গুচ্ছ কবিতা * মনোজ বাগ
হে নটরাজ
পাড় ভেঙে পড়ে ।
মাটি ধুয়ে ধুয়ে যায় ।
আবার জমে পলি,
জলে ডোবা জমি জলের স্তর সরিয়ে মাথা তোলে ।
এমনটা রোজই হয়।
তবুও কোন এক দিন আছড়ে পড়ে প্রবল বাণ ।
ভয়ঙ্কর ভাবে কেঁপে উঠে মাটি ।
প্রকৃতি যতক্ষণ তার শিব ভাবে থাকে,
মানুষ সাধ্য মতো সাজায় ।
প্রকৃতির রুদ্র রূপের কাছে মানুষের সব কীর্তি কুচো কাগজের মতো উড়ে যায় ।
এমনটা সবদিন হয় না ।
বহু দিন অন্তর অন্তর এক-আধ বার হয় ।
তখন ঐ প্রবল দুর্যোগে মানুষ যতটা তছনছ হয়,
দুর্যোগ কেটে গেলেই আবার সব ভুলেও যায় ।
জীব মাত্রই এই এক স্বভাব ।
আমাদের নিত্যদিনের সব আদর, আবদার চলে
চির শান্ত ধীর-স্থির এই শিব মূর্তির কাছেই ।
"রুদ্র রূপে নয়, সদা শিব ভাবে থাকো হে নটরাজ " --
আমাদের প্রতিটি মুহূর্তের প্রার্থনা, এই ।
প্রার্থনা মঞ্জুর হলেই আমরা ভালো থাকি ।
তা না হলে, আমরা চাক্ষুষ করি আমাদেরই ধ্বংস যজ্ঞ,
প্রত্যক্ষ করি আমাদেরই সমুহ বিনাশ ।
আত্ম-দর্শন
জগতের সমস্ত বিন্দুই একটি বৃত্তের মধ্যে আছে ।
জগতের সব সূত্র, সব পরিব্যাপ্ততা
একটি বৃত্তের পরিসরে আছে ।
বাইরে যখন ঝলমলাচ্ছে আলো ,
তা ফুটে আছে সমস্ত ক্ষেত্র জুড়ে ।
যখন সবটাই ঢাকা পড়ে গভীর অন্ধকারে,
একে অন্যতে মিলিয়ে আছে ঐ অন্ধকারের গ্রাসে ।
অন্ধকারে যেমন আলো,
সজাগতায় তেমনই ধ্যান ।
ধ্যান সমগ্রতার দীপ্তি ।
ধ্যানাসনে বসে নিমীলিত চোখ ঐ আলোয়
নিজের চোখে নিজেকে দেখে ।
ঝুঁজকো বেলার আলো
মনোজ বাগ
খুব ভোরে উঠলে, সকালটা অনেক বড় মনে হয় ।
যদিও দুপুর গড়িয়ে অপরাহ্নে এসে
কখনো এমনও হয়, মন বলছে --
সন্ধ্যে আরো কত দূর ?
সবার নয়, কারোর কারোর ।
যাদের দিন ও রাত এক ।
যাদের চব্বিশ ঘন্টায় দিন ।
তারা সন্ধ্যে নামার বহু আগে থেকেই দেখে রাখে,
বারান্দার, ঘরের সব আলোগুলোই ঠিকঠাক আছে কিনা ।
যদি লোডশেডিং হয় !
হ্যারিকেনে তেল, চার্জার, নিদেনপক্ষে কটা মোমবাতি -- আছে তো ?
যাতে ভরসন্ধ্যায় কোন কিছুই হাতড়াতে না হয় ।
যাতে রাতটাকেও দিনের মতোই কার্যকর রাখা যায় ।
যারা ঝুঁজকো বেলায় উঠে বাসিপাঠ সেরে আবারও একটি দিনের শুরু করে,
তারা জানে, এক বিশ্ব অন্ধকার
ধীরে ধীরে কী করে বদলে যায় আলোয় ।
মুশাফির
রাস্তা কখনো সংকীর্ণ, কখনো প্রশস্ত ।
কখনো ঋজু, কখনো আঁকা-বাঁকা ।
সুদীর্ঘ বা হ্রস্ব, যে কোন রাস্তাই তবুও শেষ পর্যন্ত যায় ।
এখানে আমার ভূমিকা একজন যাত্রিকের ।
এক জীবনে আবিশ্বের প্রতিটি রাস্তারই পথিক হতে আমি পারি না ।
পারি না বলেই, আমি এক অসম্পূর্ণ মন --
এক অসমাপ্ত যাত্রার ভ্রাম্যমান এক মুশাফির ।
শরীরে নয়, মিলে মিশে থাকি মনে প্রাণে, ভাবনায়, চিন্তায় --
আবিশ্বের প্রতিটি দৃশ্যে, শ্রুতিতে
প্রতিটি লতায় পাতায় ,
প্রতিটি কণায় কণায় ।
ভিতর-বার
ভিতরে যখন প্রবল অস্থিরতা,
বাহির হয়তো তখনও ধীর স্থির ।
সমাহিত মন যখন গভীরতর ধ্যানে মগ্ন, গম্ভীর ।
বাহিরে, অঝোর হয়তো আবিশ্ব জুড়েই ।
জীবন এরকমই ।
জগৎও ।
একই বস্তু যতক্ষণ জড়মাত্র --
মৃতের মতো পড়ে আছে ।
যেই তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা পেল, হলো জীবন ।
হলো স্বতঃস্ফূর্ত এক সজীবতা ।
যাতে উথাল-পাতাল করছে ধীশক্তি --
টলটলাচ্ছে মেধা।
শুধুই আমাদের আশপাশের কটা এঁদো গলি বা কটা খানা-খন্দে নয় ,
আবিশ্বেই এই একই নিয়ম।
জীবন কোথাও থেমে নেই ।
আবহ্ম জগৎ কোথাও নিছকই স্থির নেই ।
সর্বত্রই আছে ক্রিয়া ।
বিভু ভাবে যা মহাজাগতিক ।
বিন্দুতে বিন্দুতে সেটিই ফুটিয়ে তুলছে
জীবন -- জগৎ ।
**************************************************************


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন