মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

গুচ্ছ কবিতা * মনোজ বাগ






গুচ্ছ কবিতা * মনোজ বাগ 

হে নটরাজ


পাড় ভেঙে পড়ে ।

মাটি ধুয়ে ধুয়ে যায় ।

আবার জমে পলি, 

জলে ডোবা জমি জলের স্তর সরিয়ে মাথা তোলে ।


এমনটা রোজই হয়। 

তবুও কোন এক দিন আছড়ে পড়ে প্রবল বাণ ।

ভয়ঙ্কর ভাবে কেঁপে উঠে মাটি ।


প্রকৃতি যতক্ষণ তার শিব ভাবে থাকে,

মানুষ সাধ্য মতো সাজায় ।

প্রকৃতির রুদ্র রূপের কাছে মানুষের সব কীর্তি  কুচো কাগজের মতো উড়ে যায় । 


এমনটা সবদিন হয় না ।

বহু দিন অন্তর অন্তর এক-আধ বার হয় ।


তখন ঐ প্রবল দুর্যোগে মানুষ যতটা তছনছ হয়,

দুর্যোগ কেটে গেলেই আবার সব ভুলেও যায় ।

জীব মাত্রই এই এক স্বভাব ।


আমাদের নিত্যদিনের সব আদর, আবদার চলে

চির শান্ত ধীর-স্থির এই শিব মূর্তির কাছেই ।

"রুদ্র রূপে নয়, সদা শিব ভাবে থাকো হে নটরাজ " -- 

আমাদের প্রতিটি মুহূর্তের প্রার্থনা, এই ।


প্রার্থনা মঞ্জুর হলেই আমরা ভালো থাকি ।

তা না হলে, আমরা চাক্ষুষ করি আমাদেরই  ধ্বংস যজ্ঞ,

প্রত্যক্ষ করি আমাদেরই সমুহ বিনাশ ।


আত্ম-দর্শন


জগতের সমস্ত বিন্দুই একটি বৃত্তের মধ্যে আছে ।

জগতের সব সূত্র, সব পরিব্যাপ্ততা 

একটি বৃত্তের পরিসরে আছে ।


বাইরে যখন ঝলমলাচ্ছে আলো , 

তা ফুটে আছে সমস্ত ক্ষেত্র জুড়ে ।


যখন সবটাই ঢাকা পড়ে গভীর অন্ধকারে,

একে অন্যতে মিলিয়ে আছে ঐ অন্ধকারের গ্রাসে ।


অন্ধকারে যেমন আলো, 

সজাগতায় তেমনই ধ্যান । 

ধ্যান সমগ্রতার দীপ্তি । 


ধ্যানাসনে বসে নিমীলিত চোখ ঐ আলোয় 

নিজের চোখে নিজেকে দেখে ।


ঝুঁজকো বেলার আলো

মনোজ বাগ


খুব ভোরে উঠলে, সকালটা অনেক বড় মনে হয় । 

যদিও দুপুর গড়িয়ে অপরাহ্নে এসে 

কখনো এমনও হয়, মন বলছে -- 

সন্ধ্যে আরো কত দূর ?

সবার নয়, কারোর কারোর ।


যাদের দিন ও রাত এক ।

যাদের চব্বিশ ঘন্টায় দিন ।

তারা সন্ধ্যে নামার বহু আগে থেকেই দেখে রাখে,

বারান্দার, ঘরের সব আলোগুলোই ঠিকঠাক আছে কিনা ।

যদি লোডশেডিং হয় !

হ্যারিকেনে তেল, চার্জার, নিদেনপক্ষে কটা মোমবাতি -- আছে তো ?

যাতে ভরসন্ধ্যায় কোন কিছুই হাতড়াতে না হয় । 

যাতে রাতটাকেও দিনের মতোই কার্যকর রাখা যায় । 


যারা ঝুঁজকো বেলায় উঠে বাসিপাঠ সেরে আবারও একটি দিনের শুরু করে,

তারা জানে, এক বিশ্ব অন্ধকার 

ধীরে ধীরে কী করে বদলে যায় আলোয় ।


মুশাফির 



রাস্তা কখনো সংকীর্ণ, কখনো প্রশস্ত ।

কখনো ঋজু, কখনো আঁকা-বাঁকা ।

সুদীর্ঘ বা হ্রস্ব, যে কোন রাস্তাই তবুও শেষ পর্যন্ত যায় ।


এখানে আমার ভূমিকা একজন যাত্রিকের ।


এক জীবনে আবিশ্বের প্রতিটি রাস্তারই পথিক হতে আমি পারি না ।

পারি না বলেই, আমি এক অসম্পূর্ণ মন --

এক অসমাপ্ত যাত্রার ভ্রাম্যমান এক মুশাফির ।


শরীরে নয়, মিলে মিশে থাকি মনে প্রাণে, ভাবনায়, চিন্তায় --

আবিশ্বের প্রতিটি দৃশ্যে, শ্রুতিতে 

প্রতিটি লতায় পাতায় , 

প্রতিটি কণায় কণায় ।


ভিতর-বার


ভিতরে যখন প্রবল অস্থিরতা, 

বাহির হয়তো তখনও ধীর স্থির ।

সমাহিত মন যখন গভীরতর ধ্যানে মগ্ন, গম্ভীর ।

বাহিরে, অঝোর হয়তো আবিশ্ব জুড়েই । 


জীবন এরকমই ।

জগৎও । 


একই বস্তু যতক্ষণ জড়মাত্র --

মৃতের মতো পড়ে আছে ।

যেই তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা পেল, হলো জীবন ।

হলো স্বতঃস্ফূর্ত এক সজীবতা ।

যাতে উথাল-পাতাল করছে ধীশক্তি --

টলটলাচ্ছে মেধা। 


শুধুই আমাদের আশপাশের কটা এঁদো গলি বা কটা খানা-খন্দে নয় ,

আবিশ্বেই এই একই নিয়ম। 


জীবন কোথাও থেমে নেই । 

আবহ্ম জগৎ কোথাও নিছকই স্থির নেই ।


সর্বত্রই আছে ক্রিয়া ।

বিভু ভাবে যা মহাজাগতিক । 

বিন্দুতে বিন্দুতে সেটিই ফুটিয়ে তুলছে 

জীবন -- জগৎ ।




**************************************************************

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন