শীত এবং তৃতীয় পক্ষ
শাশ্বত বোস
শীত বলতে আমার কাছে এক আঁজলা বেদান্ত আঁতুরঘর, স্থাবর বিছানা, চেতনাহীন ঘনিষ্ঠতা অথবা অনেক দূরের শ্মশ্মানের জমাট বাঁধা ধোঁয়ার মাঝে, আটকা পরে থাকা একান্নবর্তী প্রসেনিয়াম। আমার ছোটমামার খুব ফুলের শখ ছিল। তাই শীতকালের শুরুতেই আমার মামাবাড়ির চিলেকোঠার ছাতটা দেখতাম দিব্যি দখল করে ফেলেছে, লাল নীল মশারি, একটা হলুদ মরচে ধরা হোল্ডার, ছোট বড় মাঝারি বিভিন্ন মাপের টব আর অনুবাদপ্রবণ ডালিয়া-চন্দ্রমল্লিকা আর হলদে কমলা গ্যাঁদার দল। শীতের রূপ পাল্টানো প্যারাডক্সের পাশাপাশি এক অলৌকিক বহমান সুপ্তি যেন ঘিরে থাকতো ছাতটার পরিবর্তিত কল্পলোক জুড়ে! ছাতের অনেকটা জুড়ে বোঝাই করা থাকতো গুঁড়ো গুঁড়ো সূক্ষ্ম বালিকণা, এঁটেল মাটির সাথে ঝুরঝুরে হয়ে মিশে গিয়ে আগামী দিনে টবের দৈঘ্য প্রস্থ জুড়ে, এক অপার্থিব রহস্যকে ঘনিয়ে তুলবে এরা। গোটা নভেম্বর মাস জুড়ে বিদেশী ফুলের বীজ বোনা হতো হলদেটে বালিকণার গর্ভে। রাস্তা থেকে যখনই দেখতাম সন্ধ্যের হিমের আমেজ গায়ে মেখে, ছাতের ঘরে বিশ ওয়াটের বাল্বটা জ্বলে উঠেছে, ঠিক তখনই মফস্বলের অন্ধকার গলির বাঁকে, শহরতলীর অজস্র জীবন ষড়যন্ত্রের, কত সহস্র হোঁচট-জখম-রক্তপাত ভুলে একটা বায়বীয় পারলৌকিক জগৎ, একটা নির্জনতার ফিসফাসে নিমগ্ন আপাত মোলায়েম জীবন যেন ডাকতো আমায়! যেন ঐখানেতে পরম স্নেহে বোনা হয়ে চলছে এক বিচিত্র জীবন! নিষ্ক্রিয় অভিব্যক্তির মতো অনেকখানি স্থূল আরাম হয়তো মাখামাখি করে থাকতো ভাবনাটাতে! হয়তো নতুন শীতের ভোরে পায়ের গোড়ায় নীরব অবহেলায়, নিতান্ত মোলায়েম মিথ্যের মত গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকা লেপ কম্বলের মামুলি আরামের থেকেও অনেক বেশী ছায়াঘন একটা আরাম! টিউশন থেকে ফিরে এসে পড়তে বসতে আর ইচ্ছে করতো না হয়তো! ব্যাগ ফেলে ছুট দিতাম সোজা তেতলার ছাতে। একটা রৌদ্রমুখর দিনের শেষে ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যেটা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে তখন হীমশীতল কুয়াশাঘেরা অন্ধকারের দিকে! জীবনের বহুমুখী স্বরের মাঝে নিয়ম করে বেজে চলেছে এক সুর! অলীক জীবনের খাতায়, পরাবাস্তব লিপির দ্রাব্যতায়, পরিমিত অনুভবে যা খানিক সৌজন্যমূলক কবিতা লিখে রেখে যায়, তারপর মিশে যায়, ইট চাপা পড়ে থাকা অর্ধেক জীবনের খাঁজে! যেন শব্দের ভিড়ে প্রভাবিত কবির লেখা কোন কবিতা! একজন জন্মাবধি দুর্বল নবজাতককে যেমন ইনকিউবেটরে রেখে দেওয়া হয়, চোখ মেলার অপেক্ষায়! তারপর সব বিপদ কাটিয়ে ধীরে ধীরে সে চোখ মেলে একদিন! পুষ্ট হয়ে ওঠে তার সেই অর্ধেক হয়ে জন্মানো শরীরটি! ঠিক সেরকম কোন এক কুসুম কুসুম শিশিরমাখা ভোরে, গত দীপাবলীর রং মশালের নীল যখন মুখে গেছে, ঘুমন্ত খিদের গা থেকে ঝরে গেছে বারুদের গন্ধ, ঠিক তখন শীর্ণ দুটো হাত শূন্যে মেলে মাথা তুলতে চায়, প্যানজি-পিটুনিয়া-ক্যালেন্ডুলা-আজেলিয়ারা! সে অনুভব শুধু কাঞ্চনফুলের মতো সাদা, ঋতুপ্রবণ! শীত মানে তাই আমার কাছে কোন নিঃস্ব পরিধিতে প্রথম প্রাণের সঞ্চার! যেন হঠাৎ করেই চিঠি লিখতে চাওয়া কোন অনাথ শিশুকে!
শীত মানে সোনালী ধানক্ষেত আধখানা ন্যাড়া হয়ে আছে। আলু তুলে নেবার পর মাঠের ধারে ধুনি জ্বেলে মেঠো ইঁদুরের মাংস খাচ্ছে একপাল অসভ্য আদিবাসীর দল! কোন এক সময় এরা আমাদের প্রজা ছিল, তারপর ভাগচাষী! এখন এরা আমাকে হয়তো চিনতেও পারে না! অথচ জমি জঙ্গলের প্রাচীন হকদার হিসেবে ওদের আমরা চিরটাকালই সমীহ করে এসেছি! শীত মানে যেন গদ্য নির্ভরজীবনে বিপ্রতীপ চলনের কবিতা বোনা! হিম হিম অন্ধকারে বসে নষ্ট তারা খোসা দেখতে পাওয়া! শীতকাল মানে যেন আবার কোথাও গিয়ে মৃত্যু! যেখানে বেঁচে থাকাটাই একটা আশ্চর্য্য ঘটনা! এই হয়তো অনেক উৎসাহ নিয়ে বেঁচে আছি! পাতাঝরা কিছুটা শীতল বরফ যেন মুহূর্তে এসে সব কিছু ভেঙে চুরে চুরমার করে দিল! আসলে শুধু দেখে যাওয়া জীবনে মুহূর্ত নির্ভর আমাদের বেঁচে থাকা! বড় আশ্চর্য্য সে ভঙ্গিমা! যেন ঈশ্বরী চোখে গেঁথে যাওয়া চঞ্চল দৃশ্যের বিন্যাস থেকে হঠাৎই ফ্রিজ ফ্রেমে ফিরে আসা! যেন কোন এক দীর্ঘ্য রোগভোগের পর অনন্তের গা ঘেঁষে আমার ঠাকুমার চলে যাওয়া। বেঁচে থাকতে সারা শরীর জুড়ে তীব্র যন্ত্রনাময় বাত বেদনায় গোটা বিছানা জুড়ে যিনি শুধু গড়িয়ে যেতেন। মাঝে মাঝে চোখ খুলে শুধু বলতেন, “আমার হাড় মুড়মুড়াইসে!” মৃত্যুটি হয়তো সংক্ষিপ্ত পর্ব ছিল কিন্তু পরবর্তীতে তার পোস্ট স্ক্রিপ্ট হিসেবে জুড়ে যাওয়া শোককাল ছিল বড় অবিচ্ছেদ্য! শীত মানে আসলে স্থিরতা! একটা ঘটনাপ্রবণ জীবনের ভঙ্গুর আবর্তে বার কতক ঘুরপাক খেয়ে, মলিন স্মৃতির দোকান থেকে টুক করে ঘুরে, ফিরে আসা প্রাপ্তির জোয়ারে! বছর ঘুরে শীতকালে ফিরে এলে যেন বয়স হয়ে আসে! না ফুরোনো এই অনর্থক জীবনে সংযত প্রেম-সতর্ক হাসির অস্পষ্ট ইমেজারি তৈরী করে!
শীত মানে আসলে নিয়ন্ত্রিত ছয় ঋতু! যে চারাগাছ গত বর্ষায় বেগবতী হয়েছে, শরীরে যার ঠাসা হয়েছে বিজ্ঞাপিত মেদ, আত্মমন্থনের দোলায় আর্দ্র এখন যার অমলিন হৃদয়, পুঁতিগন্ধময় বর্জ্য উপেক্ষা করে শীতের উদ্বায়ী রোদের কাছে এখন সে স্বর্গীয় উত্তাপ খোঁজে! তার পরিণত চোখ জুড়ে শিশুকাল কৈশোর যৌবন টেনে এগিয়ে চলে অদ্ভুত সব স্বপ্নের এক ভ্রাম্যমান শর্টকাট! আমার কাছে স্মৃতির মানে শীত! শীত মানেই চেনা অচেনা নানা গন্ধ, হালকা হয়ে আসা বাতাস, নিবিড় ভাবে ঝিম মেরে যাওয়া এক নদী, এই কালান্তক শীতের মলাটে জমাট বাঁধা জনপদ জুড়ে যে বুনে দিয়েছে রবিশস্যের নির্বিবাদী বুনিয়াদ। শীত মানে নিঝুম হয়ে যাওয়া শব্দের দল। প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে ব্যবহৃত উপমার আড়ালে মুখ লুকোনো ক্যাসুয়াল কথাবার্তার রিফ্লেক্স! শীতকাল মানে পরিপাটি হয়ে বিয়েবাড়ি যাওয়া। খেয়েদেয়ে বাড়ি ফেরার পথে নবদম্পতির আশু বিচ্ছেদের দিনক্ষণ প্রেডিক্ট করা। ‘এখনকার বিয়েতে স্টেবিলিটি কাহা!’ মার্কা নির্বিষ আস্ফালন! এই একটু আগে অনুষ্ঠানবাড়িতে অনেকদিন বাদে দেখা হওয়া ব্যক্তি, “কেমন আছেন!” জানতে চাইলাম যার কাছে, দেশকাল-চাকরি-ব্যবসা-অর্থনীতি-মন্দা-অগ্নিমূল্য বাজার-সোনা রুপোর দর-জিনিসপত্রের দাম এসব নিয়ে গালভরা বাতেল্লা ঝাড়লাম যার কাছে, মুখ সরলেই মাথার মধ্যে স্পষ্ট রজঃমূলক প্রবৃত্তি এনে তার ভাবী নষ্ট দিনকালের পাটিগণিত কষি মনে মনে! মগজের গভীরে গিজগিজে পাঞ্চলাইনের ব্যাকড্রপে, জড়ো হওয়া এইসব এলেবেলে কনভার্সেশন, প্রত্যুত্তরের আশা রাখে না কখনোই! শুধু আশা থেকে যায় সাময়িক মনোযোগ আকর্ষণের! শোভাবাজার কিংবা হাতিবাগানের চুন সুরকি খসে পড়া পোড়ো বাড়ির ছাতে, তখন কৌতূহলহীন কাকটা অব্যর্থ নিশানার মতো ভেজা ভেজা রোদটুকু বেয়ে ছুটে এসে ফেটে গড়িয়ে পড়ে। নির্জনতা ও আধ্যাত্মিকতা মেশানো নির্ভেজাল কল্পনাশক্তির দুর্বলতম স্থানটুকু জুড়ে ততক্ষণে রোদ ফোদ সব হাওয়া! ততক্ষণে আর জি কর রোডের সার্সি জানলা ঘোরানো সিঁড়ি বসানো স্টাফ কোয়ার্টারের, দোতলার বেরিয়ে আসা ছাদের, ভেঙে আসা পাঁচিলে ঠেস দিয়ে, তখন পিসতুতো বোনের গালে হঠাৎ করে চুমু এঁকে দেয় আপন মামাতো ভাই! যৌবন বীজপত্র থেকে বেরিয়ে এসে সোনালী রঙের বিকেলে এসে দাঁড়ানো কিশোরীটি বাড়িয়ে দেয় ঠোঁট! শীতকাল তখন উদোম উৎকণ্ঠাদের বুকে করে জীবনের সবথেকে বিষন্ন সত্যকে চিনতে পেরে উর্বরতার কথা বলে! আহিরীটোলা ঘাটে ফিরতি স্টিমার এসে ভেরে। মৌলালি দরগায় আজান লাগে। পদ্মপুকুর বস্তি, পার্ক সার্কাস অঞ্চল থেকে ভেসে আসা ঝলসানো মাংসের গন্ধ, গ্রাম বাংলার নিরন্ন উনুনের ভাপে সিদ্ধ হওয়া পিঠে পুলির গন্ধ, নোনাপুকুরে বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম ডিপোয় টং টং করতে করতে ঢুকে যাওয়া শেষ ট্রামটার গন্ধ, এংলো পাড়ার লাল বাড়িটার গায়ে ক্রিস্টমাসের জিঙ্গল বেল হয়ে ঝুলে থাকা পর্ক সসেজ, মোমো আর চিকেন চাউমিনের গন্ধ, বহড়ুর রস ব্যবসায়ীর হাতে জাল খেতে খেতে শুকিয়ে আসা খেঁজুর রসের গন্ধ সব মিলে মিশে একাকাকার হয়ে যায়। শলাকার গোপন পাঁজরে ধ্বস নামে! সার্কাসের বামন জোকারটির চোখে তখন বুদ্বুদের ইশারা! শীতকালের শেষে, গেল শীতের স্মৃতিই বেশী করে ফিরে ফিরে আসে।
***************************************************************************************



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন