বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

গুচ্ছ কবিতা * অর্ণব সামন্ত

 




কবিতাগুচ্ছ * অর্ণব সামন্ত

সাক্ষাৎকার , আবহমান রহস্যের সঙ্গে 

         

আকর্ষণ করেছে এমনটা নয় আবার 

বিকর্ষণ করেছে তাও নয় 

তবু বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের চেয়েও বেশি টেনেছে 

চৌম্বকীয় টানে , রহস্য ছাড়িয়েছে নীহারিকাকেও 

কবিতাগুলি কোষের বাক্সে পুরেছে , স্নায়ুতে গানগুলি 

ভাবেভঙ্গিতে প্রকাশ করেছে উপন্যাসের দ্বন্দ্ব ও চলন 

দিনরাত্রি বসিয়ে রেখেছে রঙ্গমঞ্চে অসম্ভব নাটকীয়তায় 

সব রহস্য ভেসে যায় ভেসে ভেসে যায় 

অন্তরীণে জমা থাকে সাক্ষাৎকারের সৌন্দর্য্য ও সম্পদ 

ত্রিভুজের তিনটি বিন্দুতে তিন রহস্য 

শুধু যখন ভালোবাসে খরস্রোতা স্রোতস্বিনী হয়ে ছুটে যায় 

সাক্ষাৎকারের কোলাজ , মন্তাজ নিয়ে 

কবিতাগুলি ব্ল্যাকহোল থেকে সমান্তরালে নেমে 

অন্য কবিতা অন্য যাপন হয়ে অন্য ভাবে প্রকাশিত হয় !



টিউলিপের প্রেমপর্ব 

                 

টিউলিপ বর্ষারাতকে মনে রাখেনি 

সে বরঞ্চ এক হাতে রুটি করে গেছে 

সামলেছে গেরস্থালি , বিভিন্ন দাবি দাওয়া 

অন্য হাতে অভয়ারণ্যে জ্যোৎস্নাবৃক্ষ রোপণ করেছে 

সহজ হবার জন্য সহজ গান গেয়েছে গুনগুন আড়ালে 

নৈঃশব্দের কাছে রেখেছে জন্মজন্মান্তরের ঋণ 

মেলে ধরেছে নিজেকে মাতাল দখিনায় কামিনীর মতো 

ললন্তিকা , নূপুর খুলে নিজের বকুলগন্ধে ডুবিয়েছে

গোঁসাইকে 

যাচ্ছেতাই ভাসানে ভেসে যাবে বলে দুজনে কূজনে !



বালুচরীর স্রোত 

     

স্রোতকে ভুলতে চেয়েছি বালুচরীতে 

বালু আর চরী দুটি শব্দের উচ্চারণে 

মনে পড়ে চোরাবালির কথা যেখানে মানুষ 

হাজার চেষ্টা করেও বাস্তবিক চক্রব্যুহে পড়ে যায় 

অভিমন্যুর থেকে বড়ো হবার চেষ্টা করেও পারে না 

আকন্ঠ মায় আমস্তক ডুবে যায় সহজিয়া ভঙ্গিতে 

একটি সহজ গান গাইতে গাইতে , যার মর্মকথা 

বেদনার বালুচরে খেলাঘর বাঁধার ইচ্ছা 

মহাকালের বিন্দুর চেয়েও আরও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু 

অথবা প্রায়ই শূন্য শূন্যপুরের যার অনায়াস যাতায়াত 

স্রোত বন্ধ হলেও তার মধ্যে আগুন থাকে 

যা সেই স্রোতস্বিনীকে বা অন্তরঙ্গ হওয়া মানুষজনকে 

পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় , কখনো সখনো স্রোত দৃশ্যমান 

না হলে ফল্গুভাবে বহমান হয় , তার চোরাবালিতে 

সে প্রিয়জনকে গ্রাস করে আনন্দ পায় 

তবে সে মৃত্যু মৃত্যু নয় মৃত্যুর অধিক মৃত্যু 

যার সঞ্জীবনী সুধা পানে জীবন পেয়ে যায় 

জীবনের থেকেও বেশি জীবন ,

তখন স্রোতস্বিনী সমুদ্রে হারায় নাকি 

সমুদ্র স্রোতস্বিনীতে হারায় তার জন্য 

কোনো ভূগোলবিদ বা সেচদপ্তরের আধিকারিককে লাগবে না 

কিংবা জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন করার টারবাইন বা ইঞ্জিনিয়ার

 দরকার নেই 

শুধু স্রোত বসে থাকে , হেঁটে বেড়ায় , ছোটে সহজ পোশাকে 

সরল ভঙ্গিতে , অক্ষরে অক্ষরে ঢেউ লাগে 

বিবর্তনে বিবর্তনে পরিবর্তনই ধ্রুবসত্য বলে 

এক জীবন অন্য জীবনের ঠোঁটে চুমু খায় 

আর শিষ দিতে দিতে উদাত্ত গান গেয়ে ওঠে 

সমুদ্র ফেনায় , জ্যোৎস্নায় , স্পন্দনে , কম্পনে , আনন্দের

অর্গাজমে !



জ্যান্ত বাইসন , আলতামিরার গুহায়

         

আলতাপরা আলতামিরা খুঁজে ফেরে বাইসন 

কোনো এক শরৎ দুপুরে শিউলীর গন্ধে মাতাল চোখ 

পদ্মফোটা পুকুরের তোলপাড় ঘটে ভেতরে , বাইরে 

পাহাড় পর্বত উপত্যকা গড়িয়ে খরস্রোতা নেমেছে

মোহনায় , ভুলে গেছে জাগতিক শুধু নির্ভেজাল 

আদির পুরুষ ও নারী জাগরুক বাস্তবে ছিন্নভিন্ন দারুন

 সাজানো খেলায় 

তবু তিলককামোদে বয়ে আনে ইমন , দরবারী কানাড়ার সুর 

তারপর অপেক্ষা রাখে ঘাসের শিশিরে , আধফোটা পদ্মে 

রক্তস্নায়ুমেদমজ্জখহৃদে আন্দোলিত হয় সুখস্য সুখের হাওয়া 

বাইসন দেখে অবাক হওয়া নয়ন , বাস্তবে করে স্বপ্নসুন্দরের

 বাস্তবায়ন 

মানবমিথুনে উঠে আসে এককের ঝঙ্কার বুকে বুক মুখে মুখ 

অন্তরে অন্তর পরম পরম সুখের পরমা সুন্দরী ও সুন্দরের

 কবিতাযাপন !



জ্যোৎস্নার পান্ডুলিপি 

    

জ্যোৎস্নার নম্রনত পান্ডুলিপি ছুঁয়েছে পদপ্রান্ত তোর 

আর তুই সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে স্নানঘাটে 

জ্যোৎস্নার চেয়েও আরও বেশি মেদুর , উজ্বল জ্যোৎস্না 

দিয়ে যাস রঙীন মাছেদের খেলায় -----

হে অরণ্যে কপোত কপোতী গ্যাছে নির্জন বাসে 

হাওয়া কয়েক মুহূর্তেই মেঘের সংঘর্ষেই এনেছে দৃষ্টিপাত 

দিবারাত্রির কাব্যে একই ছাতার নীচে মানবমিথুন 

তিলককামোদ বেজে ওঠে রেমব্রান্টের হলুদ আলোয় 

বিনিময়ে বিনিময়ে বিঠোফেন সিম্ফনি স্নায়ুকোষেরক্তে 

ভরভরন্ত প্রাণ চলকে ওঠে ব্ল্যাকহোলের গর্ভে

টুকরো কথায় কথায় নেমে আসে সমান্তরালে

পার্থিবে অপার্থিব সুখের উজানের স্রোত বেয়ে !



মুখড়া 

                   

মুখড়া তৈরী হতে মুখশ্রী ও মুখোশ দুই লাগে 

মুখশ্রী সুন্দরী বা কুৎসিত হোক সেটা কোনো ব্যাপার না 

মুখোশ ভীতিপ্রদ বা হাস্যকর কিনা জানার দরকার নেই 

মন মন তোমার শরীর নেই , মনের মতন শরীর নেই 

যে শরীরে ফুটে উঠবে তোমার মনের ইচ্ছা কামনাবাসনার

 প্রতিফলন 

তারার কোমল গান্ধার ছুঁয়ে আর্তনাদ বা সোচ্চার প্রতিবাদ বেরোবে 

হলুদ আঁধারে বসে থাকবে রেমব্রান্ট চোখ 

সেজানের সাত স্তর খুঁড়ে খুঁড়েও মন পাওয়া যাবে না 

একবার শুরু হলে তার শেষ হবে 

কিন্তু যদি শুরু বা মুখড়া তৈরী না হয় 

তবে গানটি গর্ভাবস্থায় থেকে সদ্যোজাতের আগের অবস্থায় থাকবে 

অথবা আকাশে ভেসে বেড়াবে সাদা মেঘের মতন 

পদার্পণ করবে না অন্ধকার পরবর্তী আলোয় 

কিংবা শিমূল বীজের মতন সারা জীবন ভেসে বেড়াবে 

এইভাবে তার নাগালের জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে 

অনুসন্ধানকারীদের জীবন সহজ সরল গান হয়ে যাবে !




  








******************************************************************



অর্ণব সামন্ত

                                                                   

ইংরাজী ভাষার ছাত্র। ইংরাজীতে এম. এ ; বি . এড ।উনিশশো তিয়াত্তর সালে দক্ষিণ ২৪ পরগণার বাসন্তীতে জন্মালেও স্কুল জীবনের পর থেকে শহরতলীতে আবাস । শিক্ষকতা পেশা , নেশা কবিতা লেখা । এ পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ , ৪টি - গোলাপ এবং , ঝরা সময়ের উপকথা , পারমিতা , বামাক্ষী । পেশাগত সময় বাদে গান শোনা , বইপড়া , ফোটোগ্রাফি , কবিতা লেখাকেই জীবন যাপনের একমাত্র উপায় বলে মনে করেন।

                   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন