কথা দিয়েছিলাম হেমন্তের নিয়রে
পর্ব * ২১
দীপংকর রায়

এতো ভারি মজা! অর্থ খুঁজে পাই না বলে কি আমি চেয়ে চেয়ে দেখবো না? তাহলে সেই যে, প’রে মামা আইশোদাদের সঙ্গে সঙ্গে, তাদের মতো কাঁধের উপর একখানি গামছা ফেলে দিয়ে, টর্চলাইটটি হাতে করে, গ্রীষ্মের রাত-ভোরগুলিতে এ-বাগান ও-বাগান ও-পথ সে-পথগুলিতে, মাঠের ধারে ধারে, বাগানের পাশের চষা জমিগুলির ঢেলার ভেতর, যদি ছুটে এসে একটি আম পড়ে থাকে কোথাও, সেই আশায়, একটি দুটি আম কুড়োবার জন্যেই-কি শুধু ঘুরে বেড়াতাম ওদের সঙ্গে সঙ্গে? নাকি সেই বেড়াবার আনন্দেই এক অজানা মুগ্ধতা এসে ডেকে তুলতো আমাকে! বলতো চল চল, যাবি না, চল, ওঠ তো দেখি...
সেকি শুধুই প’রে মামা বা আইশোদাদেরই ডাক নাকি শুধু? তাতে কি কোনো অজানা গলার ডাক ছিলো না বলতে চাও?
সেই গলার স্বর শুনতে পেতাম না কি?
তাহলে শুধুই-কি ওদের ডাকেই সাড়া দিতাম!
ছুটে যেতাম কেনো? কেন রাতের বেলায়, শুধুমাত্র শেষ রাতের হাওয়া-বাতাস লাগাবার জন্যেই-কি এই উৎকর্ণ হয়ে থাকা খালি? কখন ওরা আমায় ডেকে নিয়ে যাবে যেন…
সে যেমন গ্রীষ্মের ভোর বেলাতেও, সে তেমন নৌকায় হ্যাজাক জ্বালিয়ে কোঁচ নিয়ে মাছ ধরবার জন্যেও যখন ওদের সঙ্গে নিতাম, তখনো। আমি তাই নিয়ে কত বকাবকিই না শুনেছি দিদিমার। দিদিমা বলেছে, আচ্ছা, কেন যাস তুই? আমি কি তোরে আম খাতি দিতি পারি না একটাও? আমার কি আমের গাছ একটাও নেই? মাছও কি আমি তোরে খাওয়াই না! তাহলি ক্যান তুই এই আন্ধার ধাকতি উঠে ঘুরে বেড়াস ওগের সঙ্গে সঙ্গে, এই কামডার মানে কি একবার কবি আমারে ভাইডি?
এসবের অর্থ সেদিন পরিস্কার করে বলে দিতে পারিনি। চুপ করে থেকেছি খানিকক্ষণ, না হলে বড়জোর হয়তো বলেছি কিছুটা সময় পরে, আমার ভালো লাগে যে দিদিভাই—আমি যে বিশেষ এক ধরণের আনন্দ পাই, কেন যে পাই, তা তো কতি পারবোনানে তোমারে।
আমাদের এই একখানি ঘরের নোনা ধরা দেওয়ালে চুন খসে যেয়ে বিচিত্র এক সাদা সাদা দাগ ভেসে উঠতে দেখেছি ইদানীং। এবং বর্ষার সময় সেটা যেন বেশি হয়। অনেক কষ্টে অশোকদার সাহায্য নিয়ে সেই যে সানের মেঝেটা করেছি, এই তো কিছুদিন আগে, এর আগে প্রায়শই দেখেছি মেঝেতে মাদুর পেতে রাখলে বর্ষার সময় পুয়ে সাপ ওঠে কোথা থেকে; এখন সে সমস্যাটা খানিকটা মিটেছে যদিও। কিন্তু মেঝে করার সময় দেওয়ালের খানিকটা খানিকটা জায়গায় প্লাস্টার চটিয়ে সংস্কার করবার পরেও, সেই খড়ি ওঠা ভাবটা একেবারে যেতে চাইছে না যেন কিছুতেই। ঘরের ভেতরে দরমার সিলিং ও দিয়েছি, সেও নিজেরই উৎসাহে। কিন্তু ইদানীং বাড়তি আর একটি উৎপাত দেখা দিয়েছে, সেটা হলো ঘরের পেছনের বাঁশ-জঙ্গল-থেকেই হবে হয়তো, ইঁদুরেরা সেই দরমার সিলিং-এর উপরে যথেচ্ছাচার দৌড়াদৌড়ি করে বেড়ায়। কখনো কখনো হয়তো পেচ্ছাপই করে দিলো, বুকের উপর। এখন, সেটা ইঁদুর না ছুঁচোর পেচ্ছাপ সেও জানি না যদিও, পেচ্ছাপে বুকের খাঁজ ভরে যায়। সেই রাতে বিছানা ছেড়ে উঠে গায়ে জল ঢালতে হয় কখনো কখনো। না হলে জামা কাপড় পাল্টে ফেলতে হয় অন্তত। ভেতরে ভেতরে কীসের যেন একটা অসহায়তাবোধ পেয়ে বসে কিছু সময়। মনে মনে ভাবি, কীভাবে যে এই টানাটানির সংসার থেকে কিছুটা অর্থ সাশ্রয় করে, এই সমস্যার সমাধান করি যে, সেটাই ভেবে চলি…
উত্তর দিকের জানালার পাল্লা লাগানো নেই। আজও পর্যন্ত সে কাজে মায়ের কোনো মন নেই। ‘চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে যখন তখন দেখা যাবে, যখন যা হয় তাই হবে।’ অথচ কাজের মানুষ না রাখলে তার চলবে না। এই জানালাবিহীন, যাতে দরমার জানলা, তাই দিয়েই এ-বাড়িতে এত লৌকিকতা, শরনার্থী-সেবা, সবই তো হয়ে গেল এতকাল ধরে। সেই সময়গুলিতে যেন এগুলির প্রয়োজন হয়নি। আমিও এর আগে এতটা গুরুত্ব দিয়ে চেয়ে দেখিনি এই বিষয়গুলি; এতরকম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে সবটা এতকাল ধরে! যদি সেভাবে আগে বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতাম তাহলে তো সেই শরনার্থী বেলাতেই দিদিমার সঙ্গে একটা পরামর্শ করে নিয়ে, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে পাল্লাটি লাগিয়ে ফেলা যেতো; কিন্তু কেন যে এই বিষয়টা এতদিন চোখে পড়েনি, সেটাই ভাবছি।
ঘরের পেছন দিকের জানলা খুললে বাঁশ জঙ্গল, ডোবার জলে সেই যে আমার দুপুরবেলার
রোদ-আলোয় লালচে ধরা ডোবার জলের উপর ডাহুক পাখির থেকে থেকে কু…উ…ব… কু…উ…ব …ক..ট্…ক..ট্ …. ক..ট্ করে ডেকে ওঠা, বাঁশ গাছের মাথাগুলি যখন হাওয়া-বাতাসে নুয়ে এসে আমাদের টালির চালের ওপর বাড়ি খায়, তখন রাতের বেলায় আচমকা সেই সরসর … ঝপ ঝপ… বাড়ি খাওয়ার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় আমার। আর ঠিক তখনই মনে মনে ভাবি, হে ঈশ্বর, কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করে ওঠা সম্ভব হবে তা জানি না।
মনে মনে ভাবি, আর আপন মনেই বলি, আহা, আমাদের যদি আর সকলের মতো একটা ছাদ আঁটা বাড়ি থাকতো তাহলে তো আর এতো কষ্ট সহ্য করতে হতো না, ঝড় বাদলে।
আবার খানিকটা সংশোধন করে নিয়ে বলি, সে না হয় থাক, ছাদ না হয় না হোক, সে যেদিন হবার হবে, কিন্তু এইমুহূর্তে তো উত্তুরে হাওয়ার থেকে রক্ষা পেতে হবে! বৃষ্টির সময় যে দরমার পাল্লা পেরিয়ে জল ঢুকে যায়, তার কি কোনো সুরাহাই হতে পারে না? অন্তত কোনোভাবেও যদি হতো এইটুকুন অন্তত!
সমস্ত ক্ষণ এই কথাটিই মাথার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভাবছি এই মাসে না হলেও সামনের মাসে যেভাবেই হোক সংসার খরচার টাকা থেকে বাঁচিয়ে কিছু একটা সমাধান করতে হবেই।
গোপালন থেকে বিশেষ কিছুই থাকছে না বাড়তি। যেন ‘যত্র আয়, তত্র ব্যায়।’ তারমধ্যে থেকেও যেটুকু একটি কৌটোর মধ্যে সংগ্রহ করে রাখা হয়, কিছুদিন যেতে না যেতেই দানাভুসি আনতে যাবার সময় হিসাব মেলাতে যেয়ে দেখি, হিসাব মিলছে না। একশো আর পঞ্চাশের নোটগুলি কোথায়? কুড়ি আর দশের নোট পড়ে আছে কিছু। আর কিছু খুচরো পয়সা তলায় পড়ে আছে। কিছুতেই কিনারা করে ওঠা যায় না, এগুলি নিচ্ছেটা কে?
ওদিকে এ মাস ও মাস ঘুরে সময় ফুরিয়ে যায়, কিন্তু মোড়ের মাথার সেই ফার্নিচারের দোকানটায় যাওয়া আর হয় না কিছুতেই।
যা হোক আচমকা একদিন খানিকটা জোর করেই ভদ্রলোকটির দোকানে উপস্থিত হই, এবং বলি, সামনের মাসে আমারে একটা জানলা বানায়ে দিতি পারবেন সরকারদা? আমি কিছু আগোপ দিয়ে যাতি পারি, বাকিটা নিবানে যহনে তহনেই দিতি পারবানে।
সে তাতে বলে, আগোপ দেবার দরকার কি, মাপটা নিয়ে এসেছো? নাকি যেতে হবে বাড়িতে? তোমাদের টাকা নিয়ে ভাবনা নেই। তোমার মাকে চিনি ভালো করেই। তাই ওসব নিয়ে ভাবছি নে। দেখি, যাবো একদিন দুই একদিনের মধ্যে।
—হ্যাঁ, যাতি তো একবার হবেনেই, আমি কি ওসব পারি? ওসবের কিছুই জানিনে যে।
আজ আর কাল করে করে সরকারদাও আর আসে না। শেষে দিন দশেক পরে মাপজোক নিয়ে গেল দেখলাম এসে একদিন নিজের ইচ্ছেতেই।
মনে মনে ঠিক করি, আচ্ছা সুজিত তো আমার ওদেশের থেকে বানানো সাফারিটা দেখে খুব পছন্দ করেছিলো! জাপানি গ্যাবাডিনের কাপড় দিয়ে বানানো। সেবার চূয়াডাঙ্গায় জোস্না মাসির বাড়িতে গেলে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে আনা হয়েছিলো। সেটা দেখে সুজিতের যখন পছন্দ হয়েছিলো ও তখনেই বলেছিলো, খুব ভালো জিনিস, আমাকে একটা আনিয়ে দিতে পারিস?
মনে পড়ে গেলো হঠাৎই আজ। তাই তাকে ডেকে বললাম, এইটা তো তোর খুব পছন্দ হয়েছিলো বলেছিলি, তা তুই এটা কি নিবি? আমি তো গায়ে দিইনি বেশিদিন। তাই ভাবছি, তোর তো এটা খুব পছন্দ, সেদিন যখন গায়ে দিয়ে দেখতিছিলি টাইনে নিয়ে, দেখতি পাইছিলাম, তোর গায়ে বেশ মানাইছে; তাই বলতিছি কি, আমারও টাকার দরকার, তা তুই যদি নিস, তাহলি কিছু ছাড়ে-ছুড়ে দিয়েই তোরেই দিয়ে দিতি পারি। তুই নিবি কি এডা?
সুজিত রাজি হয়ে যায়। আমারও একটা উপায় বের হয়ে যায় অতি সহজে। চারশো কি পাঁচশো টাকায় সেই সাফারি সুটটা ওকে দিয়ে দিই।
তারপরে যদিও সরকারদা একমাস লাগিয়ে দিয়েছিলো সেই জানলা বানিয়ে দিতে।
দড়মার জানলার পাল্লাটি সরিয়ে সেগুন কাঠের সেই পাল্লাটি ফ্রেমের সঙ্গে লেগে গেলে দেখলাম কী সুন্দর লাগছে আমাকে যেন এই সাফারি সুটটি পড়ে। জানলা নয়, সেই জামাপ্যান্টের সেটটি পড়ে কি সুন্দর সটান দাঁড়িয়ে আছি আমিই যেন।
এর মধ্যেই বাড়ির বাৎসরিক ঠাকুরের উৎসবের দিন এসে যায়। যা এখানে আসার পর থেকেই শুনছি সে নাকি মহা আড়ম্বর করে চলছে বেশ কিছু বছর ধরে। অষ্টপ্রহর নাম সংকীর্তন। আগের দিন অধিবাস হয়, সেও খুব ধুমধাম করে। আর এইবছর তো আরো আড়ম্বর হয়েছে অশোকদার সব আয়োজনে মাথা দেওয়ায়। আমাকে ডেকে বললো, প্যান্ডেলটা সারা উঠোন জুড়েই হয় যেন দেখিস। এত মানুষের জায়গার সংকুলান হয় না গতবছর তো দেখেছি।
নাম সংকীর্তনের দুপুরবেলায় সবে লোকজন খেয়ে-দেয়ে গেছে এমন সময় কোথায় ছিলো ঝড়জল একেবারে হুড়মুড়িয়ে আরম্ভ হয়ে গেলো। অশোকদা তো বারান্দার পিলারের সঙ্গে প্যান্ডেলের বাঁশের খুঁটিটিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখবার চেষ্টা করতে লাগলো দেখলাম। কিন্তু ঝড়ের দাপট তাকে যেন সে কাজ আর করতেই দিতে চাইছে না। অনেক কষ্টে সে সেই কাজ যদিও বেশ খানিকটা পরে পেরে উঠলো দেখলাম, কিন্তু ঘরের ভেতরে উত্তরের জানলা দিয়ে ঝাপটা এসে সব ভিজিয়ে দিতে চাইছে যে! দরমার পাল্লা, এবং তাতে প্লাস্টিকের আচ্ছাদনের আর কতটা ক্ষমতা। দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে থাকলাম তাই। ভিজে যাচ্ছি। আমার এই অবস্থা দেখে নান্টু ও নান্টুর মা এগিয়ে এলো। নান্টু আমার সঙ্গে সঙ্গে সেই দরমার জানলা চেপে ধরে থাকলো। দুজনেই ভিজে যাচ্ছি। তবুও যতদূর পারছি খুব জোরের সঙ্গে চেপে ধরে আছি, সেই দরমার জানলাটিকে সজোরে। নান্টুর মা বলে চলেছে, দেখিস, ছিঁড়ে যায় না যেন, ধরে থাকিস কিন্তু খুব জোরের সাথে…
এই বলতে বলতে কোথা থেকে আর একটি প্লাস্টিক এনে খুব করে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিলো কি কায়দায় যেন টেনে জানলার শিকের ভেতর দিয়ে গলিয়ে দিয়ে নান্টু একাই, আমিও তার এই হঠাৎ বুদ্ধি করা কাজে হাত লাগালাম। বাতাসের যা ঝাপটা তাতে মনে হচ্ছে আর কিছুতেই কিছু হবে না বুঝি, সবটাই ছিঁড়ে-ছুটে না পড়ে; যদিও তখন আর একটি কথাও ভাবছি—ভাগ্যিস ঝড়জলের আগে লোকজনের খাওয়াদাওয়া হয়ে গেছিলো! এটা রক্ষা। তা না হলে আরো একাকার হতো সবকিছু।
উৎসবের বাকি লোকজন যারা ছিলেন কয়েকজন তো বারান্দা জুড়ে আধভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে বসে কোনোরকমে এ ওর গায়ে গা লাগিয়ে রয়েছে কোথাও একটুখানি পাশ খুঁজে নিয়ে।
প্রায় ঘন্টাখানেক এই অবস্থা চললো। তারপরে থামলো।
ঝড়-জল থামলে তাকিয়ে দেখলাম সমস্ত শরীর ভিজেছে, জামাকাপড় একেবারে ভিজে চুপসে আছে গায়ে লেগে। সঙ্গে সঙ্গে নান্টুরও তাই, তার সাদা জর্জেটের জামায় জল লেগে সমস্ত শরীরের সাথে একেবারে লেপ্টে আছে। তার সদ্য কিশোরী থেকে নব যৌবন প্রাপ্তি যেন কোনো এক নতুন বার্তা দিতে চাইছে! তখন কেন জানি না আমার ভীষণ লজ্জা করতে লাগলো ওদের এই প্রাণপন করে আমাদের ঘরের এই দৈন্যকে সামাল দেওয়ার ভূমিকার কথা ভেবে। আবার মনে মনে এ কথাও ভাবছি, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কগুলি যেন এরকমই! কারো কেউ না হয়েও আমরা কীরকম আপন হয়ে উঠি কখন কীভাবে যেন।
সেদিনের সেই ঝড়জলে ওদের এই মুখোমুখি বুক বাধিয়ে দিয়ে দাঁড়ানোকে দেখে, ভেতরে ভেতরে যে বিস্ময় জেগেছিলো, সে কথা যেন কোনোদিনও ভুলবার নয় । যদিও মনে মনে ভাবতে থাকলাম আর একটি কথা, এতো সেই নিতান্ত ছেলেমানুষী বা যৌবনের খানিকটা খুনসুটি করা নয়! বা একটুখানি উত্তাপ নেওয়াও নয়। আজকের এই নিতান্ত আপনজনের সহানুভূতিসুলভ আচরণ যা সবকিছুকে ছাড়িয়ে আরো অনেক বড় কিছু দিয়ে আমাকে যেন নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিলো এমন কিছুর, যা পরিশোধের কথা ভাবাও অন্যায় বা পাপ।
ক’দিন পরে অবশ্য সেই সাফারি সুট বিক্রি করা অর্থের বিনিময়ে জানলার পাল্লা লাগিয়ে দিয়ে গেছিলো সরকারদা। কিন্তু সেদিনের সেই ঝড়জলের আগে যদি লাগিয়ে দিতো সরকারদা জানলার পাল্লা দুটি, তাহলে আজ যে অনুভব জন্মালো ওদের একান্ত সান্নিধ্যে, সেটি হয়তো এমনভাবে হতো না কোনোদিনও।
এতগুলি দিন পেছনে ফেলে এসে আজও সেদিনের সেইসব কথা মাঝে মাঝেই আপন মনে স্মরণ করি। এ রকমের কত মুগ্ধতা, কৃতজ্ঞতা, সহানুভূতি, প্রেমময়তাকে কত ভাবে জ্বালিয়ে দেখি, কত মুহূর্তে যে, আর তাতেই যেন মনে হয় কিছুটা বুঝি বিশুদ্ধতার ছোঁয়া পেলাম; তখন মনে হয়, কোনো এক চতুর্দশীর সন্ধ্যাবেলায় কলার ভেওয়ায় প্রদীপ জ্বালিয়ে যেভাবে ভাসিয়ে দেওয়া হতো, সেই যে ছেলেবেলায় নদীতে দেখতে পেতাম যখন, ভেলাটি ভাসতে ভাসতে বহু দূর ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে যেয়ে, কখনো হয়তো বা দুই-একটি প্রদীপ তাদের ভেতরে, বাকি যেগুলি জ্বলতে থাকে, যতোদূর দেখা যায় তাদের সেই ভাসতে ভাসতে চলে যাওয়াকে দেখতেই থাকি… তারপর একসময় বহুদূরে চলে যেয়ে একেবারেই মুছে যায় তারা। কিন্তু সেই সন্ধ্যাবেলার অনুভব, সেই আনন্দ বেদনা, সেকি সত্যিই একেবারে স্মৃতির বাইরে চলে যেতে পারে কখনো? তাই এতকাল পরেও তার আবার ভেসে ওঠা, কয়েকটি প্রদীপের আলোয় দূর নদীতে সেই কলার ভেওয়াটিকেই যেন দেখতে পাই আবার।
এই রকমের কত সম্পর্কের মধ্যে যে এই জীবন কত অনুভূতিকে আশ্রয় দিল, কতবার তাঁরা এলো, কতবার তাঁরা হাসলো, কাঁদলো, গাইলো মনে মনে, মনখারাপ করালো, একাকী ভাবিয়েও তুললো কতবার; যে বিষয়ের উপস্থিতির কোনো কার্যকারণ স্বরূপ খুঁজে পাওয়া গেল না যেন তাও কিছুই। সে শুধুই দেখতে দেখতে ভাসতে ভাসতেই চললো… ঐ কলার ভেওয়ায় ভাসান চড়েই শুধু… কোন্ সেই অতীত দিনের দেখা গ্রাম্য জীবনে… সকলের সঙ্গে মিলে যে কলার ভেওয়ায় প্রদীপের আলো জ্বালিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হতো, তারপর তারা ভাসতে ভাসতে চলে যেত কত দূরে, যখন আর দৃষ্টিতে ধরে রাখা যেত না, কোন্ ভেওয়াটি কার, কোনটি চলে গেলো কত দূরে তখন ভাসতে ভাসতে…
আগামী পর্বে
*****************************************************************************************


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন