বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

মুক্ত গদ্য * রানি মজুমদার




 কানা মাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাঁকে ছোঁ...        

রানি মজুমদার


আলোটা নিভিয়ে দি? শরম লাগে না বুঝি ? যাঃ চুরিগুলো সব গেলো! দরজা জানলা সব খুলে ফেললে কেমন হয় ? চারিদিক থেকে হাওয়া আসুক  । এত রাতে সূর্য কোথায় পাবো?  এখান থেকেই আরও একটা গল্পের শুরু। প্রেমহীনতায় কে বাঁচিতে চায়? চাদর সরিয়ে তুমি আদর খুঁজছো, আমি খুঁজছি প্রেম। মন তো সেই কৃষ্ণে! হায় রে কালা এ কী জ্বালা বাঁশি শুনে ঘরে...।  এই অন্ধকার জন্মের মত তাঁকে ভুলিয়ে দিক ! এ শরীর এলিয়ে দিলাম, এ জীবন বিলিয়ে দিলাম.... ।।।

দাদা পুঁটিরামটা কোন দিকে? দুপুর দেড়টা। বোধহয় শক্তিপূঞ্জ পাবো না! লোকগুলো বই বই করে অস্থির করে তুলছে, আরে বই লাগবে না ভাই। পেয়ারগুলো খাসা। আরে বই আমার লাগবে না । কাকু ডাব কত? ষাট ! হাওড়ায় নেমে একটা লাল চা খেয়ে নেব। রামরাজাতলা টু  রাজাবাজার !  দুনিয়ায় কত রাজার ছড়াছড়ি ! কী আমার পরিচয় মা ? বয় য়া গার্ল? ছেলেটা কালো তবে সেক্সি !একে বিয়ে করবি? একটা হাওয়া এসে কানে কানে শুধিয়ে গেলো! শীতের দুপুরে বেড়ে রসিকতা ! সেই সরল মুখটার খোঁজে আছি জানো না বুঝি? আমি পুরুষ নই, মেয়ের মতো। আঁচল সরিয়ে দেখবে আমার ভেতরের দুর্গাকে? দাদা দাদা বাস রোকো ! মহানগর কলকাতা! প্যাসেঞ্জার কইলো, সামনে রেডলাইট ! কথাটা শোনা but Third শব্দ is মিসিং ! যাত্রীদের চিল চিৎকার, ও ড্রাইভার ! ছাড়ুন ছাড়ুন,পেছনেরগুলো আগে চলে যাচ্ছে !  ড্রাইভার বলে, দেখছেন না সামনে সিঙ্গেল ! এবার বাস উড়ছে ,দু পাশের জানলা দিয়ে ফুরফুর করে গঙ্গার হাওয়া বইছে। হে মা কালী ! কবে যে সিগন্যাল পাবো, সিঙ্গেল থাকতে আর ভালো লাগে না ....!

মেঘলা আকাশ। পথ ঘাট দেওয়াল উঠোন ভিজে স্যাঁতস্যাঁত করছে । অদ্ভুত একটা হাওয়া বইছেই। কেমন শীত শীত ভাব। ভাবছি কিছু রাঁধতে হবে কিছু খেতে হবে কিন্তু হচ্ছে কই? শরীর মন মাথা লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে! স্মৃতির কত শক্তি ! ভুলিয়ে দাও সব, উড়ে বেড়াই শব সীমানা ছাড়িয়ে। এই ঘর এই দুয়োর জানলা লতাপাতায় জড়ানো নিশ্চুপ অন্ধকার পেরিয়ে সময়কে এবার দূর হতে দেখি, এসো তেল মেখে কাঁঠাল ভাঙতে শিখি। বিশ্বাসেই অস্তিত্ব! আকারের পথ খানিক সোজা।  আত্মায়  মন, শরীরে রক্ত ঘিলু। ঝড় কি সকলেই সইতে পারে? পারে না। তাই ভাবে  তাঁর উপস্থিতি,  মাথা ঠেকানোর আশ্রয়। খুঁটি নাই  তাই লাউয়ের ডগা মাটিতে পড়ে আছে। চোখ বুজলাম, অতল তলে আলোয় চললাম। ছেড়ে যাওয়া সময়, হারিয়ে যাওয়া জীবন .. তবু খুঁটির আগল! জয়রামবাটি, আর বাগবাজার, সকল খুঁটি সেথায় বাঁধা.......

হাওড়া পৌঁছাতে সেই এগারোটা । কতদিন খবর কাগজ পড়িনি। বাদাম কত গো? অনলাইন হবে?  লোকটার দৃষ্টি কী ভারী! আহা দৃশ্য ! জানলা জুড়ে শুধু সবুজ !! ঘর বাড়ি গাছপালা কেমন সো সো করে বেরিয়ে যাচ্ছে। কবি হতে ইচ্ছে করছে । ঝালমুড়ি উঠলে, একটা ঝালমুড়ি খাবো। উফ ছেলেটার গাল দুটো কী লাল! একটা চুমু!  কদিন দুর্গাপুর নিয়ে খুব চলছে !  ধুর,লাল চা উঠছে না! হ্যাঁ,হ্যালো! এখন মানকর ছাড়লো,কোলফিল্ডেই ফিরবো, রাখলাম বুঝলি ? ঘড়ি বলছে নটা । মাঠ ঘাট রৌদ্রে  ভরে গেছে। দিব্যি লাগছে জগৎ টাকে ! এই রৌদ্র, এই মাটি, এই বাতাস, এই সবুজে এতটুকু ভেজাল নেই, যত ভেজাল মানুষে মানুষে। ছোট্ট সফর, শুধু গন্তব্যের অপেক্ষা...!.

একটা সদন। গ্রীন লাইনটা এদিকে? কানের ভেতর উদিত নারায়ণ। ফিল্ম আনমোল। আগলা স্টেশন রবীন্দ্র সদন প্লাটফর্ম ডানদিকে । কিলবিল করছে চরিত্র। পায়ে পায়ে অস্তিত্ব। সময় হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাঁকে ছোঁ...! এরপর রাত এরপর শীতল স্তব্ধ। চারিদিক এত মায়া করে রেখেছ? চরিত্রের দোষ নাকি দুনিয়ার? জড়িয়ে পড়ার জটিলতাই বুঝি জীবন.....?

চোখের নীচে বক্রতল এক বিন্দুতে এসে ঠেকেছে ! দোমড়ানো মোচড়ানো ভীষণ অসুখ! অন্তরের অন্ধকার মুখে-সুখে আঁকিবুঁকি খেলেছে! সংকীর্ণতা কখনও আকাশ দেখে নি। শঙ্কু উল্টে দিলেই বিন্দু হতে সিন্ধুতে যাতায়াত। তবু ব্যামো সারে কই? সহজ সরল সুন্দর এইটুকুই তো লক্ষ্য পথ। জীবনকে মৃত্যু দিয়ে না বুঝলে আকাশ মেলে না । দু চার শব্দ, চার পাঁচ কল্পনা কোন অতল তলে নিয়ে যায় আপনাকে ? ডুবে থাকেন ঋষির মতো! কতদূর পর্যন্ত আপনার যাতায়াত! অতদূর ছুঁতে পারি নে। অবাক চেয়ে দেখি, ভাবনার বিস্তার কোন অনন্ত অবধি! চলার পথে মোড় বাঁক স্থাপত্য ! জীবনকে আত্মা দিয়ে বোঝেন আর এঁকে চলেন লেখায় রেখায়! এই রেখা জন্ম জীবন হতে মৃত্যু পর্যন্ত কিম্বা মৃত্যুকেও অতিক্রম করে। মায়ার মতো ঘোর লাগে! ভাবনায় দাড়ি নেই, মাথার ওপর আকাশটুকুই কি অনন্ত? যতদূর যাবো ততদূর আকাশ, জীবনকে কোন গভীরে নিয়ে যাবো শিল্পী জানেন । উচ্চতার গভীরতায় তিনি জীবন খুঁজে চলেছেন। চলতে চলতেই অনন্তের সন্ধান, যেখানে সব আকাশ একসাথে মিলেছে। হে কবি আপনাকে প্রণাম।

চাল ধুচ্ছি একটু আয়নায় দেখে নিলাম,আশা গাইছেন আধ ঘন্টা নেচে নিলাম। দাঁত মাজতে মাজতে চোখদুটো গোলগোল পাকিয়ে নিলাম। ওরা বলে লুডো খেলার সময়ও ছটফট করি। আমার ছক্কা তোদের পুট! খেয়াল করছি কফি খেলে আজকাল নেশার মতো হচ্ছে । এমন মরশুমে বিয়ে নিয়ে ভাবছি না তা নয় কিন্তু আমি তো পৃথিবী দেখবো । আজ রাতে খাজুরাহ কাল কাশ্মীর। বাসা বাঁধি না শুধু মণ্ডপ সাজাই। অভিযোজন? এক সন্ধ্যায় দশাশ্বমেধ ঘাটে যে রাজপুত্রকে মনে ধরলো, তাঁকে এখন চাই, আজ দুপুরেই চাই। কিন্তু কী করি ঘাটই তো ফাঁকা! সাধেই বলি, হাড়গোড়ের পৃথিবী ?

অস্তিত্ব আছে, উপস্থিতি নেই। বিশ্বাসে বস্তু মেলে না, শান্তি মেলে। তখন থেকে হাওয়ায় বাটিটা দুলে যাচ্ছে, ঝড় উঠলে সবসুদ্ধ ভেসে যাবে । সাজানো সব কিছু, উল্টে দেখলেই ডঙ্কা বাজছে।  যুদ্ধ জয় বটে। একটু জল একটু বাতাস একটু ঘুম, পিছু পিছু দেদার অন্ধকার। আর ফিরছি না, তাই ঘাড় দুলছে। যতদূর পথ ততদূর উপস্থিতি। আসলে সাজানো সব কিছু, বাজিয়ে দেখলেই ভ্যানিশ। 

মাঝে মাঝে জীবনটার ওপর অভিমান হয়। এমন কেন হলাম আমি। আর পাঁচজনের মতো হলে মহাভারত কি অন্যভাবে লেখা হতো? এইটুকু শরীর এত যন্ত্রণা এইটুকু জীবন এত ঝড়। সব বিপদ একা একা সামাল দিয়েছি। একা তো সবসময়। পুজোর দিনগুলো কষ্ট হয়। সবাই ঘুরছে আনন্দ করছে আমি চুপচাপ ঘরে বসে ।

শুনেছি আমাদের ঠাকুরের মাতৃভাব ছিল, রাধা ভাবে ওড়ানা নিতেন। নারী পুরুষ শরীর ভেদাভেদের ওপরে তিনি অতি মানব অতি আত্মা। আর আমরা অতি ক্ষুদ্র যারা ,জীবনকাল শুধু ভেদাভেদের আবর্তেই ঘুরে চলেছি।







*********************************************************************




 রানি মজুমদার 

তৃতীয় লিঙ্গের লেখিকা। 'অন্য নারীর অন্য কথা' লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন