বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

গুচ্ছ কবিতা * মনোজ বাগ





কবিতাগুচ্ছ * মনোজ বাগ 


কেউ ফেলনা নয় 

আমি দেখতে দেখতে শিখি ।

শুনতে শুনতে , 

স্পর্শে , অনুভূতিতে বস্তুটাকে , ব্যক্তিটাকে ঠাওর করতে করতে শিখি ।


খোলা গ্রন্থের মতো মেলা একটা জগৎ ।

তাতে জড় আছে , জীবন আছে ।

কেউই কারোর মতো নয় ।

সবাই আলাদা আলাদা - অন্য অন্য ।


এই অন্য অন্য বস্তু ও জীবনগুলোকেই ধারণ করে আছে যে বিরাট একটি ক্ষেত্র ,

তার আদিগন্ত সবুজে সবুজ 

কোথাও ধূসর - মাটি রঙের ।

তার আকাশ কোথাও এতটাই স্বচ্ছ যে

দেখে মনে হয় যেন শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে ।

কোথাও বা ঘষা কাঁচের মতো ।


এর সবটাই এক করে দেখলে 

ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা বস্তুসর্বস্ব নিজস্বতাগুলো  সেভাবে আর নজরে আসে না ।

এর উল্টো হলে -

একটি একটি ব্যক্তি বা বস্তুর 

বর্ণ গন্ধ সৌষ্ঠবেই মন ম'জে থাকলে ,

তখন ভাবনা থেকে 

দিগন্ত জোড়া ভূমি , আদিগন্ত আকাশের ধারণা উভে যায় ।


আমি এর সমাধান পাই 

"বিন্দুতে বিভু"- এই ধারণায় । 


এক কণা বালিও ধারণ করে আছে  

বিরাটের ভাব -

এক বিন্দু জলেও প্রতিবিম্বিত হয়ে আছেন বিভু স্বয়ং -

জীবনে এটা সম্ভব ।


কণামাত্র ধুলোকেও তাই আর 

ফেলনা মনে হয় না ।



বক্তা

স্টক ফুরিয়ে গেলেই অতি বড় নেতাও 

মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে চুপসে যান। 

কী বলতে গিয়ে কী বলে ফেলবেন -

একটা অনিশ্চয়তার ভয়ে !

এই ভয় সদ্-অর্থের ।

আবোল-তাবোল বকার চেয়ে এই মৌনতা শ্রেয় । 


নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন 

সহজাত অভ্যাসের মতো কম বেশি 

তবু আমাদের সবারই আছে ।

নেতা হয়তো আমরা অনেকেই নই ।

কিন্তু বক্তা সবাই । 

এই বলাটা চলে নিজের সঙ্গে নিজের।

এই বলাটা মানুষ বলে নিজেকে নিজেই ।


মুখের সামনে কোন অ্যামপ্লিফায়ার নেই ।

ডায়াসের সামনে অগুনতি 

ধড়-কাটা , মুন্ডু-কাটা জনতা নেই - 

আছে প্রবহমান একটা অদৃশ্য ধারা ।

যা সময়ের , যা সংস্কৃতির , যা সংস্কারের , 

যা আবহমান কালের শিক্ষার , রুচির ...



বহতা পানি 

আগরবাতির মতো জ্বলছি 

আর গন্ধ ছড়াচ্ছি যতটা সম্ভব ।

এটুক্ ছাড়া জগতে আর কোন নিবেদন আমার নেই !


চলে যাচ্ছি ।

জীবন একটা যাত্রা ।

অলিগলি থেকে রাজসরণি -

যে কোন রাস্তাই আসলে ডহর ,

মাড়িয়ে মাড়িয়ে চলেছি 

রেখার মতো টানা দীর্ঘ একটা যাত্রায় ।


যাত্রা দীর্ঘ -

তাই আঁকড়ে ধরিনি কিছুই । 

নিজের বলে দাবিও করিনি কাউকেই ।

বহতা পানি - বয়ে যাচ্ছি ।



হাঁদাবোকারা 

চেয়ে আছি বোকার মতো ।

বোকারা যেমন চেয়ে থাকে -

যেন দেখছে সবই কিন্তু বুঝছে না কিছুই । 


বোকাদের চোখ থেকেও নেই ।

মুখ থেকেও বোবা হয়ে থাকে ।

বোকারা বেটোফেনের মতোই বধির বলেই 

আজ পর্যন্ত এ সমাজ জেনে এসেছে ।


তবুও টিভির চ্যানেল কোম্পানিগুলো 

তাদের গুরুগম্ভীর সব টক-শোগুলো 

বছরের পর বছর চালিয়ে যান 

এই সব হাঁদাবোকাদের ভরসাতেই ।

রাষ্ট্রনেতা থেকে বিজনেস টাইকুন - 

এঁদের বিলিয়ন ট্রিলিয়নের সব গল্পগুলো ফাঁদা -  

এই সব হাঁদাবোকাদের কথা ভেবেই ।


অথচ সেই দাপর যুগের থেকে আজ পর্যন্ত 

এই আমরা মানে হাঁদাবোকারা , 

নিজেদের নিয়েই ম'জে আছি 

কতকটা কস্তুরি মৃগের মতো 

আর হন্যে হয়ে ছুটে মরছি দিক-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে 

অদৃশ্য কিছু একটার পিছনে -


যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন শিকারী 

খুব সন্তর্পনে এসে 

আমাদের নাভি কুন্ডলির পাশে বেড়ে ওঠা দুর্মূল্য গ্রন্থিটিকে কেটে নিয়ে যায় ।



ভর

জলে চোবানো গামছার মতো নিজেকে নিংড়াই । 

তারপর মেলে দিই কল্পনার বারান্দায় ।

বেলা থাকতে থাকতেই রোদের হলকায় ভিতরের জোলো ভাবটা শুকিয়ে যায়। 


খটখটে শুকনো ওই আমিটাকে নিয়ে 

এরপর টান টান হয়ে ঘুরে দাঁড়াই নিজেরই সামনে । 


নিজেকে কেউই মিথ্যে বলে না ।

নিজের কাছেও গোপন রাখতে হয় ,

তেমন গোপনতা কারোর থাকেও না ।

যদিও কোন না কোন অতিরঞ্জন 

সুগন্ধী দ্রব্যের মতো একটু আধটু থাকে ।


সারা ঘরময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আসবাব স্বভাবসিদ্ধ মৌনতায় চেয়ে আছে ।

আমি দেখছি আমাকে ।

দেখছি , তামঝামহীন একটা ছাপোষা মানুষ - 

যার আগে পিছে নাম মাত্র কেউ কেউ আছে - কিছু আছে ।

ভারহীন মানুষেরও যেমন কিছুটা ভর থাকে 

অভিকর্ষের কারণে ।











*********************************************************************************************



মনোজ বাগ

পেশায় ব্যবসাজীবী । কবিতা বেঁচে থাকার রসদ ; অনিবার্য এক ইন্ধনও । প্রিয় কবিতার গ্রন্থ : গীতা , ঈশোপনিষদ , গীতবিতান , আমিই মাটি , আমিই আকাশ (সুজিত সরকার) । কবিতা প্রিয় বিষয় হলেও সাহিত্যের প্রতিটি শাখাই টানে । সঙ্গীত ও চিত্রকলার প্রতিও প্রবল আকর্ষণ আছে । ভালো লাগে ভাবতে : আপাত যা কিছু -- এই সবই এক পরম সত্যেরই প্রকাশ ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন