মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

গল্প * যুগল কিশোর দাস অধিকারী

 




শেষ জলখাবার

যুগল কিশোর দাস অধিকারী


সেদিন প্রচন্ড ঝড় জলের সন্ধ্যা। ভাদ্রের শেষ আশ্বিনের শুরু। তবু বর্ষা যায় না। ইদানিং বছরে কমপক্ষে আট দশটা নিম্নচাপ ধরা বাঁধা। কেবল আষাঢ় শ্রাবণ এখন বর্ষাকাল নয়। ঋতু চক্রে বিশাল পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। ইচ্ছামত গাছপালা বনভূমি কেটে সাফ করা ,এর জন্য দায়ী। আশ্বিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত বর্ষা বন্যা লেগেই আছে। এমনই ঝড় জলের দিনে এবিসি ক্লাবের মেম্বাররা দুর্গাপূজা ও কালী পূজার বাজেট করছিল। হঠাৎ লোডশেডিং। মোমবাতি জ্বালিয়ে সমস্ত মেম্বাররা কারেন্ট আসার অপেক্ষায় ছিল। হঠাৎ ভুতো এসে হাজির। গায়ে কালো রেইনকোট চাপানো, গা থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। কি যেন বলল হ্যাঁরে ভূতনাথ কতক্ষণ থেকে তোকে ফোন করছি ফোনটা ধরছিস না কেন।

আরে বৃষ্টিতে পা পিছলে জলে পড়ে গিয়ে ফোনটা একদম ডেভ হয়ে গেছে। কিন্তু তোর হাতে কি? 

বুড়োদার দোকান থেকে তেলে ভাজার মুড়ি নিয়ে এলাম। জানি তোরা কেউ বৃষ্টিতে বেরোতে পারিস নি। তাই তোদের জন্য নিয়ে এলাম। 

বাঃ বাঃ বেশ করেছিস। এই ওয়েদারে তেলে ভাজার মুড়ি খুব জমবে। কিন্তু শালা আলোর দেখা নেই। 

মোমের আলোতেই খেয়ে নে। কারেন্ট এলে তখন মিটিং হবে।

আগে তো  ইটিং কর। ভুতো বলল আমি পেছনের চেয়ারে বসছি। সারা গা ভিজে তোদের মাঝখানে বসে কাজ নেই। বলাই বললো তাই হোক।

মুড়ি খেতে খেতে বলাই বললো ভুতদা তুমি গত বছর বিজ্ঞাপন ছাড়াও যা কালেকশন দিয়েছিলে তার রেকর্ড ।এ বছর তোমার উপর আমরা অনেকটা ভরসা করে আছি।

এবারে আর আমার উপর ভরসা করিস না। আমি তোদের সাথে থাকবো কিনা ঠিক নেই। 

ওমা এ আবার কি কথা? কোথাও বেড়াতে যাচ্ছ? 

টিকিট তো কাটাই হয়ে গেছে। 

কোথায় কোথায় যাচ্ছ? 

দুই এক দিন পরেই জানতে পারি ওটা না হয় সাসপেন্স থাক। এখন মুড়ি তেলেভাজা খা। এই আলো অন্ধকারে খাব?

শালা জীবনটাই তো আলো আঁধারী। কখনো কি 24 ঘন্টা আলো বা ২৪ ঘন্টা অন্ধকার দেখেছিস? 

বলাই বাহাবা দিয়ে বলল তা যা বলেছিস। কিন্তু কেমন যেন একটা উদ্ভট গন্ধ আসছে। 

বৃষ্টির জলে  কত কি ড্রেনে ভেসে আসছে। সবাই গল্পে মশগুল হয়ে মুড়ি তেলে ভেজা খেতে লাগলো। ভুতো বলল - আমি বাথরুম থেকে আসছি তোরা চালিয়ে যা। 

বেশ কিছু সময় হল ভূত আর বাথরুম থেকে আসছে না। ব্যাপারটা কি? হয়তো পটি করছে ।

বলতে বলতে আলো এসে গেল। কিন্তু ভুতো গেল কোথায় ?যা তো বাথরুম টা দেখে  আয়তো।

বলাই বাথরুমে গিয়ে বাবা গো মা গো বলে ছুটে এল।

সবাই বলছে কি হয়েছে কি হয়েছে? বলাই কিছুই বলতে পারছে না ।

সবাই হতভম্ব। কিছুটা জিরিয়ে নিয়ে বলাই বলল বাথরুমটা তো দূরে, ওখানে যেতে যেতেই একটা ফোন এলো। কার ফোন ? ভুতোর দাদা ফোন করেছে ।আমিও বাথরুমে ঢুকেছি। 

কি বলল দাদা? আর ভুতোই বা কোথায় হাওয়া হয়ে গেল? 

ওর দাদা বলো তোদের সবাইকে ট্রাই করছি, ফোন রিং হয়ে যাচ্ছে তোরা কেউ ফোন ধরছিস না। 

সবাই ফোন খুলে দেখে হ্যাঁ মিস কল আছে। কিন্তু কি আশ্চর্য্য ! কারো ফোন রিং  হল না কেন?

আমি বাথরুমে গিয়ে দেখি কে যেন হেঁটে গেছে ,গোটা পায়ে রক্তের দাগ। কিছুই বুঝতে পারছি না। আরো কিছুটা এগিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখি ভুতোর রেইনকোট টা ঝুলছে  - ভূতোই নেই।

ওর রেনকোর্ট থেকেও রক্ত পড়ছে।

সবাই অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো সে কি?

কিন্তু ওর দাদা কি বললো? 

ওর দাদা বললো হরিশ মুখার্জী রোডের ক্রসিং এ সিগন্যাল খুলতেই পেছন থেকে কোন প্রাইভেট কার বা ট্যাক্সি এসে এমন মেরেছে যে ভুতো বাইক নিয়ে ছিটকে হাইড্রেনে পড়েছে।

লোকজন ধরাধরি করে যখন ড্রেন থেকে তুলল। তখন সারা গা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ওর ফোনটাও পাওয়া যায়নি। পিজিতে নিয়ে গিয়ে ইমার্জেন্সি তে ভর্তি করানোর ২৫ মিনিটের মধ্যে ওর শ্বাসকষ্ট তীব্র হয়। চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে। এবং ও মারা যায়। 

ইমারজেন্সিতে রক্তের কথা ডাক্তার বলেছিল ।তাই ওর দাদা আমাদেরকে ফোন করছিল । অঝোরে কাঁদছিল। এখন বলল তোরা সবাই আয় শ্মশানে নিয়ে যেতে হবে। তোরাই ওর সর্বক্ষণের বন্ধু ওই ক্লাব নিয়েই তো সব সময় পড়ে থাকতো।

বে থা তো করেনি।

সবাই যেন চোখে সর্ষেফুল দেখছিল। তাহলে মুড়ি তেলেভাজার এগুলো নিয়ে কি এসেছিল? মরেও বন্ধুদের প্রতি এত টান? তাই শেষ খাবারটা খাইয়ে দিয়ে গেল । সেজন্যই ওর চোখটা দেখা যাচ্ছিল না। শরীর যেন কেমন নড়বড় করছিল। গলাটাও ভারি ভারি ঠেক ছিল। কি ভয়ানক! চল সবাই ,আর দেরি করলে ও হয়তো নিজেই আমাদেরকে ডাকতে আসবে।


**********************************************

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন