খাঁটুরা বয়েজ হাই স্কুল: গোবরডাঙার গর্ব ।।
মিঠুন মুখার্জী
'স্কুল' শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ
হলো 'বিদ্যালয়'। প্রতিটি মানুষই কম-বেশি বিদ্যালয় শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। জীবনের প্রথম অর্থাৎ ৪-৫ বছর বয়স থেকে বিদ্যালয়ের সঙ্গে আমরা যুক্ত হই। শেষ হয় এক একজনের এক এক
সময়। অতীতের বড় বড় মনীষীদের গৌরবময় অবদান বিদ্যালয় বা স্কুলের নাম উজ্জ্বল করে গেছে। তাদের জন্য সেই বিদ্যালয়ের নাম ছড়ায় জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে জাতীয় স্তরে। এমনই একটি গৌরবময়
বিদ্যালয় হল উত্তর ২৪ পরগনা জেলার গোবরডাঙায়
অবস্থিত 'খাঁটুরা বয়েজ হাই স্কুল'। স্বাধীনতার প্রায় একশো বছর আগে অর্থাৎ 'কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়' স্থাপনের আগের বছর এই
বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়েছিল। ইংরেজ শাসিত এই বিদ্যালয়ে জমিদার থেকে শুরু করে অভিজাত পরিবারের সন্তানরা
পড়তেন। তারই সঙ্গে ছিল স্থানীয় ও আশেপাশের মেধাবি ছাত্ররাও।
১৮৫৬ সালের ১৪ জানুয়ারি গোবরডাঙার জমিদার সারদা প্রসন্ন মুখোপাধ্যায়
কর্তৃক 'খাঁটুরা বয়েজ হাই স্কুল'টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
যদিও তখন এই স্কুলটির নাম ছিল 'গোবরডাঙ্গা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়'। বিদ্যালয়টি এই দেড় শত
বছরের বেশি সময় ধরে বহু রত্নের জন্ম
দিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানকে রত্নগর্ভা বললে ভুল হয় না। গোবরডাঙার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে
এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে,
যুগ যুগ ধরে এই বিদ্যালয়টি "সত্য, প্রেম ও পবিত্রতা"-র প্রতীক হয়ে
অরণ্যঘেরা পরিমণ্ডলে স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়িয়ে আছে; বহু উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী
হয়ে। বিদ্যালয়টির ঘটনাবহুল ইতিহাস এবং এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক উত্থান-পতন এই সত্যের
সাক্ষ্য দেয় যে, এই বিদ্যালয় এবং এই গ্রাম উভয়ই বাংলার সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ও
শিক্ষাগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। তাই, ইতিহাসের পাতায়
গোবরডাঙা এক গর্বের স্থান অধিকার করে আছে। প্রথমে এই বিদ্যালয়টির নাম
ছিল 'গোবরডাঙ্গা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়'। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে 'গোবরডাঙ্গা উচ্চ ইংরেজি
বিদ্যালয়' ও 'খাঁটুরা মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়' মিলে গিয়ে তৈরি হয়েছিল
আজকের 'খাঁটুরা বয়েজ হাই স্কুল'টি।
এই স্কুলটির কথা বলতে গেলে সেই সকল পণ্ডিত ব্যক্তিদের কথা অবশ্যই স্মরণ
করতে হয়, যাদের সাহচর্যে বা আবির্ভাবে এই স্কুলের মাটি হয়েছিল ধন্য। ধরণীধর বন্দ্যোপাধ্যায়, হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
(আইসিএস),রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থপতি, কেশব চন্দ্র সেন, যিনি
১৮৭৮ সালে ক্ষেত্রমোহন দত্ত, দুর্গাচরণ রক্ষিত, বিপিন বিহারী চক্রবর্তী,
রত্নেশ্বর পান্ডে, বিনোদিনী দাসীর আমন্ত্রণে
এখানে এসেছিলেন। যাদের দানশীলতা, নারী
শিক্ষার প্রসারে এবং খাটুরা আদর্শ বঙ্গ বিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ প্রমথনাথ বসু তার জীবনের প্রথম শিক্ষা এই 'খাঁটুরা আদর্শ বঙ্গ
বিদ্যালয়'এ গ্ৰহন করেছিলেন।
এই উচ্চবিদ্যালয়ে এই আড়াইশো বছরের বেশি সময় ধরে বহু ছাত্ররা পড়েছেন, যাদের মধ্যে এমন অনেকে
আছেন যারা দেশে ও বিদেশে বড় পদে চাকরি করে, সমাজসেবামূলক কাজ করে 'গোবরডাঙ্গা খাঁটুরা হাই
স্কুল'টির ও গোবরডাঙার নাম উজ্জ্বল করেছেন। সম্প্রতি এই স্কুলটি
হেরিটেজ হিসাবে ঘোষিত হয়েছে। এই স্কুলটির সঙ্গে সঙ্গে 'গোবরডাঙা জমিদার বাড়ি ',
'সিংহ দরজা'ও হেরিটেজের তকমা পেয়েছে। 'খাঁটুরা বয়েজ হাই স্কুল'- এর উল্লেখযোগ্য কয়েকজন
প্রধান শিক্ষক হলেন --- শ্রী রামকৃষ্ণ দাশগুপ্ত, শ্রী হেমনাথ
বন্দ্যোপাধ্যায় , শ্রী প্রদীপ কুমার কুন্ডু, শ্রী বিশ্বনাথ রায়
প্রভৃতি। বর্তমানে এই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আছেন শ্রী দেবাশীষ
মুখোপাধ্যায় মহাশয়।
'গোবরডাঙ্গা খাঁটুরা উচ্চ বিদ্যালয়' টি সেই পুন্য ভূমিতে
দাঁড়িয়ে যেখানে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের মতো মহান ব্যক্তির জন্ম। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর
মহাশয় 'গোবরডাঙ্গা পৌরসভা'র প্রথম পৌরপ্রধান এই
শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের সঙ্গে কালীমতি নামের এক বিধবার প্রথম বিধবাবিবাহ
দিয়েছিলেন। যা হয়ে আছে ইতিহাস। স্কুলটি নির্মানের বছরই এই বিধবাবিবাহ দেওয়া হয়েছিল। সুদীর্ঘ অতীতে এই স্কুলে
পড়াশোনা করে এই স্কুলকে কর্মস্থল করেছেন এমন অনেক শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীরা
আছেন। বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ব্যারিস্টার, পুলিশ অফিসার এমন
বড় বড় পদ মর্যাদায় চাকরি করে
ভারতমায়ের মুখোজ্জ্বল করেছেন এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যারা একসময় এই স্কুলেই
পড়তেন।
পরিশেষে বলা যায় শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব। শিক্ষা মানুষের মনের অন্ধকারকে দূর করে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে
দেয়। ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা তৈরি হয় তাদের। আর 'গোবরডাঙ্গা খাঁটুরা বয়েজ হাই স্কুল' -এর মতো শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবেই যুগ যুগ ধরে শিক্ষার্থীদের মনের অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের
আলো জ্বালানোর কাজ করছে। মানুষ গড়ার কারিগর হয়ে উঠেছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে
সযত্নে লালন করতে হবে আমাদের। নতুবা একদিন শিক্ষার্থীদের মনের অন্ধকার আরও গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে উঠবে। যা
সুস্থ সমাজ গড়ার পথে হবে অন্তরায়।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন