সব পাখিই আকাশ উড়াল চায়
শাশ্বত বোস
চূড়ান্ত নির্লিপ্ত একটা দুপুরবেলা! যে দুপুরটা পেরিয়ে হয়তো এমন একটা বিকেল আসবে, যেদিকে তাকালে শুধু পাহাড় আর বনের সৌন্দর্য্যের কথাই মনে পড়ে বারবার। মনে পড়ে উৎসবের কথা! যে বিকেলে একা চুপ করে বসে থাকতে থাকতে ক্ৰমশঃ ঘনিয়ে আসে পাড়া! পৃথিবীর সব মায়েরা মায়ার মত হয়ে ওঠে এই একটা সময়! এই একটা সময় মায়েরা যেন বিকেল হয়ে যায়!
এই নাতিখর্ব জৈষ্ঠ্য দুপুরে যখন আগুনের লেলিহান শিখা খোলা আকাশ থেকে ঝরে পড়ে, আশেপাশের গাছপালায় তৃষ্ণার্ত পাখিদের আর্তনাদ হয়ে, তখন আসা যাওয়ার মাঝে ভেসে ওঠা, টলটলে মধুর মতো পাতলা একরাশ বিচ্ছেদের স্মৃতি নিয়ে, একটা লম্বা সময়ের শূন্যতা বড় প্রয়োজনীয় মনে হয়। যে শূন্যতা দেহমনে ঠিক বুনো ঝাউ গাছের মত! যে গাছের নীচে অনন্ত হয়ে পড়ে থাকে একটা ছোট্ট সাদা পাখি! যেন দীর্ঘ্য অপ্রস্তরীভুত একটা সাদা স্পেস! তার মাথার ওপরে সাদা আলোর অনিদ্রা থাকতে নেই! তার বুকের ওপর কোনো সামাজিক দায় থাকতে নেই! একটি আদিম ফার্নের মতো শুধুমাত্র অস্তিত্ত্বই যার চূড়ান্ত বৈশিষ্ট্য।
ঠিক এরকম একটা বিকেল আর দুপুরের মাঝ বরাবর, কম্পাউন্ডের ঠিক মাঝখানে সত্যি সত্যিই সেদিন পড়েছিল পাখিটা। শরীরটা জড়োসড়ো, ডানাদুটো ছড়ানো, ঠোঁটদুটো অল্প ফাঁক করা! হয়তো তার নিষ্পলক চাহনি সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ হয়ে যাবার আগে, জল চেয়েছিল দু ফোঁটা! পাখিটা হয়তো প্রচন্ড গরমে মারা গেল! কিংবা নিজেদের ভেতর লড়াই করে! দুর্বলকে তো সবাই ঠোকরায়! ক্যাম্পাসের ভেতর আর্ট গ্যালারী বিল্ডিঙের মাথার ঠিক ওপরটায় বানানো বিশাল কাঁচের গম্বুজটা যেন পাখিদের কাছে ইদানীঙ অন্তহীন অসহায়তার গর্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে! গোল হয়ে উড়তে উড়তে পাখিগুলো সব ওইখানে গিয়ে জড়ো হয়, তারপর শীতল, অস্বচ্ছ, গাঢ় নীল রঙের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে সজোরে আছড়ে পড়ে মাটিতে! ঠিক এমনটা এর আগে অনেকবার ঘটতে দেখেছে বছর চল্লিশের সীমা হালদার। দেখেছে, অন্তিম শ্বাসেও পাখিদের স্বরে কেমন নিবিড় এক কুলুকুলু খেলা করে! দেখতে দেখতে ভিতর ভিতর কেমন যেন আবার একা হয়ে গেছে ও! ঠিক যেমন একা ও ছিল জন্মের ঠিক পর থেকেই। চারপাশে তখন যেন কেমন এক ক্ষুধার্থ চন্দনের গন্ধ! কোনো এককালে হয়তো ওরও মা ছিল! বাপ ছিল! নিজের একটা ঘর ছিল! সে কথা মনে পড়লে আজও চোখের দেখা কত বাড়ির কথা মনে পরে যায় ওর! ছায়া ছায়া গাছ! শীতল আঁধার! অনন্ত অপেক্ষা শেষে ঠান্ডা নরমে ফিরে যাওয়ার ভেতরে কেমন যেন একটা শিরশিরানি লেগে থাকে সবসময়। আসলে সংসার সংগ্রামে হেরে যাওয়ার পর ভাঙাচোরা বুকওয়ালা পাখিদের গা থেকে খসে পড়া সব কটি পালক, ওকে সেই মুহূর্তে এক সীমাহীন অসহায়তার সামনে এনে দাঁড় করায়! একটা বাড়ি মানে কত শখ! কত স্বপ্ন! কতদিনের জমিয়ে রাখা স্বাদ! আহ্লাদ! যে হারায় সেই শুধু বোঝে! শিমুরালির অনাথ আশ্রমে যেদিন প্রথম সীমা ওর মায়া দাদুকে দেখেছিল, সেইদিন ওর মনে হয়েছিল ওদের সেই বাড়িটার কথা। করিমপুরের জলঙ্গীর তীরে নীচু জমিতে বানানো চাচাড়ি দর্মা বাঁশের দীপ্ত অহংকার সেই বাড়ি। বেহিসেবি এক বর্ষার প্লাবনে, নদীর পাড় ভেঙে যে বাড়ি তলিয়ে গেছিল এক রাতের ভেতরে। বাড়ির পোষা বিড়ালের সাথে জলের বড় ড্রামের ওপর বসে ভেসে থেকেছিল ওরা কজন, তিনদিন! তিনরাত! মায়াদাদুই ওকে সঙ্গে করে শিমুরালির আশ্রম থেকে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর মধ্য কলকাতার বাড়িতে। বারো ঘর, এক উঠোন, শিরোনামহীন শনিবারের বারবেলা হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো বাড়িটায় সর্বত্র! কেমন যেন স্যাঁতস্যাঁতে শীত শীত ভাব! একদম তলার কোণের দিকের ঘরটায় ছিল মায়াদাদুর ষ্টুডিও। সারাটা ঘর জুড়ে খালি রং-তুলি, খড়-মাটি আর নন্দনহীন প্লাস্টার অফ প্যারিসের প্রলাপ। মাঝখানে পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম মানুষটির মতো, সম্মোহন আর কুহকের জালে জড়িয়ে, প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে তিনপায়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা প্রকান্ড কাঠের ইজেল। তাতে গায়ে গা লাগিয়ে সেঁটে আছে কুৎসিত আলো-আঁধারীর রং মাখানো একটা অন্ধকার মুখের ক্যানভ্যাস। মুখও বটে! আবার আয়নাও বটে! তবু তাদের নিঃসঙ্গতা নিয়ে কারো তেমন মাথাব্যথা নেই! এই প্রপঞ্চময় শিল্পের দুনিয়ায় আসলে সবাই একা! হয়ত একদিন পৃথিবীর অদৃশ্য কোনো কোণ থেকে ঠিকরে আসা সূর্য্যের অতিবেগুনী রশ্মি সরাসরি আলো ফেলবে ক্যানভাসটার ওপর, মুছে যাবে সব অন্ধকার! আপাতত কোনো অমীমাংসিত ছবি আঁকার অসমাপ্ত চেষ্টা খোদাই হয়ে আছে ওতে। সেদিন পুরো প্রেক্ষাপট জুড়ে শুধু মহাকাব্য লেখা হবে, এমনটাই আশা করে বসে আছে হয়তো, এ ঘরের প্রত্যেকে। খুব ছোট থেকেই ছবি আঁকতে পারতো সীমা। কারো কাছে কখনো শেখেনি হয়তো, কিন্তু ওর আঁকা ছবি কখনো কাউকে নির্লিপ্ত থাকতে দেয়নি! সর্বদা উদ্যত! এলোমেলো! অস্থির সে ছবি! এ বাড়িতে আসার পর অল্প অল্প করে মায়াদাদুর কাছে স্কাল্পচার শিখেছিল সীমা। ছোট ছোট দুহাতে ধরে ঠেসে ঠেসে সিলভার ক্লে মাখতো। মায়াদাদু তখন চলচ্ছক্তিহীন। হুইলচেয়ারে লোহার চাকাগুলো মাটিতে হ্যাঁচড়াবার সাথে ঘড়ঘড়ে একটা আওয়াজ বেরিয়ে আসতো। তার সাথে তাল মিলিয়ে সীমা শুনতে পেত মায়া দাদুর গলার আওয়াজ, “যত্ন নিয়ে মাখ রে সীমু! যত্ন নিয়ে মাখ! যত্ন নিয়ে মাখতে পারলে দেখবি ঘোরের এই পৃথিবীতে মাটি, মানুষ, মাংস, হিসেব করে সব এক! ঠিকঠাক মাখা যেদিন শেষ হবে, দেখবি, ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে পাথরগুড়ির বুক ফেটে জল বেরিয়ে এসেছে!” শিল্প কখন শুকনো পাথর জীবনের কাছে জল চায়! কখন ভিজে শ্রাবণে যৌনতার রং চায়! গাছের মুকুলের প্রাণ আর মানুষের শরীরের ঘ্রাণ মিলে মিশে গিয়ে, দুপায়ের ভাঁজে রাখা গোপন সমুদ্র নিয়ে পাশা খেলে, সেদিন তা বোঝেনি সীমা! বোঝেনি ঠিক ততদিন, যতদিন না তার কিশোরীবেলার সমস্ত সুপ্ত স্রোত, নিঃস্বতা স্বাদের শিকলে বাঁধা জীবনে ফুঁসে উঠেছিল, এক প্রথম দর্শনের বিস্ময়ে বা প্রগলভতায়! ঠিক যতদিন না ও এ বাড়ির চৌকাঠে প্রথম ওর মঙ্কুদাকে দেখেছিল!
মঙ্কুদা মায়াদাদুর ছেলে। ছোট থেকে মামাবাড়ি থেকেই মানুষ হয়েছে। মাঝে বিলেতে গেছিল আর্টের কাজ শিখতে! বিদেশ থেকে সিরামিক শিখে ফিরলো। এদিকে এসব তখন তেমন চালু হয়নি। থিমের পুজো তখন সবে উঠেছে। সিরামিকের বাজেট দিতে পারে এমন পুজো তখন হাতে গোনা! হাতে করে সীমাকে ফায়ার প্লেসে সিরামিক পোড়াতে শিখিয়েছিল মঙ্কুদা! সাথে ভাদ্র দুপুরের গনগনে তাপে পুড়ে গেছিল দুটো শরীর! সীমার সারা শরীরে শিহরণ খেলে গিয়েছিল যেন! জীবনের প্রথম পুরুষের লোভাতুর স্পর্শে, তার উন্মুখ দাঁতে আর নখে দাগ বসে গেছিল সীমার কোমল কোমরে, বুকে, নিতম্বে! কামনার গভীরে তৈরী হয়েছিল এক উর্বর পাত্র! পৃথিবীর সব জলকে ধরে রাখবে বলে! মাংশাসী পাথরের বুকে প্রাণের জন্ম দেবে বলে! শরীরী মহোল্লাসের আশাতীত সমারোহ অতিক্রম করে ওরা ঢুকে পড়েছিল বেখেয়ালে, ভয়-ডরের গন্ডি পেরোনো কোন অনাম্নী কাক জোৎস্নায়! সীমা নিজেই নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুনভাবে তৈরী করছিল, ওর মঙ্কুদার জন্য। ও যেন তখন, খানিকটা সুগন্ধ ছেটানো কোন নারী ভাস্কর্য্য! নিজের শরীর-মন, সব সঞ্চয়, উপুড় করে ঢেলে চলেছে, প্রায় প্রতিদিন নতুন করে! প্রায় বছর কুড়ি পঁচিশ ধরে! হয়তো একটা উল্টো গতি! একটা উল্টো পথ! তবু তো সেই নিজেকে তৈরী করতে চাওয়াতে কোনো খামতি ছিল না! আর ছিল না বলেই, প্রেম-ভালোবাসা সবই একাত্ম হয়ে গেছে, ওর আর ওর মঙ্কুদার ভেতরে, এটা হয়তো আজও বিশ্বাস করে সীমা! আসলে মেয়েরা অধিকার পেতে তো বড় ভালোবাসে!
এই ক্যাম্পাসে এখন আর ক্লাস হয়না হয় না। হয় না লাইভ ফিগার স্টাডি, রিলিফ ওয়ার্ক বা অ্যাসেমব্লেজ শেখানোর কাজ। ক্লাসরুমগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকে শুধু! তার একপাশে বোঝাই করা আছে মডেলস! হয়তো কোন অসমাপ্ত স্কাল্পচার কিংবা বাতিল কোন ইন্সটলেশন্স! দেখলে মনে হবে যেন পুজোর দিনে ফাঁকা কুমোরটুলি! এখানে এখন শুধু আর্ট গ্যালারিগুলোই খোলা থাকে দিনভর। দেওয়ালে দেওয়ালে ঝোলে নিস্তব্ধ বিমূর্ততা! সাদা কালো, উঁচু নীচু বিরহের ইনকিউবেশন! এখানকার কত কাজে এখনও নিজেকে খুঁজে পায় সীমা! অনাবিল আদরে হয়ত ওর শরীরটাকে স্লো মোশানে ধরে রেখেছে কোন নবীশ যুবক! গোটা একটা দেওয়াল জুড়ে শায়িত কোন উদ্দাম যুগলের মাঝে, নারী শরীরের যে পর্বত সমান ভাঁজ, অভিসারী উপত্যকা বরাবর মোলায়েম হয়ে নামতে গিয়ে চোখ হামাগুড়ি দেয়, মেঘের আড়ালে ঘনিয়ে আসা, ঘোর অমানিশার মতো অন্ধকার কালো শরীরটার, যে নরম বলিরেখাগুলোয়, ঠিক সেখান থেকেই হয়তো ঝরে যাওয়া কামিনীর গন্ধের মতো ওর নিজের শরীরের গন্ধ ভেসে আসে আজও! মঙ্কুদা ছাড়া আর একবারই সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে শিল্পীর সামনে ধরা দিয়েছিল সীমা। সেবার বিদেশ থেকে এক লাল মুখ সাহেব এসেছিল এই আর্ট স্কুলে। ওদেশে নাকি তার অনেক নামডাক নুড পেইন্টিংয়ে! এই কলেজের বুকে তার একটা সৃষ্টি অমর হয়ে থাকুক, চেয়েছিল মঙ্কুদা! না করতে পারেনি সীমা। প্রায় অন্ধকার ঘরে, কিছু জোরালো স্পট তাক করা ছিল ওর কালো শরীরে। ঘোর বর্ষার মত গাঢ় রং ক্যানভাসের গায়ে ছড়িয়ে পড়ে পাগল প্রেম এঁকেছিল শুধু অবাধ্য তুলির টানে। একটা ফ্যাটফ্যাটে সাদা চামড়া যেন আপাদমস্তক রং মেখেছিল সেদিন, সীমার কালো চিবুক, কুসুম কোমল স্তনবৃন্ত, গহীন গুহ্যদেশকে ফুটিয়ে তুলতে তুলতে! সেকথা আজও মনে পড়লে মনে মনে গর্ব হয় সীমার। একজন শিল্পী কি একটি নগ্ন শরীরকে তার দৃষ্টি দিয়ে একবারও ভোগ করেন না? শিল্পের চরমে পৌঁছলে চোখের সামনে পাওয়া অবজেক্টকেই ফ্যান্টাসাইজ করে বসেন না আকণ্ঠ মাতালের মতো? একটা সুগঠিত শরীর, সে পুরুষ হোক বা নারী, তার সামনে পড়লে শিল্প কি আর শুধু সাধনা থাকে? মস্তিষ্কের সকল ঘুলঘুলি ছুঁয়ে পাক খেতে খেতে, বদ্ধ ঘরে ঘনিয়ে ওঠা দমকা বাতাসটায়, আচমকা স্মৃতির অ্যালবামটা ওলোট পালট হয়ে যেতে থাকে সীমার! উন্মুখ কারো মুখ মায়াজলে ভেসে ওঠে দূরে! কৃত্রিম ঠান্ডায় নিস্তব্ধ কথাদের আড়াল করে রেখে, সামনের স্ট্যান্ডে রাখা টকটকে সোনালি রঙের মেটাল স্কাল্পচারটার দিকে এগোতে থাকে সীমা। খুব ধীরে! আশপাশের দেওয়ালের মাথায় বসানো এসি মেশিনগুলোর নিয়ন্ত্রিত শব্দে চাপা পড়ে যায়, এ ঘরের টাইলসের মেঝেতে ওর পায়ের হাওয়াই চটির তোলা মৃদু ফটাস ফটাস শব্দ। একজন পুরুষের নাভিদেশ থেকে বেরিয়ে আদুল গায়ে আপাদমস্তক নাড়ি জালে জড়িয়ে রয়েছে একটি শিশু! পুরুষের জননাঙ্গটি নিম্নদেশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে! যেন প্রাকৃতিক নিয়মে, জীবজ ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায়, জীবনের শ্রেষ্ঠ শিল্পটি রচনা করার পর সে নিজেই নিজের অস্ত্রখানা নামিয়ে রেখেছে। পরাবাস্তবতা, লৌকিক-অলৌকিক, জীবজ সংগ্রাম, টিকে থাকার লড়াই এসব পেরিয়ে এ যেন তার শিল্পের পথে উত্তরণ! শিশুটিও পুরুষ! সবে জন্মেছে সে! তার শরীর এখনো অর্ধবৃত্তের মতোই অসমাপ্ত! শিবু জন্মানোর সময় তিনরাত জ্ঞান ফেরেনি সীমার! পাশের বাড়ির চম্পা রাত জেগেছিল সেবার। চোখ খোলার পর সব ঝাপসা দেখেছিল ও! কানের কাছে শুধু মেনকার গলা পেয়েছিল অবচেতনে, “ব্যাটা হইসে রে! ব্যাটা! ব্যাটা হইসে তোর! পুরা রাজার ব্যাটা আইসে রে!” একতাল মাটিকে নয় মাস পনেরো দিন গর্ভে ধরে, পৃথিবীর মুখ দেখিয়ে সেদিন ওর মনে হয়েছিল, সাক্ষ্যাৎ পরম ব্রম্ভকে পাওয়া হয়ে গিয়েছে!
ক্যাম্পাস ছেড়ে বেরিয়েছে সীমা, বেশ অনেকক্ষণ হল। ক্যাম্পাসের সামনেই বাসস্টপ। জৈষ্ঠ্য শেষের হঠাৎ বৃষ্টির সম্ভাবনাকে প্রায় উড়িয়ে দিয়ে, চারপাশের পৃথিবীটা যেন জ্বলন্ত ফার্নেসের রূপ নিয়েছে। চরম গলনাংকে পুড়ছে সব কিছু! সব এলোমেলো চুল আজ পুড়ে যাবে! পুড়ে যাবে পেশীতন্তুর আড়ালে বয়ে চলা শ্বাসরুদ্ধ রক্তের ধারা! এই দুপুর দ্বিপ্রহরে পুড়ে যাবে, ধুধু করা মাঠ, গাছ গাছালিতে বেড়ে ওঠা পাখিদের বাসা, গলে যাবে নিন্দুকের মুখে বলা সব অশ্লীলতা! যোনিদ্বার! পুরুষালি স্তনের বোঁটা! নতুন শরীর তৈরী হবে বুঝি গলে যাওয়া সেই রক্ত মাংসের তাল থেকে। বাসস্টপের নোংরা ধুলো পড়ে যাওয়া মার্বেলের বেদীটা এখন চলে গেছে রাস্তার ওই পাগলীটার দখলে! ওকে সীমা আজ নতুন দেখছে না! প্রায়ই এ চত্ত্বরে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় ওকে। ওর গা থেকে জন্ম জন্মান্তরের জমে থাকা ময়লার পুঁতিগন্ধ ভেসে আসে সবসময়। তবু প্রতিবার ওর দুটো দীঘল চোখ যেন নৈশব্দের ব্যঞ্জনাকে কাটে ফলায় ফলায়। জ্বলন্ত সূর্য্যের তাপেও সে চোখে যেন ছ্যাঁকা লাগে না। প্রচন্ড দাবদাহে ওর শরীরের সব আঢাকা চামড়া পোড়ে। চামড়া পুড়ে তার কৌলিন্য হারায়! কালো হয়ে যায়! চামড়া মাংস পোড়া গন্ধ ছাড়ে এ চরাচর জুড়ে। পুড়ে যায় প্রাণ! সুযোগসন্ধানী পরজীবীর দল সে পোড়া দেহে মোচ্ছবের মিছিল করে। কিন্তু পাগলীর সেসবে হুঁশ নেই! অনায়াসে সে নিজের দুটো হাত রোদে বার করে, বিলি কাটে এই তপ্ত শহরে বুকে। দুটো হাতের চেটো জড়ো করে পাখি বানায়। ওর পরনের হাফ প্যান্টটা এখন অনেকটা ভাঁজ হয়ে ঢুকে গেছে, ওর যৌনাঙ্গের গোপন স্থানে। ঝলসানো রোদে বাসস্ট্যান্ডের পাতানো ছায়ায়, সেই প্যান্টের আড়াল থেকে পেলব মরুদ্যানের মতো উঁকি দিচ্ছে ওর ঈষৎ মাংসল থাইযুগল! কাছে গেলে হয়তো বোঝা যায় ওর যোনির খাঁজ! একদল স্কুল পড়ুয়া ছেলে ওর পাশ বরাবর হেঁটে যেতে যেতে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতে থাকে। ওর দিকে কাঁচা অশ্লীলতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছুঁড়ে দেয় কিছু কুরুচিকর মন্তব্যের ফালি! “যা না বাল ওর কোলে গিয়ে বসগে যা না!” পাগলী ওদেরকে দেখেও দেখে না! সেসব শুনেও শোনে না! ভারি নীরব এক তাচ্ছিল্য যেন ওকে পেয়ে বসে সেই সময়! সীমা ওর দিকে চেয়ে থাকে আর মনে মনে ভাবে, মেয়েটাকে লাইভ ফিগার স্টাডিসের ক্লাসে মডেল করলে মানাত ভালো! একটা সময় তো ও নিজেও এ কাজ করেছে! এখন বাসন্তী, গোসাবা কিংবা দেগঙ্গা, মাটিয়া থেকে ঠিকে ঝির কাজে যারা এ চত্ত্বরে আসে, কিংবা বর্ডার পেরিয়ে এসে যারা এ চত্ত্বরে ঝুপড়ি গাড়ে, দুবেলা দুমুঠো রোজগারের আশায়, সীমা তাদের মধ্যে থেকে সোর্স লাগিয়ে মেয়ে তুলে নিয়ে এসে এ কাজে লাগায়। মডেল খুঁজতে গেলে এক জোড়া সন্ধানী চোখ লাগে। শুধু হয়তো নীরব দৃষ্টি দিয়েই একটা সম্ভাব্য উত্তীর্ণ মেয়ে শরীরকে খুঁজে নিতে হয়। আপাদমস্তক পোশাকের ওপর থেকেই দেখে বুঝে নিতে হয় শরীরের মাত্রা, মুদ্রা এবং গঠন বৃত্তান্ত! একজন শিল্পীর তুলি কিংবা আর্টিস্ট নাইফ একটা ঠিকঠাক ডাইমেনশনের শরীরের সামনেই তো প্রাণ পায়! বা প্রাণ তৈরী করতে পারে! একটা সুঠাম নারী শরীর, চওড়া বক্ষদেশ থেকে সরু হয়ে কোমরের কাছে গিয়ে যা আবার ছড়িয়ে গিয়েছে বেশ খানিকটা! চর্বির বন্ধনীগুলো হয়তো নারীর হাতের শাঁখার মতো ঘিরে রয়েছে সেখানটায়! তারপর পাছার দিকটা আবার দু ভাঁজের পাহাড়চূড়ার মতো উঁচু হয়ে গেছে বেশ অনেকটা! এই এমনটাই তো সবাই খোঁজে! এদেরকে দেখে খুব ভালো ফিগার স্টাডি করা যায় আসলে। এরাই তো আসলে আদর্শ অবসারভিং এলিমেন্ট এ বিশ্ব চরাচরে। পলির বুক ছোট, রোজিনার ভারী ভরাট বুক, বাতাসীর বুক আবার মাঝারি, ছোট না আবার খুব বড়োও না! শেফালীর বুক আবার পরিণত! খুব পরিমিত এবং যথাযথ! অপুষ্টি নেই, উপাদান আছে এমন এক জোড়া বুকেই তো স্বয়ং ঈশ্বরেরও তৃষ্ণা মেটে! শিল্পের সারা শরীর জুড়ে এক নোনা সমুদ্র তখন!
শিবু হবার পর এই আর্ট কলেজের কাজটা ওকে মঙ্কুদাই করে দিয়েছিল। ওদের ব্যাপারটা ও বাড়িতে জানাজানি হয়ে গেল যখন, তখন সীমার তিন মাস চলছে। মঙ্কুদা দায়িত্ত্ব এড়ায়নি। নিজের সবটুকু দিয়েই ওর পাশে ছিল। জোড়াবাগান বস্তিতে ঘর দেখে দিয়েছিল। মাসে মাসে টাকাও পাঠাত। শুধু দিতে যেটা পারলো না, সেটা শিবুর পিতৃপরিচয়! ছেলেটা একটা বয়স অবধি বাবা বাবা করে ঘ্যানঘ্যান করতো সীমার কাছে। তারপর নিজেই যা বোঝার বুঝে নিল। পেটকাটি, চাঁদিয়াল আর বস্তির বাকি ছেলেপুলেদের সাথে লাট্টু লেত্তি কিংবা বল পেটানোর বয়সে, একদিন হঠাৎ করেই শিবু বড় হয়ে গেল। বুঝতে শিখে গেল, ওর মা প্রায়দিন যেকাজে যায়, সেটা খুউব একটা সম্মানের কিছু নয়। আর চার পাঁচজনের সামনে মুখ তুলে তা বলা যায়না। লোকে আড়ালে হাসাহাসি করে। বড় বিচ্ছিরি রকমের দাঁত বের করা সে হাসি! বুকের কাছটা হঠাৎ টনটন করে ওঠে সীমার। বোঁটার কাছে নখ বসিয়ে দিয়েছে একদম! এরকমভাবে কেউ আঁচড়ায়! এরকম দস্যিপনা করে কেউ এই বয়সেও! মঙ্কুদাটা আর পাল্টালো না! মনে মনে হেসে ওঠে সীমা, সেই কেমন ও বাড়িতে থাকতে, ফাঁকা ঘরে একা পেলেই ওকে কাছে টেনে নিতে মঙ্কুদা! এরকম কত নির্জন দুপুরে সীমার কলমিলতা শরীর, মিশে গিয়েছে মঙ্কুদার বিশাল রোমশ বুকে! এখন মাঝে মাঝে এই ফাঁকা বিল্ডিংটায় ওকে ডেকে নেয় মঙ্কুদা। নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে, ছিনিমিনি খেলে ওর ঢিলেঢালা শরীরটা নিয়ে। প্যালেট নাইফ দিয়ে আঁচড়ায় ওর ঝুলে যাওয়া স্তন, প্রায় ঝাপসা হয়ে আসা যোনিকেশর! তলপেটটা টাটিয়ে ওঠে সীমার! পেটের সেলাইয়ের কাছটা টনটন করে ওঠে আজও! যেন সম্মানহীন প্রসূতির বিত্তহীন শরীরে টোল খেয়ে যায় গতজন্মের প্রায় শুকিয়ে আসা প্রসব চিহ্ন! দূরে মায়া মায়া অমলতাসের বাঁশির সুর ভেসে আসে।
মায়া দাদু বলতো, পাখিদের মধ্যে একমাত্র বাবুইই পারে সুন্দর করে বাসা বাঁধতে। তাইতো গোটা পক্ষীকূলে ওরাই শুধু শিল্পী! পুরুষ বাবুই বাসা বাঁধে স্ত্রী পাখির জন্য। বাসা পছন্দ হলে স্ত্রী পাখিটা ঢুকে যায় সেই বাসায়। পুরুষটি তখন তার স্বামী! তারপর খড় কুটো পালকের অন্তস্থল জুড়ে শুধু দুজনার নিয়মের সংসার! ঋতুর নিয়ম মেনেই মেয়েটি পোয়াতি হয় একদিন। ডিম দেয়। সেই ভ্রূণই তখন তাদের একমাত্র ভালোবাসার আশ্রয়! একসঙ্গে থাকার একমাত্র বন্ধন! মেয়ে পাখিটি অন্ধকার বাসার এক কোনায় বসে ডিমে তা দেয়। বাচ্চা না হওয়া অবধি স্বামী কিন্তু তার খুব খেয়াল রাখে! অবহেলা করে না কোনোমতেই! কিন্তু তার মন তখন আর ঘরমুখো থাকে না। চোখ চলে যায় অন্য গাছে, অন্য বাসা বাঁধার দিকে! সেই বাসা দেখে যদি আবার কোনো মেয়ের মন মজে! পুরোনো সংসারের প্রতি তার আর তখন টান নেই। বাচ্চাদের প্রতি কর্তব্য, সেসব তখন শুধু ভান হয়ে দাঁড়ায়। এর আগে কলেজটা থাকতে যতবার সীমা এখানে এসেছে, প্রতিবারই মঙ্কুদার ঘরের বাইরে অপেক্ষা করেছে অনেকক্ষণ। ভেতরে তখন মিহি গলার হুল্লোড় চলছে। চলছে কলেজের ডিন এর সাথে কমবয়সী ছাত্রীদের নিবিড় বাক্যালাপ! কামনায় মত্ত পুরুষের হালকা সুযোগ সন্ধান! অসমবয়সী দুজন নর ও নারীর জলজ সেনসুয়াল কথার উচ্ছাসে শিল্প তখন শুধু ভেঙেছে, গড়েছে, পুরুষের খোলা বুকে আছড়ে পড়েছে! ক্যানভাস জোড়া যৌনতায় ভালোবাসার তুলি ছুঁড়ে, ঘেঁটে, মনোগ্যামীর নিয়ম ভেঙে গড়ে তোলা প্রবণতায়, মাতাল মেহফিলে, পরকীয়ার তখন শিল্পান্তর ঘটে গেছে শুধু!
শিবুটা ইদানীঙ খারাপ পাড়ায় যাতায়াত শুরু করেছে নির্ঘাৎ! ওর হাবভাব, চলন বলন দেখে এসব ঠিক ধরতে পারে সীমা! ইদানীঙ প্রায়ই এক গলা মাল গিলে বাড়ি ফেরে ছেলেটা। ফিরেই সারা ঘর বমি করে ভাসায়! উল্টে পড়ে থাকে চৌকির ওপর! কানা উঁচু টোল খাওয়া থালায়, বাসি রুটি আর হেলেঞ্চা শাক চাপা দেওয়া থাকে, বিয়ে করে ঘরে রাখা মেয়েমানুষের মতো! বারমুখো পুরুষের মুখে রোচে না সেসব! সীমা কিছু বলতে গেলেই ক্ষেপে যাওয়া ষাঁড়ের মতো করে মারতে আসে! মুখে অকথ্য গালিগালাজ! সীমাকে ‘মা’ বলে ভাবতেই বুঝি ঘেন্না করে ওর! কদিন ধরেই বলছে, হাড় কাটা গলির মর্জিনাকে ঘরে এনে তুলবে! সীমা আপত্তি করলে, গলা ফাঁটিয়ে চেঁচাতে থাকে শিবু, “মাগী, যাইস তো চুদাইতে এহনো, ওই বুইড়াটার লগে, পুরা জীবন তো ব্যাডাদের লগে চুদাইয়া কামাইয়া আনসস! তুই আর মর্জিনাতে আবার তফাৎ করস কিসে? রেন্ডির পুলা আমি রেন্ডি লইয়াই থাকমু! তর না পুষাইলে বাইরাইয়া যাবি বুঝছস?” এই বলে সীমার চুলের মুঠিটা ধরে সজোরে দেওয়ালে ঠেসে ধরে শিবু! এই যেমন পরশু রাতে এরকম কথা কাটাকাটি হতে হতে, হঠাৎ দরজার খিল তুলে সজোরে বসিয়ে দিল শিবু, সীমার মাথায়! মাঝরাতে মাথা ফেটে চৌচির! মাথা থেকে অঝোরে রক্ত বেরিয়ে গেছে শুধু! সারা ঘরের মেঝে জুড়ে শুধু চাপ চাপ রক্ত! পোয়াতির গর্ভ নষ্ট হলে বুঝি এরকম রক্তক্ষরণ হয়! বাবুর তখনও এসবে হুঁশ নেই! সে তখনও মালের ঘোরে ভুল বকে চলেছে!
পাগলিটাকে তুলে নিয়ে গিয়ে কাল সারারাত ধরে একদল কামতাড়িত পুরুষ চলন্ত গাড়ির ভেতর দল বেঁধে রেপ করেছে! সম্ভোগের চাপে বুক ফেটে দুধ বেরিয়ে আসবে এই ভ্রমে, অক্ষান্ত পাশবিকতায় সদ্য পেট খসানো এক অপ্রকৃতিস্থ মায়ের স্তনের বোঁটা ছিড়ে পান করেছে তাজা রক্ত! লোহার রড ঢুকিয়ে তার যোনিদেশ ফালাফালা করে দিয়েছে বীর্য্য প্রমাণ লোপাটের নেশায়! মেয়েটার সারা গায়ের মাংস খুবলে খেয়েছে বুভুক্ষু হায়নার দল! তারপর পৈশাচিক প্রাণের লালসা মেটাতে ওর ছেঁড়া ফাঁটা দেহটাকে চলন্ত গাড়ির চাকার তলায় পিষে দিয়েছে ‘ওরা’! নারী-স্তন-মাংস-যোনি-রক্ত সব মিলে মিশে একাকার!
উদাসী কোনো মেঘবালিকার ভুলে যাওয়া কোনো জাদুর মন্ত্রে, পাগলীটাও হয়তো একদিন পাখি হতে চেয়েছিল! আসলে সব পাখিই তো আকাশ উড়াল চায়, তাই না?
*************************************************************************************


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন