, কোরক, পথ ও পাঁচালি ইত্যাদি পরিবারের তিনি নিয়মিত সদস্য ছিলেন । বহু স্বনামধন্য লেখক-লেখিকাদের সাথে তিনি বিভিন্ন পত্রিকার শারদসংখ্যায় লেখালিখি করতেন । 

পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষা ও কেরিয়ারের জন্য সাময়িকভাবে সাহিত্যচর্চার জগৎ থেকে বিরতি নিয়েছিলেন । ২০১১  সালে ইলেকট্রনিক্স এন্ড কমিউনিকেশন  ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হবার পর একজন সফল আউটডোর ব্রডকাস্টিং ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে একটি খ্যাতনামা বাংলা স্যাটেলাইট চ্যানেলে যোগ দেন ও পরবর্তীতে তিনি ইন্ডিয়ান নেভি ডেপুটেশনেও কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি একটি নামি বহুজাতিক সংস্থায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কর্মরত । বর্তমানে তিনি পুনরায় সাহিত্যর্চচার জগতে প্রবেশ করেছেন। তার বিভিন্ন লেখালিখির মধ্যে উল্লেখযোগ্য রচনা “অনন্ত বিকেলের রূপকথারা” , “বৈশালী_পাড়ার_প্রতিমা রা”,  “অতঃপর অশুচি বনেদিয়ানা, পুজোর বনসাই এবং .....” ,  "কান্না রাগের 'হোমা পাখি'"  , “ডরাইয়া মরে”, “রূপান্তরের পথে”, “প্রবাসের বিভীষিকা”, “বইমেলা ও একটি গোলাপ”, “পুরোনো মর্গটার কাছে”, এবং “পিশাচসিদ্ধ”, যা একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত এবং ইতিমধ্যেই ইউ টিউবে অডিও স্টোরি হিসেবে সাড়া ফেলে দিয়েছে। এছাড়া ভ্রমণকাহিনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য  “পরবাসী টুসুর দেশে”||
তার লিখিত কবিতাগুলির মধ্যে “একটি ব্যর্থ প্রেমের ক্ষুব্ধ আখ্যান”, “উদ্বর্তিনী”,   “প্রাণের পুজো”, “কালো মেয়ের উপাখ্যান”,  “বাংলা ভাষার দেশ”, “অন্য বসন্ত”, “ ভালোবাসা ও একটি বসন্ত”, “ মন- শরীরী”,  “হে নজরুল”  ,  “সমর শেষের অসিয়ৎনামা”  উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয়||
এই স্বল্প কালেই বহু সংস্থা থেকে তিনি সেরার সেরা সম্মানে ভূষিত | এর মধ্যে “অচেনা পর্বত” সম্মান, রাজার কবিতা studio কর্তৃক প্রদত্ত “অয়ন সৃজন সম্মান” প্রণিধানযোগ্য|


মুক্ত গদ্য * রানি মজুমদার




 কানা মাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাঁকে ছোঁ...        

রানি মজুমদার


আলোটা নিভিয়ে দি? শরম লাগে না বুঝি ? যাঃ চুরিগুলো সব গেলো! দরজা জানলা সব খুলে ফেললে কেমন হয় ? চারিদিক থেকে হাওয়া আসুক  । এত রাতে সূর্য কোথায় পাবো?  এখান থেকেই আরও একটা গল্পের শুরু। প্রেমহীনতায় কে বাঁচিতে চায়? চাদর সরিয়ে তুমি আদর খুঁজছো, আমি খুঁজছি প্রেম। মন তো সেই কৃষ্ণে! হায় রে কালা এ কী জ্বালা বাঁশি শুনে ঘরে...।  এই অন্ধকার জন্মের মত তাঁকে ভুলিয়ে দিক ! এ শরীর এলিয়ে দিলাম, এ জীবন বিলিয়ে দিলাম.... ।।।

দাদা পুঁটিরামটা কোন দিকে? দুপুর দেড়টা। বোধহয় শক্তিপূঞ্জ পাবো না! লোকগুলো বই বই করে অস্থির করে তুলছে, আরে বই লাগবে না ভাই। পেয়ারগুলো খাসা। আরে বই আমার লাগবে না । কাকু ডাব কত? ষাট ! হাওড়ায় নেমে একটা লাল চা খেয়ে নেব। রামরাজাতলা টু  রাজাবাজার !  দুনিয়ায় কত রাজার ছড়াছড়ি ! কী আমার পরিচয় মা ? বয় য়া গার্ল? ছেলেটা কালো তবে সেক্সি !একে বিয়ে করবি? একটা হাওয়া এসে কানে কানে শুধিয়ে গেলো! শীতের দুপুরে বেড়ে রসিকতা ! সেই সরল মুখটার খোঁজে আছি জানো না বুঝি? আমি পুরুষ নই, মেয়ের মতো। আঁচল সরিয়ে দেখবে আমার ভেতরের দুর্গাকে? দাদা দাদা বাস রোকো ! মহানগর কলকাতা! প্যাসেঞ্জার কইলো, সামনে রেডলাইট ! কথাটা শোনা but Third শব্দ is মিসিং ! যাত্রীদের চিল চিৎকার, ও ড্রাইভার ! ছাড়ুন ছাড়ুন,পেছনেরগুলো আগে চলে যাচ্ছে !  ড্রাইভার বলে, দেখছেন না সামনে সিঙ্গেল ! এবার বাস উড়ছে ,দু পাশের জানলা দিয়ে ফুরফুর করে গঙ্গার হাওয়া বইছে। হে মা কালী ! কবে যে সিগন্যাল পাবো, সিঙ্গেল থাকতে আর ভালো লাগে না ....!

মেঘলা আকাশ। পথ ঘাট দেওয়াল উঠোন ভিজে স্যাঁতস্যাঁত করছে । অদ্ভুত একটা হাওয়া বইছেই। কেমন শীত শীত ভাব। ভাবছি কিছু রাঁধতে হবে কিছু খেতে হবে কিন্তু হচ্ছে কই? শরীর মন মাথা লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে! স্মৃতির কত শক্তি ! ভুলিয়ে দাও সব, উড়ে বেড়াই শব সীমানা ছাড়িয়ে। এই ঘর এই দুয়োর জানলা লতাপাতায় জড়ানো নিশ্চুপ অন্ধকার পেরিয়ে সময়কে এবার দূর হতে দেখি, এসো তেল মেখে কাঁঠাল ভাঙতে শিখি। বিশ্বাসেই অস্তিত্ব! আকারের পথ খানিক সোজা।  আত্মায়  মন, শরীরে রক্ত ঘিলু। ঝড় কি সকলেই সইতে পারে? পারে না। তাই ভাবে  তাঁর উপস্থিতি,  মাথা ঠেকানোর আশ্রয়। খুঁটি নাই  তাই লাউয়ের ডগা মাটিতে পড়ে আছে। চোখ বুজলাম, অতল তলে আলোয় চললাম। ছেড়ে যাওয়া সময়, হারিয়ে যাওয়া জীবন .. তবু খুঁটির আগল! জয়রামবাটি, আর বাগবাজার, সকল খুঁটি সেথায় বাঁধা.......

হাওড়া পৌঁছাতে সেই এগারোটা । কতদিন খবর কাগজ পড়িনি। বাদাম কত গো? অনলাইন হবে?  লোকটার দৃষ্টি কী ভারী! আহা দৃশ্য ! জানলা জুড়ে শুধু সবুজ !! ঘর বাড়ি গাছপালা কেমন সো সো করে বেরিয়ে যাচ্ছে। কবি হতে ইচ্ছে করছে । ঝালমুড়ি উঠলে, একটা ঝালমুড়ি খাবো। উফ ছেলেটার গাল দুটো কী লাল! একটা চুমু!  কদিন দুর্গাপুর নিয়ে খুব চলছে !  ধুর,লাল চা উঠছে না! হ্যাঁ,হ্যালো! এখন মানকর ছাড়লো,কোলফিল্ডেই ফিরবো, রাখলাম বুঝলি ? ঘড়ি বলছে নটা । মাঠ ঘাট রৌদ্রে  ভরে গেছে। দিব্যি লাগছে জগৎ টাকে ! এই রৌদ্র, এই মাটি, এই বাতাস, এই সবুজে এতটুকু ভেজাল নেই, যত ভেজাল মানুষে মানুষে। ছোট্ট সফর, শুধু গন্তব্যের অপেক্ষা...!.

একটা সদন। গ্রীন লাইনটা এদিকে? কানের ভেতর উদিত নারায়ণ। ফিল্ম আনমোল। আগলা স্টেশন রবীন্দ্র সদন প্লাটফর্ম ডানদিকে । কিলবিল করছে চরিত্র। পায়ে পায়ে অস্তিত্ব। সময় হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাঁকে ছোঁ...! এরপর রাত এরপর শীতল স্তব্ধ। চারিদিক এত মায়া করে রেখেছ? চরিত্রের দোষ নাকি দুনিয়ার? জড়িয়ে পড়ার জটিলতাই বুঝি জীবন.....?

চোখের নীচে বক্রতল এক বিন্দুতে এসে ঠেকেছে ! দোমড়ানো মোচড়ানো ভীষণ অসুখ! অন্তরের অন্ধকার মুখে-সুখে আঁকিবুঁকি খেলেছে! সংকীর্ণতা কখনও আকাশ দেখে নি। শঙ্কু উল্টে দিলেই বিন্দু হতে সিন্ধুতে যাতায়াত। তবু ব্যামো সারে কই? সহজ সরল সুন্দর এইটুকুই তো লক্ষ্য পথ। জীবনকে মৃত্যু দিয়ে না বুঝলে আকাশ মেলে না । দু চার শব্দ, চার পাঁচ কল্পনা কোন অতল তলে নিয়ে যায় আপনাকে ? ডুবে থাকেন ঋষির মতো! কতদূর পর্যন্ত আপনার যাতায়াত! অতদূর ছুঁতে পারি নে। অবাক চেয়ে দেখি, ভাবনার বিস্তার কোন অনন্ত অবধি! চলার পথে মোড় বাঁক স্থাপত্য ! জীবনকে আত্মা দিয়ে বোঝেন আর এঁকে চলেন লেখায় রেখায়! এই রেখা জন্ম জীবন হতে মৃত্যু পর্যন্ত কিম্বা মৃত্যুকেও অতিক্রম করে। মায়ার মতো ঘোর লাগে! ভাবনায় দাড়ি নেই, মাথার ওপর আকাশটুকুই কি অনন্ত? যতদূর যাবো ততদূর আকাশ, জীবনকে কোন গভীরে নিয়ে যাবো শিল্পী জানেন । উচ্চতার গভীরতায় তিনি জীবন খুঁজে চলেছেন। চলতে চলতেই অনন্তের সন্ধান, যেখানে সব আকাশ একসাথে মিলেছে। হে কবি আপনাকে প্রণাম।

চাল ধুচ্ছি একটু আয়নায় দেখে নিলাম,আশা গাইছেন আধ ঘন্টা নেচে নিলাম। দাঁত মাজতে মাজতে চোখদুটো গোলগোল পাকিয়ে নিলাম। ওরা বলে লুডো খেলার সময়ও ছটফট করি। আমার ছক্কা তোদের পুট! খেয়াল করছি কফি খেলে আজকাল নেশার মতো হচ্ছে । এমন মরশুমে বিয়ে নিয়ে ভাবছি না তা নয় কিন্তু আমি তো পৃথিবী দেখবো । আজ রাতে খাজুরাহ কাল কাশ্মীর। বাসা বাঁধি না শুধু মণ্ডপ সাজাই। অভিযোজন? এক সন্ধ্যায় দশাশ্বমেধ ঘাটে যে রাজপুত্রকে মনে ধরলো, তাঁকে এখন চাই, আজ দুপুরেই চাই। কিন্তু কী করি ঘাটই তো ফাঁকা! সাধেই বলি, হাড়গোড়ের পৃথিবী ?

অস্তিত্ব আছে, উপস্থিতি নেই। বিশ্বাসে বস্তু মেলে না, শান্তি মেলে। তখন থেকে হাওয়ায় বাটিটা দুলে যাচ্ছে, ঝড় উঠলে সবসুদ্ধ ভেসে যাবে । সাজানো সব কিছু, উল্টে দেখলেই ডঙ্কা বাজছে।  যুদ্ধ জয় বটে। একটু জল একটু বাতাস একটু ঘুম, পিছু পিছু দেদার অন্ধকার। আর ফিরছি না, তাই ঘাড় দুলছে। যতদূর পথ ততদূর উপস্থিতি। আসলে সাজানো সব কিছু, বাজিয়ে দেখলেই ভ্যানিশ। 

মাঝে মাঝে জীবনটার ওপর অভিমান হয়। এমন কেন হলাম আমি। আর পাঁচজনের মতো হলে মহাভারত কি অন্যভাবে লেখা হতো? এইটুকু শরীর এত যন্ত্রণা এইটুকু জীবন এত ঝড়। সব বিপদ একা একা সামাল দিয়েছি। একা তো সবসময়। পুজোর দিনগুলো কষ্ট হয়। সবাই ঘুরছে আনন্দ করছে আমি চুপচাপ ঘরে বসে ।

শুনেছি আমাদের ঠাকুরের মাতৃভাব ছিল, রাধা ভাবে ওড়ানা নিতেন। নারী পুরুষ শরীর ভেদাভেদের ওপরে তিনি অতি মানব অতি আত্মা। আর আমরা অতি ক্ষুদ্র যারা ,জীবনকাল শুধু ভেদাভেদের আবর্তেই ঘুরে চলেছি।







*********************************************************************




 রানি মজুমদার 

তৃতীয় লিঙ্গের লেখিকা। 'অন্য নারীর অন্য কথা' লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক।


উপন্যাস * বিশ্বনাথ পাল




বামনের চন্দ্রাভিযান 

পর্ব * ১৪ 

বিশ্বনাথ পাল

 

                             

আমার রিলিফ অফিসারের চাকরিপ্রাপ্তির খবরে মৌমিতার মধ্যেও এক খুশির ভাব লক্ষ করলাম। মৌমিতার মধ্যে যেন আমার প্রেমিকা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো জেগে উঠল। আমরা কয়েকদিন


 







বাইশ



ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করলাম। কখনও ফোনে কথা বলে, আবার কখনও টেক্সট চালাচালি করে।আমি লিখলাম, “ইয়াদ মে তেরি সারি জাঁহা-কো ভুল না চাহতা হুঁ ম্যায়/ ভুলনেওয়ালে কো কভী ইয়াদ আতা হুঁ ম্যায়।”

ইতিমধ্যে অরিন্দমদা একদিন বলল, সোমনাথ, তোমার বান্ধবী মৌমিতার সঙ্গে একদিন আমার আলাপ করাও।

বললাম, বেশ। বলে দেখি।

মৌমিতাকে বলতেই রাজি হয়ে গেল।

আমরা তিনজন একদিন বিকেলের শোয়ে আনোয়ার শাহ রোডে নবীনায় দেখলাম তারে জমিন পার। ছবি দেখার পর বেরিয়ে খানিক গল্প ও এগরোল খাওয়া হল। মৌমিতা যে প্রথম আলাপেই কারও সঙ্গে অসঙ্কোচে মিশতে পারে, আমার তা নজরে পড়ল।

এরপর একদিন অরিন্দমদা আমাকে বলল, সোমনাথ, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।

বললাম, কী কথা বলো?

বলছি, মৌমিতা কিন্তু ভাল মেয়ে নয়।

কেন বলছ এই কথা?

ও শ্রীরামপুরে সৌম্যর বাড়িতে একদিন রাতে ছিল।

সৌম্য কে?

আছে একজন। পর্ণা চেনে। ফিল্ম এডিটিং-এর কাজ করে।

বললাম, দেখো, মৌমিতা আমার বউ-ও নয়, প্রেমিকাও নয়। ও কার সঙ্গে শোবে, কার সঙ্গে রাত কাটাবে এটা ওর একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার তা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে।”

অরিন্দমদা আর কোনও কথা বলল না। অত সহজে কথাগুলো বললাম বটে, কিন্তু বুকের মধ্যে কি কোথাও চিনচিন ব্যথা করল? কে জানে!

মৌমিতার সঙ্গে আমার গল্পগাছা আরও কয়েক দিন স্থায়ী হয়েছিল মনে পড়ে। আমার ব্যাপারে প্রায় নিরুত্তাপ মৌমিতার গলায় উষ্ণতা টের পেলাম। আবেগপ্রবণ ও অন্তরঙ্গ হলে পরে মৌমিতার কণ্ঠস্বর হাস্কি হয়ে যায়। আমি ক’দিন হাস্কি স্বর শুনলাম। রিলিফ অফিসারের চাকরি মৌমিতার বেশ পছন্দ। অতএব হাইকোর্ট ছেড়ে ওই চাকরিতে জয়েন করলে যে ভাল করব এ নিয়ে মৌমিতার কোনও সন্দেহই নেই। একদিন তো বলেই ফেলল, তুই রিলিফ অফিসারের চাকরিতে জয়েন কর, আমি তোর ওখানে যাব। থাকব।

‘থাকব’ কথাটায় বেশ জোর। আমি যার-পর-নাই অবাক হলাম। কিন্তু কিছু বললাম না।

 

মা-কে একদিন বললাম, আচ্ছা মা, আমি যদি কোনও ডিভোর্সী মেয়েকে বিয়ে করতে চাই, তুমি কি আপত্তি করবে?

মা বলল, কাকে মৌমিতাকে?

বললাম, হ্যাঁ।

না, আপত্তি করব না। তোর যদি ভাল লাগে করবি। কিন্তু পরে আবার এই নিয়ে ওকে কোনও খোঁটা দিতে পারবি না।

ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়া আমার মা-কে বেশ অসাধারণ মহিলা বলে মনে হল, যিনি তার ছেলের সুখের জন্য একমাত্র ছেলের বিয়ে ডিভোর্সী মেয়ের সঙ্গে দিতেও প্রস্তুত।

মৌমিতার সঙ্গে কথা বলে একদিন ওকে আমার চাকরি পাওয়ার জন্য খাওয়ানোর দিন ঠিক করা হল। সামনের রবিবার বাইপাশের ধারে উত্তর পঞ্চান্নগ্রামে একটা রেস্তোরায় ওকে খাওয়াতে নিয়ে যাব। এই বিশেষ রেস্তোরাতে নিয়ে যাওয়ার  কারণ এর আগে অরিন্দমদাকে নিয়ে একদিন গিয়েছিলাম ওর-ই পরামর্শে। রেস্তোরাটার পরিবেশ বেশ পছন্দ হয়েছিল। এমনিতে রেস্তোরায় গিয়ে খাওয়ার অভ্যেস নেই আমার। বেকারত্বের গন্ধ যার গা থেকে এখনও যায়নি, তাকে কি ঘন ঘন রেস্তোরাতে যাওয়া মানায়? যাইহোক, রবিবার বিকেলে মৌমিতাদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। আমাকে সোফায় বসিয়ে মৌমিতা শাড়ি পরতে পাশের ঘরে গেল। কাকিমা আমার কাছে এসে খানিকক্ষণ কথা বলে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বেরলাম। বেশ সেজেছিল সেদিন মৌমিতা। গা থেকে পারফিউমের হালকা অথচ মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে আসছিল। একটা উজ্জ্বল খয়েরি রঙের শাড়ি পরেছিল। অটো করে প্রথমে গেলাম গড়িয়া, তারপর গড়িয়া থেকে বাসে উত্তরপঞ্চান্নগ্রামে। রাস্তা পার করার সময় মৌমিতার হাত ধরলাম। কী কী কথা হয়েছিল আজ আর স্পষ্ট মনে নেই। কিন্তু এটুকু মনে আছে বুকের মধ্যে যেন তিস্তার ঢেউয়ের কম্পন অনুভব করেছিলাম। এক অদ্ভুত শিরশিরানি। বামনের চাঁদ ধরার স্বপ্ন কি সত্যি হতে যাচ্ছে? কে জানে! হয়তো খানিকক্ষণের মধ্যেই তা নির্ণয় হয়ে যাবে। আবার মাথার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পাক খেতে থাকেন—“অধিকাংশ বর্বর বিয়েটাকেই মনে করে মিলন, সেইজন্যে তারপর থেকেমিলনটাকে এত অবহেলা।” ‘শেষের কবিতা’-য় পেয়েছি।

রুটি, মাংস, ফ্রাইড রাইস ও স্যালাড খেলাম আমরা। হালকা মিষ্টি আলো জ্বলছিল রেস্তোরায়। খাওয়া শেষ হলে পর বললাম, এখনই বাসে উঠব না, চল না কিছুটা হাঁটি।

মৌমিতা রাজি হল। খানিকক্ষণ হাঁটার পর বললাম, আচ্ছা মৌমিতা একটা কথা বলব?

কী কথা? বল।

তুই আমাকে বিয়ে করবি?

তুই কোনও ভাল মেয়েকে বিয়ে কর। সুখী হবি।

বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। তার মানে মৌমিতা ভাল মেয়ে নয়? অরিন্দমদা যা বলেছিল সেটাই সত্যি? এখানে-সেখানে পুরুষবন্ধুদের কাছে গিয়ে রাতে থাকে মৌমিতা?

বললাম, কেন তুই কি ভাল মেয়ে নোস?

না, বলতে চাইছি তুই কোনও ঘরোয়া মেয়েকে বিয়ে কর।

বললাম, তুই আমাকে কষ্ট দিবি?

দ্যাখ কষ্ট পাস না। বিয়েটা ঠিক আমার জন্য নয়।

আমি কি দ্বিতীয় বার ঠকলামআমার ইউনিভার্সিটির সেই দিনটার কথা মনে পড়লযেদিন খয়েরি পাঞ্জাবি পরে যাওয়ায় মৌমিতার চোখে বিদ্যুৎ দেখিউঠে ওর বেঞ্চে গিয়ে বসে এক ঘণ্টা গল্প করে কীভাবে যে কেটে গেল টের পেলাম না কেউইবিডিজির ক্লাস অফ ছিল সেদিন । চোখের সেই বিদ্যুৎ কি আমাকে প্ররোচিত করেনি ওকে প্রপোজ করতেভুল ছিল সেই দেখাআর এখন ক'দিন আগেও তো আমার মনে হচ্ছিল আমার প্রেমিকা মৌমিতার মধ্যে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো বহুকাল পরে জেগে উঠেছে। আমিও তার প্রেমিক হয়ে উঠছি। ভুল ছিল সেই উপলব্ধি?

আমি আর সাধাসাধি করলাম না। যে মেয়ের একবার ঘর ভেঙেছে, তাকে কি দ্বিতীয়বার ঘর করার জন্য জোর করা যায়? কিন্তু বুকের ভেতরটা যেন হুহু করতে লাগল। আমার এতদিনের সাধ ছিল মৌমিতার যোগ্য হয়ে ওঠা। সেই সাধ বুঝি অধরাই থেকে গেল। মৌমিতা যদি বিয়ে করে সুখী হোত, এই সাধকে বাড়তে দিতাম না। গলা টিপে ধরতাম। কিন্তু মৌমিতার অসুখী দাম্পত্য ও কিছু দিনের অন্তরঙ্গ ব্যবহার যেন মৌসুমী বায়ুর মতো আমার বুকের ঢেউ বাড়িয়ে তুলেছিল এতদিনে। আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম।

পাশাপাশি দু’জন ফুটপাত ধরে হাঁটছি। মৌমিতার গায়ের সুগন্ধ টের পাচ্ছি। কখনও মৌমিতার ডান হাতের আলতো স্পর্শ পাচ্ছে আমার বাঁ হাত। আরও কিছু টুকরো কথাবার্তার পর আমরা রুবির মোড়ে এসে পড়লাম। মনে হল সময়টা যেন কী দ্রুত শেষ হয়ে গেল। আমার এই-ই হয়, মৌমিতার সঙ্গে থাকলে সময় কীভাবে ফুরোয় টের পাই না। মৌমিতা বলল, চল, এবার বাসে উঠি।

একটু দাঁড়াতেই বাস এসে গেল। বাসের মধ্যে মনে আছে মৌমিতা আমাকে বলেছিল, তুই তোর গলাটা একজন অঙ্কোলজিস্টকে দেখিয়ে নিস।

বাবাকে গত বছর হারানোর পরে একত্রিশে ডিসেম্বর নিউ ইয়ার রেজোলিউশন করে সিগারেট খাওয়া ছেড়েছি। প্রথমবার হাসপাতাল থেকে ফেরার সময় বাবাকে ডাক্তারবাবু ধুমপান করতে নিষেধ করেছিলেন। বাবা সেই বারণ শোনেনি। বিড়ি খেত। আমাদের চোখে পড়লে বারণ করতাম, কিন্তু কাজ হোত না। ছ’মাস না কাটতেই প্রাণ দিয়ে যেন ফল পেতে হল বাবাকে। এটা দেখে বেশ ভয় পেয়েছিলাম। দ্বিতীয়ত আমারও গলায় সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সবসময় কেমন কাঁটা কাঁটা লাগে। গলা থেকে কিছুক্ষণ পর পরই শ্লেষ্মা জাতীয় পদার্থ বেরোয়। বাবা বেঁচে থাকতেই এই সমস্যার শুরু। ডাক্তার দেখাচ্ছিলাম। ল্যারিঙজাইটিস, ফ্যারিনজাইটিসএই নাকি রোগের নাম। রক্ত পরীক্ষা হয়েছিল। কিন্তু ওষুধপত্তরে কী যে উপকার হচ্ছিল কিছুই বুঝতে পারতাম না। ফলে বাবার মৃত্যুর তিন মাসের মধ্যে রেজোলিউশন করে সিগারেট ছেড়ে দিলাম। কিন্তু গলার অস্বস্তি আমাকে ছাড়ল না। আমার এই সমস্যার কথা একদিন মৌমিতাকে জানিয়েছিলাম।

সন্দেহটা আমারও হয়েছিল। দীর্ঘস্থায়ী গলার এই সমস্যা ক্যানসার নয় তো? আজ মৌমিতারও এই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ও আরও বলল, রেমেডিতে একজন অঙ্কলজিস্ট বসেন। ডক্টর অবিনাস সরকার। তুই ওখানে একবার দেখিয়ে নে। আমার মা কিন্তু বার বার বলেছে তোকে ডাক্তার দেখানোর কথা বলতে।

আমার মনে মনে হাসি পেল। আমার গলা নিয়ে মৌমিতা যে একেবারেই উদ্বিগ্ন নয়, আমি অসময়ে ফুটে গেলে যে ওর কিছুই যায় আসে না এটা বোঝাতেই কি কাকিমার কথা বলছে?

গড়িয়ায় বাস থেকে নেমে আমরা অটো ধরলাম। বিদায়ের মুহূর্তেও আবার মনে করাল, ডাক্তারটা দেখাস কিন্তু।

বললাম,“ঠিক আছে, দেখাব। কিন্তু কাকিমার কথায় নয়, বল তুই বলছিস, তাহলে ডক্টর সরকারকে দেখাব।

বেশ, আমিই বলছি।

 

এরপর একদিন ডক্টর অবিনাস সরকারের সঙ্গে অ্যাপয়ন্টমেন্ট করে যাই রেমেডিতে। আমার গলা পরীক্ষা করে দুটো টেস্ট করতে বলেন। একটা সোয়াব টেস্ট, আরেকটা গলার মধ্যে মাইক্রো ক্যামেরা ঢুকিয়ে পরীক্ষা। সেলিমপুরের কোন কেন্দ্র থেকে টেস্ট করতে হবে ডাক্তারবাবু তাও বুঝিয়ে দিলেন। টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে যেতেই দেখে বললেন, ভয়ের কিছু নেই।

একরকমের ওষুধ  লিখে দিলেন।

বছর শেষ হয়ে নতুন বছর পড়ল। শীত শেষ হতে চলল। তাও তো দেখি না যে আমার রিলিফ অফিসারের পোস্টিং অর্ডার বেরতে। মনস্থির করে ফেলেছি। কলকাতা থেকে চলে যাব। যেখানেই পোষ্টিং হোক। গ্রামেগঞ্জে গিয়ে গরিব মানুষের উপকারে লাগে এমন কাজ করব। না, উপকার করতে নয়, আমার কর্তব্যবোধেই করব। ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন ত্রাণভবনে গিয়ে জানলাম সামনের মাসে অর্ডার বেরবে।

মার্চের মাঝামাঝি অর্ডার বেরল। হাইকোর্টে নির্দিষ্ট তারিখের উল্লেখ করে রিলিজের আবেদন করলাম।

 

 

তেইশ

এস্টাবলিশমেন্ট সেকশনে গিয়ে মনে করিয়ে এসেছি আমার রিলিজ অর্ডারের কথা। শুনলাম নোটশীট অ্যাপ্রুভ করে অর্ডার টাইপ হয়ে গিয়েছে, এখন শুধু সাহেবের সই করানো বাকি। সই হলেই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে অ্যাপয়ন্টমেন্ট সেকশনে পাঠিয়ে দেবে। আমাকে একা যেতে হয়নি, আমার সঙ্গে পলাশদা গিয়েছে।

ফিরে এসে একটা ফাইল খুলেছি সবে কাজ করব বলে, সুশোভনদা প্রায় চেঁচিয়ে বলল, সোমনাথ, তুই আর আজকের দিনে কাজ করে আমাদের পাপ বাড়াস না। আজ তুই রিলিজড হবি, আজকেও কাজ করবি?

অগত্যা ফাইল বন্ধ করতে হল। সকাল থেকে আমি সকলের কাছে যেন সেলিব্রিটির মর্যাদা পাচ্ছি। সবাই আমাকে দেখছে, অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছে, সমবয়সি সহকর্মী শিবু তো আমাকে জড়িয়েই ধরে বলল, সোমনাথ, আমাদের ভুলে যাবে না তো?

মাত্র নয় মাস এগারো দিনেই হাইকোর্ট আমাকে বড় আপন করে নিয়েছে। হাইকোর্টই আমার কাছে প্রথম প্রতিষ্ঠান, যেখানে আমি গ্রহণযোগ্যতার স্বাদ পাই। স্কুলে প্যারাটিচার ছিলাম যখন সবাই আমার উপস্থিতি ভাল ভাবে নেয়নি। অনেকের আশঙ্কা ছিল আমি তাদের টিউশনির বাজারে ভাগ বসাব। আবার আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা অনেকের সমান বা বেশি বলেও তাদের অস্বস্তি হত। হাইকোর্টে পদেও নীচে ছিলাম, বয়সও কম হওয়া মানুষের অকুণ্ঠ ভালবাসা পেয়েছি। ছোট হয়ে থাকার এই এক সুবিধে—হাত মাটির কাছাকাছি, তাই ভালবাসা কুড়োনো সহজ। অধিকাংশ সহকর্মীর সঙ্গেই আমার দাদা-দিদির সম্পর্ক। তারাও আমাকে তুই করে নাম ধরে ডাকতেন যেন বাড়ির লোক। অথচ আগে কতজনের মুখে যে শুনেছি কর্মক্ষেত্রে নাকি বন্ধু মেলে না। সবাই সবার প্রতিযোগী। পিছন থেকে পিঠে ছুরি মারার জন্য হাত নিশপিশ করে। আমার তো তা মনে হয়নি। সেসব নিশ্চয়ই বেসরকারি ক্ষেত্রে হলেও হতে পারে সরকারি ক্ষেত্রে গ্রেডেশন লিস্ট অনুসারে উপযুক্ত লোকের নির্দিষ্ট সময়ে প্রোমোশন হবে। তাই কাউকে পিছন থেকে ছুরি মেরে এগোনোর প্রশ্ন নেই।

ভালবাসার বন্ধন ছিন্ন করে চলে যাচ্ছি বলে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মনের মধ্যে আবার দ্বিধার তরঙ্গ উঠল। কাজটা কি ঠিক করছি? বাড়িতে বয়স্ক বিধবা মা, অবিবাহিত বোন। এদের ছেড়ে কোন গ্রামেগঞ্জে একা পড়ে থাকব। বাড়ির কোনও জরুরি অবস্থায় আমি যদি উপস্থিত থাকতে না পারি? মা অবশ্য আশ্বাস দিয়েছে, কী হবে? তুই যা, গিয়ে জয়েন কর। তোর দিদি তো পাড়াতেই আছে, সুবিধা-অসুবিধায় আমায় দেখবে। তোর বোনও তো আছে যতদিন বিয়ে না হয়। আর তুই যখন আসবি ন’মাসে ছ’মাসে আমার চেক আপ করাবি, ভয় পাস না।

বাবা মারা যাওয়ার পর মা-কে সুখে রাখার ভাবনা আমার মাথায় বার বার খেলেছে। মৌমিতার কাছে কাঙ্ক্ষিত পাত্তা পাইনি বলে দেবদাস হওয়ার ইচ্ছা আমার ছিল না। বোনেরও বিয়ে দিতে হবে। মনে হল সৎপথে উপার্জিত টাকাকে সংসারী মানুষের অবহেলা করা উচিত  নয়। হাইকোর্টের চাকরির থেকে রিলিফ অফিসারের বেতনের ফারাক দু’হাজার টাকার। পরে তা আরও বাড়বে। বাবার জীবনের শেষ দিন অক্সিজেন-সহ অ্যাম্বুলেন্স জোটেনি। টাকা ছিল না বলেই তো। হয়তো টাকা থাকলে সেইদিনটা বাবার জীবনের শেষদিন হত না। আমি অবশ্য শুধু টাকার জন্য যেতে চাই না। কেরানি থেকে অফিসারের পদে যোগ দেব এটা আনন্দের। আগের দিন যখন বৈকুণ্ঠপুর স্কুলে গিয়েছিলাম অমলেন্দুবাবুর সঙ্গে দেখা করতে, কয়েকজনের চোখে সন্দেহও দেখেছি আমার অফিসারের চাকরির ব্যাপারে। কাদম্বরি যেমন মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই, আমাকেও চাকরিতে জয়েন করে প্রমাণ করতে হবে আমি অফিসারের চাকরি পেয়েছি। জগতে সব সময় অর্থবানরাই জেতে এটা ঠিক নয়, প্রমাণ হবে আন্তরিক ইচ্ছার বাধার পাহাড় পেরনো যায়। এছাড়াও একটু তো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাও হবে, কত মানুষ যে আমাকে ভয় দেখাল রিলিফ অফিসারের চাকরিতে গেলে কী ভয়ানক হেনস্থা হতে হবে, তা দেখার সুযোগ হারাই কী করে!

পলাশদা আমাকে ছায়ার মতো ঘিরে থাকল সারা দিন। একবার তো বলেই ফেলল, তোমাকে তো আর পাব না, তাই আজ একটা মুহূর্ত মিস করতে চাই না।

আমি বললাম, পাবে না কেন বলছ? নম্বর তো থাকলই, ফোনে যোগাযোগ থাকবে।

না, এত কাছে তো পাব না। তবে তুমি সময় পেলে কিন্তু হাইকোর্টে চলে আসবে।

আর একবার পলাশদার আন্তরিকতায় আমার চোখে চলে এল, পলাশদা তা দেখে বলল, দেখো, এখনও সিদ্ধান্ত বদল করবে কিনা বলো?

বললাম, এখনও বদল করা যায়? কীভাবে?

এখনই তাহলে রেজিস্টার জেনারেলকে প্রেয়ার দিতে হবে রিলিজ অর্ডার রিকল করার জন্য।

না, থাক। লোক হাসিয়ে কাজ নেই।

বিধাতার ইচ্ছা একটা সরকারি চাকরি পেলেই যে ছেলে নিজেকে ধন্য মনে করত, তার এখন একাধিক চাকরির সুযোগ। কোনটা ছেড়ে কোনটা করে অবস্থা। আবার প্যারাটিচার থাকার সময় কতদিন এটাও মনে হয়েছে যে এই চুক্তি ভিত্তিক অস্থায়ী চাকরিটাও যদি অন্তত পাঁচ হাজার টাকার মাইনেতে ষাট বছর অবধি স্থায়ী হত!

দুপুরের পরেই বুঝলাম আমার সহকর্মীরা আমাকে এমনি এমনি ছাড়বে না। ফেয়ারওয়েল দেবে। কারণ একটা চামড়ার ব্যাগ সমীরণদা  দেখিয়ে বলল, সোমনাথ  দ্যাখ তো পছন্দ হয় কিনা?

ফেয়ারওয়েল নেওয়া বেশ অস্বস্তির ব্যাপার। কিন্তু ভালবাসার দাবির কাছে কোনও আপত্তি টেকেনি। বিদায়বেলায় স্মৃতি ছাড়া কোনও স্পর্শযোগ্য স্মারক না দিলে সহকর্মীদের খারাপ লাগে। স্কুল থেকেও আমাকে ফেয়ারওয়েল দিয়েছে।

মিতাদি এসে আমাকে বলল, তুই এখন অফিসার। তাই কাঁধে ঝুলিয়ে ব্যাগ নিয়ে যাওয়া মানাবে না। হাতে করে ব্রিফকেসের মতো করে ব্যাগ নিবি।

মিতাদি আমাকে একটা কলম উপহার দিল। কলমটা এখনও আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখা আছে।

সুচন্দ্রাদি আমাকে বলল, তুই এখানে মাথা উঁচু করে ছিলি, ওখানে পারবি না।

মানে ব্লক সার্ভিসে আমাকে আপ করতে হবে। আমি কোনও কথা বললাম না।

এছাড়া ফুল মিষ্টি ও পেন উপহার পেলাম। মিষ্টির প্যাকেটটা মিতাদিকে দিয়ে বললাম, আপনি সবাইকে ভাগ করে দিন।

কেউ বক্তব্য রাখার মতো কোনও ফর্মাল অনুষ্ঠান নয়, কিন্তু আন্তরিকতায় ভালবাসায়, উপহারে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম।

তপনদা একটা সাদা পৃষ্ঠায় আমাকে নিয়ে কবিতা লিখে দিল। শিবু সেই কাগজটায় সকলের স্বাক্ষর করিয়ে আমাকে ফেরত দিল। আমি চোখের জল লুকোলাম।


                   সমাপ্ত 


 

***************************************************************************************