মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

গ্রন্থ আলোচনা * অরিন্দম মুখোপাধ্যায়





কবি অমিতাভ সেন এর ভক্ত কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করলেন তরুণ কবি ও আলোচক অরিন্দম মুখোপাধ্যায় 


‘ভক্ত’: অন্ধত্ব থেকে অনুসন্ধানের যাত্রাপথ

অরিন্দম মুখোপাধ্যায়


‘ভক্ত’ বললে প্রথমেই যা মনে পড়ে তা হল ভক্তি। এখন প্রশ্ন হল, কীসের? তাঁর সদ্য প্রকাশিত কবিতার বইয়ের এই নামকরণের পর কবি অমিতাভ সেন আমাদের সেই ভক্তির সামান্য আভাস দিয়েছেন এই বইয়ের বিভাবে। তিনি লিখেছেন ঘরফেরতা রেলগাড়ির অনর্গল ছুটে চলার কথা, পথ খুঁজে না পাওয়ার কথা। এই বই সেই খোঁজকে বারবার মনে করায়। নিজেকে খুঁজে পাওয়ার পথে কবির বিভিন্ন পর্যায়ের উত্তরণের চিহ্ন বহন করে এই বইয়ের প্রতিটি কবিতা। জীবনের অসীমত্বের প্রতি কবির নিস্তব্ধ সাধনার প্রামাণ্য নথি হয়ে ওঠে এই বই।

অমিতাভ বই শুরু করেছেন যে কবিতা দিয়ে, তার নাম ‘ভেজাল জল’। প্রথম কবিতার, প্রথম লাইনেই তিনি এই জীবনের ক্ষুদ্রতাকে স্বীকার করেছেন। মৃত্যুকে দেখেছেন সামান্য, সহজের মতো, ‘জীবন যখন জন্মে, মরে সহজে/ কী করার আছে মানুষের সেক্ষেত্রে!’ অথচ পাঠক হিসাবে প্রশ্ন আসে, যে কবিতা শুরু হচ্ছে আধ্যাত্মিকতাকে লক্ষ্য হিসাবে রেখে, তার শিরোনামে ‘ভেজাল জল’ কেন? এর উত্তর আমরা পাই কবিতার শেষে এসে। কবি ব্রহ্মাণ্ডকে আলাদা কোনও শক্তি হিসাবে দেখতে চাননি, দেখতে চাননি কোনও দেবতার নৈমিত্তিক সৃষ্টি হিসাবে। তিনি মানুষ ও সৃষ্টিকে দেখেছেন একত্রে। মানুষের কর্মফলের চূড়ান্ত পরিণতি হিসাবে চিহ্নিত করেছেন এই ধ্বংসকে। পাঠককে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে অমিতাভ লিখছেন, ‘হদিস মিলবে না জেনে, মানুষ/ কেড়ে খায় ভাষা, জলহাওয়াবন/ যে-ভাষায় বলেছে কথা এতকাল।’

এই বইয়ের প্রতিটি কবিতা আমাদের চারপাশের সময়কে প্রতিফলিত করে। প্রতিফলিত করে সময়ের হতাশা, ক্ষোভ। অথচ তার সঙ্গে মিশে যায় কবির আত্ম-অন্বেষণের দৃঢ় চেতনার অনুভূতি। তাই অন্ধকারকে বিষয় হিসাবে বেছে নিলেও, প্রতিটি কবিতা নিজস্ব শরীরে জ্বালিয়ে রাখে আশার ক্ষীণতম আলো। তাই ‘ভক্ত’ বই হিসাবে সমসাময়িক সমাজ এবং সময়ের এক অদৃশ্য দলিলপত্র হলেও, আবেদনে সমস্ত পাঠকের কাছে সর্বাঙ্গীন হয়ে উঠতে পারে। ঠিক যেমন ‘কথোপকথন’ কবিতা অমিতাভ শুরু করেছেন মায়ের মৃত্যু সংবাদ দিয়ে। উঠে এসেছে এই নৃশংসতার পাশে ঘটে চলা উৎসবের ছবি, শিল্পপ্রদর্শনীর ছবি। অথচ কবিতার শেষে সেই মাতৃবিয়োগের শোককে বিসর্জনের পাশে বসিয়েছেন তিনি। নীরবতাকে দেখেছেন সমস্ত প্রশ্নের শেষতম উত্তর হিসাবে।

এই বইয়ের বেশ কিছু কবিতায় অমিতাভ দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করেছেন রূপকের বিপরীতে। চিত্রকল্পের ভিতর জন্ম দিয়েছেন আশ্চর্য কনট্রাডিকশন। নাম-কবিতার শুরুতেই ছবি এঁকেছেন কার্ফিউয়ের। যে দৃশ্য ক্ষতের গল্পে বলে, শোনায় রক্তের কাহিনি, তার পাশে লিখেছেন কোরবানির কথা, আত্মসমর্পণের কথা। মানুষের জীবনে নেমে আসা আকস্মিক এই অভিশাপকে পবিত্র স্নানের সমতুল্য করে তুলেছেন তিনি। ভক্তর মুক্তিতে দেখতে পেয়েছেন ঈশ্বরের মৃত্যুকে। শেষতম লাইনে এসে অধুনা দেশে বিচ্ছিন্নতার শ্রেষ্ঠ অস্ত্রকে খুন করিয়েছেন ভক্তের হাতেই। লিখেছেন, ‘কামড়ে ধরে ধর্ম/ চিবিয়ো মাস তুমি, ভক্ত।’

গোটা বই জুড়ে বিভিন্ন ফর্মের ব্যবহার করেছেন অমিতাভ। বিষয়ের উপযুক্ততা বিচার করে, বেছে নিয়েছেন প্রয়োজনীয় সামগ্রী। মুক্তছন্দের কবিতা, ছন্দের কবিতা, চতুর্দশপদী—প্রত্যেকেরই অবস্থান রয়েছে এই বইতে। এছাড়াও, অমিতাভর উর্দুর উপর দখল ও শব্দের ব্যবহার বেশ কিছু কবিতায় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। ‘বেকারার’ শব্দের সঙ্গে দিলের যোগাযোগ, অর্থাৎ মনের। অথচ অমিতাভ এই বিশেষণকে জুড়ে দিয়েছেন মস্তিষ্কের সঙ্গে। শারীরিক কামনার আকুতি, প্রেমের তীব্র নেশার যে ঘোর, পলাশের গন্ধের ন্যায় যার মধুরতা—সেই অনুভূতি উর্দুর ব্যবহারে যেন আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। অমিতাভ লিখছেন, ‘চক্রব্যূহ, গ্রাস করে সর্বাঙ্গ; পলাশ/ জ্বলে চোখে-মুখে, দিমাগ ভি বেকারার/ দেয় না দিল, শ্বাস নেওয়ার অবকাশ।’

কিছু কিছু কবিতা উপমা ও রূপক থেকে সরে এসে সরাসরি আঘাত করেছে প্রতিষ্ঠানকে। যে ক্ষোভ অমিতাভর ভিতর জমা হয়েছে এই সমাজের প্রতি, তা তিনি পাঠককে জানাতে চেয়েছেন কোনও মুখোশের সাহায্য ছাড়া। সেসব কবিতায় সততা ও ভয়াবহতা বিরাজ করেছে পাশাপাশি। এক্ষেত্রে পাঠকের মনের অস্বস্তি কবিতার দুর্বলতার পরিবর্তে সার্থকতার সমার্থক হয়ে উঠেছে। অমিতাভ লিখেছেন, ‘কালো হল দেহ তার/ শ্রমের ফেরে,/ আর রাষ্ট্র লেখে তথ্য/ মঞ্চের তরে’। এই প্রশ্ন পাঠককে শান্তি থেকে দূরে নিয়ে যাবে। তার অন্দরের নৈতিকতাকে ক্ষত-বিক্ষত করবে। রূপক যে অনুভূতিকে শোকার্ত করে তুলত, অমিতাভর শব্দের দৃঢ়তা তাকে জ্বলন্ত ক্রোধের দিকে ঠেলে দেয়। কবি এভাবেই তার কবিতার শরীরকে ব্যবহার করে তার অভিমুখ নির্দেশ করেন, যার হাত ধরে বক্তব্য কখনও কখনও বাণী হয়ে ওঠে।

শব্দের ব্যবহার যেমন এই বইয়ের শক্তি, তেমনই দুর্বলতাও। বেশ কিছু কবিতা সাধারণ শব্দের ব্যবহারে আরও বেশি সাবলীল হয়ে উঠতে পারত অথচ অতিরিক্ত তৎসম শব্দের ব্যবহার তাকে জটিল করেছে। শব্দের আধিক্যে বক্তব্য লঘু হয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। তবে সবরকম গুণ ও দোষ নিয়েও প্রত্যেকটি কবিতা তার স্বকীয়তা বজায় রাখে। যে ধারণা থেকে, যে বিভাব দিয়ে এ বইয়ের যাত্রার শুরু, সেই আগুনের আঁচ লেগে থাকে প্রতিটা পাতায়।

কবিতার বই হিসাবে ‘ভক্ত’ তবে কেমন? সরলও নয়, সহজও নয়। তবে কি জটিল? না, তাও নয়। তবে? ‘ভক্ত’ যেন এর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক অচেনা জগৎ, যে নিজস্ব পথের অপেক্ষায় দোদুল্যমান। সে উত্তর খুঁজছে—অস্তিত্বের, ন্যায়ের, জন্মের, মৃত্যুর। ঠিক একজন ভক্ত যেমন খুঁজে চলে তার ঈশ্বরকে।

 

বইয়ের নাম: ভক্ত

কবি: অমিতাভ সেন

প্রচ্ছদ: অমিতাভ সেন

প্রকাশক: ধানসিড়ি প্রকাশন

প্রথম প্রকাশ: মে ২০২৬

মূল্য: ২২০ টাকা

 

আলোচক পরিচিতি: অরিন্দম মুখোপাধ্যায় কবি ও গদ্যকার। সিনেমা, সংগীত, খেলাধূলা, সাহিত্য, এমন বিবিধ বিষয়ে তাঁর আগ্রহ, নিয়মিত লেখালেখিও করেন। এযাবৎ প্রকাশিত তাঁর দুটি বই ‘একহাত মাত্র দূরে’ (২০২২) ও ‘সামান্য জলের নেশায়’ (২০২৬)। প্রথমটি গদ্যের, দ্বিতীয়টি কবিতার।

1 টি মন্তব্য:

  1. কিছু দিন ধরেই বিচ্ছিন্ন ভাবে ভক্ত কাব্যগ্ৰন্থের কবিতা পড়ছি । অমিতাভ সেন কেও গত দুবছরে তাঁর কবিতা মারফৎ চিনেছি। উক্ত গ্ৰন্থের আলোচনা এবারে পড়লাম। এই আলোচনাটা বড় জরুরি ছিল। ভক্ত এই সময়ের মানচিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। শুধু কবিতা তো নয়, এটি এক দানবিক সময়ে সাহসি উচ্চারণ। এবং অমিতাভের স্বকীয় কাব্যভাষায়। অমিতাভ এমন একজন কবি যাঁকে পড়তে একটি অনুশীলন লাগে। আরো লিখুন অমিতাভ।

    উত্তরমুছুন