মিথ
সুধাংশুরঞ্জন সাহা
বীরভূমের মালঞ্চ পাহাড়ের খুব কাছেই বাস করত একটা আদিবাসী পরিবার। তাদের ছিল একটি কন্যাসন্তান। কন্যাটি অপরূপা সুন্দরী। পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষা একটি শালের চারায় সে রোজ জল ঢালত। তারপর সেই চারাগাছকে পুজো করত। এই পথ দিয়েই কাজে যেত এক যুবক। যেতে আসতে প্রেমে পড়ল মেয়েটির। ঠিক করল ওকেই বিয়ে করবে।
একদিন ছেলেটি তার মাকে জানায় তার ইচ্ছের কথা। কিন্তু বাড়ির লোক রাজি হয় না। কারণ মেয়েটি নিচু জাতের। আদিবাসী সম্প্রদায়ের। ছেলে জেদ ধরে বসল। এই মেয়েকেই সে বিয়ে করবে। এমন অপৃর্ব সুন্দরী মেয়ে সে কখনো দেখেনি। শেষ পর্যন্ত ছেলের জেদের কাছে, বাধ্য হয়ে, হার স্বীকার করে নেয় পরিবার। মেয়ের পরিবারের কাছে প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু মেয়েটির মা-বাবা সেই প্রস্তাবে রাজি নয়। কারণ তারা নিচু জাতের এবং গরিব। উঁচু জাতের বড়ো বাড়িতে বিয়ে হলে তাদের মেয়ে সুখী হবে না, তাদের আশঙ্কা।
এই প্রেক্ষাপটে ছেলেটি জানায় যে, তাদের মেয়ের যাতে কোনোরকম সম্মানহানি না হয় সেটা সে দেখবে। মেয়েটির মা-বাবা তখন জানায়, ঠিক আছে মেয়ে রাজি থাকলে তাদের কোনো আপত্তি নেই। এরপর মেয়েকে জিজ্ঞাসা করা হল। মেয়েটি বলল, সে একটা শর্তে বিয়ে করতে রাজি। সে যে শালের চারায় জল দেয়, সেই চারাগাছকে ছেলের বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যাতে সে বিয়ের পরে প্রতিদিন গাছে জল এবং পুজো দিতে পারে। ছেলের পরিবার এই শর্তে সম্মত হওয়ায় ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল।
কথানুযায়ী শালগাছটি বাড়ির উঠোনে স্থাপন করা হয়। মেয়েটি রোজ ঘুম থেকে উঠে স্নান করে পবিত্র মনে শালগাছে জল দেয়, পুজো করে। তারপর বাড়ির অন্য কাজকর্ম করে। বেশ সুখে শান্তিতেই চলছিল সংসার। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন সইল না কপালে। পাড়া প্রতিবেশী পাঁচ কান করতে লাগল যে, নিশ্চয়ই বউয়ের মাথায় গণ্ডগোল আছে। না হলে এতো দেবদেবী থাকতে কেন গাছের পুজো করবে! এটা মোটেই শুভ লক্ষণ নয়। প্রথম প্রথম দু'চারজন, তারপর গোটা গ্রাম একই কথা বলতে শুরু করে। ছেলের মা-বাবাকে বোঝায়। গোরার দিকে মা-বাবা গা করেনি ব্যাপারটায়। শেশমেশ বিশ্বাস করে বসে যে, সত্যিই বউয়ের মাথায় দোষ আছে। তারা গাছ পুজোয় আপত্তি জানায়। মনের দুঃখে বাড়ির বউ গাছ পুজো বন্ধ করে দেয়।
কিছুদিন যেতে না যেতেই ওই পরিবারে এবং গ্রামে নানারকম বিপদ আপদ হতে লাগল। নানাবিধ জটিল অসুখ বিসুখ, মৃত্যু, টাকা পয়সার টানাটানি, চাষাবাদ, ফসলের অভাব, অনটন। খুবই বাজে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। গ্রামের মানুষ বাধ্য হয়ে গ্রামের পুরোহিতের স্মরণাপন্ন হয়। পুরোহিত মশায় সব শুনে তিন দিন ধরে পুজো আচ্চা করেন। বড়ো করে যজ্ঞ করেন। পুজোপাঠ শেষে পুরোহিত গ্রামের সবাইকে ডেকে পাঠান। বলেন, এই বিপদের কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে। গ্রামের একজনকে শালগাছ পুজো করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। সেই কারণেই এই বিপত্তি। ওই শালগাছেই আছেন মারাংবুরু দেবতা।
অগত্যা গ্রামের মানুষের আর্জিতে মেয়েটি আবার শালগাছকে পুজো করতে শুরু করে। গ্রামে আবার সুখ সমৃদ্ধি ফিরে আসে। তখন থেকেই পাহাড় অঞ্চলের সব জাতের মানুষ শালগাছকে মারাংবুরু দেবতা হিসেবে মান্যতা দেয় এবং পুজো করে আজো।
জন্ম ৩০ ডিসেম্বর ১৯৫৭। বেড়ে ওঠা পূর্ব কলকাতায়। ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্কের অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক।আটের দশক থেকে লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা লিখেই তার যাবতীয় পরিচিতি । কবিতা ছাড়াও গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ এবং বিদেশি কবিতা অনুবাদ করতে ভালোবাসেন। সম্পাদনা করেন একটি অনিয়মিত লিটল ম্যাগাজিন 'অন্যসাম্পান' । প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : ১৬, গল্পগ্রন্থ : ২, ছড়াগ্রন্থ : ২ উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : অপহৃত রাত্রির চর্যাকথা * নিরুত্তর তারার স্বপ্ন * পূর্বাভাস * পাগল চাকা ঘুরছে অবিরাম * একা দুপুর * শ্রেষ্ঠ প্রেমের পদ্য * সময়ের এস্রাজে বেজে যায় অবুঝ দুপুর * বেলুনের কোন জন্মদিন নেই * নির্বাচিত কবিতা ১০০ ইত্যাদি।




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন