ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা
ইউরোপিয়ান বিপ্লব অনুসারী স্প্যানিশ কবি সম্মেলন, প্রজন্ম-২৭ সাহিত্য বিপ্লবী সদস্য,ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার জন্ম ৫ জুন ১৮৯৮ । তাঁর লেখা স্বকীয় রীতির কবিতাগুলি বিশ্ব সাহিত্যে চিরকালের মতো জায়গা করে নিয়েছে। তিনি একাধারে কবি,নাট্যকার ও মঞ্চ পরিচালক। ১৯৩৬ সালে স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় তাঁকে হত্যা করা হয়। লোরকাকে স্পেনে "জনগনের কবি"আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এখানে আমরা তাঁর একটি কবিতা পড়ছি, কবিতাটির -----
ভাষান্তরঃ জয়িতা ভট্টাচার্য
যে শহর ঘুমোয় না
ফ্রেডরিকো গার্সিয়া লোরকা
===================
এখন আকাশে ঘুম নেই।ঘুম নেই।
কারো চোখে ঘুম নেই। চাঁদের জীবেরা ওদের কুটিরের আশপাশে
ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়ায়।
জীবন্ত গিরগিটির দল ঘুরে বেড়ায়,
ওরা দংশনে করবে তাদের যারা স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে। হতভাগ্য যেজন ছিটকে পড়েছে পথের বাঁকে,
সেখানে নক্ষত্রের বিনীত প্রতিবাদের নিচে অপেক্ষা করছে একটা তৃপ্ত কুমির।
কেউ ঘুমিয়ে নেই জগতে।কেউ না।কেউ না। কারো চোখে ঘুম নেই। দূরে সমাধির নিচে লাশ। গত তিন বছর যাবৎ কাঁদছে,তার জানুর ওপর শুয়ে আছে ঊষর দেশ।যে ছেলেটিকে
আজ সকালে কফিন থেকে বার করে কবরে রাখা হলো হলো,তার ক্রন্দন বন্ধ করতে কুকুরের সমবেত এই চিৎকার
জরুরি ছিল।
জীবন কিন্তু কোনো স্বপ্ন নয়। সাবধান!সাবধান!
পদস্খলন হলেই ভিজে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। অথবা বলা যায়, হাঁসুলির সুতীক্ষ্ণ ফলার ওপর জীবন এখন__
ঠাণ্ডা, শুকনো পাণ্ডুর জবাফুল সঙ্গী করে চলা।
বিস্মৃতির কোনও অস্তিত্ব নেই।
নেই স্বপ্নের অস্তিত্ব। আছে শুধু মাংস,এবং চুম্বন__
আমাদের ঠোঁট বন্ধ করে দেবে,
নতুন নতুন শিরা উপশিরার গুল্মজট।যত বেদনাই হোক
এই ব্যথা থেকে যায় কষ্টের উৎস হয়ে। মরার ভয় যাদের তারা এই বেদনা বহন করবে কাঁধে করে। একদিন ঘোড়াদের ঠিকানা
হবে সুসজ্জিত বৈঠকখানা।
একদিন ক্ষুব্ধ পিঁপড়েরা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে হলুদ আকাশে। আর জড়ো হবে গো-চক্ষুতে।
আরেকদিন, দেখা যাবে লাশের মধ্যে থেকে প্রজাপতিরা উঠে আসছে,আর তখনও
তখনও আমরা চলব ধুসর স্পঞ্জের দেশের
বোবা নৌকোয় চড়ে,আমরা দেখব বৃত্তটা
ঝলসে উঠেছে।
গোলাপ থেকে ঠিকরে উঠছে বজ্র বিদ্যুৎ ।
এবং,সেই ছেলেটা__কাঁদছে।কারন সে কোনও পারাপারের সেতুর খবর জানে না।
আর ওই মৃত লোকটা,যার, শুধু একটি মস্তিষ্ক
এবং জুতোটুকু সম্বল;ওকেও নিয়ে যেতে হবে,
সেই পাঁচিলের কাছে যেখানে আছে সাপ এবং গিরগিটিরা অপেক্ষা করছে। যেখানে ভাল্লুকের
দাঁত অপেক্ষা করছে।যেখানে ছেলেটির মমি
হয়ে যাওয়া হাত অপেক্ষা করছে।
এবং যেখানে উটের পিঠের নীলচে রং ভয়ঙ্কর শিহরণ জাগায়েছে। সকলেই এখন অপেক্ষা করে।
কেউ ঘুমোয়নি।কেউ নয়। কেউ নয়।যদি কারো চোখে ঘুম আসে চাবুক মারো।ও ছেলে,চাবুক মারো।আসুক চক্ষু উন্মিলিত প্রান্তর যেখানে
আগুন পোড়া তীব্র ক্ষত...
কেউ ঘুমোচ্ছে না।কেউ ঘুমোয়নি এই বিশ্বে।
আগেই বলেছি আমি সেকথা ।
কেউ ঘুমোয়নি। তবে যদি কেউ এতটাই
মন্দ ভাগ্য থাকে তবে রাতে হলে খুলে দিও মুক্ত মঞ্চের পেছনের দরজা,যাতে সে দেখতে পায় চাঁদের আলোয় কেমন শুয়ে আছে এক বিদেহী আত্মা,বিষ বিশাখা,আর পড়ে থাকা শূন্য মঞ্চের হাড়-পাঁজড়া।
*************************************************************************************************
কলকাতা নিবাসী সাহিত্যিক জয়িতা ভট্টাচার্য পেশায় শিক্ষক। অল্প বয়স থেকে লেখালিখি। প্রধানত মানবাধিকার বিষয়ক বুলেটিন ও খবরের কাগজে লিখতেন। প্রথম প্রেম কবিতা। এযাবৎ চারটি কবিতার বই,একটি গল্পের বই ও একটি উপন্যাস প্রকাশিত। লিখেছেন অসংখ্য সংকলনে। এছাড়াও নিয়মিত প্রবন্ধ, ও অনুবাদ কবিতা লেখেন বৈদ্যুতিন ও মুদ্রিত পত্রিকায়। পেয়েছেন সরকারি ও সাহিত্য গোষ্ঠীর নানা সম্মান।



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন