কবিতাগুচ্ছ * মনোজ বাগ
কেউ ফেলনা নয়
আমি দেখতে দেখতে শিখি ।
শুনতে শুনতে ,
স্পর্শে , অনুভূতিতে বস্তুটাকে , ব্যক্তিটাকে ঠাওর করতে করতে শিখি ।
খোলা গ্রন্থের মতো মেলা একটা জগৎ ।
তাতে জড় আছে , জীবন আছে ।
কেউই কারোর মতো নয় ।
সবাই আলাদা আলাদা - অন্য অন্য ।
এই অন্য অন্য বস্তু ও জীবনগুলোকেই ধারণ করে আছে যে বিরাট একটি ক্ষেত্র ,
তার আদিগন্ত সবুজে সবুজ
কোথাও ধূসর - মাটি রঙের ।
তার আকাশ কোথাও এতটাই স্বচ্ছ যে
দেখে মনে হয় যেন শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে ।
কোথাও বা ঘষা কাঁচের মতো ।
এর সবটাই এক করে দেখলে
ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা বস্তুসর্বস্ব নিজস্বতাগুলো সেভাবে আর নজরে আসে না ।
এর উল্টো হলে -
একটি একটি ব্যক্তি বা বস্তুর
বর্ণ গন্ধ সৌষ্ঠবেই মন ম'জে থাকলে ,
তখন ভাবনা থেকে
দিগন্ত জোড়া ভূমি , আদিগন্ত আকাশের ধারণা উভে যায় ।
আমি এর সমাধান পাই
"বিন্দুতে বিভু"- এই ধারণায় ।
এক কণা বালিও ধারণ করে আছে
বিরাটের ভাব -
এক বিন্দু জলেও প্রতিবিম্বিত হয়ে আছেন বিভু স্বয়ং -
জীবনে এটা সম্ভব ।
কণামাত্র ধুলোকেও তাই আর
ফেলনা মনে হয় না ।
বক্তা
স্টক ফুরিয়ে গেলেই অতি বড় নেতাও
মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে চুপসে যান।
কী বলতে গিয়ে কী বলে ফেলবেন -
একটা অনিশ্চয়তার ভয়ে !
এই ভয় সদ্-অর্থের ।
আবোল-তাবোল বকার চেয়ে এই মৌনতা শ্রেয় ।
নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন
সহজাত অভ্যাসের মতো কম বেশি
তবু আমাদের সবারই আছে ।
নেতা হয়তো আমরা অনেকেই নই ।
কিন্তু বক্তা সবাই ।
এই বলাটা চলে নিজের সঙ্গে নিজের।
এই বলাটা মানুষ বলে নিজেকে নিজেই ।
মুখের সামনে কোন অ্যামপ্লিফায়ার নেই ।
ডায়াসের সামনে অগুনতি
ধড়-কাটা , মুন্ডু-কাটা জনতা নেই -
আছে প্রবহমান একটা অদৃশ্য ধারা ।
যা সময়ের , যা সংস্কৃতির , যা সংস্কারের ,
যা আবহমান কালের শিক্ষার , রুচির ...
বহতা পানি
আগরবাতির মতো জ্বলছি
আর গন্ধ ছড়াচ্ছি যতটা সম্ভব ।
এটুক্ ছাড়া জগতে আর কোন নিবেদন আমার নেই !
চলে যাচ্ছি ।
জীবন একটা যাত্রা ।
অলিগলি থেকে রাজসরণি -
যে কোন রাস্তাই আসলে ডহর ,
মাড়িয়ে মাড়িয়ে চলেছি
রেখার মতো টানা দীর্ঘ একটা যাত্রায় ।
যাত্রা দীর্ঘ -
তাই আঁকড়ে ধরিনি কিছুই ।
নিজের বলে দাবিও করিনি কাউকেই ।
বহতা পানি - বয়ে যাচ্ছি ।
হাঁদাবোকারা
চেয়ে আছি বোকার মতো ।
বোকারা যেমন চেয়ে থাকে -
যেন দেখছে সবই কিন্তু বুঝছে না কিছুই ।
বোকাদের চোখ থেকেও নেই ।
মুখ থেকেও বোবা হয়ে থাকে ।
বোকারা বেটোফেনের মতোই বধির বলেই
আজ পর্যন্ত এ সমাজ জেনে এসেছে ।
তবুও টিভির চ্যানেল কোম্পানিগুলো
তাদের গুরুগম্ভীর সব টক-শোগুলো
বছরের পর বছর চালিয়ে যান
এই সব হাঁদাবোকাদের ভরসাতেই ।
রাষ্ট্রনেতা থেকে বিজনেস টাইকুন -
এঁদের বিলিয়ন ট্রিলিয়নের সব গল্পগুলো ফাঁদা -
এই সব হাঁদাবোকাদের কথা ভেবেই ।
অথচ সেই দাপর যুগের থেকে আজ পর্যন্ত
এই আমরা মানে হাঁদাবোকারা ,
নিজেদের নিয়েই ম'জে আছি
কতকটা কস্তুরি মৃগের মতো
আর হন্যে হয়ে ছুটে মরছি দিক-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে
অদৃশ্য কিছু একটার পিছনে -
যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন শিকারী
খুব সন্তর্পনে এসে
আমাদের নাভি কুন্ডলির পাশে বেড়ে ওঠা দুর্মূল্য গ্রন্থিটিকে কেটে নিয়ে যায় ।
ভর
জলে চোবানো গামছার মতো নিজেকে নিংড়াই ।
তারপর মেলে দিই কল্পনার বারান্দায় ।
বেলা থাকতে থাকতেই রোদের হলকায় ভিতরের জোলো ভাবটা শুকিয়ে যায়।
খটখটে শুকনো ওই আমিটাকে নিয়ে
এরপর টান টান হয়ে ঘুরে দাঁড়াই নিজেরই সামনে ।
নিজেকে কেউই মিথ্যে বলে না ।
নিজের কাছেও গোপন রাখতে হয় ,
তেমন গোপনতা কারোর থাকেও না ।
যদিও কোন না কোন অতিরঞ্জন
সুগন্ধী দ্রব্যের মতো একটু আধটু থাকে ।
সারা ঘরময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আসবাব স্বভাবসিদ্ধ মৌনতায় চেয়ে আছে ।
আমি দেখছি আমাকে ।
দেখছি , তামঝামহীন একটা ছাপোষা মানুষ -
যার আগে পিছে নাম মাত্র কেউ কেউ আছে - কিছু আছে ।
ভারহীন মানুষেরও যেমন কিছুটা ভর থাকে
অভিকর্ষের কারণে ।
*********************************************************************************************
পেশায় ব্যবসাজীবী । কবিতা বেঁচে থাকার রসদ ; অনিবার্য এক ইন্ধনও । প্রিয় কবিতার গ্রন্থ : গীতা , ঈশোপনিষদ , গীতবিতান , আমিই মাটি , আমিই আকাশ (সুজিত সরকার) । কবিতা প্রিয় বিষয় হলেও সাহিত্যের প্রতিটি শাখাই টানে । সঙ্গীত ও চিত্রকলার প্রতিও প্রবল আকর্ষণ আছে । ভালো লাগে ভাবতে : আপাত যা কিছু -- এই সবই এক পরম সত্যেরই প্রকাশ ।



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন