বামনের চন্দ্রাভিযান
পর্ব * ১৪
বিশ্বনাথ পাল
আমার রিলিফ অফিসারের চাকরিপ্রাপ্তির খবরে মৌমিতার মধ্যেও এক খুশির ভাব লক্ষ করলাম। মৌমিতার মধ্যে যেন আমার প্রেমিকা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো জেগে উঠল। আমরা কয়েকদিন
বাইশ
ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করলাম। কখনও ফোনে কথা বলে, আবার কখনও টেক্সট চালাচালি করে।আমি লিখলাম, “ইয়াদ মে তেরি সারি জাঁহা-কো ভুল না চাহতা হুঁ ম্যায়/ ভুলনেওয়ালে কো কভী ইয়াদ আতা হুঁ ম্যায়।”
ইতিমধ্যে অরিন্দমদা একদিন বলল, “সোমনাথ, তোমার বান্ধবী মৌমিতার সঙ্গে একদিন আমার আলাপ করাও।”
বললাম, “বেশ। বলে দেখি।”
মৌমিতাকে বলতেই রাজি হয়ে গেল।
আমরা তিনজন একদিন বিকেলের শোয়ে আনোয়ার শাহ রোডে নবীনায় দেখলাম তারে জমিন পার। ছবি দেখার পর বেরিয়ে খানিক গল্প ও এগরোল খাওয়া হল। মৌমিতা যে প্রথম আলাপেই কারও সঙ্গে অসঙ্কোচে মিশতে পারে, আমার তা নজরে পড়ল।
এরপর একদিন অরিন্দমদা আমাকে বলল, “সোমনাথ, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।”
বললাম, “কী কথা বলো?”
“বলছি, মৌমিতা কিন্তু ভাল মেয়ে নয়।”
“কেন বলছ এই কথা?”
“ও শ্রীরামপুরে সৌম্যর বাড়িতে একদিন রাতে ছিল।”
“সৌম্য কে?”
“আছে একজন। পর্ণা চেনে। ফিল্ম এডিটিং-এর কাজ করে।”
বললাম, “দেখো, মৌমিতা আমার বউ-ও নয়, প্রেমিকাও নয়। ও কার সঙ্গে শোবে, কার সঙ্গে রাত কাটাবে এটা ওর একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার তা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে।”
অরিন্দমদা আর কোনও কথা বলল না। অত সহজে কথাগুলো বললাম বটে, কিন্তু বুকের মধ্যে কি কোথাও চিনচিন ব্যথা করল? কে জানে!
মৌমিতার সঙ্গে আমার গল্পগাছা আরও কয়েক দিন স্থায়ী হয়েছিল মনে পড়ে। আমার ব্যাপারে প্রায় নিরুত্তাপ মৌমিতার গলায় উষ্ণতা টের পেলাম। আবেগপ্রবণ ও অন্তরঙ্গ হলে পরে মৌমিতার কণ্ঠস্বর হাস্কি হয়ে যায়। আমি ক’দিন হাস্কি স্বর শুনলাম। রিলিফ অফিসারের চাকরি মৌমিতার বেশ পছন্দ। অতএব হাইকোর্ট ছেড়ে ওই চাকরিতে জয়েন করলে যে ভাল করব এ নিয়ে মৌমিতার কোনও সন্দেহই নেই। একদিন তো বলেই ফেলল, “তুই রিলিফ অফিসারের চাকরিতে জয়েন কর, আমি তোর ওখানে যাব। থাকব।”
‘থাকব’ কথাটায় বেশ জোর। আমি যার-পর-নাই অবাক হলাম। কিন্তু কিছু বললাম না।
মা-কে একদিন বললাম, “আচ্ছা মা, আমি যদি কোনও ডিভোর্সী মেয়েকে বিয়ে করতে চাই, তুমি কি আপত্তি করবে?”
মা বলল, “কাকে মৌমিতাকে?”
বললাম, “হ্যাঁ।”
“না, আপত্তি করব না। তোর যদি ভাল লাগে করবি। কিন্তু পরে আবার এই নিয়ে ওকে কোনও খোঁটা দিতে পারবি না।”
ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়া আমার মা-কে বেশ অসাধারণ মহিলা বলে মনে হল, যিনি তার ছেলের সুখের জন্য একমাত্র ছেলের বিয়ে ডিভোর্সী মেয়ের সঙ্গে দিতেও প্রস্তুত।
মৌমিতার সঙ্গে কথা বলে একদিন ওকে আমার চাকরি পাওয়ার জন্য খাওয়ানোর দিন ঠিক করা হল। সামনের রবিবার বাইপাশের ধারে উত্তর পঞ্চান্নগ্রামে একটা রেস্তোরায় ওকে খাওয়াতে নিয়ে যাব। এই বিশেষ রেস্তোরাতে নিয়ে যাওয়ার কারণ এর আগে অরিন্দমদাকে নিয়ে একদিন গিয়েছিলাম ওর-ই পরামর্শে। রেস্তোরাটার পরিবেশ বেশ পছন্দ হয়েছিল। এমনিতে রেস্তোরায় গিয়ে খাওয়ার অভ্যেস নেই আমার। বেকারত্বের গন্ধ যার গা থেকে এখনও যায়নি, তাকে কি ঘন ঘন রেস্তোরাতে যাওয়া মানায়? যাইহোক, রবিবার বিকেলে মৌমিতাদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। আমাকে সোফায় বসিয়ে মৌমিতা শাড়ি পরতে পাশের ঘরে গেল। কাকিমা আমার কাছে এসে খানিকক্ষণ কথা বলে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বেরলাম। বেশ সেজেছিল সেদিন মৌমিতা। গা থেকে পারফিউমের হালকা অথচ মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে আসছিল। একটা উজ্জ্বল খয়েরি রঙের শাড়ি পরেছিল। অটো করে প্রথমে গেলাম গড়িয়া, তারপর গড়িয়া থেকে বাসে উত্তরপঞ্চান্নগ্রামে। রাস্তা পার করার সময় মৌমিতার হাত ধরলাম। কী কী কথা হয়েছিল আজ আর স্পষ্ট মনে নেই। কিন্তু এটুকু মনে আছে বুকের মধ্যে যেন তিস্তার ঢেউয়ের কম্পন অনুভব করেছিলাম। এক অদ্ভুত শিরশিরানি। বামনের চাঁদ ধরার স্বপ্ন কি সত্যি হতে যাচ্ছে? কে জানে! হয়তো খানিকক্ষণের মধ্যেই তা নির্ণয় হয়ে যাবে। আবার মাথার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পাক খেতে থাকেন—“অধিকাংশ বর্বর বিয়েটাকেই মনে করে মিলন, সেইজন্যে তারপর থেকেমিলনটাকে এত অবহেলা।” ‘শেষের কবিতা’-য় পেয়েছি।
রুটি, মাংস, ফ্রাইড রাইস ও স্যালাড খেলাম আমরা। হালকা মিষ্টি আলো জ্বলছিল রেস্তোরায়। খাওয়া শেষ হলে পর বললাম, “এখনই বাসে উঠব না, চল না কিছুটা হাঁটি।”
মৌমিতা রাজি হল। খানিকক্ষণ হাঁটার পর বললাম, “আচ্ছা মৌমিতা একটা কথা বলব?”
“কী কথা? বল।”
“তুই আমাকে বিয়ে করবি?”
“তুই কোনও ভাল মেয়েকে বিয়ে কর। সুখী হবি।”
বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। তার মানে মৌমিতা ভাল মেয়ে নয়? অরিন্দমদা যা বলেছিল সেটাই সত্যি? এখানে-সেখানে পুরুষবন্ধুদের কাছে গিয়ে রাতে থাকে মৌমিতা?
বললাম, “কেন তুই কি ভাল মেয়ে নোস?”
“না, বলতে চাইছি তুই কোনও ঘরোয়া মেয়েকে বিয়ে কর।”
বললাম, “তুই আমাকে কষ্ট দিবি?”
“দ্যাখ কষ্ট পাস না। বিয়েটা ঠিক আমার জন্য নয়।”
আমি কি দ্বিতীয় বার ঠকলাম? আমার ইউনিভার্সিটির সেই দিনটার কথা মনে পড়ল, যেদিন খয়েরি পাঞ্জাবি পরে যাওয়ায় মৌমিতার চোখে বিদ্যুৎ দেখি, উঠে ওর বেঞ্চে গিয়ে বসে এক ঘণ্টা গল্প করে কীভাবে যে কেটে গেল টের পেলাম না কেউই, বিডিজির ক্লাস অফ ছিল সেদিন । চোখের সেই বিদ্যুৎ কি আমাকে প্ররোচিত করেনি ওকে প্রপোজ করতে? ভুল ছিল সেই দেখা? আর এখন ক'দিন আগেও তো আমার মনে হচ্ছিল আমার প্রেমিকা মৌমিতার মধ্যে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো বহুকাল পরে জেগে উঠেছে। আমিও তার প্রেমিক হয়ে উঠছি। ভুল ছিল সেই উপলব্ধি?
আমি আর সাধাসাধি করলাম না। যে মেয়ের একবার ঘর ভেঙেছে, তাকে কি দ্বিতীয়বার ঘর করার জন্য জোর করা যায়? কিন্তু বুকের ভেতরটা যেন হুহু করতে লাগল। আমার এতদিনের সাধ ছিল মৌমিতার যোগ্য হয়ে ওঠা। সেই সাধ বুঝি অধরাই থেকে গেল। মৌমিতা যদি বিয়ে করে সুখী হোত, এই সাধকে বাড়তে দিতাম না। গলা টিপে ধরতাম। কিন্তু মৌমিতার অসুখী দাম্পত্য ও কিছু দিনের অন্তরঙ্গ ব্যবহার যেন মৌসুমী বায়ুর মতো আমার বুকের ঢেউ বাড়িয়ে তুলেছিল এতদিনে। আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম।
পাশাপাশি দু’জন ফুটপাত ধরে হাঁটছি। মৌমিতার গায়ের সুগন্ধ টের পাচ্ছি। কখনও মৌমিতার ডান হাতের আলতো স্পর্শ পাচ্ছে আমার বাঁ হাত। আরও কিছু টুকরো কথাবার্তার পর আমরা রুবির মোড়ে এসে পড়লাম। মনে হল সময়টা যেন কী দ্রুত শেষ হয়ে গেল। আমার এই-ই হয়, মৌমিতার সঙ্গে থাকলে সময় কীভাবে ফুরোয় টের পাই না। মৌমিতা বলল, “চল, এবার বাসে উঠি।”
একটু দাঁড়াতেই বাস এসে গেল। বাসের মধ্যে মনে আছে মৌমিতা আমাকে বলেছিল, “তুই তোর গলাটা একজন অঙ্কোলজিস্টকে দেখিয়ে নিস।”
বাবাকে গত বছর হারানোর পরে একত্রিশে ডিসেম্বর নিউ ইয়ার রেজোলিউশন করে সিগারেট খাওয়া ছেড়েছি। প্রথমবার হাসপাতাল থেকে ফেরার সময় বাবাকে ডাক্তারবাবু ধুমপান করতে নিষেধ করেছিলেন। বাবা সেই বারণ শোনেনি। বিড়ি খেত। আমাদের চোখে পড়লে বারণ করতাম, কিন্তু কাজ হোত না। ছ’মাস না কাটতেই প্রাণ দিয়ে যেন ফল পেতে হল বাবাকে। এটা দেখে বেশ ভয় পেয়েছিলাম। দ্বিতীয়ত আমারও গলায় সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সবসময় কেমন কাঁটা কাঁটা লাগে। গলা থেকে কিছুক্ষণ পর পরই শ্লেষ্মা জাতীয় পদার্থ বেরোয়। বাবা বেঁচে থাকতেই এই সমস্যার শুরু। ডাক্তার দেখাচ্ছিলাম। ল্যারিঙজাইটিস, ফ্যারিনজাইটিসএই নাকি রোগের নাম। রক্ত পরীক্ষা হয়েছিল। কিন্তু ওষুধপত্তরে কী যে উপকার হচ্ছিল কিছুই বুঝতে পারতাম না। ফলে বাবার মৃত্যুর তিন মাসের মধ্যে রেজোলিউশন করে সিগারেট ছেড়ে দিলাম। কিন্তু গলার অস্বস্তি আমাকে ছাড়ল না। আমার এই সমস্যার কথা একদিন মৌমিতাকে জানিয়েছিলাম।
সন্দেহটা আমারও হয়েছিল। দীর্ঘস্থায়ী গলার এই সমস্যা ক্যানসার নয় তো? আজ মৌমিতারও এই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ও আরও বলল, “রেমেডিতে একজন অঙ্কলজিস্ট বসেন। ডক্টর অবিনাস সরকার। তুই ওখানে একবার দেখিয়ে নে। আমার মা কিন্তু বার বার বলেছে তোকে ডাক্তার দেখানোর কথা বলতে।”
আমার মনে মনে হাসি পেল। আমার গলা নিয়ে মৌমিতা যে একেবারেই উদ্বিগ্ন নয়, আমি অসময়ে ফুটে গেলে যে ওর কিছুই যায় আসে না এটা বোঝাতেই কি কাকিমার কথা বলছে?
গড়িয়ায় বাস থেকে নেমে আমরা অটো ধরলাম। বিদায়ের মুহূর্তেও আবার মনে করাল, “ডাক্তারটা দেখাস কিন্তু।”
বললাম,“ঠিক আছে, দেখাব। কিন্তু কাকিমার কথায় নয়, বল তুই বলছিস, তাহলে ডক্টর সরকারকে দেখাব।”
“বেশ, আমিই বলছি।”
এরপর একদিন ডক্টর অবিনাস সরকারের সঙ্গে অ্যাপয়ন্টমেন্ট করে যাই রেমেডিতে। আমার গলা পরীক্ষা করে দুটো টেস্ট করতে বলেন। একটা সোয়াব টেস্ট, আরেকটা গলার মধ্যে মাইক্রো ক্যামেরা ঢুকিয়ে পরীক্ষা। সেলিমপুরের কোন কেন্দ্র থেকে টেস্ট করতে হবে ডাক্তারবাবু তাও বুঝিয়ে দিলেন। টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে যেতেই দেখে বললেন, “ভয়ের কিছু নেই।”
একরকমের ওষুধ লিখে দিলেন।
বছর শেষ হয়ে নতুন বছর পড়ল। শীত শেষ হতে চলল। তাও তো দেখি না যে আমার রিলিফ অফিসারের পোস্টিং অর্ডার বেরতে। মনস্থির করে ফেলেছি। কলকাতা থেকে চলে যাব। যেখানেই পোষ্টিং হোক। গ্রামেগঞ্জে গিয়ে গরিব মানুষের উপকারে লাগে এমন কাজ করব। না, উপকার করতে নয়, আমার কর্তব্যবোধেই করব। ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন ত্রাণভবনে গিয়ে জানলাম সামনের মাসে অর্ডার বেরবে।
মার্চের মাঝামাঝি অর্ডার বেরল। হাইকোর্টে নির্দিষ্ট তারিখের উল্লেখ করে রিলিজের আবেদন করলাম।
তেইশ
এস্টাবলিশমেন্ট সেকশনে গিয়ে মনে করিয়ে এসেছি আমার রিলিজ অর্ডারের কথা। শুনলাম নোটশীট অ্যাপ্রুভ করে অর্ডার টাইপ হয়ে গিয়েছে, এখন শুধু সাহেবের সই করানো বাকি। সই হলেই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে অ্যাপয়ন্টমেন্ট সেকশনে পাঠিয়ে দেবে। আমাকে একা যেতে হয়নি, আমার সঙ্গে পলাশদা গিয়েছে।
ফিরে এসে একটা ফাইল খুলেছি সবে কাজ করব বলে, সুশোভনদা প্রায় চেঁচিয়ে বলল, “সোমনাথ, তুই আর আজকের দিনে কাজ করে আমাদের পাপ বাড়াস না। আজ তুই রিলিজড হবি, আজকেও কাজ করবি?”
অগত্যা ফাইল বন্ধ করতে হল। সকাল থেকে আমি সকলের কাছে যেন সেলিব্রিটির মর্যাদা পাচ্ছি। সবাই আমাকে দেখছে, অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছে, সমবয়সি সহকর্মী শিবু তো আমাকে জড়িয়েই ধরে বলল, “সোমনাথ, আমাদের ভুলে যাবে না তো?”
মাত্র নয় মাস এগারো দিনেই হাইকোর্ট আমাকে বড় আপন করে নিয়েছে। হাইকোর্টই আমার কাছে প্রথম প্রতিষ্ঠান, যেখানে আমি গ্রহণযোগ্যতার স্বাদ পাই। স্কুলে প্যারাটিচার ছিলাম যখন সবাই আমার উপস্থিতি ভাল ভাবে নেয়নি। অনেকের আশঙ্কা ছিল আমি তাদের টিউশনির বাজারে ভাগ বসাব। আবার আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা অনেকের সমান বা বেশি বলেও তাদের অস্বস্তি হত। হাইকোর্টে পদেও নীচে ছিলাম, বয়সও কম হওয়ায় মানুষের অকুণ্ঠ ভালবাসা পেয়েছি। ছোট হয়ে থাকার এই এক সুবিধে—হাত মাটির কাছাকাছি, তাই ভালবাসা কুড়োনো সহজ। অধিকাংশ সহকর্মীর সঙ্গেই আমার দাদা-দিদির সম্পর্ক। তারাও আমাকে তুই করে নাম ধরে ডাকতেন যেন বাড়ির লোক। অথচ আগে কতজনের মুখে যে শুনেছি কর্মক্ষেত্রে নাকি বন্ধু মেলে না। সবাই সবার প্রতিযোগী। পিছন থেকে পিঠে ছুরি মারার জন্য হাত নিশপিশ করে। আমার তো তা মনে হয়নি। সেসব নিশ্চয়ই বেসরকারি ক্ষেত্রে হলেও হতে পারে। সরকারি ক্ষেত্রে গ্রেডেশন লিস্ট অনুসারে উপযুক্ত লোকের নির্দিষ্ট সময়ে প্রোমোশন হবে। তাই কাউকে পিছন থেকে ছুরি মেরে এগোনোর প্রশ্ন নেই।
ভালবাসার বন্ধন ছিন্ন করে চলে যাচ্ছি বলে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মনের মধ্যে আবার দ্বিধার তরঙ্গ উঠল। কাজটা কি ঠিক করছি? বাড়িতে বয়স্ক বিধবা মা, অবিবাহিত বোন। এদের ছেড়ে কোন গ্রামেগঞ্জে একা পড়ে থাকব। বাড়ির কোনও জরুরি অবস্থায় আমি যদি উপস্থিত থাকতে না পারি? মা অবশ্য আশ্বাস দিয়েছে, “কী হবে? তুই যা, গিয়ে জয়েন কর। তোর দিদি তো পাড়াতেই আছে, সুবিধা-অসুবিধায় আমায় দেখবে। তোর বোনও তো আছে যতদিন বিয়ে না হয়। আর তুই যখন আসবি ন’মাসে ছ’মাসে আমার চেক আপ করাবি, ভয় পাস না।”
বাবা মারা যাওয়ার পর মা-কে সুখে রাখার ভাবনা আমার মাথায় বার বার খেলেছে। মৌমিতার কাছে কাঙ্ক্ষিত পাত্তা পাইনি বলে দেবদাস হওয়ার ইচ্ছা আমার ছিল না। বোনেরও বিয়ে দিতে হবে। মনে হল সৎপথে উপার্জিত টাকাকে সংসারী মানুষের অবহেলা করা উচিত নয়। হাইকোর্টের চাকরির থেকে রিলিফ অফিসারের বেতনের ফারাক দু’হাজার টাকার। পরে তা আরও বাড়বে। বাবার জীবনের শেষ দিন অক্সিজেন-সহ অ্যাম্বুলেন্স জোটেনি। টাকা ছিল না বলেই তো। হয়তো টাকা থাকলে সেইদিনটা বাবার জীবনের শেষদিন হত না। আমি অবশ্য শুধু টাকার জন্য যেতে চাই না। কেরানি থেকে অফিসারের পদে যোগ দেব এটা আনন্দের। আগের দিন যখন বৈকুণ্ঠপুর স্কুলে গিয়েছিলাম অমলেন্দুবাবুর সঙ্গে দেখা করতে, কয়েকজনের চোখে সন্দেহও দেখেছি আমার অফিসারের চাকরির ব্যাপারে। কাদম্বরি যেমন মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই, আমাকেও চাকরিতে জয়েন করে প্রমাণ করতে হবে আমি অফিসারের চাকরি পেয়েছি। জগতে সব সময় অর্থবানরাই জেতে এটা ঠিক নয়, প্রমাণ হবে আন্তরিক ইচ্ছার বাধার পাহাড় পেরনো যায়। এছাড়াও একটু তো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাও হবে, কত মানুষ যে আমাকে ভয় দেখাল রিলিফ অফিসারের চাকরিতে গেলে কী ভয়ানক হেনস্থা হতে হবে, তা দেখার সুযোগ হারাই কী করে!
পলাশদা আমাকে ছায়ার মতো ঘিরে থাকল সারা দিন। একবার তো বলেই ফেলল, “তোমাকে তো আর পাব না, তাই আজ একটা মুহূর্ত মিস করতে চাই না।”
আমি বললাম, “পাবে না কেন বলছ? নম্বর তো থাকলই, ফোনে যোগাযোগ থাকবে।”
“না, এত কাছে তো পাব না। তবে তুমি সময় পেলে কিন্তু হাইকোর্টে চলে আসবে।”
আর একবার পলাশদার আন্তরিকতায় আমার চোখে চলে এল, পলাশদা তা দেখে বলল, “দেখো, এখনও সিদ্ধান্ত বদল করবে কিনা বলো?”
বললাম, “এখনও বদল করা যায়? কীভাবে?”
“এখনই তাহলে রেজিস্টার জেনারেলকে প্রেয়ার দিতে হবে রিলিজ অর্ডার রিকল করার জন্য।”
“না, থাক। লোক হাসিয়ে কাজ নেই।”
বিধাতার ইচ্ছায় একটা সরকারি চাকরি পেলেই যে ছেলে নিজেকে ধন্য মনে করত, তার এখন একাধিক চাকরির সুযোগ। কোনটা ছেড়ে কোনটা করে অবস্থা। আবার প্যারাটিচার থাকার সময় কতদিন এটাও মনে হয়েছে যে এই চুক্তি ভিত্তিক অস্থায়ী চাকরিটাও যদি অন্তত পাঁচ হাজার টাকার মাইনেতে ষাট বছর অবধি স্থায়ী হত!
দুপুরের পরেই বুঝলাম আমার সহকর্মীরা আমাকে এমনি এমনি ছাড়বে না। ফেয়ারওয়েল দেবে। কারণ একটা চামড়ার ব্যাগ সমীরণদা দেখিয়ে বলল, “সোমনাথ দ্যাখ তো পছন্দ হয় কিনা?”
ফেয়ারওয়েল নেওয়া বেশ অস্বস্তির ব্যাপার। কিন্তু ভালবাসার দাবির কাছে কোনও আপত্তি টেকেনি। বিদায়বেলায় স্মৃতি ছাড়া কোনও স্পর্শযোগ্য স্মারক না দিলে সহকর্মীদের খারাপ লাগে। স্কুল থেকেও আমাকে ফেয়ারওয়েল দিয়েছে।
মিতাদি এসে আমাকে বলল, “তুই এখন অফিসার। তাই কাঁধে ঝুলিয়ে ব্যাগ নিয়ে যাওয়া মানাবে না। হাতে করে ব্রিফকেসের মতো করে ব্যাগ নিবি।”
মিতাদি আমাকে একটা কলম উপহার দিল। কলমটা এখনও আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখা আছে।
সুচন্দ্রাদি আমাকে বলল, “তুই এখানে মাথা উঁচু করে ছিলি, ওখানে পারবি না।”
মানে ব্লক সার্ভিসে আমাকে আপস করতে হবে। আমি কোনও কথা বললাম না।
এছাড়া ফুল মিষ্টি ও পেন উপহার পেলাম। মিষ্টির প্যাকেটটা মিতাদিকে দিয়ে বললাম, “আপনি সবাইকে ভাগ করে দিন।”
কেউ বক্তব্য রাখার মতো কোনও ফর্মাল অনুষ্ঠান নয়, কিন্তু আন্তরিকতায় ভালবাসায়, উপহারে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম।
তপনদা একটা সাদা পৃষ্ঠায় আমাকে নিয়ে কবিতা লিখে দিল। শিবু সেই কাগজটায় সকলের স্বাক্ষর করিয়ে আমাকে ফেরত দিল। আমি চোখের জল লুকোলাম।
সমাপ্ত
***************************************************************************************

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন